সূরা আন-নাহাল (আয়াত: 112)
হরকত ছাড়া:
وضرب الله مثلا قرية كانت آمنة مطمئنة يأتيها رزقها رغدا من كل مكان فكفرت بأنعم الله فأذاقها الله لباس الجوع والخوف بما كانوا يصنعون ﴿١١٢﴾
হরকত সহ:
وَ ضَرَبَ اللّٰهُ مَثَلًا قَرْیَۃً کَانَتْ اٰمِنَۃً مُّطْمَئِنَّۃً یَّاْتِیْهَا رِزْقُهَا رَغَدًا مِّنْ کُلِّ مَکَانٍ فَکَفَرَتْ بِاَنْعُمِ اللّٰهِ فَاَذَاقَهَا اللّٰهُ لِبَاسَ الْجُوْعِ وَ الْخَوْفِ بِمَا کَانُوْا یَصْنَعُوْنَ ﴿۱۱۲﴾
উচ্চারণ: ওয়া দারাবাল্লা-হু মাছালান কারইয়াতান কা-নাত আ-মিনাতাম মুতমাইন্নাতাইঁ ইয়া’তীহারিযকুহা-রাগাদাম মিন কুল্লি মাকা-নিন ফাকাফারাত বিআন‘উমিল্লা-হি ফাআযা-কাহাল্লা-হু লিবা-ছাল জূ‘ই ওয়াল খাওফি বিমা-কা-নূইয়াসনা‘ঊন।
আল বায়ান: আর আল্লাহ উপমা পেশ করছেন, একটি জনপদ, যা ছিল নিরাপদ ও শান্ত। সবদিক থেকে তার রিয্ক তাতে বিপুলভাবে আসত। অতঃপর সে (জনপদ) আল্লাহর নিআমত অস্বীকার করল। তখন তারা যা করত তার কারণে আল্লাহ তাকে ক্ষুধা ও ভয়ের পোশাক পরালেন।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১১২. আর আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের(১) যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেখানে আসত সবদিক থেকে তার প্রচুর জীবনোপকরণ। তারপর সে আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করল(২), ফলে তারা যা করত সে জন্য আল্লাহ সেটাকে আস্বাদ গ্রহণ করালেন ক্ষুধা ও ভীতির আচ্ছাদনের(৩)।
তাইসীরুল ক্বুরআন: আল্লাহ এক জনবসতির দৃষ্টান্ত পেশ করছেন যা ছিল নিরাপদ, চিন্তা-ভাবনাহীন। সবখান থেকে সেখানে আসত জীবন ধারণের পর্যাপ্ত উপকরণ। অতঃপর সে জনপদ আল্লাহর নি‘মাতরাজির কুফুরী করল, অতঃপর আল্লাহ তাদের কৃতকর্মের কারণে ক্ষুধা ও ভয়-ভীতির মুসীবাত তাদেরকে আস্বাদন করালেন।
আহসানুল বায়ান: (১১২) আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেথায় আসতো সর্বদিক হতে প্রচুর জীবনোপকরণ; অতঃপর তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করল; ফলে তারা যা করত, তার জন্য আল্লাহ তাদেরকে আস্বাদন করালেন ক্ষুধা ও ভীতির স্বাদ।[1]
মুজিবুর রহমান: আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেখানে আসত সব দিক হতে প্রচুর জীবনোপকরণ; অতঃপর ওরা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করল। ফলে তাদের কৃতকর্মের কারণে আল্লাহ তাদেরকে আস্বাদ গ্রহণ করালেন ক্ষুধা ও ভীতির।
ফযলুর রহমান: আল্লাহ একটি জনপদের (মক্কা) উদাহরণ দিচ্ছেন। জনপদটি ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত। সেখানে সব জায়গা থেকে পর্যাপ্ত জীবিকা আসত। তারপর সেটি (তার অধিবাসীরা) আল্লাহর নেয়ামতসমূহের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। তখন আল্লাহ তাদের কৃতকর্মের জন্য জনপদটিকে ক্ষুধা ও ভীতির স্বাদ আস্বাদন করালেন।
মুহিউদ্দিন খান: আল্লাহ দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন একটি জনপদের, যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, তথায় প্রত্যেক জায়গা থেকে আসত প্রচুর জীবনোপকরণ। অতঃপর তারা আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। তখন আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের কারণে স্বাদ আস্বাদন করালেন, ক্ষুধা ও ভীতির।
