সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 43)
হরকত ছাড়া:
ونزعنا ما في صدورهم من غل تجري من تحتهم الأنهار وقالوا الحمد لله الذي هدانا لهذا وما كنا لنهتدي لولا أن هدانا الله لقد جاءت رسل ربنا بالحق ونودوا أن تلكم الجنة أورثتموها بما كنتم تعملون ﴿٤٣﴾
হরকত সহ:
وَ نَزَعْنَا مَا فِیْ صُدُوْرِهِمْ مِّنْ غِلٍّ تَجْرِیْ مِنْ تَحْتِهِمُ الْاَنْهٰرُ ۚ وَ قَالُوا الْحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِیْ هَدٰىنَا لِهٰذَا ۟ وَ مَا کُنَّا لِنَهْتَدِیَ لَوْ لَاۤ اَنْ هَدٰىنَا اللّٰهُ ۚ لَقَدْ جَآءَتْ رُسُلُ رَبِّنَا بِالْحَقِّ ؕ وَ نُوْدُوْۤا اَنْ تِلْکُمُ الْجَنَّۃُ اُوْرِثْتُمُوْهَا بِمَا کُنْتُمْ تَعْمَلُوْنَ ﴿۴۳﴾
উচ্চারণ: ওয়া নাযা‘না-মা-ফী সুদূ রিহিম মিন গিলিলন তাজরী মিন তাহতিহিমুল আনহা-রু ওয়া কা-লুল হামদুলিল্লা-হিল্লাযী হাদা-না-লিহা-যা- ওয়া মা-কুন্না-লিনাহতাদিইয়া লাওলাআন হাদা-নাল্লা-হু লাকাদ জাআত রুছুলুরাব্বিনা-বিলহাক্কি ওয়া নূদূ আন তিলকুমুল জান্নাতুঊরিছতুমূহা-বিমা-কুনতুম তা‘মালূন।
আল বায়ান: আর তাদের অন্তরে যে ঈর্ষা ছিল, আমি তা বের করে নিয়েছি। তাদের নীচ দিয়ে নহরসমূহ প্রবাহিত হবে। আর তারা বলবে, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি এর জন্য আমাদেরকে হিদায়াত দিয়েছেন। আর আমরা হিদায়াত পাওয়ার ছিলাম না, যদি না আল্লাহ আমাদেরকে হিদায়াত দিতেন। অবশ্যই আমার রবের রাসূলগণ সত্য নিয়ে এসেছেন’ এবং তাদেরকে ডাকা হবে যে, ‘ঐ হল জান্নাত, তোমরা যা আমল করেছ, তার বিনিময়ে তোমাদেরকে এর ওয়ারিস করা হয়েছে’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪৩. আর আমরা তাদের অন্তর থেকে ঈর্ষা দূর করব(১), তাদের পাদদেশে প্রবাহিত হবে নদীসমূহ। আর তারা বলবে, যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহরই যিনি আমাদেরকে এ পথের হিদায়াত করেছেন। আল্লাহ আমাদেরকে হিদায়াত না করলে, আমরা কখনো হিদায়াত পেতাম না। অবশ্যই আমাদের রবের রাসূলগণ সত্য নিয়ে এসেছিলেন। আর তাদেরকে সম্বোধন করে বলা হবে, তোমরা যা করতে তারই জন্য তোমাদেরকে এ জান্নাতের(২) ওয়ারিস করা হয়েছে।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তাদের অন্তর থেকে হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে দেব, তাদের পাদদেশে নির্ঝরিণী প্রবাহিত হবে, আর তারা বলবে, যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাদেরকে এ পথ দেখিয়েছেন, আমরা কিছুতেই পথ পেতাম না যদি না আল্লাহ আমাদেরকে পথ দেখাতেন। আমাদের প্রতিপালকের রসূলগণ প্রকৃত সত্য নিয়েই এসেছিলেন। তাদেরকে আহবান করে জানানো হবে- ‘তোমরা (দুনিয়াতে) যে ‘আমাল করতে তার ফলে তোমরা এ জান্নাতের উত্তরাধিকারী হয়েছ।’
