সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 165)
হরকত ছাড়া:
وهو الذي جعلكم خلائف الأرض ورفع بعضكم فوق بعض درجات ليبلوكم في ما آتاكم إن ربك سريع العقاب وإنه لغفور رحيم ﴿١٦٥﴾
হরকত সহ:
وَ هُوَ الَّذِیْ جَعَلَکُمْ خَلٰٓئِفَ الْاَرْضِ وَ رَفَعَ بَعْضَکُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجٰتٍ لِّیَبْلُوَکُمْ فِیْ مَاۤ اٰتٰکُمْ ؕ اِنَّ رَبَّکَ سَرِیْعُ الْعِقَابِ ۫ۖ وَ اِنَّهٗ لَغَفُوْرٌ رَّحِیْمٌ ﴿۱۶۵﴾
উচ্চারণ: ওয়া হুওয়াল্লাযী জা‘আলাকুম খালাইফাল আরদিওয়ারাফা‘আ বা‘দাকুম ফাওকা বা‘দিন দারাজা-তিল লিইয়াবলুওয়াকুম ফী মাআ-তাকুম ইন্না রাব্বাকা ছারী‘উল ‘ইকা-বি ওয়া ইন্নাহূলাগাফূরুর রাহীম।
আল বায়ান: আর তিনি সে সত্তা, যিনি তোমাদেরকে যমীনের খলীফা বানিয়েছেন এবং তোমাদের কতককে কতকের উপর মর্যাদা দিয়েছেন, যাতে তিনি তোমাদেরকে যা প্রদান করেছেন, তাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন। নিশ্চয় তোমার রব দ্রুত শাস্তিদানকারী এবং নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৬৫. তিনিই তোমাদেরকে যমীনের খলীফা বানিয়েছেন(১) এবং যা তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন সে সম্বন্ধে পরীক্ষার উদ্দেশ্যে তোমাদের কিছু সংখ্যককে কিছু সংখ্যকের উপর মর্যাদায় উন্নীত করেছেন। নিশ্চয় আপনার রব দ্রুত শাস্তি প্রদানকারী এবং নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, দয়াময়।(২)
তাইসীরুল ক্বুরআন: তিনিই তোমাদেরকে পৃথিবীতে পরস্পরের স্থলাভিষিক্ত বানিয়েছেন, মর্যাদায় তোমাদের কতককে কতকের উপরে স্থান দিয়েছেন, আমি তোমাদেরকে যা দিয়েছি ওগুলোর মাধ্যমে তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য, তোমার রবব তো শাস্তি দানে দ্রুত (ব্যবস্থা গ্রহণ করেন) আর তিনি অবশ্যই বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
আহসানুল বায়ান: (১৬৫) তিনিই তোমাদেরকে পৃথিবীর প্রতিনিধি করেছেন[1] এবং যা তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন, সে সম্বন্ধে পরীক্ষার উদ্দেশ্য তোমাদের কিছুকে অপরের উপর মর্যাদায় উন্নত করেছেন।[2] নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক সত্বর শাস্তিদাতা এবং তিনি চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়াময়।
মুজিবুর রহমান: আর তিনি এমন, যিনি তোমাদেরকে দুনিয়ার প্রতিনিধি করেছেন এবং তোমাদের কতককে কতকের উপর মর্যাদায় উন্নীত করেছেন, উদ্দেশ্য হল তোমাদেরকে তিনি যা কিছু দিয়েছেন তাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করা। নিঃসন্দেহে তোমার রাব্ব ত্বরিত শাস্তিদাতা, আর নিঃসন্দেহে তিনি ক্ষমাশীল ও কৃপানিধান।
ফযলুর রহমান: তিনিই তোমাদেরকে দুনিয়ার প্রতিনিধি করেছেন এবং তোমাদেরকে যা কিছু দান করেছেন সে সম্বন্ধে পরীক্ষা করার জন্য তোমাদের কতককে কতকের ওপরে মর্যাদা দিয়েছেন। নিশ্চয়ই তোমার প্রভু দ্রুত শাস্তি প্রদানকারী; আবার নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
মুহিউদ্দিন খান: তিনিই তোমাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছেন এবং একে অন্যের উপর মর্যাদা সমুন্নত করেছেন, যাতে তোমাদের কে এ বিষয়ে পরীক্ষা করেন, যা তোমাদেরকে দিয়েছেন। আপনার প্রতিপালক দ্রুত শাস্তি দাতা এবং তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, দয়ালু।