জহুরুল হক: আর আল্লাহ্ একটি উপমা ছুড়ঁছেন -- একটি শহর যা নিরাপত্তায় ও নিশ্চিন্তে ছিল, এর রিযেক সব দিক থেকে প্রচুর পরিমাণে এর কাছে আসত, তারপর আল্লাহ্র অনুগ্রহাবলী সন্বন্ধে সে অকৃতজ্ঞ হলো, কাজেই তারা যা করে চলেছিল সেজন্য আল্লাহ্ তাকে আস্বাদন করালেন ক্ষুধার আবরণ দিয়ে ও ভয় দিয়ে।
Sahih International: And Allah presents an example: a city which was safe and secure, its provision coming to it in abundance from every location, but it denied the favors of Allah. So Allah made it taste the envelopment of hunger and fear for what they had been doing.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১১২. আর আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের(১) যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেখানে আসত সবদিক থেকে তার প্রচুর জীবনোপকরণ। তারপর সে আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করল(২), ফলে তারা যা করত সে জন্য আল্লাহ সেটাকে আস্বাদ গ্রহণ করালেন ক্ষুধা ও ভীতির আচ্ছাদনের(৩)।
তাফসীর:
(১) এখানে যে জনপদের উদাহরণ পেশ করা হয়েছে তাকে চিহ্নিত করা হয়নি। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ এখানে নাম না নিয়ে মক্কাকেই দৃষ্টান্ত হিসেবে পেশ করা হয়েছে। [তাবারী] এ প্রেক্ষিতে বিচার করলে এখানে ভীতি ও ক্ষুধা দ্বারা জনপদটির আক্রান্ত হবার যে কথা বলা হয়েছে সেটি হবে মক্কার দুর্ভিক্ষ, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াত লাভের পর বেশ কিছুকাল পর্যন্ত মক্কাবাসীদের ওপর জেঁকে বসেছিল। অথচ মক্কা ছিল শান্তির নগরী, কিন্তু তাদের অপরাধের কারণেই তাদেরকে শাস্তি পেতে হয়েছিল। আল্লাহ তা'আলা এ ব্যাপারটি কুরআনের বিভিন্ন স্থানে সুন্দরভাবে বিবৃত করেছেন। [দেখুনঃ সূরা আল-কাসাসঃ ৫৭, সূরা ইবরাহীমঃ ২৮–২৯]
তবে এ আয়াতের একটি তাফসীর উম্মুল মুমেনীন হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি হজ্জে ছিলেন। তখন উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু মদীনায় তার গৃহাভ্যন্তরে অবরুদ্ধ ছিলেন। তিনি যাকেই পেতেন তাকেই উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেন। অবশেষে একদিন তিনি দু’জন সওয়ার দেখে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তারা বললো যে, তাকে হত্যা করা হয়েছে। তখন তিনি বললেনঃ যার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ করে বলছি, এটাই হলো সে জনপদ যার কথা আল্লাহর বাণী “আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেখানে আসত সবদিক থেকে তার প্রচুর জীবনোপকরণ। তারপর সে আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করল” এ আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। [ইবন কাসীর]
