সূরা আল-জুমু‘আ (আয়াত: 9)
হরকত ছাড়া:
ياأيها الذين آمنوا إذا نودي للصلاة من يوم الجمعة فاسعوا إلى ذكر الله وذروا البيع ذلكم خير لكم إن كنتم تعلمون ﴿٩﴾
হরকত সহ:
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نُوْدِیَ لِلصَّلٰوۃِ مِنْ یَّوْمِ الْجُمُعَۃِ فَاسْعَوْا اِلٰی ذِکْرِ اللّٰهِ وَ ذَرُوا الْبَیْعَ ؕ ذٰلِکُمْ خَیْرٌ لَّکُمْ اِنْ کُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ ﴿۹﴾
উচ্চারণ: ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূইযা-নূদিয়া লিসসালা-তি মিইঁ ইয়াওমিল জুমু‘আতি ফাছ‘আও ইলা-যিকরিল্লা-হি ওয়া যারুল বাই‘আ যা-লিকুম খাইরুল্লাকুম ইন কুনতুম তা‘লামূন।
আল বায়ান: হে মুমিনগণ, যখন জুমু‘আর দিনে সালাতের জন্য আহবান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও। আর বেচা-কেনা বর্জন কর। এটাই তোমাদের জন্য সর্বোত্তম, যদি তোমরা জানতে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৯. হে ঈমানদারগণ! জুমুআর দিনে(১) যখন সালাতের জন্য ডাকা হয়(২) তখন তোমরা আল্লাহ্র স্মরণে ধাবিত হও (৩)এবং কেনা-বেচা ত্যাগ কর, এটাই তোমাদের জন্য সর্বোত্তম, যদি তোমরা জানতে।
তাইসীরুল ক্বুরআন: হে মু’মিনগণ! জুমু‘আহর দিনে যখন নামাযের জন্য ডাকা হয়, তখন আল্লাহর স্মরণের দিকে শীঘ্র ধাবিত হও, ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর, এটাই তোমাদের জন্য অতি উত্তম, যদি তোমরা জানতে!
আহসানুল বায়ান: (৯) হে বিশ্বাসীগণ! জুমুআর দিনে যখন নামাযের জন্য আহবান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের জন্য ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর। [1] এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যদি তোমরা উপলব্ধি কর।
মুজিবুর রহমান: হে মু’মিনগণ! জুমু’আর দিন যখন সালাতের জন্য আহবান করা হয় তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর; এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যদি তোমরা উপলদ্ধি কর।
ফযলুর রহমান: হে ঈমানদারগণ! যখন শুক্রবারের (জুম্আর) নামাযের জন্য ডাক (আযান) দেওয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণপানে ছুটে আসবে এবং কেনাবেচা বন্ধ করে দেবে। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।
মুহিউদ্দিন খান: মুমিনগণ, জুমআর দিনে যখন নামাযের আযান দেয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের পানে ত্বরা কর এবং বেচাকেনা বন্ধ কর। এটা তোমাদের জন্যে উত্তম যদি তোমরা বুঝ।
জহুরুল হক: ওহে যারা ঈমান এনেছ! যখন জুমু'আর দিনে নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন তোমরা আল্লাহ্র স্মরণে তাড়াতাড়ি করবে ও বেচা-কেনা বন্ধ রাখবে। এইটিই হচ্ছে তোমাদের জন্য শ্রেয়, যদি তোমরা জানতে।
Sahih International: O you who have believed, when [the adhan] is called for the prayer on the day of Jumu'ah [Friday], then proceed to the remembrance of Allah and leave trade. That is better for you, if you only knew.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৯. হে ঈমানদারগণ! জুমুআর দিনে(১) যখন সালাতের জন্য ডাকা হয়(২) তখন তোমরা আল্লাহ্–র স্মরণে ধাবিত হও (৩)এবং কেনা-বেচা ত্যাগ কর, এটাই তোমাদের জন্য সর্বোত্তম, যদি তোমরা জানতে।
তাফসীর:
(১) এই দিনটি মুসলিমদের সমাবেশের দিন। তাই এই দিনকে ‘ইয়াওমুল জুম'আ’ বলা হয়। এইদিনের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন হাদীসে এসেছে; যেমন, আল্লাহ তা'আলা নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও সমস্ত জগৎকে ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন। এই ছয়দিনের শেষদিন ছিল জুম'আর দিন। [মুসলিম: ২৭৮৯] আরও এসেছে, “যে দিনগুলোতে সূৰ্য উদিত হয় তন্মধ্যে সবচেয়ে উত্তম দিন হচ্ছে, জুম'আর দিন। এই দিনেই আদম আলাইহিস সালাম সৃজিত হন, এই দিনেই তাকে জান্নাতে দাখিল করা হয় এবং এই দিনেই জন্নাত থেকে পৃথিবীতে নামানো হয়। আর কেয়ামত এই দিনেই সংঘটিত হবে।” [মুসলিম: ৮৫৪] আরও এসেছে, “এই দিনে এমন একটি মুহুর্ত আছে, যাতে মানুষ যে দো'আই করে, তাই কবুল হয়।” [বুখারী: ১৯৩৫, মুসলিম: ৮৫২]
আল্লাহ তা'আলা প্রতি সপ্তাহে মানবজাতির সমাবেশ ও ঈদের জন্যে এই দিন রেখেছিলেন। কিন্তু পূৰ্ববতীর্ণ উম্মতরা তা পালন করতে ব্যর্থ হয়। ইয়াহুদীরা ‘ইয়াওমুস সাবত’ তথা শনিবারকে নিজেদের সমাবেশের দিন নির্ধারিত করে নেয় এবং নাসারারা রবিবারকে। আল্লাহ তা'আলা এই উম্মতকে তওফীক দিয়েছেন যে, তারা শুক্রবারকে মনোনীত করেছে। অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আমরা সবশেষে এসেও কিয়ামতের দিন অগ্রণী হব। আমরাই প্রথম জান্নাতে প্ৰবেশ করব। যদিও তাদেরকে আমাদের আগে কিতাব দেয়া হয়েছিল, আর আমাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের পরে। কিন্তু তারা এতে মতভেদে লিপ্ত হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ আমাদেরকে তাদের মতভেদপূর্ণ বিষয়ে সঠিক পথ দিয়েছেন। এই যে দিনটি, তারা এতে মতভেদ করেছে। অত:পর আল্লাহ আমাদেরকে এ দিনের সঠিক হেদায়াত করেছেন। তা হলো, জুম'আর দিন। সুতরাং আজ আমাদের, কাল ইয়াহুদীদের। আর পরশু নাসারাদের।” [বুখারী: ৮৭৬, মুসলিম: ৮৫৫]
সম্ভবত ইয়াহুদীদের আলোচনার পর পবিত্র কুরআনের জুম'আর আলোচনার কারণ এটাই যে, তাদের ইবাদতের যুগ শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন কেবলমাত্র মুসলিমদের ইবাদতের দিনের প্রতি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। আর তা হচ্ছে জুম'আর দিন। মূর্খতাযুগে শুক্রবারকে “ইয়াওমে আরূবা” বলা হত। বলা হয়ে থাকে যে, আরবে কাব ইবনে লুয়াই সর্বপ্রথম এর নাম ‘ইয়াওমুল জুমুআ’ রাখেন। কারণ, জুম'আ শব্দটির অর্থ একত্রিত করা। এই দিনে কুরাইশদের সমাবেশ হত এবং কাব ইবনে লুয়াই ভাষণ দিতেন। সারকথা এই যে, ইসলাম পূর্বকালেও ক’ব ইবনে লুয়াই-এর আমলে শুক্রবার দিনকে গুরুত্ব দান করা হত। তিনিই এই দিনের নাম জুমআর দিন রেখেছিলেন। কিন্তু সহীহ হাদীসে পাওয়া যায় যে, “আদম আলাইহিস সালামের সৃষ্টিকে এই দিন একত্রিত করা হয়েছিল বলেই এই দিনকে জুম'আ নামকরণ করা হয়েছে।” [মুস্তাদরাকে হাকিম: ১/৪১২, নং ১০২৮, সহীহ ইবনে খুযাইমাহ ৩/১১৮, নং ১৭৩২, ত্বাবারানী: মুজামুল কবীর ৬/২৩৭ নং ৬০৯২, মুজামুল আওসাত: ১/২৫০, নং ৮২১, মাজমাউয যাওয়ায়িদ: ২/৩৯০]
(২) نُودِيَ অর্থ যখন ডাকা হয়। এখানে খোতবার আযান বোঝানো হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর, বাগভী] সায়েব ইবনে ইয়ায়ীদ বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ, আবু বকর এবং উমরের যুগে জুম'আর দিনে ইমাম যখন মিম্বরে বসত তখন প্রথম আযান দেয়া হত। তারপর যখন উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর যুগ আসল এবং মানুষ বেড়ে গেল তখন তৃতীয় আহবানটি তিনি বাড়িয়ে দেন” [বুখারী: ৯১২]
