সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 1)
হরকত ছাড়া:
الحمد لله الذي خلق السموات والأرض وجعل الظلمات والنور ثم الذين كفروا بربهم يعدلون ﴿١﴾
হরকত সহ:
اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِیْ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضَ وَ جَعَلَ الظُّلُمٰتِ وَ النُّوْرَ ۬ؕ ثُمَّ الَّذِیْنَ کَفَرُوْا بِرَبِّهِمْ یَعْدِلُوْنَ ﴿۱﴾
উচ্চারণ: আলহামদুলিল্লা-হিল্লাযী খালকাছছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদা ওয়া জা‘আলাজজু লুমাতি ওয়াননূরা ছু ম্মাল্লাযীনা কাফারূ বিরাব্বিহীম ইয়া‘দিলূন।
আল বায়ান: সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি সৃষ্টি করেছেন আসমান ও যমীন এবং সৃষ্টি করেছেন অন্ধকার ও আলো। তারপর কাফিররা তাদের রবের সমতুল্য স্থির করে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১. সকল প্রশংসা আল্লাহরই(১) যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, আর সৃষ্টি করেছেন অন্ধকার ও আলো।(২) এরপরও কাফেরগণ তাদের রব-এর সমকক্ষ দাঁড় করায়।(৩)
তাইসীরুল ক্বুরআন: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন আর সৃষ্টি করেছেন অন্ধকার ও আলো, এতদসত্ত্বেও যারা কুফরী করেছে তারা (অন্যকে) তাদের প্রতিপালকের সমকক্ষ দাঁড় করিয়েছে।
আহসানুল বায়ান: (১) প্রশংসা আল্লাহরই যিনি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, আর সৃষ্টি করেছেন অন্ধকার ও আলো।[1] এতদসত্ত্বেও অবিশ্বাসীগণ তাদের প্রতিপালকের সমকক্ষ স্থির করে। [2]
মুজিবুর রহমান: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্য যিনি আকাশসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং সৃষ্টি করেছেন আলো ও অন্ধকার; এ সত্ত্বেও যারা কাফির হয়েছে তারা অপর কিছুকে তাদের রবের সমকক্ষ নিরূপণ করেছে।
ফযলুর রহমান: সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং অন্ধকার ও আলোর উদ্ভব ঘটিয়েছেন। তারপরও অবিশ্বাসীরা তাদের প্রভুর সাথে সমকক্ষ দাঁড় করায়।
মুহিউদ্দিন খান: সর্ববিধ প্রশংসা আল্লাহরই জন্য যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল সৃষ্টি করেছেন এবং অন্ধকার ও আলোর উদ্ভব করেছেন। তথাপি কাফেররা স্বীয় পালনকর্তার সাথে অন্যান্যকে সমতুল্য স্থির করে।
জহুরুল হক: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্র জন্য যিনি মহাকাশমন্ডল ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, আর তিনি তৈরি করেছেন অন্ধকার ও আলো। তবু যারা অবিশ্বাস পোষণ করে তারা তাদের প্রভুর সাথে দাঁড় করায় সমকক্ষ।
Sahih International: [All] praise is [due] to Allah, who created the heavens and the earth and made the darkness and the light. Then those who disbelieve equate [others] with their Lord.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১. সকল প্রশংসা আল্লাহরই(১) যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, আর সৃষ্টি করেছেন অন্ধকার ও আলো।(২) এরপরও কাফেরগণ তাদের রব-এর সমকক্ষ দাঁড় করায়।(৩)
