সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 169)
হরকত ছাড়া:
فخلف من بعدهم خلف ورثوا الكتاب يأخذون عرض هذا الأدنى ويقولون سيغفر لنا وإن يأتهم عرض مثله يأخذوه ألم يؤخذ عليهم ميثاق الكتاب أن لا يقولوا على الله إلا الحق ودرسوا ما فيه والدار الآخرة خير للذين يتقون أفلا تعقلون ﴿١٦٩﴾
হরকত সহ:
فَخَلَفَ مِنْۢ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ وَّرِثُوا الْکِتٰبَ یَاْخُذُوْنَ عَرَضَ هٰذَا الْاَدْنٰی وَ یَقُوْلُوْنَ سَیُغْفَرُ لَنَا ۚ وَ اِنْ یَّاْتِهِمْ عَرَضٌ مِّثْلُهٗ یَاْخُذُوْهُ ؕ اَلَمْ یُؤْخَذْ عَلَیْهِمْ مِّیْثَاقُ الْکِتٰبِ اَنْ لَّا یَقُوْلُوْا عَلَی اللّٰهِ اِلَّا الْحَقَّ وَ دَرَسُوْا مَا فِیْهِ ؕ وَ الدَّارُ الْاٰخِرَۃُ خَیْرٌ لِّلَّذِیْنَ یَتَّقُوْنَ ؕ اَفَلَا تَعْقِلُوْنَ ﴿۱۶۹﴾
উচ্চারণ: ফাখালাফা মিমবা‘দিহিম খালফুওঁ ওয়ারিছুলকিতা-বা ইয়া’খুযূনা ‘আরাদাহা-যাল আদনা-ওয়া ইয়াকূলূনা ছাইউগফারুলানা ওয়া ইয়ঁইয়া’তিহিম ‘আরাদুম মিছলুহূ ইয়া’খুযূহু; আলাম ই’খায‘আলাইহিম মীছা-কুল কিতা-বি আল্লাইয়াকূলূ‘আলাল্লা-হি ইল্লাল হাক্কা ওয়া দারাছূমা-ফীহি ওয়াদ্দা-রুল আ-খিরাতুখাইরুল লিল্লাযীনা ইয়াত্তাকূনা আফালা-তা‘কিলূন।
আল বায়ান: অতঃপর তাদের পরে স্থলাভিষিক্ত হয়েছে এমন বংশধর যারা কিতাবের উত্তরাধিকারী হয়েছে, তারা এ নগণ্য (দুনিয়ার) সামগ্রী গ্রহণ করে এবং বলে, ‘শীঘ্রই আমাদের ক্ষমা করে দেয়া হবে’। বস্তুত যদি তার অনুরূপ সামগ্রী (আবারও) তাদের নিকট আসে তবে তারা তা গ্রহণ করবে। তাদের কাছ থেকে কি কিতাবের অঙ্গীকার নেয়া হয়নি যে, তারা আল্লাহর ব্যাপারে সত্য ছাড়া বলবে না? আর তারা এতে যা আছে, তা পাঠ করেছে এবং আখিরাতের আবাস তাদের জন্য উত্তম, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে। তোমরা কি বুঝ না?
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৬৯. অতঃপর অযোগ্য উত্তরপুরুষরা একের পর এক তাদের স্থলাভিষিক্তরূপে কিতাবের উত্তরাধিকারী হয়(১); তারা এ তুচ্ছ দুনিয়ার সামগ্ৰী গ্রহণ করে এবং বলে, আমাদের ক্ষমা করা হবে।(২) কিন্তু ওগুলোর অনুরূপ সামগ্ৰী তাদের কাছে আসলে তাও তারা গ্রহণ করে; কিতাবের অঙ্গীকার কি তাদের কাছ থেকে নেয়া হয়নি যে, তারা আল্লাহ সম্বন্ধে সত্য ছাড়া বলবে না(৩)? অথচ তারা এতে যা আছে তা অধ্যয়নও করে(৪)। আর যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য আখেরাতের আবাসই উত্তম; তোমরা কি এটা অনুধাবন কর না?
