আল কুরআন


সূরা ইউনুস (আয়াত: 3)

সূরা ইউনুস (আয়াত: 3)



হরকত ছাড়া:

إن ربكم الله الذي خلق السماوات والأرض في ستة أيام ثم استوى على العرش يدبر الأمر ما من شفيع إلا من بعد إذنه ذلكم الله ربكم فاعبدوه أفلا تذكرون ﴿٣﴾




হরকত সহ:

اِنَّ رَبَّکُمُ اللّٰهُ الَّذِیْ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضَ فِیْ سِتَّۃِ اَیَّامٍ ثُمَّ اسْتَوٰی عَلَی الْعَرْشِ یُدَبِّرُ الْاَمْرَ ؕ مَا مِنْ شَفِیْعٍ اِلَّا مِنْۢ بَعْدِ اِذْنِهٖ ؕ ذٰلِکُمُ اللّٰهُ رَبُّکُمْ فَاعْبُدُوْهُ ؕ اَفَلَا تَذَکَّرُوْنَ ﴿۳﴾




উচ্চারণ: ইন্না রাব্বাকুমুল্লা-হুল্লাযী খালাকাছ ছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদা ফী ছিত্তাতি আইয়া-মিন ছু ম্মাছতাওয়া-‘আলাল ‘আরশি ইউদাব্বিরুল আমরা মা-মিন শাফী‘ইন ইল্লা-মিম বা‘দি ইযনিহী যা-লিকুমুল্লা-হু রাব্বুকুম ফা‘বুদূ হু আফালা-তাযাক্কারূন।




আল বায়ান: নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ। যিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে, তারপর আরশে উঠেছেন। তিনি সব বিষয় পরিচালনা করেন। তার অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করার কেউ নেই। তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব। সুতরাং তোমরা তাঁর ইবাদাত কর। তারপরও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩. তোমাদের রব তো আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন(১), তারপর তিনি আরশের উপর উঠলেন(২)। তিনি সব বিষয় পরিচালনা করেন।(৩) তার অনুমতি লাভ না করে সুপারিশ করার কেউ নেই(৪)। তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব; কাজেই তোমরা তারই ইবাদাত কর(৫)। তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?(৬)




তাইসীরুল ক্বুরআন: নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক হলেন আল্লাহ যিনি আকাশমন্ডলী আর পৃথিবীকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশে সমুন্নত হয়েছেন। তিনি যাবতীয় বিষয়াদি পরিচালনা করেন। তাঁর অনুমতি প্রাপ্তি ছাড়া সুপারিশ করার কেউ নেই। ইনিই হলেন আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক। কাজেই তোমরা তাঁরই ‘ইবাদাত কর, তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ করবে না?




আহসানুল বায়ান: (৩) নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেন, অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন,[1] তিনি প্রত্যেক কাজ পরিচালনা করে থাকেন।[2] তাঁর অনুমতি ছাড়া সুপারিশকারী কেউ নেই।[3] ঐ (স্রষ্টা ও পরিচালক) আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক। অতএব তোমরা তাঁর ইবাদত কর।[4] তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ করবে না?



মুজিবুর রহমান: নিশ্চয়ই আল্লাহই হচ্ছেন তোমাদের রাব্ব, যিনি আসমানসমূহকে এবং যমীনকে সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে, অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হলেন, তিনি প্রত্যেক কাজ পরিচালনা করে থাকেন। তাঁর অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করার কেহ নেই; এমন আল্লাহ হচ্ছেন তোমাদের রাব্ব। অতএব তোমরা তাঁর ইবাদাত কর; তবুও কি তোমরা বুঝছনা?



ফযলুর রহমান: তোমাদের প্রভু তো সেই আল্লাহ, যিনি ছয়দিনে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। তারপর আরশে (সিংহাসনে) সমাসীন হয়ে সবকিছু পরিচালনা করছেন। তাঁর অনুমতি পাওয়ার পরই কেবল কেউ কিছুর সুপারিশ করতে পারে। এই হচ্ছেন তোমাদের প্রভু আল্লাহ। অতএব, তোমরা তাঁর এবাদত কর। তবে কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?



