আল কুরআন


সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 99)

সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 99)



হরকত ছাড়া:

وهو الذي أنزل من السماء ماء فأخرجنا به نبات كل شيء فأخرجنا منه خضرا نخرج منه حبا متراكبا ومن النخل من طلعها قنوان دانية وجنات من أعناب والزيتون والرمان مشتبها وغير متشابه انظروا إلى ثمره إذا أثمر وينعه إن في ذلكم لآيات لقوم يؤمنون ﴿٩٩﴾




হরকত সহ:

وَ هُوَ الَّذِیْۤ اَنْزَلَ مِنَ السَّمَآءِ مَآءً ۚ فَاَخْرَجْنَا بِهٖ نَبَاتَ کُلِّ شَیْءٍ فَاَخْرَجْنَا مِنْهُ خَضِرًا نُّخْرِجُ مِنْهُ حَبًّا مُّتَرَاکِبًا ۚ وَ مِنَ النَّخْلِ مِنْ طَلْعِهَا قِنْوَانٌ دَانِیَۃٌ وَّ جَنّٰتٍ مِّنْ اَعْنَابٍ وَّ الزَّیْتُوْنَ وَ الرُّمَّانَ مُشْتَبِهًا وَّ غَیْرَ مُتَشَابِهٍ ؕ اُنْظُرُوْۤا اِلٰی ثَمَرِهٖۤ اِذَاۤ اَثْمَرَ وَ یَنْعِهٖ ؕ اِنَّ فِیْ ذٰلِکُمْ لَاٰیٰتٍ لِّقَوْمٍ یُّؤْمِنُوْنَ ﴿۹۹﴾




উচ্চারণ: ওয়া হুওয়াল্লাযীআনযালা মিনাছছামাই মাআন ফাআখরাজনা-বিহীনাবা-তা কুল্লি শাইয়িন ফাআখরাজনা-মিনহু খাদিরান নুখরিজুমিনহু হাব্বাম মুতারা-কিবাওঁ ওয়া মিনান নাখলি মিন তাল‘ইহা-কিনওয়া-নুন দা-নিয়াতুওঁ ওয়া জান্না-তিম মিন আ‘না-বিওঁ ওয়াযযাইতূনা ওয়াররুম্মা-না মুশতাবিহাওঁ ওয়া গাইরা মুতাশা-বিহিন উনজু রূইলাছামারিহীইযাআছমারা ওয়া ইয়ান‘ইহী ইন্না ফী যা-লিকুম লাআ-য়া-তিল লিকাওমিইঁ ইঊ’মিনূন।




আল বায়ান: আর তিনিই আসমান থেকে বর্ষণ করেছেন বৃষ্টি। অতঃপর আমি এ দ্বারা উৎপন্ন করেছি সব জাতের উদ্ভিদ। অতঃপর আমি তা থেকে বের করেছি সবুজ ডাল-পালা। আমি তা থেকে বের করি ঘন সন্নিবিষ্ট শস্যদানা। আর খেজুর বৃক্ষের মাথি থেকে (বের করি) ঝুলন্ত থোকা। আর (উৎপন্ন করি) আঙ্গুরের বাগান এবং সাদৃশ্যপূর্ণ ও সাদৃশ্যহীন যয়তুন ও আনার। দেখ তার ফলের দিকে, যখন সে ফলবান হয় এবং তার পাকার প্রতি। নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে এমন কওমের জন্য যারা ঈমান আনে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৯৯. আর তিনিই আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, তারপর তা দ্বারা আমরা সব রকমের উদ্ভিদের চারা উদগম করি; অতঃপর তা থেকে সবুজ পাতা উদগত করি। যা থেকে আমরা ঘন সন্নিবিষ্ট শস্যদানা উৎপাদন করি। আরও (নির্গত করি) খেজুর গাছের মাথি থেকে ঝুলন্ত কাঁদি, আংগুরের বাগান, যায়তুন ও আনার। একটার সাথে অন্যটার মিল আছে, আবার নেইও। লক্ষ্য করুন, ওগুলোর ফলের দিকে যখন সেগুলো ফলবান হয় এবং সেগুলো পেকে উঠার পদ্ধতির প্রতি। নিশ্চয় মুমিন সম্প্রদায়ের জন্য এগুলোর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: তিনিই আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন অতঃপর তা দ্বারা আমি সকল প্রকার উদ্ভিদ উদগত করি, অতঃপর তা থেকে সবুজ পাতা উদ্গত করি, অতঃপর তা থেকে ঘন সন্নিবিষ্ট শস্যদানা উৎপন্ন করি, খেজুর গাছের মোচা থেকে ঝুলন্ত কাঁদি নির্গত করি, আঙ্গুরের বাগান সৃষ্টি করি, আর সৃষ্টি করি জায়তুন ও ডালিম, সেগুলো একই রকম এবং বিভিন্ন রকমও। লক্ষ্য কর তার ফলের প্রতি যখন গাছে ফল আসে আর ফল পাকে। এসবের ভিতরে মু’মিন সম্প্রদায়ের জন্য অবশ্যই নিদর্শন আছে।