তাইসীরুল ক্বুরআন: তাদের পরে (পাপিষ্ঠ) বংশধরগণ তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়ে কিতাবের উত্তরাধিকারী হয় যারা দুনিয়ার নিকৃষ্ট স্বার্থ গ্রহণ করে আর বলে, ‘(আমরা যা কিছুই করি না কেন) আমাদেরকে ক্ষমা করা হবে’। আর দুনিয়ার স্বার্থ তাদের সামনে আসলে আবার তা গ্রহণ করে নেয়। (তাওরাত) কিতাবে কি তাদের নিকট থেকে এ অঙ্গীকার নেয়া হয়নি যে তারা আল্লাহ সম্বন্ধে প্রকৃত সত্য ছাড়া বলবে না? তারা তো ঐ কিতাবে যা আছে তা পাঠ করেও থাকে। যারা তাক্বওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য পরকালের আবাসই উত্তম, তোমরা কি বুঝবে না?
আহসানুল বায়ান: (১৬৯) অতঃপর অযোগ্য উত্তরপুরুষরা তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়,[1] তারা কিতাবের (ঐশীগ্রন্থের)ও উত্তরাধিকারী হয়। তারা এ তুচ্ছ (অবৈধ পার্থিব) সামগ্রী গ্রহণ করে[2] এবং বলে, ‘আমাদেরকে ক্ষমা করা হবে।’[3] কিন্তু ওর অনুরূপ সামগ্রী তাদের নিকট এলে সেটিকেও তারা গ্রহণ করে। কিতাবের অঙ্গীকার কি তাদের নিকট হতে নেওয়া হয়নি যে, তারা আল্লাহ সম্বন্ধে সত্য ব্যতীত (অসত্য) বলবে না?[4] অথচ তারা তো ওতে যা আছে, তা অধ্যয়নও করেছে।[5] যারা সাবধান (পরহেযগার) হয়, তাদের জন্য পরকালের আবাসই শ্রেয়, তোমরা কি তা অনুধাবন কর না?
মুজিবুর রহমান: অতঃপর তাদের অযোগ্য উত্তরসুরীরা একের পর এক তাদের স্থলাভিষিক্ত হয় এবং তারা কিতাবেরও উত্তরাধিকারী হয়। কিন্তু তারা এই নিকৃষ্ট দুনিয়ার স্বার্থাবলী করায়ত্ত্ব করে আর বলেঃ আমাদেরকে ক্ষমা করা হবে। বস্তুতঃ ওর অনুরূপ সামগ্রী আবার তাদের নিকট এলে ওটাও তারা গ্রহণ করে। তাদের নিকট হতে কি কিতাবের প্রতিশ্রুতি নেয়া হয়নি যে, আল্লাহর নামে সত্য ছাড়া কিছুই বলবেনা? আর কিতাবে যা রয়েছে তাতো তারা অধ্যয়নও করে। মুত্তাকী ও আল্লাহভীরু লোকদের জন্য পরকালের সামগ্রী, তোমরা কি এতটুকু কথাও অনুধাবণ করতে পারনা?
ফযলুর রহমান: তাদের পর তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে এক (অধম) প্রজন্ম, যারা কিতাবের উত্তরাধিকারী হয়েছে, কিন্তু তারা এই তুচ্ছ জগতের সামগ্রী গ্রহণ করে আর বলে, “আমাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে”। অথচ যদি তাদের কাছে এরকম আরো সামগ্রী আসে তাও তারা গ্রহণ করবে। তাদের থেকে কি কিতাবের অঙ্গীকার নেওয়া হয়নি যে, তারা আল্লাহ সম্পর্কে সত্য ছাড়া বলবে না? তারা তো কিতাবে যা আছে তা পাঠও করেছে। বস্তুত পরকালের আবাসই মোত্তাকীদের জন্য শ্রেয়। তোমরা কি তা বোঝ না?
মুহিউদ্দিন খান: তারপর তাদের পেছনে এসেছে কিছু অপদার্থ, যারা উত্তরাধিকারী হয়েছে কিতাবের; তারা নিকৃষ্ট পার্থিব উপকরণ আহরণ করছে এবং বলছে, আমাদের ক্ষমা করে দেয়া হবে। বস্তুতঃ এমনি ধরনের উপকরণ যদি আবারো তাদের সামনে উপস্থিত হয়, তবে তাও তুলে নেবে। তাদের কাছথেকে কিতাবে কি অঙ্গীকার নেয়া হয়নি যে, আল্লাহর প্রতি সত্য ছাড়া কিছু বলবে না? অথচ তারা সে সবই পাঠ করেছে, যা তাতে লেখা রয়েছে। বস্তুতঃ আখেরাতের আলয় ভীতদের জন্য উত্তম-তোমরা কি তা বোঝ না ?