মুহিউদ্দিন খান: নিশ্চয়ই তোমাদের পালনকর্তা আল্লাহ যিনি তৈরী করেছেন আসমান ও যমীনকে ছয় দিনে, অতঃপর তিনি আরশের উপর অধিষ্ঠিত হয়েছেন। তিনি কার্য পরিচালনা করেন। কেউ সুপারিশ করতে পাবে না তবে তাঁর অনুমতি ছাড়া ইনিই আল্লাহ তোমাদের পালনকর্তা। অতএব, তোমরা তাঁরই এবাদত কর। তোমরা কি কিছুই চিন্তা কর না ?



জহুরুল হক: নিঃসন্দেহ তোমাদের প্রভু হচ্ছেন আল্লাহ্ যিনি মহাকাশমন্ডল ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে, তখন তিনি অধিষ্ঠিত হলেন আরশের উপরে, তিনি সমস্ত ব্যাপার নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁর অনুমতিক্রমে ব্যতীত কোনো সুপারিশকারী নেই। এই-ই আল্লাহ্ -- তোমাদের প্রভু, অতএব তাঁরই উপাসনা করো। তোমরা কি তবে খেয়াল করো না।



Sahih International: Indeed, your Lord is Allah, who created the heavens and the earth in six days and then established Himself above the Throne, arranging the matter [of His creation]. There is no intercessor except after His permission. That is Allah, your Lord, so worship Him. Then will you not remember?



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৩. তোমাদের রব তো আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন(১), তারপর তিনি আরশের উপর উঠলেন(২)। তিনি সব বিষয় পরিচালনা করেন।(৩) তার অনুমতি লাভ না করে সুপারিশ করার কেউ নেই(৪)। তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব; কাজেই তোমরা তারই ইবাদাত কর(৫)। তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?(৬)


তাফসীর:

(১) এ আয়াতে তাওহীদকে এমন অনস্বীকার্য বাস্তবতার দ্বারা প্রমাণ করা হয়েছে যে, আসমান ও যমীনকে সৃষ্টি করার মধ্যে অতঃপর সমস্ত কাজকর্ম পরিচালনার মধ্যে যখন আল্লাহ তা'আলার কোন শরীক-অংশীদার নেই, তখন ইবাদাত-বন্দেগী এবং হুকুম পালনের ক্ষেত্রে অন্য কেউ কি করে শরীক হতে পারে? বরং এতে (ইবাদাতে) অন্য কাউকে শরীক করা একান্তই অবিচার এবং সীমালঙ্ঘনের শামিল। এ আয়াতে এরশাদ হয়েছে যে, আসমান ও যমীনকে আল্লাহ তা'আলা মাত্র ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। এখানে কি পরিমাণ সময় উদ্দেশ্য তা একমাত্র আল্লাহই ভাল জানেন। যদিও কোন কোন মুফাসসির এ দিনগুলোকে আমাদের বর্তমান দিন এর মত মনে করেছেন। কোন কোন মুফাসসির মত প্রকাশ করেছেন যে, এ দিনগুলো অন্য আয়াতে বর্ণিত, একদিন সমান একহাজার বছরের মত। [ইবন কাসীর]


(২) তারপর বলেছেন (ثُمَّ اسْتَوَىٰ عَلَى الْعَرْشِ) অর্থাৎ আরশের উপর উঠেছেন। কুরআন এবং হাদীস দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, আল্লাহ্ তা'আলার আরশ এক প্রকাণ্ড সৃষ্টি আর তা সমস্ত সৃষ্টিজগতের ছাদস্বরূপ। আল্লাহ্ তা'আলা তার আরশের উপর উঠা বাস্তব বিষয়। এটা আল্লাহর একটি মহান কার্যগত গুণ। তিনি যে রকম তার আরশের উপর উঠাও সেরকম। আমরা তার আরশের উপর উঠা কথাটা বুঝি তবে সে উঠার ধরণ আমরা জানিনা। আল্লাহর আরশের উপর উঠা সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা সূরা আল-বাকারায় করা হয়েছে।


