আল কুরআন


সূরা আল-আনফাল (আয়াত: 24)

সূরা আল-আনফাল (আয়াত: 24)



হরকত ছাড়া:

يا أيها الذين آمنوا استجيبوا لله وللرسول إذا دعاكم لما يحييكم واعلموا أن الله يحول بين المرء وقلبه وأنه إليه تحشرون ﴿٢٤﴾




হরকত সহ:

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوا اسْتَجِیْبُوْا لِلّٰهِ وَ لِلرَّسُوْلِ اِذَا دَعَاکُمْ لِمَا یُحْیِیْکُمْ ۚ وَ اعْلَمُوْۤا اَنَّ اللّٰهَ یَحُوْلُ بَیْنَ الْمَرْءِ وَ قَلْبِهٖ وَ اَنَّهٗۤ اِلَیْهِ تُحْشَرُوْنَ ﴿۲۴﴾




উচ্চারণ: ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানুছতাজীবূলিল্লা-হি ওয়ালিররাছূলি ইযা-দা‘আ-কুম লিমাইউহয়ীকুম ওয়া‘লামূআন্নাল্লা-হা ইয়াহূলুবাইনাল মারয়ি ওয়া কালবিহী ওয়া আন্নাহূইলাইহি তুহশারূন।




আল বায়ান: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের ডাকে সাড়া দাও; যখন সে তোমাদেরকে আহবান করে তার প্রতি, যা তোমাদেরকে জীবন দান করে। জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ মানুষ ও তার হৃদয়ের মাঝে অন্তরায় হন। আর নিশ্চয় তাঁর নিকট তোমাদেরকে সমবেত করা হবে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৪. হে ঈমানদারগণ রাসূল যখন তোমাদেরকে এমন কিছুর দিকে ডাকে যা তোমাদেরকে প্রাণবন্ত করে তখন তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের ডাকে সাড়া দেবে এবং জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ মানুষ ও তার হৃদয়ের মাঝে অন্তরায় হন(১)। আর নিশ্চয় তারই দিকে তোমাদেরকে একত্রিত করা হবে।




তাইসীরুল ক্বুরআন: ওহে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের ডাকে সাড়া দাও যখন তোমাদেরকে ডাকা হয় (এমন বিষয়ের দিকে) যা তোমাদের মাঝে জীবন সঞ্চার করে, আর জেনে রেখ যে আল্লাহ মানুষ ও তার অন্তরের মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে যান আর তোমাদেরকে তাঁর কাছেই একত্রিত করা হবে।




আহসানুল বায়ান: (২৪) হে বিশ্বাসীগণ! রসূল যখন তোমাদেরকে এমন কিছুর দিকে আহবান করে, যা তোমাদেরকে প্রাণবন্ত করে,[1] তখন আল্লাহ ও রসূলের আহবানে সাড়া দাও এবং জেনে রাখ যে, আল্লাহ মানুষ ও তার হৃদয়ের মাঝে অন্তরায় হন[2] এবং তাঁরই নিকট তোমাদেরকে একত্রিত করা হবে।



মুজিবুর রহমান: হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ডাকে সাড়া দাও যখন তিনি তোমাদেরকে তোমাদের জীবন সঞ্চারক বস্তুর দিকে আহবান করেন। আর জেনে রেখ, আল্লাহ মানুষ ও তার অন্তরের অন্তরালে থাকেন, পরিশেষে তাঁর কাছেই তোমাদেরকে সমবেত করা হবে।



ফযলুর রহমান: হে ঈমানদারগণ! যখন আল্লাহর রসূল তোমাদেরকে এমন কাজের আহবান জানায় যা তোমাদেরকে প্রাণময় করে তখন তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের ডাকে সাড়া দেবে। আর জেনে রাখবে, মানুষ ও তার অন্তরের মাঝে আল্লাহ প্রতিবন্ধক হন (অর্থাৎ খারাপ মানুষকে কিছু সিদ্ধান্ত নিতে তিনি বাধা দেন) এবং তাঁর কাছেই তোমাদেরকে একত্রিত করা হবে।



মুহিউদ্দিন খান: হে ঈমানদারগণ, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নির্দেশ মান্য কর, যখন তোমাদের সে কাজের প্রতি আহবান করা হয়, যাতে রয়েছে তোমাদের জীবন। জেনে রেখো, আল্লাহ মানুষের এবং তার অন্তরের মাঝে অন্তরায় হয়ে যান। বস্তুতঃ তোমরা সবাই তাঁরই নিকট সমবেত হবে।