আহসানুল বায়ান: (৯৯) তিনিই আকাশ হতে পানি বর্ষণ করেছেন, অতঃপর তা দিয়ে আমি সর্বপ্রকার উদ্ভিদের চারা উদগম করেছি।[1] অনন্তর তা থেকে আমি সবুজ পাতা উদগত করেছি।[2] অতঃপর তা থেকে ঘন সন্নিবিষ্ট শস্য-দানা সৃষ্টি করি[3] এবং খেজুর বৃক্ষের মাথি থেকে ঝুলন্ত কাঁদি নির্গত করি।[4] আর আঙ্গুরের উদ্যানরাজি সৃষ্টি করি এবং যয়তুন ও ডালিমও,[5] যা একে অন্যের সদৃশ এবং বিসদৃশও।[6] যখন তা ফলবান হয় এবং ফলগুলি পরিপক্ব হয়, তখন সেগুলির প্রতি লক্ষ্য কর। নিশ্চই এগুলিতে বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে। [7]



মুজিবুর রহমান: আর তিনি আকাশ হতে পানি বর্ষণ করেন, ওর সাহায্যে সব রকমের উদ্ভিদ আমি (আল্লাহ) উৎপন্ন করি; অতঃপর তা থেকে সবুজ শাখা বের করি, ফলতঃ তা থেকে আমি উপর্যুপরি উত্থিত বীজ উৎপন্ন করি। এবং খেজুর বৃক্ষ থেকে অর্থাৎ ওর পুস্পকণিকা থেকে ছড়া হয় যা নিম্ন দিকে ঝুঁকে পড়ে, আর আঙ্গুরসমূহের উদ্যান এবং যাইতূন ও আনার যা পরস্পর সাদৃশ্যযুক্ত। প্রত্যেক ফলের প্রতি লক্ষ্য কর যখন ওটা ফলে এবং ওর পরিপক্ক হওয়ার প্রতি লক্ষ্য কর। এই সমুদয়ের মধ্যে নিদর্শনসমূহ রয়েছে তাদেরই জন্য যারা ঈমান রাখে।



ফযলুর রহমান: তিনিই আকাশ থেকে পানি (বৃষ্টি) বর্ষণ করেন। তারপর এর সাহায্যে আমি সবরকমের গাছপালা উৎপন্ন করি; তা থেকে সবুজ বৃন্ত উদ্‌গত করি, যা থেকে ঘন থোকা-থোকা শস্যদানা বের করি। খেজুরগাছের শিষ থেকে নির্গত হয় নিচে নুয়ে-পড়া কাঁদি। আঙ্গুরের বাগান, জলপাই ও ডালিম উৎপন্ন করি। এগুলোর মধ্যে কোন কোনটি অন্য কোন কোনটির মত আবার কোন কোনটি অন্য যে-কোনটি থেকে ভিন্ন। গাছে যখন ফল ধরে তখন এর ফল ও তার পরিপক্কতার দিকে লক্ষ্য কর। নিশ্চয়ই এসবের মধ্যে বিশ্বাসী লোকদের জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে।



