সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 163)
হরকত ছাড়া:
لا شريك له وبذلك أمرت وأنا أول المسلمين ﴿١٦٣﴾
হরকত সহ:
لَا شَرِیْکَ لَهٗ ۚ وَ بِذٰلِکَ اُمِرْتُ وَ اَنَا اَوَّلُ الْمُسْلِمِیْنَ ﴿۱۶۳﴾
উচ্চারণ: লা-শারীকা লাহু ওয়া বিযা-লিকা উমিরতুওয়া আনা আওওয়ালুল মুসলিমীন।
আল বায়ান: ‘তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমাকে এরই নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। আর আমি মুসলমানদের মধ্যে প্রথম’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৬৩. তার কোন শরীক নেই। আর আমাকে এরই নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে(১) এবং আমি মুসলিমদের মধ্যে প্রথম।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তাঁর কোন শরীক নেই, আমাকে এরই নির্দেশ দেয়া হয়েছে আর আমিই সর্বপ্রথম আত্মসমর্পণকারী।
আহসানুল বায়ান: (১৬৩) তাঁর কোন অংশী নেই এবং আমি এ সম্বন্ধেই আদিষ্ট হয়েছি। আর আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)দের মধ্যে আমিই প্রথম।’ [1]
মুজিবুর রহমান: তাঁর কোন শরীক নেই, আমি এর জন্য আদিষ্ট হয়েছি, আর মুসলিমদের মধ্যে আমিই হলাম প্রথম।
ফযলুর রহমান: “তাঁর কোন শরীক নাই। আমাকে এই আদেশই দেওয়া হয়েছে এবং আমিই প্রথম মুসলিম (অনুগত বান্দা)”
মুহিউদ্দিন খান: তাঁর কোন অংশীদার নেই। আমি তাই আদিষ্ট হয়েছি এবং আমি প্রথম আনুগত্যশীল।
জহুরুল হক: কোনো শরিক নেই তাঁর, আর এভাবেই আমি আদিষ্ট হয়েছি, আর আমি থাকবো আত্মসমর্পণকারীদের একেবারে পুরোভাগে।
Sahih International: No partner has He. And this I have been commanded, and I am the first [among you] of the Muslims."
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৬৩. তার কোন শরীক নেই। আর আমাকে এরই নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে(১) এবং আমি মুসলিমদের মধ্যে প্রথম।
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ আমাকে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এরূপ ঘোষণা করার এবং আন্তরিকতা অবলম্বন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর আমি সর্বপ্রথম অনুগত মুসলিম। উদ্দেশ্য এই যে, এ উম্মতের মধ্যে সর্বপ্রথম মুসলিম আমি। [আত-তাফসীরুস সহীহ] কেননা, প্রত্যেক উম্মতের সর্বপ্রথম মুসলিম স্বয়ং ঐ নবীই হন, যার প্রতি ওহী নাযিল করা হয়। আর প্রত্যেক নবীর দ্বীনই ছিল ইসলাম। [ইবন কাসীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৬৩) তাঁর কোন অংশী নেই এবং আমি এ সম্বন্ধেই আদিষ্ট হয়েছি। আর আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)দের মধ্যে আমিই প্রথম।’ [1]
তাফসীর:
[1] তাওহীদে উলূহিয়্যাত তথা আল্লাহর একত্বতার দাওয়াত সকল নবীরা দিয়েছেন। এখানেও শেষ নবীর পবিত্র জবান দ্বারা ঘোষণা করানো হচ্ছে যে, ‘‘আমাকে এরই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আমি আত্মসমর্পণকারী মুসলিমদের প্রথম।’’ অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘তোমার পূর্বে যে রসূলই আমি প্রেরণ করেছি, তাঁকে এই আদেশই করেছি যে, আমি ব্যতীত কোন সত্য উপাস্য নেই। অতএব, তোমরা আমারই ইবাদত কর।’’ (সূরা আম্বিয়াঃ ২৫) নূহ (আঃ)ও এই ঘোষণা দিয়েছেন, {وَأُمِرْتُ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ} অর্থাৎ, আমাকে হুকুম করা হয়েছে যে, আমি যেন আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)-দের অন্তর্ভুক্ত থাকি. (সূরা ইউনুস ৭২) ইবরাহীম (আঃ) সম্পর্কে এসেছে যে, যখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে বললেন, أَسْلِمْ (আত্মসমর্পণ কর।), তখন তিনি বললেন, {أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِيْنَ} বিশ্ব-জগতের প্রতিপালকের কাছে আমি আত্মসমর্পণ করলাম।’’ (সূরা বাক্বারাহ ১৩১) ইবরাহীম এবং ইয়াকূব عليهما السلام তাঁদের সন্তানদের অসিয়ত করেছিলেন, {فَلاَ تَمُوْتُنَّ إِلاَّ وَأَنْتُمْ مُّسْلِمُوْنَ} অর্থাৎ, আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) না হয়ে তোমরা অবশ্যই মৃত্যুবরণ করো না। (সূরা বাক্বারাহ ১৩২) ইউসুফ (আঃ) দু’আ করেছিলেন, {تَوَفَّنِيْ مُسْلِمًا} অর্থাৎ, তুমি আমাকে আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) হিসাবে মৃত্যু দান করো। (সূরা ইউসুফ ১০১) মূসা (আঃ) তাঁর জাতিকে বলেছিলেন, {فَعَلَيْهِ تَوَكَّلُوْا إِنْ كُنْتُمْ مُّسْلِمِيْنَ} অর্থাৎ, তাঁরই উপর ভরসা কর; যদি তোমরা মুসলিম হও। (সূরা ইউনুস ৮৪) ঈসা (আঃ)-এর সহচররা বলেছিলেন, {وَاشْهَدْ بِأَنَّنَا مُسْلِمُوْنَ} অর্থাৎ, তুমি সাক্ষী থাক যে, আমরা আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)। (সূরা মাইদাহ ১১১) এইভাবে সকল নবী ও তাঁদের নিষ্ঠাবান অনুসারীরা এই ইসলামকেই গ্রহণ করেছিল, যাতে তাওহীদে উলূহিয়্যাতই ছিল মৌলিক বিষয়, যদিও কোন কোন বিধি-বিধান একে অপর থেকে ভিন্ন ছিল।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৬১-১৬৩ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সঠিক পথের হিদায়াত দিয়ে যে অনুগ্রহ করেছেন তা প্রকাশ করতে নির্দেশ দিচ্ছেন, যে দীন বা সঠিক পথের একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন ইবরাহীম (আঃ)। কারণ মক্কার মুশরিকরা দাবি করত তারা সঠিক পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং তারা ইবরাহীমের মিল্লাতের ওপর রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَجَاهِدُوْا فِي اللّٰهِ حَقَّ جِهَادِهِ ط هُوَ اجْتَبٰكُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّيْنِ مِنْ حَرَجٍ ط مِلَّةَ أَبِيْكُمْ إِبْرٰهِيْمَ)
“এবং জিহাদ কর আল্লাহর পথে যেভাবে জিহাদ করা উচিত। তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন। তিনি দীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোন কঠোরতা আরোপ করেননি। এটাই তোমাদের পিতা ইব্রাহীমের ধর্ম।”(সূরা হজ্জ ২২:৭৮) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(اِنَّ اِبْرٰھِیْمَ کَانَ اُمَّةً قَانِتًا لِّلّٰهِ حَنِیْفًاﺚ وَلَمْ یَکُ مِنَ الْمُشْرِکِیْنَﺫ شَاکِرًا لِّاَنْعُمِھ۪ﺚ اِجْتَبٰٿھُ وَھَدٰٿھُ اِلٰی صِرَاطٍ مُّسْتَقِیْمٍ وَاٰتَیْنٰھُ فِی الدُّنْیَا حَسَنَةًﺚ وَاِنَّھ۫ فِی الْاٰخِرَةِ لَمِنَ الصّٰلِحِیْنَﺚ ثُمَّ اَوْحَیْنَآ اِلَیْکَ اَنِ اتَّبِعْ مِلَّةَ اِبْرٰھِیْمَ حَنِیْفًاﺚ وَمَا کَانَ مِنَ الْمُشْرِکِیْنَ)
“নিশ্চয়ই ইব্রাহীম ছিল এক ‘উম্মাত’, আল্লাহর অনুগত, একনিষ্ঠ এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না; সে ছিল আল্লাহর অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞ; আল্লাহ তাকে মনোনীত করেছিলেন এবং তাকে পরিচালিত করেছিলেন সরল পথে। আমি তাকে দুনিয়ায় দিয়েছিলাম মঙ্গল এবং নিশ্চয়ই আখিরাতেও সে সৎ কর্মপরায়ণদের অন্যতম। অতঃপর আমি তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করলাম, ‘তুমি একনিষ্ঠ ইব্রাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ কর; এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।”(সূরা নাহল ১২:১২০-২৩)
