সূরা আত-তাওবা (আয়াত: 30)
হরকত ছাড়া:
وقالت اليهود عزير ابن الله وقالت النصارى المسيح ابن الله ذلك قولهم بأفواههم يضاهئون قول الذين كفروا من قبل قاتلهم الله أنى يؤفكون ﴿٣٠﴾
হরকত সহ:
وَ قَالَتِ الْیَهُوْدُ عُزَیْرُۨ ابْنُ اللّٰهِ وَ قَالَتِ النَّصٰرَی الْمَسِیْحُ ابْنُ اللّٰهِ ؕ ذٰلِکَ قَوْلُهُمْ بِاَفْوَاهِهِمْ ۚ یُضَاهِـُٔوْنَ قَوْلَ الَّذِیْنَ کَفَرُوْا مِنْ قَبْلُ ؕ قٰتَلَهُمُ اللّٰهُ ۚ۫ اَنّٰی یُؤْفَکُوْنَ ﴿۳۰﴾
উচ্চারণ: ওয়া কা-লাতিল ইয়াহূদু‘ঊযাইরুনিবনুল্লা-হি ওয়াকা-লাতিন নাসা-রাল মাছীহুবনুল্লা-হি যা-লিকা কাওলুহুম বিআফওয়া-হিহিম ইউদা-হিঊনা কাওলাল্লাযীনা কাফারূ মিন কাবলু কা-তালাহুমুল্লা-হু; আন্না-ইউ’ফাকূন।
আল বায়ান: আর ইয়াহূদীরা বলে, উযাইর আল্লাহর পুত্র এবং নাসারারা বলে, মাসীহ আল্লাহর পুত্র। এটা তাদের মুখের কথা, তারা সেসব লোকের কথার অনুরূপ বলছে যারা ইতঃপূর্বে কুফরী করেছে। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন, কোথায় ফেরানো হচ্ছে এদেরকে?
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩০. আর ইয়াহুদীরা বলে, উযাইর আল্লাহর পুত্র(১), এবং নাসারারা বলে, মসীহ আল্লাহর পুত্র এটা তাদের মুখের কথা। আগে যারা কুফরী করেছিল তারা তাদের মত কথা বলে। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন। কোন দিকে তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে!(২)
তাইসীরুল ক্বুরআন: ইয়াহূদীরা বলে, ‘উযায়র আল্লাহর পুত্র। আর নাসারারা বলে, ‘মাসীহ আল্লাহর পুত্র। এসব তাদের মুখের কথা। এতে তারা তাদের পূর্বেকার কাফিরদের কথারই অনুকরণ করে। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন! কেমনভাবে তারা সত্য পথ থেকে দূরে ছিটকে পড়েছে।
আহসানুল বায়ান: (৩০) আর ইয়াহুদীরা বলে, ‘উযাইর আল্লাহর পুত্র’ এবং খ্রিষ্টানরা বলে, ‘মসীহ আল্লাহর পুত্র।’ এটা তাদের মুখের কথা মাত্র (বাস্তবে তা কিছুই নয়)। তারা তো তাদের মতই কথা বলছে, যারা তাদের পূর্বে অবিশ্বাস করেছে। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন, তারা উল্টা কোন্ দিকে যাচ্ছে!
মুজিবুর রহমান: ইয়াহুদীরা বলেঃ উযায়ের আল্লাহর পুত্র এবং নাসারারা বলেঃ মাসীহ্ আল্লাহর পুত্র। এটা তাদের মুখের কথা মাত্র (বাস্তবে তা কিছুই নয়), তারাতো তাদের মতই কথা বলছে যারা তাদের পূর্বে কাফির হয়েছে। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন! তারা উল্টা কোন দিকে যাচ্ছে!
ফযলুর রহমান: ইহুদিরা বলে ওযায়ের আল্লাহর পুত্র এবং খ্রিষ্টানরা বলে মসীহ (ঈসা) আল্লাহর পুত্র। এ হচ্ছে তাদেরই মুখের কথা। তারা পূর্ববর্তী কাফেরদের মতই কথা বলছে। তাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ পড়ুক; তারা কীভাবে সত্য থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছে!
