সূরা আল-আনফাল (আয়াত: 23)
হরকত ছাড়া:
ولو علم الله فيهم خيرا لأسمعهم ولو أسمعهم لتولوا وهم معرضون ﴿٢٣﴾
হরকত সহ:
وَ لَوْ عَلِمَ اللّٰهُ فِیْهِمْ خَیْرًا لَّاَسْمَعَهُمْ ؕ وَ لَوْ اَسْمَعَهُمْ لَتَوَلَّوْا وَّ هُمْ مُّعْرِضُوْنَ ﴿۲۳﴾
উচ্চারণ: ওয়া লাও ‘আলিমাল্লা-হু ফীহিম খাইরাল লাআছমা‘আহুম ওয়া লাও আছমা‘আহুম লাতাওয়াল্লাওঁ ওয়া হুম মু‘রিদূন।
আল বায়ান: আর আল্লাহ যদি তাদের মধ্যে কোন কল্যাণ জানতেন তাহলে অবশ্যই তাদেরকে শুনাতেন। আর যদি শুনাতেন তাহলেও তারা মুখ ফিরিয়ে নিত, এমতাবস্থায় যে, তারা উপেক্ষাকারী।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৩. আর আল্লাহ যদি তাদের মধ্যে ভাল কিছু আছে জানতেন তবে তিনি তাদেরকে শুনাতেন। কিন্তু তিনি তাদেরকে শুনালেও তারা উপেক্ষা করে মুখ ফিরিয়ে নিত।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: আল্লাহ যদি দেখতেন যে, তাদের মধ্যে কোন ভাল গুণ নিহিত আছে তবে তিনি তাদেরকে শুনবার তাওফীক দিতেন। আর (গুণ না থাকা অবস্থায়) তিনি যদি তাদেরকে শুনতে দিতেন তাহলে তারা উপেক্ষা করে মুখ ফিরিয়ে নিত।
আহসানুল বায়ান: (২৩) আল্লাহ যদি তাদের মধ্যে ভাল কিছু জানতেন, তাহলে তিনি তাদেরকে শোনাতেন।[1] কিন্তু তিনি তাদেরকে শোনালেও তারা উপেক্ষা করে মুখ ফেরাত। [2]
মুজিবুর রহমান: আল্লাহ যদি জানতেন যে, তাদের মধ্যে কল্যাণকর কিছু নিহিত রয়েছে তাহলে অবশ্যই তিনি তাদেরকে শোনার তাওফীক দিতেন, তিনি যদি তাদেরকে শোনাতেন তাহলেও তারা উপেক্ষা করে মুখ ফিরিয়ে অন্য দিকে চলে যেত।
ফযলুর রহমান: আল্লাহ যদি তাদের মধ্যে ভাল কিছু (আছে বলে) জানতেন তাহলে অবশ্যই তিনি তাদেরকে শোনাতেন। আর তিনি যদি তাদেরকে শোনাতেনও তবু তারা উপেক্ষাভরে মুখ ফিরিয়ে নিত।
মুহিউদ্দিন খান: বস্তুতঃ আল্লাহ যদি তাদের মধ্যে কিছুমাত্র শুভ চিন্তা জানতেন, তবে তাদেরকে শুনিয়ে দিতেন। আর এখনই যদি তাদের শুনিয়ে দেন, তবে তারা মুখ ঘুরিয়ে পালিয়ে যাবে।
জহুরুল হক: আর আল্লাহ্ যদি তাদের মধ্যে ভালো কিছু জানতেন তবে তিনি আলবৎ তাদের শোনাতেন। কিন্তু যদিও তিনি তাদের শোনাতেন তবু তারা ফিরে যেতো, যেহেতু তারা বিমুখ।
Sahih International: Had Allah known any good in them, He would have made them hear. And if He had made them hear, they would [still] have turned away, while they were refusing.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২৩. আর আল্লাহ যদি তাদের মধ্যে ভাল কিছু আছে জানতেন তবে তিনি তাদেরকে শুনাতেন। কিন্তু তিনি তাদেরকে শুনালেও তারা উপেক্ষা করে মুখ ফিরিয়ে নিত।(১)
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা যদি তাদের মধ্যে সামান্যতম কল্যাণকর দিক তথা সৎচিন্তা দেখতেন, তবে তাদের বিশ্বাস সহকারে শোনার সামর্থ্য দান করতেন কিন্তু বর্তমান সত্যানুরাগ না থাকা অবস্থায় যদি আল্লাহ তা'আলা সত্য ও ন্যায় কথা তাদেরকে শুনিয়ে দেন, তাহলে তারা অনীহাভরে তা থেকে বিমুখতা অবলম্বন করবে। তাদের এ বিমুখতা এ কারণে হবে না যে, তারা দ্বীনের মধ্যে কোন আপত্তিকর বিষয় দেখতে পেয়েছে, সে জন্যই তা গ্রহণ করেনি; বরং প্রকৃতপক্ষে তারা সত্যের বিষয়ে কোন লক্ষ্যই করেনি। এর দ্বারা বোঝা গেল যে, আল্লাহ্ তা'আলা শুধু তাকেই ঈমান থেকে বঞ্চিত করেন যার মধ্যে কোন কল্যাণ অবশিষ্ট নেই, যে পবিত্র হতে চায় না, যার কোন ভাল কথা কোন ফল দেয় না। আর এতে রয়েছে বিরাট হিকমত ও রহস্য। [সা’দী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২৩) আল্লাহ যদি তাদের মধ্যে ভাল কিছু জানতেন, তাহলে তিনি তাদেরকে শোনাতেন।