قِيَمًا শব্দটি قَيِّمٌ ধাতুর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ সুদৃঢ়, অর্থাৎ এ দীন সুদৃঢ় মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত যা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে আগত, কারও ব্যক্তিগত ধ্যান-ধারণা নয় এবং যাতে সন্দেহ হতে পারে এমন কোন নতুন ধর্মও নয় বরং এটিই ছিল পূর্ববর্তী নাবীদের ধর্ম। এখানে বিশেষভাবে ইবরাহীম (আঃ)-এর নাম উল্লেখ করার কারণ হল- ইয়াহুদ ও খ্রিস্টানসহ সকল আসমানী ধর্মের অনুসারীরা দাবী করে তারা ইবরাহীম (আঃ)-এর অনুসারী, ইবরাহীম (আঃ)-এর মিল্লাতের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ তা‘আলা তাদের দাবীকে খণ্ডন করে জানিয়ে দিলেন যে, ইবরাহীম (আঃ) ইয়াহূদী ও খ্রিস্টান ছিলেন না এবং মুশরিকও ছিলেন না। তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ তাওহীদপন্থী মুসলিম।
(قُلْ إِنَّ صَلَاتِيْ وَنُسُكِيْ... )
‘বল: ‘আমার সালাত, আমার কুরবানী...’ এ আয়াতে তাওহীদে উলুহিয়্যার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। আমার জীবন, মরণ, সালাত, কুরবানী সবকিছু একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্য। এ তাওহীদের দিকে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-সহ সকল নাবীগণ দাওয়াত দিয়েছেন। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আল্লাহ তা‘আলা এ ঘোষণাও দিতে বলছেন যে, আমি আত্মসমর্পণ কারীদের মধ্যে প্রথম।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمَآ أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُوْلٍ إِلَّا نُوْحِيْٓ إِلَيْهِ أَنَّه۫ لَآ إِلٰهَ إِلَّآ أَنَا فَاعْبُدُوْنِ )
“আমি তোমার পূর্বে যখন কোন রাসূল প্রেরণ করেছি তার প্রতি এ ওয়াহী করেছি, ‘আমি ব্যতীত অন্য কোন সত্যিকার মা‘বূদ নেই; সুতরাং আমারই ‘ইবাদত কর।’(সূরা আম্বিয়াহ ২১:২৫)
নূহ (আঃ)ও এ ঘোষণা দিয়েছেন:
(فَإِنْ تَوَلَّيْتُمْ فَمَا سَأَلْتُكُمْ مِّنْ أَجْرٍ ط إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَي اللّٰهِ لا وَأُمِرْتُ أَنْ أَكُوْنَ مِنَ الْمُسْلِمِيْنَ)
‘আর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তোমাদের নিকট আমি তো কোন পারিশ্রমিক চাই না, আমার পারিশ্রমিক আছে একমাত্র আল্লাহর নিকট, আমি আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হতে আদিষ্ট হয়েছি।’(সূরা ইউনুস ১০:৭২)
ইবরাহীম (আঃ)-কে যখন আল্লাহ তা‘আলা বললেন: اَسْلِمْ আত্মসমর্পণ কর। তখন তিনি বলেছিলেন-
(أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعٰلَمِيْنَ)
“বিশ্বজগতসমূহের প্রতিপালকের কাছে আমি আত্মসমর্পণ করলাম।”(সূরা বাক্বারাহ ২:১৩১) এরূপ সকল নাবীদের কথা ও দাওয়াত একটাই ছিল। তাই আমাদের সকল কাজকর্ম একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকে খুশি করার জন্য করা উচিত, তাঁর কাছেই আত্মসমর্পণ করা এবং তাঁর সাথে সকল প্রকার অংশী স্থাপন করা থেকে সাবধান থাকা উচিত।
(وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِيْنَ)
“আমিই প্রথম মুসলিম” অর্থাৎ এ উম্মাতের মধ্যে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-ই প্রথম আল্লাহ তা‘আলার কাছে আত্মসমর্পণকারী। সুতরাং একজন মুসলিম তাঁর জীবন থেকে শুরু করে মরণ পর্যন্ত সকল ইবাদত ও কর্মকাণ্ড একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্য উৎসর্গ করবে।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. জীবন-মরণসহ যাবতীয় ইবাদত একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্য।
২. সকল নাবীদের দাওয়াতী মিশন ছিল তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করা।
৩. ইবারাহীম (আঃ) একনিষ্ঠ মুসলিম ছিলেন। তিনি ইয়াহূদী, খ্রিস্টান অথবা মুশরিক ছিলেন না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৬১-১৬৩ নং আয়াতের তাফসীর:
এখানে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন, তুমি সংবাদ দিয়ে দাও-আল্লাহ তাঁর নবী (সঃ)-এর উপর কিরূপ ইন'আম বর্ষণ করেছেন যে, তাকে সরল সোজা পথে পরিচালিত করেছেন, যার মধ্যে কোন বক্রতা নেই। ওটা হচ্ছে একটা সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্ম এবং ওটাই হচ্ছে মিল্লাতে ইবরাহীম (আঃ)। তিনি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করতেন এবং তিনি কখনও শিক করেননি। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “নির্বোধেরা ছাড়া আর কেউই মিল্লাতে ইবরাহীম (আঃ) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় না।” অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা আল্লাহর পথে এমন চেষ্টা তদবীর কর যেমন চেষ্টা তদবীরের হক রয়েছে। তিনি তোমাদেরকে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং দ্বীনের ব্যাপারে তিনি তোমাদের উপর কোন সংকীর্ণতা রাখেননি, এটাই হচ্ছে তোমাদের পিতা ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্ম।” আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “ইবরাহীম বড়ই আবেদ ছিল, সে ছিল নিষ্কলুষ অন্তরের অধিকারী এবং শিরুক থেকে বহু দূরে অবস্থানকারী। সে ছিল আল্লাহর নিয়ামতের বড়ই কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী। আমি তাঁকে সরল-সোজা পথে পরিচালিত করেছিলাম। দুনিয়াতেও সে বহু পুণ্য লাভ করেছিল এবং আখিরাতেও সে আল্লাহর সৎ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হবে। এখন আমি তোমার কাছে এই অহী করছি যে, তুমি মিল্লাতে ইবরাহীম (আঃ) এর অনুসরণ করো।” নবী (সঃ)-কে মিল্লাতে ইবরাহীম (আঃ)-এর অনুসরণ করতে বলা হলো বলে যে তার উপর হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হলো তা নয়। কেননা, নবী (সঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মাযহাবের অনুসরণের মাধ্যমে তার মাযহাবকে আরও সুদৃঢ় করেছেন এবং তার মাধ্যমেই হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দ্বীন পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়েছে। অন্য কোন নবী তাঁর দ্বীনকে পূর্ণতা দানে সক্ষম হননি। আমাদের নবী (সঃ) তো খাতেমুল আম্বিয়া। তিনি সাধারণভাবে আদম সন্তানের নেতা এবং মাকামে মাহমূদের উপর তিনি সমাসীন থাকবেন। কিয়ামতের দিন সমস্ত মাখলুক তাঁরই দিকে ফিরে আসবে, এমন কি স্বয়ং ইবরাহীম খলীল (আঃ)-ও। ইবনে ইবী তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, যখন সকাল হতো তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “আমরা মিল্লাতে ইসলাম ও কালেমায়ে ইখলাসের উপর এবং আমাদের নবী মুহাম্মাদ (সঃ)-এর দ্বীনের উপর ও আমাদের পিতা একনিষ্ঠ ইবরাহীমের মিল্লাতের উপর সকাল করলাম যিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।” ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর কাছে কোন দ্বীন সব চেয়ে প্রিয়?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “ইবরাহীম হানীফ (আঃ)-এর ধর্ম।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) মুসনাদে আহমাদে তাখরীজ করেছেন)
হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি স্বীয় থুনী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাঁধের উপর রাখতাম এবং তাঁর পৃষ্ঠদেশের পিছনে থেকে হাবশীদের নাচ দেখতাম। অতঃপর যখন ক্লান্ত হয়ে পড়তাম তখন সরে আসতাম। ঐ দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “ইয়াহূদীদের এটা জেনে নেয়া উচিত যে, আমাদের ধর্ম সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম এবং আমাকে এমন দ্বীন দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছে যা শির্ক থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত।”
ইরশাদ হচ্ছে-হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও, আমার নামায, আমার সকল ইবাদত, আমার জীবন এবং আমার মরণ সবই বিশ্বপ্রভু আল্লাহর জন্যে। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক কলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি তোমার প্রভুর জন্যেই নামায পড় এবং তারই জন্যে কুরবানী কর।”
