সূরা আত-তাওবা (আয়াত: 69)
হরকত ছাড়া:
كالذين من قبلكم كانوا أشد منكم قوة وأكثر أموالا وأولادا فاستمتعوا بخلاقهم فاستمتعتم بخلاقكم كما استمتع الذين من قبلكم بخلاقهم وخضتم كالذي خاضوا أولئك حبطت أعمالهم في الدنيا والآخرة وأولئك هم الخاسرون ﴿٦٩﴾
হরকত সহ:
کَالَّذِیْنَ مِنْ قَبْلِکُمْ کَانُوْۤا اَشَدَّ مِنْکُمْ قُوَّۃً وَّ اَکْثَرَ اَمْوَالًا وَّ اَوْلَادًا ؕ فَاسْتَمْتَعُوْا بِخَلَاقِهِمْ فَاسْتَمْتَعْتُمْ بِخَلَاقِکُمْ کَمَا اسْتَمْتَعَ الَّذِیْنَ مِنْ قَبْلِکُمْ بِخَلَاقِهِمْ وَ خُضْتُمْ کَالَّذِیْ خَاضُوْا ؕ اُولٰٓئِکَ حَبِطَتْ اَعْمَالُهُمْ فِی الدُّنْیَا وَ الْاٰخِرَۃِ ۚ وَ اُولٰٓئِکَ هُمُ الْخٰسِرُوْنَ ﴿۶۹﴾
উচ্চারণ: কাল্লাযীনা মিন কাবলিকুম কা-নূআশাদ্দা মিনকুম কুওওয়াতাওঁ ওয়া আকছারা আমওয়ালাওঁ ওয়া আওলা-দান ফাছতামতা‘ঊ বিখালা-কিহিম ফাছতামতা‘তুম বিখালা-কিকুম কামাছতামতা‘আল্লাযীনা মিন কাবলিকুম বিখালা-কিহিম ওয়া খুদতুম কাল্লাযী খা-দূ উলাইকা হাবিতাত আ‘মা-লুহুম ফিদ দুনইয়া-ওয়াল আ-খিরাতি ওয়া উলাইকা হুমুল খা-ছিরূন।
আল বায়ান: তাদের মত, যারা তোমাদের পূর্বে ছিল, তারা ছিল তোমাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী, ধন-সম্পদ ও সন্তানাদিতে অধিক। ফলে তারা তাদের অংশ ভোগ করেছে, আর তোমরাও তোমাদের অংশ ভোগ করেছ, যেমনিভাবে তোমাদের পূর্বে যারা ছিল তারা তাদের অংশ ভোগ করেছে। আর তোমরা খেল-তামাশায় মত্ত হয়েছ, যেমনিভাবে তারা মত্ত হয়েছে। এদেরই আমলসমূহ নষ্ট হয়ে গিয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতে। আর তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৬৯. তাদের নত, যারা তোমাদের পূর্বে ছিল, তারা শক্তিতে তোমাদের চেয়ে প্রবল ছিল এবং তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি ছিল তোমাদের চেয়ে বেশী। অতঃপর তারা তাদের ভাগ্যে যা ছিল তা ভোগ করলে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীরা তাদের ভাগ্যে যা ছিল তা ভোগ করেছে। আর তোমরাও সেরূপ অনর্থক আলাপ-আলোচনায় লিপ্ত রয়েছ যেরূপ অনর্থক আলাপ-আলোচনায় তারা লিপ্ত ছিল।(১) ওরা তারাই যাদের আমল দুনিয়া ও আখেরাতে নিষ্ফল হয়ে গিয়েছে, আর তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।
তাইসীরুল ক্বুরআন: (তোমাদের কাজ-কারবার) তোমাদের আগের লোকেদের মতই, যারা ছিল তোমাদের চেয়ে অধিক শক্তির অধিকারী, আর ধন-মাল আর সন্তান-সন্ততিতেও তোমাদের চেয়ে অধিক সমৃদ্ধিশালী, তাদের প্রাপ্য অংশ তারা ভোগ করে গেছে, এখন তোমরাও তোমাদের প্রাপ্য অংশ ভোগ কর যেমন তোমাদের আগের লোকেরা তাদের প্রাপ্য অংশ ভোগ করেছে, আর তোমরা অনর্থক কথাবার্তায় লিপ্ত আছ যেমন তারা অনর্থক কথাবার্তায় লিপ্ত ছিল, এরাই হল তারা দুনিয়া ও আখেরাতে যাদের কাজ-কর্ম নিস্ফল হয়ে গেছে, আর তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।