তাফসীর:
(১) এ সূরাটিকে (الْحَمْدُ لِلَّهِ) বাক্য দ্বারা আরম্ভ করা হয়েছে। এতে খবর দেয়া হয়েছে যে, সর্ববিধ প্রশংসা আল্লাহর জন্য। এ খবরের উদ্দেশ্য মানুষকে প্রশংসা শিক্ষা দেয়া। যেন বলা হচ্ছে, হে মানুষ! তোমরা তার জন্যই যাবতীয় হামদ ও শোকর নির্দিষ্ট কর, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, আরও সৃষ্টি করেছেন আসমান ও যমীন। তাঁর সাথে কাউকেও সামান্যতম অংশীদারও করবে না। এ বিশেষ পদ্ধতি শিক্ষাদানের মধ্যে এদিকেও ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, পরিপূর্ণ হামদ বা প্রশংসা একমাত্র তাঁরই, যার কোন শরীক নেই। তাকে ব্যতীত আর যে সমস্ত উপাস্যের ইবাদাত করা হয়, তারা এ হামদ প্রাপ্য নয়। [তাবারী] সুতরাং কেউ প্রশংসা করুক বা না করুক, তিনি স্বীয় ওজুদ বা সত্তার পরাকাষ্ঠার দিক দিয়ে নিজেই প্রশংসনীয়। এ বাক্যের পর আসমান ও যমীন এবং অন্ধকার ও আলো সৃষ্টি করার কথা উল্লেখ করে তার প্রশংসনীয় হওয়ার প্রমাণও ব্যক্ত করা হয়েছে যে, যে সত্তা এহেন মহান শক্তি-সামর্থ্য ও বিজ্ঞবান, তিনিই হামদ বা প্রশংসার যোগ্য হতে পারেন। কাতাদা বলেন, এ আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, আল্লাহ্ তা'আলা আসমানকে যমীনের পূর্বে, অন্ধকারকে আলোর পূর্বে এবং জান্নাতকে জাহান্নামের পূর্বে সৃষ্টি করেছেন। [তাবারী]
(২) এ আয়াতে سماوات শব্দটিকে বহুবচনে এবং أرض শব্দটিকে একবচনে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও অন্য এক আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আসমানের ন্যায় যমীনও সাতটি। [যেমন, সূরা আত-তালাক ১২] এমনিভাবে ظلمات শব্দটিকে বহুবচনে এবং نور শব্দটিকে একবচনে উল্লেখ করার মাঝে ইঙ্গিত রয়েছে যে, نور বলে বিশুদ্ধ সরল পথ ব্যক্ত করা হয়েছে এবং তা মাত্র একটিই। আর ظلمات বলে ভ্রান্ত পথ ব্যক্ত করা হয়েছে, যা অসংখ্য। তাছাড়া نور বা আলো ظلمات বা অন্ধকার থেকে উত্তম। [বাহরে মুহীত, ইবন কাসীর]
(৩) আলোচ্য আয়াতের উদ্দেশ্য একত্ববাদের স্বরূপ ও সুস্পষ্ট প্রমাণ বর্ণনা করে জগতের ঐসব জাতিকে হুশিয়ার করা যারা মূলতঃ একত্ববাদে বিশ্বাসী নয় কিংবা বিশ্বাসী হওয়া সত্বেও একত্ববাদের তাৎপর্যকে পরিত্যাগ করে বসেছে। অগ্নি উপাসকদের মতে জগতের স্রষ্টা দু’জন - ইয়াযদান ও আহরামান। তারা ইয়াযদানকে মঙ্গলের স্রষ্টা এবং আহরামানকে অমঙ্গলের স্রষ্টা বলে বিশ্বাস করে। এ দুটিকেই তারা অন্ধকার ও আলো বলে ব্যক্ত করে। এমনিভাবে নাসারারা একত্ববাদে বিশ্বাসী হওয়ার সাথে সাথে ঈসা আলাইহিস সালাম ও তার মাতা মারইয়াম আলাইহাস সালাম-কে আল্লাহ তা'আলার অংশীদার সাব্যস্ত করেছে। এরপর একত্ববাদের বিশ্বাসকে টিকিয়ে রাখার জন্য তারা ‘একে তিন’ এবং ‘তিনে এক’ এর অযৌক্তিক মতবাদের আশ্রয় নিয়েছে। আরবের মুশরিকরা প্রতিটি পাহাড়ের প্রতিটি বড় পাথরকেও তাদের উপাস্য বানিয়েছে। [আল-মানার]
