আল কুরআন


সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 164)

সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 164)



হরকত ছাড়া:

قل أغير الله أبغي ربا وهو رب كل شيء ولا تكسب كل نفس إلا عليها ولا تزر وازرة وزر أخرى ثم إلى ربكم مرجعكم فينبئكم بما كنتم فيه تختلفون ﴿١٦٤﴾




হরকত সহ:

قُلْ اَغَیْرَ اللّٰهِ اَبْغِیْ رَبًّا وَّ هُوَ رَبُّ کُلِّ شَیْءٍ ؕ وَ لَا تَکْسِبُ کُلُّ نَفْسٍ اِلَّا عَلَیْهَا ۚ وَ لَا تَزِرُ وَازِرَۃٌ وِّزْرَ اُخْرٰی ۚ ثُمَّ اِلٰی رَبِّکُمْ مَّرْجِعُکُمْ فَیُنَبِّئُکُمْ بِمَا کُنْتُمْ فِیْهِ تَخْتَلِفُوْنَ ﴿۱۶۴﴾




উচ্চারণ: কুল আগাইরাল্লা-হি আবগী রাব্বাওঁ ওয়া হুয়া রাব্বুকুল্লি শাইয়িওঁ ওয়া লা-তাকছিবুকুল্লু নাফছিন ইল্লা-‘আলাইহা- ওয়া লা- তাযিরু ওয়াযিরাতুওঁবিযরা উখরা- ছু ম্মা ইলা-রাব্বিকুম মারিজ‘উকুম ফাইউনাব্বিউকুম বিমা-কুনতুম ফীহি তাখতালিফূন।




আল বায়ান: বল, ‘আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন রব অনুসন্ধান করব’ অথচ তিনি সব কিছুর রব’? আর প্রতিটি ব্যক্তি যা অর্জন করে, তা শুধু তারই উপর বর্তায় আর কোন ভারবহনকারী অন্যের ভার বহন করবে না। অতঃপর তোমাদের রবের নিকটই তোমাদের প্রত্যাবর্তনস্থল। সুতরাং তিনি তোমাদেরকে সেই সংবাদ দেবেন, যাতে তোমরা মতবিরোধ করতে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৬৪. বলুন, আমি কি আল্লাহকে ছেড়ে অন্যকে রব খুজব? অথচ তিনিই সবকিছুর রব। প্রত্যেকে নিজ নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী এবং কেউ অন্য কারো ভার গ্রহণ করবে না। তারপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন তোমাদের রব-এর দিকেই, অতঃপর যে বিষয়ে তোমরা মতভেদ করতে, তা তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন।




তাইসীরুল ক্বুরআন: আমি কি আল্লাহকে ছেড়ে অন্য প্রতিপালক তালাশ করব? (অথচ প্রকৃতপক্ষে) তিনিই সব কিছুর প্রতিপালক। প্রত্যেক ব্যক্তি যা অর্জন করে তার জন্য সে নিজেই দায়ী হবে। কোন ভারবহনকারীই অন্যের গুনাহের ভার বহন করবে না। অবশেষে তোমাদের প্রত্যাবর্তন স্থল তোমাদের প্রতিপালকের নিকটেই, তখন তিনি তোমাদেরকে জানিয়ে দেবেন যে সকল বিষয়ে তোমরা মতভেদে লিপ্ত ছিলে (সে সব বিষয়ে প্রকৃত সত্য কোনটি)।




আহসানুল বায়ান: (১৬৪) বল, ‘আমি কি আল্লাহকে ছেড়ে অন্য প্রতিপালককে অন্বেষণ করব? অথচ তিনিই সব কিছুর প্রতিপালক।[1] প্রত্যেকেই স্বীয় কৃতকর্মের জন্য দায়ী হবে এবং কেউ অন্য কারো ভার বহন করবে না।[2] অতঃপর তোমাদের প্রতিপালকের নিকটেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন হবে, তারপর যে বিষয়ে তোমরা মতান্তর ঘটিয়েছিলে তা তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন।’[3]



