আল কুরআন


সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 187)

সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 187)



হরকত ছাড়া:

يسألونك عن الساعة أيان مرساها قل إنما علمها عند ربي لا يجليها لوقتها إلا هو ثقلت في السماوات والأرض لا تأتيكم إلا بغتة يسألونك كأنك حفي عنها قل إنما علمها عند الله ولكن أكثر الناس لا يعلمون ﴿١٨٧﴾




হরকত সহ:

یَسْـَٔلُوْنَکَ عَنِ السَّاعَۃِ اَیَّانَ مُرْسٰهَا ؕ قُلْ اِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ رَبِّیْ ۚ لَا یُجَلِّیْهَا لِوَقْتِهَاۤ اِلَّا هُوَ ؕۘؔ ثَقُلَتْ فِی السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ ؕ لَا تَاْتِیْکُمْ اِلَّا بَغْتَۃً ؕ یَسْـَٔلُوْنَکَ کَاَنَّکَ حَفِیٌّ عَنْهَا ؕ قُلْ اِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ اللّٰهِ وَ لٰکِنَّ اَکْثَرَ النَّاسِ لَا یَعْلَمُوْنَ ﴿۱۸۷﴾




উচ্চারণ: ইয়াছআলূনাকা ‘আনিছ ছা-‘আতি আইঁ ইয়া-না মুরছা-হা- কুল ইন্নামা-‘ইলমুহা-‘ইনদা রাববী লা-ইউজাললীহা-লিওয়াকতিহা-ইল্লা-হূ । ছাকুলাত ফিছছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদি লা-তা’তীকুম ইল্লা-বাগতাতান ইয়াছআলূনাকা কাআন্নাকা হাফিইয়ুন ‘আনহা-; কুল ইন্নামা-‘ইলমুহা-‘ইনদাল্লা-হি ওয়ালা-কিন্না আকছারান্নাছি লা-ইয়া‘লামূন।




আল বায়ান: তারা তোমাকে কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করে, ‘তা কখন ঘটবে’? তুমি বল, ‘এর জ্ঞান তো রয়েছে আমার রবের নিকট। তিনিই এর নির্ধারিত সময়ে তা প্রকাশ করবেন। আসমানসমূহ ও যমীনের উপর তা (কিয়ামত) কঠিন হবে। তা তোমাদের নিকট হঠাৎ এসে পড়বে। তারা তোমাকে প্রশ্ন করছে যেন তুমি এ সম্পর্কে বিশেষভাবে অবহিত। বল, ‘এ বিষয়ের জ্ঞান কেবল আল্লাহর নিকট আছে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৮৭. তারা আপনাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে (বলে) তা কখন ঘটবে?(১) বলুন, এ বিষয়ের জ্ঞান শুধু আমার রবেরই নিকট। শুধু তিনিই যথাসময়ে সেটার প্রকাশ ঘটাবেন; আসমানসমূহ ও যমীনে সেটা ভারী বিষয়(২)। হঠাৎ করেই তা তোমাদের উপর আসবে(৩)। আপনি এ বিষয়ে সবিশেষ জ্ঞানী মনে করে তারা আপনাকে প্রশ্ন করে। বলুন, এ বিষয়ের জ্ঞান শুধু আল্লাহরই নিকট, কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না।(৪)




তাইসীরুল ক্বুরআন: তারা তোমাকে ক্বিয়ামাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে কখন তা সংঘটিত হবে। বল, ‘এ বিষয়ে জ্ঞান রয়েছে আমার প্রতিপালকের নিকট। তিনি ছাড়া কেউ প্রকাশ করতে পারে না কখন তা ঘটবে। আসমান ও যমীনে তা হবে বড় এক কঠিন দিন। আকস্মিকভাবে তা তোমাদের উপর এসে পড়বে।’ লোকেরা তোমাকে এ সম্পর্কে এমনভাবে জিজ্ঞেস করছে যেন তুমি আগ্রহ সহকারে এটার খোঁজে ব্যস্ত আছ। বল, ‘এ বিষয়ের জ্ঞান তো শুধু আল্লাহরই নিকট আছে। কিন্তু (এ সত্যটা) অধিকাংশ লোকই জানে না।’




আহসানুল বায়ান: (১৮৭) তারা তোমাকে কিয়ামত[1] সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, ‘তা কখন ঘটবে?’[2] বল, এ বিষয়ের জ্ঞান শুধু আমার প্রতিপালকের নিকটেই আছে।[3] কেবল তিনিই যথাকালে তা প্রকাশ করবেন। তা হবে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে একটি ভয়ংকর ঘটনা।[4] আকস্মিকভাবেই তা তোমাদের নিকট আসবে। তুমি এ বিষয়ে সবিশেষ অবহিত মনে করেই তারা তোমাকে প্রশ্ন করে।[5] তুমি বল, ‘এ বিষয়ের জ্ঞান আমার প্রতিপালকের নিকটেই আছে। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।’



মুজিবুর রহমান: তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করছে, কিয়ামাত কখন সংঘটিত হবে? তুমি বলে দাওঃ এ বিষয়ে আমার রাব্বই একমাত্র জ্ঞানের অধিকারী, শুধু তিনিই ওটা ওর নির্ধারিত সময়ে প্রকাশ করবেন, তা হবে আকাশসমূহ ও পৃথিবীতে এক ভয়ংকর ঘটনা। তোমাদের উপর ওটা আকস্মিকভাবেই আসবে। তুমি যেন এ বিষয় সবিশেষ অবগত, এটা ভেবে তারা তোমাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে। তুমি বলে দাওঃ এ সম্পর্কীয় জ্ঞান একমাত্র আমার রবেরই রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ লোকই এ কথা বুঝেনা।



