আল কুরআন


সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 3)

সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 3)



হরকত ছাড়া:

وهو الله في السموات وفي الأرض يعلم سركم وجهركم ويعلم ما تكسبون ﴿٣﴾




হরকত সহ:

وَ هُوَ اللّٰهُ فِی السَّمٰوٰتِ وَ فِی الْاَرْضِ ؕ یَعْلَمُ سِرَّکُمْ وَ جَهْرَکُمْ وَ یَعْلَمُ مَا تَکْسِبُوْنَ ﴿۳﴾




উচ্চারণ: ওয়া হুওয়াল্লা-হু ফিছছামা-ওয়া-তি ওয়া ফিল আরদি ইয়া‘লামুছিররাকুম ওয়া জাহরাকুম ওয়া ইয়া‘লামুমা-তাকছিবূন।




আল বায়ান: আর আসমানসমূহ ও যমীনে তিনিই আল্লাহ, তিনি জানেন তোমাদের গোপন ও প্রকাশ্য এবং জানেন যা তোমরা অর্জন কর।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩. আর আসমানসমূহ ও যমীনে তিনিই আল্লাহ(১), তোমাদের গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু তিনি জানেন এবং তোমরা যা অর্জন কর তাও তিনি জানেন।(২)




তাইসীরুল ক্বুরআন: আসমানসমূহ আর যমীনে তিনিই আল্লাহ, তোমাদের গোপন বিষয়াদি আর তোমাদের প্রকাশ্য বিষয়াদি সম্পর্কে তিনি জানেন, আর তিনি জানেন যা তোমরা উপার্জন কর।




আহসানুল বায়ান: (৩) আকাশ ও পৃথিবীর তিনিই আল্লাহ। তোমাদের গোপন ও প্রকাশ্য সব কিছু তিনি জানেন এবং তোমরা যা কর, তাও তিনি অবগত আছেন।[1]



মুজিবুর রহমান: আকাশসমূহ ও পৃথিবীতে ঐ এক আল্লাহই রয়েছেন, তোমাদের অপ্রকাশ্য ও প্রকাশ্য সব অবস্থাই তিনি জানেন, আর তোমরা যা কিছু কর তাও তিনি পূর্ণরূপে অবগত আছেন।



ফযলুর রহমান: আর আসমান ও জমিনে তিনিই আল্লাহ। তিনি তোমাদের গোপন ও প্রকাশ্য বিষয় জানেন; তোমরা যা কিছু উপার্জন করো তিনি তাও জানেন।



মুহিউদ্দিন খান: তিনিই আল্লাহ নভোমন্ডলে এবং ভূমন্ডলে। তিনি তোমাদের গোপন ও প্রকাশ্য বিষয় জানেন এবং তোমরা যা কর তাও অবগত।



জহুরুল হক: আর তিনিই আল্লাহ্ মহাকাশমন্ডলে ও পৃথিবীতে। তিনি জানেন তোমাদের গোপনীয় বিষয় ও তোমাদের প্রকাশ্য বিষয়, আর তিনি জানেন যা তোমরা অর্জন করো।



Sahih International: And He is Allah, [the only deity] in the heavens and the earth. He knows your secret and what you make public, and He knows that which you earn.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৩. আর আসমানসমূহ ও যমীনে তিনিই আল্লাহ(১), তোমাদের গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু তিনি জানেন এবং তোমরা যা অর্জন কর তাও তিনি জানেন।(২)


তাফসীর:

(১) এ আয়াতের অনুবাদে কোন প্রকার ভুল বুঝার অবকাশ নেই। মহান আল্লাহ তার আরশের উপরই রয়েছেন। আসমান ও যমীনের সর্বত্রই তার দৃষ্টি, জ্ঞান ও ক্ষমতা রয়েছে। তিনি সর্বত্রই মা’বুদ। আয়াতের এক অর্থ এটাই। কোন কোন মুফাসসির অর্থ করেছেন, তিনিই আল্লাহ যিনি আসমান ও যমীনের যত গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু জানেন। আবার কোন কোন মুফাসসির বলেছেন, এখানে আসমান বলে ঊর্ধ্বজগত বোঝানো হয়েছে। সেটা আরশও হতে পারে। সুতরাং আয়াতের অনুবাদ হবে, তিনিই আল্লাহ যিনি আসমানে তথা আরশের উপর রয়েছেন, সেখানে থাকলেও যমীনের যত গোপন ও প্রকাশ্য বিষয়াদি রয়েছে সব কিছু জানেন। [তাবারী, বাগভী, কুরতুবী, ইবন কাসীর, ফাতহুল কাদীর]


