আল কুরআন


সূরা আত-তাওবা (আয়াত: 6)

সূরা আত-তাওবা (আয়াত: 6)



হরকত ছাড়া:

وإن أحد من المشركين استجارك فأجره حتى يسمع كلام الله ثم أبلغه مأمنه ذلك بأنهم قوم لا يعلمون ﴿٦﴾




হরকত সহ:

وَ اِنْ اَحَدٌ مِّنَ الْمُشْرِکِیْنَ اسْتَجَارَکَ فَاَجِرْهُ حَتّٰی یَسْمَعَ کَلٰمَ اللّٰهِ ثُمَّ اَبْلِغْهُ مَاْمَنَهٗ ؕ ذٰلِکَ بِاَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا یَعْلَمُوْنَ ﴿۶﴾




উচ্চারণ: ওয়া ইন আহাদুম মিনাল মুশরিকীনাছ তাজা-রাকা ফাআজিরহু হাত্তা-ইয়াছমা‘আ কালামাল্লা-হি ছুম্মা আবলিগহু মা’মানাহূ যা-লিকা বিআন্নাহুম কাওমুল লা-ইয়া‘লামূন।




আল বায়ান: আর যদি মুশরিকদের কেউ তোমার কাছে আশ্রয় চায়, তাহলে তাকে আশ্রয় দাও, যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনে, অতঃপর তাকে পৌঁছিয়ে দাও তার নিরাপদ স্থানে। তা এই জন্য যে, তারা এমন এক কওম, যারা জানে না।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৬. আর মুশরিকদের মধ্যে কেউ আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলে আপনি তাকে আশ্রয় দিন; যাতে সে আল্লাহর বাণী শুনতে পায়(১) তারপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌছিয়ে দিন(২); কারণ তারা এমন এক সম্প্রদায় যারা জানে না।




তাইসীরুল ক্বুরআন: মুশরিকদের কেউ যদি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে তবে তাকে আশ্রয় দাও যাতে সে আল্লাহর বাণী শোনার সুযোগ পায়; তারপর তাকে তার নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দাও। এটা এজন্য করতে হবে যে, এরা এমন এক সম্প্রদায় যারা (ভাল-মন্দ, সত্য-মিথ্যা সম্পর্কে) অজ্ঞ।




আহসানুল বায়ান: (৬) আর অংশীবাদীদের মধ্যে কেউ তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলে, তুমি তাকে আশ্রয় দাও যাতে সে আল্লাহর বাণী শুনতে পায়। অতঃপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দাও।[1] তা এ জন্য যে, তারা অজ্ঞ লোক। [2]



মুজিবুর রহমান: মুশরিকদের মধ্য হতে যদি কেহ তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে তাহলে তুমি তাকে আশ্রয় দান কর, যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনতে পায়; অতঃপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দাও, এই আদেশ এ জন্য যে, এরা এমন লোক যারা জ্ঞান রাখেনা।



ফযলুর রহমান: আর যদি মুশরিকদের কেউ তোমার কাছে আশ্রয় চায় তাহলে তাকে আশ্রয় দেবে, যাতে সে আল্লাহর কালাম (কোরআন) শোনে। তারপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেবে। এটা এজন্য যে, ওদের জ্ঞান নেই।



মুহিউদ্দিন খান: আর মুশরিকদের কেউ যদি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে তাকে আশ্রয় দেবে, যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনতে পায়, অতঃপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌছে দেবে। এটি এজন্যে যে এরা জ্ঞান রাখে না।



জহুরুল হক: আর যদি মুশরিকদের কোনো একজন তোমার কাছে আশ্রয় চায় তবে তাকে আশ্রয় দাও যেন সে আল্লাহ্‌র বাণী শোনে, তারপর তাকে তার নিরাপদ যায়গায় পৌঁছে দিয়ো। এটি এই জন্য যে তারা হচ্ছে এমন এক সম্প্রদায় যারা জানে না।