মুজিবুর রহমান: তুমি জিজ্ঞেস করঃ আমি কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য রবের সন্ধান করব? অথচ তিনিই হচ্ছেন প্রতিটি বস্তুর রাব্ব! প্রত্যেক ব্যক্তিই স্বীয় কৃতকর্মের জন্য দায়ী হবে, কেহ কারও কোন বোঝা বহন করবেনা, পরিশেষে তোমাদের রবের নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন করতে হবে, অতঃপর তিনি তোমরা যে বিষয়ে মতবিরোধ করেছিলে সে বিষয়ের মূল তত্ত্ব তোমাদেরকে অবহিত করবেন।



ফযলুর রহমান: বল, “আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন প্রভু চাইব? অথচ তিনিই সবকিছুর প্রভু। যে যা উপার্জন করে তার ফল তার ওপরই বর্তায়। একজন আরেকজনের ভার বহন করে না। পরিশেষে তোমাদের প্রভুর কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন (নির্ধারিত)। তোমরা যা নিয়ে মতভেদ করতে সে ব্যাপারে তখন তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন।”



মুহিউদ্দিন খান: আপনি বলুনঃ আমি কি আল্লাহ ব্যতীত অন্য প্রতিপালক খোঁজব, অথচ তিনিই সবকিছুর প্রতিপালক? যে ব্যক্তি কোন গোনাহ করে, তা তারই দায়িত্বে থাকে। কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না। অতঃপর তোমাদেরকে সবাইকে প্রতিপালকের কাছে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। অনন্তর তিনি তোমাদেরকে বলে দিবেন, যেসব বিষয়ে তোমরা বিরোধ করতে।



জহুরুল হক: বলো -- "কী! আমি কি আল্লাহ্ ছাড়া অন্য প্রভু খুজঁবো, অথচ তিনিই সব-কিছুর রব্ব?" আর প্রত্যেক সত্তা অর্জন করে না তার জন্যে ছাড়া, আর কোনো ভারবাহক অন্যের ভার বহন করবে না। তারপর তোমাদের প্রভুর কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন, তখন তিনি তোমাদের জানিয়ে দেবেন যে-বিষয়ে তোমরা মতভেদ ক’রে চলছিলে।



Sahih International: Say, "Is it other than Allah I should desire as a lord while He is the Lord of all things? And every soul earns not [blame] except against itself, and no bearer of burdens will bear the burden of another. Then to your Lord is your return, and He will inform you concerning that over which you used to differ."



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৬৪. বলুন, আমি কি আল্লাহকে ছেড়ে অন্যকে রব খুজব? অথচ তিনিই সবকিছুর রব। প্রত্যেকে নিজ নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী এবং কেউ অন্য কারো ভার গ্রহণ করবে না। তারপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন তোমাদের রব-এর দিকেই, অতঃপর যে বিষয়ে তোমরা মতভেদ করতে, তা তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৬৪) বল, ‘আমি কি আল্লাহকে ছেড়ে অন্য প্রতিপালককে অন্বেষণ করব? অথচ তিনিই সব কিছুর প্রতিপালক।[1] প্রত্যেকেই স্বীয় কৃতকর্মের জন্য দায়ী হবে এবং কেউ অন্য কারো ভার বহন করবে না।[2] অতঃপর তোমাদের প্রতিপালকের নিকটেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন হবে, তারপর যে বিষয়ে তোমরা মতান্তর ঘটিয়েছিলে তা তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন।’[3]


তাফসীর:

[1] এখানে রব্ব বা প্রতিপালক বলতে সেই উলূহিয়্যাতের কথা স্বীকার করা, যা মুশরিকরা অস্বীকার করত এবং যা তাঁর রুবূবিয়্যাত দাবী করে। মুশরিকরা তাঁর রুবূবিয়্যাতকে তো মানত, এতে কাউকে শরীকও করত না, কিন্তু তাঁর উলূহিয়্যাতে শরীক করত। (অর্থাৎ, তারা মহান আল্লাহকে শরীকবিহীন প্রতিপালক বলে মানত, কিন্তু শরীকবিহীন অদ্বিতীয় উপাস্য বলে মানত না।)

[2] অর্থাৎ, মহান আল্লাহ পরিপূর্ণরূপে ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। ভাল ও মন্দ যে যা-ই করবে, সে সেই অনুযায়ী প্রতিদান ও শাস্তি পাবে। সৎকাজের উত্তম প্রতিদান এবং অন্যায়ের জন্য শাস্তি দেবেন। আর একের বোঝা অন্যের উপর চাপাবেন না।

[3] কাজেই তোমরা যদি তাওহীদের এই দাওয়াতকে না মানো, যে দাওয়াতে সকল নবীরা শরীক ছিলেন, তবে তোমরা তোমাদের কাজ করে যাও, আর আমরাও আমাদের কাজ করে যাই, কিয়ামতের দিন আল্লাহর সমীপে আমাদের ও তোমাদের মাঝে ফায়সালা হবে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৬৪-১৬৫ নং আয়াতের তাফসীর:



আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নির্দেশ দেন যে, বল: আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কাকে রব ও মা‘বূদ হিসেবে অন্বেষণ করব? অথচ তিনি সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, মালিক ও পরিচালনাকারী। এখানে যদিও রব বা প্রতিপালকের কথা বলা হয়েছে উদ্দেশ্য হল তাওহীদে উলুহিয়্যাহ। কেননা এ কথা পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, মুশরিকরা সব কিছুর মালিক, স্রষ্টা ইত্যাদি একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকে মানত। তারা স্বীকার করত আল্লাহ তা‘আলা আছেন, তিনি রিযিকদাতা, জীবন-মৃত্যুর মালিক। কিন্তু সমস্যা ছিল তাওহীদে উলুহিয়্যাতে। কিছু চাইলে সরাসরি আল্লাহ তা‘আলার কাছে না চেয়ে মূর্তির কাছে চাইত। মানত মানলে মূর্তির নামে মানত। সুতরাং যিনি সব কিছুর মালিক, তিনিই সকল ইবাদত পাওয়ার হকদার। তাই আমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে মা‘বূদ হিসেবে গ্রহণ করতে পারি না।



(وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِّزْرَ أُخْرٰي)



‘কেউ অন্য কারো (পাপের) ভার বহন করবে না।’অর্থাৎ কিয়ামতের দিন কেউ কারো পাপের বোঝা বহন করবে না। এমনকি পিতা-মাতাও সন্তানের কোন পাপের বোঝা বহন করবে না। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَإِنْ تَدْعُ مُثْقَلَةٌ إِلٰي حِمْلِهَا لَا يُحْمَلْ مِنْهُ شَيْءٌ وَّلَوْ كَانَ ذَا قُرْبٰي)



“যদি কোন বোঝা ভারাক্রান্ত ব্যক্তি কাউকে তার বোঝা বহন করতে ডাকে, তবে তা থেকে কিছুই বহন করা হবে না, যদিও সে তার নিকটাত্মীয় হয়।”(সূরা ফাতির ৩৫:১৮)



বরং সে বোঝা নিজের ঘাড়েই বহন করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(مَنْ عَمِلَ صَالِحًا فَلِنَفْسِه۪ ج وَمَنْ أَسَا۬ءَ فَعَلَيْهَا ط وَمَا رَبُّكَ بِظَلَّامٍ لِّلْعَبِيْدِ )‏



“যে সৎ আমল করে সে নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে এবং কেউ মন্দ আমল করলে তার প্রতিফল সে-ই ভোগ করবে। তোমার প্রতিপালক তাঁর বান্দাদের প্রতি কোন জুলুম করেন না।”(সূরা হা-মীম আস-সিজদাহ ৪১:৪৬)



