সূরা আত-তাওবা (আয়াত: 31)
হরকত ছাড়া:
اتخذوا أحبارهم ورهبانهم أربابا من دون الله والمسيح ابن مريم وما أمروا إلا ليعبدوا إلها واحدا لا إله إلا هو سبحانه عما يشركون ﴿٣١﴾
হরকত সহ:
اِتَّخَذُوْۤا اَحْبَارَهُمْ وَ رُهْبَانَهُمْ اَرْبَابًا مِّنْ دُوْنِ اللّٰهِ وَ الْمَسِیْحَ ابْنَ مَرْیَمَ ۚ وَ مَاۤ اُمِرُوْۤا اِلَّا لِیَعْبُدُوْۤا اِلٰـهًا وَّاحِدًا ۚ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ ؕ سُبْحٰنَهٗ عَمَّا یُشْرِکُوْنَ ﴿۳۱﴾
উচ্চারণ: ইত্তাখাযূআহবা-রাহুম ও রুহবা-নাহুম আরবা-বাম মিন দূ নিল্লা-হি ওয়াল মাছীহাবনা মারইয়ামা ওয়ামা উমিরূ ইল্লা-লিয়া‘বুদূ ইলা-হাওঁ ওয়াহিদাল লাইলা-হা ইল্লাহুওয়া; ছুবহা-নাহূ‘আম্মা-ইউশরিকূন।
আল বায়ান: তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পন্ডিত ও সংসার-বিরাগীদের* রব হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং মারইয়ামপুত্র মাসীহকেও। অথচ তারা এক ইলাহের ইবাদত করার জন্যই আদিষ্ট হয়েছে, তিনি ছাড়া কোন (হক) ইলাহ নেই। তারা যে শরীক করে তিনি তা থেকে পবিত্র।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩১. তারা আল্লাহ্ ব্যতীত তাদের পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগিদের(১)কে তাদের রবরূপে গ্রহণ করেছে(২) এবং মারইয়াম-পুত্র মসীহকেও। অথচ এক ইলাহের ইবাদাত করার জন্যই তারা আদিষ্ট হয়েছিল। তিনি ব্যতীত অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই। তারা যে শরীক করে তা থেকে তিনি কত না পবিত্ৰ।(৩)!
তাইসীরুল ক্বুরআন: আল্লাহকে বাদ দিয়ে তারা তাদের ‘আলিম আর দরবেশদেরকে রব বানিয়ে নিয়েছে; আর মারইয়াম-পুত্র মাসীহকেও। অথচ তাদেরকে এক ইলাহ ব্যতীত (অন্যের) ‘ইবাদাত করার আদেশ দেয়া হয়নি। তিনি ব্যতীত সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, পবিত্রতা আর মহিমা তাঁরই, (বহু ঊর্ধ্বে তিনি) তারা যাদেরকে (তাঁর) অংশীদার গণ্য করে তাত্থেকে।
আহসানুল বায়ান: (৩১) তারা আল্লাহকে ছেড়ে নিজেদের পন্ডিত-পুরোহিতদেরকে প্রভু বানিয়ে নিয়েছে[1] এবং মারয়্যামের পুত্র মসীহকেও। অথচ তাদেরকে শুধু এই আদেশ করা হয়েছিল যে, তারা শুধুমাত্র একক উপাস্যের উপাসনা করবে, তিনি ব্যতীত (সত্য) উপাস্য আর কেউই নেই, তিনি তাদের অংশী স্থির করা হতে পবিত্র।
মুজিবুর রহমান: তারা আল্লাহকে ছেড়ে নিজেদের পন্ডিত ও ধর্ম যাজকদেরকে রাব্ব বানিয়ে নিয়েছে এবং মারইয়ামের পুত্র মসীহকেও। অথচ তাদের প্রতি শুধু এই আদেশ করা হয়েছে যে, তারা শুধুমাত্র এক মা‘বূদের ইবাদাত করবে যিনি ব্যতীত ইলাহ হওয়ার যোগ্য কেহই নয়। তিনি তাদের অংশী স্থির করা হতে পবিত্র।