মুশরিকরা তো মূর্তির পূজা করতো এবং মূর্তির নামেই কুরবানী করতো। আল্লাহ তাদের বিরুদ্ধাচরণ করার নির্দেশ দিচ্ছেন এবং ওদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কলুষমুক্ত অন্তঃকরণ নিয়ে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে আল্লাহর উপাসনায় নিমগ্ন থাকতে মুসলমানদেরকে হুকুম করছেন। যেমন তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলতে বললেনঃ “নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার ইবাদত-বন্দেগী সব কিছুই বিশ্ব প্রভু আল্লাহর জন্যে।` (আরবী) হজ্ব ও উমরা পালনের সময় কুরবানী করাকে বলা হয়। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঈদুল আযহার দিন দু'টি দুম্বা যবাই করেন এবং যবাই করার সময় বলেন : (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি আমার মুখমণ্ডল সেই সত্তার দিকে একনিষ্ঠভাবে ফিরাচ্ছি যিনি আকাশসমূহ ও ভূ-মণ্ডল সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ বিশ্বপ্রভু আল্লাহরই জন্যে। তার কোন অংশীদার নেই, আমি এর জন্যেই আদিষ্ট হয়েছি এবং আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে আমিই হলাম প্রথম।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)
(আরবী) দ্বারা ঐ উম্মতের প্রথম মুসলমান বুঝানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পূর্ববর্তী সকল নবী ইসলামেরই দাওয়াত দিতেন। প্রকৃত ইসলাম হচ্ছে আল্লাহকে মা'বুদ মেনে নেয়া এবং তাঁকে এক ও শরীক বিহীন বলে বিশ্বাস করা। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! আমি তোমার পূর্বে যতজন নবী পাঠিয়েছিলাম তাদের সকলের কাছেই এই অহী করেছিলাম যে, আল্লাহ এক, তার কোন অংশীদার নেই, সুতরাং তোমরা তাঁরই ইবাদত কর।” আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নূহ তার কওমকে বললো-তোমরা যদি আমা থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও তবে বলতো- আমি কি তাবলীগ করার বিনিময়ে তোমাদের কাছে। কোন পারিশ্রমিক চাচ্ছি? আমাকে পারিশ্রমিক তো আল্লাহই প্রদান করবেন। আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, আমি যেন সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করি।” আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যে মিল্লাতে ইবরাহীম (আঃ) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় সে বড়ই নির্বোধ। আমি তাকে দুনিয়াতেও মনোনীত করেছি এবং পরকালেও সে আল্লাহর ইবাদতকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” যখন আল্লাহ ইবরাহীম (আঃ)-কে বললেনঃ ইসলাম গ্রহণ কর, তখন সে তৎক্ষণাৎ বলে উঠলো-আমি সারা জাহানের প্রভুর কাছে আত্মসমর্পণ করলাম। ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সন্তানদেরকে অসিয়ত করেছিলো এবং ইয়াকূব (আঃ)ঃ “হে আমার সন্তানগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্যে এই দ্বীনকে নির্দিষ্ট করেছেন, সুতরাং তোমরা কখনও মুসলমান না হয়ে মরো না।” হযরত ইউসুফ (আঃ) বলেছিলেনঃ “হে আমার প্রভু! আপনি আমাকে রাজত্বের বিরাট অংশ দান করেছেন এবং আমাকে স্বপ্নফল বর্ণনা শিক্ষা দিয়েছেন, হে আকাশসমূহের ও ভূ-মণ্ডলের সৃষ্টিকর্তা! আপনি আমার কার্য নির্বাহক দুনিয়াতেও আখিরাতেও, আমাকে পূর্ণ আনুগত্যের অবস্থায় দুনিয়া হতে উঠিয়ে নিন এবং আমাকে বিশিষ্ট নেক বান্দাদের মধ্যে পরিগণিত করুন।” হযরত মূসা (আঃ) বলেছিলেনঃ “হে আমার কওম! যদি তোমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনে থাক তবে তাঁরই উপর ভরসা কর যদি তোমরা মুসলমান হও।” তখন তাঁর উম্মত বলেছিলঃ “আমরা আমাদের প্রভুর উপরই ভরসা করছি। হে আমাদের প্রভু! আপনি আমাদেরকে যালিমদের লক্ষ্যস্থল বানাবেন না এবং স্বীয় রহমতে আমাদেরকে কফিরদের আধিপত্য হতে মুক্তি দান করুন!”