জহুরুল হক: অতঃপর তাদের পরে স্থলাভিষিক্ত হয়েছিল এক উত্তরপুরুষ যারা গ্রন্থ উত্তরাধিকার করেছিল, তারা আঁকড়ে ধরেছিল এই সাধারণ জীবনের তুচ্ছ-বস্তুসব আর বলতো -- "আমাদের তো মাফ করে দেয়া হবে।" আর যদি তাদের কাছে তার মতো বস্তুগুলো আসে তবে তারা তা গ্রহণ করে। তাদের কাছ থেকে কি গ্রন্থের অঙ্গীকার নেওয়া হয় নি যে তারা আল্লাহ্ সন্বন্ধে সত্য ছাড়া আর কিছু বলবে না, আর তারা পাঠও করেছে যা তাতে রয়েছে? আর পরকালের বাসস্থানই শ্রেয় তাদের জন্য যারা ধর্মভীরুতা অবলন্বন করে। তোমরা কি তবে বুঝো না?
Sahih International: And there followed them successors who inherited the Scripture [while] taking the commodities of this lower life and saying, "It will be forgiven for us." And if an offer like it comes to them, they will [again] take it. Was not the covenant of the Scripture taken from them that they would not say about Allah except the truth, and they studied what was in it? And the home of the Hereafter is better for those who fear Allah, so will you not use reason?
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৬৯. অতঃপর অযোগ্য উত্তরপুরুষরা একের পর এক তাদের স্থলাভিষিক্তরূপে কিতাবের উত্তরাধিকারী হয়(১); তারা এ তুচ্ছ দুনিয়ার সামগ্ৰী গ্রহণ করে এবং বলে, আমাদের ক্ষমা করা হবে।(২) কিন্তু ওগুলোর অনুরূপ সামগ্ৰী তাদের কাছে আসলে তাও তারা গ্রহণ করে; কিতাবের অঙ্গীকার কি তাদের কাছ থেকে নেয়া হয়নি যে, তারা আল্লাহ সম্বন্ধে সত্য ছাড়া বলবে না(৩)? অথচ তারা এতে যা আছে তা অধ্যয়নও করে(৪)। আর যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য আখেরাতের আবাসই উত্তম; তোমরা কি এটা অনুধাবন কর না?
তাফসীর:
(১) মুজাহিদ বলেন, এখানে অযোগ্য উত্তরপুরুষ বলে নাসারাদের বোঝানো হয়েছে। [আত-তাফসীরুস সহীহ] ইবন কাসীর বলেন, এখানে ইয়াহুদী, নাসারাসহ পরবর্তী সবাই উদ্দেশ্য হতে পারে। ইবন কাসীর মুজাহিদ বলেন, দুনিয়ার যে বস্তুতেই তাদের চোখ পড়বে, সেটা হালাল কিংবা হারাম যাই হোক না কেন, তারা তাই গ্রহণ করে, তারপর ক্ষমার তালাশে থাকে। আবার যদি আগামী কাল অনুরূপ কিছু নজরে পড়ে সেটাও গ্রহণ করে। [তাবারী]
সুদ্দী বলেন, তাদের মধ্যে কাউকে বিচারক নিয়োগ করা হলে সে ঘুষ খেয়ে বিচার করত, তখন তাদের ভাললোকেরা একত্র হয়ে বলল যে, এটা করা যাবে না এবং ঘুষও দেয়া যাবে না। কিন্তু পূণরায় তাদের কেউ কেউ ঘুষ খেতে আরম্ভ করে। তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে বলতো যে, আমাকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। তখন অন্যরা তাকে খারাপ বলত। তারপর এ বিচারকের পদচ্যুতি বা মৃত্যুর কারণে যদি অন্য কাউকেও নিয়োগ করা হতো, সেও ঘুষ খেত। [ইবন কাসীর]