মোটকথা, যে মানবকে আল্লাহ তা'আলা আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির সেরা করেছিলেন, তারা যখন পথভ্রষ্ট হল, তখন চন্দ্র, সূর্য, তারকারাজি, আকাশ, পানি, বৃক্ষলতা এমনকি পোকা-মাকড়কেও সিজদার যোগ্য উপাস্য, রুযীদাতা ও বিপদ বিদূরণকারী সাব্যস্ত করে নিল। কুরআনুল কারীমের আলোচ্য আয়াত আল্লাহ তা'আলাকে যমীন ও আসমানের স্রষ্টা এবং অন্ধকার ও আলোর উদ্ভাবক বলে উপরোক্ত সব ভ্রান্ত বিশ্বাসের মূলোৎপাটন করেছে। কেননা, অন্ধকার ও আলো, আসমান ও যমীন এবং এতে উৎপন্ন যাবতীয় বস্তু আল্লাহ্ তা'আলার সৃষ্ট। অতএব, এগুলোকে কেমন করে আল্লাহ্ তা'আলার অংশীদার করা যায়? যিনি সৃষ্টি করেন তিনি কি যারা সৃষ্টি করতে পারে না তাদের মত? সুতরাং কিভাবে ইবাদাতে ও সম্মানে তাঁর সমকক্ষ কাউকে দাড় করানো যায়? [ইবন কাসীর, ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১) প্রশংসা আল্লাহরই যিনি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, আর সৃষ্টি করেছেন অন্ধকার ও আলো।[1] এতদসত্ত্বেও অবিশ্বাসীগণ তাদের প্রতিপালকের সমকক্ষ স্থির করে। [2]
তাফসীর:
[1] ظُلُمَات বলতে রাতের অন্ধকার এবং نُور বলতে দিনের আলো বুঝানো হয়েছে। অথবা কুফরীর অন্ধকার এবং ঈমানের জ্যোতি বুঝানো হয়েছে। ‘নূর’ (জ্যোতি) একবচন এবং ‘যুলুমাত’ (অন্ধকার) বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ, অন্ধকারের কারণ অনেক এবং তার প্রকারাদিও বিভিন্ন। পক্ষান্তরে ‘নূর’ (জ্যোতি)র উল্লেখ জিন্স (জাত) স্বরূপ করা হয়েছে, যা তার সমস্ত প্রকারকে নিজের মধ্যে শামিল করে নেয়। (ফাতহুল ক্বাদীর) আবার এটাও হতে পারে যে, হিদায়াত এবং ঈমানের রাস্তা যেহেতু একটাই, চার অথবা পাঁচ কিংবা ভিন্ন ভিন্ন নয়, তাই ‘নূর’কে একবচন শব্দে উল্লেখ করা হয়েছে।
[2] অর্থাৎ, তাঁর সাথে অন্যকে শরীক করে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: নামকরণ, অবতরণের স্থান ও প্রেক্ষাপট:
আন্‘আম শব্দের শাব্দিক অর্থ হল: গৃহপালিত পশু। অত্র সূরার ১৩৬, ১৩৮, ১৪২ নং আয়াতে (الأنعام) আল-আন্‘আম শব্দটি উল্লেখ রয়েছে বিধায় উক্ত নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে। তাছাড়া এ সূরাতে গৃহপালিত পশু সংক্রান্ত বিধি-বিধান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। কারণ মক্কার মুশরিকরা কিছু পশু আল্লাহ তা‘আলার জন্য নির্ধারণ করত, কিছু নিজেদের জন্য হারাম করে নিত, আবার কিছু পশু নিজেদের নারী-পুরুষের মাঝে ব্যবধান করতঃ হারাম করে নিত।
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: সূরা আন্‘আম মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। (সনদ সহীহ, ইবনে কাসীর, ৩/২৭২)
আল্লামা সা‘লাবী (রহঃ) বলেন: সূরা আন্‘আম মক্কায় অবতীর্ণ হয়। তবে ছয়টি আয়াত মদীনায় অবতীর্ণ হয়। তা হল
(وَمَا قَدَرُوا اللّٰهَ حَقَّ قَدْرِه۪)