(৩) আয়াতে বর্ণিত فَاسْعَوْا শব্দের এক অর্থ দৌড়ানো এবং অপর অর্থ কোন কাজ গুরুত্ব সহকারে করা। এখানে এই অর্থ উদ্দেশ্য। কারণ, সালাতের জন্যে দৌড়ে আসতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, “প্রশান্তি ও গাম্ভীৰ্য সহকারে সালাতের জন্যে গমন কর।” [বুখারী: ৬৩৬, মুসলিম: ৬০২] আয়াতের অর্থ এই যে, জুমআর দিনে জুমআর আযান দেয়া হলে আল্লাহর যিকিরের দিকে গুরুত্বসহকারে যাও। অর্থাৎ সালাত ও খোতবার জন্যে মসজিদে যেতে যত্নবান হও। যে ব্যক্তি দৌড় দেয়, সে যেমন অন্য কোন কাজের প্রতি মনোযোগ দেয় না, তোমরাও তেমনি আযানের পর সালাত ও খোতবা ব্যতীত অন্য কাজের দিকে মনোযোগ দিও না।
এখানে ‘যিকর’ বলে জুম'আর সালাত এবং এই সালাতের অন্যতম শর্ত খোতবাও বোঝানো হয়েছে। বহু হাদীসে জুম'আর দিনে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মসজিদে হাযির হওয়ার গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে জুম'আর দিনে জানাবত তথা অপবিত্র অবস্থা থেকে পবিত্র হওয়ার মত গোসল করবে, তারপর (প্রথম ঘণ্টায়) মসজিদে হাজির হবে সে যেন একটি উট কুরবানী করল। আর যে ব্যক্তি দ্বিতীয় ঘণ্টায় গেল সে যেন গরু কুরবানী করল। যে তৃতীয় ঘন্টায় গেল সে যেন শিংওয়ালা ছাগল কুরবানী করল। যে চতুর্থ ঘন্টায় গেল সে যেন মুরগী উৎসর্গ করল। যে পঞ্চম ঘন্টায় গেল সে যেন ডিম উৎসর্গ করল। তারপর যখন ইমাম বের হয়ে যায় তখন ফেরেশতারা (লিখা বন্ধ করে) ইমামের কাছে হাযির হয়ে যিকর (খুতবা) শুনতে থাকে।” [বুখারী: ৮৮১] তাছাড়া এটা অনেকের নিকট দোআ কবুল হওয়ার সময়। এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “জুম'আর দিনে এমন একটি সময় আছে কোন মুসলিম যদি সে সময়ে আল্লাহর কাছে কোন কল্যাণ চায় তবে অবশ্যই তিনি তাকে সেটা দিবেন”। [বুখারী: ৬৪০০]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৯) হে বিশ্বাসীগণ! জুমুআর দিনে যখন নামাযের জন্য আহবান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের জন্য ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর। [1] এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যদি তোমরা উপলব্ধি কর।
তাফসীর:
[1] এই আযান কিভাবে দেওয়া হবে, তার শব্দাবলী কি হবে? কুরআন মাজীদে কোথাও তার উল্লেখ নেই। অবশ্য হাদীসে আছে। এ থেকে জানা যায় যে, হাদীস ছাড়া কুরআন বোঝাও সম্ভব নয় এবং তার উপর আমল করাও সম্ভব নয়। ‘জুমআহ’কে জুমআহ এই জন্য বলা হয় যে, এই দিনে আল্লাহ তাআলা সমস্ত বস্তুর সৃষ্টির কাজ সমাপ্ত করেন। যেন সকল সৃষ্টি এই দিন ‘জমা’ (একত্রিত) হয়েছে। অথবা নামাযের জন্য মানুষ জমা ও সমবেত হয়, তাই এই দিনকে জুমআহর দিন বলা হয়। (ফাতহুল ক্বাদীর) فَاسْعَوْا (ধাবিত হও) এর অর্থ এই নয় যে, দৌড়ে এস। বরং অর্থ হল, আযানের পর সত্বর চলে এস এবং ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ কর। কেননা, হাদীসে নামাযের জন্য দৌড়ে আসতে নিষেধ এবং ধীর-স্থিরতার সাথে আসতে তাকীদ করা হয়েছে। (বুখারী, আযান অধ্যায়, মুসলিমঃ মাসজিদ অধ্যায়) কেউ কেউ وَذَرُوا الْبَيِعَ (ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর বা কেনাবেচা বন্ধ কর)-কে দলীল বানিয়ে বলেছেন যে, জুমআহ কেবল শহরেই ফরয, গ্রামবাসীদের উপর ফরয নয়। কেননা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় কেবল শহরেই হয়, গ্রাম-গঞ্জে হয় না। অথচ প্রথমতঃ দুনিয়াতে কোন গ্রাম এমন নেই, যেখানে কেনাবেচা এবং কোন ব্যবসা হয় না। অতএব এ দাবীই হল বাস্তবতার বিপরীত। দ্বিতীয়তঃ বেচাকেনা ও ব্যবসা বলতে বুঝানো হয়েছে, যাবতীয় পার্থিব ব্যস্ততাকে; তা যেমন এবং যে প্রকারেরই হোক না কেন, জুমআর আযানের পর তা ত্যাগ করতে হবে। গ্রামবাসীদের বৈষয়িক ব্যস্ততা থাকে না কি? চাষাবাদ, ঘর-সংসারের নানা ব্যস্ততা দুনিয়া থেকে ভিন্ন জিনিস নাকি?