জহুরুল হক: আর তিনিই সেইজন যিনি তোমাদের পৃথিবীর প্রতিনিধি বানিয়েছেন, আর তোমাদের কাউকে অন্যদের উপরে মর্যাদায় উন্নত করেছেন, যেন তিনি তোমাদের নিয়মানুবর্তী করতে পারেন যা তিনি তোমাদের দিয়েছেন তার দ্বারা। নিঃসন্দেহ তিনি পরিত্রাণকারী, অফুরন্ত ফলদাতা।
Sahih International: And it is He who has made you successors upon the earth and has raised some of you above others in degrees [of rank] that He may try you through what He has given you. Indeed, your Lord is swift in penalty; but indeed, He is Forgiving and Merciful.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৬৫. তিনিই তোমাদেরকে যমীনের খলীফা বানিয়েছেন(১) এবং যা তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন সে সম্বন্ধে পরীক্ষার উদ্দেশ্যে তোমাদের কিছু সংখ্যককে কিছু সংখ্যকের উপর মর্যাদায় উন্নীত করেছেন। নিশ্চয় আপনার রব দ্রুত শাস্তি প্রদানকারী এবং নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, দয়াময়।(২)
তাফসীর:
(১) এখানে খলীফা অর্থ স্থলাভিষিক্ত করা। অর্থাৎ এক প্রজন্মের উপর অপর প্রজন্মকে তাদের জায়গায় স্থান দিয়েছেন। কখনও কখনও এক জাতিকে ধ্বংস করে অপর জাতিকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন। [আত-তাফসীরুস সহীহ]
(২) হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “মুমিন যদি জানত, আল্লাহ্র কাছে শাস্তির পরিমাণ কতখানি, তাহলে কেউই তাঁর জান্নাতের লোভ করত না। আর কাফের যদি জানত, আল্লাহর কাছে ক্ষমা কতখানি, তাহলে কেউই তার রহমত থেকে নিরাশ হতো না।” [মুসলিম: ২৭৫৫]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৬৫) তিনিই তোমাদেরকে পৃথিবীর প্রতিনিধি করেছেন[1] এবং যা তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন, সে সম্বন্ধে পরীক্ষার উদ্দেশ্য তোমাদের কিছুকে অপরের উপর মর্যাদায় উন্নত করেছেন।[2] নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক সত্বর শাস্তিদাতা এবং তিনি চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়াময়।
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, শাসক বানিয়ে কর্তৃত্ব দানে ধন্য করেছেন। অথবা একের পর অন্যকে তার উত্তরাধিকারী, স্থলাভিষিক্ত (খলীফা) বানিয়েছেন।
[2] অর্থাৎ, দরিদ্রতা-ধনাঢ্যতা, জ্ঞান-অজ্ঞতা এবং সুস্থতা-অসুস্থতা যাকে যা কিছু দিয়েছেন, তাতেই তার জন্য রয়েছে পরীক্ষা।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৬৪-১৬৫ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নির্দেশ দেন যে, বল: আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কাকে রব ও মা‘বূদ হিসেবে অন্বেষণ করব? অথচ তিনি সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, মালিক ও পরিচালনাকারী। এখানে যদিও রব বা প্রতিপালকের কথা বলা হয়েছে উদ্দেশ্য হল তাওহীদে উলুহিয়্যাহ। কেননা এ কথা পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, মুশরিকরা সব কিছুর মালিক, স্রষ্টা ইত্যাদি একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকে মানত। তারা স্বীকার করত আল্লাহ তা‘আলা আছেন, তিনি রিযিকদাতা, জীবন-মৃত্যুর মালিক। কিন্তু সমস্যা ছিল তাওহীদে উলুহিয়্যাতে। কিছু চাইলে সরাসরি আল্লাহ তা‘আলার কাছে না চেয়ে মূর্তির কাছে চাইত। মানত মানলে মূর্তির নামে মানত। সুতরাং যিনি সব কিছুর মালিক, তিনিই সকল ইবাদত পাওয়ার হকদার। তাই আমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে মা‘বূদ হিসেবে গ্রহণ করতে পারি না।
(وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِّزْرَ أُخْرٰي)
‘কেউ অন্য কারো (পাপের) ভার বহন করবে না।’অর্থাৎ কিয়ামতের দিন কেউ কারো পাপের বোঝা বহন করবে না। এমনকি পিতা-মাতাও সন্তানের কোন পাপের বোঝা বহন করবে না। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَإِنْ تَدْعُ مُثْقَلَةٌ إِلٰي حِمْلِهَا لَا يُحْمَلْ مِنْهُ شَيْءٌ وَّلَوْ كَانَ ذَا قُرْبٰي)
“যদি কোন বোঝা ভারাক্রান্ত ব্যক্তি কাউকে তার বোঝা বহন করতে ডাকে, তবে তা থেকে কিছুই বহন করা হবে না, যদিও সে তার নিকটাত্মীয় হয়।”(সূরা ফাতির ৩৫:১৮)
বরং সে বোঝা নিজের ঘাড়েই বহন করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(مَنْ عَمِلَ صَالِحًا فَلِنَفْسِه۪ ج وَمَنْ أَسَا۬ءَ فَعَلَيْهَا ط وَمَا رَبُّكَ بِظَلَّامٍ لِّلْعَبِيْدِ )
“যে সৎ আমল করে সে নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে এবং কেউ মন্দ আমল করলে তার প্রতিফল সে-ই ভোগ করবে। তোমার প্রতিপালক তাঁর বান্দাদের প্রতি কোন জুলুম করেন না।”(সূরা হা-মীম আস-সিজদাহ ৪১:৪৬)
তবে যদি দুনিয়াতে কোন ব্যক্তি এমন পাপ কাজের রীতি-নীতি চালু করে, যার অনুসরণ করে মানুষ পাপ কাজে লিপ্ত হয় তাহলে তাদের পাপের সমপরিমাণ বোঝা সে ব্যক্তিকেও বহন করতে হবে, যে ব্যক্তি সে রীতি-নীতি চালু করেছে।
(وَإِذَا قِيْلَ لَهُمْ مَّاذَآ أَنْزَلَ رَبُّكُمْ لا قَالُوْآ أَسَاطِيْرُ الْأَوَّلِيْنَ)
যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘তোমাদের প্রতিপালক কী অবতীর্ণ করেছেন?’ তখন তারা বলে, ‘পূর্ববর্তীদের উপকথা!’ (সূরা নাহল ১৬:২৫)
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
مَنْ دَعَا إِلَي هُدًي كَانَ لَهُ مِنَ الأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنْ تَبِعَهُ لاَ يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْئًا وَمَنْ دَعَا إِلَي ضَلاَلَةٍ كَانَ عَلَيْهِ مِنَ الإِثْمِ مِثْلُ آثَامِ مَنْ تَبِعَهُ لاَ يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ آثَامِهِمْ شَيْئًا
যে ব্যক্তি মানুষকে সঠিক পথের দিকে আহ্বান করবে, সে ব্যক্তি তেমন প্রতিদান পাবে যেমন প্রতিদান পাবে সে পথের অনুসারীরা; তবে তাদের প্রতিদান থেকে কোন কম করা হবে না। আর যে ব্যক্তি মানুষকে পথভ্রষ্টতার দিকে আহ্বান করবে সে ব্যক্তি তেমন গুনাহগার হবে যেমন গুনাহগার হবে সে পথের অনুসারীরা। তবে তাদের গুনাহ থেকে কম করা হবে না। (সহীহ মুসলিম হা: ৬৯৮০)
কিয়ামতের দিন সবকিছু আল্লাহ তা‘আলা জানিয়ে দেবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قُلْ لَّا تُسْأَلُوْنَ عَمَّآ أَجْرَمْنَا وَلَا نُسْأَلُ عَمَّا تَعْمَلُوْنَ قُلْ يَجْمَعُ بَيْنَنَا رَبُّنَا ثُمَّ يَفْتَحُ بَيْنَنَا بِالْحَقِّ ط وَهُوَ الْفَتَّاحُ الْعَلِيْمُ)
“বল, আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে একত্রিত করবেন, অতঃপর তিনি আমাদের মধ্যে বিচার করবেন সঠিকভাবে, আর তিনিই শ্রেষ্ঠ ফায়সালাকারী, সর্বজ্ঞ। বল: আমরা যে অপরাধ করেছি সেজন্য তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে না এবং তোমরা যা কর তার জন্য আমরাও জিজ্ঞাসিত হব না ” (সূরা সাবা ৩৪:২৫-২৬)
(خَلٰ۬ئِفَ الْأَرْضِ)
