আল কুরআন


সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 168)

সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 168)



হরকত ছাড়া:

وقطعناهم في الأرض أمما منهم الصالحون ومنهم دون ذلك وبلوناهم بالحسنات والسيئات لعلهم يرجعون ﴿١٦٨﴾




হরকত সহ:

وَ قَطَّعْنٰهُمْ فِی الْاَرْضِ اُمَمًا ۚ مِنْهُمُ الصّٰلِحُوْنَ وَ مِنْهُمْ دُوْنَ ذٰلِکَ ۫ وَ بَلَوْنٰهُمْ بِالْحَسَنٰتِ وَ السَّیِّاٰتِ لَعَلَّهُمْ یَرْجِعُوْنَ ﴿۱۶۸﴾




উচ্চারণ: ওয়া কাত্তা‘না-হুম ফিল আরদিউমামান মিনহুমুসসা-লিহূনা ওয়া মিনহুম দূ না যালিকা ওয়া বালাওনা-হুম বিলহাছানা-তি ওয়াছছাইয়িআ-তি লা‘আল্লাহুম ইয়ারজি‘ঊন।




আল বায়ান: আর যমীনে আমি তাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতিতে। তাদের কেউ নেককার আর কেউ অন্যরূপ এবং আমি তাদেরকে পরীক্ষা করেছি ভাল ও মন্দ দ্বারা, হয়তো তারা ফিরে আসবে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৬৮. আর আমরা তাদেরকে যমীনে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করেছি(১); তাদের কেউ কেউ সৎকর্মপরায়ণ আর কেউ অন্যরূপ।(২) আর আমরা তাদেরকে মঙ্গল ও অমঙ্গল দ্বারা পরীক্ষা করেছি, যাতে তারা প্রত্যাবর্তন করে।(৩)




তাইসীরুল ক্বুরআন: পৃথিবীতে আমি তাদেরকে নানা দলে বিভক্ত করে দিয়েছিলাম, তাদের মধ্যে কিছু দল ছিল সৎ, কতক দল অন্য রকম এবং সুখ আর দুখ দিয়ে তাদেরকে পরীক্ষা করেছিলাম যাতে তারা (আল্লাহর নির্দেশের পথে) ফিরে আসে।




আহসানুল বায়ান: (১৬৮) দুনিয়ায় আমি তাদেরকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করলাম, তাদের কতক সৎকর্মপরায়ণ ও কতক অন্যরূপ। আর মঙ্গল ও অমঙ্গলসমূহ দ্বারা আমি তাদেরকে পরীক্ষা করলাম, যাতে তারা প্রত্যাবর্তন করে। [1]



মুজিবুর রহমান: আমি তাদেরকে বিভিন্ন দলে দুনিয়ায় বিস্তৃত করেছি, তাদের কতক লোক সদাচারী, আর কিছু লোক ভিন্নতর। আর আমি ভাল ও মন্দের মধ্যে নিপতিত করে তাদেরকে পরীক্ষা করে থাকি যাতে তারা আমার পথে ফিরে আসে।



ফযলুর রহমান: আমি তাদেরকে পৃথিবীতে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে দিয়েছি। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সৎকর্মশীল, আবার কেউ কেউ তার ব্যতিক্রম। আর আমি তাদেরকে কল্যাণ ও অকল্যাণ দ্বারা পরীক্ষা করেছি, যাতে তারা (আল্লাহর আনুগত্যের দিকে) ফিরে আসে।



মুহিউদ্দিন খান: আর আমি তাদেরকে বিভক্ত করে দিয়েছি দেশময় বিভিন্ন শ্রেনীতে, তাদের মধ্যে কিছু রয়েছে ভাল আর কিছু রয়েছে অন্য রকম! তাছাড়া আমি তাদেরকে পরীক্ষা করেছি ভাল ও মন্দের মাধ্যমে যাতে তারা ফিরে আসে।



জহুরুল হক: আর আমরা পৃথিবীতে তাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন দলে, তাদের মধ্যে কেউ-কেউ সৎপথাবলন্বী, আর তাদের কতক এর বিপরীত। আর আমরা তাদের নিয়ন্ত্রিত করেছি ভালো দিয়ে ও মন্দ দিয়ে, যেন তারা ফিরে আসে।



Sahih International: And We divided them throughout the earth into nations. Of them some were righteous, and of them some were otherwise. And We tested them with good [times] and bad that perhaps they would return [to obedience].



