আল কুরআন


সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 170)

সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 170)



হরকত ছাড়া:

والذين يمسكون بالكتاب وأقاموا الصلاة إنا لا نضيع أجر المصلحين ﴿١٧٠﴾




হরকত সহ:

وَ الَّذِیْنَ یُمَسِّکُوْنَ بِالْکِتٰبِ وَ اَقَامُوا الصَّلٰوۃَ ؕ اِنَّا لَا نُضِیْعُ اَجْرَ الْمُصْلِحِیْنَ ﴿۱۷۰﴾




উচ্চারণ: ওয়াল্লাযীনা ইউমাছছিকূনা বিলকিতা-বি ওয়া আকা-মুসসালা-তা ইন্না-লা-নুদী‘উ আজরাল মুসলিহীন।




আল বায়ান: আর যারা কিতাবকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে এবং সালাত কায়েম করে, নিশ্চয় আমি সৎকর্মশীলদের প্রতিদান বিনষ্ট’ করি না।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৭০. যারা কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারন করে ও সালাত কায়েম করে, আমরা তো সৎকর্মপরায়ণদের শ্রমফল নষ্ট করি না।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: যারা কিতাবকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে, নামায প্রতিষ্ঠা করে, আমি (এসব) সৎকর্মশীলদের কর্মফল কখনো বিনষ্ট করি না।




আহসানুল বায়ান: (১৭০) আর যারা কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে ও নামায যথারীতি আদায় করে, নিশ্চয় আমি (তাদের মত) সংশোধনকারীদের শ্রমফল নষ্ট করি না। [1]



মুজিবুর রহমান: যারা আল্লাহর কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে এবং সালাত কায়েম করে; আমিতো সৎ কর্মশীলদের কর্মফল নষ্ট করিনা।



ফযলুর রহমান: আর যারা কিতাবকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে থাকে আর সঠিকভাবে নামায আদায় করে, এরকম সৎকর্মশীলদের পুরস্কার আমি কিছুতেই নষ্ট করি না।



মুহিউদ্দিন খান: আর যেসব লোক সুদৃঢ়ভাবে কিতাবকে আঁকড়ে থাকে এবং নামায প্রতিষ্ঠা করে নিশ্চয়ই আমি বিনষ্ট করব না সৎকর্মীদের সওয়াব।



জহুরুল হক: আর যারা কিতাব শক্তভাবে ধারণ করে ও নামায কায়েম করে -- আমরা নিশ্চয় সৎকর্মশীলদের কর্মফল বিনষ্ট করি না।



Sahih International: But those who hold fast to the Book and establish prayer - indeed, We will not allow to be lost the reward of the reformers.



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৭০. যারা কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারন করে ও সালাত কায়েম করে, আমরা তো সৎকর্মপরায়ণদের শ্রমফল নষ্ট করি না।(১)


তাফসীর:

(১) পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে একটি প্রতিজ্ঞা ও প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে যা বিশেষতঃ বনী-ইসরাঈলের আলেম সম্প্রদায়ের নিকট থেকে তাওরাত সম্পর্কে নেয়া হয়েছিল যে, এতে কোন রকম পরিবর্তন কিংবা বিকৃতি সাধন করবে না এবং সত্য ও সঠিক বিষয় ছাড়া মহান রবের প্রতি অন্য কোন বিষয় আরোপ করবে না। আর এ বিষয়টি পূর্বেই উল্লেখিত হয়ে গিয়েছিল যে, বনী-ইসরাঈলের আলেমগণ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে স্বার্থাম্বেষীদের কাছ থেকে উৎকোচ নিয়ে তাওরাতের বিধিবিধানের পরিবর্তন করেছে এবং তাদের উদ্দেশ্য ও স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে বাতলিয়েছে।