আহসানুল বায়ান: (৬৯) (তোমরাও) তোমাদের পূর্ববর্তীদের মত,[1] যারা শক্তি, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে ছিল তোমাদের চেয়ে অনেক বেশী; ফলতঃ তারা নিজেদের (দ্বীনী) অংশ উপভোগ করেছে। অতঃপর তোমরাও তোমাদের (দ্বীনী) অংশ উপভোগ করেছ,[2] যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীগণ নিজেদের অংশ উপভোগ করেছে। আর তোমরাও সেইরূপ (অন্যায়) আলাপ-আলোচনায় নিমগ্ন হয়েছ, যেরূপ তারা হয়েছিল।[3] দুনিয়াতে ও আখেরাতে ওদের (নেক) কর্মসমূহ বিনষ্ট হয়ে গেছে, আর ওরাই হল ক্ষতিগ্রস্ত। [4]
মুজিবুর রহমান: তোমাদের পূর্বে যারা গত হয়েছে, যারা ছিল তোমাদের চেয়ে অধিকতর শক্তিশালী এবং ধন-সম্পদ ও সন্তানাদীর প্রাচুর্য্যও ছিল তোমাদের চেয়ে অনেক বেশী; তারা তাদের (পার্থিব) অংশ দ্বারা যথেষ্ট উপকার লাভ করেছে। অতঃপর তোমরাও তোমাদের (পার্থিব) অংশ দ্বারা খুব উপকার লাভ করলে যেমন, তোমাদের পূর্ববর্তীরা নিজেদের অংশ দ্বারা ফল ভোগ করেছিল; আর তোমরাও ব্যাঙ্গাত্মক হাসি তামাসায় এরূপভাবে নিমগ্ন রয়েছ যেমন তারা নিমগ্ন হয়েছিল। তাদের কার্যসমূহ বিনষ্ট হয়ে গেছে দুনিয়ায় ও আখিরাতে, আর তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।
ফযলুর রহমান: (তোমরা) তোমাদের পূর্ববর্তীদের মতই। তারা শক্তিতে তোমাদের চেয়ে প্রবল ছিল এবং তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিও তোমাদের চেয়ে বেশি ছিল। তারা তাদের অংশ ভোগ করেছিল; তোমরাও তোমাদের অংশ ভোগ করেছো, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীরা তাদের অংশ ভোগ করেছিল এবং তারা যেমন অনর্থক কথাবার্তা বলেছিল তোমরাও তেমন অনর্থক কথাবার্তা বলেছো। তারাই সেই লোক, দুনিয়া ও আখেরাতে যাদের কর্মসমূহ নিষ্ফল হয়ে গিয়েছে আর তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।
মুহিউদ্দিন খান: যেমন করে তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তোমাদের চেয়ে বেশী ছিল শক্তিতে এবং ধন-সম্পদের ও সন্তান-সন্ততির অধিকারীও ছিল বেশী; অতঃপর উপকৃত হয়েছে নিজেদের ভাগের দ্বারা আবার তোমরা ফায়দা উঠিয়েছ তোমাদের ভাগের দ্বারা-যেমন করে তোমাদের পূর্ববর্তীরা ফায়দা উঠিয়েছিল নিজেদের ভাগের দ্বারা। আর তোমরাও বলছ তাদেরই চলন অনুযায়ী। তারা ছিল সে লোক, যাদের আমলসমূহ নিঃশেষিত হয়ে গেছে দুনিয়া ও আখেরাতে। আর তারাই হয়েছে ক্ষতির সম্মুখীন।
জহুরুল হক: তাদের মতো যারা ছিল তোমাদের পূর্ববর্তীকালে, -- তারা ছিল তোমাদের চাইতে বল-বিক্রমে বেশী প্রবল আর ধন-সম্পদে ও সন্তান সন্ততিতে বেশী সমৃদ্ধ। কাজেই তারা তাদের ভাগ ভোগ করে গেছে, অতএব তোমরাও তোমাদের ভাগ ভোগ করছো, যেমন ওরা যারা তোমাদের পূর্ববর্তী ছিল তারা ভোগ করেছিল তাদের ভাগ, আর তোমরাও বৃথা-বাক্যালাপ করছো যেমন তারা অনর্থক খোশ- গল্প করেছিল। এরাই -- এদের ক্রিয়াকলাপ ব্যর্থ হয়েছে ইহকালে ও পরকালে, আর এরা নিজেরাই হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত।