ফযলুর রহমান: তারা তোমার কাছে কেয়ামত সম্বন্ধে প্রশ্ন করে, “তার নির্ধারিত সময় কখন?” বল, “বিষয়টি কেবল আমার প্রভুই জানেন। তিনি ছাড়া কেউই তার সঠিক সময় বলতে পারে না। আসমান ও জমিনে এটি একটি গুরুতর বিষয়। তোমাদের কাছে তা আকস্মিকভাবেই আসবে।” তারা তোমার কাছে (এমনভাবে) প্রশ্ন করে যেন তুমি সে সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত। বল, “বিষয়টি কেবল আল্লাহই জানেন।” কিন্তু অধিকাংশ মানুষ (তা) জানে না।



মুহিউদ্দিন খান: আপনাকে জিজ্ঞেস করে, কেয়ামত কখন অনুষ্ঠিত হবে? বলে দিন এর খবর তো আমার পালনকর্তার কাছেই রয়েছে। তিনিই তা অনাবৃত করে দেখাবেন নির্ধারিত সময়ে। আসমান ও যমীনের জন্য সেটি অতি কঠিন বিষয়। যখন তা তোমাদের উপর আসবে অজান্তেই এসে যাবে। আপনাকে জিজ্ঞেস করতে থাকে, যেন আপনি তার অনুসন্ধানে লেগে আছেন। বলে দিন, এর সংবাদ বিশেষ করে আল্লাহর নিকটই রয়েছে। কিন্তু তা অধিকাংশ লোকই উপলব্ধি করে না।



জহুরুল হক: তারা তোমাকে ঘড়িঘন্টা সন্বন্ধে জিজ্ঞাসা করছে -- কখন তা ঘটবে। বলো -- "এর জ্ঞান অবশ্যই রয়েছে আমার প্রভুর কাছে, এর সময় সন্বন্ধে তা প্রকাশ করতে পারে না তিনি ছাড়া কেউ। এ অতি গুরুতর ব্যাপার মহাকাশমন্ডলে ও পৃথিবীতে, এ এসে পড়বে না তোমাদের উপরে অতর্কিতে ছাড়া।" তারা তোমাকে জিজ্ঞাসা করছে যেন তুমিই এ বিষয়ে আগ্রহী। বলো -- "এর জ্ঞান আলবৎ আল্লাহ্‌র কাছে, কিন্তু অধিকাংশ লোকই জানে না।"



Sahih International: They ask you, [O Muhammad], about the Hour: when is its arrival? Say, "Its knowledge is only with my Lord. None will reveal its time except Him. It lays heavily upon the heavens and the earth. It will not come upon you except unexpectedly." They ask you as if you are familiar with it. Say, "Its knowledge is only with Allah, but most of the people do not know."



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৮৭. তারা আপনাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে (বলে) তা কখন ঘটবে?(১) বলুন, এ বিষয়ের জ্ঞান শুধু আমার রবেরই নিকট। শুধু তিনিই যথাসময়ে সেটার প্রকাশ ঘটাবেন; আসমানসমূহ ও যমীনে সেটা ভারী বিষয়(২)। হঠাৎ করেই তা তোমাদের উপর আসবে(৩)। আপনি এ বিষয়ে সবিশেষ জ্ঞানী মনে করে তারা আপনাকে প্রশ্ন করে। বলুন, এ বিষয়ের জ্ঞান শুধু আল্লাহরই নিকট, কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না।(৪)


তাফসীর:

(১) এ আয়াতগুলো নাযিলের পেছনে বিশেষ একটি ঘটনা কার্যকর ছিল। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, জাবাল ইবন আবি কুশাইর ও শামওয়াল ইবন যায়দ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস ওয়াসাল্লামের নিকট ঠাট্টা ও বিদ্রুপচ্ছলে জিজ্ঞাসা করল যে, আপনি কেয়ামত আগমনের সংবাদ দিয়ে মানুষকে এ ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে থাকেন- এ ব্যাপারে যদি আপনি সত্য নবী হয়ে থাকেন, তবে নির্দিষ্ট করে বলুন, কেয়ামত কোন সালের কত তারিখে অনুষ্ঠিত হবে। এ ব্যাপারে তো আমরাও জানি। এ ঘটনার ভিত্তিতেই আয়াতটি নাযিল হয়। [তাবারী]


(২) এর কয়েকটি অর্থ হতে পারে, এক. কিয়ামতের জ্ঞান অত্যন্ত ভারী বিষয়, আসমান ও যমীনের অধিবাসীদের থেকে তা গোপন রাখা হয়েছে। সুতরাং কোন নবী-রাসূল বা ফেরেশতাকেও আল্লাহ সে জ্ঞান দেননি। আর যে কোন জ্ঞান গোপন রাখা হয় তা অন্তরের উপর ভারী হয়ে থাকে। দুই. কিয়ামত এত ভারী সংবাদ যে আসমান ও যমীন সেটাকে সহ্য করতে পারে না। কারণ, আসমানসমূহ ফেটে যাবে, তারকাসমূহ বিক্ষিপ্ত হয়ে যাবে। আর সাগরসমূহ শুকিয়ে যাবে। তিন. কিয়ামতের গুণাগুণ বর্ণনা আসমান ও যমীনের অধিবাসীদের উপর কঠিন। চার. কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করা তাদের জন্য এক ভারী বিষয়। [ফাতহুল কাদীর]