(২) এখানে মূলে كفر শব্দটি প্রয়োগ করা হয়েছে। এ কুফরী আল্লাহর সাথে কুফর ও আল্লাহর নেয়ামতের সাথে কুফরী উভয়টিই উদ্দেশ্য হতে পারে। [ইবন কাসীর] কারণ, তারা আল্লাহর সাথে কুফরি করেছিল, তার রাসূলদের সাথে কুফরি করেছিল। তাছাড়া তারা আল্লাহর নেয়ামতকেও অস্বীকার করেছিল। আল্লাহর নেয়ামত অস্বীকারের উদাহরণ হিসেবে এক হাদীসেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ধরনের কুফুরীকে ব্যবহার করেছেন। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “আমাকে জাহান্নাম দেখানো হলো, আমি দেখলাম তার অধিবাসীদের অধিকাংশই স্ত্রীলোক। তারা কুফর করে”। জিজ্ঞেস করা হলো, তারা কি আল্লাহর সাথে কুফরী করে? তিনি বললেনঃ “তারা স্বামীর প্রতি কুফর বা অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। যদি তুমি এক যুগ ধরে তাদের কারও উপকার কর, তারপরও সে তোমার কোন ক্রটি দেখলে বলে, আমি তোমার কাছ থেকে কখনও ভাল কিছু পাইনি।” [বুখারীঃ ২৯]
(৩) এ আয়াতে ক্ষুধা ও ভীতির স্বাদ আস্বাদনের জন্য লেবাস শব্দ ব্যবহার করে বলা হয়েছে যে, তাদেরকে ক্ষুধা ও ভীতির পোষাক আস্বাদন করানো হয়েছে। অথচ পোষাক আস্বাদন করার বস্তু নয়। কিন্তু এখানে লেবাস শব্দটি পুরোপুরি পরিবেষ্টনকারী হওয়ার কারণে রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ ক্ষুধা ও ভীতি তাদের সবাইকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে নিয়েছে, যেমন পোশাক দেহের সাথে ওতঃপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে যায়, ক্ষুধা এবং ভীতিও তাদের উপর তেমনিভাবে চেপে বসে। [ফাতহুল কাদীর] আয়াতে বর্ণিত দৃষ্টান্তটি কোন কোন তাফসীরবিদের মতে একটি সাধারণ দৃষ্টান্ত। এর সম্পর্ক বিশেষ কোন জনপদের সাথে নয়। অধিকাংশ তাফসীরবিদ একে মক্কা মুকাররমার ঘটনা সাব্যস্ত করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বিরুদ্ধে ইউসুফ আলাইহিস সালামের সময়ের মত দূর্ভিক্ষের দোআ করেছিলেন। [দেখুন, বুখারী ৪৮২১; মুসলিম: ২৭৯৮]
ফলে মক্কাবাসীরা সাত বছর পর্যন্ত নিদারুণ দুর্ভিক্ষে পতিত ছিল। এমনকি, মৃত জন্তু, কুকুর ও ময়লা-আবর্জনা পর্যন্ত খেতে বাধ্য হয়ে পড়েছিল। এছাড়া মুসলিমদের ভয়ও তাদেরকে পেয়ে বসেছিল। [দেখুন, ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর] অবশেষে মক্কার সর্দাররা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে আরয করল যে, কুফর ও অবাধ্যতার দোষে পুরুষরা দোষী হতে পারে, কিন্তু শিশু ও মহিলারা তো নির্দোষ। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের জন্য মদীনা থেকে খাদ্যসম্ভার পাঠিয়ে দেন। আবু সুফিয়ান কাফের অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে অনুরোধ করেন যে, আপনি তো আত্মীয় বাৎসল্য, দয়া-দাক্ষিণ্য ও মার্জনা শিক্ষা দেন। আপনারই স্বজাতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। দুর্ভিক্ষ দূর করে দেয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোআ করুন। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের জন্য দোআ করেন এবং দূর্ভিক্ষ দূর হয়ে যায়। [ইবন কাসীর আস-সীরাতুন নাবওয়ীয়্যাহ, ২/৯১]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১১২) আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেথায় আসতো সর্বদিক হতে প্রচুর জীবনোপকরণ; অতঃপর তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করল; ফলে তারা যা করত, তার জন্য আল্লাহ তাদেরকে আস্বাদন করালেন ক্ষুধা ও ভীতির স্বাদ।[1]