এখানে আলোচ্য এই আয়াতটিতে সে বর্ণনারই উপসংহার হিসাবে বলা হয়েছে যে, বনী-ইসরাঈলের সব আলেমই এমন নয়; কোন কোন আলেম এমনও রয়েছে যারা তাওরাতের বিধি-বিধানকে দৃঢ়তার সাথে ধরেছে এবং বিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে সৎকাজেও নিষ্ঠা অবলম্বন করেছে। আর যথারীতি সালাতও প্রতিষ্ঠা করেছে। এমনি লোকদের সম্পর্কে বলা হয়েছে- আল্লাহ তাদের প্রতিদান বিনষ্ট করে দেন না, যারা নিজেদের সংশোধন করে। কাজেই যারা ঈমান ও আমলের উভয় ফরয আদায়ের মাধ্যমে নিজের সংশোধন করে নিয়েছে, তাদের প্রতিদান বা প্রাপ্য বিনষ্ট হতে পারে না। এ আয়াতে কয়েকটি লক্ষণীয় ও জ্ঞাতব্য বিষয় রয়েছে-

প্রথমতঃ কিতাব বলতে এতে সে কিতাবই উদ্দেশ্য যার আলোচনা ইতোপূর্বে এসেছে অর্থাৎ তাওরাত। অর্থাৎ যারা তাদের কিতাবে যে নবীর কথা বলা হয়েছে সে অনুসারে ঈমান এনেছে। মুজাহিদ বলেন, এ অনুসারে এটি আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। [কুরতুবী; ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর] আর এও হতে পারে যে, এতে কুরআনকেই উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ যারা বর্তমান নাযিলকৃত কিতাবের অনুসরণ করে তাদের প্রচেষ্টা ও আমল নষ্ট হবার নয়। তখন উম্মতে মুহাম্মাদীই উদ্দেশ্য হবে। [বাগভী; জালালাইন: সা’দী] অথবা সমস্ত আসমানী কিতাবই উদ্দেশ্য। তখন অর্থ হবে, যাদেরকেই আমরা কিতাব দিয়েছি তারা যদি তাদের সময়কার কিতাব অনুসারে চলে আমরা তাদের কর্মকাণ্ড ও আমল নষ্ট করি না। আর বর্তমানে কুরআন অনুসারেই সকলকে চলতে হবে।

দ্বিতীয়তঃ আল্লাহর কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে হবে। তাতে যত হুকুম আহকাম আছে তারা সেটার উপর যত্ন সহকারে আমল করে, এ ব্যাপারে তাদের কোন শৈথিল্য হয় না। যাদের আমল বিনষ্ট হয় না। তাদের পরিচয় হচ্ছে যে, তারা কঠোরভাবে এ কিতাবে বর্ণিত শরীআতের উপর আমল করে। [আইসারুত তাফসীর] সুতরাং একান্ত আদব ও সম্মানের সাথে অতি যত্ন সহকারে নিজের কাছে শুধু রেখে দিলেই তার উদ্দেশ্য সাধিত হয় না; বরং তার বিধি-বিধান ও নির্দেশাবলীর অনুবতীও হতে হবে।

তৃতীয় লক্ষণীয় বিষয় হল, এখানে একটিমাত্র বিধান সালাত প্রতিষ্ঠা করার কথা বলেই ক্ষান্ত করা হয়েছে। এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, আল্লাহর কিতাবের বিধিবিধানসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম ও গুরুত্বপূর্ণ বিধান হল সালাত। [সা’দী] তদুপরি সালাতের অনুবর্তিতা আসমানী বিধানসমূহের অনুবর্তিতার বিশেষ লক্ষণ। এরই মাধ্যমে চেনা যায়, কে কৃতজ্ঞ আর কে কৃতঘ্ন। আর এর নিয়মানুবর্তিতার একটা বিশেষ কার্যকারিতাও রয়েছে যে, যে লোক সালাতে নিয়মানুবর্তী হয়ে যাবে, তার জন্য অন্যান্য বিধি-বিধানের নিয়মানুবর্তিতাও সহজ হয়ে যায়।

পক্ষান্তরে যে লোক সালাতের ব্যাপারে নিয়মানুবর্তী নয়, তার দ্বারা অন্যান্য বিধি-বিধানের নিয়মানুবর্তিতাও সম্ভব হয় না। সহীহ হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘সালাত হল দ্বীনের স্তম্ভ', [তিরমিযীঃ ২৬১৬] অর্থাৎ যার উপরে তার ইমারত রচিত হয়েছে, যে ব্যক্তি এই স্তম্ভকে প্রতিষ্ঠিত রেখেছে, সে দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত রেখেছে, যে এ স্তম্ভকে বিধ্বস্ত করেছে, সে গোটা দ্বীনের ইমারতকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। যে সালাতের ব্যাপারে গাফলতি করে, সে যত তাসবীহ-ওযীফাই পড়ুক কিংবা যত প্রচেষ্টা করুক না কেন, আল্লাহর নিকট সে কিছুই নয়।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৭০) আর যারা কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে ও নামায যথারীতি আদায় করে, নিশ্চয় আমি (তাদের মত) সংশোধনকারীদের শ্রমফল নষ্ট করি না। [1]