মুহিউদ্দিন খান: তিনিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন অতঃপর আমি এর দ্বারা সর্বপ্রকার উদ্ভিদ উৎপন্ন করেছি, অতঃপর আমি এ থেকে সবুজ ফসল নির্গত করেছি, যা থেকে যুগ্ম বীজ উৎপন্ন করি। খেজুরের কাঁদি থেকে গুচ্ছ বের করি, যা নুয়ে থাকে এবং আঙ্গুরের বাগান, যয়তুন, আনার পরস্পর সাদৃশ্যযুক্ত এবং সাদৃশ্যহীন। বিভিন্ন গাছের ফলের প্রতি লক্ষ্য কর যখন সেুগুলো ফলন্ত হয় এবং তার পরিপক্কতার প্রতি লক্ষ্য কর। নিশ্চয় এ গুলোতে নিদর্শন রয়েছে ঈমানদারদের জন্যে।



জহুরুল হক: আর তিনিই সেইজন যিনি আকাশ থেকে নামান বৃষ্টি, তখন তার দ্বারা আমরা উদ্‌গত করি সব রকমের চারা গাছ, তারপর তা থেকে উদগম করি সবুজ গাছপালা, যা থেকে উদ্ভব করি থোকা থোকা শস্য, আর খেজুর গাছ থেকে -- তার মাথি থেকে ঝুলন্ত কাঁদি, আর আঙ্গুরের ও জলপাইয়ের ও ডালিমের বাগান -- এক রকমের ও সামস্যবিহীন। তোমরা তাকিয়ে দেখো তার ফলের দিকে যখন তা ফলবান হয় ও তার পেকে ওঠাতে। নিঃসন্দেহ এগুলোতে রয়েছে নিদর্শনাবলী তেমন লোকের জন্য যারা বিশ্বাস স্থাপন করে।



Sahih International: And it is He who sends down rain from the sky, and We produce thereby the growth of all things. We produce from it greenery from which We produce grains arranged in layers. And from the palm trees - of its emerging fruit are clusters hanging low. And [We produce] gardens of grapevines and olives and pomegranates, similar yet varied. Look at [each of] its fruit when it yields and [at] its ripening. Indeed in that are signs for a people who believe.



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৯৯. আর তিনিই আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, তারপর তা দ্বারা আমরা সব রকমের উদ্ভিদের চারা উদগম করি; অতঃপর তা থেকে সবুজ পাতা উদগত করি। যা থেকে আমরা ঘন সন্নিবিষ্ট শস্যদানা উৎপাদন করি। আরও (নির্গত করি) খেজুর গাছের মাথি থেকে ঝুলন্ত কাঁদি, আংগুরের বাগান, যায়তুন ও আনার। একটার সাথে অন্যটার মিল আছে, আবার নেইও। লক্ষ্য করুন, ওগুলোর ফলের দিকে যখন সেগুলো ফলবান হয় এবং সেগুলো পেকে উঠার পদ্ধতির প্রতি। নিশ্চয় মুমিন সম্প্রদায়ের জন্য এগুলোর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।(১)


তাফসীর:

(১) উপরোক্ত ৯৫-৯৯ আয়াতসমূহে প্রথমে অধঃজগতের বস্তুসমূহ সম্পর্কে বর্ণনা এসেছে। কারণ এগুলো আমাদের অধিক নিকটবর্তী। এরপর এগুলোর বর্ণনাকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে, এক. মাটি থেকে উৎপন্ন উদ্ভিদ, বৃক্ষ ও বাগানের বর্ণনা এবং দুই. মানব ও জীবজন্তুর বর্ণনা। এরপর শূন্য জগতের উল্লেখ করা হয়েছে; অর্থাৎ সকাল ও বিকাল। এরপর উর্ধ্ব জগতের সৃষ্ট বস্তু বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজি। অতঃপর অধঃজগতের বস্তুসমূহ অধিক প্রত্যক্ষ হওয়ার কারণে এগুলোর পূর্ণ বর্ণনা দ্বারা আলোচনা সমাপ্ত করা হয়েছে।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৯৯) তিনিই আকাশ হতে পানি বর্ষণ করেছেন, অতঃপর তা দিয়ে আমি সর্বপ্রকার উদ্ভিদের চারা উদগম করেছি।[1] অনন্তর তা থেকে আমি সবুজ পাতা উদগত করেছি।[2] অতঃপর তা থেকে ঘন সন্নিবিষ্ট শস্য-দানা সৃষ্টি করি[3] এবং খেজুর বৃক্ষের মাথি থেকে ঝুলন্ত কাঁদি নির্গত করি।[4] আর আঙ্গুরের উদ্যানরাজি সৃষ্টি করি এবং যয়তুন ও ডালিমও,[5] যা একে অন্যের সদৃশ এবং বিসদৃশও।[6] যখন তা ফলবান হয় এবং ফলগুলি পরিপক্ব হয়, তখন সেগুলির প্রতি লক্ষ্য কর। নিশ্চই এগুলিতে বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে। [7]


তাফসীর:

[1] এখান থেকে তাঁর আরো একটি বিস্ময়কর কারিগরির কথা বর্ণনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ, বৃষ্টির পানি। যার দ্বারা তিনি বিভিন্ন প্রকারের বৃক্ষ সৃষ্টি করেন।

[2] অর্থাৎ, সেই সবুজ কচি কিশলয় ও অঙ্কুরিত চারাগাছকে বুঝানো হয়েছে, যেগুলো মাটিতে চাপা দেওয়া বীজ হতে মহান আল্লাহ মাটির উপর প্রকাশ করেন। অতঃপর সে চারাগাছ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।

[3] অর্থাৎ, সবুজ এই চারাগাছগুলোর উপর সন্নিবিষ্ট দানা সৃষ্টি করি। যেমন, গম ও ধানের শীষে হয়। উদ্দেশ্য, সকল প্রকার শস্যাদি। যেমন, যব, জোয়ার, বাজরা, ভুট্টা এবং গম ও ধান ইত্যাদি।

[4] قِنْوانٌ হল قِنْوٌ এর বহুবচন; যেমন, صِنْوٌ এবং صِنْوانٌ অর্থঃ গুচ্ছ। طَلْعٌ হল খেজুরের সেই মোচা, যা প্রাথমিক অবস্থায় প্রকাশ পায়। এটাই বড় হয়ে কাঁদির আকার ধারণ করে অতঃপর তা আধপাকা খেজুরে পরিণত হয়। دَانِيَةٌ সেই গুচ্ছকে বলা হয়, যা নুয়ে থাকে। আর কিছু গুচ্ছ অনেক দূরে থাকে যেখানে হাত পৌঁছে না। অনুগ্রহের প্রকাশ স্বরূপ دانية এর কথা উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, مِنْهَا دَانِيَةٌ ومِنْهَا بَعِيْدَةٌ (কিছু গুচ্ছ নিকটে থাকে এবং কিছু দূরে)। (ফাতহুল ক্বাদীর) بَعِيْدَةٌ শব্দ ঊহ্য আছে।

[5] جنات، الزيتون এবং الرمان শব্দগুলো ‘মানসূব’ (যবর অবস্থায়) এসেছে, কারণ এগুলোর সংযোগ হল পূর্বোক্ত نباتَ এর সাথে। অর্থাৎ, وَأَخْرَجْنَا بِهِ جَنَّاتٍ (আর বৃষ্টির পানির দ্বারা আমি আঙ্গুরের বাগান এবং যয়তুন ও আনার সৃষ্টি করেছি।)

[6] অর্থাৎ, কোন কোন গুণাবলীতে এরা পরস্পর সাদৃশ্যযুক্ত, আবার কোন কোন গুণাবলীতে এদের পারস্পরিক কোন সাদৃশ্য থাকে না। অথবা এদের পাতাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সাদৃশ্য থাকে, কিন্তু ফলের মধ্যে কোন মিল থাকে না। কিংবা আকার-আকৃতিতে এদের মধ্যে সাদৃশ্য থাকে, কিন্তু মজা ও সবাদে এরা একে অপর থেকে ভিন্নতর হয়।