(৩) সৃষ্টিজগতের যাবতীয় কর্মকাণ্ড তিনিই পরিচালনা করেন। “আসমানও যমীনের অণু পরিমান বস্তুও তাঁর জ্ঞানের বাইরে নেই।” [সাবাঃ ৩] কোন ব্যাপারে মনযোগ দিতে গিয়ে অন্য ব্যাপার তাঁর বাধা হয় না। [বুখারী] অগণিত আবেদনকারীর আবেদন তাঁর জন্য কোন সমস্যা সৃষ্টি করে না। চাওয়ার প্রচণ্ডতায় তিনি বিরক্ত হোন না। বৃহৎ কর্মকাণ্ডগুলো পরিচালনা করতে গিয়ে ছোট ছোট বস্তুগুলো তার খেয়ালচ্যুত হয়না। চাই তা সমুদ্রে বা পাহাড়ে বা জনবসতিপূর্ণ এলাকা যেখানেই হোক না কেন। [এ ব্যাপারে আরো দেখুনঃ সূরা হুদঃ ৬, সূরা আল-আনআমঃ ৫৯]


(৪) অর্থাৎ দুনিয়ার পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় অন্য কারোর হস্তক্ষেপ করা তো দূরের কথা, কারো আল্লাহর কাছে সুপারিশ করে তাঁর কোন ফায়সালা পরিবর্তন করার অথবা করো ভাগ্য ভাঙা-গড়ার ইখতিয়ারও নেই। বড়জোর সে আল্লাহর কাছে দোআ করতে পারে। কিন্তু তার দোআ কবুল হওয়া না হওয়া পুরোপুরি আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। আল্লাহর এ একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার রাজ্যে নিজের কথা নিশ্চিতভাবে কার্যকর করিয়ে নেবার মতো শক্তিধর কেউ নেই। এমন শক্তি কারোর নেই যে, তার সুপারিশকে প্রত্যাখ্যাত হওয়া থেকে বাঁচাতে পারে। এ সুপারিশের বিষয়টি আল্লাহ্ তা'আলা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বর্ণনা করেছেন। [দেখুনঃ সূরা আল-বাকারাহঃ ২৫৫, সূরা আন-নাজমঃ ২৬, সূরা সাবাঃ ২৩]


(৫) উপরের তিনটি বাক্যে প্রকৃত সত্য বর্ণনা করা হয়েছিল, অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই তোমাদের রব। এখন বলা হচ্ছে, এ প্রকৃত সত্যের উপস্থিতিতে তোমাদের কোন ধরনের কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করা উচিত। মূলত রবুবীয়াত তথা বিশ্ব-জাহানের সার্বভৌম ক্ষমতা, নিরংকুশ কর্তৃত্ব ও প্রভুত্ব যখন পরোপুরি আল্লাহর আয়ত্বাধীন তখন এর অনিবার্য দাবী স্বরুপ মানুষকে তাঁরই বন্দেগী করতে হবে। [ইবন কাসীর] অন্য আয়াতেও আল্লাহ তা'আলা সেটা বলেছেন, তিনি বলেন, “আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে, তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ। অতঃপর তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে? [সূরা আয-যুখরুফঃ ৮৭) আরও বলেন, “বলুন, সাত আসমান ও মহা-আরশের রব কে? অবশ্যই তারা বলবে, ‘আল্লাহ। বলুন, ‘তবুও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না? [সূরা আল-মুমিনুন: ৮৬-৮৭] তাছাড়া সূরা ইউনুসের এ আয়াতের আগের ও পরের আয়াতেও একই বক্তব্য এসেছে।


(৬) অর্থাৎ যখন এ সত্য তোমাদের সামনে প্রকাশ করে দেয়া হয়েছে এবং তোমাদের পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, এ সত্যের উপস্থিতিতে তোমাদের কি কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে তখন এরপরও কি তোমাদের চোখ খুলবে না এবং তোমরা এমন বিভ্রান্তির মধ্যে ডুবে থাকবে? তোমরা কি তোমাদের অস্বীকার ও গোড়ামীতেই রত থাকবে যে তোমরা মোটেই উপদেশ গ্রহণ করবে না? [আইসারুত তাফাসীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৩) নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেন, অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন,[1] তিনি প্রত্যেক কাজ পরিচালনা করে থাকেন।[2] তাঁর অনুমতি ছাড়া সুপারিশকারী কেউ নেই।[3] ঐ (স্রষ্টা ও পরিচালক) আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক। অতএব তোমরা তাঁর ইবাদত কর।[4] তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ করবে না?