মুহিউদ্দিন খান: ইহুদীরা বলে ওযাইর আল্লাহর পুত্র এবং নাসারারা বলে ‘মসীহ আল্লাহর পুত্র’। এ হচ্ছে তাদের মুখের কথা। এরা পূর্ববর্তী কাফেরদের মত কথা বলে। আল্লাহ এদের ধ্বংস করুন, এরা কোন উল্টা পথে চলে যাচ্ছে।
জহুরুল হক: আর ইহুদীরা বলে -- "উযাইর আল্লাহ্র পুত্র", আর খ্রীষ্টানরা বলে -- "মসীহ আল্লাহ্র পুত্র।" এসব হচ্ছে তাদের মুখ দিয়ে তাদের বুলি আওড়ানো, -- তারা ওদের কথার অনুসরণ করে যারা পূর্বকালে অবিশ্বাস পোষণ করেছিল। আল্লাহ্ তাদের ধ্বংস করবেন। তারা কেমন ক’রে বিমুখ হয়!
Sahih International: The Jews say, "Ezra is the son of Allah "; and the Christians say, "The Messiah is the son of Allah." That is their statement from their mouths; they imitate the saying of those who disbelieved [before them]. May Allah destroy them; how are they deluded?
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩০. আর ইয়াহুদীরা বলে, উযাইর আল্লাহর পুত্র(১), এবং নাসারারা বলে, মসীহ আল্লাহর পুত্র এটা তাদের মুখের কথা। আগে যারা কুফরী করেছিল তারা তাদের মত কথা বলে। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন। কোন দিকে তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে!(২)
তাফসীর:
(১) আয়াতের ভাষ্য হতে বুঝা যায় যে, ইয়াহুদীদের সবাই এ কথা বলেছিল। কারও কারও মতে, এটি ইয়াহুদীদের এক গোষ্ঠী বলেছিল। সমস্ত ইয়াহুদীদের আকীদা বিশ্বাস নয়। [কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর] কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, সাল্লাম ইবন মিশকাম, নুমান ইবন আওফা, শাস ইবন কায়স ও মালেক ইবনুস সাইফ তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বলল, আমরা কিভাবে আপনার অনুসরণ করতে পারি, অথচ আপনি আমাদের কেবলা ত্যাগ করেছেন, আপনি উযায়েরকে আল্লাহর পুত্র বলে মেনে নেন না? তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত নাযিল করলেন। [তাবারী; সীরাতে ইবন হিশাম ১/৫৭০]
উযায়ের সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে যে, ইয়াহুদীরা যখন তাওরাত হারিয়ে ফেলেছিল তখন উযায়ের সেটা তার মুখস্থ থেকে পুণরায় জানিয়ে দিয়েছিল। তাই তাদের মনে হলো যে, এটা আল্লাহর পুত্র হবে, না হয় কিভাবে এটা করতে পারল। [সা’দী; কুরতুবী; ইবন কাসীর] এটা নিঃসন্দেহে একটি মিথ্যা কথা যে, উযায়ের তাদেরকে মূল তাওরাত তার মুখস্থ শক্তি দিয়ে এনে দিয়েছিল। কারণ উযায়ের কোন নবী হিসেবেও আমাদের কাছে প্রমাণিত হয়নি। এর মাধ্যমে ইয়াহুদীরা তাদের হারিয়ে যাওয়া গ্রন্থের ধারাবাহিকতা প্রমাণ করতে চেষ্টা করে। কিন্তু সেটা তাদের দাবী মাত্র। ঐতিহাসিকভাবে এমন কিছু প্রমাণিত হয়নি। [দেখুন, ড. সাউদ ইবন আবদুল আযীয, দিরাসাতুন ফিল আদইয়ান- আল-ইয়াহুদিয়াহ ওয়ান নাসরানিয়্যাহ]