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৬৮. আর আমরা তাদেরকে যমীনে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করেছি(১); তাদের কেউ কেউ সৎকর্মপরায়ণ আর কেউ অন্যরূপ।(২) আর আমরা তাদেরকে মঙ্গল ও অমঙ্গল দ্বারা পরীক্ষা করেছি, যাতে তারা প্রত্যাবর্তন করে।(৩)


তাফসীর:

(১) এ আয়াতে ইয়াহুদীদের উপর আরোপিত অন্য আরেক শাস্তির কথা বলা হয়েছে। তা হল, তাদেরকে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে একান্ত বিক্ষিপ্ত করে দেয়া। কোথাও কোন এক দেশে তাদের সমবেতভাবে বসবাসের সুযোগ হয়নি। (وَقَطَّعْنَاهُمْ فِي الْأَرْضِ أُمَمًا) এর মর্মও তাই। قَطَّعْنَا শব্দটি تقطيع থেকে নির্গত। যার অর্থ খণ্ড-বিখণ্ড করে দেয়া। আর أُمَما হল أمة এর বহুবচন। যার অর্থ দল বা শ্রেণী। এর মর্ম হল, আমি ইয়াহুদী জাতিকে খণ্ড খণ্ড করে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে বিক্ষিপ্ত করে দিয়েছি। সুতরাং যেখানেই কেউ ঢুকবে সেখানে ইয়াহুদীদের কোন সম্প্রদায় দেখতে পাবে। [তাবারী]


(২) এ আয়াতে ইয়াহুদীদের শ্রেণী বিভাগ করে বলা হচ্ছেঃ (مِنْهُمُ الصَّالِحُونَ) অর্থাৎ “এদের মধ্যে কিছু লোক রয়েছে সৎ এবং কিছু অন্য রকম।” “অন্য রকম” এর মর্ম হল এই যে, কাফের দুস্কৃতকারী ও অসৎ লোক রয়েছে। অর্থাৎ ইয়াহুদীদের মধ্যে সবই এক রকম লোক নয়, কিছু সৎও আছে। [তাবারী; ইবন কাসীর] এর অর্থ, সেসব লোক, যারা তাওরাতের যুগে তাওরাতের নির্দেশাবলীর পূর্ণ আনুগত্য ও অনুশীলন করেছে। না তার হুকুমের প্রতি কৃতঘ্নতা প্রকাশ করেছে, আর না কোন রকম অপব্যাখ্যা ও বিকৃতির আশ্রয় নিয়েছে। [আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর]

এছাড়া এতে তারাও উদ্দেশ্য হতে পারেন, যারা কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার পর তার আনুগত্যে আত্মনিয়োগ করেছেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর ঈমান এনেছেন। অপরদিকে রয়েছে সে সমস্ত লোক, যারা তাওরাতকে আসমানী গ্রন্থ বলে স্বীকার করা সত্বেও তার বিরুদ্ধাচরণ করেছে, কিংবা তার আহকাম বা বিধি বিধানের বিকৃতি ঘটিয়ে নিজেদের আখেরাতকে পৃথিবীতে নিকৃষ্ট বস্তু-সামগ্রীর বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছে। [বাগভী; ফাতহুল কাদীর]


(৩) আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছেঃ “আমি ভাল-মন্দ অবস্থার দ্বারা তাদের পরীক্ষা করেছি যেন তারা নিজেদের গহিত আচার-আচরণ থেকে ফিরে আসে।” “ভাল অবস্থার দ্বারা”-এর অর্থ হল এই যে, তাদেরকে ধন-সম্পদের প্রাচুর্য ও ভোগবিলাসের উপকরণ দান। আর “মন্দ অবস্থার দ্বারা”-এর অর্থ হয় লাঞ্ছনা-গঞ্জনার সে অবস্থা যা যুগে যুগে বিভিন্নভাবে তাদের উপর নেমে এসেছে, অথবা কোন কোন সময়ে তাদের উপর আপতিত দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র্য। [তাবারী; ইবন কাসীর] সারমর্ম এই যে, মানব জাতির আনুগত্য ও ঔদ্ধত্যের পরীক্ষা করার দুটিই প্রক্রিয়া। তাদের ব্যাপারে উভয়টিই ব্যবহৃত হয়েছে।