আহসানুল বায়ান: (৪৩) আর আমি তাদের অন্তর থেকে হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে দেব,[1] তাদের নিম্নদেশে প্রবাহিত হবে নদীমালা এবং তারা বলবে, ‘যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহরই; যিনি আমাদেরকে এর পথ দেখিয়েছেন। আল্লাহ আমাদেরকে পথ না দেখালে, আমরা কখনও পথ পেতাম না।[2] নিশ্চয় আমাদের প্রতিপালকের রসূলগণ সত্য (বাণী) এনেছিলেন।’ আর তাদেরকে আহবান করে বলা হবে যে, ‘তোমরা যা করতে তারই প্রতিদানে তোমাদেরকে এ জান্নাতের উত্তরাধিকারী করা হয়েছে।’ [3]
মুজিবুর রহমান: আর তাদের অন্তরে যা কিছু ঈর্ষা ও বিদ্বেষ রয়েছে তা আমি দূর করে দিব, তাদের নিম্নদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত হবে; তখন তারা বলবেঃ সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি আমাদেরকে পথ প্রদর্শন করেছেন, আল্লাহ আমাদেরকে পথ প্রদর্শন না করলে আমরা পথ পেতামনা, আমাদের রবের প্রেরিত রাসূলগণ সত্য বাণী নিয়ে এসেছিলেন। আর তাদেরকে সম্বোধন করে বলা হবেঃ তোমরা যে (ভাল) ‘আমল করতে তারই জন্য তোমাদেরকে এই জান্নাতের উত্তরাধিকারী বানানো হয়েছে।
ফযলুর রহমান: আমি তাদের মন থেকে (দুনিয়ার) যাবতীয় বিদ্বেষ দূর করে দেব। তাদের নিচ থেকে নদী প্রবাহিত হবে। তারা বলবে, “প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাদেরকে এখানে আসার পথ দেখিয়েছেন। আল্লাহ আমাদেরকে পথ না দেখালে আমরা পথের সন্ধান পেতাম না। আমাদের প্রভুর রসূলগণ অবশ্যই সত্য নিয়ে এসেছিলেন।” আর তাদেরকে ডেকে বলা হবে, “এই হল জান্নাত; তোমাদের কর্মের প্রতিদানে তোমাদেরকে এর উত্তরাধিকারী করা হয়েছে।”
মুহিউদ্দিন খান: তাদের অন্তরে যা কিছু দুঃখ ছিল, আমি তা বের করে দেব। তাদের তলদেশ দিয়ে নির্ঝরণী প্রবাহিত হবে। তারা বলবেঃ আল্লাহ শোকর, যিনি আমাদেরকে এ পর্যন্ত পৌছিয়েছেন। আমরা কখনও পথ পেতাম না, যদি আল্লাহ আমাদেরকে পথ প্রদর্শন না করতেন। আমাদের প্রতিপালকের রসূল আমাদের কাছে সত্যকথা নিয়ে এসেছিলেন। আওয়াজ আসবেঃ এটি জান্নাত। তোমরা এর উত্তরাধিকারী হলে তোমাদের কর্মের প্রতিদানে।
জহুরুল হক: আর আমরা দূর করে দেবো মনোমালিন্যের যা-কিছু আছে তাদের বুকে, -- তাদের নিচে দিয়ে বয়ে চলবে ঝরনারাজি, আর তারা বলবে -- "সমুদয় প্রশংসা আল্লাহ্রই যিনি আমাদের পথ দেখিয়েছেন এই দিকে, আর আমরা নিজেরা সুপথ পেতাম না যদি আল্লাহ্ আমাদের পথ না দেখাতেন, নিশ্চয়ই আমাদের প্রভুর রসূলগণ সত্য নিয়ে এসেছিলেন।" আর তাদের কাছে ঘোষণা করা হবে -- "দেখো! এই বেহেশত তোমাদের সামনে, তোমরা এ উত্তরাধিকার করলে তোমরা যা করতে তার জন্য।"
Sahih International: And We will have removed whatever is within their breasts of resentment, [while] flowing beneath them are rivers. And they will say, "Praise to Allah, who has guided us to this; and we would never have been guided if Allah had not guided us. Certainly the messengers of our Lord had come with the truth." And they will be called, "This is Paradise, which you have been made to inherit for what you used to do."
