সূরা ইউনুস (আয়াত: 2)
হরকত ছাড়া:
أكان للناس عجبا أن أوحينا إلى رجل منهم أن أنذر الناس وبشر الذين آمنوا أن لهم قدم صدق عند ربهم قال الكافرون إن هذا لساحر مبين ﴿٢﴾
হরকত সহ:
اَکَانَ لِلنَّاسِ عَجَبًا اَنْ اَوْحَیْنَاۤ اِلٰی رَجُلٍ مِّنْهُمْ اَنْ اَنْذِرِ النَّاسَ وَ بَشِّرِ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اَنَّ لَهُمْ قَدَمَ صِدْقٍ عِنْدَ رَبِّهِمْ ؕؔ قَالَ الْکٰفِرُوْنَ اِنَّ هٰذَا لَسٰحِرٌ مُّبِیْنٌ ﴿۲﴾
উচ্চারণ: আকা-না লিন্না-ছি ‘আজাবান আন আওহাইনাইলা-রাজুলিম মিনহুম আন আনযিরিন্না-ছা ওয়া বাশশিরিল্লাযীনা আ-মানূআন্না লাহুম কাদামা সিদকিন ‘ইনদা রাব্বিহিম কা-লাল কা-ফিরূনা ইন্না হা-যা-লাছা-হিরুম মুবীন।
আল বায়ান: এটা কি মানুষের জন্য আশ্চর্যের বিষয় যে, আমি তাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তির নিকট ওহী প্রেরণ করেছি যে, তুমি মানুষকে সতর্ক কর এবং মুমিনদেরকে সুসংবাদ প্রদান কর যে, তাদের রবের নিকট তাদের জন্য রয়েছে উচ্চ মর্যাদা। কাফিররা বলে, ‘এ তো স্পষ্ট যাদুকর’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২. মানুষের জন্য এটা কি আশ্চর্যের বিষয় যে, আমরা তাদেরই একজনের কাছে ওহী পাঠিয়েছি এ মর্মে যে, আপনি মানুষকে সতর্ক করুন(১) এবং মুমিনদেরকে সুসংবাদ দিন যে, তাদের জন্য তাদের রবের কাছে আছে উচ্চ মর্যাদা।(২) কাফিররা বলে, এ তো এক সুস্পষ্ট জাদুকর।
তাইসীরুল ক্বুরআন: মানুষের কাছে কি এটা আশ্চর্যের বিষয় যে, আমি তাদেরই মধ্যেকার একজন লোকের কাছে ওয়াহী পাঠিয়েছি যে, লোকদের সতর্ক করে দাও, আর যারা ঈমান আনে তাদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের কাছে আছে মহা মর্যাদা, (কিন্তু) কাফিররা বলে, ‘এ ব্যক্তি তো প্রকাশ্য যাদুকর’।
আহসানুল বায়ান: (২) লোকদের জন্য এটা কি বিস্ময়কর[1] যে, আমি তাদের মধ্য হতে একজনের নিকট অহী প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তুমি লোকদেরকে সতর্ক কর এবং বিশ্বাসীদেরকে এই সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে তাদের প্রতিপালকের নিকট উচ্চ মর্যাদা। [2] অবিশ্বাসীরা বলে, ‘এ ব্যক্তি তো নিঃসন্দেহে প্রকাশ্য যাদুকর।’[3]
মুজিবুর রহমান: লোকদের জন্য এটা কি বিস্ময়কর মনে হয়েছে যে, আমি তাদের মধ্য হতে একজনের নিকট অহী প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তুমি সকলকে ভয় প্রদর্শন কর এবং যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে এই সুসংবাদ দাও যে, তারা তাদের রবের নিকট পূর্ণ মর্যাদা লাভ করবে। কাফিরেরা বলতে লাগল যে, এ ব্যক্তিতো নিঃসন্দেহে প্রকাশ্য যাদুকর।
ফযলুর রহমান: মানুষের জন্য এটা কি একটা বিস্ময়ের ব্যাপার যে, আমি তাদের মধ্য থেকেই একজনের কাছে এই বলে ওহী পাঠিয়েছি যে, লোকদেরকে সতর্ক করো আর মুমিনদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য তাদের প্রভুর কাছে উচ্চ মর্যাদা (অথবা সৎকর্মের পুরস্কার) রয়েছে? তাই কাফেররা বলতে লাগল, “নিশ্চয়ই এ তো এক প্রকাশ্য যাদুকর।
মুহিউদ্দিন খান: মানুষের কাছে কি আশ্চর্য লাগছে যে, আমি ওহী পাঠিয়েছি তাদেরই মধ্য থেকে একজনের কাছে যেন তিনি মানুষকে সতর্ক করেন এবং সুসংবাদ শুনিয়ে দেন ঈমনাদারগণকে যে, তাঁদের জন্য সত্য মর্যাদা রয়েছে তাঁদের পালনকর্তার কাছে। কাফেররা বলতে লাগল, নিঃসন্দেহে এ লোক প্রকাশ্য যাদুকর।