[1] কিন্তু তিনি তাদেরকে শোনালেও তারা উপেক্ষা করে মুখ ফেরাত। [2]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, তাদের শোনাকে ফলপ্রসূ করে তাদেরকে সঠিক বুঝ দান করতেন, যাতে তারা সত্য গ্রহণ করে নিত। কিন্তু যেহেতু তাদের মধ্যে কল্যাণ অর্থাৎ, সত্যের সন্ধানই নেই, সেহেতু তারা সঠিক বুঝ হতে বঞ্চিত।
[2] প্রথম শোনা হতে লাভদায়ক শোনা (অর্থাৎ, মানা), আর দ্বিতীয় শোনা হতে কেবল সাধারণ শোনা বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, মহান আল্লাহ যদি সত্য কথা শুনিয়েও থাকেন, তবুও যেহেতু তাদের মধ্যে সত্যের অনুসন্ধান নেই, সেহেতু তারা পুনরায় তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২০-২৩ নং আয়াতের তাফসীরঃ
আল্লাহ তা‘আলা মু’মিন বান্দাদেরকে তাঁর ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করার নির্দেশ দিচ্ছেন। আর ঐ সব জাতির মত হতে নিষেধ করেছেন যারা শুনেও শুনে না। পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: যারা সত্য শুনে না এবং সত্য প্রকাশও করে না তারা সবচেয়ে নিকৃষ্ট জাতি।
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمَثَلُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا كَمَثَلِ الَّذِيْ يَنْعِقُ بِمَا لَا يَسْمَعُ إِلَّا دُعَا۬ٓءً وَّنِدَا۬ٓءً ط صُمٌّۭ بُكْمٌ عُمْيٌ فَهُمْ لَا يَعْقِلُوْنَ)
“আর যারা কুফরী করেছে তাদের দৃষ্টান্ত ওদের ন্যায় যাদেরকে কেউ আহ্বান করলে শুধু চিৎকার ও শব্দ ব্যতীত আর কিছুই শুনে না। তারা বধির, বোবা, অন্ধ। কাজেই তারা বুঝতে পারে না।”(সূরা বাক্বারাহ ২:১৭১)
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيْرًا مِّنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ ز ﺻﻠﮯ لَهُمْ قُلُوْبٌ لَّا يَفْقَهُوْنَ بِهَا ز وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَّا يُبْصِرُوْنَ بِهَا ز وَلَهُمْ اٰذَانٌ لَّا يَسْمَعُوْنَ بِهَا ط أُولٰ۬ئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ ط أُولٰ۬ئِكَ هُمُ الْغٰفِلُوْنَ)
“আমি তো বহু জিন ও মানবকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি, তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তারা তা দ্বারা উপলব্ধি করে না, তাদের চক্ষু আছে কিন্তু তারা তা দ্বারা দেখে না, এবং তাদের কর্ণ আছে কিন্তু তারা তা দ্বারা শ্রবণ করে না, তারা পশুর ন্যায়, বরং তার চেয়েও অধিক বিভ্রান্ত। তারাই গাফিল।”(সূরা আ‘রাফ ৭:১৭৯) এ আয়াত সম্পর্কে ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: তারা হচ্ছে বানী আবুদ দারর গোষ্ঠীর একটি দল। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৪৬) তবে এরূপ আচরণ যাদের মধ্যে পাওয়া যাবে তাদের সকলের জন্য তা প্রযোজ্য।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা অবগত করেন: তাদের সঠিক বুঝ নেই এবং সঠিকটা বুঝার ইচ্ছাও নেই। যদি থাকত তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে হিদায়াতের জন্য কুরআনের বাণী শুনাতেন।