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৯-১১ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
অত্র আয়াতগুলোতে জুমু‘আর দিনে একজন মুসলিম ব্যক্তির করণীয় ও বর্জণীয় সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
(إِذَا نُوْدِيَ لِلصَّلٰوةِ)
জুমু‘আর সালাতের জন্য যখন আযান দেওয়া হবে তখন সবকিছু বর্জন করে সালাতের প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এখানে النداء বা আযান বলতে খতিব সাহেব মিম্বারে বসার পর যে আযান প্রদান করা হয় তা বুঝানো হয়েছে। এটাকে দ্বিতীয় আযান বলা হয়। প্রথম আযান হল উসমান (রাঃ) মানুষের সংখ্যাধিক্যতার কারণে যে আযান চালু করেছিলেন। সায়েব বিন ইয়াজিদ বলেন : রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবূ বকর ও উমার (রাঃ)-এর যুগে আযান ছিল যখন খতিব সাহেব মিম্বারে বসতেন তখন। যখন উসমান (রাঃ) খলিফা হলেন আর মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেল তখন জাওরাতে দ্বিতীয় আরেকটি আযান বৃদ্ধি করলেন। জাওরা হল الزوراء মদীনার একটি বাড়ি যা খুব উঁচু ছিল এবং মাসজিদের নিকটে ছিল। (ইবনু কাসীর, সহীহ বুখারী হা. ৯১২)
(فَاسْعَوْا إِلٰي ذِكْر)
অর্থাৎ জুমু‘আর সালাত আদায় করার জন্য মনোনিবেশ কর, সালাতের গুরুত্ব দাও। السعي দ্বারা দৌড়ানো উদ্দেশ্য নয়। কারণ সালাতের জন্য তাড়াহুড়া করা বা দৌড়ানো নিষেধ করা হয়েছে। (সহীহ বুখারী হা. ৬৩৬)
উমার (রাঃ) বলেন :
فامضوا الي ذكر الله
অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার যিকির বা সালাতের দিকে অগ্রসর হও। (ইবনু কাসীর)
ذكر الله আল্লাহ তা‘আলার স্মরণে বলতে জুমু‘আর সালাত ও উভয় খুৎবাকে বুঝানো হয়েছে। (তাফসীর সা‘দী)।
(وَذَرُوا الْبَيْعَ)
অর্থাৎ যখন আযান দেওয়া হয় তখন সকল কাজকর্ম এমনকি ব্যবসায়-বাণিজ্য বর্জন করে সালাত আদায় করতে চলো। এজন্য সকল আলেমগণ একমত যে, দ্বিতীয় আযানের পর সকল প্রকার ক্রয়-বিক্রয় হারাম। (ইবনু কাসীর)
(ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ)
অর্থাৎ ব্যবসায় বাণিজ্যসহ সবকিছু বর্জন করে সালাত আদায়ের দিকে ধাবিত হওয়া উভয় জগতের জন্য কল্যাণকর। অতত্রব আল্লাহ তা‘আলা মু’মিন বান্দাদেরকে সালাত শেষে দুনিয়াতে তিনি যে فَضْلِ বা রিযিক রেখে দিয়েছেন তা অন্বেষণ করার নির্দেশ প্রদান করছেন।
বি : দ্র : এ নির্দেশ (তথা সালাত শেষে রিযিক অন্বেষণ কর) পালন করা ওয়াজিব না। কেউ সালাত শেষে রিযিক অন্বেষণে বের না হলে গুনাহগার হবে না। মূলত এখানে নির্দেশমূলক শব্দ ব্যবহার করার কারণ হল আযানের পর ব্যবসায়-বাণিজ্য নিষেধ করা হয়েছিল নির্দেশমূলক শব্দ দ্বারা তাই বৈধ হওয়ার জন্যও নির্দেশমূলক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।
আরাক বিন মালেক (রাঃ) জুমু‘আর সালাত আদায় শেষে মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে বলতেন : হে আল্লাহ! আমি আপনার ডাকে সাড়া দিয়েছি ফরয সালাত আদায় করছি, এখন আপনার নির্দেশ মতে জমিনে ছড়িয়ে পড়ছি। অতএব আপনি আমাকে আপনার উত্তম রিযিক দান করুন, আপনি তো উত্তম রিযিকদাতা। কতক সালাফ থেকে বর্ণনা এসেছে : যে ব্যক্তি জুমু‘আর সালাতের পর ক্রয়-বিক্রয় করবে আল্লাহ তা‘আলা তাতে সত্তরবার বরকত দেবেন। (ইবনু কাসীর)।
(وَاذْكُرُوا اللّٰهَ كَثِيْرًا)
অর্থাৎ ব্যবসায় বাণিজ্য লেনদেন ওঠাবসাসহ সর্বাবস্থায় বেশি বেশি আল্লাহ তা‘আলার যিকির কর। কোন অবস্থাতেই যেন তাঁর স্মরণ থেকে গাফেল না হও। এজন্য হাদীসে এসেছে : যে ব্যক্তি কোন এক বাজারে প্রবেশ করল এবং বলল :
لَا اِلٰهَ اِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَاشَرِيْكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلٰي كُلِّ شَيْئٍ قَدِيْرٍ
অর্থাৎ ‘আল্লাহ ব্যতীত সত্যিকার কোন মা‘বূদ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই, রাজত্ব তাঁরই ও তার জন্য যাবতীয় প্রশংসা এবং তিনি সবকিছুর উপরে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী’-তাহলে তার জন্য এক লক্ষ নেকী লেখা হবে এবং এক লক্ষ গুনাহ মোচন করা হবে। )তিরমিযী হা. ৩৪২৮, ইবনু মাযাহ হা. ২২৩৫ হাসান)।
জুমু‘আর দিনে করণীয় :
জুমু‘আর দিন মাসজিদে আসার পূর্বে গোসল করা মুস্তাহাব। এটা অধিকাংশ আলেমদের অভিমত। (সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ)।