(২) অর্থাৎ তারা আল্লাহর কিতাব পড়েছে কিন্তু কিতাবের হুকুমের বিরোধিতা করেছে। দুনিয়ার যত নিকৃষ্ট কামাই আছে যেমন ঘুষ ইত্যাদি তা-ই তারা গ্রহণ করে। কারণ তাদের লোভ ও লালসা প্রচণ্ড। তারা গোনাহ করে, তারা জানে এ কাজটি করা গুণাহ। তবুও এ আশায় তারা এ কাজটি করে যে, কোন না কোনভাবে তাদের গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। কারণ তারা মনে করে, তারা আল্লাহর প্রিয়পাত্র এবং তারা যত কঠিন অপরাধই করুক না কেন তাদের ক্ষমালাভ অপরিহার্য। এ ভুল ধারণার ফলে কোন গুনাহ করার পর তারা লজ্জিত হয় না এবং তাওবাও করে না। বরং একই ধরনের গোনাহ করার সুযোগ এলে তারা তাতে জড়িয়ে পড়ে। তারপর আবার যদি তাদের কাছে দুনিয়ার কোন ভোগ এসে যায়, তা যত হারামই হোক তা গ্রহণ করতে কুষ্ঠাবোধ করে না। বরং তা বারবার করতে থাকে। [মুয়াসসার]
(৩) অর্থাৎ তারা নিজেরাই জানে যে, আল্লাহ কখনো তাদেরকে একথা বলেননি এবং তাদের নবীগণও কখনো তাদেরকে এ ধরণের নিশ্চয়তা দেননি যে, তোমরা যা ইচ্ছা করতে পারো, তোমাদের সকল গুনাহ অবশ্যি মাফ হয়ে যাবে। তাছাড়া আল্লাহ নিজে যে কথা কখনো বলেননি তাকে আল্লাহর কথা বলে প্রচার করার কি অধিকারই বা তাদের থাকতে পারে? অথচ তাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল যে, আল্লাহর নামে কোন অসত্য কথা তারা বলবে না। তাওরাত কায়েম করবে, সে অনুযায়ী আমল করবে। কুরআনের অন্যত্র তাদের এ অঙ্গীকারটি বর্ণিত হয়েছে।
সেখানে এসেছে, “স্মরণ করুন, যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল আল্লাহ তাদের প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন: অবশ্যই তোমরা তা মানুষের কাছে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করবে এবং তা গোপন করবে না। এরপরও তারা তা তাদের পেছনে ফেলে রাখে (অগ্রাহ্য করে) ও তুচ্ছ মূল্যে বিক্রি করে; কাজেই তারা যা ক্রয় করে তা কত নিকৃষ্ট। [সূরা আলে ইমরান: ১৮৭] কিন্তু তারা কিতাবের বিধান জানার পরও সেটাকে নষ্ট করে দেয়, তা অনুসারে আমল করে না। এভাবে তারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকারকে ভঙ্গ করে। [মুয়াসসার]
(৪) অর্থাৎ এমন নয় যে, তারা বুঝে না। তারা আল্লাহর কিতাব অধ্যয়ণ করে, তারা জানে যে, তাদেরকে এ ধরনের হারাম বস্তু গ্রহণ করা থেকে তাদের কিতাবে নিষেধ করা হয়েছে। এমন নয় যে, তারা সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তা করছে। বস্তুতঃ তাদের কোন সন্দেহ নেই। তারা জেনে-বুঝেই এ অন্যায় করছে। এটা নিঃসন্দেহে খারাপ কাজ। [সা’দী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৬৯) অতঃপর অযোগ্য উত্তরপুরুষরা তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়,[1] তারা কিতাবের (ঐশীগ্রন্থের)ও উত্তরাধিকারী হয়। তারা এ তুচ্ছ (অবৈধ পার্থিব) সামগ্রী গ্রহণ করে[2] এবং বলে, ‘আমাদেরকে ক্ষমা করা হবে।’[3] কিন্তু ওর অনুরূপ সামগ্রী তাদের নিকট এলে সেটিকেও তারা গ্রহণ করে। কিতাবের অঙ্গীকার কি তাদের নিকট হতে নেওয়া হয়নি যে, তারা আল্লাহ সম্বন্ধে সত্য ব্যতীত (অসত্য) বলবে না?[4] অথচ তারা তো ওতে যা আছে, তা অধ্যয়নও করেছে।[5] যারা সাবধান (পরহেযগার) হয়, তাদের জন্য পরকালের আবাসই শ্রেয়, তোমরা কি তা অনুধাবন কর না?