(২) এ আয়াতে প্রথম দু’আয়াতে বর্ণিত বিষয়বস্তুর ফলাফল বর্ণিত হয়েছে। তা এই যে, আল্লাহ তা'আলাই এমন এক সত্তা, যিনি আসমান ও যমীনে ইবাদাত ও আনুগত্যের যোগ্য এবং তিনিই তোমাদের প্রতিটি প্রকাশ্য ও গোপন অবস্থা এবং প্রতিটি উক্তি ও কর্ম সম্পর্কে পুরোপুরি পরিজ্ঞাত। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আর কারও ইবাদাত করো না। তিনি যেহেতু তোমাদের গোপন ও প্রকাশ্য সবই জানেন সুতরাং তার নাফরমানী করা থেকে সতর্কতা অবলম্বন করো এবং এমন কাজ করবে, যা তোমাদেরকে তাঁর নৈকট্য প্রদান করবে, তাঁর রহমতের অধিকারী করবে। এমন কোন কাজ করো না, যাতে তার নৈকট্য থেকে দূরে সরে যাও। [সা'দী]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৩) আকাশ ও পৃথিবীর তিনিই আল্লাহ। তোমাদের গোপন ও প্রকাশ্য সব কিছু তিনি জানেন এবং তোমরা যা কর, তাও তিনি অবগত আছেন।[1]


তাফসীর:

[1] আহলে সুন্নাহ অর্থাৎ, সালাফদের আকীদা হলো, মহান আল্লাহ তো আরশে সমাসীন; যেভাবে তাঁর সত্তার জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু তাঁর জ্ঞান সর্বত্র বিরাজমান। অর্থাৎ, কোন জিনিসই তাঁর জ্ঞানের বাইরে নয়। অবশ্য কোন কোন ভ্রান্ত দল আল্লাহর আরশে সমাসীন হওয়াকে মানে না। তারা বলে যে, আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান এবং তারা এই আয়াতের ভিত্তিতেই তাদের (ভ্রান্ত) আকীদা সাব্যস্ত করে। অথচ তাদের আকীদা যেমন ভুল, অনুরূপ তাদের দলীলও সঠিক নয়। কেননা, আয়াতের অর্থ হলো, যে সত্তাকে আসমান ও যমীনে ‘আল্লাহ’ বলে ডাকা হয়, আসমানে ও যমীনে যার রাজত্ব বিস্তৃত এবং আসমান ও যমীনে যাকে সত্য উপাস্য মনে করা হয়, সেই আল্লাহই তোমাদের গোপনীয় ও প্রকাশ্য সমস্ত আমলাদির খবর রাখেন। (ফাতহুল ক্বাদীর) এর আরো ব্যাখা করা হয়েছে, উলামাগণ তা তফসীরের কিতাবগুলোতে দেখতে পারেন। যেমন, তাফসীরে ত্বাবারী, ইবনে কাসীর ইত্যাদি।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: নামকরণ, অবতরণের স্থান ও প্রেক্ষাপট:



আন্‘আম শব্দের শাব্দিক অর্থ হল: গৃহপালিত পশু। অত্র সূরার ১৩৬, ১৩৮, ১৪২ নং আয়াতে (الأنعام) আল-আন্‘আম শব্দটি উল্লেখ রয়েছে বিধায় উক্ত নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে। তাছাড়া এ সূরাতে গৃহপালিত পশু সংক্রান্ত বিধি-বিধান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। কারণ মক্কার মুশরিকরা কিছু পশু আল্লাহ তা‘আলার জন্য নির্ধারণ করত, কিছু নিজেদের জন্য হারাম করে নিত, আবার কিছু পশু নিজেদের নারী-পুরুষের মাঝে ব্যবধান করতঃ হারাম করে নিত।



ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: সূরা আন্‘আম মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। (সনদ সহীহ, ইবনে কাসীর, ৩/২৭২)



আল্লামা সা‘লাবী (রহঃ) বলেন: সূরা আন্‘আম মক্কায় অবতীর্ণ হয়। তবে ছয়টি আয়াত মদীনায় অবতীর্ণ হয়। তা হল



(وَمَا قَدَرُوا اللّٰهَ حَقَّ قَدْرِه۪)



-সহ পরের দু’টি আয়াত এবং



(قُلْ تَعَالَوْا أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ) আয়াত সহ পরের দু’টি আয়াত। অর্থাৎ ৯১-৯৩ নং আয়াত ও ১৫১-১৫৩ নং আয়াত।



ইমাম কুরতুবী (রহঃ) ইবনু আব্বাস ও কাতাদাহ (রহঃ) থেকে একটি বর্ণনা নিয়ে এসেছেন তাতে তাঁরা বলেন: দু’টি আয়াত ব্যতীত সম্পূর্ণ সূরা মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। সে দু’টি আয়াত হল ৯১ ও ১৪১ নং। (ফাতহুল কাদীর, ২/১২৬)



এ সূরা অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট ও ফযীলত সম্পর্কে যেসব বর্ণনা পাওয়া যায় সকল বর্ণনাই দুর্বল। (ফাতহুল কাদীর, ২/১২৬) তবে ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে একটি বর্ণনা পাওয়া যায়, তিনি বলেন: আরবের অশিক্ষিত লোকেদের শিক্ষা দিতে যদি তুমি আনন্দ পাও তাহলে সূরা আন্‘আমের ১৩০ নং আয়াতের পরের আয়াতগুলো পড়। (সহীহ বুখারী হা: ৩৫২৪)



অত্র সূরার শুরুতে তাওহীদ, আল্লাহ তা‘আলার মর্যাদা, মাঝে ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রকৃত মা‘বূদ চেনার ঐতিহাসিক ঘটনা, হালাল-হারামের বিধান এবং শেষ দিকে মক্কার মুশরিকদের শির্কের ধরণ ও পদ্ধতি আর যেসব প্রাণী হারাম করা হয়েছে তা-সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিধানাবলী অত্র সূরায় স্থান পেয়েছে।



১-৩ নং আয়াতের তাফসীর:



আল্লাহ তা‘আলা সূরাটি শুরু করেছেন দু’ প্রকার তাওহীদ দ্বারা। প্রথমেই নিজের প্রশংসা করলেন যা তাওহীদে উলুহিয়্যাহ, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল সর্বাধিক প্রশংসার অধিকারী একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। মানুষ একমাত্র তাঁর প্রশংসা করবে, কেননা প্রশংসা করা একটি ইবাদত। তবে ভাল ও সৎ কাজে মানুষেরও প্রশংসা করা যায়। সৎ কাজ ও একে অন্যের প্রতি দয়াদ্রতার জন্য মানুষের প্রশংসা করা আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসার পরিপন্থী নয়। কারণ হাদীসে এসেছে:



مَنْ لَمْ يَشْكُرِ النَّاسَ لَمْ يَشْكُرِ اللّٰهَ



“যে মানুষের প্রশংসা করল না সে আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করল না।”(নাসায়ী হা: ১৯৫৫, সহীহ) কেননা ভাল কাজে মানুষের প্রশংসা করা মূলত আল্লাহ তা‘আলারই প্রশংসা করা। এতে আরো ইঙ্গিত রয়েছে: মানুষ আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করুক আর নাই করুক আল্লাহ তা‘আলা তাঁর স্বত্ত্বা ও গুণে প্রশংসনীয়। মানুষ তাঁর প্রশংসা করলে মর্যাদা বাড়বেও না, আর প্রশংসা না করলে মর্যাদা ক্ষুণœও হবে না। তিনি সকল প্রশংসনীয় গুণের একক অধিকারী।



