আল কুরআন


সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 2)

সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 2)



হরকত ছাড়া:

هو الذي خلقكم من طين ثم قضى أجلا وأجل مسمى عنده ثم أنتم تمترون ﴿٢﴾




হরকত সহ:

هُوَ الَّذِیْ خَلَقَکُمْ مِّنْ طِیْنٍ ثُمَّ قَضٰۤی اَجَلًا ؕ وَ اَجَلٌ مُّسَمًّی عِنْدَهٗ ثُمَّ اَنْتُمْ تَمْتَرُوْنَ ﴿۲﴾




উচ্চারণ: হুওয়াল্লাযী খালাকাকুম মিন তীনিন ছুম্মা কাদাআজালাওঁ ওয়া আজালুম মুছাম্মান ‘ইনদাহূছু ম্মা আনতুম তামতারূন।




আল বায়ান: তিনিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন কাদা মাটি থেকে তারপর নির্ধারণ করেছেন একটি কাল, আর তাঁর কাছে আছে একটি নির্দিষ্ট কাল, তারপর তোমরা সন্দেহ কর।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২. তিনিই তোমাদেরকে কাদামাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন(১), তারপর একটা সময় নির্দিষ্ট করেছেন এবং আর একটি নির্ধারিত সময় আছে যা তিনিই জানেন, এরপরও তোমরা সন্দেহ কর(২)।




তাইসীরুল ক্বুরআন: যিনি মাটি থেকে তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন অতঃপর (তোমাদের জীবনের জন্য) একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ নির্ধারিত করেছেন, এছাড়া আরেকটি নির্ধারিত মেয়াদ আছে (যে সম্পর্কিত জ্ঞান আছে) তাঁর কাছে, কিন্তু তোমরা সন্দেহই করে চলেছ।




আহসানুল বায়ান: (২) তিনি তোমাদেরকে মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন,[1] অতঃপর একটি কাল নির্দিষ্ট করেছেন[2] এবং আর একটি নির্ধারিত সময়সীমা আছে যা তিনিই জ্ঞাত,[3] তারপরেও তোমরা সন্দেহ কর।[4]



মুজিবুর রহমান: অথচ তিনি তোমাদের মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাদের জীবনের জন্য একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ নির্ধারণ করেছেন, এছাড়া আরও একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ তাঁর নিকট নির্ধারিত রয়েছে, কিন্তু এরপরেও তোমরা সন্দেহ করে থাক।



ফযলুর রহমান: তিনি সেই সত্তা যিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তারপর একটি সময় নির্ধারণ করেছেন। আরেকটি নির্ধারিত সময় তাঁর কাছে আছে। তারপরও তোমরা সন্দেহ কর।



মুহিউদ্দিন খান: তিনিই তোমাদেরকে মাটির দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর নির্দিষ্টকাল নির্ধারণ করেছেন। আর অপর নির্দিষ্টকাল আল্লাহর কাছে আছে। তথাপি তোমরা সন্দেহ কর।



জহুরুল হক: তিনিই সেইজন যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন কাদা থেকে তারপর তিনি নির্ধারিত করেছেন একটি আয়ুস্কাল, আর তাঁর কাছে নির্ধারিত রয়েছে একটি কাল, তবু তোমরা সন্দেহ করো!



Sahih International: It is He who created you from clay and then decreed a term and a specified time [known] to Him; then [still] you are in dispute.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২. তিনিই তোমাদেরকে কাদামাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন(১), তারপর একটা সময় নির্দিষ্ট করেছেন এবং আর একটি নির্ধারিত সময় আছে যা তিনিই জানেন, এরপরও তোমরা সন্দেহ কর(২)।


তাফসীর:

(১) প্রথম আয়াতে বৃহৎ জগত অর্থাৎ সমগ্র বিশ্বের বৃহত্তম বস্তুগুলোকে আল্লাহ্ তা'আলার সৃষ্ট ও মুখাপেক্ষী বলে মানুষকে নির্ভুল একত্ববাদের শিক্ষা দেয়া হয়েছে। অতঃপর দ্বিতীয় আয়াতে মানুষকে বলা হয়েছে যে, তোমার অস্তিত্ব স্বয়ং একটি ক্ষুদ্র জগৎবিশেষ। যদি এরই সূচনা, পরিণতি ও বাসস্থানের প্রতি লক্ষ্য করা হয়, তবে একত্ববাদ একটা বাস্তব সত্য হয়ে সামনে ফুটে উঠবে। আল্লাহ বলেনঃ “আল্লাহই সে সত্তা যিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃজন করেছেন।” আল্লাহ্ তা'আলা আদম আলাইহিস সালাম-কে একটি বিশেষ পরিমাণ মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। [ইবন কাসীর] সমগ্র পৃথিবীর অংশ এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ কারণেই আদম-সন্তানরা বর্ণ, আকার, চরিত্র ও অভ্যাসে বিভিন্ন।

কেউ কৃষ্ণবর্ণ, কেউ শ্বেতবর্ণ, কেউ লালবর্ণ, কেউ কঠোর, কেউ নম্র, কেউ পবিত্র-স্বভাব বিশিষ্ট এবং কেউ অপবিত্র স্বভাবের হয়ে থাকে। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা আদমকে এমন এক মুষ্টি মাটি থেকে তৈরী করেছেন যে মুষ্টি সমস্ত মাটি থেকে নেয়া হয়েছে। তাই আদম সন্তান মাটির মতই হয়েছে। তাদের মধ্যে লাল, সাদা, কালো, আবার এর মাঝামাঝি রয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ নম্র, কেউ চিন্তাগ্রস্ত, কেউ মন্দ, কেউ ভাল, কেউ এর মাঝামাঝি পর্যায়ের রয়েছে। [আবুদাউদ: ৪৬৯৩]


(২) পূর্বে আদমসন্তানদের সৃষ্টির সূচনা বর্ণনা করা হয়েছে। এখন এর পরিণতির দুটি মঞ্জিল উল্লেখ করা হয়েছে। একটি মানবের ব্যক্তিগত পরিণতি, যাকে মৃত্যু বলা হয়। অপরটি সমগ্র মানবগোষ্ঠীর ও তার উপকারে নিয়োজিত সৃষ্টিজগত- সবার সামষ্টিক পরিণতি, যাকে কেয়ামত বলা হয়। প্রথমটির ব্যাপারে বলেছেন, (ثُمَّ قَضَىٰ أَجَلًا) অর্থাৎ মানব সৃষ্টির পর আল্লাহ্ তা'আলা তার স্থায়িত্ব ও আয়ুস্কালের জন্য একটি মেয়াদ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এ মেয়াদের শেষ প্রান্তে পৌছার নাম মৃত্যু। এ মেয়াদ মানবের জানা না থাকলেও এর প্রকৃতি সম্পর্কে মানুষ অবগত। কেননা, সে সর্বদা, সর্বত্র আশ-পাশের আদম-সন্তানদেরকে মারা যেতে দেখে। এরপর সমগ্র বিশ্বের পরিণতি অর্থাৎ কেয়ামতের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, “আরো একটি মেয়াদ নির্দিষ্ট আছে, যা একমাত্র তার কাছেই” অর্থাৎ আল্লাহই জানেন, এ মেয়াদের পূর্ণ জ্ঞান ফিরিশতাদের নেই এবং মানুষেরও নেই।