(২) এ আয়াতটি হলো পূর্বের আয়াতের ব্যাখ্যা। পূর্বে আয়াতে মোটামুটিভাবে বলা হয় যে, তারা আল্লাহর উপর ঈমান রাখে না। এখানে তার ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয় যে, ইহুদীরা উযাইরকে আর নাসারারা ঈসা আলাইহিস সালামকে আল্লাহর পুত্র সাব্যস্ত করে। [ইবন কাসীর] তাই তাদের ঈমান ও তাওহীদের দাবী নিরর্থক। এরপর বলা হয়ঃ “এটি তাদের মুখের কথা”। এর অর্থ তারা মুখে যে কুফর উক্তি করে যাচ্ছে তার পেছনে না কোন দলীল আছে, না কোন যুক্তি। কত মারাত্মক সে উক্তি যা তারা করে যাচ্ছে। অন্য আয়াতেও আল্লাহ তা বলেছেন, “এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান নেই এবং তাদের পিতৃপুরুষদেরও ছিল না। তাদের মুখ থেকে বের হওয়া বাক্য কী সাংঘাতিক। তারা তো শুধু মিথ্যাই বলে।” [সূরা আল-কাহাফ: ৫]
অতঃপর বলা হয়ঃ এরা পূর্ববর্তী কাফেরদের মত কথা বলে, আল্লাহ এদের ধ্বংস করুন। এরা কোন উল্টা পথে চলে যাচ্ছে। [ইবন কাসীর] এর অর্থ হল ইয়াহুদী ও নাসারারা নবীগণকে আল্লাহর পুত্র বলে পুর্ববর্তী কাফের ও মুশরিকদের মতই হয়ে গেল, তারা ফেরেশতা ও লাত মানাত মূর্তিদ্বয়কে আল্লাহর কন্যা সাব্যস্ত করেছিল। [বাগভী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩০) আর ইয়াহুদীরা বলে, ‘উযাইর আল্লাহর পুত্র’ এবং খ্রিষ্টানরা বলে, ‘মসীহ আল্লাহর পুত্র।’ এটা তাদের মুখের কথা মাত্র (বাস্তবে তা কিছুই নয়)। তারা তো তাদের মতই কথা বলছে, যারা তাদের পূর্বে অবিশ্বাস করেছে। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন, তারা উল্টা কোন্ দিকে যাচ্ছে!
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩০-৩৩ নং আয়াতের তাফসীর:
ইয়াহূদীরা বলে: উযাইর আল্লাহ তা‘আলার ছেলে আর খ্রিস্টানরা বলে, ঈসা (রাঃ) আল্লাহ তা‘আলার ছেলে। উভয় দলই এ কথা বলার কারণে কাফির। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(لَقَدْ كَفَرَ الَّذِيْنَ قَالُوْآ إِنَّ اللّٰهَ هُوَ الْمَسِيْحُ ابْنُ مَرْيَمَ ط قُلْ فَمَنْ يَّمْلِكُ مِنَ اللّٰهِ شَيْئًا إِنْ أَرَادَ أَنْ يُّهْلِكَ الْمَسِيْحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَأُمَّه۫ )
“যারা বলে, ‘মারিয়ামের ছেলে মাসীহ-ই আল্লাহ’, তারা অবশ্যই কুফরী করেছে। বল: আল্লাহ মারিয়ামের ছেলে মাসীহ, তাঁর মা এবং দুনিয়ার সকলকে যদি ধ্বংস করতে ইচ্ছা করেন তবে তাঁকে বাধা দেয়ার শক্তি কারো আছে?’ (সূরা মায়িদাহ ৫:১৭) আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(لَقَدْ كَفَرَ الَّذِيْنَ قَالُوْآ إِنَّ اللّٰهَ ثَالِثُ ثَلٰثَةٍ ﻣ وَمَا مِنْ إلٰهٍ إِلَّآ إِلٰهٌ وَّاحِدٌ)
“যারা বলে, ‘আল্লাহ তো তিনের মধ্যে একজন তারা কুফরী করেছে- এক মা‘বূদ ব্যতীত অন্য কোন সত্য মা‘বূদ নেই।” (সূরা মায়িদাহ ৫:৭৩)
(اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ)
‘তারা আল্লাহ ব্যতীত তাদের পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগিদেরকে প্রভুরূপে গ্রহণ করেছে’ এ আয়াতের তাফসীর আদী বিন হাতিম কর্তৃক বর্ণিত হাদীস দ্বারা পরিষ্কার হয়ে যায়। তিনি বলেন: একদা নাবী (সাঃ)-এর মুখে এ আয়াত তেলাওয়াত করতে শুনতে পাই। তখন আমি বললাম, আমরা তো তাদের ইবাদত করিনা। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন: আল্লাহ তা‘আলা যা হালাল করেছেন সেটা কি তারা হারাম করে দেয়না? অতঃপর তোমরাও তা হারাম হিসেবে গ্রহণ করে নাও। আল্লাহ তা‘আলা যা হারাম করে দিয়েছেন- তারা কি সেটা হালাল করে দেয়না? অতঃপর তোমরা তা হালাল হিসেবে গ্রহণ করে নাও। আমি বললাম: হ্যাঁ, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন: এটাই তাদের ইবাদত করা। (সহীহ তিরমিযী হা: ২৪৭১) কেননা হালাল হারামের বিধানদাতা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা।
অর্থাৎ ধর্মীয় যাজক, পীর, আলেম বা শাসক আল্লাহ তা‘আলার বিধানের বিপরীত কোন বিধান দিলে তা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেয়া তাদের রব হিসেবে গ্রহণ করার শামিল।
(أَنْ يُطْفِئُوْا نُوْرَ اللّٰهِ)
‘আল্লাহর জ্যোতি নিভিয়ে দিতে চায়’ অর্থাৎ কাফিররা চায় দীন ইসলামকে তাদের বাক-বিতণ্ডা ও মিথ্যা অপবাদ দ্বারা দুনিয়া থেকে মিটিয়ে দিতে। তাদের এসব কাজের দৃষ্টান্ত এমন যে, কেউ মুখে ফুৎকার দিয়ে সূর্যের বা চন্দ্রের কিরণ নিভিয়ে দিতে চায়। আল্লাহ তা‘আলা তার দীনকে বিজয়ী করবেনই, যদিও কাফির মুশরিকরা অপছন্দ করে। আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:
(یُرِیْدُوْنَ لِیُطْفِئُوْا نُوْرَ اللہِ بِاَفْوَاھِھِمْ وَاللہُ مُتِمُّ نُوْرِھ۪ وَلَوْ کَرِھَ الْکٰفِرُوْنَ , هُوَ الَّذِیْٓ اَرْسَلَ رَسُوْلَھ۫ بِالْھُدٰی وَدِیْنِ الْحَقِّ لِیُظْھِرَھ۫ عَلَی الدِّیْنِ کُلِّھ۪ وَلَوْ کَرِھَ الْمُشْرِکُوْنَ)
“তারা তাদের মুখের ফুৎকারে আল্লাহর নূর নিভিয়ে দিতে চায়; কিন্তু আল্লাহ তাঁর নূরকে পরিপূর্ণ করবেনই, যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে। তিনিই তাঁর রাসূলকে প্রেরণ করেছেন হিদায়েত এবং সত্য দীনসহ সকল দীনের ওপর তাকে বিজয়ী করার জন্য, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।”(সূরা সাফ ৬১:৮-৯)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: ভূ-পৃষ্ঠে এমন কোন কাঁচা ও পাকা ঘর বাকি থাকবে না যেখানে আল্লাহ তা‘আলা ইসলামের কালিমাকে প্রবেশ করাবেন না।
তিনি মর্যাদাবানদের মর্যাদা দেবেন এবং লাঞ্ছিতদের লাঞ্ছিত করবেন। যাদেরকে তিনি মর্যাদা দানের ইচ্ছা করবেন তাদেরকে ইসলামে প্রবেশ করার সৌভাগ্য দেবেন আর যাদেরকে লাঞ্ছিত করার ইচ্ছা করবেন তাদেরকে মুসলিমদের অধীনস্থ করে রাখবেন। (আহমাদ হা: ২৩৮১৪)
অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: আল্লাহ তা‘আলা আমাকে ভূ-পৃষ্ঠের পূর্ব-পশ্চিম সমস্ত পৃথিবীকে গুটিয়ে দেখিয়েছেন। অচিরেই আমাকে যে পর্যন্ত দেখানো হয়েছে ততদূর আমার উম্মাতের রাজত্ব পৌঁছাবে। (সহীহ মুসলিম হা: ২২১৫) কোন শাসক বা আলেম ও পীর-বুজুর্গ ইসলামের কোন বিধানকে পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখেনা। অতএব যারা আল্লাহ তা‘আলার বিধানের পরিবর্তন করবে এবং যারা তাদের সেসব বিধান মাথা পেতে মেনে নেবে তারা মূলত তাদেরকে বর হিসেবে গ্রহণ করে এবং তাগুতকেই প্রতিষ্ঠা করে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. যারা বলে ঈসা (রাঃ), উযাইর বা যে কোন মানুষ আল্লাহ তা‘আলার ছেলে তারা কাফির।
২. আল্লাহ তা‘আলা যা হারাম করেছেন তা কোন আলিম বা রাষ্ট্র প্রধান হালাল করে দিলে আর কেউ তা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিলে সেই আলিম বা রাষ্ট্রপ্রধানকে রব হিসেবে গ্রহণ করা হবে।
৩. আল্লাহ তা‘আলার দীনকে বিজয়ী করতে কেউ বাধা দিতে পারবে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৩০-৩১ নং আয়াতের তাফসীর:
এ আয়াতগুলোতেও মহা মহিমান্বিত আল্লাহ মুমিনদেরকে মুশরিক, কাফির, ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের সাথে যুদ্ধ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করছেন। মহান আল্লাহ বলেন, দেখো! আল্লাহর শত্রুরা কেমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ ব্যবহার করছে! ইয়াহূদীরা উযায়ের (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র বলছে (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক)। আল্লাহ এটা থেকে পবিত্র ও বহু ঊর্ধে যে, তার কোন পুত্র থাকবে! ঐ লোকেরা যে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে উযায়ের (আঃ) সম্পর্কে এ ধারণা পোষণ করেছিল তা এই যে, যখন আমালিকা সম্প্রদায় বানী ইসরাঈলের উপর জয়যুক্ত হয় এবং তাদের আলেমদেরকে হত্যা করে ও নেতৃস্থানীয় লোকদেরকে বন্দী করে ফেলে তখন ইলম উঠে যাওয়া, কিছু সংখ্যক আলেমের নিহত হওয়া এবং বানী ইসরাঈলদের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে উযায়ের (আঃ) অত্যন্ত মর্মাহত হন।
তিনি এমনভাবে কাঁদতে শুরু করেন যে, তাঁর চোখের অশ্রু বন্ধই হয় না। কাঁদতে কাঁদতে তাঁর চোখের পাতাগুলোও ঝরে পড়ে। একদা এভাবে ক্রন্দনরত। অবস্থায় একটি মাঠের মধ্য দিয়ে গমন করেন। এমন সময় দেখতে পান যে, একজন মহিলা একটি কবরের পার্শ্বে বসে ক্রন্দন করছে এবং মুখে উচ্চারণ করছে- “হায়! এখন আমার খাওয়া ও পরার ব্যবস্থা কি করে হবে?” এ দেখে উযায়ের (আঃ) সেখানে দাঁড়িয়ে যান এবং মহিলাটিকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এই লোকটির পূর্বে তোমার খাওয়া ও পরার ব্যবস্থা কে করতেন?” সে উত্তরে বলেঃ “আল্লাহ তা'আলা।” তখন তিনি তাকে বলেনঃ “তাহলে আল্লাহ তাআলা তো এখনো জীবিত রয়েছেন। তার তো কখনো মৃত্যু হয় না। তার এ কথা শুনে মহিলাটি উযায়ের (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করেঃ “তাহলে হে উযায়ের (আঃ)! আপনি বলুনতো- বানী ইসরাঈলের পূর্বে আলেমদেরকে বিদ্যা শিক্ষা দিতেন কে?