তারপর আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী, অন্ধকার এবং আলো সৃষ্টির কথা বলেছেন যা তাওহীদে রুবুবিয়্যাহ। অর্থাৎ সকল কিছুর স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, দ্বিতীয় কেউ নেই। তা ভাল হোক আর মন্দ হোক। আয়াতে الظُّلُمٰتِ ‘অন্ধকারসমূহ’ শব্দটি বহুবচন আর النُّوْرَ ‘আলো’ শব্দটি একবচন উল্লেখ করা হয়েছে। এ অন্ধকার ও আলোতে পঞ্চইন্দ্রিয় অনুধাবনযোগ্য দিন-রাত চন্দ্র-সূর্য ইত্যাদির সাথে আধ্যাত্মিক অন্ধকার ও আলো শামিল। যেমন অজ্ঞতা, শির্ক ও অন্যায়ের অন্ধকার। আর জ্ঞান, ঈমান, তাওহীদ ও আনুগত্যের আলো। এসব কিছু প্রমাণ করে স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, তিনিই সকল ইবাদত পাওয়ার একমাত্র হকদার।



এত সুন্দরভাবে আল্লাহ তা‘আলার তাওহীদ ও পরিচয় তুলে ধরার পরেও একশ্রেণির মানুষ আল্লাহ তা‘আলার সাথে কুফরী করে এবং তাঁর সাথে অংশী স্থাপন করে। তারা বলে: আল্লাহ তা‘আলার নাকি স্ত্রী ও সন্তান রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা এ থেকে পবিত্র ও মহান।



তারপর আমাদের আদি পিতা আদম (আঃ)-এর সৃষ্টির উপাদান মাটির কথা স্মরণ করে দিচ্ছেন, আর আমরা তারই বংশধর। সে হিসেবে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “তোমাদেরকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছি। তারপর সকলের একটি নির্দিষ্ট আয়ু (জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়) নির্ধারণ করে দিয়েছি, আর একটি সময় তথা কিয়ামতের নির্দিষ্ট সময় আল্লাহর কাছে আছে যা তিনি ছাড়া অন্য কেউ জানেন না।” অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(إِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ رَبِّيْ ج لَا يُجَلِّيْهَا لِوَقْتِهَآ إِلَّا هُوَ)



‘এ বিষয়ের জ্ঞান শুধু আমার প্রতিপালকেরই আছে। তিনিই যথাকালে সেটা প্রকাশ করবেন।’(সূরা আ‘রাফ ৭:১৮৭)



(وَهُوَ اللّٰهُ فِي السَّمٰوٰتِ وَفِي الْأَرْضِ)



‘আসমানসমূহ ও জমিনে তিনিই আল্লাহ’এ আয়াতের ব্যাপারে মুফাসসিরদের উক্তিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সঠিক উক্তি হল: আকাশে যারা রয়েছে এবং জমিনে যারা রয়েছে সকলের মা‘বূদ আল্লাহ তা‘আলা।



এর প্রমাণে অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَهُوَ الَّذِيْ فِي السَّمَا۬ءِ إِلٰهٌ وَّفِي الْأَرْضِ إِلٰه)



“তিনিই মা‘বূদ আকাশমণ্ডলীতে, তিনিই মা‘বূদ পৃথিবীতে।”(সূরা যুখরুফ ৪৩:৮৪)



ইমাম শাওকানী (রহঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেছেন:



أي هو المعبود أو المالك أو المتصرف في السموات والأرض كما تقول زيد الخليفة في الشرق والغرب



আল্লাহ তা‘আলা আকাশে ও জমিনে একমাত্র মা‘বূদ অথবা মালিক অথবা ক্ষমতাশীল। যেমন বলা হয়, যায়েদ পূর্ব ও পশ্চিমের খলিফা। (ফাতহুল কাদীর, ২/১২৯)



তাফসীর মুয়াসসারে এ অংশের তাফসীর করা হয়েছে:



والله سبحانه هو الإ له المعبود بحق في السموات والأرض



আল্লাহ তা‘আলাই আকাশমণ্ডলী ও জমিনের সত্যিকার মা‘বূদ।



আল্লামা আব্দুর রহমান নাসির আস সা‘দী বলেন:



أي: وهو المألوه المعبود ، في السموات والأرض ، فأهل السماء والأرض ، متعبدون لربهم ، خاضعون لعظمته ، مستكينون لعزه وجلاله ، الملائكة المقربون ، والأنبياء ، والمرسلون ، والصديقون ، والشهداء ، والصالحون



অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলাই আকাশমণ্ডলী ও জমিনের একমাত্র মা‘বূদ। তাই আকাশে ও জমিনে যারা আছে সবাই তাদের রবের ইবাদত করে, তাঁর বড়ত্বের কাছে বিনয়ী হয় এবং তাঁর সম্মান ও মর্যাদার কাছে নতি স্বীকার করে নৈকট্যশীল ফেরেশতাগণ, নাবী, রাসূলগণ, সত্যবাদীগণ, শহীদ ও সৎ কর্ম স¤পাদনকারীগণ। (তাফসীর সা‘দী পৃ: ২৪১-২৪২)



তাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকীদাহ হল, আল্লাহ তা‘আলা আরশের ওপরে আছেন। সেখানে থেকে তাঁর দর্শন, জ্ঞান, শ্রবণ ও ক্ষমতার দ্বারা সর্বত্র রয়েছেন। তাঁর জ্ঞান, দর্শন, শ্রবণ ও ক্ষমতার বাইরে কিছুই নেই। গভীর অন্ধকার রাতে কালো পাথরের ওপর কালো পিপিলিকা চলাচল করলেও আল্লাহ তা‘আলার জ্ঞান ও দর্শনের বাইরে নয়।



সুতরাং জাহমিয়াগণ ও অন্যান্য যারা এ আয়াত দ্বারা দলীল গ্রহণ করে থাকে যে, “আল্লাহ তা‘আলা সর্বত্র বিরাজমান” এ ধরণের বিশ্বাস ভুল এবং ভ্রান্ত আকীদাহ।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. সকল প্রশংসা পাওয়ার একমাত্র মালিক আল্লাহ তা‘আলা। আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করা এক প্রকার ইবাদত।

২. স্রষ্টা কেবল তিনিই যিনি ইবাদত পাওয়ার যোগ্য, যিনি সৃষ্টি করতে পারেন না তিনি মা‘বূদ হতে পারে না।

৩. ভাল কাজের জন্য মানুষের প্রশংসা করা বৈধ তবে সীমা অতিক্রম করা যাবে না যাতে আল্লাহ তা‘আলার সমপর্যায়ে যেন না পৌঁছে যায়।

৪. আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক মানুষের নির্দিষ্ট আয়ু নির্ধারণ করে দিয়েছেন যা আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া কেউ জানে না।

৫. আল্লাহ তা‘আলা স্বস্বত্ত্বায় সর্বত্র বিরাজমান নন বরং তিনি স্বস্বত্ত্বায় আরশের ওপরে রয়েছেন।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: সূরায়ে আন'আম মক্কায় এক রাতের মধ্যেই সম্পূর্ণটা একই সাথে অবতীর্ণ হয়। সত্তর হাজার ফেরেশতা এই সূরাটি নিয়ে হাজির হন এবং তাসবীহ পাঠ করতে থাকেন। হযরত আসমা বিনতে ইয়াযীদ (রাঃ) বলেনঃ নবী (সঃ) উষ্ট্রীর উপর সওয়ার ছিলেন। এমতাবস্থায় সূরায়ে আন'আম অবতীর্ণ হচ্ছিল। আমি তাঁর উষ্ট্ৰীটির লাগাম ধরে রেখেছিলাম। অহীর ভারে উষ্ট্রীটির পিঠ এমনভাবে কুঁজো হয়ে যাচ্ছিল যে, মনে হচ্ছিল যেন ওর পিঠের হাড় ভেঙ্গে যাবে। ফেরেশতাগণ আসমান ও যমীনকে পরিবেষ্টন করে রেখেছিলেন। সূরায়ে আনআম অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাসবীহ পড়তে শুরু করেন এবং বলেনঃ “এই সূরার অনুসরণে ফেরেশতাগণ দিগন্ত পর্যন্ত পরিবেষ্টন করে রেখেছিলেন। তাঁদের (আরবী) -এই তাসবীহের গুঞ্জনে আসমান ও যমীন মুখরিত ছিল।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজেও এই তাসবীহ পাঠ করছিলেন। তিনি বলেনঃ “সূরায়ে আনআম একবারেই অবতীর্ণ হয়েছে এবং এটা সত্তর হাজার ফেরেশতার তাসবীহ ও তাহমীদের গুঞ্জনের মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে।”