তাফসীর:
[1] خَلَف (লামের যবরের সাথে) সৎ সন্তান এবং خَلْف (লামে জযমের সাথে) অসৎ ও অযোগ্য সন্তানদেরকে বলা হয়।
[2] أدنى শব্দটি دُنُو থেকে নেওয়া হয়েছে; যার অর্থ নিকটবর্তী। অর্থাৎ, নিকটবর্তী (পার্থিব) সম্পদ গ্রহণ করে। অথবা এটি دناءة থেকে নেওয়া হয়েছে; যার অর্থ হল নিকৃষ্ট বা তুচ্ছ সম্পদ। উভয় অর্থেরই উদ্দেশ্য, তাদের পার্থিব সম্পদের প্রতি আসক্তির স্পষ্টীকরণ।
[3] অর্থাৎ, তারা দুনিয়াদার হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমা প্রাপ্তির আশা রাখে। যেমন আজকের যুগের মুসলিমদের অবস্থা।
[4] এ সত্ত্বেও তারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করা হতে বিরত থাকে না। উদাহরণস্বরূপ ক্ষমার কথা যা উপরে বর্ণিত হয়েছে।
[5] دَرَسوا এর অন্য এক অর্থ মুছে দেওয়াও হতে পারে। যেমন বলা হয়, درست الريح الآثار অর্থাৎ, হাওয়া নিদর্শন (পদচিহ্ন) মুছে ফেলেছে। অর্থাৎ, কিতাবের কথাগুলোকে মুছে দিয়েছে। যার মতলব কিতাবের উপর আমল করা ছেড়ে দিয়েছে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৬৮-১৭১ নং আয়াতের তাফসীরঃ
আলোচ্য আয়াতগুলোতে ইয়াহূদীদের বিভিন্ন দল উপদলে বিভক্ত হবার কথা বলা হচ্ছে। আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়াতে তাদেরকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে দিয়েছেন অথচ পূর্বে তারা সকলেই এক ও অভিন্ন ছিল। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَّقُلْنَا مِنْۭ بَعْدِه۪ لِبَنِيْ إِسْرَا۬ئِيْلَ اسْكُنُوا الْأَرْضَ فَإِذَا جَا۬ءَ وَعْدُ الْاٰخِرَةِ جِئْنَا بِكُمْ لَفِيْفًا)
“এরপর আমি বানী ইসরাঈলকে বললাম, ‘তোমরা ভূ- পেৃষ্ঠে বসবাস কর এবং যখন ক্বিয়ামতের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবে তখন তোমাদের সকলকে আমি একত্র করে উপস্থিত করব।” (সূরা ইসরা ১৭:১০৪)
এদের মধ্যে অনেকে সৎ লোক ছিল এবং অনেকে অসৎ লোক ছিল। যেমন জিনেদের মধ্যে ভালমন্দ উভয় প্রকারই রয়েেেছ তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَّأَنَّا مِنَّا الصَّالِحُوْنَ وَمِنَّا دُوْنَ ذٰلِكَ ط كُنَّا طَرَآئِقَ قِدَدًا)
“এবং আমাদের কতক সৎ কর্মপরায়ণ এবং কতক এর ব্যতিক্রম, আমরা ছিলাম বিভিন্ন পথের অনুসারী।” (জিন ৭২:১১)
بِالْحَسَنَاتِ وَالسَّيِّئَاتِ
‘মঙ্গল ও অমঙ্গল দ্বারা আমি তাদেরকে পরীক্ষা করেছিলাম’ অর্থাৎ তাদেরকে সুখ সাচ্ছন্দ ও বিপদ-আপদ দ্বারা পরীক্ষা করেছি।
اَدْنٰي- (هَذَا الْأَدْنٰي)
শব্দটি دُنُوٌ থেকে নেয়া হয়েছে যার অর্থ নিকটবর্তী। অর্থাৎ নিকটবর্তী (পার্থিব) সম্পদ গ্রহণ করে। অথবা এটি دَنَاءَةٌ থেকে এসেছে যার অর্থ, নিকৃষ্ট বা তুচ্ছ সম্পদ। উভয় অর্থই উদ্দেশ্য, তাদের পার্থিব সম্পদের প্রতি আসক্তির স্পষ্ট কারণ।
কাতাদাহ (রাঃ) বলেন:
(فَخَلَفَ مِنْۭ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ)