সুতরাং সদা-সর্বদা আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করতে হবে, আনুগত্যের নামে প্রহসন করা যাবে না।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. সর্বদা ও সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলের আনুগত্য করা ফরয।
২. কাফির মুশরিকদের সাথে সাদৃশ্য রাখা হারাম।
৩. কিছু মানুষ রয়েছে তারা চতুষ্পদ জন্তু থেকেও নিকৃষ্ট।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২০-২৩ নং আয়াতের তাফসীর:
এখানে মুমিনদেরকে আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য করার এবং বিরোধিতা করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। আর তাদেরকে বলা হচ্ছে যে, তারা যেন কাফিরদের সাথে সাদৃশ্য স্থাপন না করে। এ জন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমরা তাঁর আনুগত্য হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না।
(আরবী) অর্থাৎ অথচ তোমরা জানছো যে, নবী (সঃ) তোমাদেরকে কোন্ কথার দিকে আহ্বান করছেন। আর তোমরা ঐ লোকদের মত হয়ো না যারা বলে আমরা আপনার কথা শুনলাম, অথচ কার্যতঃ তারা কিছুই শোনে না। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা মুনাফিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। তাদের রীতিনীতি এই ছিল যে, তারা মুখে বলতো- আমরা শুনলাম ও কবুল করলাম । কিন্তু আসলে তারা কিছুই শুনতো না।
এরপর জানিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, এই প্রকারের আদম সন্তানরা হচ্ছে নিকৃষ্টতম জীব। চতুষ্পদ জন্তু ও প্রাণীদের মধ্যে ওরাই হচ্ছে নিকৃষ্টতম যারা সত্য কথা শোনার ব্যাপারে বধির ও সত্য কথা বলার ব্যাপারে মূক। তারা কোন জ্ঞানই রাখে না। কেননা, তারা সত্য কথা মোটেই বুঝে না। এরা নিকৃষ্টতম প্রাণী, এরাই কাফির। চতুষ্পদ জন্তু যে প্রকৃতিতে সৃষ্ট হয়েছে ওরা ঐ ভাবেই চলাফেরা করে, কাজেই তারা যেন আল্লাহর অনুগত। কিন্তু মানুষ তো প্রকৃতিগতভাবে ইবাদতের জন্যে সৃষ্ট হয়েছে, অথচ তারা কুফরী করতে রয়েছে। অতএব প্রকৃতির বিপরীতরূপে চলার কারণে তারা চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও নিকৃষ্ট। এ জন্যেই তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তুর সাথে তুলনা করা হয়েছে। আল্লাহ পাক বলেনঃ “কাফিরদের দৃষ্টান্ত ঐ জানোয়ারগুলোর মত যারা আহ্বানকারীদের উদ্দেশ্য কিছুই বুঝে না, শুধু শব্দ শুনে থাকে।” আর এক জায়গায় বলেছেনঃ “বরং এই কাফিররা চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও নিকৃষ্ট, এরাই হচ্ছে সীমাহীন গাফেল।” বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা কুরায়েশের বানু আবদিদ দারের লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে। কারো কারো ধারণায় এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে মুনাফিকরা। কিন্তু মুশরিক ও মুনাফিকদের পার্থক্য কিছুই নেই। কেননা, এই দু'দলই হচ্ছে জ্ঞানবিবেকহীন লোক। ভাল কাজ করার মত কোন যোগ্যতাই তাদের মধ্যে নেই। এরপর ইরশাদ হচ্ছে- “আল্লাহ যদি জানতেন যে, তাদের মধ্যে কল্যাণকর কিছু নিহিত রয়েছে তবে অবশ্যই তিনি তাদেরকে শুনবার (ও বুঝবার) তাওফীক দিতেন।” অন্তর্নিহিত কথা এই যে, যেহেতু তাদের মধ্যে কোন মঙ্গলই নিহিত নেই সেহেতু তারা কিছুই বুঝে না। আর যদি মহান আল্লাহ তাদেরকে শুনানও তবুও এই হতভাগারা সরল সোজা পথ অবলম্বন করবে না বরং তখনো তারা উপেক্ষা করতঃ মুখ ফিরিয়ে নিবে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।