‘দুনিয়ার প্রতিনিধি’ খলিফা বা প্রতিনিধি এর দু’টি অর্থ: ১. শাসক, কর্তৃত্বশীল। যারা অন্যদের নেতৃত্ব দেয় ও পরিচালনা করে। ২. উত্তরাধিকারী, স্থলাভিষিক্ত। একজন চলে গেলে অন্যজনের আগমন করা। এখানে দ্বিতীয় অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। এক জাতি চলে যাবে আবার নতুন জাতি দুনিয়া আবাদ করবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(عَسٰي رَبُّكُمْ أَنْ يُّهْلِكَ عَدُوَّكُمْ وَيَسْتَخْلِفَكُمْ فِي الْأَرْضِ فَيَنْظُرَ كَيْفَ تَعْمَلُوْنَ)
‘শীঘ্রই তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের শত্র“ ধ্বংস করবেন এবং তিনি তোমাদেরকে জমিনে তাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন, অতঃপর তোমরা কী কর তা তিনি লক্ষ করবেন।’(সূরা আ‘রাফ ৭:১২৯)
(وَرَفَعَ بَعْضَكُمْ فَوْقَ بَعْضٍ)
‘তোমাদের কতককে কতকের ওপর মর্যাদায় উন্নীত করেছেন।’অর্থাৎ জীবিকা, চরিত্র, সৌন্দর্য, দৃশ্য, দৈহিক গঠন, রং ইত্যাদিতে একজনকে অপরের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُمْ مَّعِيْشَتَهُمْ فِي الْحَيٰوةِ الدُّنْيَا وَرَفَعْنَا بَعْضَهُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجٰتٍ لِّيَتَّخِذَ بَعْضُهُمْ بَعْضًا سُخْرِيًّا ط وَرَحْمَتُ رَبِّكَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُوْنَ)
“আমিই তাদের মধ্যে জীবিকা বন্টন করি তাদের পার্থিব জীবনে এবং একজনকে অপরের ওপর মর্যাদায় উন্নীত করি যাতে একে অপরের দ্বারা খেদমত লাভ করতে পারে এবং তারা যা জমা করে তা হতে তোমার প্রতিপালকের রহমত উৎকৃষ্টতর।”(সূরা যুখরুফ ৪৩:২)
(لِّيَبْلُوَكُمْ فِيْ مَآ اٰتٰكُمْ)
‘যা তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন সে সম্বন্ধে পরীক্ষার উদ্দেশ্যে’অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়াতে মানুষকে যা দিয়েছেন তার দ্বারা তাকে পরীক্ষা করেন। কে ধন-সম্পদ, সুযোগ সুবিধা ইত্যাদি পেয়ে আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় করে ও তাঁর দীনের ওপর অটল থাকে আর কে আল্লাহ তা‘আলার নাফরমানী করে ও দীন থেকে সরে যায়।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: দুনিয়া হচ্ছে সুমিষ্ট, শ্যামল ও সবুজ। আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে অন্যান্যদের পরে দুনিয়া ভোগ করার সুযোগ করে দিয়েছেন এবং তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত বানিয়েছেন। এখন তিনি দেখতে চান তোমরা কিরূপ আমল কর। অতএব দুনিয়া থেকে বেঁচে চল এবং মেয়েদের থেকেও বেঁচে চল। কেননা বানী ইসরাঈলগণ সর্বপ্রথম মহিলাদের ফেতনায় পড়েছিলেন। (সহীহ মুসলিম হা: ৭১২৪, তিরমিযী হাঃ ২১৯১, ইবনু মাযাহ হা: ৪০০০)
(إِنَّ رَبَّكَ سَرِيْعُ الْعِقَابِ)
‘তোমার প্রতিপালক তো শাস্তি প্রদানে তৎপর’অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা যেমন শাস্তি দিতে তৎপর আবার তেমন তিনি দয়ালুও বটে।
নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি যে কত কঠিন তা যদি মু’মিনরা জানত তাহলে কেউ জান্নাতের আশা করত না আর কাফিররা যদি জানত যে, আল্লাহ তা‘আলার কাছে কী পরিমাণ রহমত রয়েছে তাহলে তারা কেউ জান্নাতের আশা ছাড়ত না। আল্লাহ তা‘আলা একশত রহমত সৃষ্টি করেছেন। তার এক ভাগ সৃষ্টির মাঝে দিয়েছেন যার দ্বারা পরস্পর পরস্পরকে দয়া করে থাকে। আর নিরানব্বই ভাগ নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। (সহীহ মুসলিম হা: ২৭৫৫, তিরমিযী হা: ৩৫৪২)