১-৩ নং আয়াতের তাফসীর:

এখানে মহান আল্লাহ তাঁর পবিত্র সত্তার প্রশংসা করছেন যে, তিনিই আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। যেন তিনি স্বীয় বান্দাদেরকে প্রশংসা করার কথা শিক্ষা দিচ্ছেন। তিনি দিনে আলোককে এবং রাত্রে অন্ধকারকে তাঁর বান্দাদের জন্যে একটা উপকারী বস্তু বলে ঘোষণা দিচ্ছেন। এখানে (আরবী) শব্দটিকে একবচন এবং (আরবী) শব্দটিকে বহুবচনরূপে ব্যবহার করা হয়েছে। কেননা, উৎকৃষ্ট জিনিসকে একবচন রূপেই ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলার উক্তি রয়েছেঃ (আরবী) এবং (আরবী) এখানে (আরবী) শব্দকে একবচন এবং (আরবী) শব্দকে বহুবচন আনা হয়েছে। আর নিজের রাস্তাকে (আরবী) বলে একবচন এনেছেন এবং ভুল রাস্তাগুলোকে (আরবী) বলে বহুবচন এনেছেন। মোটকথা, যদিও আল্লাহর কতকগুলো বান্দা কুফরীতে লিপ্ত হয়ে তার শরীক স্থাপন করেছে এবং তাঁর স্ত্রী ও সন্তান সাব্যস্ত করেছে (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক),তথাপি তিনি এ সবকিছু হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র।

(আরবী) -তিনি সেই প্রভু যিনি তোমাদেরকে মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন অর্থাৎ তোমাদের পিতা হযরত আদম (আঃ)-কে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং মাটিই তার গোশত ও চামড়ার আকার ধারণ করেছিল। অতঃপর তাঁরই মাধ্যমে মানবকে সৃষ্টি করে পূর্ব ও পশ্চিমে ছড়িয়ে দেয়া হয়। তারপর হযরত আদম (আঃ) পূর্ণ শক্তি প্রাপ্ত হন এবং তাঁর মৃত্যুর নির্ধারিত সময়ে পৌছে যান। হযরত হাসান (রঃ)-এর মতে প্রথম (আরবী)। শব্দ দ্বারা মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের সময় বুঝানো হয়েছে। আর দ্বিতীয় (আরবী) শব্দ দ্বারা মৃত্যুর পরে পুনর্জীবন পর্যন্ত সময়কে বুঝানো হয়েছে। (আরবী) হচ্ছে মানুষের চলন্ত বয়স এবং (আরবী) হচ্ছে সারা দুনিয়ার বয়স অর্থাৎ দুনিয়া লয়প্রাপ্ত হওয়া থেকে নিয়ে দারে আখিরাতের সময় আসা পর্যন্ত।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, প্রথম (আরবী) দ্বারা দুনিয়ার সময়কাল এবং (আরবী) দ্বারা মানুষের জীবন হতে মৃত্যু পর্যন্ত সময়কে বুঝানো হয়েছে। এটা যেন আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তি হতেই গ্রহণ করা হয়েছেঃ