Sahih International: And if any one of the polytheists seeks your protection, then grant him protection so that he may hear the words of Allah. Then deliver him to his place of safety. That is because they are a people who do not know.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৬. আর মুশরিকদের মধ্যে কেউ আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলে আপনি তাকে আশ্রয় দিন; যাতে সে আল্লাহর বাণী শুনতে পায়(১) তারপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌছিয়ে দিন(২); কারণ তারা এমন এক সম্প্রদায় যারা জানে না।


তাফসীর:

(১) আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, কোন বিধর্মী যদি ইসলামের সত্যতার দলীল জানতে চায়, তবে প্রমাণপঞ্জী সহকারে তার সামনে ইসলামকে পেশ করা মুসলিমদের কর্তব্য। অনুরূপভাবে কোন বিধর্মী ইসলামের সম্যক তথ্য ও তত্ত্বাবলী হাসিলের জন্যে যদি আমাদের কাছে আসে, তবে এর অনুমতি দান ও তার নিরাপত্তা বিধান আমাদের পক্ষে ওয়াজিব। তাকে বিব্রত করা বা তার ক্ষতিসাধন অবৈধ। তারপর তাকে তার নিরাপদ স্থান যেখান থেকে সে এসেছে সেখানে পৌছে দেয়াও মুসলিমের দায়িত্ব। [তাবারী] এ আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, কুরআন আল্লাহর কালাম, তিনি স্বয়ং এ বাণীর প্রবক্তা। সুতরাং কুরআন সৃষ্ট নয়, যেমনটি কোনও কোনও বিদআতপন্থীরা মনে করে থাকে।


(২) এ সহনশীলতা প্রদর্শনের কারণ হলো, কাফের মুশরিকদেরকে আল্লাহর কালাম শুনে এবং মুসলিমদের বাস্তব অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ দেয়া। হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় মুশরিকগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যাবতীয় কর্মকাণ্ড ও রাসূলের প্রতি সাহাবাদের ভালবাসা দেখার পরে তাদের মধ্যে প্রচণ্ড ভাবান্তর সৃষ্টি হয়েছিল যা তাদের ঈমান গ্রহণে সহযোগিতা করেছিল। [ইবন কাসীর] তাছাড়া এমনও হতে পারে যে, তারা মূর্খতা বা অজ্ঞতা বশত: বিরোধিতায় লিপ্ত। আল্লাহর কালাম শোনার পর তাদের মধ্যে ভাবান্তর হবে এবং ইসলাম গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ হবে। [সা'দী]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৬) আর অংশীবাদীদের মধ্যে কেউ তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলে, তুমি তাকে আশ্রয় দাও যাতে সে আল্লাহর বাণী শুনতে পায়। অতঃপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দাও।[1] তা এ জন্য যে, তারা অজ্ঞ লোক। [2]


তাফসীর:

[1] এই আয়াতে পূর্বোক্ত জঙ্গী কাফেরদের ব্যাপারে এক অনুমতি দেওয়া হয়েছে যে, যদি কোন কাফের আশ্রয় প্রার্থনা করে, তাহলে তাকে আশ্রয় দাও। অর্থাৎ, তাকে নিজেদের হিফাযত ও নিরাপত্তায় রাখ; যাতে কোন মুসলিম তাকে হত্যা করতে না পারে। আর যাতে সে আল্লাহর বাণী শোনা ও ইসলাম সম্পর্কে জানার অবকাশ পায়। স‎ম্ভবতঃ এইভাবে তার তাওবাহ ও ইসলাম কবুল করার পথ বেরিয়ে আসবে। অতঃপর যদি সে আল্লাহর বাণী শোনা সত্ত্বেও ইসলাম গ্রহণ না করে, তাহলে তাকে তার নিজ নিরাপদ জায়গায় পৌঁঁছে দাও। উদ্দেশ্য এই যে, নিজেদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত পালন করতে হবে; যতক্ষণ না সে নিজের গন্তব্যস্থলে নির্বিঘ্নে পৌঁছে যায়। যেহেতু তার প্রাণ রক্ষা করা তোমাদের দায়িত্ব।