তাফসীর:

[1] বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন সূরা আ’রাফের ৫৪নং আয়াতের টীকা।

[2] অর্থাৎ আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করে তিনি এমনিই ছেড়ে দেননি, বরং সারা বিশ্ব-জাহানকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করেন যে, কখনো পরস্পরের মাঝে কোন সংঘর্ষ হয় না। সকল বস্তু তাঁরই নির্দেশে নিজ নিজ কর্মে রত আছে।

[3] মুশরিক ও কাফের - যারা এখানে সম্বোধিত - তাদের বিশ্বাস ছিল যে, যে সকল মূর্তির তারা উপাসনা করে, তারা আল্লাহর নিকট তাদের জন্য সুপারিশ করবে এবং তাদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, সেখানে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ সুপারিশ করতে পারবে না। আর এই অনুমতিও একমাত্র তাদের জন্য দেওয়া হবে, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা পছন্দ করবেন। الأنبياء-২৮  (وَلاَ يَشفَعُونَ إِلاَّ لِمَن ارتَضَى)

النجم-২৬) (لا تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِنْ بَعْدِ أَنْ يَأْذَنَ اللهُ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَرْضَى)

[4] অর্থাৎ এমন আল্লাহ যিনি বিশ্ব-জগতের স্রষ্টা এবং তার পরিচালক ও ব্যবস্থাপক। এ ছাড়া সমস্ত এখতিয়ারের পরিপূর্ণ মালিক একমাত্র তিনিই। ফলে একমাত্র তিনিই উপাসনা পাওয়ার যোগ্য।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৩-৪ নং আয়াতের তাফসীর:



(الْعَرْشِ........ إِنَّ رَبَّكُمُ اللّٰهُ)



আল্লাহ তা‘আলা স্ব সত্ত্বায় আরশে সমুন্নত, এ সম্পর্কে সূরা আ‘রাফ এর ৫৪ নং আয়াতে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।



(يُدَبِّرُ الْأَمْرَ) আল্লাহ তা‘আলা আকাশ ও জমিন সৃষ্টি করার পর তিনি সমস্ত বিশ্বজাহানকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করেন যে, কখনো পরস্পরের মাঝে কোন সংঘর্ষ হয় না। প্রত্যেকে নিজ নিজ কর্মে অবিরত। তিনি তাতে দিয়েছেন জীবন, মৃত্যু, রিযিক। তিনি দিবা-রাত্রির পরিবর্তন করেন, মানুষের জন্য কষ্ট দূর করেন, যে চায় তাকে দেন ইত্যাদি কার্য তিনি পরিচালনা করেন।



(مَا مِنْ شَفِيْعٍ إِلَّا مِنْۭ بَعْدِ إِذْنِهِ)



আল্লাহ তা‘আলার অনুমতি ব্যতীত কেউ আল্লাহ তা‘আলার নিকট সুপারিশ করতে পারবে না। অথচ মক্কার কাফিরদের বিশ্বাস ছিল যে, তাদের দেবতারা তাদের জন্য আল্লাহ তা‘আলার দরবারে সুপারিশ করবে। যেমন তারা বলত:



(مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُوْنَآ إِلَي اللّٰهِ زُلْفٰي)



“আমরা তো এদের উপাসনা এজন্য করি, যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছে দেয়।” (সূরা যুমার ৩৯:৩)



অথচ আল্লাহ তা‘আলার অনুমতি ব্যতীত কারো পক্ষে এটা সম্ভব নয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা কুরআনের একাধিক জায়গায় বলেন:



(وَلَا يَشْفَعُوْنَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضٰي)



“তারা সুপারিশ করে শুধু তাদের জন্য যাদের প্রতি তিনি সন্তুষ্ট।” (সূরা আম্বিয়াহ ২১:২৮)



আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:



(لَا تُغْنِيْ شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِنْۭ بَعْدِ أَنْ يَّأْذَنَ اللّٰهُ لِمَنْ يَّشَا۬ءُ وَيَرْضٰي)



