সূরা আল-আনফাল (আয়াত: 22)
হরকত ছাড়া:
إن شر الدواب عند الله الصم البكم الذين لا يعقلون ﴿٢٢﴾
হরকত সহ:
اِنَّ شَرَّ الدَّوَآبِّ عِنْدَ اللّٰهِ الصُّمُّ الْبُکْمُ الَّذِیْنَ لَا یَعْقِلُوْنَ ﴿۲۲﴾
উচ্চারণ: ইন্না শাররাদ্দাওয়াব্বি ‘ইনদাল্লা-হিসসুম্মুল বুকমুল্লাযীনা লা-ইয়া‘কিলূন।
আল বায়ান: নিশ্চয় আল্লাহর নিকট নিকৃষ্টতম বিচরণশীল প্রাণী হচ্ছে বধির, বোবা, যারা বুঝে না।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২২. নিশ্চয় আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম বিচরণশীল জীব হচ্ছে বধির, বোবা, যারা বুঝে না।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: আল্লাহর নিকট সবচেয়ে নিকৃষ্ট জীব হচ্ছে যারা (হক্ব কথা শুনার ব্যাপারে) বধির এবং (হক্ব কথা বলার ব্যাপারে) বোবা, যারা কিছুই বোঝে না।
আহসানুল বায়ান: (২২) নিশ্চয় আল্লাহর নিকট নিকৃষ্টতম জীব কালা ও বোবা; যারা কিছুই বোঝে না।[1]
মুজিবুর রহমান: আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম জীব হচ্ছে ঐ সব মূক ও বধির লোক, যারা কিছুই বুঝেনা (অর্থাৎ বিবেক বুদ্ধিকে কাজে লাগায়না)।
ফযলুর রহমান: আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম প্রাণী হল বধির ও বোবারা (অবিশ্বাসীরা), যারা কিছু বোঝে না।
মুহিউদ্দিন খান: নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা’আলার নিকট সমস্ত প্রাণীর তুলনায় তারাই মূক ও বধির, যারা উপলদ্ধি করে না।
জহুরুল হক: নিঃসন্দেহ আল্লাহ্র নিকট নিকৃষ্টতম জীব হচ্ছে -- বধির বোবা -- যারা বোঝে না।
Sahih International: Indeed, the worst of living creatures in the sight of Allah are the deaf and dumb who do not use reason.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২২. নিশ্চয় আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম বিচরণশীল জীব হচ্ছে বধির, বোবা, যারা বুঝে না।(১)
তাফসীর:
(১) الدَّوَابِّ শব্দটি دابة এর বহুবচন। অভিধান অনুযায়ী যমীনের উপর বিচরণকারী প্রতিটি জীবকেই دابة বলা হয়। [কাশশাফ] কিন্তু সাধারণ প্রচলন ও পরিভাষায় دابة বলা হয় শুধুমাত্র চতুষ্পদ জন্তুকে। সুতরাং আয়াতের অর্থ দাঁড়ায় এই যে, আল্লাহর নিকট সে সমস্ত লোকই সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট ও চতুষ্পদ জীবতুল্য যারা সত্য ও ন্যায়ের শ্রবণের ব্যাপারে বধির এবং তা গ্রহণ করার ব্যাপারে মুক। কারণ আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে হক জানা ও সে পথে চলার জন্য চোখ ও কান দিয়েছিলেন, কিন্তু তারা সেটা না করে সেগুলোকে ভিন্ন পথে পরিচালিত করেছে। [সা'দী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২২) নিশ্চয় আল্লাহর নিকট নিকৃষ্টতম জীব কালা ও বোবা; যারা কিছুই বোঝে না।[1]
তাফসীর:
[1] এই কথাটিকেই কুরআনের অন্যত্র এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে।{لَهُمْ قُلُوبٌ لاَّ يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لاَّ يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لاَّ يَسْمَعُونَ بِهَا أُوْلَئِكَ كَالأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُوْلَئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ} অর্থাৎ, তাদের হৃদয় আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না, তাদের চক্ষু আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা দর্শন করে না এবং তাদের কর্ণ আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা শ্রবণ করে না। এরা চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়; বরং তা অপেক্ষাও অধিক বিভ্রান্ত! তারাই হল উদাসীন। (সূরা আ’রাফ ১৭৯ আয়াত)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২০-২৩ নং আয়াতের তাফসীরঃ
আল্লাহ তা‘আলা মু’মিন বান্দাদেরকে তাঁর ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করার নির্দেশ দিচ্ছেন। আর ঐ সব জাতির মত হতে নিষেধ করেছেন যারা শুনেও শুনে না। পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: যারা সত্য শুনে না এবং সত্য প্রকাশও করে না তারা সবচেয়ে নিকৃষ্ট জাতি।
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمَثَلُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا كَمَثَلِ الَّذِيْ يَنْعِقُ بِمَا لَا يَسْمَعُ إِلَّا دُعَا۬ٓءً وَّنِدَا۬ٓءً ط صُمٌّۭ بُكْمٌ عُمْيٌ فَهُمْ لَا يَعْقِلُوْنَ)
“আর যারা কুফরী করেছে তাদের দৃষ্টান্ত ওদের ন্যায় যাদেরকে কেউ আহ্বান করলে শুধু চিৎকার ও শব্দ ব্যতীত আর কিছুই শুনে না। তারা বধির, বোবা, অন্ধ। কাজেই তারা বুঝতে পারে না।”(সূরা বাক্বারাহ ২:১৭১)
