সূরা আল-আনফাল (আয়াত: 25)
হরকত ছাড়া:
واتقوا فتنة لا تصيبن الذين ظلموا منكم خاصة واعلموا أن الله شديد العقاب ﴿٢٥﴾
হরকত সহ:
وَ اتَّقُوْا فِتْنَۃً لَّا تُصِیْبَنَّ الَّذِیْنَ ظَلَمُوْا مِنْکُمْ خَآصَّۃً ۚ وَ اعْلَمُوْۤا اَنَّ اللّٰهَ شَدِیْدُ الْعِقَابِ ﴿۲۵﴾
উচ্চারণ: ওয়াত্তাকূফিতনাতাল লা-তুসীবান্নাল্লাযীনা জালামূমিনকুম খাসসাতাওঁ ওয়া‘লামূআন্নাল্লা-হা শাদীদুল ‘ইকা-ব।
আল বায়ান: আর তোমরা ভয় কর ফিতনাকে* যা তোমাদের মধ্য থেকে বিশেষভাবে শুধু যালিমদের উপরই আপতিত হবে না। আর জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ আযাব প্রদানে কঠোর।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৫. আর তোমরা ফেৎনা থেকে বেঁচে থাক যা বিশেষ করে তোমাদের মধ্যে যারা যালিম শুধু তাদের উপরই আপতিত হবে না। আর জেনে রাখ যে, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: সতর্ক থাক সেই শাস্তি হতে যা বিশেষভাবে তোমাদের যালিম লোকেদেরকেই আক্রমন করবে না। আর জেনে রেখ যে আল্লাহ শাস্তিদানে খুবই কঠোর।
আহসানুল বায়ান: (২৫) তোমরা সেই ফিতনাকে ভয় কর, যা বিশেষ করে তোমাদের মধ্যে যারা অত্যাচারী কেবল তাদেরই ক্লিষ্ট করবে না[1] এবং জেনে রাখ যে, আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর।
মুজিবুর রহমান: তোমরা সেই ফিতনাকে ভয় কর যা তোমাদের মধ্যকার শুধুমাত্র যালিম ও পাপিষ্ঠদেরকেই বিশেষভাবে ক্লিষ্ট করবেনা। তোমরা জেনে রেখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তি দানে খুবই কঠোর।
ফযলুর রহমান: তোমরা এমন বিপদকে ভয় করবে যা তোমাদের মধ্যে শুধুমাত্র জালেমদের ওপরই আসবে না। আর জেনে রেখো, আল্লাহর শাস্তি বড় কঠোর।
মুহিউদ্দিন খান: আর তোমরা এমন ফাসাদ থেকে বেঁচে থাক যা বিশেষতঃ শুধু তাদের উপর পতিত হবে না যারা তোমাদের মধ্যে জালেম এবং জেনে রেখ যে, আল্লাহর আযাব অত্যন্ত কঠোর।
জহুরুল হক: আর ধর্মভীরুতা অবলন্বন করো সেই বিপদ সন্বন্ধে যা তোমাদের মধ্যের যারা অত্যাচারী শুধুমাত্র তাদের উপরেই পড়ে না। আর জেনে রেখো যে আল্লাহ্ আলবৎ প্রতিফল দানে কঠোর।
Sahih International: And fear a trial which will not strike those who have wronged among you exclusively, and know that Allah is severe in penalty.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২৫. আর তোমরা ফেৎনা থেকে বেঁচে থাক যা বিশেষ করে তোমাদের মধ্যে যারা যালিম শুধু তাদের উপরই আপতিত হবে না। আর জেনে রাখ যে, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর।(১)
তাফসীর:
(১) এ আয়াতে কিছু পাপ থেকে বেঁচে থাকার জন্য বিশেষভাবে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কারণ, পাপের আযাব শুধু পাপীদের পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং পাপ করেনি এমন লোকও তাতে জড়িয়ে পড়ে। সে পাপ যে কি, সে সম্পর্কে মুফাসসিরীন ওলামায়ে কেরামের বিভিন্ন মত রয়েছে। কেউ কেউ বলেনঃ এখানে ফেতনা বলতে সে সব সামাজিক সামগ্রিক ফেতনা বুঝানো হয়েছে, যা এক সংক্রামক ব্যাধির মত জন-সমাজে ছড়িয়ে পড়ে, যাতে কেবল গোনাহগার লোকরাই নিপতিত হয় না, সে লোকেরাও এতে পড়ে মার খায়, যারা গোনাহগার সমাজে বসবাস করাকে বরদাশত করে থাকে। [ইবন কাসীর]