সুতরাং আশা ও ভয় উভয়ের সমন্বয়ে ঈমান আনয়ন ও ইবাদত করা। জান্নাতের আশায় আমল করতে হবে আর জাহান্নামের ভয়ে আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্যতামূলক কাজ-কর্ম বর্জন করতে হবে।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. যিনি সব কিছুর মালিক তিনিই একমাত্র সব ইবাদত পাবার যোগ্য।
২. মক্কার মুশরিকরাও আল্লাহ তা‘আলাকে সব কিছুর মালিক বলে জানত কিন্তু এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করত না।
৩. যে যা কর্ম করবে তার পাপের বোঝা তাকেই বহন করতে হবে। কোন নিকটাত্মীয়ও বহন করবে না।
৪. আল্লাহ তা‘আলা ধন-সম্পদ, উত্তম অবয়ব ইত্যাদি দিয়ে মানুষকে পরীক্ষা করেন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে- তোমরা একের পর এক ভূ-পৃষ্ঠে বসতি স্থাপন করে আসছিলে এবং পূর্ববর্তীদের পর পরবর্তীদের যুগ আসতে রয়েছিল। আর একে অপরের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছিল। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “যদি আমি ইচ্ছা করতাম তবে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত তোমাদের সন্তানদেরকে বা অন্য কাউকেও না বানিয়ে ফেরেশতাদেরকে বানাতাম এবং তারা তোমাদের পর তোমাদের স্থান দখল করে নিত।” আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “এ যমীনকে তিনি তোমাদেরকে পর্যায়ক্রমে একের পর অপরকে প্রদান করেছেন।” অন্যত্র তিনি বলেছেনঃ “ভূ-পৃষ্ঠে আমি নিজের প্রতিনিধি বানাতে চাই।” আর এক জায়গায় বলেনঃ “এ সম্ভাবনা রয়েছে যে, সত্বরই তোমাদের প্রভু তোমাদের শক্রকে ধ্বংস করে দিবেন। এবং তোমাদেরকে তাদের স্থানে বসাবেন, অতঃপর তিনি দেখবেন যে, তাদের স্থানে তোমরা এসে কিরূপ আমল পেশ করছে।”
আল্লাহ পাক বলেনঃ তিনি কতককে কতকের উপর মর্যাদায় উন্নত করেছেন, অর্থাৎ জীবিকা, চরিত্র, সৌন্দর্য, সমতা, দৃশ্য, দৈহিক গঠন, রং ইত্যাদিতে একে অপরের অপেক্ষা কম-বেশী রয়েছে। যেমন তিনি বলেছেনঃ “আমি তাদের পার্থিব জীবনে তাদের পারস্পরিক জীবিকা বন্টন করে দিয়েছি এবং একের মর্যাদা অপরের চেয়ে উচ্চ করেছি।” কেউ আমীর, কেউ গরীব, কেউ মনিব এবং কেউ তার চাকর । মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেনঃ “লক্ষ্য কর, আমি কিভাবে একের উপরে অপরকে প্রাধান্য ও মর্যাদা দান করেছি, তবে পার্থিব জীবনের মর্যাদার তুলনায় পারলৌকিক মর্যাদা ও প্রাধান্য বহু গুণে গুরুত্বপূর্ণ।” আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “এই মর্যাদার বিভিন্নতার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে চাই, ধনীকে ধন দিয়ে জিজ্ঞেস করা হবে যে, সে ধন-সম্পদের শাকরিয়া কিভাবে আদায় করেছে এবং গরীবকে জিজ্ঞেস করা হবে যে, সে স্বীয় দারিদ্রের উপর ধৈর্যধারণ করেছে কি করেনি।”
সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়া হচ্ছে সুমিষ্ট, শ্যামল ও সবুজ। আল্লাহ তোমাদেরকে অন্যান্যদের পরে দুনিয়া ভোগ করার সুযোগ দিয়েছেন এবং তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত বানিয়েছেন। এখন তিনি দেখতে চান তোমরা কিরূপ আমল করছো। তোমরা দুনিয়াকে ভয় কর এবং নারীদেরকেও ভয় করে চল। বানী ইসরাঈলের মধ্যে প্রথম যে ফিত্না সৃষ্টি হয়েছিল তা ছিল নারী সম্পৰ্কীয়ই।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে মারফু’রূপে বর্ণনা করেছেন)