[7] অর্থাৎ, উল্লিখিত সমস্ত জিনিসের মধ্যে বিশ্বজাহানের স্রষ্টার পরিপূর্ণ শক্তি এবং তাঁর হিকমত ও রহমতের বহু প্রমাণ রয়েছে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৯৮-৯৯ নং আয়াতের তাফসীর:



(نَّفْسٍ وَّاحِدَةٍ)



‘একই ব্যক্তি’অর্থাৎ আদম (আঃ) হতে সৃষ্টি করেছেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوْا رَبَّكُمُ الَّذِيْ خَلَقَكُمْ مِّنْ نَّفْسٍ وَّاحِدَةٍ)



“হে মানবমণ্ডলী! তোমরা ভয় কর তোমাদের প্রতিপালককে যিনি তোমাদেরকে একই ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন” (সূরা নিসা ৪:১)



(فَمُسْتَقَرٌّ وَّمُسْتَوْدَعٌ)



‘প্রত্যেকের জন্য একটি আবাস স্থল আছে আর একটি আছে গচ্ছিত রাখার জায়গা’ স্থায়ী ও অস্থায়ী এর অর্থ নিয়ে মতভেদ পাওয়া যায়। সঠিক অর্থ হল: مُسْتَقَرٌّ বলতে মায়ের গর্ভাশয় আর مُسْتَوْدَعٌ বলতে পিতার পৃষ্ঠদেশকে বুঝানো হয়েছে। (ফাতহুল কাদীর, ইবনু কাসীর, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ৩৪৩)



مُّتَرَاكِبًا অর্থাৎ



يركب بعضه بعضا



কিছু অংশ কিছু অংশের সাথে সম্পৃক্ত, একেই গুচ্ছ বলা হয়।



قِنْوَانٌ শব্দটি قنو এর বহুবচন। অর্থ: গুচ্ছ। طَلْعِ হল খেজুরের সেই মোচা যা প্রাথমিক অবস্থয় প্রকাশ পায়। এটাই বড় হয়ে কাঁদির আকার ধারণ করে। অতঃপর তা আধাপাকা খেজুরে পরিণত হয়।



دَانِيَةٌ সেই গুচ্ছকে বলা হয় যা নুয়ে থাকে। আর কিছু গুচ্ছ অনেক দূরে থাকে যেখানে হাত পৌঁছে না। অনুগ্রহের প্রকাশস্বরূপ دَانِيَةٌ এর কথা উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ



منها دانية و منها بعيدة



(কিছু গুচ্ছ থাকে কাছে আর কিছু দূরে)। (ফাতহুল কাদীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)



(اُنْظُرُوْآ إِلٰي ثَمَرِه۪)



‘লক্ষ কর, তার ফলের প্রতি যখন তা ফলবান হয়’ অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার এ সব কুদরত নিয়ে চিন্তা কর কিভাবে তিনি অস্তিত্বহীন থেকে অস্তিত্ব দিয়েছেন। একই জমিন থেকে উদ্গত একই পানি দ্বারা সেচপ্রাপ্ত একই আবহাওয়া, আলো-বাতাসে লালিত পালিত। এক ফলের সাথে অন্য ফলের স্বাদে ও রঙে কোন সাদৃশ্য নেই। ==== আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَفِي الْأَرْضِ قِطَعٌ مُّتَجٰوِرٰتٌ وَّجَنّٰتٌ مِّنْ أَعْنَابٍ وَّزَرْعٌ وَّنَخِيْلٌ صِنْوَانٌ وَّغَيْرُ صِنْوَانٍ يُّسْقٰي بِمَا۬ءٍ وَّاحِدٍ ﺤ وَنُفَضِّلُ بَعْضَهَا عَلٰي بَعْضٍ فِي الْأُكُلِ ﺚإِنَّ فِيْ ذٰلِكَ لَاٰيٰتٍ لِّقَوْمٍ يَّعْقِلُوْنَ)