(৩) এ আয়াতে উল্লেখিত السَّاعَة শব্দটি আরবী ভাষায় সামান্য সময় বা মুহুর্তকে বলা হয়। আভিধানিকভাবে যার কোন বিশেষ পরিসীমা নেই। আর গাণিতিকদের পরিভাষায় রাত ও দিনের চব্বিশ অংশের এক অংশকে বলা হয় “সা'আহ”, যাকে বাংলায় ঘন্টা নামে অভিহিত করা হয়। কুরআনের পরিভাষায় এ শব্দটি সে দিবসকে বুঝাবার জন্য ব্যবহৃত হয়, যা হবে সমগ্র সৃষ্টির মৃত্যুদিবস এবং সেদিনকেও বলা হয় যাতে সমগ্র সৃষ্টি পুনরায় জীবিত হয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে উপস্থিত হবে। أَيَّانَ (আইয়্যানা) অর্থ কবে। আর مُرسى (মুরসা) অর্থ অনুষ্ঠিত কিংবা স্থাপিত হওয়া। يُجَلِّيهَا শব্দটি تجلية থেকে গঠিত। এর অর্থ প্রকাশিত এবং খোলা। بغتة (বাগতাতান) অর্থ অকস্মাৎ। حفي (হাফিয়ূন) অর্থ আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন, জ্ঞানী ও অবহিত ব্যক্তি। প্রকৃতপক্ষে এমন লোককে ‘হাফী’ বলা হয়, যে প্রশ্ন করে বিষয়ের পরিপূর্ণ তথ্য অনুসন্ধান করে নিতে পারে। [তাবারী] কাজেই আয়াতের মর্ম দাড়াল এই যে, এরা আপনার নিকট কেয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করে যে, তা কবে আসবে? আপনি তাদেরকে বলে দিন, এর নির্দিষ্টতার জ্ঞান শুধুমাত্র আমার পালনকর্তারই রয়েছে। এ ব্যাপারে পূর্ব থেকে কারো জানা নেই এবং সঠিক সময়ও কেউ জানতে পারবে না। নির্ধারিত সময়টি যখন উপস্থিত হয়ে যাবে, ঠিক তখনই আল্লাহ্ তা'আলা তা প্রকাশ করে দেবেন।

এতে কোন মাধ্যম থাকবে না। কেয়ামতের ঘটনাটি আসমান ও যমীনের জন্যও একান্ত ভয়ানক ঘটনা হবে। সেগুলোও টুকরো টুকরো হয়ে উড়তে থাকবে। সুতরাং এহেন ভয়াবহ ঘটনা সম্পর্কে পূর্ব থেকে প্রকাশ না করাই বিচক্ষণতার দাবী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেয়ামতের আকস্মিক আগমন সম্পর্কে বলেছেন, মানুষ নিজ নিজ কাজে পরিব্যস্ত থাকবে। এক লোক খরিদদারকে দেখাবার উদ্দেশ্যে কাপড়ের থান খুলে সামনে ধরে থাকবে, সে (সওদাগর) এ বিষয়টিও সাব্যস্ত করতে পারবে না, এরই মধ্যে কেয়ামত এসে যাবে। এক লোক তার উটনীর দুধ দুইয়ে নিয়ে যেতে থাকবে এবং তখনো তা ব্যবহার করতে পারবে না, এরই মধ্যে কেয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে।

কেউ নিজের হাউজ মেরামত করতে থাকবে- তা থেকে অবসর হওয়ার পূর্বেই কেয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে। কেউ হয়ত খাবারের লোকমা হাতে তুলে নেবে, তা মুখে দেবার পূর্বেই কেয়ামত হয়ে যাবে। [বুখারীঃ ৬৫০৬, মুসলিমঃ ২৯৫৪] সুতরাং যেভাবে মানুষের ব্যক্তিগত মৃত্যুর তারিখ ও সময়-ক্ষণ অনির্দিষ্ট ও গোপন রাখার মাঝে বিরাট তাৎপর্য নিহিত রয়েছে, তেমনিভাবে কেয়ামতকেও-যা সমগ্র বিশ্বের সামগ্রিক মৃত্যুরই নামান্তর-তাকে গোপন এবং অনির্দিষ্ট রাখার মধ্যেও বিপুল রহস্য ও তাৎপর্য বিদ্যমান।


(৪) বলা হয়েছে, আপনি লোকদিগকে বলে দিন যে, প্রকৃতপক্ষে কেয়ামতের সঠিক তারিখ সম্পর্কিত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ ছাড়া তার কোন ফিরিশতা কিংবা নবী-রাসূলগণেরও জানা নেই। তবে হ্যাঁ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস ওয়াসাল্লামকে কেয়ামতের কিছু নিদর্শন ও লক্ষণাদি সম্পর্কিত জ্ঞান দান করা হয়েছে। আর তা হল এই যে, এখন তা নিকটবর্তী। এ বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস ওয়াসাল্লাম বহু বিশুদ্ধ হাদীসে অত্যন্ত পরিস্কারভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ “আমার আবির্ভাব এবং কেয়ামত এমনভাবে মিশে আছে, যেমন মিশে থাকে হাতের দু’টি আঙ্গুল।” [বুখারীঃ ৬৫০৩-৬৫০৫, মুসলিমঃ ২৯৫০]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৮৭) তারা তোমাকে কিয়ামত[1] সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, ‘তা কখন ঘটবে?’[2] বল, এ বিষয়ের জ্ঞান শুধু আমার প্রতিপালকের নিকটেই আছে।[3] কেবল তিনিই যথাকালে তা প্রকাশ করবেন। তা হবে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে একটি ভয়ংকর ঘটনা।[4] আকস্মিকভাবেই তা তোমাদের নিকট আসবে। তুমি এ বিষয়ে সবিশেষ অবহিত মনে করেই তারা তোমাকে প্রশ্ন করে।[5] তুমি বল, ‘এ বিষয়ের জ্ঞান আমার প্রতিপালকের নিকটেই আছে। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।’


তাফসীর:

[1] ساعة সময় (ক্ষণ বা মুহূর্ত)এর অর্থে ব্যবহার হয়। কিয়ামত দিবসকে الساعة বলা হয়েছে, যেহেতু তা হঠাৎ এমনভাবে উপস্থিত হবে যে, ক্ষণিকের মধ্যে সমস্ত পৃথিবী লন্ডভন্ড হয়ে যাবে। অথবা দ্রুত হিসাব-নিকাশের দিকে লক্ষ্য করে কিয়ামতের সময়কে الساعة (সময়) বলা হয়েছে।

[2] أرسي يرسى এর অর্থঃ সংঘটিত হওয়া। অর্থাৎ, কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে?