সারকথা এই যে, প্রথম আয়াতে বৃহৎ জগত অর্থাৎ গোটা বিশ্বের অবস্থা সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তা আল্লাহ্ তাআলা কর্তৃক সৃষ্ট ও নির্মিত। দ্বিতীয় আয়াতে এমনিভাবে ক্ষুদ্র জগৎ অর্থাৎ মানুষ যে আল্লাহর সৃষ্টজীব, তা বর্ণিত হয়েছে। এরপর মানুষকে শৈথিল থেকে জাগ্রত করার জন্য বলা হয়েছে যে, প্রত্যেক মানুষের একটি বিশেষ আয়ুষ্কাল রয়েছে, যার পর তার মৃত্যু অবধারিত। প্রতিটি মানুষ এ বিষয়টি সর্বক্ষণ নিজের আশ-পাশে প্রত্যক্ষ করে। এটা যেহেতু সত্য, সেহেতু এরপরও আরেকটি সময় তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে। যার ঘোষণা আল্লাহ নিজেই দিয়েছেন। সুতরাং এ ব্যাপারে সন্দেহ থাকতে পারে না। [ইবন কাসীর, সা’দী, আল-মুনীর, ফাতহুল কাদীর, আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর] এ কারণে আয়াতের শেষভাগে কিয়ামতের উপযুক্ততা প্রকাশার্থে বলা হয়েছে (ثُمَّ أَنْتُمْ تَمْتَرُونَ) অর্থাৎ এহেন সুস্পষ্ট যুক্তি-প্রমাণ সত্বেও তোমরা কেয়ামত সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ কর! এটা অনুচিত।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২) তিনি তোমাদেরকে মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন,[1] অতঃপর একটি কাল নির্দিষ্ট করেছেন[2] এবং আর একটি নির্ধারিত সময়সীমা আছে যা তিনিই জ্ঞাত,[3] তারপরেও তোমরা সন্দেহ কর।[4]


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, তোমাদের পিতা আদম (আঃ)-কে যিনি তোমাদের মূল এবং যাঁর থেকেই তোমাদের আবির্ভাব ঘটেছে। এর আর একটি অর্থ এও হতে পারে যে, তোমরা যে খাদ্য খাও তা সবই মাটি থেকেই জন্মায় এবং সেই খাদ্য থেকেই বীর্য তৈরী হয়; যা মায়ের গর্ভাশয়ে গিয়ে মানুষ সৃষ্টির কারণ হয়। এই হিসাবে তোমাদেরও সৃষ্টি মাটি থেকেই।

[2] অর্থাৎ, মৃত্যুর।

[3] অর্থাৎ, কিয়াতের সময়। এর জ্ঞান কেবল আল্লাহই রাখেন। অর্থাৎ, প্রথম ‘আজাল’ (নির্দিষ্টকাল) বলতে জন্ম থেকে নিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের বয়সকে বুঝানো হয়েছে। আর দ্বিতীয় ‘আজাল মুসাম্মা’ (নির্ধারিত সময়সীমা) বলতে মানুষের মৃত্যু থেকে নিয়ে কিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত দুনিয়ার সম্পূর্ণ বয়সকে বুঝানো হয়েছে। যার পর সে সম্পূর্ণ রূপে বিনাশ হয়ে যাবে এবং দ্বিতীয় আর এক দুনিয়া অর্থাৎ, আখেরাতের জীবন শুরু হয়ে যাবে।

[4] অর্থাৎ, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে। যেমন, কাফের ও মুশরিকরা বলত যে, ‘যখন আমরা মরে মাটিতে মিশে যাব, তখন কিভাবে আমাদেরকে পুনরায় জীবিত করা সম্ভব হবে?’ মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে সত্তা তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছে, সেই সত্তাই তোমাদেরকে দ্বিতীয়বার জীবিত করবে।’ (সূরা ইয়াসীন ৭৮-৭৯)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: নামকরণ, অবতরণের স্থান ও প্রেক্ষাপট:



আন্‘আম শব্দের শাব্দিক অর্থ হল: গৃহপালিত পশু। অত্র সূরার ১৩৬, ১৩৮, ১৪২ নং আয়াতে (الأنعام) আল-আন্‘আম শব্দটি উল্লেখ রয়েছে বিধায় উক্ত নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে। তাছাড়া এ সূরাতে গৃহপালিত পশু সংক্রান্ত বিধি-বিধান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। কারণ মক্কার মুশরিকরা কিছু পশু আল্লাহ তা‘আলার জন্য নির্ধারণ করত, কিছু নিজেদের জন্য হারাম করে নিত, আবার কিছু পশু নিজেদের নারী-পুরুষের মাঝে ব্যবধান করতঃ হারাম করে নিত।



ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: সূরা আন্‘আম মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। (সনদ সহীহ, ইবনে কাসীর, ৩/২৭২)