কিন্তু ইহুদী সম্প্রদায় এতদুভয় পরীক্ষাতেই অকৃতকার্য হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা যখন তাদের জন্য নেয়ামতের দুয়ার খুলে দিয়ে ধন-সম্পদের প্রাচুর্য দান করেছেন, তখন তারা বলতে শুরু করেছে, (إِنَّ اللَّهَ فَقِيرٌ وَنَحْنُ أَغْنِيَاءُ) অর্থাৎ “আল্লাহ হলেন ফকীর আর আমরা ধনী।” [সূরা আলে-ইমরান: ১৮১] আর তাদেরকে যখন দারিদ্র্য ও দুর্দশার মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়েছে, তখন বলতে শুরু করেছেঃ (يَدُ اللَّهِ مَغْلُولَةٌ) অর্থাৎ “আল্লাহর হাত সংকুচিত হয়ে গেছে।” [সূরা আল-মায়েদাহঃ ৬৪]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৬৮) দুনিয়ায় আমি তাদেরকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করলাম, তাদের কতক সৎকর্মপরায়ণ ও কতক অন্যরূপ। আর মঙ্গল ও অমঙ্গলসমূহ দ্বারা আমি তাদেরকে পরীক্ষা করলাম, যাতে তারা প্রত্যাবর্তন করে। [1]


তাফসীর:

[1] এই আয়াতে ইয়াহুদীদের বিভিন্ন দলে উপদলে ভাগ হয়ে যাওয়ার ও তাদের মধ্যে কিছু লোকের সৎ হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে এবং তাদেরকে দু’ভাবেই পরীক্ষা করার কথাও বলা হয়েছে; যাতে তারা নিজেদের দুষ্কর্ম থেকে ফিরে আসে ও আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৬৮-১৭১ নং আয়াতের তাফসীরঃ



আলোচ্য আয়াতগুলোতে ইয়াহূদীদের বিভিন্ন দল উপদলে বিভক্ত হবার কথা বলা হচ্ছে। আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়াতে তাদেরকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে দিয়েছেন অথচ পূর্বে তারা সকলেই এক ও অভিন্ন ছিল। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَّقُلْنَا مِنْۭ بَعْدِه۪ لِبَنِيْ إِسْرَا۬ئِيْلَ اسْكُنُوا الْأَرْضَ فَإِذَا جَا۬ءَ وَعْدُ الْاٰخِرَةِ جِئْنَا بِكُمْ لَفِيْفًا)



“এরপর আমি বানী ইসরাঈলকে বললাম, ‘তোমরা ভূ- পেৃষ্ঠে বসবাস কর‎ এবং যখন ক্বিয়ামতের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবে তখন তোমাদের সকলকে আমি একত্র করে উপস্থিত করব।” (সূরা ইসরা ১৭:১০৪)



এদের মধ্যে অনেকে সৎ লোক ছিল এবং অনেকে অসৎ লোক ছিল। যেমন জিনেদের মধ্যে ভালমন্দ উভয় প্রকারই রয়েেেছ তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَّأَنَّا مِنَّا الصَّالِحُوْنَ وَمِنَّا دُوْنَ ذٰلِكَ ط كُنَّا طَرَآئِقَ قِدَدًا)‏



“এবং আমাদের কতক সৎ কর্মপরায়ণ এবং কতক এর ব্যতিক্রম, আমরা ছিলাম বিভিন্ন পথের অনুসারী।” (জিন ৭২:১১)



بِالْحَسَنَاتِ وَالسَّيِّئَاتِ



‘মঙ্গল ও অমঙ্গল দ্বারা আমি তাদেরকে পরীক্ষা করেছিলাম’ অর্থাৎ তাদেরকে সুখ সাচ্ছন্দ ও বিপদ-আপদ দ্বারা পরীক্ষা করেছি।



اَدْنٰي- (هَذَا الْأَدْنٰي)



শব্দটি دُنُوٌ থেকে নেয়া হয়েছে যার অর্থ নিকটবর্তী। অর্থাৎ নিকটবর্তী (পার্থিব) সম্পদ গ্রহণ করে। অথবা এটি دَنَاءَةٌ থেকে এসেছে যার অর্থ, নিকৃষ্ট বা তুচ্ছ সম্পদ। উভয় অর্থই উদ্দেশ্য, তাদের পার্থিব সম্পদের প্রতি আসক্তির স্পষ্ট কারণ।