-সহ পরের দু’টি আয়াত এবং
(قُلْ تَعَالَوْا أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ) আয়াত সহ পরের দু’টি আয়াত। অর্থাৎ ৯১-৯৩ নং আয়াত ও ১৫১-১৫৩ নং আয়াত।
ইমাম কুরতুবী (রহঃ) ইবনু আব্বাস ও কাতাদাহ (রহঃ) থেকে একটি বর্ণনা নিয়ে এসেছেন তাতে তাঁরা বলেন: দু’টি আয়াত ব্যতীত সম্পূর্ণ সূরা মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। সে দু’টি আয়াত হল ৯১ ও ১৪১ নং। (ফাতহুল কাদীর, ২/১২৬)
এ সূরা অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট ও ফযীলত সম্পর্কে যেসব বর্ণনা পাওয়া যায় সকল বর্ণনাই দুর্বল। (ফাতহুল কাদীর, ২/১২৬) তবে ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে একটি বর্ণনা পাওয়া যায়, তিনি বলেন: আরবের অশিক্ষিত লোকেদের শিক্ষা দিতে যদি তুমি আনন্দ পাও তাহলে সূরা আন্‘আমের ১৩০ নং আয়াতের পরের আয়াতগুলো পড়। (সহীহ বুখারী হা: ৩৫২৪)
অত্র সূরার শুরুতে তাওহীদ, আল্লাহ তা‘আলার মর্যাদা, মাঝে ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রকৃত মা‘বূদ চেনার ঐতিহাসিক ঘটনা, হালাল-হারামের বিধান এবং শেষ দিকে মক্কার মুশরিকদের শির্কের ধরণ ও পদ্ধতি আর যেসব প্রাণী হারাম করা হয়েছে তা-সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিধানাবলী অত্র সূরায় স্থান পেয়েছে।
১-৩ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা‘আলা সূরাটি শুরু করেছেন দু’ প্রকার তাওহীদ দ্বারা। প্রথমেই নিজের প্রশংসা করলেন যা তাওহীদে উলুহিয়্যাহ, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল সর্বাধিক প্রশংসার অধিকারী একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। মানুষ একমাত্র তাঁর প্রশংসা করবে, কেননা প্রশংসা করা একটি ইবাদত। তবে ভাল ও সৎ কাজে মানুষেরও প্রশংসা করা যায়। সৎ কাজ ও একে অন্যের প্রতি দয়াদ্রতার জন্য মানুষের প্রশংসা করা আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসার পরিপন্থী নয়। কারণ হাদীসে এসেছে:
مَنْ لَمْ يَشْكُرِ النَّاسَ لَمْ يَشْكُرِ اللّٰهَ
“যে মানুষের প্রশংসা করল না সে আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করল না।”(নাসায়ী হা: ১৯৫৫, সহীহ) কেননা ভাল কাজে মানুষের প্রশংসা করা মূলত আল্লাহ তা‘আলারই প্রশংসা করা। এতে আরো ইঙ্গিত রয়েছে: মানুষ আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করুক আর নাই করুক আল্লাহ তা‘আলা তাঁর স্বত্ত্বা ও গুণে প্রশংসনীয়। মানুষ তাঁর প্রশংসা করলে মর্যাদা বাড়বেও না, আর প্রশংসা না করলে মর্যাদা ক্ষুণœও হবে না। তিনি সকল প্রশংসনীয় গুণের একক অধিকারী।