[2] অর্থাৎ, আশ্রয়প্রার্থী (শরণার্থী)-দেরকে আশ্রয় দেওয়ার অনুমতি এই জন্য দেওয়া হয়েছে যে, এরা হল অজ্ঞ লোক। স‎ম্ভবতঃ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের কথা তাদের কানে এলে এবং মুসলিমদের আখলাক-চরিত্র দেখলে সে ইসলামের সত্যতার বিশ্বাসী হয়ে যাবে এবং ইসলাম গ্রহণ করে আখেরাতের আযাব থেকে বেঁচে যাবে। যেমন হুদাইবিয়ার চুক্তির পর বহু সংখ্যক কাফের নিরাপত্তা চেয়ে মদীনায় আসা-যাওয়া করত। যার ফলে মুসলিমদের চরিত্র ও আচরণ প্রত্যক্ষ করে ইসলাম বুঝা তাদের জন্য সহজ হল। অতঃপর তাদের মধ্যে বহু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করল।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: নামকরণ ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা:



মুফাসসিরগণ এ সূরাটির একাধিক নাম বর্ণনা করেছেন। তার মধ্যে দু’টি নাম প্রসিদ্ধ:

১. তাওবাহ: এ সূরাতে কয়েকজন সাহাবীর তাওবাহ কবূলের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে, তাই একে তাওবাহ বলা হয়।

২. বারাআহ: একে বারাআহ বলা হয় এজন্য যে, এতে মুশরিকদের সাথে মুসলিমদের সাধারণভাবে বারাআহ বা সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা বলা হয়েছে এবং সূরার প্রথম শব্দটিও বারাআহ।



এটা কুরআন মাজীদের একমাত্র সূরা যার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ নেই। এ ব্যাপারে ইমাম কুরতুবী (রাঃ) পাঁচটি কারণ উল্লেখ করেছেন। তন্মেধ্যে:



ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি উসমান (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কী কারণে সূরা আনফালকে সূরা বারাআহর সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন? (অথচ সূরা আনফাল مثاني তথা একশত এর কম আয়াতবিশিষ্ট সূরা আর বারাআহ একশত এর বেশি আয়াতবিশিষ্ট সূরা) এবং উভয়ের মাঝে বিসমিল্লাহ লেখেননি, অনুরূপ এটাকে সাতটি দীর্ঘ সূরার মধ্যে শামিল করেছেন। উসমান (রাঃ) বলেন: কোন কোন সময় রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর ওপর অনেক আয়াতবিশিষ্ট কয়েকটি সূরা অবতীর্ণ হত। যখন আয়াত অবতীর্ণ হত তখন তিনি লেখকদের কাউকে ডেকে বলতেন: এ আয়াতটি উমুক সূরার মধ্যে রেখে দাও যার মধ্যে এরূপ এরূপ বর্ণনা রয়েছে। সূরা আনফাল মদীনায় অবতীর্ণ সূরাগুলোর মধ্যে প্রথম দিকের অন্যতম একটি, আর সূরা বারাআহ সর্বশেষ অবতীর্ণ সূরাসমূহের অন্তর্ভুক্ত। উভয় সূরার ঘটনা সাদৃশ্যপূর্ণ। তাই আমি মনে করেছি সূরা বারাআহ আনফালের অন্তর্ভুক্ত। আর এ অবস্থাতেই নাবী (সাঃ) মারা গেলেন কিন্তু এ সম্পর্কে কিছু বর্ণনা করে যাননি। এ কারণে আমি দুটি সূরাকে মিলিয়ে দিয়েছি; মাঝে বিসমিল্লাহ লেখিনি। আর এটাকে সাতটি দীর্ঘ সূরার মধ্যে শামিল করে দিয়েছি। (তিরমিযী হা: ৩০৮৬, আবূ দাঊদ হা: ৭৮৬, হাকিম: ২/৩৩০, ইমাম হাকিম বলেন: সনদ সহীহ)