আল্লামা সা‘লাবী (রহঃ) বলেন: সূরা আন্‘আম মক্কায় অবতীর্ণ হয়। তবে ছয়টি আয়াত মদীনায় অবতীর্ণ হয়। তা হল



(وَمَا قَدَرُوا اللّٰهَ حَقَّ قَدْرِه۪)



-সহ পরের দু’টি আয়াত এবং



(قُلْ تَعَالَوْا أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ) আয়াত সহ পরের দু’টি আয়াত। অর্থাৎ ৯১-৯৩ নং আয়াত ও ১৫১-১৫৩ নং আয়াত।



ইমাম কুরতুবী (রহঃ) ইবনু আব্বাস ও কাতাদাহ (রহঃ) থেকে একটি বর্ণনা নিয়ে এসেছেন তাতে তাঁরা বলেন: দু’টি আয়াত ব্যতীত সম্পূর্ণ সূরা মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। সে দু’টি আয়াত হল ৯১ ও ১৪১ নং। (ফাতহুল কাদীর, ২/১২৬)



এ সূরা অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট ও ফযীলত সম্পর্কে যেসব বর্ণনা পাওয়া যায় সকল বর্ণনাই দুর্বল। (ফাতহুল কাদীর, ২/১২৬) তবে ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে একটি বর্ণনা পাওয়া যায়, তিনি বলেন: আরবের অশিক্ষিত লোকেদের শিক্ষা দিতে যদি তুমি আনন্দ পাও তাহলে সূরা আন্‘আমের ১৩০ নং আয়াতের পরের আয়াতগুলো পড়। (সহীহ বুখারী হা: ৩৫২৪)



অত্র সূরার শুরুতে তাওহীদ, আল্লাহ তা‘আলার মর্যাদা, মাঝে ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রকৃত মা‘বূদ চেনার ঐতিহাসিক ঘটনা, হালাল-হারামের বিধান এবং শেষ দিকে মক্কার মুশরিকদের শির্কের ধরণ ও পদ্ধতি আর যেসব প্রাণী হারাম করা হয়েছে তা-সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিধানাবলী অত্র সূরায় স্থান পেয়েছে।



১-৩ নং আয়াতের তাফসীর:



আল্লাহ তা‘আলা সূরাটি শুরু করেছেন দু’ প্রকার তাওহীদ দ্বারা। প্রথমেই নিজের প্রশংসা করলেন যা তাওহীদে উলুহিয়্যাহ, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল সর্বাধিক প্রশংসার অধিকারী একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। মানুষ একমাত্র তাঁর প্রশংসা করবে, কেননা প্রশংসা করা একটি ইবাদত। তবে ভাল ও সৎ কাজে মানুষেরও প্রশংসা করা যায়। সৎ কাজ ও একে অন্যের প্রতি দয়াদ্রতার জন্য মানুষের প্রশংসা করা আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসার পরিপন্থী নয়। কারণ হাদীসে এসেছে:



مَنْ لَمْ يَشْكُرِ النَّاسَ لَمْ يَشْكُرِ اللّٰهَ



“যে মানুষের প্রশংসা করল না সে আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করল না।”(নাসায়ী হা: ১৯৫৫, সহীহ) কেননা ভাল কাজে মানুষের প্রশংসা করা মূলত আল্লাহ তা‘আলারই প্রশংসা করা। এতে আরো ইঙ্গিত রয়েছে: মানুষ আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করুক আর নাই করুক আল্লাহ তা‘আলা তাঁর স্বত্ত্বা ও গুণে প্রশংসনীয়। মানুষ তাঁর প্রশংসা করলে মর্যাদা বাড়বেও না, আর প্রশংসা না করলে মর্যাদা ক্ষুণœও হবে না। তিনি সকল প্রশংসনীয় গুণের একক অধিকারী।