Sahih International: [You disbelievers are] like those before you; they were stronger than you in power and more abundant in wealth and children. They enjoyed their portion [of worldly enjoyment], and you have enjoyed your portion as those before you enjoyed their portion, and you have engaged [in vanities] like that in which they engaged. [It is] those whose deeds have become worthless in this world and in the Hereafter, and it is they who are the losers.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৬৯. তাদের নত, যারা তোমাদের পূর্বে ছিল, তারা শক্তিতে তোমাদের চেয়ে প্রবল ছিল এবং তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি ছিল তোমাদের চেয়ে বেশী। অতঃপর তারা তাদের ভাগ্যে যা ছিল তা ভোগ করলে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীরা তাদের ভাগ্যে যা ছিল তা ভোগ করেছে। আর তোমরাও সেরূপ অনর্থক আলাপ-আলোচনায় লিপ্ত রয়েছ যেরূপ অনর্থক আলাপ-আলোচনায় তারা লিপ্ত ছিল।(১) ওরা তারাই যাদের আমল দুনিয়া ও আখেরাতে নিষ্ফল হয়ে গিয়েছে, আর তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।
তাফসীর:
(১) আল্লাহ তা'আলা বলেন, এ লোকগুলো সে রকম আযাবই পেয়েছে যে রকম আযাব তাদের পূর্ববর্তীরা পেয়েছে। অথচ তারা এদের চেয়ে বেশী শক্তিশালী ও বেশী সম্পদ ও সন্তান সন্ততির অধিকারী ছিল। অতঃপর তারা ভোগ করেছে তাদের অংশ। হাসান বসরী বলেন, এখানে অংশ বলে দ্বীন বোঝানো হয়েছে। তারা তাদের দ্বীনের অংশ অনুসারে আমল করে চলেছে। যেমনিভাবে তোমরা তোমাদের দ্বীনের অংশ অনুসারে আমল করে চলছ। অনুরূপভাবে তোমরা মিথ্যা ও অসার আলোচনায় লিপ্ত হয়ে পড়েছ যেমনি তারা মিথ্যা ও অসার আলোচনায় লিপ্ত হয়েছিল। [ইবন কাসীর]
ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, এর অর্থ তারা প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে তোমরাও তা-ই করছ। আর তারা সন্দেহের বশবর্তী হয়ে দ্বীনের মধ্যে না জেনে কথা বলেছে, তোমরাও তা বলছ। তোমাদের ও তাদের পথভ্রষ্টতার ধরণ একই। কারণ দ্বীন নষ্ট হয় দু’ভাবে। কখনও বাতিল বিশ্বাস ও সে অনুসারে কথা বলার মাধ্যমে, আবার কখনও সঠিক জ্ঞানের বাইরে চলে বাতিল আমল করার মাধ্যমে। প্রথমটি হচ্ছে, বিদ’আত। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, খারাপ আমল। প্রথমটি সন্দেহ থেকে আসে আর দ্বিতীয়টি আসে প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে। বর্তমান যুগের ফাসেক লোকরাও পূর্ববর্তী লোকদের মতই এ দুটিতে লিপ্ত হয়ে পথভ্রষ্ট হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে। [ইগাসাতুল লাহফানঃ ২/১৬৬-১৬৭]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের নিয়মপদ্ধতি অনুসরণ করবে, প্রতি