অতঃপর জুমু‘আর সালাত আদায়ের জন্য সামর্থ্যানুযায়ী পরিষ্কার ও সুন্দর পোশাক পরিধান করবে। (আবূ দাঊদ হা. ১০৭৮, সনদ সহীহ)। তারপর যথাসম্ভব সুগন্ধি ব্যবহার করবে। অতঃপর আগেভাগে মাসজিদের দিকে রওনা দেবে। হাদীসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি জুমু‘আর দিন ফরয গোসলের মত গোসল করে মাসজিদে রওনা দেবে সে যেন একটি উট কুরবানী করল। তারপর যে যাবে সে ব্যক্তি গরু কুরবানী করল....। (সহীহ বুখারী হা. ৮৮১)
তারপর যথাসম্ভব সালাত আদায় করে খতীব সাহেবের খুৎবা মনযোগসহকারে শুনবে, কোন প্রকার কথাবার্তা বলবে না। কারণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : যে ব্যক্তি ইমাম সাহেবের খুৎবা চলাকালীন তার পার্শ্ববর্তী ভাইকে বলল : চুপ করুন, সে ব্যক্তি অনর্থক কাজ করল। (সহীহ বুখারী হা. ৮৯২)।
এভাবে যদি কেউ জুমু‘আর সালাত আদায় করে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার ফযীলত সম্পর্কে বলেন : এক জুমু‘আহ থেকে অপর জুমু‘আহ পর্যন্ত যে সকল অপরাধ হয়েছে তার জন্য তা কাফফারা হয়ে যাবে, তবে কবীরাহ গুনাহ থেকে বেঁেচ থাকতে হবে। (সহীহ বুখারী হা. ২৩৩)
(وَإِذَا رَأَوْا تِجَارَةً) শানে নুযূল :
জাবের (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন : একটি (বাণিজ্যিক) কাফেলা জুমু‘আর দিন আগমন করল। আমরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে ছিলাম। মানুষেরা ১২ জন ব্যতীত সবাই চলে গেল। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (সহীহ বুখারী হা. ৪৮৯৯) তিরমিযীর বর্ণনামতে জাবের (রাঃ) বলছেন : একদা নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুমু‘আর দিন খুৎবা প্রদান করছিলেন। এমন সময় মদীনাতে একটি (বাণিজ্যিক) কাফেলা আগমন করল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে ১২ জন সাহাবী ব্যতীত সবাই সেদিকে দৌড়ালো। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলছেন : ঐ সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! যদি তোমরাও তাদের মতো চলে যেতে, একজনও যদি না থাকতে তাহলে উপত্যকা আগুন হয়ে তোমাদের ওপর পতিত হতো। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (তিরমিযী হা. ৩৩১১ সহীহ।) জাবের (রাঃ) বলছেন, ১২ জনের মধ্যে আবূ বকর ও উমার (রাঃ)-ও ছিলেন।
ঘটনাটি হচ্ছে : মদীনাতে তখন খুব অভাব-অনটন ছিল। বাইরের এলাকা থেকে কেউ কিছু আমদানী করে নিয়ে আসে না। দীর্ঘদিন পর এ কাফেলাটি আসছিল জুমু‘আর দিন খুৎবার সময়। তখন একজন ঘোষণা দিল অমুকের কাফেলা পণ্য নিয়ে এসেছে। যার কারণে সাহাবীগণ ছুটে গিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুমু‘আর দিন আগে সালাত আদায় করতেন পরে খুৎবা দিতেন ঈদের সালাতের মত। যখন এরূপ একদিন সালাত আদায় করে খুৎবা দিচ্ছিলেন আর একজন লোক প্রবেশ করে বলল : দাহইয়া বিন খলিফা তার বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে আগমন করেছে। তখন কয়েকজন সাহাবী ব্যতীত সবাই চলে গেল। (আবূ দাঊদ তার মারাসিল গ্রন্থে জুমু‘আর খুৎবা অধ্যায়, বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য)।
(وَتَرَكُوْكَ قَآئِمًا)
এ আয়াত প্রমাণ করছে খতিব সাহেব দাঁড়িয়ে খুৎবা প্রদান করবেন। সহীহ মুসলিমের হাদীস : নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর খুৎবা দুটি ছিল। দু খুৎবার মাঝে বসতেন। (সহীহ মুসলিম, মিশকাত হা. ১৪০৫)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. জুমু‘আহ প্রত্যেক সুস্থ ও বাড়িতে অবস্থানকারী প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষ ব্যক্তির ওপর ফরয।
২. জুমু‘আর খুতবার আযানের পর সকল প্রকার ব্যবসায় বাণিজ্য হারাম।
৩. জুমু‘আর দিনের ফযীলত জানতে পারলাম।
৪. জুমু‘আর দিন দ্বিতীয় আযান দেওয়া বৈধ হবে উসমান (রাঃ) যে কারণে চালু করেছেন যদি সে কারণ পাওয়া যায়।
৫. জুমু‘আর দিনের করণীয় ও বর্জণীয় সম্পর্কে জানলাম।
৬. জুমু‘আর খুতবা হবে দু’টি এবং তা হবে দাঁড়িয়ে ও প্রয়োজনে মাতৃভাষায়।
৭. জুমু‘আর সালাত আদায় করা যেমন ওয়াজিব তেমন খুৎবা শোনাও ওয়াজিব। খুৎবা চলাকালে কথা বলা ও কোন কাজ করা নিষেধ।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৯-১০ নং আয়াতের তাফসীর:
(আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দ হতে বের করা হয়েছে, কারণ এই যে, এই দিনে মুসলমানরা বড় বড় মসজিদে ইবাদতের জন্যে জমা বা একত্রিত হয়ে থাকে। আর এটিও একটি কারণ যে, এই দিনে সমস্ত মাখলুকের সৃষ্টি-কার্য পূর্ণ হয়েছিল। ছয় দিনে সারা জগত বানানো হয়। ষষ্ঠ দিন ছিল জুমআর দিন। এই দিনেই হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়। এই দিনেই জান্নাতে তাঁর অবস্থান ঘটে এবং এই দিনেই তাঁকে জান্নাত হতে বের করে দেয়া হয়। এই দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। এই দিনের মধ্যে এমন একটি সময় রয়েছে যে, ঐ সময়ে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট যা যা করা হয় তা-ই তিনি দান করে থাকেন।
হযরত সালমান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে সালমান (রাঃ)! জুমআর দিন কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “জমুআহর দিন এমন এক দিন যে, এ দিনে তোমাদের পিতা-মাতাকে (হযরত আদম আঃ ও হযরত হাওয়া আঃ কে) আল্লাহ একত্রিত করেন। অথবা বলেনঃ “তোমাদের পিতাকে (হযরত আদমকে আঃ) জমা করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে (মাওকুফরূপেও) অনুরূপ বর্ণিত আছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
প্রাচীন অভিধানে এটাকে ইয়াওমুল আরূবাহ বলা হতো। পূর্ববর্তী উম্মতদেরকেও প্রতি সাতদিনে একটি দিন দেয়া হয়েছিল। কিন্তু জুমআর দিনের হিদায়াত তারা লাভ করেনি। ইয়াহূদীরা শনিবারকে পছন্দ করে যেদিন মাখলুকের সৃষ্টি কার্য শুরুই হয়নি। নাসারাগণ রবিবারকে পছন্দ করে যেই দিন মাখলুক সৃষ্টির সূচনা হয়। আর এই উম্মতের জন্যে আল্লাহ তা'আলা জুমআ'হূকে পছন্দ করেছেন যেই দিন তিনি মাখলুকের সৃষ্টিকার্য পরিপূর্ণ করেছেন। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা (দুনিয়ায়) সর্বশেষে আগমনকারী, আর কিয়ামতের দিন আমরা সর্বাগ্রে হবো। যাদেরকে আমাদের পূর্বে (আসমানী) কিতাব দেয়া হয় তারা এ দিনের ব্যাপারে মতভেদ করে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। এ ব্যাপারেও তারা আমাদের পিছনে রয়েছে। ইয়াহূদীরা আগামী কাল এবং খৃষ্টানরা আগামী কালের পরের দিন।” এটা সহীহ বুখারীর শব্দ আর সহীহ মুসলিমের শব্দ হলোঃ আল্লাহ তা'আলা জুমআহ্ হতে ভ্রষ্ট করেছেন আমাদের পূর্ববর্তীদেরকে। ইয়াহুদীদের জন্যে ছিল শনিবার এবং খৃষ্টানদের জন্যে ছিল রবিবার। অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আমাদেরকে আনয়ন করেন এবং জুমআ’হর জন্যে আমাদেরকে হিদায়াত দান করেন। সুতরাং তিনি রেখেছেন শুক্রবার, শনিবার ও রবিবার। এভাবে ইয়াহুদী ও খৃষ্টানরা কিয়ামতের দিন আমাদের পিছনে থাকবে। দুনিয়াবাসীর হিসেবে আমরা শেষে রয়েছি। কিন্তু কিয়ামতের দিন সমস্ত মাখলুকের মধ্যে সর্বপ্রথম আমাদের ব্যাপারে ফায়সালা করা হবে।”
এখানে আল্লাহ তা'আলা জুমআর দিন স্বীয় মুসলিম বান্দাদেরকে তাঁর ইবাদতের জন্যে একত্রিত হওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। (আরবী) দ্বারা এখানে দৌড়ানো উদ্দেশ্য নয়, বরং ভাবার্থ হচ্ছেঃ তোমরা আল্লাহর যিকর অর্থাৎ নামাযের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়, কাজ-কর্ম ছেড়ে দিয়ে মসজিদ পানে অগ্রসর হও। যেমন মহান আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “মুমিন অবস্থায় যে আখিরাতের কামনা করে এবং ওর জন্যে চেষ্টা সাধনা করে।” (১৭:১৯)
হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) ও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআত (আরবী) এর স্থলে (আরবী) রয়েছে। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, নামাযের জন্যে দৌড়িয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ।