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৪৩. আর আমরা তাদের অন্তর থেকে ঈর্ষা দূর করব(১), তাদের পাদদেশে প্রবাহিত হবে নদীসমূহ। আর তারা বলবে, যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহরই যিনি আমাদেরকে এ পথের হিদায়াত করেছেন। আল্লাহ আমাদেরকে হিদায়াত না করলে, আমরা কখনো হিদায়াত পেতাম না। অবশ্যই আমাদের রবের রাসূলগণ সত্য নিয়ে এসেছিলেন। আর তাদেরকে সম্বোধন করে বলা হবে, তোমরা যা করতে তারই জন্য তোমাদেরকে এ জান্নাতের(২) ওয়ারিস করা হয়েছে।
তাফসীর:
(১) এ আয়াতে জান্নাতীদের বিশেষ অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। বলা হয়েছে, “জান্নাতীদের অন্তরে পরস্পরের পক্ষ থেকে যদি কোন মালিন্য থাকে, তবে আমরা তা তাদের অন্তর থেকে অপসারণ করে দেব, তাদের নীচ দিয়ে নহরসমূহ প্রবাহিত থাকবে।” সূরা আল-হিজরের ৪৭ নং আয়াতে আরো স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, “আমরা জান্নাতীদের অন্তর থেকে যাবতীয় মালিন্য দূর করে দেব, তারা একে অপরের প্রতি সন্তুষ্টি ও ভাই ভাই হয়ে জান্নাতে মুখোমুখী হয়ে খাটিয়ায় থাকবে এবং বসবাস করবে।”
অনুরূপভাবে হাদীসে বর্ণিত আছে যে, মুমিনরা যখন পুলসিরাত অতিক্রম করে জাহান্নাম থেকে মুক্তিলাভ করবে, তখন জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী এক পুলের উপর তাদেরকে থামিয়ে দেয়া হবে। তাদের পরস্পরের মধ্যে যদি কারো প্রতি কারো কোন কষ্ট থাকে কিংবা কারো কাছে কারো পাওনা থাকে, তবে এখানে পৌছে পরস্পরের প্রতিদান নিয়ে পারস্পরিক সম্পর্ক পরিষ্কার করে নেবে। এভাবে হিংসা, দ্বেষ, শক্রতা, ঘৃণা ইত্যাদি থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তোমাদের প্রত্যেকেই জান্নাতে তার ঘরকে দুনিয়ায় তার ঘরের চেয়ে বেশী চিনবে। [বুখারীঃ ২৪৪০]
(২) জান্নাতের বর্ণনা কুরআন ও সহীহ হাদীসে ব্যাপকভাবে এসেছে, সেখানে মাঝে মধ্যেই বিভিন্ন স্পেশাল ঘোষণা থাকবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আহবানকারী আহবান করে বলবেঃ তোমাদের জন্য এটাই উপযোগী যে, তোমরা সুস্থ থাকবে, কখনো তোমরা রোগাক্রান্ত হবে না। তোমাদের জন্য উপযোগী হলো জীবিত থাকা, সুতরাং তোমরা কখনো মারা যাবে না। তোমাদের জন্য উচিত হলো যুবক থাকা, সুতরাং তোমরা কখনো বৃদ্ধ হবে না। তোমাদের জন্য উচিত হলো নেয়ামতের মধ্যে থাকা, সুতরাং তোমরা কখনো অভাব-অভিযোগে থাকবে না। আর এটাই হলো আল্লাহর বাণীর অর্থ যেখানে তিনি বলেছেনঃ “এবং তাদেরকে সম্বোধন করে বলা হবে, তোমরা যা করতে তারই জন্য তোমাদেরকে এ জান্নাতের উত্তরাধিকারী করা হয়েছে।” [মুসলিমঃ ২৮৩৭]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৪৩) আর আমি তাদের অন্তর থেকে হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে দেব,[1] তাদের নিম্নদেশে প্রবাহিত হবে নদীমালা এবং তারা বলবে, ‘যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহরই; যিনি আমাদেরকে এর পথ দেখিয়েছেন। আল্লাহ আমাদেরকে পথ না দেখালে, আমরা কখনও পথ পেতাম না।[2] নিশ্চয় আমাদের প্রতিপালকের রসূলগণ সত্য (বাণী) এনেছিলেন।’ আর তাদেরকে আহবান করে বলা হবে যে, ‘তোমরা যা করতে তারই প্রতিদানে তোমাদেরকে এ জান্নাতের উত্তরাধিকারী করা হয়েছে।’ [3]