‘অতঃপর অযোগ্য পূর্বপুরুষগণ একের পর এক তাদের স্থলাভিষিক্তরূপে কিতাবের উত্তরাধিকারী হয়’ আল্লাহ তা‘আলার শপথ! এরা অতি নিকৃষ্ট উত্তরসূরী। নাবীদের পরে এরা তাওরাত ও ইঞ্জিলের উত্তরাধিকারী ছিল। আল্লাহ তা‘আলা কিতাবে তাদের থেকে অঙ্গীকারও নিয়েছিলেন। যেমন-
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَخَلَفَ مِنْۭ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلٰوةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّا)
“তাদের পরে আসল অপদার্থ পরবর্তীগণ, তারা সালাত নষ্ট করল ও লালসা-পরবশ হল। সুতরাং তারা অচিরেই কুকর্মের শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে।” (সূরা মারইয়াম ১৯:৫৯)
তারা আল্লাহ তা‘আলার কাছে আশা রাখে এবং নিজেদের প্রতারিত করে। দুনিয়া অর্জনের কোন সুযোগ এলে তখন হালাল হারাম কিছুই দেখে না। কোন জিনিস তাদেরকে পাপ কাজ হতে বিরত রাখতে পারে না।
(أَلَمْ يُؤْخَذْ عَلَيْهِمْ مِيْثَاقُ الْكِتَابِ)
‘কিতাবের অঙ্গীকার কি তাদের নিকট হতে নেয়া হয়নি’ অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা এ অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন:
(وَإِذْ أَخَذَ اللّٰهُ مِيْثَاقَ الَّذِيْنَ أُوْتُوا الْكِتٰبَ لَتُبَيِّنُنَّه۫ لِلنَّاسِ وَلَا تَكْتُمُوْنَه۫ ﺡفَنَبَذُوْهُ وَرَا۬ءَ ظُهُوْرِهِمْ وَاشْتَرَوْا بِه۪ ثَمَنًا قَلِيْلًا ط فَبِئْسَ مَا يَشْتَرُوْنَ)
“আর (স্মরণ কর!) যখন আল্লাহ তা‘আলা কিতাবধারীদের থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন যে, তোমরা অবশ্যই এটা লোকেদের মধ্যে প্রকাশ করবে এবং তা গোপন করবে না; কিন্তু তারা ওটা তাদের পশ্চাতে নিক্ষেপ করল এবং ওটা অল্প মূল্যে বিক্রি করল, অথচ তারা যা ক্রয় করেছিল তা নিকৃষ্টতর।” (সূরা আলি ইমরান ৩:১৮৭)
(وَالَّذِيْنَ يُمَسِّكُوْنَ بِالْكِتَابِ)
‘যারা কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে’ অর্থাৎ তাদের মধ্যে যারা তাক্বওয়া অবলম্বন করবে, শক্তভাবে কিতাব ধারণ করবে (যার অর্থ) আসল তাওরাতের ওপর আমল করে মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর নবুওয়াতের ওপর ঈমান আনবে, সালাত ইত্যাদি ভালভাবে আদায় করবে। তাহলে এমন সৎ কর্মশীলদের কর্মফল আল্লাহ তা‘আলা নষ্ট করবেন না। এখানে আহলে কিতাব বিশেষ করে ইয়াহূদীদের কথা বলা হচ্ছে।
(وَإِذْ نَتَقْنَا الْجَبَلَ فَوْقَهُمْ)
‘স্মরণ কর, যখন আমি পর্বতকে তাদের ঊর্ধ্বে উত্তোলন করেছিলাম’ এটা সেই সময়ের ঘটনা যখন মূসা (আঃ) স্বজাতির নিকট তাওরাত নিয়ে এলেন ও তার আদেশ-নিষেধ পড়ে শুনালেন। তারা অভ্যাসমত তার ওপর আমল করতে অস্বীকৃতি জানাল এবং মুখ ফিরিয়ে নিল। যার কারণে আল্লাহ তা‘আলা তাদের ওপর পাহাড় তুলে ধরলেন যে, না মানলে পাহাড় চাপিয়ে শেষ করে দেয়া হবে। ভয়ে তারা আমল করার অঙ্গীকার করল।