গজে গজে প্রতি হাতে হাতে তাদের অনুসরণ করবে। এমনকি যদি তারা ‘দব’ তথা ষাণ্ডার গর্তেও প্রবেশ করে থাকে তবে তোমরাও তাতে প্রবেশ করবে। সাহাবায়ে কিরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ইয়াহুদী ও নাসারা সম্প্রদায়? তিনি বললেন, তবে আর কারা? [বুখারী ৩৪৫৬]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৬৯) (তোমরাও) তোমাদের পূর্ববর্তীদের মত,[1] যারা শক্তি, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে ছিল তোমাদের চেয়ে অনেক বেশী; ফলতঃ তারা নিজেদের (দ্বীনী) অংশ উপভোগ করেছে। অতঃপর তোমরাও তোমাদের (দ্বীনী) অংশ উপভোগ করেছ,[2] যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীগণ নিজেদের অংশ উপভোগ করেছে। আর তোমরাও সেইরূপ (অন্যায়) আলাপ-আলোচনায় নিমগ্ন হয়েছ, যেরূপ তারা হয়েছিল।[3] দুনিয়াতে ও আখেরাতে ওদের (নেক) কর্মসমূহ বিনষ্ট হয়ে গেছে, আর ওরাই হল ক্ষতিগ্রস্ত। [4]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, তোমাদের অবস্থাও কর্ম এবং পরিণামের দিক দিয়ে পূর্ববর্তী কাফেরদের মতই। এখন অদৃশ্যভাবে বলার পরিবর্তে মুনাফিক্বদেরকে সরাসরি সম্বোধন করা হচ্ছে।
[2] خَلاق এর দ্বিতীয় অর্থ পার্থিব অংশও করা হয়েছে। অর্থাৎ, তোমাদের তকদীরে পার্থিব যতটা অংশ লিখে দেওয়া হয়েছিল তা উপভোগ করে নাও, যেমন তোমাদের পূর্বেকার লোকেরা নিজেদের পার্থিব অংশ উপভোগ করে নিয়েছে। অতঃপর মৃত্যু অথবা আযাবের শিকার হয়েছিল।
[3] অর্থাৎ, আল্লাহর আয়াত এবং তাঁর পয়গম্বরদেরকে মিথ্যা জানার ব্যাপারে। অথবা দ্বিতীয় অর্থ হল যে, দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও খেল-তামাশায় যেমন তারা মগ্ন ছিল, তোমাদের অবস্থাও ঠিক তাই। আয়াতে পূর্ববর্তী লোক বলতে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদেরকে বুঝানো হয়েছে। যেমন এক হাদীসে মহানবী (সাঃ) বলেছেন ‘‘অবশ্যই তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী জাতির পথ অনুসরণ করবে বিঘত বিঘত এবং হাত হাত পরিমাণ (সম্পূর্ণরূপে) এমনকি তারা যদি গোসাপের গর্তে প্রবেশ করে, তবে তোমরাও তাদের অনুসরণ করবে।’’ সাহাবাগণ বললেন, ‘আল্লাহর রসূল ইয়াহুদ ও খ্রীষ্টানরা?’ তিনি বললেন, ‘‘তবে আবার কারা?’’ (বুখারী, মুসলিম ও হাকেম)
[4] أولئك (ওরাই) বলতে উদ্দেশ্য সেই লোকেরা যারা উল্লিখিত অভ্যাসে ও গুণে গুণান্বিত; যাদের উপমা দেওয়া হচ্ছে তারা এবং যাদের জন্য উপমা দেওয়া হচ্ছে তারাও। অর্থাৎ, যেমন তারা ক্ষতিগ্রস্ত ও অসফল, তোমরাও সেইরূপ হবে। অথচ তারা তোমাদের চাইতে অধিক শক্তিশালী এবং মাল-ধন ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা অধিক সমৃদ্ধ ছিল। এ সত্ত্বেও তারা আল্লাহর আযাব থেকে পরিত্রাণ পায়নি; তাহলে তোমরা, যারা তাদের চাইতে সব দিক দিয়ে কম, তারা কেমন করে আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচতে পারবে?