জহুরুল হক: ওহে যারা ঈমান এনেছ! আল্লাহ্ ও রসূলের প্রতি সাড়া দাও যখন তিনি তোমাদের আহ্বান করেন তাতে যা তোমাদের জীবন দান করে। আর জানো যে আল্লাহ্ মানুষের ও তার অন্তঃকরণের মাঝখানে বিরাজ করছেন, আর নিঃসন্দেহ তিনি -- তাঁরই কাছে তোমাদের একত্রিত করা হবে।



Sahih International: O you who have believed, respond to Allah and to the Messenger when he calls you to that which gives you life. And know that Allah intervenes between a man and his heart and that to Him you will be gathered.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২৪. হে ঈমানদারগণ রাসূল যখন তোমাদেরকে এমন কিছুর দিকে ডাকে যা তোমাদেরকে প্রাণবন্ত করে তখন তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের ডাকে সাড়া দেবে এবং জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ মানুষ ও তার হৃদয়ের মাঝে অন্তরায় হন(১)। আর নিশ্চয় তারই দিকে তোমাদেরকে একত্রিত করা হবে।


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা মানুষের এবং তার অন্তরের মাঝে অন্তরায় হয়ে থাকেন। এ বাক্যটির বিভিন্ন অর্থ হতে পারে।

(এক) একটি অর্থ হতে পারে যে, যখনই কোন সৎকাজ করার কিংবা পাপ থেকে বিরত থাকার সুযোগ আসে, তখন সঙ্গে সঙ্গে তা করে ফেল; এতটুকু বিলম্ব করো না এবং অবকাশকে গনীমত জ্ঞান কর। কারণ, যে কোন সময় মানুষের রোগ-শোক, মৃত্যু কিংবা এমন কোন কাজ উপস্থিত হয়ে যেতে পারে, যাতে সে কাজ করার আর অবকাশ থাকে না। সুতরাং মানুষের কর্তব্য হলো আয়ু এবং সময়ের অবকাশকে গনীমত মনে করা। আজকের কাজ কালকের জন্য ফেলে না রাখা। কারণ, এ কথা কারোরই জানা নেই যে, কাল কি হবে। পরবর্তীতে ভাল কাজ করতে চাইলে সক্ষম নাও হতে পার। [সা'দী]

(দুই) এ বাক্যের দ্বিতীয় মর্ম এও হতে পারে যে, এতে আল্লাহ্ তা'আলা যে বান্দার অতি সন্নিকটে তাই বলে দেয়া হয়েছে। প্রতিটি মানুষ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যখনই তিনি কোন বান্দাকে অকল্যাণ থেকে রক্ষা করতে চান, তখন তিনি তার অন্তর ও পাপের মাঝে অন্তরায় সৃষ্টি করে দেন। আবার যখন কারো ভাগ্যে অমঙ্গল থাকে, তখন তার অন্তর ও সৎকর্মের মাঝে অন্তরায় সৃষ্টি করে দেয়া হয়। সে কারণেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিকাংশ সময় এই দোআ করতেন-  অর্থাৎ, হে অন্তরসমূহের বিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন। [তিরমিযীঃ ২১৪১] [ইবন কাসীর]

(তিন) ইবনে অববাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, এর অর্থ আল্লাহ কাফেরের ঈমান ও মুমিনের কুফরীর মাঝে অন্তরায় হয়ে যান। [মুসানদে আহমাদ ৩/১১২ [ইবন কাসীর]

(চার) কেউ কেউ বলেনঃ আয়াতটি যেহেতু বদর যুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্ট সেহেতু তার অর্থ হবে- জেনে রাখ, আল্লাহ তার নেক বান্দাদের ভাগ্যকে নিরাপত্তায় রূপান্তরিত করেন। আর কাফেরদের প্রশান্ত অন্তরে অশান্তি ও ভয়ে পরিবর্তন করে দেবেন। আবার তিনি ইচ্ছে করলে মুসলিমদের নিরাপদ অবস্থাকে ভীত অবস্থায় রুপান্তরিত করতে পারেন। [ফাতহুল কাদীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২৪) হে বিশ্বাসীগণ! রসূল যখন তোমাদেরকে এমন কিছুর দিকে আহবান করে, যা তোমাদেরকে প্রাণবন্ত করে,[1] তখন আল্লাহ ও রসূলের আহবানে সাড়া দাও এবং জেনে রাখ যে, আল্লাহ মানুষ ও তার হৃদয়ের মাঝে অন্তরায় হন[2] এবং তাঁরই নিকট তোমাদেরকে একত্রিত করা হবে।