তবে যদি দুনিয়াতে কোন ব্যক্তি এমন পাপ কাজের রীতি-নীতি চালু করে, যার অনুসরণ করে মানুষ পাপ কাজে লিপ্ত হয় তাহলে তাদের পাপের সমপরিমাণ বোঝা সে ব্যক্তিকেও বহন করতে হবে, যে ব্যক্তি সে রীতি-নীতি চালু করেছে।



(وَإِذَا قِيْلَ لَهُمْ مَّاذَآ أَنْزَلَ رَبُّكُمْ لا قَالُوْآ أَسَاطِيْرُ الْأَوَّلِيْنَ)‏



যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘তোমাদের প্রতিপালক কী অবতীর্ণ করেছেন?’ তখন তারা বলে, ‘পূর্ববর্তীদের উপকথা!’ (সূরা নাহল ১৬:২৫)



হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:



مَنْ دَعَا إِلَي هُدًي كَانَ لَهُ مِنَ الأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنْ تَبِعَهُ لاَ يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْئًا وَمَنْ دَعَا إِلَي ضَلاَلَةٍ كَانَ عَلَيْهِ مِنَ الإِثْمِ مِثْلُ آثَامِ مَنْ تَبِعَهُ لاَ يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ آثَامِهِمْ شَيْئًا



যে ব্যক্তি মানুষকে সঠিক পথের দিকে আহ্বান করবে, সে ব্যক্তি তেমন প্রতিদান পাবে যেমন প্রতিদান পাবে সে পথের অনুসারীরা; তবে তাদের প্রতিদান থেকে কোন কম করা হবে না। আর যে ব্যক্তি মানুষকে পথভ্রষ্টতার দিকে আহ্বান করবে সে ব্যক্তি তেমন গুনাহগার হবে যেমন গুনাহগার হবে সে পথের অনুসারীরা। তবে তাদের গুনাহ থেকে কম করা হবে না। (সহীহ মুসলিম হা: ৬৯৮০)



কিয়ামতের দিন সবকিছু আল্লাহ তা‘আলা জানিয়ে দেবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(قُلْ لَّا تُسْأَلُوْنَ عَمَّآ أَجْرَمْنَا وَلَا نُسْأَلُ عَمَّا تَعْمَلُوْنَ ‏ قُلْ يَجْمَعُ بَيْنَنَا رَبُّنَا ثُمَّ يَفْتَحُ بَيْنَنَا بِالْحَقِّ ط وَهُوَ الْفَتَّاحُ الْعَلِيْمُ)



“বল, আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে একত্রিত করবেন, অতঃপর তিনি আমাদের মধ্যে বিচার করবেন সঠিকভাবে, আর তিনিই শ্রেষ্ঠ ফায়সালাকারী, সর্বজ্ঞ। বল: আমরা যে অপরাধ করেছি সেজন্য তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে না এবং তোমরা যা কর তার জন্য আমরাও জিজ্ঞাসিত হব না ” (সূরা সাবা ৩৪:২৫-২৬)



(خَلٰ۬ئِفَ الْأَرْضِ)



‘দুনিয়ার প্রতিনিধি’ খলিফা বা প্রতিনিধি এর দু’টি অর্থ: ১. শাসক, কর্তৃত্বশীল। যারা অন্যদের নেতৃত্ব দেয় ও পরিচালনা করে। ২. উত্তরাধিকারী, স্থলাভিষিক্ত। একজন চলে গেলে অন্যজনের আগমন করা। এখানে দ্বিতীয় অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। এক জাতি চলে যাবে আবার নতুন জাতি দুনিয়া আবাদ করবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(عَسٰي رَبُّكُمْ أَنْ يُّهْلِكَ عَدُوَّكُمْ وَيَسْتَخْلِفَكُمْ فِي الْأَرْضِ فَيَنْظُرَ كَيْفَ تَعْمَلُوْنَ)