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৬৭-৭০ নং আয়াতের তাফসীর:
এ আয়াতগুলোতে মুনাফিক নর-নারীদের পারস্পারিক সম্পর্ক, পরকালে তাদের অবস্থান এবং তাদের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা হয়েছে।
মুনাফিক নর-নারী পরস্পর পরস্পরের বন্ধু, একে অপরকে খারাপ কাজের নির্দেশ দেয়। তারা আল্লাহ তা‘আলার পথে ব্যয় করা থেকে নিজেদের হাতকে সঙ্কুচিত করে রাখে।
(نَسُوا اللّٰهَ فَنَسِيَهُمْ)
‘তারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, ফলে তিনিও তাদেরকে ভুলে গেছেন’ অর্থাৎ তারা আল্লাহ তা‘আলাকে ভুলে গেছে ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাদের সাথে এমন আচরণ করবেন যেন তিনি তাদেরকে ভুলে গেছেন।
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:
(وَقِيْلَ الْيَوْمَ نَنْسٰكُمْ كَمَا نَسِيْتُمْ لِقَا۬ءَ يَوْمِكُمْ هٰذَا وَمَأْوَاكُمُ النَّارُ وَمَا لَكُمْ مِّنْ نّٰصِرِيْنَ)
“আর বলা হবেঃ আজ আমি তোমাদেরকে ভুলে যাব যেমন তোমরা এই দিবসের সাক্ষাতকে ভুলে গিয়েছিলে। তোমাদের আশ্রয়স্থল জাহান্নাম এবং তোমাদের কোন সাহায্যকারী থাকবে না।”(সূরা জাসিয়া ৪৫:৩৪)
এসব কাফির মুনাফিকদের জন্য আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নাম প্রস্তুত করে রেখেছেন। এদের অবস্থা ও কর্ম এবং পরিণামের দিক দিয়ে পূর্ববর্তী কাফিরদের মতই।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: যার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ! তোমরা অবশ্যই তাদের অনুসরণ করবে- বিঘতে বিঘতে, হাতে হাতে ও গজে গজে। এমনকি যদি তারা গুই সাপের গর্তে প্রবেশ করে তাহলে তোমরাও তাতে প্রবেশ করবে (অর্থাৎ হুবহু অনুসরণ করবে)। সাহাবীগণ বললেন: তারা কারা? তারা কি আহলে কিতাব (ইয়াহূদ ও খ্রিস্টান)? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, তাহলে আর কারা? আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন: তোমরা ইচ্ছা করলে এ আয়াত
(كَالَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِكُمْ كَانُوْآ أَشَدَّ مِنْكُمْ قُوَّةً .....كَمَا اسْتَمْتَعَ الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِكُمْ بِخَلَاقِهِمْ)
“তোমরাও তোমাদের পূর্ববর্তীদের মত যারা শক্তিতে তোমাদের অপেক্ষা প্রবল ছিল এবং যাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি ছিল তোমাদের অপেক্ষা অধিক, এবং তারা তাদের ভাগ্যে যা ছিল তা ভোগ করেছে; তোমাদের ভাগ্যে যা ছিল তোমরাও তা ভোগ করলে।” (সূরা তাওবাহ ৯:৬৯) তেলাওয়াত করতে পার। (সহীহ বুখারী হা: ৭৩২০, সহীহ মুসলিম হা: ২৬৬৯)