জহুরুল হক: এ কি মানবগোষ্ঠীর জন্য বিস্ময়ের ব্যাপার যে তাদেরই মধ্যেকার একজন মানুষকে আমরা প্রত্যাদেশ দিয়েছি এই ব’লে -- "তুমি মানবজাতিকে সতর্ক করো, আর যারা ঈমান এনেছে তাদের সুসংবাদ দাও যে তাদের জন্য তাদের প্রভুর কাছে রয়েছে সুনিশ্চিত পদমর্যাদা"? অবিশ্বাসীরা বলে -- "নিঃসন্দেহ এ একজন জলজ্যান্ত জাদুকর।"
Sahih International: Have the people been amazed that We revealed [revelation] to a man from among them, [saying], "Warn mankind and give good tidings to those who believe that they will have a [firm] precedence of honor with their Lord"? [But] the disbelievers say, "Indeed, this is an obvious magician."
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২. মানুষের জন্য এটা কি আশ্চর্যের বিষয় যে, আমরা তাদেরই একজনের কাছে ওহী পাঠিয়েছি এ মর্মে যে, আপনি মানুষকে সতর্ক করুন(১) এবং মুমিনদেরকে সুসংবাদ দিন যে, তাদের জন্য তাদের রবের কাছে আছে উচ্চ মর্যাদা।(২) কাফিররা বলে, এ তো এক সুস্পষ্ট জাদুকর।
তাফসীর:
(১) এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা কাফের মুশরিকদের একটি সন্দেহ ও তার উত্তর তুলে ধরেছেন। সন্দেহটি ছিল এই যে, কাফেররা তাদের মূর্খতার দরুন সাব্যস্ত করে রেখেছিল যে, আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে যে নবী বা রাসূল আসবেন তিনি মানুষ হবেন না। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে তাদের এ সন্দেহকে উল্লেখ করা হয়েছে। আর এটা যে শুধু কুরাইশ কাফেরদের সন্দেহ তা নয়। পূর্ববর্তী উম্মতরাও তা বলেছিল। তারা বলেছিল “মানুষই কি আমাদেরকে পথের সন্ধান দেবে?” [সূরা আত-তাগাবুনঃ ৬]
নূহ ও হুদ এর কাওমও এ রকম বিস্মিত হয়েছিল। তখন নবীগণ তার জবাবে বলেছেন, “তোমরা কি বিস্মিত হচ্ছ যে, তোমাদেরই একজনের মাধ্যমে তোমাদের রবের কাছ থেকে তোমাদের কাছে উপদেশ এসেছে?” [সূরা আল-আরাফঃ ৬৩; ৬৯] অনুরূপভাবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাওমও বলেছে, “সে কি বহু ইলাহকে এক ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে? এটা তো এক অত্যাশ্চর্য ব্যাপার! [সূরা সোয়াদঃ ৫] ইবন আব্বাস বলেন, যখন আল্লাহ্ তাআলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রাসূল হিসেবে পাঠালেন তখন আরবরা সেটা মানতে অস্বীকার করেছিল। অথবা তাদের মধ্যে অনেকেই এ জন্য অস্বীকার করেছিল যে, আল্লাহ মহান যে তিনি তাঁর রাসূল বানাবেন মুহাম্মাদের মত একজন মানুষকে। তিনি এটা করতেই পারেন না। তখন এ আয়াত নাযিল হয়। [ইবন কাসীর]
আল্লাহ তা'আলা তাদের এই ভ্রান্ত ধারণার উত্তর কুরআনুল কারীমের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন প্রকারে দিয়েছেন। এক আয়াতে বলেছেনঃ “যমীনের উপর যদি ফিরিশতারা বাস করত, তাহলে আমি তাদের জন্য কোন ফিরিশতাকেই রাসূল বানিয়ে পাঠাতাম।” [আল-ইসরাঃ ৯৫] যার মূল কথা হল এই যে, রিসালাতের উদ্দেশ্য ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না রাসূল এবং যাদের মধ্যে রাসূল পাঠানো হচ্ছে এ দুয়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক থাকে। বস্তুতঃ ফিরিশতার সম্পর্ক থাকে ফিরিশতাদের সাথে আর মানুষের সম্পর্ক থাকে মানুষের সাথে। যখন মানুষের জন্য রাসূল পাঠানোই উদ্দেশ্য, তখন কোন মানুষকেই রাসূল বানানো উচিত।