ফযলুর রহমান: তারা আল্লাহকে ছাড়াও তাদের যাজক ও পাদ্রীদেরকে এবং মরিয়মের পুত্র (ঈসা) মসীহকে প্রভু বানিয়েছে। অথচ তাদেরকে মাত্র একজন উপাস্যের (একমাত্র আল্লাহর) উপাসনা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তিনি ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই। তারা যে শির্ক করছে তিনি তা থেকে পবিত্র।
মুহিউদ্দিন খান: তারা তাদের পন্ডিত ও সংসার-বিরাগীদিগকে তাদের পালনকর্তারূপে গ্রহণ করেছে আল্লাহ ব্যতীত এবং মরিয়মের পুত্রকেও। অথচ তারা আদিষ্ট ছিল একমাত্র মাবুদের এবাদতের জন্য। তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তারা তাঁর শরীক সাব্যস্ত করে, তার থেকে তিনি পবিত্র।
জহুরুল হক: তারা আল্লাহ্কে ছেড়ে দিয়ে তাদের পন্ডিতগণকে ও সন্ন্যাসীদের প্রভুরূপে গ্রহণ করেছে, আর মরিয়ম-পুত্র মসীহ্কেও, অথচ শুধু এক উপাস্যের উপাসনা করা ছাড়া অন্য নির্দেশ তাদের দেয়া হয় নি। তিনি ছাড়া অন্য উপাস্য নেই। তাঁরই সব মহিমা -- তারা যে- সব অংশী দাঁড় করার সে-সব থেকে?
Sahih International: They have taken their scholars and monks as lords besides Allah, and [also] the Messiah, the son of Mary. And they were not commanded except to worship one God; there is no deity except Him. Exalted is He above whatever they associate with Him.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩১. তারা আল্লাহ্ ব্যতীত তাদের পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগিদের(১)কে তাদের রবরূপে গ্রহণ করেছে(২) এবং মারইয়াম-পুত্র মসীহকেও। অথচ এক ইলাহের ইবাদাত করার জন্যই তারা আদিষ্ট হয়েছিল। তিনি ব্যতীত অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই। তারা যে শরীক করে তা থেকে তিনি কত না পবিত্ৰ।(৩)!
তাফসীর:
(১) أحبار শব্দটি حبر এর বহুবচন। ইয়াহুদীদের আলেমকে حبر বলা হয়। পক্ষান্তরে رهبان শব্দটি راهب এর বহুবচন। নাসারাদের আলেমকে راهب বলা হয়। তারা বেশীরভাগই সংসার বিরাগী হয়ে থাকে। [ফাতহুল কাদীর]
(২) এ আয়াতে বলা হয় যে, ইয়াহুদী-নাসারাগণ তাদের আলেম ও যাজক শ্রেণীকে আল্লাহর পরিবর্তে রব ও মাবুদ সাব্যস্ত করে রেখেছে। অনুরূপ ঈসা আলাইহিস সালামকেও মা’বুদ মনে করে। তাকে আল্লাহর পুত্ৰ মনে করায় তাকে মা’বুদ সাব্যস্ত করার দোষে যে দোষী করা হয়, তার কারণ হল, তারা পরিষ্কার ভাষায় ওদের মা’বুদ না বললেও পূর্ণ আনুগত্যের যে হক বান্দার প্রতি আল্লাহর রয়েছে, তাকে তারা যাজক শ্রেণীর জন্যে উৎসর্গ রাখে। অর্থাৎ তারা যাজক শ্রেণীর আনুগত্য করে চলে; যতই তা আল্লাহর নির্দেশের বিরোধী হোক না কেন? বলাবাহুল্য পাদ্রী ও পুরোহিতগণের আল্লাহ বিরোধী উক্তি ও আমলের আনুগত্য করা তাদেরকে মা’বুদ সাব্যস্ত করার নামান্তর, আর এটি হল প্রকাশ্য কুফরী ও শির্ক।