[3] অর্থাৎ, তার সত্যিকার জ্ঞান না কোন ফিরিশতার আছে আর না কোন নবীর। আল্লাহ ছাড়া কিয়ামতের সময়জ্ঞান কারো নেই। তিনিই তা যথাসময়ে প্রকাশ করবেন।

[4] এর এক দ্বিতীয় অর্থ রয়েছে, তার জ্ঞান আকাশ ও পৃথিবীবাসীদের জন্য ভারী। কারণ তা গুপ্ত, আর গুপ্ত বস্তু হৃদয়ের জন্য ভারীই হয়ে থাকে।

[5] حَفِي এর অর্থ কারো পিছনে লেগে জিজ্ঞাসা ও যাচাই করা। অর্থাৎ, তারা কিয়ামত সম্বন্ধে তোমাকে এমনভাবে জিজ্ঞাসা করছে, যেন তুমি নিজ প্রভুর পিছনে লেগে কিয়ামতের আবশ্যিক জ্ঞান অর্জন করে রেখেছ।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৮৭-১৯২ নং আয়াতের তাফসীর:



কিয়ামত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলে আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে বলে দিচ্ছেন, বল: কিয়ামত কখন হবে সে জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার কাছে। তিনি তা যথাসময়ে ঘটাবেন।



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(إِنَّ اللّٰهَ عِنْدَه۫ عِلْمُ السَّاعَةِ ج وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ ج وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ ط وَمَا تَدْرِيْ نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا ط وَمَا تَدْرِيْ نَفْسٌۭ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوْتُ ط إِنَّ اللّٰهَ عَلِيْمٌ خَبِيْرٌ )‏



“নিশ্চয় আল্লাহরই কাছে রয়েছে কিয়ামত সম্পর্কে জ্ঞান এবং তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন, আর তিনিই জানেন যা কিছু আছে গর্ভাধারে। কেউ জানে না আগামীকাল সে কী আয় করবে এবং কেউ জানে না কোন্ স্থানে সে মারা যাবে। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু জানেন, সব খবর রাখেন।” (সূরা লুকমান ৩১:৩৪)



(ثَقُلَتْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ)



‘সেটা হবে আকাশসমূহ ও পৃথিবীতে একটি ভয়ংকর ঘটনা।’ কাতাদাহ (রাঃ) বলেন: অর্থাৎ এ জ্ঞান আকাশ ও পৃথিবীবাসীদের কাছে অস্পষ্ট ও গোপনীয়। তারা তা জানতে পারবে না।



হাসান বাসরী (রাঃ) বলেন: যখন কিয়ামত আসবে তখন আকাশ ও পৃথিবীবাসীদের ওপর তা ভারী হয়ে যাবে। (ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)



(كَأَنَّكَ حَفِيٌّ)



‘তুমি এ বিষয়ে সবিশেষ অবহিত মনে করে’ মুফাসসিরগণ এর অনেক অর্থ বর্ণনা করেছেন। তবে সঠিক কথা ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: যখন তারা নাবী (সাঃ)-কে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে তখন এমন ভঙ্গীতে জিজ্ঞাসা করে যেন তিনি কিয়ামত সংঘঠিত হবার তারিখ অবগত রয়েছেন। এ জন্য আল্লাহ তা‘আলা ওয়াহী করে বললেন, বলে দাও যে- এ জ্ঞান আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কারো নেই। (ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)



(قُلْ لَّا أَمْلِكُ لِنَفْسِيْ نَفْعًا)



‘নিজের ভাল-মন্দের ওপরও আমার কোন অধিকার নেই।’ আল্লাহ তা‘আলার রাসূল নিজের কোন কল্যাণ ও অকল্যাণের মালিক নন এবং তিনি গায়েবও জানেন না। যদি তা জানতেন তাহলে তিনি সকল কল্যাণ গ্রহণ করতেন, অকল্যাণ তাঁকে স্পর্শ করতে না। এ সম্পর্কে পূর্বের সূরাগুলোতে অনেক আলোচনা হয়েছে।



(وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا)



‘তা হতে তার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন যাতে সে তার নিকট শান্তি পায়।’ অর্থাৎ আদম (আঃ) থেকে হাওয়া (আলাইহাস সালাম)-কে সৃষ্টি করেছেন যাতে তিনি তার নিকট প্রশান্তি ও সুখ লাভ করেন। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمِنْ اٰیٰتِھ۪ٓ اَنْ خَلَقَ لَکُمْ مِّنْ اَنْفُسِکُمْ اَزْوَاجًا لِّتَسْکُنُوْٓا اِلَیْھَا وَجَعَلَ بَیْنَکُمْ مَّوَدَّةً وَّرَحْمَةًﺚ اِنَّ فِیْ ذٰلِکَ لَاٰیٰتٍ لِّقَوْمٍ یَّتَفَکَّرُوْنَﭤ)‏



“আর তার দৃষ্টান্তগুলোর মধ্যে একটি এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকে স্ত্রীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি লাভ কর এবং তিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া। নিশ্চয়ই এতে ঐসব লোকের জন্য নিদর্শন রয়েছে যারা গভীরভাবে চিন্তা করে।” (সূরা রূম ৩০:২১)



আল্লাহ তা‘আলা নারী-পুরুষের মাঝে পারস্পরিক ভালবাসা ও সম্প্রীতি সৃষ্টি করেছেন। এ চাহিদা তারজোড়া সৃষ্টির মাধ্যমে পূরণ হয় এবং এক অপরের নৈকট্য ও ভালবাসা অর্জন করে। সুতরাং বাস্তবতা এই যে, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে যে ভালবাসা ও আন্তরিকতা দেখা যায় তা পৃথিবীর আর কারো মাঝে দেখা যায় না।