তাফসীর:
[1] غِلٌّ এমন হিংসা-বিদ্বেষকে বলা হয়, যা অন্তঃকরণে গোপন থাকে। মহান আল্লাহ জান্নাতীদের উপর এই অনুগ্রহও করবেন যে, তাদের অন্তরে একে অপরের প্রতি যে বিদ্বেষ ও শত্রুতার মনোভাব (দুনিয়ায় ছিল), তাও তিনি দূর করে দেবেন। অতঃপর তাদের অন্তর একে অপরের জন্য আয়নার মত পরিষ্কার হয়ে যাবে। কারো বিরুদ্ধে অন্তরে কোন মলিনতা বা শত্রুতা থাকবে না। কেউ কেউ এর অর্থ করেছেন, জান্নাতবাসীদের স্তর ও মর্যাদায় পারস্পরিক যে তফাৎ থাকবে, তা নিয়ে তারা একে অপরের প্রতি কোন হিংসা পোষণ করবে না। প্রথম অর্থের সমর্থন একটি হাদীস থেকেও হয়। যাতে বলা হয়েছে যে, জান্নাতীদেরকে জান্নাত এবং জাহান্নামের মাঝে একটি পুলের উপর থামিয়ে দেওয়া হবে এবং তাদের আপোসের যে যুলুম-অত্যাচার থাকবে একে অপরকে তার প্রতিশোধ গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হবে। পরিশেষে যখন তারা একেবারে পাক-পবিত্র হয়ে যাবে, তখন তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করার অনুমতি দেওয়া হবে। (বুখারী, মাযালিম অধ্যায়) সাহাবাগণের মাঝে পারস্পরিক কিছু মনোমালিন্য রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে সৃষ্টি হয়েছিল। এ ব্যাপারে আলী (রাঃ) বলেছেন, ‘আমি আশা করি যে, আমি, উসমান, ত্বালহা ও যুবায়ের رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ সেই লোকদের দলভুক্ত, যাঁদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَنَزَعْنَا مَا فِي صُدُورِهِمْ مِنْ غِلٍّ} (ইবনে কাসীর)
[2] অর্থাৎ, এই হিদায়াত বা পথপ্রদর্শন যার কারণে আমরা ঈমান ও নেক আমলের জীবন লাভে ধন্য হয়েছি এবং যা আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হয়ে সম্মানিত হয়েছি, তা কেবল আল্লাহর বিশেষ দয়া এবং তাঁর অনুগ্রহ। আল্লাহর দয়া ও তাঁর অনুগ্রহ না হলে আমরা এ পর্যন্ত পৌঁছতে পারতাম না। এই হাদীসটাও এই অর্থেরই যাতে রসূল (সাঃ) বলেছেন, ‘‘এ কথা ভালভাবে জেনে নাও যে, তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তিকেই তার আমল জান্নাতে নিয়ে যাবে না, যতক্ষণ না আল্লাহর দয়া হবে।’’ সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনিও কি? তিনি বললেন, ‘‘হ্যাঁ, আমিও ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারব না, যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর রহমত দিয়ে আমাকে ঢেকে নেবেন।’’ (বুখারীঃ রিক্বাক অধ্যায়, মুসলিমঃ কিয়ামতের বিবরণ অধ্যায়)
[3] এখানে এ উক্তি পূর্বোক্ত কথা ও হাদীসের বিপরীত নয়। কারণ, নেক আমল করার তাওফীক লাভও স্বয়ং আল্লাহরই দয়া ও অনুগ্রহ।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৪০-৪৩ নং আয়াতের তাফসীর:
যারা দুনিয়াতে ঈমান আনেনি বরং ঈমান আনতে অহঙ্কার করেছে মৃত্যুর পর তাদের কী পরিণতি হবে সে সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তাদের জন্য আকাশের দরজা খোলা হবে না এবং উট যতক্ষণ না সুঁইয়ের ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করে ততক্ষণ তারা জান্নাতেও প্রবেশ করতে পারবে না। অর্থাৎ কোন দিন জান্নাতে যেতে পারবে না।
غواش হল غايشة এর বহুবচন। অর্থ: যে জিনিস ঢেকে নেয়। অর্থাৎ আগুনের আযাব তাদেরকে আচ্ছাদন করে নেবে।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: ..... পক্ষান্তরে কাফির ব্যক্তির যখন দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণের সময় হয় তখন কৃষ্ণবর্ণের এক ফেরেশতা দুর্গন্ধযুক্ত চট নিয়ে তার কাছে হাজির হয়। যতদূর কাফিরের দৃষ্টি যায় ততদূর সেই ফেরেশতাকে দেখতে পায়। তারপর মালাকুল মাওত এসে তার মাথার পাশে বসে বলে: হে খারাপ আত্মা! আল্লাহ তা‘আলার অসন্তুষ্টি ও ক্রোধের দিকে বেরিয়ে আস। ঐ আত্মা তখন শরীরে ভিতরে ছুটাছুটি করতে থাকে, কিন্তু ফেরেশতা ওকে টেনে বের করে যেমন লোহার পেরেককে ভিজা চুলের মধ্য থেকে বের করা হয়। ঐ ফেরেশতা ওকে ধরামাত্রই ওর মধ্য থেকে পচা দুর্গন্ধ বের হয়ে আসে। ফেরেশতা ওকে নিয়ে আকাশে উঠে এবং যেখান দিয়েই গমন করে সেখানকার ফেরেশতা জিজ্ঞাসা করে, এই খারাপ আত্মা কার? উত্তরে বলে: অমুকের সন্তান অমুক। দুনিয়াতে যে খারাপ নামে পরিচিত ছিল সেই নাম বলবে। যখন আকাশ পর্যন্ত পৌঁছবে তখন আকাশের দরজা খোলার জন্য বলা হবে কিন্তু খোলা হবে না। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এ আয়াত তেলাওয়াত করলেন:
(اِنَّ الَّذِیْنَ کَذَّبُوْا بِاٰیٰتِنَا وَاسْتَکْبَرُوْا عَنْھَا لَا تُفَتَّحُ لَھُمْ اَبْوَابُ السَّمَا۬ئِ وَلَا یَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ حَتّٰی یَلِجَ الْجَمَلُ فِیْ سَمِّ الْخِیَاطِ)
“নিশ্চয়ই যারা আমার নিদর্শনকে অস্বীকার করে এবং সে সম্বন্ধে অহঙ্কার করে, তাদের জন্য আকাশের দ্বারসমূহ উন্মুক্ত করা হবে না, এবং তারা জান্নাতেও প্রবশে করতে পারবে না- যতক্ষণ না সূঁচের ছিদ্রপথে উট প্রবেশ করে।” (আবূ দাঊদ হা: ৪৭৫৩, ইবনু মাযাহ হা: ১৫৪৮, মুসনাদ আহমাদ হ্:া ১৮০৬৩, সহীহ)
আর যারা ঈমানদার ও সৎ আমলকারী হবে তারা জান্নাতে থাকবে।
(مِّنْ غِلٍّ) অর্থাৎ জান্নাতীগণ জান্নাতে প্রবেশ করার পূর্বে তাদের অন্তরের সকল হিংসা বিদ্বেষ দূর করে দেয়া হবে। তাই যারা জান্নাতে থাকবে তাদের কোন প্রকার হিংসা বিদ্বেষ থাকবে না।