তাফসীর:

[1] তাদের মধ্যে যারা তাকওয়া, পরহেযগারি ও সাবধানতার পথ অবলম্বন করবে, কিতাবকে শক্তভাবে ধারণ করবে; যার অর্থঃ আসল তাওরাতের উপর আমল করে মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর নবুঅতের উপর ঈমান আনবে, নামায ইত্যাদির উপর দৃঢ় থাকবে। তাহলে এমন সৎকর্মশীলদের কর্মফল আল্লাহ নষ্ট করবেন না। এখানে ঐ সকল আহলে কিতাবের (বিশেষভাবে ইয়াহুদীদের) কথা বর্ণনা রয়েছে। যারা কিতাবকে শক্তভাবে ধারণ করবে, নামায প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে সচেষ্ট হবে এবং তাদের জন্য পরকালের সুসংবাদও রয়েছে; এর অর্থ হল, তারা যেন মুসলমান হয়ে যায় ও শেষনবীর রিসালাতের উপর ঈমান আনে। কারণ, এখন শেষ নবী মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর উপর ঈমান আনা ছাড়া পরকালের সুসংবাদ লাভ সম্ভব নয়।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৬৮-১৭১ নং আয়াতের তাফসীরঃ



আলোচ্য আয়াতগুলোতে ইয়াহূদীদের বিভিন্ন দল উপদলে বিভক্ত হবার কথা বলা হচ্ছে। আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়াতে তাদেরকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে দিয়েছেন অথচ পূর্বে তারা সকলেই এক ও অভিন্ন ছিল। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَّقُلْنَا مِنْۭ بَعْدِه۪ لِبَنِيْ إِسْرَا۬ئِيْلَ اسْكُنُوا الْأَرْضَ فَإِذَا جَا۬ءَ وَعْدُ الْاٰخِرَةِ جِئْنَا بِكُمْ لَفِيْفًا)



“এরপর আমি বানী ইসরাঈলকে বললাম, ‘তোমরা ভূ- পেৃষ্ঠে বসবাস কর‎ এবং যখন ক্বিয়ামতের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবে তখন তোমাদের সকলকে আমি একত্র করে উপস্থিত করব।” (সূরা ইসরা ১৭:১০৪)



এদের মধ্যে অনেকে সৎ লোক ছিল এবং অনেকে অসৎ লোক ছিল। যেমন জিনেদের মধ্যে ভালমন্দ উভয় প্রকারই রয়েেেছ তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَّأَنَّا مِنَّا الصَّالِحُوْنَ وَمِنَّا دُوْنَ ذٰلِكَ ط كُنَّا طَرَآئِقَ قِدَدًا)‏



“এবং আমাদের কতক সৎ কর্মপরায়ণ এবং কতক এর ব্যতিক্রম, আমরা ছিলাম বিভিন্ন পথের অনুসারী।” (জিন ৭২:১১)



بِالْحَسَنَاتِ وَالسَّيِّئَاتِ



‘মঙ্গল ও অমঙ্গল দ্বারা আমি তাদেরকে পরীক্ষা করেছিলাম’ অর্থাৎ তাদেরকে সুখ সাচ্ছন্দ ও বিপদ-আপদ দ্বারা পরীক্ষা করেছি।



اَدْنٰي- (هَذَا الْأَدْنٰي)



শব্দটি دُنُوٌ থেকে নেয়া হয়েছে যার অর্থ নিকটবর্তী। অর্থাৎ নিকটবর্তী (পার্থিব) সম্পদ গ্রহণ করে। অথবা এটি دَنَاءَةٌ থেকে এসেছে যার অর্থ, নিকৃষ্ট বা তুচ্ছ সম্পদ। উভয় অর্থই উদ্দেশ্য, তাদের পার্থিব সম্পদের প্রতি আসক্তির স্পষ্ট কারণ।