(فَلَمَّا تَغَشَّاهَا)



‘অতঃপর যখন সে তার সাথে মিলিত হয়’ অর্থাৎ যখন হাওয়া (আঃ)-এর সাথে আদম (আঃ) দৈহিক সম্পর্ক করলেন।



(حَمْلًا خَفِيْفًا فَمَرَّتْ بِهِ)



‘তখন সে এক হালকা গর্ভধারণ করে’ অর্থাৎ গর্ভ ধারণের শুরুর দিনগুলোতে প্রথমত স্ত্রীর গর্ভে স্বামীর বীর্য স্থির হয়, অতঃপর বীর্য থেকে শুক্র, তারপর রক্তপিণ্ড এবং তা হতে মাংস পিণ্ডে পরিণত হয় যা স্ত্রীগর্ভে ধারণ করে চলাফেরা করতে কোন কষ্ট হয় না।



(فَلَمَّا أَثْقَلَتْ دَعَوَا اللّٰهَ)



‘গর্ভ যখন ভারী হয়ে যায় তখন তারা (স্বামী-স্ত্রী) উভয়ে তাদের প্রতিপালক আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে’ অর্থাৎ যখন পেটে বাচ্চার আকার ধারণ করল তখন উভয়ে আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করল: হে আল্লাহ! আমাদেরকে একটি নিখুঁত ও সুন্দর সন্তান দিলে অবশ্যই আমরা শুকরিয়া আদায় করব।



কারণ পিতা-মাতার ভয় থাকে, না জানি সন্তানের কোন অঙ্গহানি বা বিকৃত অঙ্গ হয় কিনা।



(جَعَلَا لَه۫ شُرَكَا۬ءَ)



‘তারা আল্লাহর সাথে শরীক করে’ এ আয়াতের দু’টি তাফসীর আলেমদের কাছে সুপরিচিত। কুরআন তার একটিকে সমর্থন করে।



১. বলা হয়: হাওয়া (আলাইহাস সালাম)-এর যত সন্তান হত সবই ভূমিষ্টের পর মারা যেত। একদা তিনি গর্ভবতী হলেন। এ সুযোগে শয়তান এসে বলল: এবার যে সন্তান হবে তার নাম “আবদুল হারেস” রাখ তাহলে মারা যাবে না। হারেস ছিল শয়তানের একটি নাম। সন্তান ভূমিষ্ট হবার পর তিনি তাই করলেন। তাই আল্লাহ তা‘আলা বললেন, যখন সুসন্তান দিলাম তখন তারা শির্ক করল। (হাদীসটি যঈফ, সিলসিলা যঈফাহ হা: ৩৪২) এরূপ আরো মিথ্যা কাহিনী বর্ণনা করা হয়।



২. আয়াতের অর্থ: আল্লাহ তা‘আলা আদম ও হাওয়া (আলাইহিমাস সালাম)-কে যখন সৎ সন্তান দান করলেন তখন তার পরবর্তী বংশধর কুফরী করল।



মূলত আদম ও হাওয়ার দিকে সম্বোধন করে তাদের বংশধরকে বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَلَقَدْ خَلَقْنَاكُمْ ثُمَّ صَوَّرْنَاكُمْ)



“আমিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর তোমাদের আকৃতি দান করেছি।” (সূরা আ‘রাফ ৭:১১)



দ্বিতীয় মতের ওপর প্রমাণ বহন করে আয়াতের পরের অংশ। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:



(فَلَمَّآ اٰتٰهُمَا صَالِحًا جَعَلَا لَه۫ شُرَكَا۬ءَ فِيْمَآ اٰتٰهُمَا ج فَتَعٰلَي اللّٰهُ عَمَّا يُشْرِكُوْنَ ‏ أَيُشْرِكُوْنَ مَا لَا يَخْلُقُ شَيْئًا وَّهُمْ يُخْلَقُوْنَ )



“তিনি যখন তাদেরকে এক পূর্ণাঙ্গ সন্তান দান করলেন, তখন তাদেরকে যা দেয়া হল সে সম্বন্ধে তারা আল্লাহর সাথে শরীক করে, আর তারা যাকে শরীক করে আল্লাহ তা অপেক্ষা অনেক ঊর্ধ্বে। তারা কি এমন বস্তুকে শরীক করে যারা কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না? বরং তারা নিজেরাই সৃষ্ট।”



এটাই কুরআনের দলীল যে, এখানে মুশরিক বলতে বানী আদমকে বুঝানো হয়েছে আদম ও হাওয়া (আঃ)-কে নয়। এ মত পোষণ করেছেন- হাসান বসরী ও ইমাম ইবনু কাসীর (রাঃ)। (আযউয়াউল বায়ান, ২/২২৬) কারণ একজন নাবী কখনো শির্ক করতে পারেন না।



সুতরাং সকল নাবীদের ইমাম সর্বশেষ নাবী মুহাম্মাদ (সাঃ) যদি কোন কল্যাণ ও অকল্যাণের মালিক না হন তাহলে তথাকথিত পীর, গাউস, কুতুব ও মাযারে শায়িত ব্যক্তিরা কিভাবে কল্যাণের মালিক হতে পারে? তাই সকল প্রকার কল্যাণ ও অকল্যাণের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। অতএব শুধু তাঁর কাছেই আমাদের চাওয়া উচিত।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. কিয়ামত কখন হবে তা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা ভাল জানেন।

২. কিয়ামত হঠাৎ করে আসবে।

৩. রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিজেই নিজের ভাল-মন্দের মালিক না তাহলে কি করে তিনি অন্যের জন্য ভাল বা মন্দ করবেন।