ইমাম ইবনু কাসীর (রাঃ) বলেন: এ সূরার প্রথম অংশ ঐ সময় অবতীর্ণ হয় যখন নাবী (সাঃ) তাবূকের যুদ্ধ হতে ফিরে আসছিলেন। তখন হাজ্জের মওসুম ছিল। মুশরিকরা নিজেদের অভ্যাস মত হাজ্জ করতে এসে উলঙ্গ অবস্থায় বায়তুল্লাহর চারদিকে তাওয়াফ করত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাদের সাথে মিলিত হতে অপছন্দ করতেন, তাই আবূ বাকর (রাঃ)-কে ঐ বছর হাজ্জের ইমাম বানিয়ে মক্কা অভিমুখে প্রেরণ করেন। মানুষকে হাজ্জের নিয়ম-কানুন শিক্ষা দেয়ার এবং মুশরিকদের মাঝে এ ঘোষণা দেয়ার জন্য যে, এ বছরের পর থেকে কোন মুশরিক হাজ্জ করতে পারবে না। তখন তিনি জনগণের মাঝে সূরা বারাআহ তেলাওয়াত করে শুনালেন। (ইবনে কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)



সাহাবী বারা বিন আযেব (রাঃ) বলেন:



أَخِرُ سُوْرَةٍ نَزَلَتْ بَرَاءَةٌ



সূরা বারাআহ সর্বশেষ অবতীর্ণ হওয়া সূরা। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৫৪) যখন সূরা তাওবাহ নাযিল হল তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আলী (রাঃ)-কে চারটি নির্দেশ দিয়ে মক্কায় প্রেরণ করলেন।



১. কেউ উলঙ্গ অবস্থায় কাবা তাওয়াফ করতে পারবে না।

২. এ বছরের পর কোন মুশরিক বাইতুল্লাহর নিকটে আসতে পারবে না।

৩. কোন ব্যক্তি ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর মাঝে যদি কোন অঙ্গীকার থাকে তাহলে তা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে।

৪. মু’মিন ছাড়া কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।



১-৬ নং আয়াতের তাফসীর:



আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর পক্ষ থেকে এটা সেই সকল মুশরিকদের সাথে সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা যাদের সাথে স্থায়ী অথবা চার মাসের কম অথবা চার মাসের বেশি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চুক্তি ছিল। এখন মুশরিকদের থেকে আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সম্পূর্ণ মুক্ত। অতএব হে মুশরিকরা! তোমরা চার মাস (শাওয়াল, যুলকাদা, যুলহাজ্জ ও মুহাররাম) যেথায় ইচ্ছা ঘুরে বেড়াও তাতে মুসলিমদের থেকে পূর্ণ নিরাপদ থাকবে। চার মাস পর কোন অঙ্গীকার থাকবে না, কোন প্রতিশ্র“তিও থাকবে না।



(يَوْمَ الْحَجِّ الْأَكْبَرِ)



‘মহান হাজ্জের দিবসে’ মহান হাজ্জের দিন বলতে দশই যিলহাজ্জকে বুঝানো হয়েছে। এ দিনে মিনাতে সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা শুনানো হয়। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৫৫, সহীহ মুসলিম হা: ৯৮২, তিরমিযী হা: ৯৫৭)



দশই যিলহাজ্জকে বড় হাজ্জের দিন বলার কারণ হল, এ দিনে হাজ্জের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলী সম্পন্ন করা হয়। মানুষের মাঝে প্রচলন আছে যে, জুমুআর দিন আরাফা হলে ঐ হাজ্জকে বড় হাজ্জ বা হাজ্জে আকবার বলা হয়, এরূপ কথা ভিত্তিহীন। মূলত বড় হাজ্জ দ্বারা হাজ্জকে বুঝানো হয়েছে, যেহেতু উমরাকে ছোট হাজ্জ বলা হয়।



(إِلا الَّذِينَ عَاهَدْتُمْ مِنَ الْمُشْرِكِينَ)