কেউ কেউ বলেন: তাদের ওপর পাহাড় তোলার ঘটনা তাদেরই দাবী অনুসারে ঘটেছিল। তবে সঠিক কথা আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন। এটা ছিল তূর পাহাড় যা সূরা বাকারার ৬৩ ও ৯৩ নং আয়াতে ঘটনাটির বর্ণনা রয়েছে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. আহলে কিতাবদের মধ্যে ভাল-মন্দ দু’ শ্রেণির লোক ছিল।
২. মূসা (আঃ)-এর জাতির অবাধ্যতার কথা জানলাম।
৩. মুত্তাকীদের জন্য দুনিয়ার চেয়ে পরকাল শ্রেষ্ঠ।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৬৮-১৭০ নং আয়াতের তাফসীর:
ইরশাদ হচ্ছে- আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলকে দলে দলে বিভক্ত করে দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেনঃ “এরপর আমি বানী ইসরাঈলকে বলেছিলাম- ভু-পৃষ্ঠে অবস্থান করতে থাক, যখন পরকালের দিন আসবে তখন আমি তোমাদের সকলকেই একত্রিত করবো।` এই বানী ইসরাঈলের মধ্যে ভাল লোকও রয়েছে এবং মন্দ লোকও রয়েছে। যেমন জ্বীনেরা বলতো- “আমাদের মধ্যে ভাল জ্বীনও রয়েছে এবং মন্দ জ্বীনও রয়েছে। আমাদের মধ্যে বিভিন্ন দল রয়েছে। আল্লাহ পাক বলেনঃ “আমি তাদেরকে শান্তি ও আরামের যুগ দিয়ে এবং ভয় ও বিপদের যুগ দিয়ে দু'প্রকারেই পরীক্ষা করেছি, যেন তারা শিক্ষা গ্রহণ করে খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকে।
আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ এরপর তাদের অযোগ্য উত্তরসুরীরা একের পর এক তাদের স্থলাভিষিক্ত হয় এবং তারা কিতাবেরও উত্তরাধিকারী হয়ে এই নিকৃষ্ট দুনিয়ার স্বার্থাবলী করায়ত্ত করে। এই স্থলাভিষিক্ত লোকদের মধ্যে কোনই মঙ্গল। নিহিত নেই। তারা শুধু নিজেরাই তাওরাত পাঠ করার ওয়ারিস হয়। অপরকে তারা পাঠ করায়নি। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা খ্রীষ্টানদেরকে বুঝানো হয়েছে। বরং এ আয়াতটিতে আরো সাধারণ । খ্রীষ্টান ও অখ্রীষ্টান সবাই সত্য কথা বিক্রী করে এবং এর দ্বারা পার্থিব সম্পদ উপার্জন করে। আর নিজেকে এইভাবে প্রতারিত করে যে, পরে তাওবা করে নেবে। কিন্তু আবার এরূপ কোন সুযোগ পেয়ে গেলে তখনও তারা পূর্বের ন্যায় দুনিয়ার বিনিময়ে দ্বীনকে বিক্রী করে ফেলে। কিতাবের আয়াতগুলোর পরিবর্তন ঘটিয়ে দেয় এবং ভুল ফতওয়া দিয়ে বসে। পার্থিব সম্পদ লাভ করার যখনই তারা সুযোগ পায় তখনই সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। হারাম ও হালালের মোটেই পরওয়া করে না। দুনিয়ার হারাম বস্তু তারা গ্রহণ করে এবং পরে তাওবার কাজে বসে পড়ে। এভাবে তারা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। কিন্তু আবার যখন দুনিয়ার কোন সম্পদ তাদের সামনে আসে তখন তারা ঐদিকে পা বাড়িয়ে দেয়। আল্লাহর কসম! এরা অতি নিকৃষ্ট উত্তরসুরী। নবীদের পরে এরাইতো ছিল তাওরাত ও ইঞ্জীলের উত্তরাধিকারী । আর আল্লাহ তা'আলা কিতাবে তাদের কাছে অঙ্গীকারও নিয়েছিলেন। অন্য জায়গায় ইরশাদ হচ্ছে- “ঐ ভাল লোকদের পর এমন খারাপ লোকেরা তাদের স্থলাভিষিক্ত হয় যারা নামাযকে নষ্ট করে দেয়, আল্লাহর কাছে বহু দূরের আশা রাখে এবং নিজেকে প্রতারিত করে। দুনিয়া কামাবার কোন সুযোগ এসে গেলে তখন তারা (হারাম-হালাল) কিছুই দেখে না। কোন জিনিসই তাদেরকে পাপকার্য থেকে বিরত রাখতে পারে না। যা পায় তা-ই খায়। না হালালের কোন পরওয়া করে, না হারামের প্রতি কোন লক্ষ্য রাখে।”