কাতাদাহ (রাঃ) বলেন:



(فَخَلَفَ مِنْۭ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ)



‘অতঃপর অযোগ্য পূর্বপুরুষগণ একের পর এক তাদের স্থলাভিষিক্তরূপে কিতাবের উত্তরাধিকারী হয়’ আল্লাহ তা‘আলার শপথ! এরা অতি নিকৃষ্ট উত্তরসূরী। নাবীদের পরে এরা তাওরাত ও ইঞ্জিলের উত্তরাধিকারী ছিল। আল্লাহ তা‘আলা কিতাবে তাদের থেকে অঙ্গীকারও নিয়েছিলেন। যেমন-



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(فَخَلَفَ مِنْۭ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلٰوةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّا)‏



“তাদের পরে আসল অপদার্থ পরবর্তীগণ, তারা সালাত নষ্ট করল ও লালসা-পরবশ হল। সুতরাং তারা অচিরেই কুকর্মের শাস্তি‎ প্রত্যক্ষ করবে।” (সূরা মারইয়াম ১৯:৫৯)



তারা আল্লাহ তা‘আলার কাছে আশা রাখে এবং নিজেদের প্রতারিত করে। দুনিয়া অর্জনের কোন সুযোগ এলে তখন হালাল হারাম কিছুই দেখে না। কোন জিনিস তাদেরকে পাপ কাজ হতে বিরত রাখতে পারে না।



(أَلَمْ يُؤْخَذْ عَلَيْهِمْ مِيْثَاقُ الْكِتَابِ)



‘কিতাবের অঙ্গীকার কি তাদের নিকট হতে নেয়া হয়নি’ অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা এ অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন:



(وَإِذْ أَخَذَ اللّٰهُ مِيْثَاقَ الَّذِيْنَ أُوْتُوا الْكِتٰبَ لَتُبَيِّنُنَّه۫ لِلنَّاسِ وَلَا تَكْتُمُوْنَه۫ ﺡفَنَبَذُوْهُ وَرَا۬ءَ ظُهُوْرِهِمْ وَاشْتَرَوْا بِه۪ ثَمَنًا قَلِيْلًا ط فَبِئْسَ مَا يَشْتَرُوْنَ)‏



“আর (স্মরণ কর!) যখন আল্লাহ তা‘আলা কিতাবধারীদের থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন যে, তোমরা অবশ্যই এটা লোকেদের মধ্যে প্রকাশ করবে এবং তা গোপন করবে না; কিন্তু তারা ওটা তাদের পশ্চাতে নিক্ষেপ করল এবং ওটা অল্প মূল্যে বিক্রি করল, অথচ তারা যা ক্রয় করেছিল তা নিকৃষ্টতর।” (সূরা আলি ইমরান ৩:১৮৭)



(وَالَّذِيْنَ يُمَسِّكُوْنَ بِالْكِتَابِ)



‘যারা কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে’ অর্থাৎ তাদের মধ্যে যারা তাক্বওয়া অবলম্বন করবে, শক্তভাবে কিতাব ধারণ করবে (যার অর্থ) আসল তাওরাতের ওপর আমল করে মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর নবুওয়াতের ওপর ঈমান আনবে, সালাত ইত্যাদি ভালভাবে আদায় করবে। তাহলে এমন সৎ কর্মশীলদের কর্মফল আল্লাহ তা‘আলা নষ্ট করবেন না। এখানে আহলে কিতাব বিশেষ করে ইয়াহূদীদের কথা বলা হচ্ছে।



(وَإِذْ نَتَقْنَا الْجَبَلَ فَوْقَهُمْ)



‘স্মরণ কর, যখন আমি পর্বতকে তাদের ঊর্ধ্বে উত্তোলন করেছিলাম’ এটা সেই সময়ের ঘটনা যখন মূসা (আঃ) স্বজাতির নিকট তাওরাত নিয়ে এলেন ও তার আদেশ-নিষেধ পড়ে শুনালেন। তারা অভ্যাসমত তার ওপর আমল করতে অস্বীকৃতি জানাল এবং মুখ ফিরিয়ে নিল। যার কারণে আল্লাহ তা‘আলা তাদের ওপর পাহাড় তুলে ধরলেন যে, না মানলে পাহাড় চাপিয়ে শেষ করে দেয়া হবে। ভয়ে তারা আমল করার অঙ্গীকার করল।