তাফসীর:
[1] অধিকাংশ ব্যাখ্যাকারীগণ এই জনপদ বা শহর বলতে মক্কা বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ, এই আয়াতে মক্কা ও মক্কাবাসীদের অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। আর তা ঐ সময় ঘটেছিল যখন আল্লাহর রসূল (সাঃ) তাদের জন্য অভিশাপ দিয়ে বলেছিলেন, اللهم اشدد وطأتك على مضر واجعلها عليهم سنين كسني يوسف অর্থাৎ, হে আল্লাহ মুযার গোত্রকে কঠিনভাবে ধর এবং তাদের উপর এমন অনাবৃষ্টি এনে দাও যেমন ইউসুফ (আঃ)-এর যুগে মিসরে হয়েছিল। (বুখারী ৪৮২১, মুসলিম ২১৫৬নং) অতএব মহান আল্লাহ তাদের নিরাপত্তাকে ভয় এবং সুখকে ক্ষুধা দ্বারা পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন। এমন কি তাদের অবস্থা এই পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, তারা হাড় ও গাছের পাতা খেয়ে দিন যাপন করতে বাধ্য হয়েছিল। কিছু ব্যাখ্যাকারীর মতে এই জনপদ কোন নির্দিষ্ট গ্রাম নয়। বরং এটি উপমা স্বরূপ ব্যক্ত করা হয়েছে যে, অকৃতজ্ঞ লোকেদের এই পরিণাম হবে। তাতে তারা যে স্থানের বা যে কালেরই হোক না কেন। এই ব্যাপকতাকে অধিকাংশ মুফাসসিরগণ অস্বীকার করেন না। যদিও এর অবতীর্ণ হবার বিশেষ কারণ আছে। العبرة بعموم اللفظ، لا بخصوص السبب
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১১০-১১৩ নং আয়াতের তাফসীর:
(ثُمَّ اِنَّ رَبَّکَ لِلَّذِیْنَ ھَاجَرُوْا... وَھُمْ لَا یُظْلَمُوْنَ)
আল্লাহ তা‘আলা এখানে ঘোষণা করেন যে, যদি কেউ হিজরত করতে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং নির্যাতিত হয় ও পরে আবার হিজরত করে মুসলিমদের দলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় এবং ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহ তা‘আলা তাকে ক্ষমা করে দেবেন।
উক্ত আয়াতগুলোতে তাদের কথাই আলোচনা করা হয়েছে যারা তাদের ঘর-বাড়ি, সম্পদ ছেড়ে আল্লাহ তা‘আলার পথে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হিজরত করেছে। আর হিজরত করার পর পুনরায় ইসলাম ত্যাগ করে কুফরী ধর্ম গ্রহণ করার জন্য কাফিরদের হাতে অত্যাচারিত হয়েছে তথাপি ইসলাম ত্যাগ করেনি। বরং তাদের ঈমান আরও মজবুত হয়েছে। প্রচণ্ড কষ্টের সময় ধৈর্য ধারণ করেছে এবং আল্লাহ তা‘আলার পথে তাঁর শত্র“দের সাথে যুদ্ধ করেছে এখানে তাদের কথাই বলা হয়েছে।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, কিয়ামতের দিন মানুষ তাদের নিজেদের কৃতকর্মের পক্ষে যুক্তি পেশ করবে। আর আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেককে তাদের কৃতকর্মের ফলাফল দান করবেন। কারো ওপর বিন্দু পরিমাণ জুলুম করবেন না।
(وَضَرَبَ اللہُ مَثَلًا قَرْیَةً کَانَتْ اٰمِنَةً... وَھُمْ ظٰلِمُوْنَ)
এখানে قرية বা জনপদ বলে মক্কা নগরীকে বুঝানো হয়েছে। তারা তথায় নিরাপদে ও শান্তিতে বসবাস করছিল। আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে সেখানে বিভিন্ন স্থান হতে জীবিকা দানসহ তাদের ওপর আরো অসংখ্য নেয়ামত দান করলেন।
যেমন ইবরাহীম (عليه السلام)-এর কথা:
(وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيْمُ رَبِّ اجْعَلْ هٰذَا بَلَدًا اٰمِنًا وَّارْزُقْ أَهْلَه۫مِنَ الثَّمَرٰتِ)