‘শীঘ্রই তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের শত্র“ ধ্বংস করবেন এবং তিনি তোমাদেরকে জমিনে তাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন, অতঃপর তোমরা কী কর তা তিনি লক্ষ করবেন।’(সূরা আ‘রাফ ৭:১২৯)



(وَرَفَعَ بَعْضَكُمْ فَوْقَ بَعْضٍ)



‘তোমাদের কতককে কতকের ওপর মর্যাদায় উন্নীত করেছেন।’অর্থাৎ জীবিকা, চরিত্র, সৌন্দর্য, দৃশ্য, দৈহিক গঠন, রং ইত্যাদিতে একজনকে অপরের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُمْ مَّعِيْشَتَهُمْ فِي الْحَيٰوةِ الدُّنْيَا وَرَفَعْنَا بَعْضَهُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجٰتٍ لِّيَتَّخِذَ بَعْضُهُمْ بَعْضًا سُخْرِيًّا ط وَرَحْمَتُ رَبِّكَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُوْنَ)‏



“আমিই তাদের মধ্যে জীবিকা বন্টন করি তাদের পার্থিব জীবনে এবং একজনকে অপরের ওপর মর্যাদায় উন্নীত করি যাতে একে অপরের দ্বারা খেদমত লাভ করতে পারে এবং তারা যা জমা করে তা হতে তোমার প্রতিপালকের রহমত উৎকৃষ্টতর।”(সূরা যুখরুফ ৪৩:২)



(لِّيَبْلُوَكُمْ فِيْ مَآ اٰتٰكُمْ)



‘যা তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন সে সম্বন্ধে পরীক্ষার উদ্দেশ্যে’অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়াতে মানুষকে যা দিয়েছেন তার দ্বারা তাকে পরীক্ষা করেন। কে ধন-সম্পদ, সুযোগ সুবিধা ইত্যাদি পেয়ে আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় করে ও তাঁর দীনের ওপর অটল থাকে আর কে আল্লাহ তা‘আলার নাফরমানী করে ও দীন থেকে সরে যায়।



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: দুনিয়া হচ্ছে সুমিষ্ট, শ্যামল ও সবুজ। আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে অন্যান্যদের পরে দুনিয়া ভোগ করার সুযোগ করে দিয়েছেন এবং তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত বানিয়েছেন। এখন তিনি দেখতে চান তোমরা কিরূপ আমল কর। অতএব দুনিয়া থেকে বেঁচে চল এবং মেয়েদের থেকেও বেঁচে চল। কেননা বানী ইসরাঈলগণ সর্বপ্রথম মহিলাদের ফেতনায় পড়েছিলেন। (সহীহ মুসলিম হা: ৭১২৪, তিরমিযী হাঃ ২১৯১, ইবনু মাযাহ হা: ৪০০০)



(إِنَّ رَبَّكَ سَرِيْعُ الْعِقَابِ)



‘তোমার প্রতিপালক তো শাস্তি প্রদানে তৎপর’অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা যেমন শাস্তি দিতে তৎপর আবার তেমন তিনি দয়ালুও বটে।



নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি যে কত কঠিন তা যদি মু’মিনরা জানত তাহলে কেউ জান্নাতের আশা করত না আর কাফিররা যদি জানত যে, আল্লাহ তা‘আলার কাছে কী পরিমাণ রহমত রয়েছে তাহলে তারা কেউ জান্নাতের আশা ছাড়ত না। আল্লাহ তা‘আলা একশত রহমত সৃষ্টি করেছেন। তার এক ভাগ সৃষ্টির মাঝে দিয়েছেন যার দ্বারা পরস্পর পরস্পরকে দয়া করে থাকে। আর নিরানব্বই ভাগ নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। (সহীহ মুসলিম হা: ২৭৫৫, তিরমিযী হা: ৩৫৪২)