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা এসব কাফির-মুনাফিকদেরকে পূর্ববর্তী অবাধ্য জাতিসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, তাদের কাছে নাবী-রাসূলগণ আমার নিদর্শনাবলী নিয়ে আগমন করেছিল কিন্তু তারা তাদের কথায় কর্ণপাত করেনি। ফলে তাদের জুলুমের কারণে তাদের ওপর মর্মান্তিক শাস্তি আপতিত হয়েছিল। তাদের অন্যতম নূহ (আঃ)-এর জাতি ও কওমে আদ তথা হূদ (আঃ)-এর জাতি। আল্লাহ তা‘আলার গযবে ধ্বংসপ্রাপ্ত বিশ্বের প্রধান ছয়টি জাতির মধ্যে নূহ (আঃ)-এর পরে আ‘দ ছিল দ্বিতীয় জাতি। এরা খুব দুর্ধর্ষ, শক্তিশালী, সুঠামদেহী ও বিরাট বপুস¤পন্ন ছিল। হূদ (আঃ) তাদেরকে শির্ক বর্জন করে সার্বিক জীবনে তাওহীদ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে মূর্তিপূজা ত্যাগ করার এবং জুলুম ও অত্যাচার পরিহার করে ন্যায় সুবিচারের পথে চলার উদাত্ত আহ্বান জানান। হূদ (আঃ) একজন তাদের মতই মানুষ, কিন্তু তারা বাপ-দাদা ইত্যাদির দোহাই দিয়ে দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে। ফলে প্রবল ঝড়ঝঞ্ঝার শাস্তি দিয়ে তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। যা সাত রাত ও সাত দিন একাধারে প্রবাহমান ছিল। এতে তাদের লাশগুলো খেজুর গাছের কাণ্ডের মত মাটিতে পড়েছিল। এদের কথা বিস্তারিতভাবে সূরা আ‘রাফের ৬৫-৭২নং আয়াাতের আলোচনা করা হয়েছে।
وَّثَمُوْدَ কওমে সামূদ সালেহ (আঃ)-এর জাতি। আদ জাতির ধ্বংসের প্রায় ৫০০ বছর পরে সালেহ (আঃ) সামূদ জাতির প্রতি নাবী হিসেবে প্রেরিত হন। (তারীখুল আম্বিয়া ১/৪৯) আদ জাতির ধ্বংসের পর সামূদ জাতি তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়। তারাও আদ জাতির মত শক্তিশালী ও বীরের জাতি ছিল। তারা প্রস্তর খোদাই ও স্থাপত্য বিদ্যায় খুবই পারশর্দী ছিল। ভীষণ ভূমিকম্প এবং ওপর থেকে বিকট ও ভয়াবহ এক গর্জন দিয়ে তাদেরকে ধ্বংস করা হয়। ফলে সবাই যার যার স্থানে একযোগে অধোমুখী হয়ে ভূতলশায়ী হল (সূরা আ‘রাফ ৭৮, হূদ ৬৭-৬৮) এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত হল এমনভাবে যেন তারা কোনদিন সেখানে বসবাস করেনি। এ সম্পর্কে সূরা আ‘রাফের ৭৩-৭৯ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় আলোচনা করা হয়েছে।
(اَصْحٰبِ مَدْیَنَ)
‘মাদইয়ান অধিবাসী’ উদ্দেশ্য হল শুআইব (আঃ)-এর জাতি। পবিত্র কুরআনের ১০টি সূরায় ৫৩টি আয়াতে তাঁর সম্পর্কে আলোচনা উল্লেখ রয়েছে। লূত (আঃ)-এর অবাধ্য জাতি ধ্বংসের অনতিকাল পরেই তাঁকে নবুওয়াত দিয়ে মাদইয়ানবাসীর হিদায়াতের জন্য প্রেরণ করা হয়েছিল। মাদইয়ান হল লূত সাগরের নিকটবর্তী সিরিয়া ও হিজাযের সীমান্তবর্তী একটি জনপদের নাম। যা অদ্যাবধি পূর্ব জর্ডানের সামুদ্রিক বন্দর ‘মো‘আন’ (معان ) এর অদূরে বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলার গযবে ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রধান ছয়টি প্রাচীন জাতির মধ্যে ৫ম জাতি হল ‘আহলে মাদইয়ান’। তাদের অপরাধ ছিল তারা আল্লাহ তা‘আলার সাথে শির্ক করত, রাহাজানি করত, লোকদেরকে ওজনে কম দিত এবং নিজেরা মানুষের নিকট থেকে নেয়ার সময় বেশি নিত। তাদের এই সীমালংঘনের কারণে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে শাস্তি দিয়েছেন। এমনকি তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এদের সম্পর্কে সূরা আ‘রাফের ৮৫-৯৩ ও হূদের ৮৪-৯৫ নং আয়াতে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