“পৃথিবীতে রয়েছে পরস্পর সংলগ্ন ভূখণ্ড, এতে (পৃথিবীতে) আছে বিভিন্ন আঙ্গুর-কানন, শস্যক্ষেত্র, একাধিক শীষবিশিষ্ট অথবা এক শীষবিশিষ্ট খেজুর বৃক্ষ, সিঞ্চিত হয় একই পানিতে এবং ফল হিসেবে তাদের কতককে কতকের ওপর আমি শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে থাকি। অবশ্যই বোধশক্তিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য এতে রয়েছে নিদর্শন।” (সূরা রা‘দ ১৩:৪)



এতো কিছু আল্লাহ তা‘আলা দান করেছেন, নিশ্চয়ই এতে আল্লাহ তা‘আলার উদ্দেশ্য রয়েছে। তা হল বান্দারা এসব নেয়ামত উপভোগ করবে আর শুকরিয়াস্বরূপ একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. মানব সৃষ্টির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, সকল মানুষই আদম (আঃ) হতে স্পষ্ট।

২. আল্লাহ তা‘আলার কুদরত অসংখ্য বিশেষ করে ফল ও ফসল উৎপাদনে।

৩. আল্লাহ তা‘আলাকে চেনার অন্যতম মাধ্যম তার সৃষ্টিকে নিয়ে চিন্তা করা।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৯৮-৯৯ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ পাক বলেনঃ তিনিই তোমাদেরকে একটা আত্মা হযরত আদম (আঃ) থেকে সৃষ্টি করেছেন। যেমন তিনি বলেনঃ “হে মানবমণ্ডলী! তোমরা স্বীয় প্রতিপালক (এর বিরোধিতা)কে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে একই প্রাণী (আদম আঃ) হতে সৃষ্টি করেছেন এবং ঐ প্রাণী হতে তার জোড়া (বিবি হাওয়াকে) সৃষ্টি করেছেন, আর এতদুভয় হতে বহু নর ও নারী বিস্তার করেছেন।

(আরবী) -এ দুটি শব্দের ব্যাপারে মুফাসসিরদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ মনীষীগণ বলেন যে, (আরবী) শব্দ দ্বারা মায়ের গর্ভকে বুঝানো হয়েছে। আর (আরবী) শব্দ দ্বারা পিতার পিঠকে বুঝানো হয়েছে। আবার কারো মতে (আরবী) হচ্ছে দুনিয়ার অবস্থান এবং (আরবী) হচ্ছে মৃত্যুর পর পরকালের অবস্থান।

হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, এ দু'টো হচ্ছে দুনিয়ার মাতৃগর্ভে ও ভূ-পৃষ্ঠে অবস্থান এবং মৃত্যুর পরের অবস্থান। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, মৃত্যুর পর আমল বন্ধ হয়ে যাওয়া হচ্ছে (আরবী) এবং দারে আখিরাত হচ্ছে (আরবী)। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই সঠিকতম।

(আরবী) আমি নিদর্শনসমূহ ঐসব লোকের জন্যে সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করে দিয়েছি যারা বুঝে অর্থাৎ আল্লাহর কালাম ও ওর অর্থ সম্পর্কে যারা সম্যক জ্ঞান রাখে।