আদী ইবন হাতেম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি গলায় একটি সোনার ক্রুশ নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসলাম। তখন তিনি বললেনঃ হে আদী, তোমার গলা থেকে এ মূর্তিটি সরিয়ে ফেল এবং তাকে সূরা আত-তাওবাহর এ আয়াতটি তেলাওয়াত করতে শুনলাম- “তারা আল্লাহ ব্যতীত তাদের পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগীদেরকে তাদের পালনকর্তারূপে গ্রহণ করেছে।” আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল, আমরা তো তাদের ইবাদত করি না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তারা তোমাদের জন্য কোন কিছু হালাল করলে তোমরা সেটাকে হালাল মনে কর আর কোন কিছুকে হারাম করলে তোমরা সেটাকে হারাম হিসাবে গ্রহণ কর। [তিরমিযীঃ ৩০৯৫]
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, শরীআতের মাসায়েল সম্পর্কে অজ্ঞ জনসাধারণের পক্ষে ওলামায়ে কেরামের নির্দেশনার অনুসরণ বা ইজতিহাদী মাসায়েলের ক্ষেত্রে মুজতাহিদ ইমামগণের মতামতের অনুসরণর ততক্ষণই করতে পারবে যতক্ষণ না এর বিপরীতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল থেকে কোন কিছু প্রমাণিত হবে। যখনই কোন কিছু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মতের বিপক্ষে হয়েছে বলে প্রমাণিত হবে তখনি তা ত্যাগ করা ওয়াজিব। অন্যথায় ইয়াহুদী নাসারাদের মত হয়ে যাবে। কারণ ইয়াহুদী-নাসারাগণ আল্লাহর কিতাব এবং আল্লাহর রাসূলের আদেশ নিষেধকে সম্পূর্ণ উপক্ষো করে স্বার্থপর আলেম এবং অজ্ঞ পুরোহিতদের কথা ও কর্মকে নিজেদের ধর্ম বানিয়ে নিয়েছে। আয়াতে তারই নিন্দা জ্ঞাপন করা হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর]
(৩) অর্থাৎ অথচ তাদেরকে তো শুধু এ নির্দেশই দেয়া হচ্ছিল যে, তারা এক ইলাহেরই ইবাদত করবে, যিনি কোন কিছু হারাম করলেই কেবল তা হারাম হবে, আর যিনি হালাল করলেই তা হালাল হবে। অনুরূপভাবে যিনি শরীআত প্রবর্তন করলে সেটাই মানা হবে, তিনি হুকুম দিলে সেটা বাস্তবায়িত হবে। তিনি ব্যতীত আর কোন সত্য ইলাহ নেই। তারা যা তাঁর সাথে শরীক করছে তা থেকে তিনি কতই না পবিত্র। তাঁর সন্ততি নেই, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনি ছাড়া কোন রব নেই। [ইবন কাসীর] কিন্তু তারা সে নির্দেশের বিপরীত কাজ করেছে। তার সাথে শরীক করেছে। মহান আল্লাহ তাদের সে সমস্ত অপবাদ ও শরীক থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। তার পূর্ণতার বিপরীত তার জন্য যে সমস্ত অসামঞ্জস্যপূর্ণ গুণ সাব্যস্ত করে তা গ্রহণযোগ্য নয়। [সা'দী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩১) তারা আল্লাহকে ছেড়ে নিজেদের পন্ডিত-পুরোহিতদেরকে প্রভু বানিয়ে নিয়েছে[1] এবং মারয়্যামের পুত্র মসীহকেও। অথচ তাদেরকে শুধু এই আদেশ করা হয়েছিল যে, তারা শুধুমাত্র একক উপাস্যের উপাসনা করবে, তিনি ব্যতীত (সত্য) উপাস্য আর কেউই নেই, তিনি তাদের অংশী স্থির করা হতে পবিত্র।