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: জান্নাতীদেরকে যখন জাহান্নাম থেকে মুক্ত করা হবে তখন জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে একটি সেতুর ওপর আটকে রাখা হবে এবং তাদের পরস্পরের প্রতি যে জুলুম অত্যাচার করেছিল একে অপরকে তার প্রতিশোধ গ্রহণের সুযোগ দেয়া হবে। পরিশেষে যখন তারা পাক-পবিত্র হয়ে যাবে তখন তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করার অনুমতি দেয়া হবে। (সহীহ মুসলিম হা: ২৪৪০)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: প্রত্যেক জান্নাতবাসী জাহান্নামে তার আসন দেখতে পাবে, অতঃপর বলবে: যদি আল্লাহ তা‘আলা আমাকে হিদায়াত না দিতেন (তাহলে তা থেকে মুক্তি পেতাম না), সে তখন আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় করবে। অনুরূপ প্রত্যেক জাহান্নামীও জান্নাতে তার আসন দেখতে পাবে, অতঃপর বলবে: যদি আল্লাহ তা‘আলা আমাকে হিদায়াত দিতেন (তাহলে সেখানে প্রবেশ করতে পারতাম।) এভাবে সে আফসোস করবে। (মুসনাদ আহমাদ হা: ১০৬৫২, সনদ সহীহ)
(بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُوْنَ)
অর্থাৎ তোমাদের আমলের বিনিময়ে আল্লাহ তা‘আলার রহমত লাভ করেছ ফলে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারলে। কেননা আল্লাহ তা‘আলার রহমত ছাড়া আমলের বিনিময়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারতে না।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: জেনে রেখ! আমাদের কেউ আমলের বিনিময়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। তারা বলল: আপনিও না হে আল্লাহ তা‘আলার রাসূল (সাঃ)? উত্তরে তিনি বলেন: আমিও না! তবে যদি আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রহমত দ্বারা আমাকে ঢেকে না নেন। (সহীহ বুখারী হা: ৫৪৬৩)
সুতরাং আল্লাহ তা‘আলার রহমত পাওয়ার জন্য বেশি বেশি সৎ আমল করতে হবে। তাহলে জান্নাতে যাওয়া সম্ভব হবে ইনশা-আল্লাহ।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. কাফিররা কোন অবস্থাতেই জান্নাতে যেতে পারবে না।
২. কাফিরদের জন্য আকাশের দরজা খোলা হবে না।
৩. জান্নাতীদের মনে কোন হিংসা-বিদ্বেষ থাকবে না।
৪. আল্লাহ তা‘আলার রহমত ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৪২-৪৩ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ পাক হতভাগা ও পাপীদের অবস্থা বর্ণনার পর এখন ভাগ্যবান ও সৎ লোকদের অবস্থা বর্ণনা করছেন। তিনি বলেনঃ যারা ঈমান এনেছে এবং ভাল কাজ করেছে তারা ঐ লোকদের থেকে পৃথক যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে। এখানে এই বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করা হচ্ছে যে, ঈমান ও আমল কোন কঠিন ব্যাপার নয়; বরং খুবই সহজ ব্যাপার। তাই ইরশাদ হচ্ছে- আমি যে শরঈ বিধান জারি করেছি এবং ঈমান ও সৎ আমল ফরয করে দিয়েছি তা মানুষের সাধ্যের অতিরিক্ত নয়। আমি কখনও কাউকে সাধ্যের অতিরিক্ত কষ্ট দেই না। এই লোকগুলোই হচ্ছে জান্নাতের অধিবাসী। মুমিনদের অন্তরে পারস্পরিক যা কিছু হিংসা ও বিদ্বেষ থাকবে তা আমি বের করে দেবো। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুমিনরা যখন জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে তখন তাদেরকে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী পুলের উপর আটক করা হবে। অতঃপর তাদের ঐসব অত্যাচার সম্পর্কে আলোচনা করা হবে যা দুনিয়ায় তাদের পরস্পরের মধ্যে করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ঐ অত্যাচার ও হিংসা বিদ্বেষ থেকে যখন তাদের অন্তরকে পাক সাফ করা হবে তখন তাদেরকে জান্নাতের পথ প্রদর্শন করা হবে। আল্লাহর শপথ! তাদের কাছে তাদের জান্নাতের ঘর তাদের পার্থিব ঘর থেকে বেশী পরিচিত হবে। জান্নাতবাসীকে যখন জান্নাতের দিকে প্রেরণ করা হবে তখন তারা জান্নাতের পার্শ্বে একটা গাছ পাবে যার নিম্নদেশ দিয়ে দু'টি নিঝরিণী প্রবাহিত হতে থাকবে। একটা থেকে যখন তারা পানি পান করবে তখন তাদের অন্তরে যা কিছু হিংসা বিদ্বেষ ছিল সব কিছু ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে যাবে। এটাই হচ্ছে শরাবে তহুর বা পবিত্র মদ। আর অন্য ঝরণায় তারা গোসল করবে। তখন জান্নাতের মতই সজীবতা ও প্রফুল্লতা তাদের চেহারায় ফুটে উঠবে। এর পর না তাদের মাথার চুল এলোমেলো হবে, না চোখে সুরমা দেয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে। অতঃপর এই লোকগুলো দলে দলে জান্নাতের দিকে রওয়ানা হয়ে যাবে।”
হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “আমি আশা করি যে, ইনশাআল্লাহ আমি, হযরত উসমান (রাঃ), হযরত তালহা (রাঃ) এবং হযরত যুবাইর (রাঃ) ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবো যাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ ছিল, কিন্তু সমস্ত পরিষ্কার করে দেয়া হবে।” হযরত আলী (রাঃ) বলতেনঃ “আল্লাহর কসম! আমাদের মধ্যে আহলে বদরও রয়েছেন এবং তাদের সম্পর্কেই এই আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে।”
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক জান্নাতীকে জাহান্নামের ঠিক আল্লাহ আমাকে সুপথ প্রদর্শন না করতেন তবে আমার ঠিকানা এটাই হতো। এ জন্যে আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি। আর প্রত্যেক জাহান্নামীকে জান্নাতের ঠিকানা বলে দেয়া হবে। সে বলবে- হায়! যদি আল্লাহ আমাকেও সুপথ প্রদর্শন করতেন তবে এটাই আমার ঠিকানা হতো। এভাবে দুঃখ ও আফসোস তাকে ছেয়ে ফেলবে। ঐ মুমিনদেরকে যখন জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হবে তখন তাদেরকে বলা হবে- এই জান্নাত হচ্ছে তোমাদের সৎকর্মের ফল স্বরূপ তোমাদের পুরস্কার। তোমাদেরকে যে জান্নাতে প্রবিষ্ট করা হয়েছে এটা সত্যি আল্লাহর রহমতই বটে। নিজেদের আমল অনুযায়ী আপন আপন ঠিকানা বানিয়ে নাও। আর এ সবকিছুই হচ্ছে আল্লাহর রহমতেরই কারণ।” সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকেই যেন এ কথা জেনে রাখে যে, তার আমল তাকে জান্নাতে পৌছায় না।” তখন জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার আমলও কি নয়?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা, আমার আমলও নয়, যদি না আল্লাহর রহমত আমার উপর বর্ষিত হয়।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।