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيْرًا مِّنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ ز ﺻﻠﮯ لَهُمْ قُلُوْبٌ لَّا يَفْقَهُوْنَ بِهَا ز وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَّا يُبْصِرُوْنَ بِهَا ز وَلَهُمْ اٰذَانٌ لَّا يَسْمَعُوْنَ بِهَا ط أُولٰ۬ئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ ط أُولٰ۬ئِكَ هُمُ الْغٰفِلُوْنَ)
“আমি তো বহু জিন ও মানবকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি, তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তারা তা দ্বারা উপলব্ধি করে না, তাদের চক্ষু আছে কিন্তু তারা তা দ্বারা দেখে না, এবং তাদের কর্ণ আছে কিন্তু তারা তা দ্বারা শ্রবণ করে না, তারা পশুর ন্যায়, বরং তার চেয়েও অধিক বিভ্রান্ত। তারাই গাফিল।”(সূরা আ‘রাফ ৭:১৭৯) এ আয়াত সম্পর্কে ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: তারা হচ্ছে বানী আবুদ দারর গোষ্ঠীর একটি দল। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৪৬) তবে এরূপ আচরণ যাদের মধ্যে পাওয়া যাবে তাদের সকলের জন্য তা প্রযোজ্য।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা অবগত করেন: তাদের সঠিক বুঝ নেই এবং সঠিকটা বুঝার ইচ্ছাও নেই। যদি থাকত তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে হিদায়াতের জন্য কুরআনের বাণী শুনাতেন।
সুতরাং সদা-সর্বদা আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করতে হবে, আনুগত্যের নামে প্রহসন করা যাবে না।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. সর্বদা ও সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলের আনুগত্য করা ফরয।
২. কাফির মুশরিকদের সাথে সাদৃশ্য রাখা হারাম।
৩. কিছু মানুষ রয়েছে তারা চতুষ্পদ জন্তু থেকেও নিকৃষ্ট।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২০-২৩ নং আয়াতের তাফসীর:
এখানে মুমিনদেরকে আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য করার এবং বিরোধিতা করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। আর তাদেরকে বলা হচ্ছে যে, তারা যেন কাফিরদের সাথে সাদৃশ্য স্থাপন না করে। এ জন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমরা তাঁর আনুগত্য হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না।
(আরবী) অর্থাৎ অথচ তোমরা জানছো যে, নবী (সঃ) তোমাদেরকে কোন্ কথার দিকে আহ্বান করছেন। আর তোমরা ঐ লোকদের মত হয়ো না যারা বলে আমরা আপনার কথা শুনলাম, অথচ কার্যতঃ তারা কিছুই শোনে না। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা মুনাফিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। তাদের রীতিনীতি এই ছিল যে, তারা মুখে বলতো- আমরা শুনলাম ও কবুল করলাম । কিন্তু আসলে তারা কিছুই শুনতো না।
এরপর জানিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, এই প্রকারের আদম সন্তানরা হচ্ছে নিকৃষ্টতম জীব। চতুষ্পদ জন্তু ও প্রাণীদের মধ্যে ওরাই হচ্ছে নিকৃষ্টতম যারা সত্য কথা শোনার ব্যাপারে বধির ও সত্য কথা বলার ব্যাপারে মূক। তারা কোন জ্ঞানই রাখে না। কেননা, তারা সত্য কথা মোটেই বুঝে না। এরা নিকৃষ্টতম প্রাণী, এরাই কাফির। চতুষ্পদ জন্তু যে প্রকৃতিতে সৃষ্ট হয়েছে ওরা ঐ ভাবেই চলাফেরা করে, কাজেই তারা যেন আল্লাহর অনুগত। কিন্তু মানুষ তো প্রকৃতিগতভাবে ইবাদতের জন্যে সৃষ্ট হয়েছে, অথচ তারা কুফরী করতে রয়েছে। অতএব প্রকৃতির বিপরীতরূপে চলার কারণে তারা চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও নিকৃষ্ট। এ জন্যেই তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তুর সাথে তুলনা করা হয়েছে। আল্লাহ পাক বলেনঃ “কাফিরদের দৃষ্টান্ত ঐ জানোয়ারগুলোর মত যারা আহ্বানকারীদের উদ্দেশ্য কিছুই বুঝে না, শুধু শব্দ শুনে থাকে।” আর এক জায়গায় বলেছেনঃ “বরং এই কাফিররা চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও নিকৃষ্ট, এরাই হচ্ছে সীমাহীন গাফেল।” বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা কুরায়েশের বানু আবদিদ দারের লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে। কারো কারো ধারণায় এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে মুনাফিকরা। কিন্তু মুশরিক ও মুনাফিকদের পার্থক্য কিছুই নেই। কেননা, এই দু'দলই হচ্ছে জ্ঞানবিবেকহীন লোক। ভাল কাজ করার মত কোন যোগ্যতাই তাদের মধ্যে নেই। এরপর ইরশাদ হচ্ছে- “আল্লাহ যদি জানতেন যে, তাদের মধ্যে কল্যাণকর কিছু নিহিত রয়েছে তবে অবশ্যই তিনি তাদেরকে শুনবার (ও বুঝবার) তাওফীক দিতেন।” অন্তর্নিহিত কথা এই যে, যেহেতু তাদের মধ্যে কোন মঙ্গলই নিহিত নেই সেহেতু তারা কিছুই বুঝে না। আর যদি মহান আল্লাহ তাদেরকে শুনানও তবুও এই হতভাগারা সরল সোজা পথ অবলম্বন করবে না বরং তখনো তারা উপেক্ষা করতঃ মুখ ফিরিয়ে নিবে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।