মুতাররিফ বলেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবন যুবাইরকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আবু আবদিল্লাহ! আপনারা কী জন্য এসেছেন? আপনারা এক খলীফা (উসমান) কে নিঃশেষ করে দিয়েছেন। তারপর তার রক্তের দাবী নিয়ে এসেছেন। তখন আব্দুল্লাহ ইবন যুবাইর বললেন, আমরা (وَاتَّقُوا فِتْنَةً) ... এ আয়াতটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আবু বকর, উমর ও উসমানের সময় পড়েছিলাম, কিন্তু আমরা মনে করেনি যে, আমরাই এর দ্বারা উদ্দিষ্ট। শেষ পর্যন্ত তা আমাদের মধ্যেই যেভাবে ঘটার ঘটে গেল। [মুসনাদে আহমাদ: ১/১৬৫] [ইবন কাসীর]
কোন কোন মুফাসসির বলেনঃ আমর বিল মা’রূফ তথা সৎকাজের নির্দেশ দান এবং নাহী আনিল মুনকার অর্থাৎ অসৎকাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখার চেষ্টা পরিহার করাই হল এই পাপ। [ইবন কাসীর] আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ আল্লাহ মানুষকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন তারা নিজের এলাকায় কোন অপরাধ ও পাপানুষ্ঠান হতে না দেয়। কারণ, যদি তারা এমন না করে, অর্থাৎ সামর্থ্য থাকা সত্বেও অপরাধ ও পাপকৰ্ম অনুষ্ঠিত হতে দেখে তা থেকে বারণ না করে, তবে আল্লাহ স্বীয় আযাব সবার উপরই ব্যাপক করে দেন। [তাবারী] তখন তা থেকে না বাঁচতে পারে কোন গোনাহগার, আর না বাচতে পারে নিরপরাধ।
এখানে নিরপরাধ বলতে সেসব লোককেই বোঝানো হচ্ছে যারা মূল পাপে পাপীদের সাথে অংশগ্রহণ করেনি, কিন্তু তারাও আমর বিল মা’রূফ বর্জন করার পাপে পাপী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যখন কোন জাতির এমন অবস্থার উদ্ভব হয় যে, সে নিজের এলাকায় পাপকৰ্ম অনুষ্ঠিত হতে দেখে বাধা দানের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তাতে বাধা দেয় না, তখন আল্লাহর আযাব সবাইকে ঘিরে ফেলে। [আবু দাউদঃ ৩৭৭৬, ইবন মাজাহঃ ৩৯৯৯]
আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তার এক ভাষণে বলেছেন যে, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন যে, মানুষ যখন কোন অত্যাচারীকে দেখেও অত্যাচার থেকে তার হাতকে প্রতিরোধ করবে না, শীঘ্রই আল্লাহ তাদের সবার উপর ব্যাপক আযাব নাযিল করবেন। [আবু দাউদঃ ৩৭৭৫, তিরমিযীঃ ২০৯৪]
নুমান ইবন বশীর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যারা আল্লাহর কানুনের সীমালংঘনকারী গোনাহগার এবং যারা তাদের দেখেও মৌনতা অবলম্বন করে, অর্থাৎ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তাদেরকে সেই পাপানুষ্ঠান থেকে বাধা দান করে না, এতদুভয় শ্রেণীর উদাহরণ এমন একটি সামুদ্রিক জাহাজের মত যাতে দুটি শ্রেণী রয়েছে এবং নীচের শ্রেণীর লোকেরা উপরে উঠে এসে নিজেদের প্রয়োজনে পানি নিয়ে যায়, যাতে উপরের লোকেরা কষ্ট অনুভব করে। নীচের লোকেরা বলে বসে যে, যদি আমরা জাহাজের তলায় ছিদ্র করে নিজেদের কাজের জন্য পানি সংগ্রহ করতে শুরু করি, তবে আমরা আমাদের উপরের লোকদের কষ্ট দেয়া থেকে অব্যাহতি পাব। এখন যদি নিচের লোকদেরকে এ কাজ করতে দেয়া হয় এবং বাধা না দেয়া হয়, তবে বলাবাহুল্য যে, গোটা জাহাজেই পানি ঢুকে পড়বে। আর তাতে নীচের লোকেরা যখন ডুবে মরবে, তখন উপরের লোকেরাও বাঁচতে পারবে না’। [সহীহ আল-বুখারীঃ ২৪৯৩]
এসব বর্ণনার ভিত্তিতে অনেক মুফাসসির মনীষী সাব্যস্ত করেছেন যে, এ আয়াতে فتنة (ফিত্নাহ) বলতে এই পাপ অর্থাৎ সৎকাজের নির্দেশ দান ও অসৎ কাজে বাধা দান বর্জনকেই বোঝানো হয়েছে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২৫) তোমরা সেই ফিতনাকে ভয় কর, যা বিশেষ করে তোমাদের মধ্যে যারা অত্যাচারী কেবল তাদেরই ক্লিষ্ট করবে না[1] এবং জেনে রাখ যে, আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর।