কাতাদাহ (রাঃ) বলেন:



(فَخَلَفَ مِنْۭ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ)



‘অতঃপর অযোগ্য পূর্বপুরুষগণ একের পর এক তাদের স্থলাভিষিক্তরূপে কিতাবের উত্তরাধিকারী হয়’ আল্লাহ তা‘আলার শপথ! এরা অতি নিকৃষ্ট উত্তরসূরী। নাবীদের পরে এরা তাওরাত ও ইঞ্জিলের উত্তরাধিকারী ছিল। আল্লাহ তা‘আলা কিতাবে তাদের থেকে অঙ্গীকারও নিয়েছিলেন। যেমন-



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(فَخَلَفَ مِنْۭ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلٰوةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّا)‏



“তাদের পরে আসল অপদার্থ পরবর্তীগণ, তারা সালাত নষ্ট করল ও লালসা-পরবশ হল। সুতরাং তারা অচিরেই কুকর্মের শাস্তি‎ প্রত্যক্ষ করবে।” (সূরা মারইয়াম ১৯:৫৯)



তারা আল্লাহ তা‘আলার কাছে আশা রাখে এবং নিজেদের প্রতারিত করে। দুনিয়া অর্জনের কোন সুযোগ এলে তখন হালাল হারাম কিছুই দেখে না। কোন জিনিস তাদেরকে পাপ কাজ হতে বিরত রাখতে পারে না।



(أَلَمْ يُؤْخَذْ عَلَيْهِمْ مِيْثَاقُ الْكِتَابِ)



‘কিতাবের অঙ্গীকার কি তাদের নিকট হতে নেয়া হয়নি’ অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা এ অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন:



(وَإِذْ أَخَذَ اللّٰهُ مِيْثَاقَ الَّذِيْنَ أُوْتُوا الْكِتٰبَ لَتُبَيِّنُنَّه۫ لِلنَّاسِ وَلَا تَكْتُمُوْنَه۫ ﺡفَنَبَذُوْهُ وَرَا۬ءَ ظُهُوْرِهِمْ وَاشْتَرَوْا بِه۪ ثَمَنًا قَلِيْلًا ط فَبِئْسَ مَا يَشْتَرُوْنَ)‏



“আর (স্মরণ কর!) যখন আল্লাহ তা‘আলা কিতাবধারীদের থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন যে, তোমরা অবশ্যই এটা লোকেদের মধ্যে প্রকাশ করবে এবং তা গোপন করবে না; কিন্তু তারা ওটা তাদের পশ্চাতে নিক্ষেপ করল এবং ওটা অল্প মূল্যে বিক্রি করল, অথচ তারা যা ক্রয় করেছিল তা নিকৃষ্টতর।” (সূরা আলি ইমরান ৩:১৮৭)



(وَالَّذِيْنَ يُمَسِّكُوْنَ بِالْكِتَابِ)



‘যারা কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে’ অর্থাৎ তাদের মধ্যে যারা তাক্বওয়া অবলম্বন করবে, শক্তভাবে কিতাব ধারণ করবে (যার অর্থ) আসল তাওরাতের ওপর আমল করে মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর নবুওয়াতের ওপর ঈমান আনবে, সালাত ইত্যাদি ভালভাবে আদায় করবে। তাহলে এমন সৎ কর্মশীলদের কর্মফল আল্লাহ তা‘আলা নষ্ট করবেন না। এখানে আহলে কিতাব বিশেষ করে ইয়াহূদীদের কথা বলা হচ্ছে।



(وَإِذْ نَتَقْنَا الْجَبَلَ فَوْقَهُمْ)



‘স্মরণ কর, যখন আমি পর্বতকে তাদের ঊর্ধ্বে উত্তোলন করেছিলাম’ এটা সেই সময়ের ঘটনা যখন মূসা (আঃ) স্বজাতির নিকট তাওরাত নিয়ে এলেন ও তার আদেশ-নিষেধ পড়ে শুনালেন। তারা অভ্যাসমত তার ওপর আমল করতে অস্বীকৃতি জানাল এবং মুখ ফিরিয়ে নিল। যার কারণে আল্লাহ তা‘আলা তাদের ওপর পাহাড় তুলে ধরলেন যে, না মানলে পাহাড় চাপিয়ে শেষ করে দেয়া হবে। ভয়ে তারা আমল করার অঙ্গীকার করল।