তাফসীর:
[1] এর ব্যাখ্যা আদী বিন হাতেম (রাঃ)-এর বর্ণনাকৃত হাদীস হতে পরিষ্কার হয়ে যায়। তিনি বলেন, আমি নবী (সাঃ)-এর মুখে এই আয়াত শুনে আরজ করলাম যে, ইয়াহুদী-নাসারারা তো নিজেদের আলেমদের কখনো ইবাদত করেনি, তাহলে এটা কেন বলা হয়েছে যে, তারা তাদেরকে রব বানিয়ে নিয়েছে? তিনি বললেন, এ কথা ঠিক যে, তারা তাদের ইবাদত করেনি। কিন্তু এটা তো সঠিক যে, তাদের আলেমরা যা হালাল করেছে তাকে তারা হালাল এবং যা হারাম করেছে তাকে তারা হারাম বলে মেনে নিয়েছে। আর এটাই হল তাদের ইবাদত করা। (সহীহ তিরমিযী আলবানী ২৪৭১নং) কেননা, হারাম-হালাল করার এখতিয়ার কেবলমাত্র আল্লাহর। এই এখতিয়ার ও অধিকারের কথাকে যদি কোন ব্যক্তি অন্যের আছে বলে বিশ্বাস করে নেয়, তাহলে এর মানে হবে, সে তাকে রব (প্রভু) মেনে নিয়েছে। এই আয়াতে সেই লোকদের জন্য বড় সতর্কতা রয়েছে, যারা নিজেদের ইমাম-বুযুর্গদেরকে হালাল-হারাম করার অধিকার দিয়ে রেখেছে এবং যাদের কাছে তাঁদের কথার তুলনায় কুরআন হাদীসের উক্তির কোন গুরুত্ব নেই।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩০-৩৩ নং আয়াতের তাফসীর:
ইয়াহূদীরা বলে: উযাইর আল্লাহ তা‘আলার ছেলে আর খ্রিস্টানরা বলে, ঈসা (রাঃ) আল্লাহ তা‘আলার ছেলে। উভয় দলই এ কথা বলার কারণে কাফির। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(لَقَدْ كَفَرَ الَّذِيْنَ قَالُوْآ إِنَّ اللّٰهَ هُوَ الْمَسِيْحُ ابْنُ مَرْيَمَ ط قُلْ فَمَنْ يَّمْلِكُ مِنَ اللّٰهِ شَيْئًا إِنْ أَرَادَ أَنْ يُّهْلِكَ الْمَسِيْحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَأُمَّه۫ )
“যারা বলে, ‘মারিয়ামের ছেলে মাসীহ-ই আল্লাহ’, তারা অবশ্যই কুফরী করেছে। বল: আল্লাহ মারিয়ামের ছেলে মাসীহ, তাঁর মা এবং দুনিয়ার সকলকে যদি ধ্বংস করতে ইচ্ছা করেন তবে তাঁকে বাধা দেয়ার শক্তি কারো আছে?’ (সূরা মায়িদাহ ৫:১৭) আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(لَقَدْ كَفَرَ الَّذِيْنَ قَالُوْآ إِنَّ اللّٰهَ ثَالِثُ ثَلٰثَةٍ ﻣ وَمَا مِنْ إلٰهٍ إِلَّآ إِلٰهٌ وَّاحِدٌ)
“যারা বলে, ‘আল্লাহ তো তিনের মধ্যে একজন তারা কুফরী করেছে- এক মা‘বূদ ব্যতীত অন্য কোন সত্য মা‘বূদ নেই।” (সূরা মায়িদাহ ৫:৭৩)
(اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ)