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, দোষী-নির্দোষ সকলকেই করবে। এই ফিতনা থেকে উদ্দেশ্য, মানুষের এক অপরের উপর ক্ষমতার অধিকারী হয়ে নির্বিচারে সকলের উপর অত্যাচার করে। অথবা ব্যাপক আযাব বা শাস্তি, যেমন অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, বন্যা ইত্যাদি, যা আকাশ ও পৃথিবী হতে প্রাকৃতিক দুর্যোগরূপে নেমে আসে, যাতে সৎ-অসৎ সবাই প্রভাবিত হয়। অথবা কিছু হাদীসে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধাদান ছেড়ে দিলে যে শাস্তির সতর্কবাণী শোনানো হয়েছে, এখানে তাকেই ‘ফিতনা’ বলে ব্যক্ত করা হয়েছে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২৪-২৬ নং আয়াতের তাফসীরঃ
ঈমানদারদেরকে আহ্বান করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তোমরা আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের ডাকে আনুগত্যের মাধ্যমে সাড়া দাও। এতে তোমাদের ইহলৌকিক ও পরলৌকিক কল্যাণ রয়েছে।
ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেন: اسْتَجِيبُوا এর অর্থ হল: সাড়া দাও। আর
لِمَا يُحْيِيكُمْ
যাতে তোমাদের কল্যাণ রয়েছে। (সূরা আনফাল তাফসীর, সহীহ বুখারী)
আবূ সাঈদ ইবনু মু‘আল্লা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি সালাতরত ছিলাম, এমন সময় রসূলুল্লাহ (সাঃ) আমার পাশ দিয়ে গেলেন এবং আমাকে ডাকলেন। সালাত শেষ না করা পর্যন্ত আমি তাঁর কাছে যাইনি, তারপর গেলাম। তিনি বললেন, তোমাকে আসতে বাধা দিল কিসে? আল্লাহ তা‘আলা কি বলেননি “হে মু’মিনগণ! রাসূল যখন তোমাদেরকে এমন কিছুর দিকে আহ্বান করে যা তোমাদের মাঝে জীবন সঞ্চার করে, তখন আল্লাহ ও রাসূলের আহ্বানে সাড়া দাও” হাদীসের শেষ পর্যন্ত। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৪৭, ৪৪৭৪)
(أَنَّ اللّٰهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِه)
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষ ও তার অন্তরের মধ্যবর্তী প্রতিবন্ধক হয়ে থাকেন’ অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা সবকিছুর মধ্যে পরিবর্তনকারী এমনকি একজন মানুষের ও তার অন্তর যা চায় তার মধ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে সক্ষম। (তাফসীর মুয়াসসার, ১৭৯)
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: আল্লাহ তা‘আলা প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করেন মু’মিন ও কুফরীর মাঝে এবং কাফির ও ঈমানের মাঝে। (মুসতাদরাক হাকিম ২য় খ. পৃঃ ৩২৮)
তাই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) দু‘আ করতেন:
يا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلٰي دِينِكَ
হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী আমার অন্তরকে তোমার দীনের ওপর অটল রাখিও।
আয়িশাহ বলেন: হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আপনি বেশি বেশি এ দু‘আ কেন করেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জবাবে বললেন: আদম সন্তানের অন্তরসমূহ আল্লাহ তা‘আলার দু’ আঙ্গুলের মাঝে বিদ্যমান; ইচ্ছা করলে সেগুলোকে তিনি বক্র করে দেন আর ইচ্ছা করলে সঠিকের ওপর বহাল রাখেন। (মুসনাদ আহমাদ ৬ষ্ঠ খ. পৃঃ ৯১, তিরমিযী হা: ৩৫২২, হাসান)
এ অংশ দ্বারা অনেকে বুঝানোর চেষ্টা করেন যে, আল্লাহ তা‘আলার অবস্থান মু’মিন বান্দার অন্তরে। এ মর্মে তারা একটি বানোয়াট হাদীসও বর্ণনা করে বলেন: মু’মিনের অন্তর আল্লাহ তা‘আলার আরশ। তাদের এরূপ ধারণা অমূলক, বরং আল্লাহ তা‘আলা স্বসত্তায় আরশের ওপর আছেন, আর আল্লাহ তা‘আলার আরশ সাত আকাশের উপরে। এ সম্পর্কে বহুবার আলোচনা করা হয়েছে।
وَاتَّقُوا فِتْنَةً