কেউ কেউ বলেন: তাদের ওপর পাহাড় তোলার ঘটনা তাদেরই দাবী অনুসারে ঘটেছিল। তবে সঠিক কথা আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন। এটা ছিল তূর পাহাড় যা সূরা বাকারার ৬৩ ও ৯৩ নং আয়াতে ঘটনাটির বর্ণনা রয়েছে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. আহলে কিতাবদের মধ্যে ভাল-মন্দ দু’ শ্রেণির লোক ছিল।

২. মূসা (আঃ)-এর জাতির অবাধ্যতার কথা জানলাম।

৩. মুত্তাকীদের জন্য দুনিয়ার চেয়ে পরকাল শ্রেষ্ঠ।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৬৮-১৭০ নং আয়াতের তাফসীর:

ইরশাদ হচ্ছে- আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলকে দলে দলে বিভক্ত করে দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেনঃ “এরপর আমি বানী ইসরাঈলকে বলেছিলাম- ভু-পৃষ্ঠে অবস্থান করতে থাক, যখন পরকালের দিন আসবে তখন আমি তোমাদের সকলকেই একত্রিত করবো।` এই বানী ইসরাঈলের মধ্যে ভাল লোকও রয়েছে এবং মন্দ লোকও রয়েছে। যেমন জ্বীনেরা বলতো- “আমাদের মধ্যে ভাল জ্বীনও রয়েছে এবং মন্দ জ্বীনও রয়েছে। আমাদের মধ্যে বিভিন্ন দল রয়েছে। আল্লাহ পাক বলেনঃ “আমি তাদেরকে শান্তি ও আরামের যুগ দিয়ে এবং ভয় ও বিপদের যুগ দিয়ে দু'প্রকারেই পরীক্ষা করেছি, যেন তারা শিক্ষা গ্রহণ করে খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকে।

আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ এরপর তাদের অযোগ্য উত্তরসুরীরা একের পর এক তাদের স্থলাভিষিক্ত হয় এবং তারা কিতাবেরও উত্তরাধিকারী হয়ে এই নিকৃষ্ট দুনিয়ার স্বার্থাবলী করায়ত্ত করে। এই স্থলাভিষিক্ত লোকদের মধ্যে কোনই মঙ্গল। নিহিত নেই। তারা শুধু নিজেরাই তাওরাত পাঠ করার ওয়ারিস হয়। অপরকে তারা পাঠ করায়নি। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা খ্রীষ্টানদেরকে বুঝানো হয়েছে। বরং এ আয়াতটিতে আরো সাধারণ । খ্রীষ্টান ও অখ্রীষ্টান সবাই সত্য কথা বিক্রী করে এবং এর দ্বারা পার্থিব সম্পদ উপার্জন করে। আর নিজেকে এইভাবে প্রতারিত করে যে, পরে তাওবা করে নেবে। কিন্তু আবার এরূপ কোন সুযোগ পেয়ে গেলে তখনও তারা পূর্বের ন্যায় দুনিয়ার বিনিময়ে দ্বীনকে বিক্রী করে ফেলে। কিতাবের আয়াতগুলোর পরিবর্তন ঘটিয়ে দেয় এবং ভুল ফতওয়া দিয়ে বসে। পার্থিব সম্পদ লাভ করার যখনই তারা সুযোগ পায় তখনই সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। হারাম ও হালালের মোটেই পরওয়া করে না। দুনিয়ার হারাম বস্তু তারা গ্রহণ করে এবং পরে তাওবার কাজে বসে পড়ে। এভাবে তারা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। কিন্তু আবার যখন দুনিয়ার কোন সম্পদ তাদের সামনে আসে তখন তারা ঐদিকে পা বাড়িয়ে দেয়। আল্লাহর কসম! এরা অতি নিকৃষ্ট উত্তরসুরী। নবীদের পরে এরাইতো ছিল তাওরাত ও ইঞ্জীলের উত্তরাধিকারী । আর আল্লাহ তা'আলা কিতাবে তাদের কাছে অঙ্গীকারও নিয়েছিলেন। অন্য জায়গায় ইরশাদ হচ্ছে- “ঐ ভাল লোকদের পর এমন খারাপ লোকেরা তাদের স্থলাভিষিক্ত হয় যারা নামাযকে নষ্ট করে দেয়, আল্লাহর কাছে বহু দূরের আশা রাখে এবং নিজেকে প্রতারিত করে। দুনিয়া কামাবার কোন সুযোগ এসে গেলে তখন তারা (হারাম-হালাল) কিছুই দেখে না। কোন জিনিসই তাদেরকে পাপকার্য থেকে বিরত রাখতে পারে না। যা পায় তা-ই খায়। না হালালের কোন পরওয়া করে, না হারামের প্রতি কোন লক্ষ্য রাখে।”