‘তারা আল্লাহ ব্যতীত তাদের পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগিদেরকে প্রভুরূপে গ্রহণ করেছে’ এ আয়াতের তাফসীর আদী বিন হাতিম কর্তৃক বর্ণিত হাদীস দ্বারা পরিষ্কার হয়ে যায়। তিনি বলেন: একদা নাবী (সাঃ)-এর মুখে এ আয়াত তেলাওয়াত করতে শুনতে পাই। তখন আমি বললাম, আমরা তো তাদের ইবাদত করিনা। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন: আল্লাহ তা‘আলা যা হালাল করেছেন সেটা কি তারা হারাম করে দেয়না? অতঃপর তোমরাও তা হারাম হিসেবে গ্রহণ করে নাও। আল্লাহ তা‘আলা যা হারাম করে দিয়েছেন- তারা কি সেটা হালাল করে দেয়না? অতঃপর তোমরা তা হালাল হিসেবে গ্রহণ করে নাও। আমি বললাম: হ্যাঁ, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন: এটাই তাদের ইবাদত করা। (সহীহ তিরমিযী হা: ২৪৭১) কেননা হালাল হারামের বিধানদাতা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা।
অর্থাৎ ধর্মীয় যাজক, পীর, আলেম বা শাসক আল্লাহ তা‘আলার বিধানের বিপরীত কোন বিধান দিলে তা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেয়া তাদের রব হিসেবে গ্রহণ করার শামিল।
(أَنْ يُطْفِئُوْا نُوْرَ اللّٰهِ)
‘আল্লাহর জ্যোতি নিভিয়ে দিতে চায়’ অর্থাৎ কাফিররা চায় দীন ইসলামকে তাদের বাক-বিতণ্ডা ও মিথ্যা অপবাদ দ্বারা দুনিয়া থেকে মিটিয়ে দিতে। তাদের এসব কাজের দৃষ্টান্ত এমন যে, কেউ মুখে ফুৎকার দিয়ে সূর্যের বা চন্দ্রের কিরণ নিভিয়ে দিতে চায়। আল্লাহ তা‘আলা তার দীনকে বিজয়ী করবেনই, যদিও কাফির মুশরিকরা অপছন্দ করে। আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:
(یُرِیْدُوْنَ لِیُطْفِئُوْا نُوْرَ اللہِ بِاَفْوَاھِھِمْ وَاللہُ مُتِمُّ نُوْرِھ۪ وَلَوْ کَرِھَ الْکٰفِرُوْنَ , هُوَ الَّذِیْٓ اَرْسَلَ رَسُوْلَھ۫ بِالْھُدٰی وَدِیْنِ الْحَقِّ لِیُظْھِرَھ۫ عَلَی الدِّیْنِ کُلِّھ۪ وَلَوْ کَرِھَ الْمُشْرِکُوْنَ)
“তারা তাদের মুখের ফুৎকারে আল্লাহর নূর নিভিয়ে দিতে চায়; কিন্তু আল্লাহ তাঁর নূরকে পরিপূর্ণ করবেনই, যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে। তিনিই তাঁর রাসূলকে প্রেরণ করেছেন হিদায়েত এবং সত্য দীনসহ সকল দীনের ওপর তাকে বিজয়ী করার জন্য, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।”(সূরা সাফ ৬১:৮-৯)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: ভূ-পৃষ্ঠে এমন কোন কাঁচা ও পাকা ঘর বাকি থাকবে না যেখানে আল্লাহ তা‘আলা ইসলামের কালিমাকে প্রবেশ করাবেন না।
তিনি মর্যাদাবানদের মর্যাদা দেবেন এবং লাঞ্ছিতদের লাঞ্ছিত করবেন। যাদেরকে তিনি মর্যাদা দানের ইচ্ছা করবেন তাদেরকে ইসলামে প্রবেশ করার সৌভাগ্য দেবেন আর যাদেরকে লাঞ্ছিত করার ইচ্ছা করবেন তাদেরকে মুসলিমদের অধীনস্থ করে রাখবেন। (আহমাদ হা: ২৩৮১৪)
অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: আল্লাহ তা‘আলা আমাকে ভূ-পৃষ্ঠের পূর্ব-পশ্চিম সমস্ত পৃথিবীকে গুটিয়ে দেখিয়েছেন। অচিরেই আমাকে যে পর্যন্ত দেখানো হয়েছে ততদূর আমার উম্মাতের রাজত্ব পৌঁছাবে। (সহীহ মুসলিম হা: ২২১৫) কোন শাসক বা আলেম ও পীর-বুজুর্গ ইসলামের কোন বিধানকে পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখেনা। অতএব যারা আল্লাহ তা‘আলার বিধানের পরিবর্তন করবে এবং যারা তাদের সেসব বিধান মাথা পেতে মেনে নেবে তারা মূলত তাদেরকে বর হিসেবে গ্রহণ করে এবং তাগুতকেই প্রতিষ্ঠা করে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. যারা বলে ঈসা (রাঃ), উযাইর বা যে কোন মানুষ আল্লাহ তা‘আলার ছেলে তারা কাফির।
২. আল্লাহ তা‘আলা যা হারাম করেছেন তা কোন আলিম বা রাষ্ট্র প্রধান হালাল করে দিলে আর কেউ তা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিলে সেই আলিম বা রাষ্ট্রপ্রধানকে রব হিসেবে গ্রহণ করা হবে।
৩. আল্লাহ তা‘আলার দীনকে বিজয়ী করতে কেউ বাধা দিতে পারবে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৩০-৩১ নং আয়াতের তাফসীর:
এ আয়াতগুলোতেও মহা মহিমান্বিত আল্লাহ মুমিনদেরকে মুশরিক, কাফির, ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের সাথে যুদ্ধ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করছেন। মহান আল্লাহ বলেন, দেখো! আল্লাহর শত্রুরা কেমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ ব্যবহার করছে! ইয়াহূদীরা উযায়ের (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র বলছে (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক)। আল্লাহ এটা থেকে পবিত্র ও বহু ঊর্ধে যে, তার কোন পুত্র থাকবে! ঐ লোকেরা যে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে উযায়ের (আঃ) সম্পর্কে এ ধারণা পোষণ করেছিল তা এই যে, যখন আমালিকা সম্প্রদায় বানী ইসরাঈলের উপর জয়যুক্ত হয় এবং তাদের আলেমদেরকে হত্যা করে ও নেতৃস্থানীয় লোকদেরকে বন্দী করে ফেলে তখন ইলম উঠে যাওয়া, কিছু সংখ্যক আলেমের নিহত হওয়া এবং বানী ইসরাঈলদের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে উযায়ের (আঃ) অত্যন্ত মর্মাহত হন।
তিনি এমনভাবে কাঁদতে শুরু করেন যে, তাঁর চোখের অশ্রু বন্ধই হয় না। কাঁদতে কাঁদতে তাঁর চোখের পাতাগুলোও ঝরে পড়ে। একদা এভাবে ক্রন্দনরত। অবস্থায় একটি মাঠের মধ্য দিয়ে গমন করেন। এমন সময় দেখতে পান যে, একজন মহিলা একটি কবরের পার্শ্বে বসে ক্রন্দন করছে এবং মুখে উচ্চারণ করছে- “হায়! এখন আমার খাওয়া ও পরার ব্যবস্থা কি করে হবে?” এ দেখে উযায়ের (আঃ) সেখানে দাঁড়িয়ে যান এবং মহিলাটিকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এই লোকটির পূর্বে তোমার খাওয়া ও পরার ব্যবস্থা কে করতেন?” সে উত্তরে বলেঃ “আল্লাহ তা'আলা।” তখন তিনি তাকে বলেনঃ “তাহলে আল্লাহ তাআলা তো এখনো জীবিত রয়েছেন। তার তো কখনো মৃত্যু হয় না। তার এ কথা শুনে মহিলাটি উযায়ের (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করেঃ “তাহলে হে উযায়ের (আঃ)! আপনি বলুনতো- বানী ইসরাঈলের পূর্বে আলেমদেরকে বিদ্যা শিক্ষা দিতেন কে?