আল্লাহ তা'আলার উক্তি- (আরবী) হে মুহাম্মাদ (সঃ)! নিঃসন্দেহে তোমার প্রতিপালক ত্বড়িত শাস্তিদাতা এবং অবশ্যই তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালুও বটে। অর্থাৎ তোমাদের পার্থিব জীবন সত্বরই শেষ হয়ে যাবে ও তোমাদেরকে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। তবে তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল এবং দয়ালুও বটে।
এখানে ভয়ও প্রদর্শন করা হচ্ছে এবং উৎসাহও প্রদান করা হচ্ছে যে, তাঁর হিসাব ও শাস্তি সত্বরই এসে যাবে এবং তার অবাধ্যরা ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরোধিতাকারীরা পাকড়াও হয়ে যাবে। আর যারা তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছে, আল্লাহ তাদের অলী এবং তাদের প্রতি তিনি ক্ষমাশীল ও কৃপানিধান । কুরআন কারীমের অধিকাংশ স্থানে এ দুটি বিশেষণ অর্থাৎ ক্ষমাশীল ও দয়ালু এক সাথে এসেছে। যেমন তিনি বলেনঃ “তেমাদের প্রভু স্বীয় বান্দাদের পাপরাশি ক্ষমা করার ব্যাপারে বড় ক্ষমাশীল, কিন্তু এর সাথে সাথে তাঁর পাকড়াও খুবই কঠিন।” আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! আমার বান্দাদেরকে তুমি বলে দাও-আমি ক্ষমাশীল ও দয়ালু এবং আমার শাস্তিও বড়ই কঠিন।” উৎসাহ ও আশা প্রদান এবং ভয় প্রদর্শনের আয়াত অনেক রয়েছে। কখনও তো আল্লাহ পাক জান্নাতের গুণাবলী বর্ণনা করে বান্দাদেরকে উৎসাহ ও আশা প্রদান করেন, আবার কখনও জাহান্নামের বর্ণনা দিয়ে ওর শাস্তি এবং কিয়ামতের ভয়াবহ দৃশ্য থেকে ভয় প্রদর্শন করে থাকেন। মাঝে মাঝে আবার দু’টোর বর্ণনা একই সাথে দিয়েছেন। আল্লাহ যেন আমাদেরকে তাঁর বিধানসমূহ মেনে চলার তাওফীক প্রদান করেন এবং পাপীদের দল থেকে যেন আমাদেরকে দূরে রাখেন।
আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর শাস্তি যে কত কঠিন তা যদি মুমিন জানতো তবে কেউ জান্নাতের লালসা করতো না (সে বলতো--যদি জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাই তবে এটাই যথেষ্ট)। পক্ষান্তরে আল্লাহর দয়া ও রহমত যে কত ব্যাপক তা যদি কাফির জানতো তবে কেউ জান্নাত থেকে নিরাশ হতো না (অথচ জান্নাত তো কাফিরের প্রাপ্যই নয়)। আল্লাহ একশ’ ভাগ রহমত রেখেছেন। এর মধ্য থেকে একটি মাত্র অংশ সারা মাখলুকাতের মধ্যে বণ্টন করে দিয়েছেন। এই এক ভাগ রহমতের কারণেই মানুষ ও জীবজন্তু একে অপরের উপর দয়া করে থাকে। আর নিরানব্বই ভাগ রহমত আল্লাহর কাছেই রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে মারফু’রূপে তাখরীজ করেছেন) তাঁর রহমত যে কত বেশী তা এটা থেকেই অনুমান করা যেতে পারে!
আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকেই বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “আল্লাহ একশ’ ভাগ রহমত রেখেছেন। এর মধ্য থেকে নিরানব্বই ভাগ তিনি নিজের কাছে রেখেছেন এবং এক ভাগ যমীনে অবতীর্ণ করেছেন। এই এক ভাগ রহমতের বরকতেই সৃষ্টজীবগুলো একে অপরের উপর দয়া করে থাকে, এমন কি চতুষ্পদ জন্তুও ওর বাচ্চাকে খুরের আঘাত থেকে রক্ষা করে থাকে এই ভয়ে যে, সে কষ্ট পাবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে মারফু’রূপে তাখরীজ করেছেন) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, যখন আল্লাহ মাখলুকাতকে সৃষ্টি করেন তখন আরশের উপর অবস্থিত লাওহে মাহফুযে তিনি লিপিবদ্ধ করেনঃ “আমার রহমত আমার গযবের উপর জয়যুক্ত থাকবে।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।