‘তবে মুশরিকদের মধ্যে যাদের সাথে তোমরা চুক্তিতে আবদ্ধ’ অর্থাৎ পূর্বের বিধান থেকে ঐ সকল মুশরিকরা আলাদা যারা নির্দিষ্ট মেয়াদে চুক্তিবদ্ধ আর তোমাদের সাথে খিয়ানত করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে শত্রুদের সহযোগিতাও করেনি। তাহলে তাদের সাথে মেয়াদ পর্যন্ত চুক্তি পূর্ণ কর।



(فَإِذَا انْسَلَخَ الْأَشْهُرُ الْحُرُمُ)



‘অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে’এখানে হারাম মাস বলতে কোন্ মাসকে বুঝানো হয়েছে তা নিয়ে একাধিক মত পাওয়া যায়।



আল্লামা সা‘দী (রহঃ) বলেন: যে মাসগুলোতে যুদ্ধ-বিগ্রহ হারাম। তাহল যুলক্বা‘দাহ, যুলহাজ্জ, মুহাররাম ও রজব। প্রবীণ মুফাসসিরদের মধ্যে ইমাম ইবনু কাসীর (রাঃ)ও এ মত পোষণ করেছেন।



(فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِيْنَ حَيْثُ وَجَدْتُّمُوهُمْ)



‘মুশরিকদেরকে যেখানে পাবে হত্যা কর’অনেকে এ আয়াতকে ব্যাপক বলেছেন। অর্থাৎ যেখানে পাও সেখানেই মুশরিকদেরকে হত্যা কর। কিন্তু মাসজিদে হারামের সীমানায় হত্যা করা নিষেধ এটাই প্রসিদ্ধ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَاقْتُلُوْهُمْ حَيْثُ ثَقِفْتُمُوْهُمْ وَأَخْرِجُوْهُمْ مِّنْ حَيْثُ أَخْرَجُوْكُمْ وَالْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ ج وَلَا تُقٰتِلُوْهُمْ عِنْدَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ حَتّٰي يُقَاتِلُوْكُمْ فِيْهِ ج فَإِنْ قٰتَلُوْكُمْ فَاقْتُلُوْهُمْ ط كَذٰلِكَ جَزَآءُ الْكٰفِرِيْنَ)‏



“তাদেরকে যেখানেই পাও হত্যা কর এবং তারা তোমাদেরকে যেখান থেকে বহিষ্কৃত করেছে তোমরাও তাদেরকে সেখান থেকে বের করে দাও, আর হত্যা অপেক্ষা ফেত্না-ফাসাদ (কুফর ও শির্ক) গুরুতর অপরাধ এবং তোমরা তাদের সাথে মাসজিদুল হারামের নিকট যুদ্ধ কর না যে পর্যন্ত না তারা তোমাদের সাথে সেখানে যুদ্ধ করে; কিন্তু যদি তারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে তবে তোমরাও তাদের সাথে যুদ্ধ কর। কাফিরদের প্রতিফল এরূপই।” (সূরা বাকারাহ ২:১৯১, ইবনে কাসীর, ৪/১২০)



مَرْصَدٍ শত্রুরা যেখানে থাকে তাকে মারসাদ বা ঘাঁটি বলা হয়। অর্থাৎ শত্রুদের প্রত্যেক ঘাঁটিতে ওৎ পেতে বসে থাক, সুযোগ পেলেই হামলা করবে।



(فَإِنْ تَابُوْا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ)



‘অতঃপর তারা যদি তাওবাহ করে, সালাত কায়েম করে..’ অর্থাৎ যদি তারা শির্ক বর্জন করে তাওবাহ করতঃ ঈমান আনে, সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় তাহলে তাদের পথ ছেড়ে দাও। কেননা তখন তারা তোমাদের দীনী ভাই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(فَإِنْ تَابُوْا وَأَقَامُوا الصَّلٰوةَ وَاٰتَوُا الزَّكٰوةَ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّيْنِ ط وَنُفَصِّلُ الْاٰيٰتِ لِقَوْمٍ يَّعْلَمُوْنَ)