সুতরাং আশা ও ভয় উভয়ের সমন্বয়ে ঈমান আনয়ন ও ইবাদত করা। জান্নাতের আশায় আমল করতে হবে আর জাহান্নামের ভয়ে আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্যতামূলক কাজ-কর্ম বর্জন করতে হবে।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. যিনি সব কিছুর মালিক তিনিই একমাত্র সব ইবাদত পাবার যোগ্য।

২. মক্কার মুশরিকরাও আল্লাহ তা‘আলাকে সব কিছুর মালিক বলে জানত কিন্তু এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করত না।

৩. যে যা কর্ম করবে তার পাপের বোঝা তাকেই বহন করতে হবে। কোন নিকটাত্মীয়ও বহন করবে না।

৪. আল্লাহ তা‘আলা ধন-সম্পদ, উত্তম অবয়ব ইত্যাদি দিয়ে মানুষকে পরীক্ষা করেন।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেনঃ হে নবী (সঃ)! মুশরিকদেরকে নির্ভেজাল ইবাদত ও আল্লাহর উপর ভরসাকরণ সম্পর্কে তুমি বলে দাও-আমি কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যকে স্বীয় প্রতিপালক বানিয়ে নিবো ? অথচ তিনিই তো প্রত্যেক বস্তুর প্রতিপালকু। সুতরাং আমি তাকেই আমার প্রতিপালক বানিয়ে নিবো। আমার এই প্রতিপালক একাকীই আমাকে। লালন-পালন করে থাকেন, আমার রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকেন এবং আমার প্রতিটি বিষয়ে তিনি আমার তদবীরকারী। তাই আমি তিনি ছাড়া আর কারও সামনে মাথা নত করবো না। কেননা, সমস্ত সৃষ্টবস্তু ও সৃষ্টজীব তারই। নির্দেশ প্রদানের হক একমাত্র তাঁরই রয়েছে। মোটকথা, এ আয়াতে ইবাদতে আন্তরিকতা ও আল্লাহর উপর ভরসা করার নির্দেশ রয়েছে। যেমন এর পূর্ববর্তী আয়াতে ইবাদতে আন্তরিকতা শিক্ষা দেয়া হয়েছিল। আর কুরআন কারীমে এই বিষয়ের পারস্পরিক মিলন অধিক পরিলক্ষিত হয়। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ তোমরা বল- “আমরা আপনারই ইবাদত করি এবং আপনারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি।” অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “তারই ইবাদত কর এবং তাঁরই উপর ভরসা কর।” অন্যত্র বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি বল-তিনি পরম দাতা ও দয়ালু, আমরা তাঁরই উপর ঈমান এনেছি এবং তাঁরই উপর ভরসা করেছি।” আর এক জায়গায় বলেনঃ “তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের প্রভু, তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই, সুতরাং তাকেই ভরসার কেন্দ্রস্থল বানিয়ে নাও।” এর সাথে সাদৃশ্য যুক্ত আয়াত আরও রয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “কেউ কোন দুষ্কর্ম করলে ওর পাপের ফল তাকেই ভোগ করতে হবে, কারও পাপের বোঝা অপর কেউ বহন করবে না।” এই আয়াতগুলোর মাধ্যমে এই সংবাদ দেয়া হচ্ছে যে, কিয়ামতের দিন যে শাস্তি দেয়া হবে তা নিপুণতা ও ন্যায়ের ভিত্তিতেই হবে। আমলের প্রতিফল আমলকারীই পাবে। ভাল লোককে ভাল প্রতিদান এবং মন্দ লোককে মন্দ প্রতিদান দেয়া হবে। একজনের পাপের কারণে অপরজনকে শাস্তি দেয়া হবে না। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “পাপের বোঝা বহনকারী কেউ যদি তার সেই বোঝা বহনের জন্যে কাউকে আহ্বান করে তবে সে তার ঐ বোঝা বহন করবে না। যদিও সে তার নিকটতম আত্মীয়ও হয়।” (আরবী) (২০:১১২) -এর তাফসীরে আলেমগণ বলেন যে, কোন লোককে অপর কোন লোকের পাপের বোঝা বহন করতে বলে তার প্রতি অত্যাচার করা হবে না