বানী ইসরাঈলের মধ্যে যে কাযী হতে সে ঘুষখোর হতো। তাদের ভাল লোকেরা ঐ ঘুষখোর কাযীকে সরিয়ে অন্য কাযী নিযুক্ত করতো। তার উপর চাপ দেয়া হতো যে, ঘুষ নিয়ে যেন মুকদ্দমার ফায়সালা না করা হয়। সে ওয়াদা অঙ্গীকার করে যখন কাযী নিযুক্ত হয়ে যেতো তখন দু'হাতে ঘুষ লুটতে শুরু করে দিতো এবং বলতোঃ “চিন্তার কোন কারণ নেই, আল্লাহ ক্ষমা করে দিবেন।” অন্যেরা তাতে আপত্তি করতো এবং তাকে লাঞ্ছনা, গঞ্জনা ও ভৎসনা করতো। কিন্তু যখন এই ঘুষখোর মারা যেতো এবং ভৎসনাকারীদের কাযী নিযুক্ত করে দেয়া হতো তখন তারাও ঘুষ খেতে শুরু করে দিতো। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, দুনিয়া তাদের কাছে আসলো, আর তারা ওকে একত্রিত করতে শুরু করে দিলো । আল্লাহ পাক বলেনঃ “তাদের নিকট হতে কি কিতাবের ওয়াদা নেয়া হয়নি যে, আল্লাহর নামে সত্য ছাড়া কিছুই বলবে না?” তাদের কাছে ওয়াদা নেয়া হয়েছিল যে, তারা মানুষকে সত্য বলার উপদেশ দেবে এবং সত্য কথাকে গোপন করবে না। কিন্তু তারা সেই হুকুমকে পৃষ্ঠের পিছনে ছুঁড়ে ফেলে এবং অল্প মূল্যের বিনিময়ে আয়াতগুলোকে বদলিয়ে দেয় বা ওগুলোর ভুল অর্থ করে । তাদের এই উপার্জন কতই না নিকৃষ্ট উপার্জন। তারা আল্লাহর কাছে পাপমোচনের আশা রাখে বটে, কিন্তু পাপকার্য ছাড়তে চায় না এবং তাওবার উপর কায়েম থাকে না।
ইরশাদ হচ্ছে- “যদি আল্লাহকে ভয় কর তবে আখিরাতের ঘর তোমাদের জন্যে উত্তম। দুনিয়ার উপর তোমরা জীবন দিচ্ছ কেন? তোমরা কি এতটুকু কথাও অনুধাবন করতে পার না?” আল্লাহ তা'আলা বড় ও উত্তম পুরস্কারের প্রতি উৎসাহ প্রদান করছেন এবং পাপের মন্দ পরিণাম থেকে ভয় দেখাচ্ছেন। তিনি বলছেন যে, এই দ্বীন বিক্ৰীকারীরা কি এতটুকুও জ্ঞান রাখে না? অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ঐ লোকদের প্রশংসা করছেন যারা আল্লাহর কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করেছে, যে কিতাব তাদেরকে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর অনুসরণের দিকে আহ্বান করছে। এ সবকিছু তাদের কিতাব তাওরাত এবং ইঞ্জীলে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ “যারা আল্লাহর কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে এবং নামায কায়েম করে, তার আদেশ নিষেধকে পূর্ণভাবে মেনে চলে, আর পাপকার্য থেকে বিরত থাকে, তাদের জেনে রাখা উচিত যে, এরূপ সঙ্কৰ্মশীলদের কর্মফল আমি কখনও বিনষ্ট করি না।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।