বানী ইসরাঈলের মধ্যে যে কাযী হতে সে ঘুষখোর হতো। তাদের ভাল লোকেরা ঐ ঘুষখোর কাযীকে সরিয়ে অন্য কাযী নিযুক্ত করতো। তার উপর চাপ দেয়া হতো যে, ঘুষ নিয়ে যেন মুকদ্দমার ফায়সালা না করা হয়। সে ওয়াদা অঙ্গীকার করে যখন কাযী নিযুক্ত হয়ে যেতো তখন দু'হাতে ঘুষ লুটতে শুরু করে দিতো এবং বলতোঃ “চিন্তার কোন কারণ নেই, আল্লাহ ক্ষমা করে দিবেন।” অন্যেরা তাতে আপত্তি করতো এবং তাকে লাঞ্ছনা, গঞ্জনা ও ভৎসনা করতো। কিন্তু যখন এই ঘুষখোর মারা যেতো এবং ভৎসনাকারীদের কাযী নিযুক্ত করে দেয়া হতো তখন তারাও ঘুষ খেতে শুরু করে দিতো। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, দুনিয়া তাদের কাছে আসলো, আর তারা ওকে একত্রিত করতে শুরু করে দিলো । আল্লাহ পাক বলেনঃ “তাদের নিকট হতে কি কিতাবের ওয়াদা নেয়া হয়নি যে, আল্লাহর নামে সত্য ছাড়া কিছুই বলবে না?” তাদের কাছে ওয়াদা নেয়া হয়েছিল যে, তারা মানুষকে সত্য বলার উপদেশ দেবে এবং সত্য কথাকে গোপন করবে না। কিন্তু তারা সেই হুকুমকে পৃষ্ঠের পিছনে ছুঁড়ে ফেলে এবং অল্প মূল্যের বিনিময়ে আয়াতগুলোকে বদলিয়ে দেয় বা ওগুলোর ভুল অর্থ করে । তাদের এই উপার্জন কতই না নিকৃষ্ট উপার্জন। তারা আল্লাহর কাছে পাপমোচনের আশা রাখে বটে, কিন্তু পাপকার্য ছাড়তে চায় না এবং তাওবার উপর কায়েম থাকে না।

ইরশাদ হচ্ছে- “যদি আল্লাহকে ভয় কর তবে আখিরাতের ঘর তোমাদের জন্যে উত্তম। দুনিয়ার উপর তোমরা জীবন দিচ্ছ কেন? তোমরা কি এতটুকু কথাও অনুধাবন করতে পার না?” আল্লাহ তা'আলা বড় ও উত্তম পুরস্কারের প্রতি উৎসাহ প্রদান করছেন এবং পাপের মন্দ পরিণাম থেকে ভয় দেখাচ্ছেন। তিনি বলছেন যে, এই দ্বীন বিক্ৰীকারীরা কি এতটুকুও জ্ঞান রাখে না? অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ঐ লোকদের প্রশংসা করছেন যারা আল্লাহর কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করেছে, যে কিতাব তাদেরকে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর অনুসরণের দিকে আহ্বান করছে। এ সবকিছু তাদের কিতাব তাওরাত এবং ইঞ্জীলে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ “যারা আল্লাহর কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে এবং নামায কায়েম করে, তার আদেশ নিষেধকে পূর্ণভাবে মেনে চলে, আর পাপকার্য থেকে বিরত থাকে, তাদের জেনে রাখা উচিত যে, এরূপ সঙ্কৰ্মশীলদের কর্মফল আমি কখনও বিনষ্ট করি না।”





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।