৪. রাসূলুল্লাহ (সাঃ) গায়েব জানেন না; কেবল আল্লাহ তা‘আলাই জানেন।

৫. স্ত্রী সৃষ্টির লক্ষ ও উদ্দেশ্যের অন্যতম একটি হল তার নিকট প্রশান্তি লাভ।

৬. আল্লাহ তা‘আলার কাছে সৎ সন্তান কামনা করা দরকার।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: এই আয়াতটি কুরায়েশদের সম্পর্কে অথবা ইয়াহূদীদের একটি দলের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়। প্রথমটিই সঠিকতর। কেননা, এটা মক্কী আয়াত। আর ইয়াহূদীরা তো মদীনার অধিবাসী ছিল। আল্লাহ পাক বলেনঃ এই লোকগুলো যে কিয়ামতের সময় সম্পর্কে তোমাকে (নবী মুহাম্মাদ সঃ -কে) জিজ্ঞেস করছে তা কিন্তু বিশ্বাস করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করার দৃষ্টিকোণ নিয়েই প্রশ্ন করছে। যেমন নিম্নের আয়াতে দেখা যাচ্ছে- এ লোকগুলো বলে, আপনি যদি সত্যবাদী হন তবে বলুন তো কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে এবং কোন্ তারিখে হবে? অন্য জায়গায় বলেনঃ “এই কাফির লোকেরা তাড়াতাড়ি কিয়ামত সংঘটন কামনা করছে। অথচ মুমিনরা তো কিয়ামতের ভয়াবহতা থেকে সদা ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে এবং বিশ্বাস রাখে যে, ওর আগমন সত্য। যারা কিয়ামতের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করে তারা বড় ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে।”

আল্লাহ পাক বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করছেকিয়ামত কোন্ তারিখে সংঘটিত হবে এবং দুনিয়া শেষ হবে কখন? আর ওর নির্ধারিত সময় কোষ্টা ? হে নবী (সঃ) ! তুমি তাদেরকে বলে দাও- এর জ্ঞান তো একমাত্র আমার প্রতিপালক আল্লাহরই রয়েছে! আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউই এর সময় সম্পর্কে অবহিত নয়। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে পরামর্শ দিচ্ছেন- হে নবী (সঃ)! তারা তোমাকে কিয়ামতের সময় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করছে, তুমি এর উত্তর এটাই দাও যে, এর নির্দিষ্ট সময় আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ অবহিত নয়। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যমীন ও আসমানবাসী এর ব্যাপারে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। হযরত হাসান (রঃ)-এর ভাবার্থ এই বর্ণনা করেছেন যে, যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে তখন যমীন ও আসমানবাসীর ওটা অত্যন্ত ভারী ও কঠিন বোধ হবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর ভাবার্থ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন যে, এমন কোন জিনিস। থাকবে না যার উপর কিয়ামতের কষ্ট পৌছবে না। আকাশ ফেটে যাবে, তারকারাজী খসে পড়বে, সূর্য অন্ধকার হয়ে যাবে, পাহাড় উড়তে থাকবে এবং আল্লাহ তা'আলা যা কিছু বলেছেন সবই হবে। আকাশবাসীদেরও এর জ্ঞান নেই। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “ওটা এমনভাবে হঠাৎ এসে পড়বে যে, ওটার কোন ধারণাও করা হবে না।”

সহীহ বুখারীতে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামত সংঘটিত হবে না যে পর্যন্ত না পশ্চিম দিক হতে সূর্য উদিত হবে। এক সময়ে যখন সূর্য পশ্চিম দিকে উদিত হবে তখন কাফিররা এই আশ্চর্যজনক ঘটনা এবং ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতা অবলোকন করে ঈমান আনয়ন করবে। কিন্তু ঐ সময়ে ঈমান আনয়ন কারো কোন উপকারে আসবে না। পাপীদের সেই সময়ের সৎ কাজ মোটেই ফলদায়ক হবে না। দু’ব্যক্তি কাপড় আদান প্রদান করতে থাকবে, এই উদ্দেশ্যে কাপড়ের থান খুলে দেয়া হবে, দুধ দোহন করে পান করাও হবে না , মানুষ পান করার পানির পাত্র পরিষ্কার করতেই থাকবে এবং তারা খাদ্য গ্রাস মুখে উঠাতে যাবে ইত্যবসরে কিয়ামত শুরু হয়ে যাবে। `

(আরবী) -এর অর্থের ব্যাপারে মুফাসসিরগণের মতানৈক্য রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন যে, এর অর্থ হচ্ছে- হে নবী (সঃ)! তারা কিয়ামতের রহস্য তোমাকে এমনভাবে জিজ্ঞেস করছে যে, তুমি যেন তাদের বড় বন্ধু। আর তারা তোমাকে এটা এমন ভঙ্গীতে জিজ্ঞেস করছে যে, তুমি যেন কিয়ামত সংঘটনের তারিখ অবগত রয়েছে। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেন যে, এর জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই। আল্লাহ তা'আলা এই রহস্য তো নিজের নিকটতম কোন ফেরেশতা বা কোন রাসূলের উপরেও প্রকাশ করেননি। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, কুরাইশরা নবী (সঃ)-কে বলেছিলঃ “আপনার এবং আমাদের মধ্যে তো আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে, অতএব কিয়ামত কখন হবে তা আমাদেরকে বলে দিন।” তাই আল্লাহ তা'আলা এই আয়াতটি অবতীর্ণ করে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাও-এর জ্ঞান শুধু আল্লাহ তা'আলারই আছে।