“অতঃপর তারা যদি তাওবাহ করে, সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয় তবে তারা তোমাদের দীনী ভাই; জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য আমি নিদর্শন স্পষ্টরূপে বর্ণনা করি।”(সূরা তাওবাহ ৯:১১)



রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া সত্য কোন মা‘বূদ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাঃ) তাঁর রাসূল- এ সাক্ষ্য দিয়ে সালাত কায়িম করবে, যাকাত দেবে; নচেৎ আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি। (সহীহ বুখারী হা: ২৫)



(وَإِنْ أَحَدٌ مِّنَ الْمُشْرِكِيْنَ اسْتَجَارَكَ)



‘মুশরিকদের মধ্যে যদি কেউ তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে’অর্থাৎ যে সকল মুশরিকদেরকে হত্যার নির্দেশ দেয়া হয়েছে তাদের মধ্য হতে কেউ যদি নিরাপত্তা চায় তাহলে তাকে এমনভাবে নিরাপত্তা দাও যেন কুরআন শ্রবণ করতে পারে। আশা করা যায়, সে ঈমান আনবে। যদি কোন পরিবর্তন না হয় তাহলে তাদের বাসস্থানে নিরাপদে পৌঁছে দাও।



সুতরাং যেখানে আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল কাফির-মুশরিকদের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিয়েছেন সেখানে কোন মু’মিনের সম্পর্ক রাখা ঈমানের পরিচায়ক হতে পারে না। এটা সর্বদা আমাদের মনে রাখতে হবে যে, তারা কখনো আমাদের জন্য কল্যাণ চায় না, যদিও বাহ্যিক হিতাকাক্সিক্ষতা প্রকাশ করে। তবে তারা যদি তাওবাহ করে, সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয় তাহলে তারা তোমাদের দীনী ভাই, তাদের সাথে সম্পর্ক করতে পারবে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. সাধারণভাবে অমুসলিমদের সাথে কোন মুসলিমের কোন সম্পর্ক থাকবে না। তবে ইসলামের স্বার্থে মুসলিম ও মুশরিকদের মাঝে চুক্তি করা বৈধ।

২. নির্দিষ্ট মেয়াদে সম্পাদিত চুক্তিগুলো যথাযথভাবে পূর্ণ করা আবশ্যক।

৩. দশই যিলহাজ্জকে হাজ্জে আকবার বলা হয়।

৪. কোন ব্যক্তি তাওবাহ করতঃ সালাত কায়েম করলে, যাকাত প্রদান করলে সে মুসলিম ভাই বলে গণ্য হবে।

৫. কোন মুশরিক নিরাপত্তা চাইলে নিরাপত্তা দেয়া যাবে। তবে এমনভাবে নিরাপত্তা দেয়া উচিত যাতে সে ইসলাম সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়, আশা করা যায় এতে সে ইসলাম গ্রহণ করবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলছেন, আমি তোমাকে যে কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছি তাদের মধ্য হতে কেউ যদি তোমার কাছে। নিরাপত্তা প্রার্থনা করে তবে তুমি তাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করবে ও নিরাপত্তা দেবে, যেন তারা কুরআন কারীম শুনতে পায় ও তোমার কথা শুনবার সুযোগ লাভ করে। আর তারা দ্বীনের তালীম অবগত হয় এবং আল্লাহর হুজ্জত পরিপূর্ণতা লাভ করে। অতঃপর নিরাপত্তার মাধ্যমেই তাকে তার স্বদেশে নির্ভয়ে পাঠিয়ে দেবে, যেন সে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছে যেতে পারে। এর ফলে হয়তো বুঝে সুঝে ও চিন্তা ভাবনা করে সে সত্য দ্বীন কবূল করে নেবে। এটা এই কারণে যে, তারা অজ্ঞ ও মূখ লোক। সুতরাং তাদের কাছে দ্বীনী শিক্ষা পৌঁছিয়ে দাও। আল্লাহর দাওয়াত তাঁর বান্দাদের কানে পৌছিয়ে দিতে কোন ত্রুটি করো না।