মহান আল্লাহ বলেনঃ তিনিই সেই আল্লাহ যিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন, ওর সাহায্যে তিনি সব রকমের উদ্ভিদ উৎপন্ন করেছেন। তারপর তা থেকে সবুজ শাখা বের করেছেন অর্থাৎ চারাগাছ পয়দা করেছেন। অতঃপর তাতে তিনি দানা ও ফল সৃষ্টি করেছেন। যেমন তিনি বলেনঃ পানি দ্বারাই সমস্ত জিনিস জীবন লাভ করে থাকে। এর ফলেই ভূমির শস্য ও সবুজ উদ্ভিদ উৎপন্ন হয়ে থাকে। ঐসব গাছে আবার দানা ও ফল পয়দা হয়। ওগুলোর মধ্য থেকে আমি এমন দানা বের করে থাকি যা একে অপরের সাথে জড়িয়ে থাকে। একে গুচ্ছ লা হয়। খুরমা গাছে গুচ্ছযুক্ত শাখা হয়। (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের বহু বচন। এর অর্থ হচ্ছে তাজা খেজুরের গুচ্ছ যা কাছাকাছি একে অপরের সাথে জড়িত থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা ঐ ছোট ছোট খেজুর গাছ বুঝানো হয়েছে যেগুলোর গুচ্ছ মাটির সাথে লেগে থাকে। হেজাযবাসী তো একে (আরবী) পড়ে থাকে, কিন্তু বানু তামীম গোত্র একে (আরবী) অর্থাৎ (আরবী) -এর সঙ্গে পড়ে। এটা (আরবী) -এর বহু বচন। যেমন (আরবী) শব্দটি (আরবী)-এর বহু বচন।

এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ ‘আঙ্গুরের বাগানসমূহ' অর্থাৎ আমি যমীনে আঙ্গুরের বাগান পয়দা করেছি। মহান আল্লাহ খুরমা ও আঙ্গুরের বর্ণনা দিয়েছেন। কেননা, হেজযবাসীদের কাছে এ দু'টো ফলই সর্বোত্তম ফল বলে গণ্য হয়। শুধু হেজাযবাসী নয়, বরং সারা দুনিয়ার লোক এ দু'টো ফলকে সর্বোত্তম ফল মনে করে থাকে। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় ইহসানের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, এই সব খুরমা ও আঙ্গুর ফল দ্বারা তোমরা মদ তৈরী করে থাক এবং নিজেদের জন্যে উত্তম খাদ্য প্রস্তুত কর। এটা হচ্ছে মদ হারাম হওয়ার পূর্বেকার আয়াত। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যমীনে আমি খুরমা ও আঙ্গুরের বাগান বানিয়েছি। তিনি আরও বলেনঃ আমি যায়তুন ও আনারেরও বাগান করে দিয়েছি যা পাতা ও আকৃতির দিক দিয়ে একে অপরের সাথে সাদৃশ্যযুক্ত বটে, কিন্তু ফল, গঠন, স্বাদ এবং স্বভাব ও প্রকৃতির দিক দিয়ে সম্পূর্ণ পৃথক! আল্লাহ পাক বলেনঃ যখন ফল পেকে যায় তখন ঐগুলোর প্রতি লক্ষ্য করে দেখো! অর্থাৎ হে মানুষ! তোমরা আল্লাহর ক্ষমতা সম্পর্কে চিন্তা করে দেখো যে, তিনি কিভাবে ওগুলোকে অস্তিত্বহীনতা থেকে অস্তিত্বে আনয়ন করেছেন। ফল ধরার পূর্বে গাছগুলো তো জ্বালানী কাষ্ঠ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এই কাঠের মধ্য থেকেই মহান আল্লাহ এসব সুমিষ্ট খুরমা, আঙ্গুর এবং অন্যান্য ফল বের করেছেন! যেমন তিনি বলেনঃ যমীনে ঘন বৃক্ষ, আঙ্গুর এবং শস্যের বাগানসমূহ রয়েছে, ওগুলোর মধ্যে কিছু কিছু গুচ্ছ বিশিষ্ট এবং কিছু কিছু গুচ্ছবিহীন। সবগুলো একই পানি পেয়ে থাকে অথচ খেতে একটি অপরটি হতে বহুগুণে উত্তম। এ জন্যেই আল্লাহ পাক এখানে বলেনঃ “হে লোকেরা! এগুলো আল্লাহর ব্যাপক ক্ষমতা ও পূর্ণ নৈপুণ্যের পরিচয় বহন করছে। ঈমানদার লোকেরাই এগুলো বুঝতে পারে এবং তারাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সত্যতা স্বীকার করে থাকে!”





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।