তারপর আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী, অন্ধকার এবং আলো সৃষ্টির কথা বলেছেন যা তাওহীদে রুবুবিয়্যাহ। অর্থাৎ সকল কিছুর স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, দ্বিতীয় কেউ নেই। তা ভাল হোক আর মন্দ হোক। আয়াতে الظُّلُمٰتِ ‘অন্ধকারসমূহ’ শব্দটি বহুবচন আর النُّوْرَ ‘আলো’ শব্দটি একবচন উল্লেখ করা হয়েছে। এ অন্ধকার ও আলোতে পঞ্চইন্দ্রিয় অনুধাবনযোগ্য দিন-রাত চন্দ্র-সূর্য ইত্যাদির সাথে আধ্যাত্মিক অন্ধকার ও আলো শামিল। যেমন অজ্ঞতা, শির্ক ও অন্যায়ের অন্ধকার। আর জ্ঞান, ঈমান, তাওহীদ ও আনুগত্যের আলো। এসব কিছু প্রমাণ করে স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, তিনিই সকল ইবাদত পাওয়ার একমাত্র হকদার।



এত সুন্দরভাবে আল্লাহ তা‘আলার তাওহীদ ও পরিচয় তুলে ধরার পরেও একশ্রেণির মানুষ আল্লাহ তা‘আলার সাথে কুফরী করে এবং তাঁর সাথে অংশী স্থাপন করে। তারা বলে: আল্লাহ তা‘আলার নাকি স্ত্রী ও সন্তান রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা এ থেকে পবিত্র ও মহান।



তারপর আমাদের আদি পিতা আদম (আঃ)-এর সৃষ্টির উপাদান মাটির কথা স্মরণ করে দিচ্ছেন, আর আমরা তারই বংশধর। সে হিসেবে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “তোমাদেরকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছি। তারপর সকলের একটি নির্দিষ্ট আয়ু (জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়) নির্ধারণ করে দিয়েছি, আর একটি সময় তথা কিয়ামতের নির্দিষ্ট সময় আল্লাহর কাছে আছে যা তিনি ছাড়া অন্য কেউ জানেন না।” অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(إِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ رَبِّيْ ج لَا يُجَلِّيْهَا لِوَقْتِهَآ إِلَّا هُوَ)



‘এ বিষয়ের জ্ঞান শুধু আমার প্রতিপালকেরই আছে। তিনিই যথাকালে সেটা প্রকাশ করবেন।’(সূরা আ‘রাফ ৭:১৮৭)



(وَهُوَ اللّٰهُ فِي السَّمٰوٰتِ وَفِي الْأَرْضِ)



‘আসমানসমূহ ও জমিনে তিনিই আল্লাহ’এ আয়াতের ব্যাপারে মুফাসসিরদের উক্তিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সঠিক উক্তি হল: আকাশে যারা রয়েছে এবং জমিনে যারা রয়েছে সকলের মা‘বূদ আল্লাহ তা‘আলা।



এর প্রমাণে অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَهُوَ الَّذِيْ فِي السَّمَا۬ءِ إِلٰهٌ وَّفِي الْأَرْضِ إِلٰه)



“তিনিই মা‘বূদ আকাশমণ্ডলীতে, তিনিই মা‘বূদ পৃথিবীতে।”(সূরা যুখরুফ ৪৩:৮৪)



ইমাম শাওকানী (রহঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেছেন:



أي هو المعبود أو المالك أو المتصرف في السموات والأرض كما تقول زيد الخليفة في الشرق والغرب



আল্লাহ তা‘আলা আকাশে ও জমিনে একমাত্র মা‘বূদ অথবা মালিক অথবা ক্ষমতাশীল। যেমন বলা হয়, যায়েদ পূর্ব ও পশ্চিমের খলিফা। (ফাতহুল কাদীর, ২/১২৯)



তাফসীর মুয়াসসারে এ অংশের তাফসীর করা হয়েছে:



والله سبحانه هو الإ له المعبود بحق في السموات والأرض



আল্লাহ তা‘আলাই আকাশমণ্ডলী ও জমিনের সত্যিকার মা‘বূদ।



আল্লামা আব্দুর রহমান নাসির আস সা‘দী বলেন:



أي: وهو المألوه المعبود ، في السموات والأرض ، فأهل السماء والأرض ، متعبدون لربهم ، خاضعون لعظمته ، مستكينون لعزه وجلاله ، الملائكة المقربون ، والأنبياء ، والمرسلون ، والصديقون ، والشهداء ، والصالحون



অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলাই আকাশমণ্ডলী ও জমিনের একমাত্র মা‘বূদ। তাই আকাশে ও জমিনে যারা আছে সবাই তাদের রবের ইবাদত করে, তাঁর বড়ত্বের কাছে বিনয়ী হয় এবং তাঁর সম্মান ও মর্যাদার কাছে নতি স্বীকার করে নৈকট্যশীল ফেরেশতাগণ, নাবী, রাসূলগণ, সত্যবাদীগণ, শহীদ ও সৎ কর্ম স¤পাদনকারীগণ। (তাফসীর সা‘দী পৃ: ২৪১-২৪২)



তাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকীদাহ হল, আল্লাহ তা‘আলা আরশের ওপরে আছেন। সেখানে থেকে তাঁর দর্শন, জ্ঞান, শ্রবণ ও ক্ষমতার দ্বারা সর্বত্র রয়েছেন। তাঁর জ্ঞান, দর্শন, শ্রবণ ও ক্ষমতার বাইরে কিছুই নেই। গভীর অন্ধকার রাতে কালো পাথরের ওপর কালো পিপিলিকা চলাচল করলেও আল্লাহ তা‘আলার জ্ঞান ও দর্শনের বাইরে নয়।



সুতরাং জাহমিয়াগণ ও অন্যান্য যারা এ আয়াত দ্বারা দলীল গ্রহণ করে থাকে যে, “আল্লাহ তা‘আলা সর্বত্র বিরাজমান” এ ধরণের বিশ্বাস ভুল এবং ভ্রান্ত আকীদাহ।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. সকল প্রশংসা পাওয়ার একমাত্র মালিক আল্লাহ তা‘আলা। আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করা এক প্রকার ইবাদত।

২. স্রষ্টা কেবল তিনিই যিনি ইবাদত পাওয়ার যোগ্য, যিনি সৃষ্টি করতে পারেন না তিনি মা‘বূদ হতে পারে না।

৩. ভাল কাজের জন্য মানুষের প্রশংসা করা বৈধ তবে সীমা অতিক্রম করা যাবে না যাতে আল্লাহ তা‘আলার সমপর্যায়ে যেন না পৌঁছে যায়।

৪. আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক মানুষের নির্দিষ্ট আয়ু নির্ধারণ করে দিয়েছেন যা আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া কেউ জানে না।

৫. আল্লাহ তা‘আলা স্বস্বত্ত্বায় সর্বত্র বিরাজমান নন বরং তিনি স্বস্বত্ত্বায় আরশের ওপরে রয়েছেন।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: সূরায়ে আন'আম মক্কায় এক রাতের মধ্যেই সম্পূর্ণটা একই সাথে অবতীর্ণ হয়। সত্তর হাজার ফেরেশতা এই সূরাটি নিয়ে হাজির হন এবং তাসবীহ পাঠ করতে থাকেন। হযরত আসমা বিনতে ইয়াযীদ (রাঃ) বলেনঃ নবী (সঃ) উষ্ট্রীর উপর সওয়ার ছিলেন। এমতাবস্থায় সূরায়ে আন'আম অবতীর্ণ হচ্ছিল। আমি তাঁর উষ্ট্ৰীটির লাগাম ধরে রেখেছিলাম। অহীর ভারে উষ্ট্রীটির পিঠ এমনভাবে কুঁজো হয়ে যাচ্ছিল যে, মনে হচ্ছিল যেন ওর পিঠের হাড় ভেঙ্গে যাবে। ফেরেশতাগণ আসমান ও যমীনকে পরিবেষ্টন করে রেখেছিলেন। সূরায়ে আনআম অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাসবীহ পড়তে শুরু করেন এবং বলেনঃ “এই সূরার অনুসরণে ফেরেশতাগণ দিগন্ত পর্যন্ত পরিবেষ্টন করে রেখেছিলেন। তাঁদের (আরবী) -এই তাসবীহের গুঞ্জনে আসমান ও যমীন মুখরিত ছিল।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজেও এই তাসবীহ পাঠ করছিলেন। তিনি বলেনঃ “সূরায়ে আনআম একবারেই অবতীর্ণ হয়েছে এবং এটা সত্তর হাজার ফেরেশতার তাসবীহ ও তাহমীদের গুঞ্জনের মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে।”