এ আয়াতের তাফসীরে মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- যে কেউই তোমার কাছে ধর্মীয় কথা শুনবার জন্যে আসে সে নিরাপত্তা লাভ করবে যে পর্যন্ত না সে আল্লাহর কালাম না শুনে, অতঃপর যেখান থেকে এসেছিল সেখানে নিরাপদে ফিরে যায়। এজন্যেই, যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে দ্বীন বুঝবার জন্যে বা কোন পয়গাম নিয়ে আসতো তাকে তিনি নিরাপত্তা দান করতেন। হুদায়বিয়ার সন্ধির বছর এটাই হয়েছিল। কুরায়েশের যতগুলো দূত এসেছিল তাদের কোন ভয় বিপদ ছিল না। উরওয়া ইবনে মাসউদ, মাকরাম ইবনে হাফস, সাহল ইবনে আমর প্রমুখ একের পর এক আসতে থাকে। এখানে এসে তাদের ঐ শান শওকত দৃষ্টিগোচর হয় যা রোম সম্রাট কায়সার এবং পারস্য সম্রাট কিসরার দরবারেও তারা দেখতে পায়নি। একথা তারা তাদের কওমের কাছে গিয়ে বর্ণনা করে। সুতরাং এ বিষয়টিও বহু লোকের হিদায়াতের মাধ্যম হয়েছিল। ভণ্ড নবী মুসায়লামা কায্যাবের দূত যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে আগমন করে তখন তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি মুসায়লামার রিসালাতকে স্বীকার করেছো?` সে উত্তরে বললোঃ “হ্যা।” তখন নবী (সঃ) বললেনঃ “আমার নিকট দূতকে হত্যা করা যদি নাজায়েয না হতো তবে আমি তোমার গর্দান উড়িয়ে দিতাম। অবশেষে এ লোকটি ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর হাতে কুফার শাসন ক্ষমতায় থাকার সময় নিহত হয়। লোকটিকে ইবনে নাওয়াহা বলা হতো। ইবনে মাসউদ (রাঃ) যখন অবহিত হন যে, সে মুসায়লামাকে নবী বলে স্বীকারকারী তখন তাকে ডেকে পাঠান এবং বলেনঃ “এখন তুমি দূত নও। সূতরাং এখন তোমাকে হত্যা করার ব্যাপারে কোন প্রতিবন্ধকতা নেই।” অতঃপর তাকে হত্যা করা হয়। তার উপর আল্লাহর অভিসম্পাত বর্ষিত হাক!

মোটকথা, যদি কোন অমুসলিম দেশ থেকে কোন দূত বা ব্যবসায়ী অথবা সন্ধি করতে ইচ্ছুক ব্যক্তি কিংবা জিযিয়া আনয়নকারী ব্যক্তি কোন মুসলিম রাষ্ট্রে আগমন করে এবং ইমাম বা নায়েবে ইমাম তাকে নিরাপত্তা প্রদান করেন তবে যে পর্যন্ত সে ইসলামী রাষ্ট্রে অবস্থান করবে এবং স্বদেশে না পৌঁছবে সেই পর্যন্ত তাকে হত্যা করা হারাম। কিন্তু আলেমগণ বলেন যে, এরূপ ব্যক্তিকে বছর ধরে বাস করতে দেয়া চলবে না। বড়জোর তাকে চার মাস পর্যন্ত এখানে বাস করার অধিকার দেয়া যেতে পারে। আর চার মাসের অধিক ও এক বছরের কম সময় পর্যন্ত তাকে দারুল ইসলামে বাস করতে দেয়ার ব্যাপারে ইমাম শাফিঈ (রঃ) ও অন্যান্য ইমামদের (রঃ) দু’টি উক্তি রয়েছে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।