কেউ কেউ বলেন: তাদের ওপর পাহাড় তোলার ঘটনা তাদেরই দাবী অনুসারে ঘটেছিল। তবে সঠিক কথা আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন। এটা ছিল তূর পাহাড় যা সূরা বাকারার ৬৩ ও ৯৩ নং আয়াতে ঘটনাটির বর্ণনা রয়েছে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. আহলে কিতাবদের মধ্যে ভাল-মন্দ দু’ শ্রেণির লোক ছিল।

২. মূসা (আঃ)-এর জাতির অবাধ্যতার কথা জানলাম।

৩. মুত্তাকীদের জন্য দুনিয়ার চেয়ে পরকাল শ্রেষ্ঠ।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৬৮-১৭০ নং আয়াতের তাফসীর:

ইরশাদ হচ্ছে- আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলকে দলে দলে বিভক্ত করে দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেনঃ “এরপর আমি বানী ইসরাঈলকে বলেছিলাম- ভু-পৃষ্ঠে অবস্থান করতে থাক, যখন পরকালের দিন আসবে তখন আমি তোমাদের সকলকেই একত্রিত করবো।` এই বানী ইসরাঈলের মধ্যে ভাল লোকও রয়েছে এবং মন্দ লোকও রয়েছে। যেমন জ্বীনেরা বলতো- “আমাদের মধ্যে ভাল জ্বীনও রয়েছে এবং মন্দ জ্বীনও রয়েছে। আমাদের মধ্যে বিভিন্ন দল রয়েছে। আল্লাহ পাক বলেনঃ “আমি তাদেরকে শান্তি ও আরামের যুগ দিয়ে এবং ভয় ও বিপদের যুগ দিয়ে দু'প্রকারেই পরীক্ষা করেছি, যেন তারা শিক্ষা গ্রহণ করে খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকে।

আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ এরপর তাদের অযোগ্য উত্তরসুরীরা একের পর এক তাদের স্থলাভিষিক্ত হয় এবং তারা কিতাবেরও উত্তরাধিকারী হয়ে এই নিকৃষ্ট দুনিয়ার স্বার্থাবলী করায়ত্ত করে। এই স্থলাভিষিক্ত লোকদের মধ্যে কোনই মঙ্গল। নিহিত নেই। তারা শুধু নিজেরাই তাওরাত পাঠ করার ওয়ারিস হয়। অপরকে তারা পাঠ করায়নি। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা খ্রীষ্টানদেরকে বুঝানো হয়েছে। বরং এ আয়াতটিতে আরো সাধারণ । খ্রীষ্টান ও অখ্রীষ্টান সবাই সত্য কথা বিক্রী করে এবং এর দ্বারা পার্থিব সম্পদ উপার্জন করে। আর নিজেকে এইভাবে প্রতারিত করে যে, পরে তাওবা করে নেবে। কিন্তু আবার এরূপ কোন সুযোগ পেয়ে গেলে তখনও তারা পূর্বের ন্যায় দুনিয়ার বিনিময়ে দ্বীনকে বিক্রী করে ফেলে। কিতাবের আয়াতগুলোর পরিবর্তন ঘটিয়ে দেয় এবং ভুল ফতওয়া দিয়ে বসে। পার্থিব সম্পদ লাভ করার যখনই তারা সুযোগ পায় তখনই সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। হারাম ও হালালের মোটেই পরওয়া করে না। দুনিয়ার হারাম বস্তু তারা গ্রহণ করে এবং পরে তাওবার কাজে বসে পড়ে। এভাবে তারা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। কিন্তু আবার যখন দুনিয়ার কোন সম্পদ তাদের সামনে আসে তখন তারা ঐদিকে পা বাড়িয়ে দেয়। আল্লাহর কসম! এরা অতি নিকৃষ্ট উত্তরসুরী। নবীদের পরে এরাইতো ছিল তাওরাত ও ইঞ্জীলের উত্তরাধিকারী । আর আল্লাহ তা'আলা কিতাবে তাদের কাছে অঙ্গীকারও নিয়েছিলেন। অন্য জায়গায় ইরশাদ হচ্ছে- “ঐ ভাল লোকদের পর এমন খারাপ লোকেরা তাদের স্থলাভিষিক্ত হয় যারা নামাযকে নষ্ট করে দেয়, আল্লাহর কাছে বহু দূরের আশা রাখে এবং নিজেকে প্রতারিত করে। দুনিয়া কামাবার কোন সুযোগ এসে গেলে তখন তারা (হারাম-হালাল) কিছুই দেখে না। কোন জিনিসই তাদেরকে পাপকার্য থেকে বিরত রাখতে পারে না। যা পায় তা-ই খায়। না হালালের কোন পরওয়া করে, না হারামের প্রতি কোন লক্ষ্য রাখে।”