১-৩ নং আয়াতের তাফসীর:

এখানে মহান আল্লাহ তাঁর পবিত্র সত্তার প্রশংসা করছেন যে, তিনিই আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। যেন তিনি স্বীয় বান্দাদেরকে প্রশংসা করার কথা শিক্ষা দিচ্ছেন। তিনি দিনে আলোককে এবং রাত্রে অন্ধকারকে তাঁর বান্দাদের জন্যে একটা উপকারী বস্তু বলে ঘোষণা দিচ্ছেন। এখানে (আরবী) শব্দটিকে একবচন এবং (আরবী) শব্দটিকে বহুবচনরূপে ব্যবহার করা হয়েছে। কেননা, উৎকৃষ্ট জিনিসকে একবচন রূপেই ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলার উক্তি রয়েছেঃ (আরবী) এবং (আরবী) এখানে (আরবী) শব্দকে একবচন এবং (আরবী) শব্দকে বহুবচন আনা হয়েছে। আর নিজের রাস্তাকে (আরবী) বলে একবচন এনেছেন এবং ভুল রাস্তাগুলোকে (আরবী) বলে বহুবচন এনেছেন। মোটকথা, যদিও আল্লাহর কতকগুলো বান্দা কুফরীতে লিপ্ত হয়ে তার শরীক স্থাপন করেছে এবং তাঁর স্ত্রী ও সন্তান সাব্যস্ত করেছে (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক),তথাপি তিনি এ সবকিছু হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র।

(আরবী) -তিনি সেই প্রভু যিনি তোমাদেরকে মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন অর্থাৎ তোমাদের পিতা হযরত আদম (আঃ)-কে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং মাটিই তার গোশত ও চামড়ার আকার ধারণ করেছিল। অতঃপর তাঁরই মাধ্যমে মানবকে সৃষ্টি করে পূর্ব ও পশ্চিমে ছড়িয়ে দেয়া হয়। তারপর হযরত আদম (আঃ) পূর্ণ শক্তি প্রাপ্ত হন এবং তাঁর মৃত্যুর নির্ধারিত সময়ে পৌছে যান। হযরত হাসান (রঃ)-এর মতে প্রথম (আরবী)। শব্দ দ্বারা মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের সময় বুঝানো হয়েছে। আর দ্বিতীয় (আরবী) শব্দ দ্বারা মৃত্যুর পরে পুনর্জীবন পর্যন্ত সময়কে বুঝানো হয়েছে। (আরবী) হচ্ছে মানুষের চলন্ত বয়স এবং (আরবী) হচ্ছে সারা দুনিয়ার বয়স অর্থাৎ দুনিয়া লয়প্রাপ্ত হওয়া থেকে নিয়ে দারে আখিরাতের সময় আসা পর্যন্ত।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, প্রথম (আরবী) দ্বারা দুনিয়ার সময়কাল এবং (আরবী) দ্বারা মানুষের জীবন হতে মৃত্যু পর্যন্ত সময়কে বুঝানো হয়েছে। এটা যেন আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তি হতেই গ্রহণ করা হয়েছেঃ