এবং তার পুণ্য কিছু কমিয়ে দিয়েও তার উপর যুলুম করা হবে না । আল্লাহ পাক আরও বলেনঃ “প্রত্যেককেই তার কৃতকর্মের জন্যে আবদ্ধ রাখা হবে, শাস্তি প্রাপ্তির পূর্বে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে না, তবে এটা ডানদিক ওয়ালাদের জন্যে প্রযোজ্য নয়। কেননা, তাদের নেক আমলের বরকত তাদের সন্তান-সন্ততি ও আত্মীয়-স্বজন পর্যন্ত পৌছে যাবে। যেমন আল্লাহ তাআলা সূরায়ে তুরে বলেছেনঃ “যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের সন্তান-সন্ততিও ঈমান আনয়নে তাদের সঙ্গী হয়েছে, আমি তাদের সন্তান-সন্ততিদেরকেও (মর্যাদায়) তাদের সাথে শামিল করে দিবো, আর (এই জন্যে) আমি তাদের আমলসমূহ হতে কিছুমাত্রও কম করবো না।” অর্থাৎ পূর্ববর্তীরাও পরবর্তীদের সৎ আমলের পুণ্য লাভ করবে কিন্তু তাই বলে পরবর্তীদের প্রতিদান হতে একটুও কম করা হবে না এবং জান্নাতে উচ্চ আসনে সৎ সন্তানদের নিকটে তাদের পূর্ব পুরুষদেরকেও পৌছিয়ে দেয়া হবে। পুত্রের পুণ্য পিতাও লাভ করে থাকে, যদিও সে সৎ আমলে পুত্রের সাথে শরীক না থাকে। এ কারণে যে পুত্রের প্রতিদান কিছু কেটে নেয়া হবে তা নয়, বরং দু’জনকেই সমান সমান বিনিময় প্রদান করা হবে। এমন কি আল্লাহ তা'আলা পুত্রদেরকেও পিতাদের আমলের বরকতের কারণে তাদের মনযিল পর্যন্ত। পৌছিয়ে থাকেন। এটা তার বিশেষ অনুগ্রহ। আল্লাহ তাআলা বলেন যে, প্রত্যেকে তার কৃতকর্মের জন্যে আবদ্ধ থাকবে। অর্থাৎ তাকে তার কৃতকর্মের কারণে পাকড়াও করা হবে। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ তোমাদেরকে তোমাদের প্রভুর কাছেই ফিরে যেতে হবে। অর্থাৎ তোমরা যা করতে চাও স্বীয় জায়গায়। করতে থাক, আমিও আমার জায়গায় আমার কাজ করবো। শেষ পর্যন্ত একদিন তোমাদেরকে আমার কাছে আসতেই হবে। সেই দিন আমি মুমিন ও মুশরিক সবকেই তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অবহিত করবো এবং তারা দুনিয়ায় অবস্থানরত অবস্থায় প্রকাল সম্পর্কে যে মতানৈক্য রাখতো, সেই দিন সবকিছুই প্রতীয়মান হয়ে পড়বে।

মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি মুশরিক ও কাফিরদেরকে বলে দাও-আমাদের কার্য সম্পর্কে তোমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না এবং তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে আমরাও জিজ্ঞাসিত হবো না। তুমি আরও বলআমাদের প্রভু আমাদের সকলকেই একত্রিত করবেন, অতঃপর তিনি আমাদের মধ্যে হক ও ন্যায়ের সাথে ফায়সালা করবেন, তিনি হচ্ছেন সবচেয়ে উত্তম ফায়সালাকারী, সবকিছু অবহিত।”





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।