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা।” তখন মহিলাটি বলেঃ “তাহলে আপনি এভাবে কেঁদে কেটে সময় কাটাচ্ছেন কেন?” তিনি এবার বুঝে নেন যে, এর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাঁকে সতর্ক করা হয়েছে। অতঃপর তাঁকে বলা হয়ঃ “তুমি অমুক নদীতে গিয়ে গোসল কর এবং দু'রাকআত সালাত আদায় কর । সেখানে তুমি একজন লোককে দেখতে পাবে। সে তোমাকে যা কিছু খেতে দেবে তা তুমি খেয়ে নিবে।”
কথামত উযায়ের (আঃ) সেখানে গমন করেন। গোসল করে তিনি সালাত আদায় করেন। অতঃপর তিনি সেখানে একটি লোককে দেখতে পান। লোকটি তাকে বলেনঃ “মুখ খুলুন!” তিনি মুখ খুলে দেন। তখন লোকটি পাথরের মত কি একটি জিনিস তিন বার তাঁর মুখে নিক্ষেপ করেন। তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তা'আলা তাঁর বক্ষ খুলে দেন। ফলে তিনি তাওরাতের সবচেয়ে বড় আলেম হয়ে যান। তারপর তিনি বানী ইসরাঈলের কাছে গিয়ে বলেনঃ “আমি তোমাদের কাছে তাওরাত নিয়ে এসেছি।” তারা তাকে বলেঃ “হে উযায়ের (আঃ)! আপনি মিথ্যাবাদী ছিলেন না।” এরপর তিনি অঙ্গুলির সাথে কলমকে জড়িয়ে ধরেন এবং ঐ অঙ্গুলি দ্বারাই একই সময় সম্পূর্ণ তাওরাত লিখে ফেলেন। এদিকে লোকেরা যুদ্ধ হতে ফিরে আসে। তাদের সাথে তাদের আলেমগণও ফিরে আসেন। তারা উযায়ের (আঃ)-এর ব্যাপারটা জানতে পারেন। সুতরাং তারা পাহাড়ে ও গুহার মধ্যে তাওরাতের যে পুস্তিকাগুলো লুকিয়ে রেখে এসেছিলেন সেগুলো বের করে আনেন। ঐ পুস্তিকাগুলোর সাথে উযায়ের (আঃ)-এর লিখিত পুস্তিকাগুলো তারা মিলিয়ে দেখেন। দেখা যায় যে, ওগুলোর সাথে তার নুসখা সম্পূর্ণরূপে মিলে গেছে। এতে কোন কোন অজ্ঞ লোকের অন্তরে এই শয়তানী ‘ওসওয়াসা পয়দা হয়ে যায় যে, তিনি আল্লাহর পুত্র। (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক)।
খ্রীষ্টানরা ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র বলতো (আমরা এর থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি)। তার ঘটনা তো সর্বজন বিদিত। সুতরাং এ দু'টি দলের ভুল বর্ণনা কুরআন কারীমে বর্ণিত হচ্ছে। আল্লাহ পাক বলেন, এটা তাদের মুখের কথা মাত্র। তাদের কাছে এর কোন দলীল নেই। ইতিপূর্বে তাদের পূর্ববর্তী লোকেরা যেমন কুফরী ও বিভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত ছিল, তদ্রুপ এরাও তাদের মুরীদ ও অন্ধ বিশ্বাসী। আল্লাহ তাদের প্রতি অভিসম্পাত বর্ষণ করুন! হক থেকে তারা কেমন বিভ্রান্ত হচ্ছে!