“তাদের কোন সুপারিশ কাজে আসবে না যতক্ষণ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা এবং যার প্রতি সন্তুষ্ট তাকে অনুমতি না দেন।” (সূরা নাজম ৫৩:২৬)



অতএব এসব আয়াত ও অনুরূপ হাদীস হতে প্রমাণিত হয় যে, কেউ সুপারিশ করার দাবি করলেই সুপারিশ করতে পারবে এমন নয়, বরং আল্লাহ তা‘আলার অনুমতি ছাড়া সুপারিশ সম্ভব নয়। আর আল্লাহ তা‘আলার অনুমতি পেতে হলে অবশ্যই তাঁর মনঃপুত এবং অপরাধমুক্ত হতে হবে। অনুরূপ যার জন্য সুপারিশ করা হবে তার ক্ষেত্রেও আল্লাহ তা‘আলার সম্মতি থাকতে হবে। সুতরাং সুপারিশের দাবি করাও সহজ নয় এবং সুপারিশের জন্য কারো কাছে ধরণা দেয়াও ঠিক নয়।



(إِلَيْهِ مَرْجِعُكُمْ)



‘তাঁরই নিকট তোমাদের সকলের প্রত্যাবর্তন’ মানুষের বিশ্বাস যে, আমরা যখন মরে যাব তখন আমাদের সব কিছু শেষ হয়ে যাবে। আমাদেরকে শাস্তি পেতে হবে না। অথচ আল্লাহ তা‘আলা অত্র আয়াতে বলেছেন যে, তোমাদের মৃত্যুর পর পুনরায় আমার নিকট তোমাদেরকে আসতে হবে। আর আমি যেহেতু প্রথমবার সৃষ্টি করেছি সেহেতু এমনটি মনে কর না যে, তোমাদের মৃত্যুর পর পুনরায় আমি তোমাদেরকে জীবিত করতে পারব না। এতে আমি পুরোপুরি সক্ষম। আর সেদিন আমি প্রত্যেককে তার কর্মের ফলাফল দেব। যেমন



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(فَمَنْ يَّعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَّرَه۫ - وَمَنْ يَّعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَّرَه۫)



“অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তাও দেখতে পাবে।” (সূরা যিলযাল ৯৯:৭-৮)



আর যে এতে অবিশ্বাস করবে তার জন্য শাস্তিস্বরূপ পানীয় হিসেবে গরম পানি থাকবে এবং এ অস্বীকারের কারণে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থাকবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(وَسُقُوْا مَا۬ءً حَمِيْمًا فَقَطَّعَ أَمْعَا۬ءَهُمْ)



“এবং যাদেরকে এমন ফুটন্ত পানি পান করানো হবে যা তাদের নাড়ি-ভুঁড়ি পর্যন্ত কেটে ফেলবে?” (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৫) তার সাথে তাদের জন্য আরো থাকবে পুঁজ।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(لَّا يَذُوْقُوْنَ فِيْهَا بَرْدًا وَّلَا شَرَابًا - إِلَّا حَمِيْمًا وَّغَسَّاقًا) ‏



“সেখানে তারা কোন প্রকার শীতলতার স্বাদও গ্রহণ করতে পারবে না, আর না কোন পানীয় বস্তুরও; ফুটন্ত পানি ও পুঁজ ব্যতীত।” (সূরা নাবা ৭৮:২৪-২৫)



আরো থাকবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি, আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(سَيُصِيْبُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا مِنْهُمْ عَذَابٌ أَلِيْمٌ)



“তাদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে তাদের ওপর শীঘ্রই যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি পতিত হবে।” (সূরা তাওবাহ ৯:৯০)



সুতরাং কিয়ামতের দিন তারাই সফলকাম হবে যারা সঠিক ঈমান ও সৎআমল নিয়ে যাবে, আর যারা আল্লাহ তা‘আলার সাথে কুফরী করেছে তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ছাড়া কিছুই থাকবে না।



আয়াত হতে শিক্ষনীয় বিষয়:



১. আল্লাহ তা‘আলার কাছে তাঁর অনুমতি ব্যতীত কেউ শাফা‘য়াত করতে পারবে না।

২. আল্লাহ তা‘আলা একমাত্র মা‘বূদ, তাই তাঁরই ইবাদত করা সকলের কর্তব্য।

৩. কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে।

৪. আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে পুনরায় জীবিত করবেন এবং তাদের প্রতিফল দেবেন।