“আর স্মরণ কর! যখন ইবরাহীম বললেন: হে আমার রব! এ স্থানকে তুমি নিরাপত্তাময় শহরে পরিণত কর এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছে, তাদেরকে জীবিকার জন্য ফল-শস্য প্রদান কর।” (সূরা বাকারাহ ২:১২৬)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(لِاِیْلٰفِ قُرَیْشٍﭐﺫ ا۪لٰفِھِمْ رِحْلَةَ الشِّتَا۬ئِ وَالصَّیْفِﭑﺆ فَلْیَعْبُدُوْا رَبَّ ھٰذَا الْبَیْتِﭒﺫ الَّذِیْٓ اَطْعَمَھُمْ مِّنْ جُوْعٍﺃ وَّاٰمَنَھُمْ مِّنْ خَوْفٍﭓﺟ)
“কুরাইশদের অনুকূল (ও নিরাপদ) হওয়ার কারণে। শীত ও গ্রীষ্ম কালের (ব্যবসায়িক) সফরে অভ্যস্ত হওয়ার কারণে। অতএব তাদের এ ঘরের প্রতিপালকেরই ইবাদত করা উচিত। যিনি ক্ষুধায় তাদের খাবার দান করেছেন এবং তাদেরকে ভয়-ভীতি থেকে নিরাপদ রেখেছেন।” (সূরা কুরাইশ ১০৬:১-৪)
আর তাদের ওপর সবচেয়ে বড় নেয়ামত ছিল, তাদের স্বগোত্র থেকে আল্লাহ তা‘আলা তাদের নিকট একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন। অতঃপর তারা যখন আল্লাহ তা‘আলার এই নেয়মাত তথা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে অস্বীকার করল তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে আস্বাদন করালেন ক্ষুধা ও ভীতির স্বাদ। এমনকি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বদ দু‘আর ফলে তাদের অবস্থা এমন হয়েছিল যে, তারা হাড় ও গাছের পাতা খেয়ে জীবন ধারণ করত।
যেমন হাদীসে এসেছে: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদেরকে অভিশাপ করে বলেছিলেন:
(اللّٰهُمَّ اشْدُدْ وَطْأَتَكَ عَلَي مُضَرَ وَاجْعَلْهَا عَلَيْهِمْ سِنِينَ كَسِنِي يُوسُفَ)
হে আল্লাহ! মুযার গোত্রকে কঠিনভাবে ধর এবং তাদের ওপর এমন অনাববৃষ্টি দাও যেমন ইউসুফ (عليه السلام)-এর যুগে মিসরে হয়েছিল। (সহীহ বুখারী হা: ৪৮২১, সহীহ মুসলিম হা: ২১৫৩)
সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা এবং তাঁর দাওয়াতকে বর্জন করে তাঁকে কষ্ট দেয়ার ফলে তাদের প্রতি এ শাস্তি নেমে এসেছিল।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. মক্কার মর্যাদা সম্পর্কে জানা গেল।
২. নেয়ামতসমূহের শুকরিয়া আদায় করতে হবে।
৩. নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে অস্বীকার করার ফলে তৎকালীন মক্কার মুযার গোত্র যে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হয়েছিল তা জানতে পারলাম।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১১২-১১৩ নং আয়াতের তাফসীর
এই দৃষ্টান্ত দ্বারা মক্কাবাসীকে বুঝানো হয়েছে। তারা খুবই নিরাপদ ও নিশ্চিন্তভাবে বসবাস করছিল। আশে পাশে যুদ্ধ ও বিগ্রহ চলতো। কিন্তু মক্কাবাসীকে কেউই চোখ দেখাতে সাহস করতো না। যে কেউ এখানে আসতো তাকে নিরাপদ মনে করা হতো। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “তারা বলেঃ আমরা যদি হিদায়াতের অনুসরণ করি, তবে আমাদেরকে আমাদের যমীন হতে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে;” (আল্লাহ পাক বলেনঃ) “আমি কি তাদেরকে শান্তি ও নিরাপত্তার হারাম (শরীফ) দান করি নাই? যেখানে চারদিক থেকে আমার দেয়া জীবনোপকরণ বিভিন্ন প্রকারের ফলের আকারে এসে থাকে?”