বানী ইসরাঈলের মধ্যে যে কাযী হতে সে ঘুষখোর হতো। তাদের ভাল লোকেরা ঐ ঘুষখোর কাযীকে সরিয়ে অন্য কাযী নিযুক্ত করতো। তার উপর চাপ দেয়া হতো যে, ঘুষ নিয়ে যেন মুকদ্দমার ফায়সালা না করা হয়। সে ওয়াদা অঙ্গীকার করে যখন কাযী নিযুক্ত হয়ে যেতো তখন দু'হাতে ঘুষ লুটতে শুরু করে দিতো এবং বলতোঃ “চিন্তার কোন কারণ নেই, আল্লাহ ক্ষমা করে দিবেন।” অন্যেরা তাতে আপত্তি করতো এবং তাকে লাঞ্ছনা, গঞ্জনা ও ভৎসনা করতো। কিন্তু যখন এই ঘুষখোর মারা যেতো এবং ভৎসনাকারীদের কাযী নিযুক্ত করে দেয়া হতো তখন তারাও ঘুষ খেতে শুরু করে দিতো। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, দুনিয়া তাদের কাছে আসলো, আর তারা ওকে একত্রিত করতে শুরু করে দিলো । আল্লাহ পাক বলেনঃ “তাদের নিকট হতে কি কিতাবের ওয়াদা নেয়া হয়নি যে, আল্লাহর নামে সত্য ছাড়া কিছুই বলবে না?” তাদের কাছে ওয়াদা নেয়া হয়েছিল যে, তারা মানুষকে সত্য বলার উপদেশ দেবে এবং সত্য কথাকে গোপন করবে না। কিন্তু তারা সেই হুকুমকে পৃষ্ঠের পিছনে ছুঁড়ে ফেলে এবং অল্প মূল্যের বিনিময়ে আয়াতগুলোকে বদলিয়ে দেয় বা ওগুলোর ভুল অর্থ করে । তাদের এই উপার্জন কতই না নিকৃষ্ট উপার্জন। তারা আল্লাহর কাছে পাপমোচনের আশা রাখে বটে, কিন্তু পাপকার্য ছাড়তে চায় না এবং তাওবার উপর কায়েম থাকে না।

ইরশাদ হচ্ছে- “যদি আল্লাহকে ভয় কর তবে আখিরাতের ঘর তোমাদের জন্যে উত্তম। দুনিয়ার উপর তোমরা জীবন দিচ্ছ কেন? তোমরা কি এতটুকু কথাও অনুধাবন করতে পার না?” আল্লাহ তা'আলা বড় ও উত্তম পুরস্কারের প্রতি উৎসাহ প্রদান করছেন এবং পাপের মন্দ পরিণাম থেকে ভয় দেখাচ্ছেন। তিনি বলছেন যে, এই দ্বীন বিক্ৰীকারীরা কি এতটুকুও জ্ঞান রাখে না? অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ঐ লোকদের প্রশংসা করছেন যারা আল্লাহর কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করেছে, যে কিতাব তাদেরকে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর অনুসরণের দিকে আহ্বান করছে। এ সবকিছু তাদের কিতাব তাওরাত এবং ইঞ্জীলে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ “যারা আল্লাহর কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে এবং নামায কায়েম করে, তার আদেশ নিষেধকে পূর্ণভাবে মেনে চলে, আর পাপকার্য থেকে বিরত থাকে, তাদের জেনে রাখা উচিত যে, এরূপ সঙ্কৰ্মশীলদের কর্মফল আমি কখনও বিনষ্ট করি না।”





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।