(আরবী) অর্থাৎ “তিনি রাত্রিকালে তোমাদেরকে মেরে ফেলেন। এবং দিবা ভাগে তোমরা যা কিছু কর তা তিনি সম্যক অবগত। আর রাত্রিকালে তো তোমরা কিছুই করতে পার না।” (৬:৬০) অর্থাৎ তোমরা সে সময় নিদ্রিত অবস্থায় থাক এবং সেটা হচ্ছে আত্মা বেরিয়ে যাওয়ার রূপ। তারপরে তোমরা জেগে ওঠ, তখন যেন তোমরা তোমাদের সঙ্গী সাথীদের কাছে ফিরে আস। আর তাঁর (আরবী) -এই উক্তির অর্থ এই যে, ঐ সময়টা একমাত্র তিনি ছাড়া আর কেউ জানে না। যেমন তিনি অন্য এক জায়গায় বলেছেনঃ “ওর জ্ঞান একমাত্র আল্লাহরই কাছে। ওর সময় আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানতে পারে না।” অনুরূপভাবে আল্লাহ পাকের উক্তি “হে নবী (সঃ)! লোকেরা তোমাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে যে, ওটা কখন সংঘটিত হবে? তাহলে তোমার ঐ সম্পর্কে কি জ্ঞান আছে? এ জ্ঞানতো একমাত্র আল্লাহরই রয়েছে” -এই উক্তির অর্থ এটাই। তারপর ওর নীচের আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে- “আকাশসমূহ ও পৃথিবীর আল্লাহ তিনিই, তিনি তোমাদের প্রকাশ্য কথা সম্পর্কেও জ্ঞান রাখেন এবং গোপন কথা সম্পর্কেও তার পূর্ণ জ্ঞান রয়েছে, আর তোমরা যা কিছু করছো সেটাও তিনি সম্যক অবগত।” এই আয়াতের তাফসীরকারকগণ প্রথমে জাহমিয়া সম্প্রদায়ের উক্তির অস্বীকৃতির উপর একমত হয়েছেন। অতঃপর তাঁদের পরস্পরের মধ্যেও কিছুটা মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। জাহমিয়াদের উক্তি এই যে, এই আয়াত এই অর্থ বহন করছে যে, আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জায়গাতেই স্বয়ং বিদ্যমান রয়েছেন। অর্থাৎ এই আকীদায় এই কথা গ্রহণ করা হচ্ছে যে, আল্লাহ পাক প্রত্যেক জিনেসের মধ্যে স্বয়ং বিদ্যমান রয়েছেন। সঠিক উক্তি এই যে, আসমান ও যমীনে একমাত্র আল্লাহকেই মান্য করা হয় এবং তাঁরই ইবাদত করা হয়। আকাশে যেসব ফেরেশতা রয়েছে ও যমীনে যেসব মানুষ রয়েছে সবাই তাঁকে মা'বুদ বলে স্বীকার করছে। তাঁকে তারা ‘আল্লাহ’ বলে ডাকতে রয়েছে। কিন্তু জ্বিন ও মানুষের মধ্যে যারা কাফির তারা তাঁকে ভয় করে না। আল্লাহ তাআলা অন্য জায়গায় বলেছেনঃ “তিনিই আকাশসমহেরও আল্লাহ এবং যমীনেরও আল্লাহ।' এই উক্তিরও ভাবার্থ এটাই যে, আসমানে যত কিছু রয়েছে এবং যমীনে যত কিছু রয়েছে সবারই তিনি আল্লাহ। অর্থ এটা নয় যে, আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে ওগুলোই আল্লাহ। এর উপর ভিত্তি করেই নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, তিনি তোমাদের গোপন কথাও জানেন এবং প্রকাশ্য কথাও জানেন।

দ্বিতীয় উক্তি এই যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে-আল্লাহ তিনিই যিনি আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত প্রকাশ্য ও গোপনীয় কথা জানেন এবং এটা তার (আরবী) -এই উক্তির সাথে সম্পর্কযুক্ত। এর অন্তর্নিহিত অর্থ এটাই হচ্ছে যে, তিনিই আল্লাহ যিনি আকাশসমূহে. ও পৃথিবীতে তোমাদের সমস্ত কথা জানেন এবং তোমরা যা কিছু কর ওর সংবাদ তিনি রাখেন।

তৃতীয় উক্তি এই যে, (আরবী) -এটা বা (আরবী) পূর্ণ বিরতি। এর পরে পুনরায় (আরবী)-এর সূচনা হচ্ছে। অর্থাৎ (আরবী) হচ্ছে (আরবী) এবং (আরবী) হচ্ছে আর ইবনে জারীর (রঃ)-এর মত এটাই।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।