তাফসীর:

[1] لِمَا يُحْيِيكُم এর অর্থঃ এমন বস্তুর দিকে যা তোমাদেরকে জীবন দান করে। কেউ কেউ বলেন, এ থেকে জিহাদ বুঝানো হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বিজয়ীর জীবন। আবার কেউ কুরআনের আদেশ-নিষেধ, শরীয়তের বিধান অর্থ নিয়েছেন, এর মধ্যে জিহাদও রয়েছে। সারকথা হল যে, কেবল আল্লাহ ও তাঁর রসূলের কথা মানো, তার উপর আমল কর। এতেই রয়েছে তোমাদের জীবন।

[2] অর্থ মৃত্যুদান করে, যার স্বাদ সকলকেই গ্রহণ করতে হবে। অর্থাৎ, তোমাদের মৃত্যু আসার পূর্বে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের কথা মেনে নিয়ে তার উপর আমল কর। কেউ কেউ বলেন, মহান আল্লাহ মানুষের হৃদয়ের এত নিকটে যে, তারই উপমা এখানে দেওয়া হয়েছে। যার অর্থ তিনি মানুষের মনের গোপন কথাও জানেন, তাঁর কাছে কোন জিনিসই লুক্কায়িত নয়। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এর অর্থ বলেছেন যে, তিনি যখন চান মানুষ ও তার অন্তরের মাঝে অন্তরায় হয়ে যান। এমনকি মানুষ তাঁর ইচ্ছা ব্যতিরেকে কিছুই পেতে পারে না। আবার কেউ কেউ একে বদরের যুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত বলেছেন; মুসলিমগণ শত্রুদের সংখ্যাধিক্যে ভীত ছিলেন, মহান আল্লাহ তাঁদের অন্তরে অন্তরায় হয়ে ভয়কে অভয়ে বদলে দেন। ইমাম শাওকানী বলেন, আয়াতের উক্ত সকল অর্থই হতে পারে। (ফাতহুল কাদীর) ইমাম ইবনে জারীরের বর্ণিত অর্থের সমর্থন ঐ সকল হাদীস দ্বারা হয়, যাতে দ্বীনের উপর অবিচল থাকার দু’আ করতে তাকীদ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ একটি হাদীসে নবী (সাঃ) বলেছেন, ‘‘আদম সন্তানের অন্তরসমূহ একটি অন্তরের ন্যায় রহমানের (আল্লাহর) দুই আঙ্গুলের মাঝে রয়েছে। তিনি যেভাবে চান তা ঘুরিয়ে থাকেন। তারপর তিনি এই দু’আ পাঠ করেন। হে অন্তর ফিরানোর মালিক! আমাদের অন্তরকে তোমার আনুগত্যের দিকে ফিরিয়ে দাও।’’ (মুসলিমঃ তকদীর অধ্যায়) অন্য বর্ণনায় আছে, ‘‘হে হৃদয় পরিবর্তনকারী! তুমি আমার অন্তরকে তোমার দ্বীনে অবিচল রাখ।’’ (তিরমিযী, তাকদীর পরিচ্ছেদ)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ২৪-২৬ নং আয়াতের তাফসীরঃ



ঈমানদারদেরকে আহ্বান করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তোমরা আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের ডাকে আনুগত্যের মাধ্যমে সাড়া দাও। এতে তোমাদের ইহলৌকিক ও পরলৌকিক কল্যাণ রয়েছে।



ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেন: اسْتَجِيبُوا এর অর্থ হল: সাড়া দাও। আর



لِمَا يُحْيِيكُمْ



যাতে তোমাদের কল্যাণ রয়েছে। (সূরা আনফাল তাফসীর, সহীহ বুখারী)