‘তোমরা এমন ফেতনাকে ভয় কর’ অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা ঐ ফেতনাকে ভয় করার নির্দেশ দিচ্ছেন যা সৎ ও অসৎ, জালেম ও ন্যায় ব্যক্তিসহ সকলকে পাকড়াও করবে। এ ফেতনা হল আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর আনুগত্য ছেড়ে দেয়া এবং সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ থেকে বিরত থাকা। এসব কাজ না করলে সকলকে ফেতনা গ্রাস করবে। (আয়সারুত তাফাসীর, ২য় খ. পৃঃ ১৩১)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিদের খারাপ আমলের কারণে সকলকে শাস্তি দেবেন না। যতক্ষণ না মানুষ তোমাদের মাঝে খারাপ কাজ দেখে। এ খারাপ কাজে বাধা দিতে সক্ষম থাকা সত্ত্বেও বাধা না দিলে সকলকে আল্লাহ তা‘আলা শাস্তি দেবেন। (মুসনাদ আহমাদ: ১/১৯২, সহীহ) যয়নাব (রাঃ) বলেন: নাবী (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলাম: হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমাদের মাঝে সৎ লোক থাকা সত্ত্বেও কি আমাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হবে? তিনি বললেন: হ্যাঁ, যখন খারাপ কাজ বৃদ্ধি পাবে। (সহীহ বুখারী হা: ৩৩৪৬)
তারপর আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন সে সময়ের কথা যখন তোমরা সংখ্যায় স্বল্প ছিলে তোমাদেরকে জমিনে দুর্বল করে রাখা হয়েছিল। ইচ্ছা করলে মানুষ তোমাদেরকে ছুঁ মেরে নিতে পারত। তখন আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে তাঁর সাহায্য দ্বারা শক্তিশালী করেছেন। তোমাদেরকে পবিত্র বস্তু রিযিকস্বরূপ দিয়েছেন যাতে তোমরা তাঁর শুকরিয়া কর।
অতএব প্রতিটি মু’মিনের ঈমানী দায়িত্ব হল: যথাসম্ভব সৎ কাজের আদেশ প্রদান করা ও অসৎ কাজে বাধা দেয়া এবং আল্লাহ ও রাসূলের একচ্ছত্র আনুগত্য করা।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. মানুষ যে প্রান্তেই থাকুক না কেন আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর ডাকে সাড়া দেয়া আবশ্যক। সাড়া দেয়ার অর্থ হল তাদের আনুগত্য করা।
২. আল্লাহ তা‘আলা সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান।
৩. يا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلٰي دِينِكَ
এ দু‘আটি বেশি বেশি পড়া উচিত।
৪. সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের বাধা না দিলে ফেতনা আমাদেরকে গ্রাস করবে, তখন দু‘আ করেও কোন কাজে আসবে না।
৫. নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা উচিত।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: এখানে মুমিনদেরকে পরীক্ষা থেকে ভয় প্রদর্শন করা হচ্ছে যে, আল্লাহর পরীক্ষা পাপী ও নেককার সবারই উপর পতিত হবে। এই পরীক্ষা শুধু পাপীদের উপর নির্দিষ্ট নয়। হযরত যুবাইর (রাঃ)-কে বলা হয়েছিল- “হে আবু আব্দিল্লাহ (রাঃ)! আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান (রাঃ)-কে হত্যা করা হয়েছে। এভাবে আপনারা তাঁকে হারিয়ে ফেলেছেন। অতঃপর এখন তার খুনের দাবীদার হচ্ছেন! খুনের যদি দাবীদারই হবেন তবে তাঁকে নিহত হতে দিলেন কেন?” হযরত যুবাইর (রাঃ) উত্তরে বলেছিলেনঃ “এটা ছিল আল্লাহর পরীক্ষা যার মধ্যে আমরা জড়িয়ে পড়েছি। আমরা নবী (সঃ), আবু বকর (রাঃ), উমার (রাঃ) এবং উসমান (রাঃ)-এর যমানায় কুরআন কারীমের (আরবী) -এ আয়াতটি পাঠ করতাম। কিন্তু তখন আমাদের ধারণাও ছিল না যে, আমরাও এর মধ্যে পতিত হবো। শেষ পর্যন্ত ঐ পরীক্ষা আমাদের উপর এসে পড়েছে এবং মুসলমানদের দু’টি দল পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। হযরত উসমান (রাঃ)-এর হত্যাকে কেন্দ্র করেই এই পরীক্ষার সূচনা হয়েছে।