ঐ লোকগুলো নবী (সঃ)-কে কিয়ামত সংঘটনের সময় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতো, কিন্তু তারা জানতো না যে, ওর জ্ঞান তাঁর তো নেই। আল্লাহ ছাড়া কেউই ওর জ্ঞান রাখে না। একজন বেদুঈনের রূপ ধারণ করে একদা হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন, যেন জনগণ দ্বীনী শিক্ষা লাভ করতে পারে। অতঃপর তিনি হিদায়াত অনুসন্ধিৎসু একজন প্রশ্নকারীর ভঙ্গীতে তাঁর পার্শ্বে বসে পড়েন এবং তাকে ইসলাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। এরপর জিজ্ঞেস করেন ঈমান ও ইহসান সম্পর্কে। তার পর জিজ্ঞেস করেনঃ “কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে?” এই চতুর্থ প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এই ব্যাপারে তো আপনার চেয়ে আমার জ্ঞান বেশী নেই। অর্থাৎ আপনি যেমন এটা জানেন না তেমনই আমিও জানি না। কোন লোকই এই ব্যাপারে কিছুই জানে না বা জানতে পারে না।” অতঃপর তিনি (আরবী) (৩১:৩৪) এই আয়াতটি পাঠ করেন। অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) একজন বেদুঈনের রূপ ধরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন এবং তাকে কিয়ামতের নিদর্শনাবলী সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তখন তিনি নিদর্শনগুলো বলে দেন। তারপর তিনি বলেনঃ “পাঁচটি জিনিসের জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই।” তাঁর প্রতিটি উত্তরের উপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলে যাচ্ছিলেনঃ “আপনি সঠিক উত্তরই দিয়েছেন।” তাঁর কথার ধরনে বুঝা যাচ্ছিল যে, তিনি ওগুলো জানেন এবং জানেন বলেই তাঁর উত্তরের সত্যতার স্বীকারোক্তি করছেন। সুতরাং সাহাবাগণ এতে বিস্ময় প্রকাশ করেন যে, ইনি কি ধরনের প্রশ্নকারী? তিনি নিজেই প্রশ্ন করছেন, আবার উত্তরের সঠিকতা স্বীকার করছেন! যখন সেই প্রশ্নকারী চলে গেলেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবাগণকে বললেনঃ “ইনি ছিলেন হযরত জিবরাঈল (আঃ)। তিনি তোমাদেরকে দ্বীনী মাসআলাগুলো শিক্ষা দেয়ার জন্যে এসেছিলেন। এর পূর্বে যখন তিনি রূপ পরিবর্তন করে আসতেন তখন আমি তাকে চিনতে পারতাম। এবার কিন্তু আমিও তাকে চিনতে পারিনি।” (ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন, আমি শরহে বুখারীর শুরুতে এ হাদীসটি বর্ণনা করেছি) যখন এক বেদুঈন তাঁকে জিজ্ঞেস করে এবং উচ্চৈঃস্বরে ডাক দেয়, হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তখন তিনিও উচ্চৈঃস্বরেই উত্তর দেন, হা, কি বলতে চাও? তখন সে বলে, কিয়ামত কখন হবে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “ওরে মূখ! কিয়ামত তো আসবে এবং অবশ্যই আসবে। কিন্তু তুমি ওর জন্যে কি প্রস্তুতি গ্রহণ করেছো?” সে উত্তরে বলেঃ “আমি তো ভালরূপে নামায পড়তে এবং রোযা রাখতে পারিনি। তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর প্রতি আমার অত্যন্ত ভালবাসা রয়েছে।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “কিয়ামতের দিন মানুষ ঐ মানুষের সাথেই থাকবে যাকে সে বেশী ভালবাসে।” এই কথা শুনে সাহাবাগণ অত্যন্ত খুশী হলেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে এ হাদীসটি বিভিন্ন পন্থায় অধিকাংশ সাহাবা হতে বর্ণিত হয়েছে।


রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন কোন লোক তাঁকে এমন প্রশ্ন করতো যা তার জন্যে অর্থহীন, তখন তিনি উত্তরে এমন বিষয়ের দিকে তার মোড় ফিরিয়ে দিতেন যা জেনে নেয়া তার জন্যে ঐ প্রশ্ন হতে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। যেন সে নিজেকে ওর সাথে জড়িয়ে ফেলে এবং পূর্ব থেকেই ওর জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করে, যদিও ওর নির্দিষ্ট সময় তার জানা না থাকে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আরবের বেদুঈনরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে আসতো এবং প্রায়ই প্রশ্ন করতোঃ “কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে?” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার কোন এক শিশু সন্তানের দিকে ইঙ্গিত করে বলতেনঃ “যদি আল্লাহ একে পূর্ণ বয়স দান করেন তবে এ বৃদ্ধ হওয়ার পূর্বেই তোমার কিয়ামত এসে। যাবে।” এখানে যেন কিয়ামত দ্বারা মৃত্যুকে বুঝানো হয়েছে, যা মানুষকে এই দুনিয়া হতে সরিয়ে আলমে বারযাখে নিয়ে যাবে। শব্দের কম বেশী কিছু পরিবর্তনসহ এ বিষয়ের আরো বহু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। মোটকথা, এসব হাদীসের উদ্দেশ্য এই যে, কিয়ামত আসবে এবং অবশ্যই আসবে। কিন্তু সময়ের নির্ধারণ সম্ভব নয়।

“এই শিশুর বার্ধক্য আসার পূর্বেই কিয়ামত এসে যাবে” এ বাক্যের প্রয়োগও এই আবদ্ধ করণের উপরই মাহমূল হয়েছে। অর্থাৎ এর দ্বারা মানুষের মৃত্যুর সময় বুঝানো হয়েছে।