এখানেও মহান আল্লাহ বলেনঃ “সেখানে আসতো সর্বদিক হতে প্রচুর জীবনোপকরণ; কিন্তু এর পরেও তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করলো। সবচেয়ে বড় নিয়ামত ছিল তাদের কাছে মুহাম্মদকে (সঃ) নবীরূপে প্রেরণ।” যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “তুমি কি তাদেরকে দেখ নাই? যারা আল্লাহর নিয়ামতকে কুফরী দ্বারা পরিবর্তন করে দিয়েছে, আর নিজেদের কওমকে ধ্বংসের ঘরে পৌঁছিয়ে দিয়েছে, যা হচ্ছে জাহান্নাম, যেখানে তারা প্রবেশ করবে এবং ওটা কতই না নিকৃষ্ট স্থান।”
তাদের দুষ্টামি ও হঠকারিতার শাস্তি স্বরূপ তাদের দু’টি নিয়ামত দু'টি যহুমত বা দুঃখ বেদনায় পরিবর্তিত হয়। নিরাপত্তা ভয়ে এবং প্রশান্তি ক্ষুধা ও চিন্তায় রূপান্তরিত হয়। তারা আল্লাহর রাসূলকে (সঃ) স্বীকার করে নাই এবং তার বিরুদ্ধাচরণে উঠে পড়ে লেগে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাত বছরের দীর্ঘ মেয়াদী দুর্ভিক্ষের জন্যে বদ দুআ করেন, যেমন হযরত ইউসুফের (আঃ) যুগে দেখা দিয়েছিল। এই দুর্ভিক্ষের সময় তারা উটের রক্ত মিশ্রিত লোম পর্যন্ত খেয়েছিল। নিরাপত্তার পর আসলো ভয় ও সন্ত্রাস। সব সময় তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সেনাবাহিনীর ভয়ে ভীত থাকতো। তারা দিনের পর দিন তার উন্নতি এবং তার সেনাবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধির খবর শুনতে ও বুঝতো। অবশেষে আল্লাহর রাসূল (সঃ) তাদের শহর মক্কার উপর আক্রমণ চালান এবং ওটা জয় করে ওর উপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেন। এই ছিল তাদের দুষ্কার্যের ফল যে, তারা যুলুম ও বাড়াবাড়ির উপর লেগেই ছিল এবং আল্লাহর রাসূলকে (সঃ) মিথ্যা প্রতিপন্ন করতেই ছিল। অথচ তাঁকে আল্লাহ তাআলা তাদের মধ্যে স্বয়ং তাদের মধ্য থেকেই প্রেরণ করেছিলেন। এই অনুগ্রহের কথা তিনি নিম্নের আয়াতে বর্ণনা করেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ মুমিনদের উপর এইভাবে অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তাদের মধ্যে তাদের মধ্য হতেই রাসূল প্রেরণ করেছেন।” (৩:১৬৪) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ “হে জ্ঞানীরা! সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয়কর। যারা ঈমান এনেছে, (জেনে রেখো যে,) আল্লাহ তোমাদের মধ্যে পুরুষ লোককে রাসূল করে পাঠিয়েছেন।” আল্লাহ তাআলার আরো উক্তিঃ “যেমন আমি তোমাদের মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছি তোমাদের মধ্য হতেই, যে তোমাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করে থাকে, তোমাদেরকে পবিত্র করে এবং তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিয়ে থাকে.....এবং তোমরা কুফরী করবে না।”
যেমন কুফরীর কারণে নিরাপত্তার পরে ভয় আসলো এবং স্বচ্ছলতার পরে আসলো ক্ষুধার তাড়না, অনুরূপভাবে ঈমানের কারণে ভয়ের পরে আসলো শান্তি ও নিরাপত্তা এবং ক্ষুধার পরে আসলো হুকুমত ও নেতৃত্ব। সুতরাং আল্লাহ কতই না মহান!
হযরত সুলাইম ইবনু নুমাইর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ “আমরা উম্মুল মু'মিনীন হযরত হাফসার (রাঃ) সাথে হজ্ব শেষে (মদীনার পথে) ফিরছিলাম। ঐ সময় খলীফাতুল মু'মিনীন হযরত উসমান (রাঃ) (বিদ্রোহীগণ কর্তৃক পরিবেষ্টিত ছিলেন। হযরত হাফসা (রাঃ) অধিকাংশ পথিককে পথিমধ্যে হযরত উসমান (রাঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলেন। অবশেষে দু’জন উষ্ট্রারোহীকে দেখে তিনি তাদের কাছে লোক পাঠিয়ে হযরত উসমান (রাঃ) সম্পর্কে জানতে চান। তারা খবর দেয় যে, তিনি শহীদ হয়েছেন। তৎক্ষণাৎ তিনি বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! ইনিই সেই শহীদ যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআ'লা (আরবি) এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেছেন।” (এটা ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আবদুল্লাহ ইবনু মুগীরার (রঃ) শায়েখেরও এটাই উক্তি।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।