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) ও বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই আয়াতটি হযরত আলী (রাঃ), হযরত আম্মার (রাঃ), হযরত তালহা (রাঃ) এবং যুবাইর (রাঃ)-এর। ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হযরত যুবাইর (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ “আমরা সদা সর্বদা এ আয়াতটি পাঠ করতাম। কিন্তু এটা যে আমাদের উপরই সত্যরূপে প্রমাণিত হবে তা আমরা জানতাম না।” সুদ্দী (রঃ)-এর ধারণা এই যে, এ আয়াতটি বিশেষভাবে আহলে বদরের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। উষ্ট্রের যুদ্ধে তাদের উপরই এটা সত্যরূপে প্রমাণিত হয় এবং তাদের পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর ধারণা মতে এর দ্বারা উদ্দেশ্য শুধু নবী (সঃ)-এর সাহাবীবর্গ। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেনঃ “মুমিনদের উপর নির্দেশ রয়েছে- পাপর্কে তোমরা নিজেদের মধ্যে আসতে দিয়ো না। যেখানেই কাউকেও কোন অসৎ কার্যে লিপ্ত দেখতে পাও, সত্বরই তাকে তা থেকে বিরত রাখো। নতুবা শাস্তি সবার উপরই আসবে।” এটাই উত্তম তাফসীর। মুজাহিদ (রঃ) বলেনঃ “এ হুকুম তোমাদের জন্যেও বটে।” হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ তোমাদের প্রত্যেকেই এই পরীক্ষায় পতিত হবে। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই তোমাদের মালধন ও সন্তান সন্ততি হচ্ছে পরীক্ষা।” (৬৪:১৫) সুতরাং তোমাদের সকলেরই ফির বিভ্রান্তি থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা উচিত। কেননা, এই ভয় প্রদর্শন সাহাবা ও গায়ের সাহাবা সবার উপরই রয়েছে। তবে এটা সঠিক কথা যে, এর দ্বারা সাহাবীদেরকেই সম্বোধন করা হয়েছে। এই হাদীসটি ফিত্না ও পরীক্ষাকে ভয় করার কথাই প্রমাণ করছে। এগুলো ইনশাআল্লাহ পৃথক পুস্তকে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, যেমন ইমামগণও পৃথক পুস্তকের আকারে এই কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন। এখানে বিশেষভাবে যেটা আলোচনা করা হয়েছে তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “মহামহিমান্বিত আল্লাহ বিশেষ বিশেষ লোকের আমলের কারণে সর্বসাধারণের উপর শাস্তি নাযিল করেন না। কিন্তু যখন বিশিষ্ট লোকগুলো কওমের মধ্যে গর্হিত কাজকর্ম ছড়ানো অবস্থায় দেখতে পায় এবং ওগুলো বন্ধ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বন্ধ করে না এবং লোকদেরকে ঐসব কাজ করতে বাধা দেয় না তখন শাস্তি সাধারণভাবে এসে পড়ে এবং বিশিষ্ট ও সাধারণ সবাই ঐ শাস্তির শিকারে পরিণত হয়।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, সুনানের কিতাবগুলোতে কেউই এটাকে তাখরীজ করেননি)
রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর শপথ! যে পর্যন্ত তোমরা ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করতে থাকবে সেই পর্যন্ত তোমাদের উপর শাস্তি আসবে না। আর যখন তোমরা মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা ছেড়ে দেবে এবং ভাল কাজের প্রতি উৎসাহ প্রদান থেকে বিরত থাকবে তখন আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর কঠিনতম শাস্তি অবতীর্ণ করতে পারেন। অতঃপর তোমরা লক্ষবার দুআ করলেও সেই দুআ কবুল হবে না। অথবা আল্লাহ তোমাদের উপর অন্য কওমকে বিজয়ী করবেন। এরপর তোমাদের সমস্ত দুআ বিফল হয়ে যাবে।” (এ হাদীস দুটি হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রাঃ) এবং হযরত ইসমাঈল ইবনে জাফর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)