আল্লাহ পাক বলেনঃ “নিশ্চয়ই আমি তাওরাত অবতীর্ণ করেছিলাম যার মধ্যে হিদায়াত ও নূর রয়েছে, যার মাধ্যমে আত্মসমর্পণকারী নবীরা ইয়াহুদী, আল্লাহওয়ালা ও আলেমদের মধ্যে ফায়সালা করতো।” অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন আমি হাওয়ারীদের কাছে অহী করেছিলাম-তোমরা আমার উপর ও আমার রাসূলের উপর ঈমান আনয়ন কর, তখন তারা বললো- আমরা ঈমান আনলাম, আপনি সাক্ষী থাকুন যে, আমরা মুসলমান।” এসবের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিলেন যে, তিনি সমস্ত নবীকে ইসলাম দিয়ে পঠিয়েছিলেন। কিন্তু নবীদের উম্মতেরা নিজ নিজ শরীয়তের প্রতি লক্ষ্য রেখে পৃথক পৃথক ধর্মের উপর ছিল। কোন কোন নবী পূর্ববর্তী নবীর শাখা ধর্মকে রহিত করে দিয়ে নিজস্ব ধর্ম চালু করেন। শেষ পর্যন্ত শরীয়তে মুহাম্মাদীর মাধ্যমে অন্যান্য সমস্ত দ্বীন মানসূখ বা রহিত হয়ে যায় এবং দ্বীনে মুহাম্মাদী কখনও রহিত হবে না, বরং চির বিদ্যমান থাকবে। কিয়ামত পর্যন্ত এর পতাকা উঁচু হয়েই থাকবে। এ জন্যেই নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা নবীরা পরস্পর বৈমাত্রেয় সন্তান। অর্থাৎ বৈমাত্রেয় সন্তানদের পিতা একজনই হয় তদ্রুপ আমাদেরও সবারই দ্বীন একই। আমরা। সবাই সেই আল্লাহকে মেনে থাকি যিনি এক ও অংশীবিহীন। আমরা তাঁরই ইবাদত করে থাকি। যদিও আমাদের শরীয়ত বিভিন্ন; কিন্তু এই শরীয়তগুলো মায়ের মত। যেমন বৈপিত্রেয় ভাই বৈমাত্রেয় ভাই এর বিপরীত হয়ে থাকে। অর্থাৎ মা এক এবং পিতা পৃথক পৃথক। আর প্রকৃত ভাই একই মা ও একই পিতার সন্তান হয়ে থাকে। তাহলে উম্মতের দৃষ্টান্ত পরম্পর এক মায়েরই সন্তানের মত।” হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) যখন নামায শুরু করতেন তখন তাকবীর বলতেন। তারপর (আরবী) বলতেন। এরপর নিম্নের দু'আটি বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি বাদশাহ। আপনি ছাড়া অন্য কেউ উপাস্য নেই। আপনি আমার প্রভু এবং আমি আপনার দাস। আমি আমার নিজের উপর অত্যাচার করেছি এবং আমি আমার পাপের কথা স্বীকার করছি। সুতরাং আপনি আমার সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দিন। আপনি ছাড়া আর কেউ পাপরাশি ক্ষমা করতে পারে না। আমাকে উত্তম চরিত্রের পথ বাতলিয়ে দিন। আপনি ছাড়া অন্য কেউ আমাকে উত্তম চরিত্রের পথ বাতলিয়ে দিতে পারে না। আমা থেকে দুশ্চরিত্রতা দূর করে দিন। আপনি ছাড়া অন্য কেউ আমা থেকে দুশ্চরিত্রতা দূর করতে পারে না। আপনি কল্যাণময় ও উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। আমি আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং (পাপকার্য থেকে) আপনার কাছে তাওবা করছি।” তারপর তিনি রুকূ ও সিজদায় এবং তাশাহহুদে যা বলেছিলেন সেগুলো সম্বলিত সম্পূর্ন হাদীসটি বর্ণনা করা হয়। (এ হাদীসটি ইমাম মুহাম্মাদ (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।