আবূ সাঈদ ইবনু মু‘আল্লা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি সালাতরত ছিলাম, এমন সময় রসূলুল্লাহ (সাঃ) আমার পাশ দিয়ে গেলেন এবং আমাকে ডাকলেন। সালাত শেষ না করা পর্যন্ত আমি তাঁর কাছে যাইনি, তারপর গেলাম। তিনি বললেন, তোমাকে আসতে বাধা দিল কিসে? আল্লাহ তা‘আলা কি বলেননি “হে মু’মিনগণ! রাসূল যখন তোমাদেরকে এমন কিছুর দিকে আহ্বান করে যা তোমাদের মাঝে জীবন সঞ্চার করে, তখন আল্লাহ ও রাসূলের আহ্বানে সাড়া দাও” হাদীসের শেষ পর্যন্ত। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৪৭, ৪৪৭৪)



(أَنَّ اللّٰهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِه)



‘নিশ্চয়ই‎ আল্লাহ মানুষ ও তার অন্তরের মধ্যবর্তী প্রতিবন্ধক হয়ে থাকেন’ অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা সবকিছুর মধ্যে পরিবর্তনকারী এমনকি একজন মানুষের ও তার অন্তর যা চায় তার মধ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে সক্ষম। (তাফসীর মুয়াসসার, ১৭৯)



ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: আল্লাহ তা‘আলা প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করেন মু’মিন ও কুফরীর মাঝে এবং কাফির ও ঈমানের মাঝে। (মুসতাদরাক হাকিম ২য় খ. পৃঃ ৩২৮)



তাই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) দু‘আ করতেন:



يا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلٰي دِينِكَ



হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী আমার অন্তরকে তোমার দীনের ওপর অটল রাখিও।



আয়িশাহ  বলেন: হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আপনি বেশি বেশি এ দু‘আ কেন করেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জবাবে বললেন: আদম সন্তানের অন্তরসমূহ আল্লাহ তা‘আলার দু’ আঙ্গুলের মাঝে বিদ্যমান; ইচ্ছা করলে সেগুলোকে তিনি বক্র করে দেন আর ইচ্ছা করলে সঠিকের ওপর বহাল রাখেন। (মুসনাদ আহমাদ ৬ষ্ঠ খ. পৃঃ ৯১, তিরমিযী হা: ৩৫২২, হাসান)



এ অংশ দ্বারা অনেকে বুঝানোর চেষ্টা করেন যে, আল্লাহ তা‘আলার অবস্থান মু’মিন বান্দার অন্তরে। এ মর্মে তারা একটি বানোয়াট হাদীসও বর্ণনা করে বলেন: মু’মিনের অন্তর আল্লাহ তা‘আলার আরশ। তাদের এরূপ ধারণা অমূলক, বরং আল্লাহ তা‘আলা স্বসত্তায় আরশের ওপর আছেন, আর আল্লাহ তা‘আলার আরশ সাত আকাশের উপরে। এ সম্পর্কে বহুবার আলোচনা করা হয়েছে।



وَاتَّقُوا فِتْنَةً



‘তোমরা এমন ফেতনাকে ভয় কর’ অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা ঐ ফেতনাকে ভয় করার নির্দেশ দিচ্ছেন যা সৎ ও অসৎ, জালেম ও ন্যায় ব্যক্তিসহ সকলকে পাকড়াও করবে। এ ফেতনা হল আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর আনুগত্য ছেড়ে দেয়া এবং সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ থেকে বিরত থাকা। এসব কাজ না করলে সকলকে ফেতনা গ্রাস করবে। (আয়সারুত তাফাসীর, ২য় খ. পৃঃ ১৩১)



রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিদের খারাপ আমলের কারণে সকলকে শাস্তি দেবেন না। যতক্ষণ না মানুষ তোমাদের মাঝে খারাপ কাজ দেখে। এ খারাপ কাজে বাধা দিতে সক্ষম থাকা সত্ত্বেও বাধা না দিলে সকলকে আল্লাহ তা‘আলা শাস্তি দেবেন। (মুসনাদ আহমাদ: ১/১৯২, সহীহ) যয়নাব (রাঃ) বলেন: নাবী (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলাম: হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমাদের মাঝে সৎ লোক থাকা সত্ত্বেও কি আমাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হবে? তিনি বললেন: হ্যাঁ, যখন খারাপ কাজ বৃদ্ধি পাবে। (সহীহ বুখারী হা: ৩৩৪৬)