الْمُؤْتَفِکٰتِ অর্থাৎ উল্টো-পাল্টাকৃত। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায় যাদের জনপদের নাম ছিল সামূদ। এদেরকে প্রথমত আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ করা হয়েছিল। দ্বিতীয়ত: তাদের জনপদকে উল্টো-পাল্টা করে দেয়া হয়েছিল। এ কারণে তাদেরকে আসহাবে মুতাফিকাত বলা হয়। সুতরাং এসব ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত, আল্লাহ তা‘আলা কেন তাদের বিবরণ আমাদের কাছে তুলে ধরেছেন? তা এজন্যই যে, যাতে আমরা সতর্ক হই এবং তাদের মত আচরণ না করি।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. মুনাফিকরা পরস্পর পরস্পরের সহযোগী এবং তাদের কাজ-কর্ম ও চাল-চলন সাদৃশ্যপূর্ণ।
২. সৎ কাজে বাধা দেয়া অসৎ কাজের নির্দেশ দেয়া মুনাফিকদের আলামত।
৩. অনেকে সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির কারণে সত্য গ্রহণে বাধাগ্রস্ত হয়।
৪. পূর্ববর্তী জাতিদের পরিণতি থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন, এই লোকদের উপরেও আল্লাহর শাস্তি পৌঁছে, যেমন এদের পূর্ববর্তীদের উপর তার শাস্তি পৌঁছেছিল। হাসান (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে দ্বীন। পূর্ববর্তী লোকেরা যেমন মিথ্যা ও বাতিলের মধ্যে নিমজ্জিত ছিল, তেমনই এরাও ওর মধ্যে নিমজ্জিত রয়েছে। এদের এই অসৎ আমল অকেজো ও মূল্যহীন হয়ে গেল। তারা না দুনিয়ায় উপকৃত হলো, না। আখিরাতে। এটাই হচ্ছে প্রকাশ্য ক্ষতি যে, আমল করলো অথচ ফল পেলো না। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যেমন আজকের রাতের সাথে কালকের রাতের সাদৃশ্য রয়েছে, তদ্রপ এই উম্মতের মধ্যেও ইয়াহূদীদের সাদৃশ্য এসে গেছে। তিনি বলেন, আমার তো ধারণা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমরা অবশ্যই তাদের অনুসরণ করবে, এমন কি যদি তাদের কেউ গো সাপের গর্তে প্রবেশ করে থাকে তবে তোমরাও তাতে প্রবেশ করবে।” আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর কসম! তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তীদের পন্থা অনুসরণ করবে বিঘতে বিঘতে, হাতে হাতে ও গজে গজে। এমন কি তারা যদি কোন গো সাপের গর্তে ঢুকে গিয়ে থাকে তবে তোমরাও অবশ্যম্ভাবীরূপে তাতে ঢুকে পড়বে।” তখন জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তারা কারা? আহলে কিতাব কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “আর কারা হবে?এ হাদীসটি বর্ণনা করার পর আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা ইচ্ছা করলে (আরবী)-এ আয়াতটি পড়ে নাও।” আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ (আরবী) শব্দ দ্বারা (আরবী) বুঝানো হয়েছে। (আরবী) সম্পর্কে জনগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)? পারসিক ও রোমকদের মত কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “লোকদের মধ্যে এরা ছাড়া আর কেউ নয়।” এ হাদীসের সত্যতার সাক্ষ্য সহীহ হাদীসসমূহেও পাওয়া যায়।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।