৫. অবিশ্বাসীদের জন্য আখিরাতে রয়েছে কঠিন শাস্তি, ইত্যাদি।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তিনি সমস্ত জগতের প্রতিপালক। তিনি আসমানসমূহ ও যমীনকে ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন। বলা হয়েছে যে, এই দিন আমাদের দিনের মতই ছিল। আবার এ কথাও বলা হয়েছে যে, হাজার বছরের একটি দিন ছিল, যার বর্ণনা সামনে আসবে । তারপর তিনি বড় আরশের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলেন। আরশ হচ্ছে সমস্ত সৃষ্টবস্তুর মধ্যে সবচেয়ে বড় সৃষ্টবস্তু। ওটা লাল ইয়াকুতের তৈরী । অথবা এটাও হচ্ছে আল্লাহর একটি নূর। আল্লাহ তা'আলা হচ্ছেন সারা মাখলুকের পরিচালক, অভিভাবক এবং যামানতদার। তার রক্ষণাবেক্ষণ হতে যমীন ও আসমানের অণু পরিমাণ জিনিসও বাদ পড়ে না। তাঁর একদিকের মনোযোগ অন্য দিকের মনোযোগ থেকে বিরত রাখতে পারে না। তাঁর জন্যে কোন একটা ব্যাপার ভুলবশতঃ বাকী থাকতে পারে না। পাহাড়ে, সাগরে, লোকালয়ে এবং জঙ্গলে কোথাও কোন বড় তদবীর কোন ছোট তদবীরকে ভুলিয়ে রাখতে পারে না । ভূ-পৃষ্ঠে এমন কোন প্রাণী নেই যার আহারের দায়িত্ব আল্লাহ তা'আলার উপর অর্পিত নয়। কোন কিছু নড়লে বা কোন একটা পাতা ঝরলে তারও খবর তিনি রাখেন। যমীনের অন্ধকারে কোন অণু পরিমাণ জিনিসও এমন নেই বা সিক্ত এবং শুষ্ক এমন কিছু নেই যে তাঁর লাওহে মাহফুষে বা ইলমের কিতাবে বিদ্যমান নেই। যখন (আরবী) -এই আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন এমন এক বিরাট যাত্রীদল মুসলিমদের দৃষ্টিগোচর হয় যাদেরকে বেদুঈন মনে করা হয়েছিল। জনগণ তাদেরকে জিজ্ঞেস করেঃ “তোমরা কে?” তারা উত্তরে বলেঃ “আমরা জ্বিন জাতি। এই আয়াতের কারণে আমরা শহর হতে বেরিয়ে পড়েছি।`

আল্লাহ পাকের (আরবী) এই উক্তিটি তাঁর (আরবী) (২:২৫৫) ও (আরবী) (৫৩:২৬) এবং (আরবী) (৩৪:২৩) এই উক্তিগুলোর মতই।

(আরবী) অর্থাৎ ঐ লোকগুলো ইবাদতের জন্যে আল্লাহ তা'আলাকেই বিশিষ্ট করে নিয়েছে। আর হে মুশরিকরা! তোমরা ইবাদতে আল্লাহর সাথে তোমাদের অন্যান্য দেবতাদেরকেও শরীক করে নিচ্ছ! অথচ তোমরা ভালরূপেই জান যে, সৃষ্টিকর্তা হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ। তিনি ছাড়া আর কারো উপাসনা করা যেতে পারে না। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর- তাদেরকে কে সৃষ্টি করেছে। তবে (উত্তরে) অবশ্যই তারা বলবে- আল্লাহ (তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন)।` (৪৩৪ ৮৭) আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি বল (অর্থাৎ তুমি জিজ্ঞেস কর) সাতটি আকাশ ও বিরাট আরশের প্রতিপালক কে? (তবে উত্তরে) অবশ্যই তারা বলবে- আল্লাহই (এগুলোর প্রতিপালক), তুমি বলে দাও- তবুও কি তোমরা ভয় করছো না?” (২৩:৮৬-৮৭) এরূপ আরও আয়াত এর পূর্বেও আছে এবং পরেও আছে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।