(২) এ বাক্যের দ্বারা সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। ইবনে আব্বাস বলেন, এর অর্থ ‘যিকরুল আউয়াল’ তথা লাওহে মাহফুযে তাদের তাকদীরে সৌভাগ্যবান লিখা হয়েছে। অন্য বর্ণনায় তিনি বলেন, তারা যে উত্তম আমল পেশ করেছে সে জন্য উত্তম প্রতিদান রয়েছে। [ইবন কাসীর; সাদী] অতএব, বাক্যের অর্থ দাঁড়ালো এই যে, ঈমানদারদেরকে এ সুসংবাদ দিয়ে দিন যে, তাদের জন্য তাদের পালনকর্তার কাছে অনেক বড় সম্মানিত মর্যাদা রয়েছে যা তারা নিশ্চিতই পাবে এবং পাওয়ার পর কখনো তা শেষ হয়ে যাবে না। চিরকালই তারা সে সম্মানিত মর্যাদায় অধিষ্ঠিত থাকবেন। এ আয়াতের তাফসীর যদি আমরা কুরআনের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই যে, এর সমার্থে সূরা আল-কাহফের ২-৩ নং আয়াতে এসেছে, যেখানে বলা হয়েছে, তারা সেখানে সর্বদা অবস্থান করবে। মুজাহিদ বলেন, এর দ্বারা পূর্বে তারা যে আমল করেছে যেমন, তাদের সালাত, সাওম, সাদকা, তাসবীহ ইত্যাদি বোঝানো হয়েছে। [ইবন কাসীর]
কোন কোন মুফাসসির বলেছেন, এক্ষেত্রে صدق শব্দ প্রয়োগের মাঝে এমন ইশারা করাও উদ্দেশ্য যে, জান্নাতের এসব উচ্চমর্যাদা একমাত্র সত্যনিষ্ঠা ও ইখলাসের কারণেই পাওয়া যাবে। কোন কোন মুফাসসির বলেন এখানে যাবতীয় কল্যাণ উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। মুজাহিদ রাহেমাহুল্লাহ বলেনঃ এখানে (قَدَمَ صِدْقٍ) বলে তাদের সৎকর্মকাণ্ডসমূহকেই বুঝানো হয়েছে। যেমন, তাদের সালাত, সাওম, সাদকা, তাসবীহ ইত্যাদি। [ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২) লোকদের জন্য এটা কি বিস্ময়কর[1] যে, আমি তাদের মধ্য হতে একজনের নিকট অহী প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তুমি লোকদেরকে সতর্ক কর এবং বিশ্বাসীদেরকে এই সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে তাদের প্রতিপালকের নিকট উচ্চ মর্যাদা। [2] অবিশ্বাসীরা বলে, ‘এ ব্যক্তি তো নিঃসন্দেহে প্রকাশ্য যাদুকর।’[3]
তাফসীর:
[1] এটি বিস্ময়ের জন্য অস্বীকৃতিমূলক জিজ্ঞাসা, যাতে তিরস্কার বা ধমকও শামিল আছে। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা মানব জাতির মধ্য হতে একজনকে রসূল করে প্রেরণ করেছেন; এতে আশ্চর্য হওয়া উচিত নয়। কারণ, রসূল তাদের স্বজাতি হওয়ার কারণে তিনি সঠিকভাবে তাদেরকে পথপ্রদর্শন করতে সক্ষম হবেন। যদি তিনি স্বজাতি না হয়ে ফিরিশতা বা জীন হতেন, তাহলে উভয় অবস্থাতেই রিসালাতের আসল উদ্দেশ্য সাধন হত না। কারণ মানুষ তাঁর সাথে একাত্মতাবোধ না করে ভিন্নতাবোধ করত। দ্বিতীয়ত তারা তাঁকে দেখতেও পেত না। আর যদি কোন জীন অথবা ফিরিশতাকে মানুষরূপে প্রেরণ করতাম, তবে ঐ একই প্রশ্ন আসত যে, এরাও তো আমাদের মতই মানুষ। ফলে তাদের উক্ত বিস্ময়ের কোন অর্থই থাকত না।
[2] قَدَمَ صِدْقٍ এর অর্থ ‘উচ্চ মর্যাদা’ উত্তম প্রতিদান ও ঐ সকল নেক আমল যা একজন মু’মিন তার জীবনে করে থাকে।