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা ইকামত শুনলে নামাযের জন্যে ধীরে সুস্থে যাবে, দৌড়াবে না। নামাযের যে অংশ (জামাআতের সাথে) পাবে তা পড়ে নিবে এবং যা ছুটে যাবে তা পুরো করবে।” অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামাযে ছিলেন এমতাবস্থায় তিনি দরযার কাছে জনগণের পায়ের জোর শব্দ শুনতে পান। নামায শেষে তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “ব্যাপার কি?” সাহাবীগণ উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা তাড়াতাড়ি করে নামাযে শরীক হয়েছি।” তখন তিনি বললেনঃ “না, না, এরূপ করো না। ধীরে সুস্থে নামাযে আসবে। যা পাবে পড়বে এবং যা ছুটে যাবে তা পুরো করে নিবে।` হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! এখানে এ হুকুম কখনো নয় যে, মানুষ নামাযের জন্যে দৌড়িয়ে আসবে। এটা তো নিষেধ। বরং এখানে উদ্দেশ্য হলো অত্যন্ত আগ্রহ, মনোযোগ ও বিনয়ের সাথে নামায পড়া। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ স্বীয় মন ও আমল দ্বারা চেষ্টা কর। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন তিনি (হযরত ইসমাঈল আঃ) এমন বয়সে পদার্পণ করলেন যে, তাঁর সাথে (হযরত ইবরাহীম আঃ এর সাথে) চলাফেরা করতে সক্ষম হলেন।” (৩৭:১০২) জুমআর নামাযের জন্যে আগমনকারীর জুমআ’হর পূর্বে গোসল করা উচিত।
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ যখন জুমআ’হর জন্যে আসবে তখন যেন সে গোসল করে নেয়। এ দু' গ্রন্থেই হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জুমআর দিন প্রত্যেক মুসলমানের উপর গোসল ওয়াজিব।
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ প্রত্যেক মুসলমানের উপর আল্লাহর হক এই যে, সে প্রতি সাত দিনে এক দিন গোসল করবে, যাতে সে তার মাথা ও শরীর ধৌত করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক মুসলিমের জন্যে প্রতি সাত দিনে একদিন গোসল রয়েছে এবং তা হলো জুমআর দিন।” (ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম হিব্বান (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)
হযরত আউস ইবনে আউস সাকাফী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যক্তি জুমআ'র দিন ভালভাবে গোসল করে এবং সকালেই মসজিদ পানে রওয়ানা হয়ে যায়, পায়ে হেঁটে যায়, সওয়ার হয় না, ইমামের নিকটবর্তী হয়ে বসে মনোযোগের সাথে খুৎবাহ শুনে এবং বাজে কথা বলে না, সে প্রতি পদক্ষেপের বিনিময়ে সারা বছরের রোযা ও সারা বছরের কিয়ামের (রাত্রে দাঁড়িয়ে ইবাদত করার) পুণ্য লাভ করে।” (এ হাদীসটি আহলে সুনানে আরবাআহ ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে খুবই উত্তম বলেছেন)
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জুমআর দিন যে ব্যক্তি নাপাক অবস্থার গোসলের ন্যায় গোসল করে আওয়াল বা প্রথম সময়ে মসজিদে গেল সে যেন একটা উট কুরবানী করলো, যে দ্বিতীয় সময়ে হাযির হলো সে যেন একটা গরু কুরবানী করলো, যে তৃতীয় সময়ে পৌঁছলো সে একটা মেষ কুরবানী করার সওয়াব পেলো, যে হাযির হলো চতুর্থ ওয়াক্তে সে যেন সাদকাহ করলো একটা মোরগ এবং যে হাযির হলো পঞ্চম ওয়াক্তে, একটা ডিম আল্লাহর পথে সাদকাহ করার মত পুণ্য সে লাভ করলো। অতঃপর যখন ইমাম (খুত্বাহ দেয়ার উদ্দেশ্যে) বের হয় তখন ফেরেশতামণ্ডলী। হাযির হয়ে যিক্র শুনতে থাকেন।` (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
জুমআ'র দিন স্বীয় সাধ্য অনুযায়ী ভাল পোশাক পরা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, মিসওয়াক করা এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও পাক-পবিত্র হয়ে জুমআর নামাযের জন্যে আসা উচিত। একটি হাদীসে গোসলের বর্ণনার সাথে সাথেই মিসওয়াক করা ও সুগন্ধি ব্যবহারের বর্ণনাও রয়েছে।
হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যক্তি জুমআর দিন গোসল করে ও স্বীয় পরিবারের লোকদেরকে সুগন্ধি মাখায় যদি থাকে, অতঃপর ভাল কাপড় পরিধান করে মসজিদে আসে ও ইচ্ছা হলে কিছু নফল নামায পড়ে নেয় এবং কাউকেও কষ্ট দেয় না (অর্থাৎ কারো ঘাড়ের উপর দিয়ে যায় না ও কোন উপবিষ্ট লোককে উঠায় না), অতঃপর ইমাম এসে খুৎবাহ শুরু করলে নীরবে তা শুনতে থাকে, তার এই জুমআহ্ হতে পরবর্তী জুমআ’হ্ পর্যন্ত যত পাপ হয় সবই কাফফারা বা মাফ হয়ে যায়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
সুনানে আবু দাউদে ও সুনানে ইবনে মাজা হতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে। সালাম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি মিম্বরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ যদি দৈনন্দিনের পরিশ্রমের কাপড় ছাড়া দু'টি কাপড় ক্রয় করে নিয়ে জুমআর নামাযের জন্যে খাস বা নির্দিষ্টি করে রাখে তবে ক্ষতি কি?” একথা তিনি ঐ সময় বলেন যখন দেখেন যে, জনগণ সাধারণ কাপড় পরিধান করে রয়েছে। তাই তিনি বলেন যে, শক্তি থাকলে কেন এরূপ করবে না?