আবু রাকাদ (রঃ) বলেন, আমি আমার এক গোলামকে হযরত হুযাইফা (রাঃ)-এর নিকট পাঠালাম। সেই সময় তিনি বলেছিলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে কেউ এ ধরনের একটি মাত্র কথা বললেও তাকে মুনাফিক মনে করা হতো। কিন্তু আজ এক মজলিসে তোমাদের কোন একজনের মুখ থেকে আমি এরূপ চারটি কপটতাপূর্ণ কথা শুনতে পাচ্ছি! তোমাদের পক্ষে উচিত এই যে, তোমরা ভাল কাজের আদেশ করবে, মন্দ কাজ থেকে সত্বর বাধা দিবে এবং মানুষকে ভাল কাজে উৎসাহিত করবে। নতুবা তোমরা সবাই শাস্তিতে গ্রেফতার হয়ে যাবে অথবা এই ধরনের শাস্তি হবে যে, দুষ্ট লোককে তোমাদের উপর শাসনকর্তা বানিয়ে দেয়া হবে। অতঃপর ভাল লোকেরা লাখবার দুআ করলেও তা বিফলে যাবে।
হযরত আমের (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ)-কে ভাষণ দিতে শুনেছি, তিনি নিজের দু’টি অঙ্গলি দ্বারা নিজের কানের দিকে ইশারা করছিলেন এবং বলছিলেন- আল্লাহর হুদূদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি এবং আল্লাহর হুদূদকে লংঘনকারী অথবা তাতে অবহেলা প্রদর্শনকারী ব্যক্তির দৃষ্টান্ত এইরূপ যে, কতকগুলো তাক নৌকায় চড়ে আছে। উপরের লোকেরা নীচের লোকদের কষ্টের কারণ হয়ে গেছে এবং নীচের লোকেরা উপরের লোকদেরকে কষ্ট দিচ্ছে। অর্থাৎ নীচের লোকদের পানির প্রয়োজন হওয়ায় তারা পানি আনার জন্যে উপরে গেল। কিন্তু এর ফলে উপরের লোকদের কষ্ট হতে লাগলো। তাই ঐ নীচের লোকেরা বলাবলি করলো- যদি আমরা নৌকার নীচের দিক থেকেই কোন তক্তা সরিয়ে দিয়ে পানির পথ করে দেই তবে উপরের লোকদের কোন কষ্ট হবে না। এর ফল তো জানা কথা যে, নৌকায় পানি উঠার কারণে নৌকার আরোহীরা সবাই ডুবে মরবে। সুতরাং নৌকায় ছিদ্র করা থেকে তাদেরকে বাধা দেয়া উচিত। অনুরূপভাবে এই পাপীদেরকে যদি তোমরা পাপকাজে বাধা না দিয়ে ঐ অবস্থাতেই ছেড়ে দাও তবে নৌকায় আরোহীদের মত তোমরা সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে, যদিও নৌকার উপরের আরোহীদের মত তোমাদের কোন দোষ নেই। কিন্তু এটা এরই শাস্তি যে, তোমরা পাপ কাজ থেকে বাধা প্রদান করনি। (এটা ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- “আমার উম্মতের মধ্যে পাপ যখন সাধারণভাবে প্রকাশ পাবে তখন আল্লাহ সাধারণভাবে শাস্তি পাঠাবেন।” তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাদের মধ্যে সৎ লোক থাকলেও কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, তারাও শাস্তিতে জড়িয়ে পড়বে। কিন্তু (মৃত্যুর পর) তারা আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি লাভ করবে।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) অন্য একটি বর্ণনায় আছে- “কোন কওম পাপ কাজ করতে রয়েছে, আর তাদের মধ্যে কতকগুলো এমন লোকও রয়েছে যারা সম্ভ্রান্ত, তারা নিজেরা সেই পাপকার্যে লিপ্ত নয় বটে, কিন্তু তারা সেই কাজে বাধা প্রদান করে না, তখন আল্লাহ তাদের উপর সাধারণভাবে শাস্তি দিয়ে থাকেন।”
হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন“যখন ভূ-পৃষ্ঠে পাপকার্য প্রকাশ পাবে তখন আল্লাহ দুনিয়াবাসীর উপর তার শাস্তি নাযিল করবেন।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, তাদের মধ্যে আল্লাহর অনুগত বান্দারাও থাকবে কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, তবে (মৃত্যুর পর) তারা আল্লাহর করুণা লাভ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) তাখরীজ করেছেন)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।