[3] কাফেররা মহানবী (সাঃ)-কে অস্বীকার করার যখন কোন পথ পেত না, তখন তারা এই বলে নিজেদেরকে বাঁচাতে চাইত যে, এ তো একজন যাদুকর। (নাউযু বিল্লাহ)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: নামকরণ:
’يُوْنُسَ‘ ইউনুস (عليه السلام) একজন নাবী, তাঁর পিতার নাম মাত্তা। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: কোন মানুষের জন্য এ কথা বলা সমীচীন নয় যে, সে বলবে: আমি “ইউনুস ইবনু মাত্ত্বা” থেকে উত্তম। (সহীহ বুখারী হা: ৩৪১৩)। ইউনুস (عليه السلام) সম্পর্কে কুরআনের ৬টি সূরার ১৮টি আয়াতে বর্ণনা এসেছে। অত্র সূরায় তাঁর নাম ইউনুস, সূরা আম্বিয়ার ৮৭ নং আয়াতে যুন-নূন (ذو النون) এবং সূরা কলামের ৪৮ নং আয়াতে তাঁকে সাহেবুল হূত
(صاحب الحوت)
বলা হয়েছে। ‘নূন’ ও ‘হূত’ উভয়ের অর্থ মাছ। যুন-নূন ও সাহেবুল হূত অর্থ মাছওয়ালা। একটি বিশেষ ঘটনার প্রেক্ষিতে তিনি উক্ত নামে পরিচিত হন।
অত্র সূরার ৯৮ নং আয়াতে ইউনুস (عليه السلام) ও তাঁর জাতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে, সেখান থেকেই উক্ত নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে।
এ সূরাতেও কুরআনুল কারীম এবং ইসলামের মৌলিক উদ্দেশ্যাবলী তাওহীদ, রিসালাত, আখেরাত ইত্যাদি বিষয়ের যথার্থতা বিশ্বচরাচর এবং তার মধ্যকার পরিবর্তন-পরিবর্ধনশীল ঘটনাবলীর মাধ্যমে প্রমাণ দেখিয়ে উত্তমরূপে বোধগম্য করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সাথে সাথে কিছু উপদেশমূলক, ঐতিহাসিক ঘটনাবলী এবং কাহিনীর অবতারণা করে সে সমস্ত লোকদেরকে সতর্ক করা হয়েছে যারা আল্লাহ তা‘আলার এসব নিদর্শন দেখেও তাঁকে ভয় করে না। পৃথিবীর মানুষের মধ্য হতে আল্লাহ তা‘আলার মনোনিত একজন পুরুষ ব্যক্তিকে রিসালাত দান করে নাবী হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে এটা অনেকের কাছে আশ্চর্যজনক মনে হওয়া, মু’মিনদের উত্তম পরিণতি, চন্দ্র-সূর্য সৃষ্টির হিকমত এবং শাস্তিকে বিলম্ব করার কারণ সম্পর্কে তুলে ধরা হয়েছে। আরো তুলে ধরা হয়েছে অধিকাংশ মানুষের কিছু বদ অভ্যাস, বাতিল মা‘বূদের ইবাদতকারীদের আশা, দুনিয়ার জীবনের উপমা, মু’মিনরা আখিরাতে আল্লাহ তা‘আলাকে দেখতে পাওয়া, মক্কার মুশরিকদের তাওহীদে রুবুবিয়্যাহর স্বীকৃতি এবং কুরআনের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে। নাবীরা নিজেদের কোন উপকার বা ক্ষতি করার শক্তি রাখেন না, আল্লাহ তা‘আলার ওলীদের পরিচয় এবং তাদের উত্তম পরিণতি, কয়েকজন নাবীদের ও তাদের শত্র“দের মাঝে সংঘঠিত ঘটনা এবং তাওহীদের উলুহিয়্যাহর বিবৃতি দিয়ে সূরা শেষ করা হয়েছে।
১ ও ২ নং আয়াতের তাফসীর:
الر (আলিফ-লাম-রা) এ জাতীয় “হুরূফুল মুক্বাত্বাআত” বা বিচ্ছিন্ন অক্ষর সম্পর্কে সূরা বাকারার শুরুতে আলোচনা করা হয়েছে। এগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন।
(تِلْكَ اٰيَاتُ الْكِتَابِ الْحَكِيْمِ)
‘এগুলো জ্ঞানগর্ভ কিতাবের আয়াত।’ অর্থাৎ এতে আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক জিনিসের ন্যায়সঙ্গতভাবে ফায়সালা দিয়েছেন, যাতে করে মানুষের মধ্যে কোন প্রকার দ্বন্দ্ব-বিরোধ না দেখা দেয়। الحكيم শব্দটি পবিত্র কুরআনে কয়েকটি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। একটি অর্থ যা অনুবাদে নিয়ে আসা হয়েছে। যেমন