এ আয়াতে যে আযানের বর্ণনা রয়েছে ওর দ্বারা ঐ আযান উদ্দেশ্য যা ইমামের মিম্বরের উপর বসার পর দেয়া হয়। নবী (সঃ)-এর যুগে এ আযান ছিল। যখন নবী (সঃ) বাড়ী হতে বেরিয়ে এসে মিম্বরে উপবেশন করতেন তখন তাঁর সামনে এই আযান দেয়া হতো। এর পূর্ববর্তী আযান নবী (সঃ)-এর যুগে ছিল না। আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান (রাঃ) শুধু জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এই আযান চালু করেন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, নবী (সঃ), হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ)-এর যুগে জুমুআহর আযান শুধু ঐ সময় হতো যখন ইমাম খুৎবাহ দেয়ার জন্যে মিম্বরে বসতেন। হযরত উসমান। (রাঃ)-এর যুগে যখন জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলো তখন তিনি এই দ্বিতীয় আযান একটি পৃথক স্থানের উপর বলিয়ে নেন। ঐ স্থানটির নাম ছিল যাওরা, মসজিদের নিকটবর্তী সর্বাপেক্ষা উঁচু জায়গা এটাই ছিল।
হযরত মাকল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন ইমাম জুমআর খুত্বার জন্যে বেরিয়ে আসতেন তখনই শুধু মুআযযিন আযান দিতেন। এর পর শুধু তাকবীর দেয়া হতো এবং মুসল্লীগণ নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন। এই সময়েই ক্রয়-বিক্রয় হারাম হয়ে যায়। হযরত উসমান (রাঃ) শুধু লোক জমা করবার জন্যেই প্রথম আযান চালু করেন।
জুমআ'হয় হাযির হওয়ার হুকুম শুধু আযাদ-পুরুষদের উপর রয়েছে। নারী, গোলাম ও শিশুদের উপর এ হুকুম নেই। রুগ্ন, মুসাফির এবং অন্যান্য মাযুর ব্যক্তিদের উপরও এ হুকুম প্রযোজ্য নয়। যেমন ফুরূর কিতাব সমূহের মধ্যে এর প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে।
মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমরা ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর। অর্থাৎ বেচা-কেনা ত্যাগ করে তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও।
উলামায়ে কিরাম এই ব্যাপারে একমত যে, জুমআর দিন যখন আযান হয়ে যাবে তখন এর পরে বেচা-কেনা সম্পূর্ণরূপে হারাম হয়ে যাবে। তবে দাতা যখন দিবে তখন সেটাও শুদ্ধ হবে কি-না এই ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। প্রকাশ্য আয়াত দ্বারা তো এটাই বুঝা যাচ্ছে যে, ওটাও শুদ্ধ হবে না। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ বেচা-কেনা ছেড়ে আল্লাহর যিকর ও নামাযের দিকে তোমাদের গমন তোমাদের জন্যে শ্রেয় যদি তোমরা উপলব্ধি কর। হ্যাঁ, তবে যখন তোমাদের নামায পড়া হয়ে যাবে তখন সেখান হতে চলে যাওয়া এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধানে লেগে পড়া তোমাদের জন্যে বৈধ।
আরাক ইবনে মালিক (রাঃ) জুমআর নামায হতে ফারেগ হয়ে মসজিদের দরযার উপর দাঁড়িয়ে যেতেন এবং নিম্নের দু'আটি পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমি আপনার আহ্বানে সাড়া দিয়েছি ও আপনার হুকুম অনুযায়ী এই সমাবেশ হতে উঠে এসেছি (ও পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে যাচ্ছি), সুতরাং আপনি আমাকে আপনার অনুগ্রহ দান করুন, আপনি তো সর্বোত্তম রিযকদাতা।” (এটা ইমাম ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
এই আয়াতকে সামনে রেখে পূর্বযুগীয় কয়েকজন মনীষী বলেছেন যে, যে ব্যক্তি জুমআর দিন নামাযের পরে ক্রয়-বিক্রয় করে আল্লাহ তা'আলা তাকে সত্তর গুণ বেশী বরকত দান করবেন।
মহান আল্লাহর উক্তিঃ নামায সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করবে, আর আল্লাহকে অধিক স্মরণ করবে। অর্থাৎ ক্রয়-বিক্রয়ের অবস্থাতে আল্লাহকে স্মরণ করবে। দুনিয়ার লাভের মধ্যে এমনভাবে নিমগ্ন হয়ে পড়বে না যে, পরকালের লাভের কথা একেবারে ভুলে যাবে। এজন্যেই হাদীসে এসেছেঃ “যে ব্যক্তি কোন বাজারে গিয়ে পাঠ করেঃ (আরবি)
অর্থাৎ “আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তিনি একক, তাঁর কোন অংশীদার নেই, রাজত্ব ও প্রশংসা তাঁরই এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান।” আল্লাহ তা'আলা তার জন্যে এক লক্ষ পুণ্য লিখে নেন এবং এক লক্ষ পাপ ক্ষমা করে থাকেন।
হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, বান্দা তখনই আল্লাহর অধিক যিকরকারী হতে পারে যখন সে দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে সর্বাবস্থাতেই আল্লাহর যিকর করে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।