ইন্তেকালের এক মাস পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “তোমরা আমাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতে রয়েছে, কিন্তু কিয়ামত আসতে আর কত দিন সময় আছে এর জ্ঞান তো একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই রয়েছে। তবে আমি কসম খেয়ে বর্ণনা করছি যে, বর্তমানে ভূ-পৃষ্ঠে যতগুলো প্রাণী রয়েছে, একশ’ বছর পরে এগুলোর একটিরও অস্তিত্ব বাকী থাকবে না। তা হলে ভাবার্থ যেন এই যে, কিয়ামতের দিন যেমন সমস্ত লোক মৃত্যুবরণ করবে, তদ্রুপ একশ’ বছর পরে বর্তমানের সমস্ত লোকের জন্যে কিয়ামত এসে যাবে। সুতরাং তার উদ্দেশ্য যেন এই যে, তোমরা যদি নির্ধারিত সময়ই জানতে চাও তবে এটাই হচ্ছে। নির্ধারিত সময়। এভাবে কিয়ামত দ্বারা ঐ এক শতাব্দীর সমাপ্তি বুঝানো হয়েছিল। তিনি এই ঢঙ্গেই বর্ণনা দিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, শবে মিরাজে আমি হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ) এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর পার্শ্ব দিয়ে গমন করি। লোকেরা কিয়ামত সম্পর্কে আলোচনা করছিল। সবাই এসে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করলো। তিনি উত্তরে বললেনঃ “এ ব্যাপারে আমার কোনই জ্ঞান নেই।” এর পর তারা হযরত মূসা (আঃ)-এর কাছে গেল। তিনিও বললেন যে, এর জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই। অতঃপর তারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর কাছে গেল। তিনিও বললেনঃ এর জ্ঞান একমাত্র আল্লাহরই আছে। তবে এর আলামত এই যে, দাজ্জাল বের হবে। আমার সাথে দু'একটি শাখা থাকবে। সে (দাজ্জাল) আমাকে দেখা মাত্রই সীসার মত গলে যাবে এবং আল্লাহ পাক তাকে ধ্বংস করে দিবেন। এমন কি গাছ ও পাথরও বলে উঠবে- হে মুসলমান! আমার আড়ালে একজন কাফির লুকিয়ে রয়েছে। সুতরাং তুমি এসে তাকে হত্যা কর। অতএব, আল্লাহ তাআলা ঐ সব কাফিরকে ধ্বংস করে দিবেন। অতঃপর লোকেরা নিজ নিজ শহরে ও দেশে ফিরে যাবে। ইতিমধ্যে ইয়াজুজ ও মাজুজ প্রত্যেক প্রান্ত থেকে বেরিয়ে পড়বে। তারা শহর-পল্লী ধ্বংস করে চলবে। প্রতিটি জিনিস তাদের ঘোরা ফেরার কারণে ধ্বংস ও নষ্ট হতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত তারা প্রস্রবণে পৌছবে এবং ওকে শূন্য করে ফেলবে। জনগণ তখন আমার কাছে তাদের অভিযোগ নিয়ে আসবে। আমি তাদের জন্যে আল্লাহর কাছে বদ দুআ করবো। আল্লাহ তা'আলা ঐসব ইয়াজুজ ও মাজুজকে ধ্বংস করে দিবেন। অবশেষে প্রতিটি স্থান তাদের মৃতদেহে ভরে যাবে এবং ওগুলো সড়ে পচে দুর্গন্ধময় হয়ে পড়বে। তখন আল্লাহ তা'আলা বৃষ্টি বর্ষণ করে তাদের মৃতদেহগুলো বইয়ে নিয়ে সমুদ্রে ফেলে দিবেন। ঐ সময় পাহাড় স্থানচ্যুত হয়ে যাবে এবং যমীন বিস্তৃত হয়ে পড়বে। ঐ সময় কিয়ামত এমনই নিকটবর্তী হবে যেমন ন'মাসের গর্ভবতী মহিলা সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে যে, সে দিন-রাত কোন এক সময়ের মধ্যেই সন্তান প্রসব করবে। বড় বড় নবীরাও কিয়ামতের সময় সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। না। হযরত ঈসা (আঃ)-ও শুধুমাত্র ওর আলামতগুলো বলে দিয়েছেন। কেননা, এই উম্মতের শেষ যুগে তিনি অবতরণ করবেন এবং নবী (সঃ)-এর আহকাম নাফি করবেন। তিনি দাজ্জালকে হত্যা করবেন এবং আল্লাহ তা'আলা তারই বদ দুআ’য় ইয়াজুজ-মাজুজকে ধ্বংস করবেন।

রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি তোমাদেরকে কিয়ামতের নিদর্শনগুলো বলছি। তা এই যে, ওর সামনে বড় বড় ফি ও ‘হারাজ সংঘটিত হবে।” সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা ফিৎনা তো বুঝলাম। কিন্তু ‘হারাজ’ কি?` তিনি উত্তরে বললেনঃ “হাবশের আরবী ভাষায় এর অর্থ হচ্ছে হত্যা।” অতঃপর তিনি বলেনঃ জনগণের মধ্যে অপরিচিতি ও বেপরওয়াঈ এতো বৃদ্ধি পাবে যে, এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে বলবেঃ “আমি তোমাকে চিনি না।' বিশুদ্ধ ছ’খানা হাদীস গ্রন্থে এ কথাটিকে এভাবে বর্ণনা করা হয়নি।

আমাদের উম্মী নবী (সঃ) সাইয়্যেদুল মুরসালীন, খাতিমুন নাবিঈন, যিনি রহমত ও তাওবার নবী, বলেছেনঃ “আমি ও কিয়ামত এই দুটি অঙ্গুলির মত।” ঐ সময় তিনি তাঁর শাহাদাত ও মধ্যমা অঙ্গুলি দুটি মিলিত দেখিয়েছিলেন। তিনি যেন বলতে চেয়েছেন যে, তার সাথে কিয়ামত লেগে রয়েছে। অর্থাৎ তার ও কিয়ামতের মধ্যভাগে কোন নবী আসবেন না। মোট কথা (আরবী) বা। কিয়ামতের ইলম শুধু আল্লাহ পাকেরই রয়েছে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।