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَالْقُرْاٰنِ الْحَكِيْمِ)-
শপথ প্রজ্ঞাময় কুরআনের। (সূরা ইয়াসীন ৩৬:২)
এই শব্দটি حاكم বা ফায়সালাকারী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(ذٰلِكُمْ حُكْمُ اللّٰهِ ط يَحْكُمُ بَيْنَكُمْ ط وَاللّٰهُ عَلِيْمٌ حَكِيْمٌ)
“এটাই আল্লাহর বিধান; তিনি তোমাদের মধ্যে ফায়সালা করে থাকেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাবান।” (সূরা মুমতাহিনা ৬০:১০)
(أَكَانَ لِلنَّاسِ عَجَبًا أَنْ أَوْحَيْنَا.... )
‘মানুষের জন্য এটা কি আশ্চর্যের বিষয়’ মূলত এটি একটি বিস্ময়কর অস্বীকৃতিমূলক তিরস্কার ও ধমক সম্বলিত জিজ্ঞাসা। আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতির মধ্য হতে একজনকে রাসূল বানিয়ে পাঠিয়েছেন এতে অবাক হবার কিছুই নেই। কারণ, মানব জাতির মধ্য হতে রাসূল আগমনের ফলে তিনি তাদেরকে সঠিকভাবে পথ প্রদর্শন করতে সক্ষম হবেন। যদি তিনি স্বজাতি না হয়ে অন্য জাতির যেমন ফেরেশতা বা জিন জাতি হতে প্রেরিত হতেন তাহলে রিসালাতের প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হত না। কারণ, তখন তাঁর মতের সাথে মানুষের মতের ভিন্নতা দেখা দিত। তিনি রক্ত মাংসের মানুষের দুঃখ-কষ্ট, চাহিদা ইত্যাদি অনুভব করতে পারতেন না। ফলে মানুষের প্রকৃতি ও স্বভাব অনুপাতে বিধি-বিধান ও ফায়সালা দিতে পারতেন না। আল্লাহ তা‘আলা এখানে মানুষদেরকে ধমকস্বরূপ বলেছেন যে, এটা বিস্ময়ের ব্যাপার নয়। পক্ষান্তরে, যারা আশ্চর্য না হয়ে ঈমান আনবে তাদের জন্যই তাদের রবের নিকট রয়েছে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন জান্নাত। তারাই হল মু’মিন, আর কাফিররা শুধু অবিশ্বাসই করে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. কুরআনকে বিশ্বাস করার মাধ্যমে ওয়াহীর স্বীকৃতি দেয়া।
২. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নবুওয়াতকে স্বীকৃতি দেয়া। আরো স্বীকৃতি দেয়া যে, তিনি একজন মানুষ, জিন বা ফেরেশতা নন।
৩. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুধু সতর্ককারীরূপেই আসেননি, সুসংবাদ দানকারী হিসেবেও আগমন করেছেন।
৪. যারা সৎ আমল করে তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট প্রতিদান রয়েছে এ সুসংবাদ দেয়া ইত্যাদি।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১-২ নং আয়াতের তাফসীর:
যেগুলো সূরাসমূহের শুরুতে এসে থাকে সেগুলোর উপর আলোচনা ইতিপূর্বে হয়ে গেছে এবং সূরায়ে বাকারায় এর পুরোপুরি ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। আবু যুহা (রঃ) ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, (আরবী) আল্লাহ তা'আলার এই উক্তির ভাবার্থ হচ্ছে (আরবী)অর্থাৎ আমি আল্লাহ, আমি সব কিছু দেখতে রয়েছি। যহ্হাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজনও এ কথাই বলেছেন।