(আরবী) অর্থাৎ “তিনি রাত্রিকালে তোমাদেরকে মেরে ফেলেন। এবং দিবা ভাগে তোমরা যা কিছু কর তা তিনি সম্যক অবগত। আর রাত্রিকালে তো তোমরা কিছুই করতে পার না।” (৬:৬০) অর্থাৎ তোমরা সে সময় নিদ্রিত অবস্থায় থাক এবং সেটা হচ্ছে আত্মা বেরিয়ে যাওয়ার রূপ। তারপরে তোমরা জেগে ওঠ, তখন যেন তোমরা তোমাদের সঙ্গী সাথীদের কাছে ফিরে আস। আর তাঁর (আরবী) -এই উক্তির অর্থ এই যে, ঐ সময়টা একমাত্র তিনি ছাড়া আর কেউ জানে না। যেমন তিনি অন্য এক জায়গায় বলেছেনঃ “ওর জ্ঞান একমাত্র আল্লাহরই কাছে। ওর সময় আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানতে পারে না।” অনুরূপভাবে আল্লাহ পাকের উক্তি “হে নবী (সঃ)! লোকেরা তোমাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে যে, ওটা কখন সংঘটিত হবে? তাহলে তোমার ঐ সম্পর্কে কি জ্ঞান আছে? এ জ্ঞানতো একমাত্র আল্লাহরই রয়েছে” -এই উক্তির অর্থ এটাই। তারপর ওর নীচের আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে- “আকাশসমূহ ও পৃথিবীর আল্লাহ তিনিই, তিনি তোমাদের প্রকাশ্য কথা সম্পর্কেও জ্ঞান রাখেন এবং গোপন কথা সম্পর্কেও তার পূর্ণ জ্ঞান রয়েছে, আর তোমরা যা কিছু করছো সেটাও তিনি সম্যক অবগত।” এই আয়াতের তাফসীরকারকগণ প্রথমে জাহমিয়া সম্প্রদায়ের উক্তির অস্বীকৃতির উপর একমত হয়েছেন। অতঃপর তাঁদের পরস্পরের মধ্যেও কিছুটা মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। জাহমিয়াদের উক্তি এই যে, এই আয়াত এই অর্থ বহন করছে যে, আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জায়গাতেই স্বয়ং বিদ্যমান রয়েছেন। অর্থাৎ এই আকীদায় এই কথা গ্রহণ করা হচ্ছে যে, আল্লাহ পাক প্রত্যেক জিনেসের মধ্যে স্বয়ং বিদ্যমান রয়েছেন। সঠিক উক্তি এই যে, আসমান ও যমীনে একমাত্র আল্লাহকেই মান্য করা হয় এবং তাঁরই ইবাদত করা হয়। আকাশে যেসব ফেরেশতা রয়েছে ও যমীনে যেসব মানুষ রয়েছে সবাই তাঁকে মা'বুদ বলে স্বীকার করছে। তাঁকে তারা ‘আল্লাহ’ বলে ডাকতে রয়েছে। কিন্তু জ্বিন ও মানুষের মধ্যে যারা কাফির তারা তাঁকে ভয় করে না। আল্লাহ তাআলা অন্য জায়গায় বলেছেনঃ “তিনিই আকাশসমহেরও আল্লাহ এবং যমীনেরও আল্লাহ।' এই উক্তিরও ভাবার্থ এটাই যে, আসমানে যত কিছু রয়েছে এবং যমীনে যত কিছু রয়েছে সবারই তিনি আল্লাহ। অর্থ এটা নয় যে, আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে ওগুলোই আল্লাহ। এর উপর ভিত্তি করেই নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, তিনি তোমাদের গোপন কথাও জানেন এবং প্রকাশ্য কথাও জানেন।

দ্বিতীয় উক্তি এই যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে-আল্লাহ তিনিই যিনি আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত প্রকাশ্য ও গোপনীয় কথা জানেন এবং এটা তার (আরবী) -এই উক্তির সাথে সম্পর্কযুক্ত। এর অন্তর্নিহিত অর্থ এটাই হচ্ছে যে, তিনিই আল্লাহ যিনি আকাশসমূহে. ও পৃথিবীতে তোমাদের সমস্ত কথা জানেন এবং তোমরা যা কিছু কর ওর সংবাদ তিনি রাখেন।

তৃতীয় উক্তি এই যে, (আরবী) -এটা বা (আরবী) পূর্ণ বিরতি। এর পরে পুনরায় (আরবী)-এর সূচনা হচ্ছে। অর্থাৎ (আরবী) হচ্ছে (আরবী) এবং (আরবী) হচ্ছে আর ইবনে জারীর (রঃ)-এর মত এটাই।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।