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা।” তখন মহিলাটি বলেঃ “তাহলে আপনি এভাবে কেঁদে কেটে সময় কাটাচ্ছেন কেন?” তিনি এবার বুঝে নেন যে, এর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাঁকে সতর্ক করা হয়েছে। অতঃপর তাঁকে বলা হয়ঃ “তুমি অমুক নদীতে গিয়ে গোসল কর এবং দু'রাকআত সালাত আদায় কর । সেখানে তুমি একজন লোককে দেখতে পাবে। সে তোমাকে যা কিছু খেতে দেবে তা তুমি খেয়ে নিবে।”
কথামত উযায়ের (আঃ) সেখানে গমন করেন। গোসল করে তিনি সালাত আদায় করেন। অতঃপর তিনি সেখানে একটি লোককে দেখতে পান। লোকটি তাকে বলেনঃ “মুখ খুলুন!” তিনি মুখ খুলে দেন। তখন লোকটি পাথরের মত কি একটি জিনিস তিন বার তাঁর মুখে নিক্ষেপ করেন। তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তা'আলা তাঁর বক্ষ খুলে দেন। ফলে তিনি তাওরাতের সবচেয়ে বড় আলেম হয়ে যান। তারপর তিনি বানী ইসরাঈলের কাছে গিয়ে বলেনঃ “আমি তোমাদের কাছে তাওরাত নিয়ে এসেছি।” তারা তাকে বলেঃ “হে উযায়ের (আঃ)! আপনি মিথ্যাবাদী ছিলেন না।” এরপর তিনি অঙ্গুলির সাথে কলমকে জড়িয়ে ধরেন এবং ঐ অঙ্গুলি দ্বারাই একই সময় সম্পূর্ণ তাওরাত লিখে ফেলেন। এদিকে লোকেরা যুদ্ধ হতে ফিরে আসে। তাদের সাথে তাদের আলেমগণও ফিরে আসেন। তারা উযায়ের (আঃ)-এর ব্যাপারটা জানতে পারেন। সুতরাং তারা পাহাড়ে ও গুহার মধ্যে তাওরাতের যে পুস্তিকাগুলো লুকিয়ে রেখে এসেছিলেন সেগুলো বের করে আনেন। ঐ পুস্তিকাগুলোর সাথে উযায়ের (আঃ)-এর লিখিত পুস্তিকাগুলো তারা মিলিয়ে দেখেন। দেখা যায় যে, ওগুলোর সাথে তার নুসখা সম্পূর্ণরূপে মিলে গেছে। এতে কোন কোন অজ্ঞ লোকের অন্তরে এই শয়তানী ‘ওসওয়াসা পয়দা হয়ে যায় যে, তিনি আল্লাহর পুত্র। (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক)।
খ্রীষ্টানরা ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র বলতো (আমরা এর থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি)। তার ঘটনা তো সর্বজন বিদিত। সুতরাং এ দু'টি দলের ভুল বর্ণনা কুরআন কারীমে বর্ণিত হচ্ছে। আল্লাহ পাক বলেন, এটা তাদের মুখের কথা মাত্র। তাদের কাছে এর কোন দলীল নেই। ইতিপূর্বে তাদের পূর্ববর্তী লোকেরা যেমন কুফরী ও বিভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত ছিল, তদ্রুপ এরাও তাদের মুরীদ ও অন্ধ বিশ্বাসী। আল্লাহ তাদের প্রতি অভিসম্পাত বর্ষণ করুন! হক থেকে তারা কেমন বিভ্রান্ত হচ্ছে!