তারপর আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন সে সময়ের কথা যখন তোমরা সংখ্যায় স্বল্প ছিলে তোমাদেরকে জমিনে দুর্বল করে রাখা হয়েছিল। ইচ্ছা করলে মানুষ তোমাদেরকে ছুঁ মেরে নিতে পারত। তখন আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে তাঁর সাহায্য দ্বারা শক্তিশালী করেছেন। তোমাদেরকে পবিত্র বস্তু রিযিকস্বরূপ দিয়েছেন যাতে তোমরা তাঁর শুকরিয়া কর।



অতএব প্রতিটি মু’মিনের ঈমানী দায়িত্ব হল: যথাসম্ভব সৎ কাজের আদেশ প্রদান করা ও অসৎ কাজে বাধা দেয়া এবং আল্লাহ ও রাসূলের একচ্ছত্র আনুগত্য করা।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. মানুষ যে প্রান্তেই থাকুক না কেন আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর ডাকে সাড়া দেয়া আবশ্যক। সাড়া দেয়ার অর্থ হল তাদের আনুগত্য করা।

২. আল্লাহ তা‘আলা সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান।



৩. يا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلٰي دِينِكَ



এ দু‘আটি বেশি বেশি পড়া উচিত।



৪. সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের বাধা না দিলে ফেতনা আমাদেরকে গ্রাস করবে, তখন দু‘আ করেও কোন কাজে আসবে না।

৫. নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা উচিত।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: আল্লাহ পাক বলেনঃ হে মুমিনগণ! তোমাদেরই সংশোধনের উদ্দেশ্যে যখন নবী (সঃ) তোমাদেরকে আহ্বান করেন তখন তোমরা অতিসত্বর সাড়া দাও এবং হুকুম পালন কর। আবু সাঈদ ইবনে মাআ’ল্লা (রাঃ) বলেন, আমি একদা নামায পড়ছিলাম, এমন সময় নবী (সঃ) আমার পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন। তিনি আমাকে ডাক দেন, কিন্তু আমি নামাযে থাকায় সাথে সাথে তাঁর কাছে যেতে পারলাম না। নামায শেষে তাঁর কাছে পৌছলে তিনি আমাকে বলেন, তুমি এতক্ষণ আসনি কেন? আল্লাহ কি তোমাদেরকে বলেননি- “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও রাসূল (সঃ)-এর হুকুম পালন কর যখন রাসূল (সঃ) তোমাদেরকে তোমাদের জীবন সঞ্চারক বস্তুর দিকে আহ্বান করে?” অতঃপর তিনি আমাকে বলেনঃ “আমি এখান থেকে চলে যাওয়ার পূর্বে তোমাকে কুরআনের একটি মহা সম্মানিত সূরা শিখিয়ে দেবো।” এর পর তিনি যাওয়ার উদ্যোগ করলে আমি তাঁকে ঐ কথা স্মরণ করিয়ে দিলাম।” মোটকথা, এখানে আল্লাহ ও রাসূল (সঃ)-এর নির্দেশ সত্বর পালনের হুকুম দেয়া হয়েছে। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, এটা হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ)-এর ঘটনা। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেন যে, ঐ সূরাটি হচ্ছে সূরায়ে ফাতেহা । অতঃপর তিনি বলেনঃ “এটাই হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ সাতটি আয়াত যা নামাযে সদা পুনরাবৃত্তি করা হয়। এই হাদীসের বর্ণনা সূরায়ে ফাতেহার তাফসীরে দেয়া হয়েছে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) -এর অর্থ হচ্ছে ‘সত্যের খাতিরে। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এটাই হচ্ছে কুরআন যাতে মুক্তি, স্থায়িত্ব এবং জীবন রয়েছে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, ইসলাম গ্রহণের মধ্যেই জীবন রয়েছে এবং কুফরীর মধ্যে রয়েছে মৃত্যু। অথবা ভাবার্থ হচ্ছে- যখন নবী (সঃ) তোমাদেরকে সেই জিহাদের দিকে আহ্বান করেন। যার মাধ্যমে তোমরা মর্যাদা লাভ করেছো, অথচ এর পূর্বে তোমরা দুর্বল ছিলে, অতঃপর আল্লাহ তোমাদেরকে শক্তিশালী করেছেন এবং তোমরা কাফিরদের কাছে পরাজিত হয়েছিলে, যার পর তিনি তোমাদেরকে তাদের উপর বিজয় দান করেছেন, তখন তোমরা তাড়াতাড়ি তার ডাকে সাড়া দাও এবং হুকুম পালন কর।

আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ জেনে রেখো যে, আল্লাহ মানুষ ও তার অন্তরের মাঝে আড়াল হয়ে রয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তিনি আড়াল হয়ে আছেন মুমিন ও কুফরীর মাঝে এবং কাফির ও ঈমানের মাঝে। মুমিনকে তিনি কুফরী করতে দেন না এবং কাফিরকে ঈমান আনতে দেন না। (এটাই হচ্ছে মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), যহহাক (রঃ), আতিয়্যা এবং মুকাতিল (রঃ)-এরও উক্তি। মুজাহিদ (রঃ)-এর এক রিওয়ায়াতে আছে যে, (আরবী) অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত তিনি তাকে এমন অবস্থায় ছেড়ে দেন যে, সে কিছুই বুঝতে পারে না) সুদ্দী (রঃ) বলেনঃ “এর অর্থ হচ্ছেকেউই এই ক্ষমতা রাখে না যে, তাঁর অনুমতি ছাড়া ঈমান আনে কুফরী করে।” কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতটি (৫০:১৬) -এই আয়াতটির মতই। এর সাথে সাদৃশ্যযুক্ত বহু হাদীস রয়েছে।

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেন-(আরবী) অর্থাৎ “হে অন্তরকে পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন!` (হযরত আনাস রাঃ তখন বলেন) আমরা বললামঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা আপনার উপর এবং কুরআনের উপর ঈমান এনেছি। আমাদের ব্যাপারে আপনার কোন সন্দেহ রয়েছে কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা কেননা এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, তোমাদের পরিবর্তন ঘটে যাবে। কারণ, মানুষের অন্তর আল্লাহ তাআলার দু’ অঙ্গুলির মাঝে রয়েছে। তিনি যখন ইচ্ছা করবেন তখন বদলিয়ে দিবেন।”

হযরত নাওয়াস ইবনে সামআন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেন- “প্রত্যেক অন্তর আল্লাহর দু’টি অঙ্গুলির মধ্যভাগে রয়েছে। আল্লাহ যখন ওটাকে সোজা রাখার ইচ্ছা করেন তখন তা সোজা থাকে। আর যখন বাঁকা করে দেয়ার ইচ্ছা করেন তখন তা বাঁকা হয়ে যায়।” অতঃপর তিনি বলেনঃ “মীযান আল্লাহর হাতে রয়েছে। ইচ্ছা করলে তিনি ওকে হালকা করে দিবেন এবং ইচ্ছা করলে ভারী করবেন।” (এ হাদীসটি ইমাম নাসাঈ (রঃ) ও ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত উম্মু সালমা (রাঃ) বলেনঃ “আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অন্তর কি পরিবর্তিত হয়?” তিনি উত্তরে বললেনঃ হ্যাঁ, আল্লাহ ইচ্ছা করলে মানুষের অন্তর সোজা রাখেন এবং ইচ্ছা করলে বাকা করে দেন। এ জন্যেই আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি- (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে হিদায়াত দানের পর আমাদের অন্তরগুলোকে বাঁকা করবেন না এবং আপনার নিকট থেকে আমাদেরকে করুণা দান করুন! নিশ্চয়ই আপনি বড় দাতা।” (৩:৮) আমি বললামঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে এমন একটি দুআ শিখিয়ে দিন যার মাধ্যমে আমি নিজের জন্যে প্রার্থনা করবো।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! হে নবী মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রতিপালক! আমার গুনাহ মার্জনা করুন, আমার অন্তরের ক্রোধ দূরীভূত করুন এবং যতদিন আমাকে জীবিত রাখবেন ততদিন আমাকে বিভ্রান্তিকর ফিত্না হতে বাঁচিয়ে রাখুন!”

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “বানী আদমের অন্তরগুলো আল্লাহর দু'টি অঙ্গুলির মাঝে একটি অন্তরের ন্যায়। তিনি যেভাবে চান সেভাবেই ওগুলোকে ফিরিয়ে থাকেন।” অতঃপর তিনি বলেনঃ অর্থাৎ “হে আল্লাহ! হে অন্তরগুলোকে পরিবর্তনকারী! আমাদের অন্তরগুলোকে আপনার আনুগত্যের দিকে ফিরিয়ে দিন।”





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।