এটা হচ্ছে অতি সূক্ষ্ম তত্ত্বপূর্ণ কিতাবের আয়াতসমূহ। মুজাহিদ (রঃ)-এরও এটাই উক্তি। হাসান (রঃ) বলেন যে, কিতাব দ্বারা তাওরাত ও যনূরকে বুঝানো হয়েছে। কাতাদা (রঃ)-এর ধারণা এই যে, কিতাব দ্বারা কুরআনের পূর্ববর্তী সমস্ত আসমানী কিতাবকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু তাঁর এ ধারণা ভিত্তিহীন। আল্লাহ তাআলার উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ কাফিরদের বিস্ময়ের প্রতি লক্ষ্য করে আল্লাহ পাক বলেন, মানুষের মধ্য হতেই যদি রাসূল নির্বাচিত হয়। তাতে বিস্ময়ের কি আছে? যেমন মহান আল্লাহ অতীত যুগের কাফিরদের উক্তি নকল করে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কোন মানুষ কি আমাদেরকে হিদায়াত করবে?” (৬৪:৬) এখানে কাফিররা হুদ (আঃ) ও সালিহ (আঃ)-কে উদ্দেশ্য করে ঐ কথা বলেছিল । হুদ (আঃ) ও সালিহ (আঃ) তাদের কওমকে সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ “তোমাদের মধ্যকার এক ব্যক্তির উপর তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে অহী অবতীর্ণ করা হয়েছে এতে কি তোমরা বিস্মিত হয়েছো?”
কুরায়েশ কাফিরদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “(কাফিররা বলে) সে (মুহাম্মাদ সঃ) কি এতগুলো উপাস্যের স্থলে মাত্র একজন উপাস্য করে দিলো? বাস্তবিকই এটা তো বড় বিস্ময়কর ব্যাপার বটে!”
যহহাক (রঃ) ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা যখন মুহাম্মাদ (সঃ)-কে রাসূল করে পাঠালেন তখন আরবরা তাঁকে অস্বীকার করে বসলো এবং বলতে লাগলো- আল্লাহ তো এর চেয়ে অনেক বড় যে তিনি মুহাম্মাদের ন্যায় মানুষকে রাসূল করে পাঠাবেন। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেন যে, এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই।
(আরবী) এই উক্তির ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রথম বর্ণনাতেই সত্যতা স্বীকার করে নেয়া এবং সৌভাগ্য লাভ করা। আর নিজের আমলের উত্তম প্রতিদান লাভ করা। এটা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ তা'আলার (আরবী) (১৮:২) এই উক্তির সঙ্গে সাদৃশ্যযুক্ত অর্থাৎ “যেন তিনি তাদেরকে যুদ্ধ ও কঠিন শাস্তি হতে ভয় প্রদর্শন করেন।” (আরবী) (আরবী) -এর ব্যাপারে মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা উত্তম আমল বুঝানো হয়েছে। যেমন সালাত, সিয়াম, সাদকা, তাসবীহ এবং রাসূল (সঃ)-এর শাফাআত। যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) এবং মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রঃ) এরূপই বলেছেন। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা (আরবী) উদ্দেশ্য। ইবনে জারীর (রঃ) মুজাহিদ (রঃ)-এর অভিমত সমর্থন করে এর দ্বারা (আরবী) ‘উত্তম আমল’ ভাবার্থ নিয়েছেন। যেমন (আরবী) এ কথা বলা হয়। যেমন হাসসান (রাঃ)-এর কবিতায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের আমল এবং আমাদের রীতিনীতি আপনার সাথে সত্য ও সঠিকভাবে রয়েছে, আর আল্লাহর আনুগত্যের ব্যাপারে আমাদের পরবর্তীরা পূর্ববর্তীদের অনুসারী।
আল্লাহপাকের উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ যদিও আমি তাদেরই মধ্য হতে একজন লোককে সুসংবাদদাতা ও ভয়প্রদর্শনকারী রূপে প্রেরণ করেছি তবুও ঐ কাফিররা বলে-এই ব্যক্তি তো অবশ্যই একজন প্রকাশ্য যাদুকর। এই ব্যাপারে তারা সম্পূর্ণরূপে মিথ্যাবাদী।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।