আদী ইবনে হাতিম (রাঃ)-এর কাছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দ্বীন যখন পৌঁছে তখন তিনি সিরিয়ার দিকে পালিয়ে যান। অজ্ঞতার যুগেই তিনি খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। এখানে তার ভগ্নি ও তার দলের লোকেরা বন্দী হয়ে যায় । রাসূলুল্লাহ (সঃ) দয়া পরবশ হয়ে তার ভগ্নিকে মুক্তি দেন এবং তাকে কিছু অর্থও প্রদান করেন। সে তখন সরাসরি তার ভাই-এর কাছে চলে যায় এবং তাঁকে ইসলাম গ্রহণে উৎসাহিত করে ও মদীনায় গমনের অনুরোধ করে। সুতরাং আদী (রাঃ) মদীনায় চলে আসেন। তিনি তার ‘তাঈ' গোত্রের নেতা ছিলেন। তাঁর পিতার দানশীলতা দুনিয়াব্যাপী প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তাঁর আগমনের সংবাদ অবহিত করেন। তিনি স্বয়ং তাঁর কাছে। আসেন। ঐ সময় আদী (রাঃ)-এর স্কন্ধে রৌপ্য নির্মিত ক্রুশ লটকানো ছিল । রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পবিত্র মুখে (আরবী) এ আয়াতটি উচ্চারিত হচ্ছিল। তখন আদী (রাঃ) বলেনঃ “ইয়াহূদী খ্রীষ্টানরা তো তাদের আলেম ও দরবেশদের উপাসনা করেনি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “তাহলে শুন! তারা তাদের আলেম ও দরবেশদের হারামকৃত বিষয়কে হারাম বলে মেনে নেয় এবং হালালকৃত বিষয়কে হালাল বলে স্বীকার করে নেয়। এটাই তাদেরকে তাদের উপাসনা করার শামিল।” অতঃপর তিনি বলেনঃ “হে আদী! আল্লাহ সবচেয়ে বড় এটা কি তুমি মেনে নিতে পার না? তোমার ধারণায় আল্লাহর চেয়ে বড় কেউ আছে কি? ‘আল্লাহ ছাড়া উপাসনার যোগ্য আর কেউ নেই' এটা কি তুমি অস্বীকার করছো? তোমার মতে কি তিনি ছাড়া অন্য কেউ ইবাদতের যোগ্য আছে?” অতঃপর তিনি তাকে ইসলামের দাওয়াত দেন। আদী (রাঃ) তা ককূল করে নেন এবং আল্লাহর একত্ববাদ ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদান করেন। এ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চেহারা মুবারক খুশীতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তিনি বলেনঃ “ইয়াহূদীদের উপর আল্লাহর ক্রোধ পতিত হয়েছে এবং খ্রীষ্টানরা পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রাঃ) এবং আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এ আয়াতের তাফসীর এরূপই বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে হারাম ও হালালের মাসআলায় আলেম ও ইমামদের কথার প্রতি তাদের অন্ধ অনুকরণ । সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, তারা তাদের বুযুর্গদের কথা মানতে শুরু করে এবং আল্লাহর কিতাবকে এক দিকে সরিয়ে দেয়। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেন, তাদেরকে তো শুধু এ নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, তারা আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করবে না। তিনি যেটা হারাম করেছেন সেটাই হারাম এবং তিনি যেটা হালাল করেছেন সেটাই হালাল। তাঁর ফরমানই হচ্ছে শরীয়ত। তাঁর হুকুমই মান্য করার যোগ্য। তাঁরই সত্তা ইবাদতের দাবীদার। তিনি শিক ও শরীক হতে পবিত্র। তাঁর কোন শরীক, কোন নবীর ও কোন সাহায্যকারী নেই। তাঁর বিপরীতও কেউ নেই। তিনি সন্তান-সন্ততি থেকে পবিত্র। তিনি ছাড়া না আছে কোন উপাস্য, না আছে কোন প্রতিপালক।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।