আদী ইবনে হাতিম (রাঃ)-এর কাছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দ্বীন যখন পৌঁছে তখন তিনি সিরিয়ার দিকে পালিয়ে যান। অজ্ঞতার যুগেই তিনি খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। এখানে তার ভগ্নি ও তার দলের লোকেরা বন্দী হয়ে যায় । রাসূলুল্লাহ (সঃ) দয়া পরবশ হয়ে তার ভগ্নিকে মুক্তি দেন এবং তাকে কিছু অর্থও প্রদান করেন। সে তখন সরাসরি তার ভাই-এর কাছে চলে যায় এবং তাঁকে ইসলাম গ্রহণে উৎসাহিত করে ও মদীনায় গমনের অনুরোধ করে। সুতরাং আদী (রাঃ) মদীনায় চলে আসেন। তিনি তার ‘তাঈ' গোত্রের নেতা ছিলেন। তাঁর পিতার দানশীলতা দুনিয়াব্যাপী প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তাঁর আগমনের সংবাদ অবহিত করেন। তিনি স্বয়ং তাঁর কাছে। আসেন। ঐ সময় আদী (রাঃ)-এর স্কন্ধে রৌপ্য নির্মিত ক্রুশ লটকানো ছিল । রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পবিত্র মুখে (আরবী) এ আয়াতটি উচ্চারিত হচ্ছিল। তখন আদী (রাঃ) বলেনঃ “ইয়াহূদী খ্রীষ্টানরা তো তাদের আলেম ও দরবেশদের উপাসনা করেনি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “তাহলে শুন! তারা তাদের আলেম ও দরবেশদের হারামকৃত বিষয়কে হারাম বলে মেনে নেয় এবং হালালকৃত বিষয়কে হালাল বলে স্বীকার করে নেয়। এটাই তাদেরকে তাদের উপাসনা করার শামিল।” অতঃপর তিনি বলেনঃ “হে আদী! আল্লাহ সবচেয়ে বড় এটা কি তুমি মেনে নিতে পার না? তোমার ধারণায় আল্লাহর চেয়ে বড় কেউ আছে কি? ‘আল্লাহ ছাড়া উপাসনার যোগ্য আর কেউ নেই' এটা কি তুমি অস্বীকার করছো? তোমার মতে কি তিনি ছাড়া অন্য কেউ ইবাদতের যোগ্য আছে?” অতঃপর তিনি তাকে ইসলামের দাওয়াত দেন। আদী (রাঃ) তা ককূল করে নেন এবং আল্লাহর একত্ববাদ ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদান করেন। এ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চেহারা মুবারক খুশীতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তিনি বলেনঃ “ইয়াহূদীদের উপর আল্লাহর ক্রোধ পতিত হয়েছে এবং খ্রীষ্টানরা পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রাঃ) এবং আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এ আয়াতের তাফসীর এরূপই বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে হারাম ও হালালের মাসআলায় আলেম ও ইমামদের কথার প্রতি তাদের অন্ধ অনুকরণ । সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, তারা তাদের বুযুর্গদের কথা মানতে শুরু করে এবং আল্লাহর কিতাবকে এক দিকে সরিয়ে দেয়। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেন, তাদেরকে তো শুধু এ নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, তারা আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করবে না। তিনি যেটা হারাম করেছেন সেটাই হারাম এবং তিনি যেটা হালাল করেছেন সেটাই হালাল। তাঁর ফরমানই হচ্ছে শরীয়ত। তাঁর হুকুমই মান্য করার যোগ্য। তাঁরই সত্তা ইবাদতের দাবীদার। তিনি শিক ও শরীক হতে পবিত্র। তাঁর কোন শরীক, কোন নবীর ও কোন সাহায্যকারী নেই। তাঁর বিপরীতও কেউ নেই। তিনি সন্তান-সন্ততি থেকে পবিত্র। তিনি ছাড়া না আছে কোন উপাস্য, না আছে কোন প্রতিপালক।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।