তারপর আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী, অন্ধকার এবং আলো সৃষ্টির কথা বলেছেন যা তাওহীদে রুবুবিয়্যাহ। অর্থাৎ সকল কিছুর স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, দ্বিতীয় কেউ নেই। তা ভাল হোক আর মন্দ হোক। আয়াতে الظُّلُمٰتِ ‘অন্ধকারসমূহ’ শব্দটি বহুবচন আর النُّوْرَ ‘আলো’ শব্দটি একবচন উল্লেখ করা হয়েছে। এ অন্ধকার ও আলোতে পঞ্চইন্দ্রিয় অনুধাবনযোগ্য দিন-রাত চন্দ্র-সূর্য ইত্যাদির সাথে আধ্যাত্মিক অন্ধকার ও আলো শামিল। যেমন অজ্ঞতা, শির্ক ও অন্যায়ের অন্ধকার। আর জ্ঞান, ঈমান, তাওহীদ ও আনুগত্যের আলো। এসব কিছু প্রমাণ করে স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, তিনিই সকল ইবাদত পাওয়ার একমাত্র হকদার।
এত সুন্দরভাবে আল্লাহ তা‘আলার তাওহীদ ও পরিচয় তুলে ধরার পরেও একশ্রেণির মানুষ আল্লাহ তা‘আলার সাথে কুফরী করে এবং তাঁর সাথে অংশী স্থাপন করে। তারা বলে: আল্লাহ তা‘আলার নাকি স্ত্রী ও সন্তান রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা এ থেকে পবিত্র ও মহান।
তারপর আমাদের আদি পিতা আদম (আঃ)-এর সৃষ্টির উপাদান মাটির কথা স্মরণ করে দিচ্ছেন, আর আমরা তারই বংশধর। সে হিসেবে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “তোমাদেরকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছি। তারপর সকলের একটি নির্দিষ্ট আয়ু (জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়) নির্ধারণ করে দিয়েছি, আর একটি সময় তথা কিয়ামতের নির্দিষ্ট সময় আল্লাহর কাছে আছে যা তিনি ছাড়া অন্য কেউ জানেন না।” অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ رَبِّيْ ج لَا يُجَلِّيْهَا لِوَقْتِهَآ إِلَّا هُوَ)
‘এ বিষয়ের জ্ঞান শুধু আমার প্রতিপালকেরই আছে। তিনিই যথাকালে সেটা প্রকাশ করবেন।’(সূরা আ‘রাফ ৭:১৮৭)
(وَهُوَ اللّٰهُ فِي السَّمٰوٰتِ وَفِي الْأَرْضِ)
‘আসমানসমূহ ও জমিনে তিনিই আল্লাহ’এ আয়াতের ব্যাপারে মুফাসসিরদের উক্তিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সঠিক উক্তি হল: আকাশে যারা রয়েছে এবং জমিনে যারা রয়েছে সকলের মা‘বূদ আল্লাহ তা‘আলা।
এর প্রমাণে অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَهُوَ الَّذِيْ فِي السَّمَا۬ءِ إِلٰهٌ وَّفِي الْأَرْضِ إِلٰه)
“তিনিই মা‘বূদ আকাশমণ্ডলীতে, তিনিই মা‘বূদ পৃথিবীতে।”(সূরা যুখরুফ ৪৩:৮৪)
ইমাম শাওকানী (রহঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেছেন:
أي هو المعبود أو المالك أو المتصرف في السموات والأرض كما تقول زيد الخليفة في الشرق والغرب
আল্লাহ তা‘আলা আকাশে ও জমিনে একমাত্র মা‘বূদ অথবা মালিক অথবা ক্ষমতাশীল। যেমন বলা হয়, যায়েদ পূর্ব ও পশ্চিমের খলিফা। (ফাতহুল কাদীর, ২/১২৯)
তাফসীর মুয়াসসারে এ অংশের তাফসীর করা হয়েছে:
والله سبحانه هو الإ له المعبود بحق في السموات والأرض
আল্লাহ তা‘আলাই আকাশমণ্ডলী ও জমিনের সত্যিকার মা‘বূদ।
আল্লামা আব্দুর রহমান নাসির আস সা‘দী বলেন:
أي: وهو المألوه المعبود ، في السموات والأرض ، فأهل السماء والأرض ، متعبدون لربهم ، خاضعون لعظمته ، مستكينون لعزه وجلاله ، الملائكة المقربون ، والأنبياء ، والمرسلون ، والصديقون ، والشهداء ، والصالحون
অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলাই আকাশমণ্ডলী ও জমিনের একমাত্র মা‘বূদ। তাই আকাশে ও জমিনে যারা আছে সবাই তাদের রবের ইবাদত করে, তাঁর বড়ত্বের কাছে বিনয়ী হয় এবং তাঁর সম্মান ও মর্যাদার কাছে নতি স্বীকার করে নৈকট্যশীল ফেরেশতাগণ, নাবী, রাসূলগণ, সত্যবাদীগণ, শহীদ ও সৎ কর্ম স¤পাদনকারীগণ। (তাফসীর সা‘দী পৃ: ২৪১-২৪২)
তাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকীদাহ হল, আল্লাহ তা‘আলা আরশের ওপরে আছেন। সেখানে থেকে তাঁর দর্শন, জ্ঞান, শ্রবণ ও ক্ষমতার দ্বারা সর্বত্র রয়েছেন। তাঁর জ্ঞান, দর্শন, শ্রবণ ও ক্ষমতার বাইরে কিছুই নেই। গভীর অন্ধকার রাতে কালো পাথরের ওপর কালো পিপিলিকা চলাচল করলেও আল্লাহ তা‘আলার জ্ঞান ও দর্শনের বাইরে নয়।
সুতরাং জাহমিয়াগণ ও অন্যান্য যারা এ আয়াত দ্বারা দলীল গ্রহণ করে থাকে যে, “আল্লাহ তা‘আলা সর্বত্র বিরাজমান” এ ধরণের বিশ্বাস ভুল এবং ভ্রান্ত আকীদাহ।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. সকল প্রশংসা পাওয়ার একমাত্র মালিক আল্লাহ তা‘আলা। আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করা এক প্রকার ইবাদত।
২. স্রষ্টা কেবল তিনিই যিনি ইবাদত পাওয়ার যোগ্য, যিনি সৃষ্টি করতে পারেন না তিনি মা‘বূদ হতে পারে না।
৩. ভাল কাজের জন্য মানুষের প্রশংসা করা বৈধ তবে সীমা অতিক্রম করা যাবে না যাতে আল্লাহ তা‘আলার সমপর্যায়ে যেন না পৌঁছে যায়।
৪. আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক মানুষের নির্দিষ্ট আয়ু নির্ধারণ করে দিয়েছেন যা আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া কেউ জানে না।
৫. আল্লাহ তা‘আলা স্বস্বত্ত্বায় সর্বত্র বিরাজমান নন বরং তিনি স্বস্বত্ত্বায় আরশের ওপরে রয়েছেন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: সূরায়ে আন'আম মক্কায় এক রাতের মধ্যেই সম্পূর্ণটা একই সাথে অবতীর্ণ হয়। সত্তর হাজার ফেরেশতা এই সূরাটি নিয়ে হাজির হন এবং তাসবীহ পাঠ করতে থাকেন। হযরত আসমা বিনতে ইয়াযীদ (রাঃ) বলেনঃ নবী (সঃ) উষ্ট্রীর উপর সওয়ার ছিলেন। এমতাবস্থায় সূরায়ে আন'আম অবতীর্ণ হচ্ছিল। আমি তাঁর উষ্ট্ৰীটির লাগাম ধরে রেখেছিলাম। অহীর ভারে উষ্ট্রীটির পিঠ এমনভাবে কুঁজো হয়ে যাচ্ছিল যে, মনে হচ্ছিল যেন ওর পিঠের হাড় ভেঙ্গে যাবে। ফেরেশতাগণ আসমান ও যমীনকে পরিবেষ্টন করে রেখেছিলেন। সূরায়ে আনআম অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাসবীহ পড়তে শুরু করেন এবং বলেনঃ “এই সূরার অনুসরণে ফেরেশতাগণ দিগন্ত পর্যন্ত পরিবেষ্টন করে রেখেছিলেন। তাঁদের (আরবী) -এই তাসবীহের গুঞ্জনে আসমান ও যমীন মুখরিত ছিল।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজেও এই তাসবীহ পাঠ করছিলেন। তিনি বলেনঃ “সূরায়ে আনআম একবারেই অবতীর্ণ হয়েছে এবং এটা সত্তর হাজার ফেরেশতার তাসবীহ ও তাহমীদের গুঞ্জনের মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে।”
১-৩ নং আয়াতের তাফসীর:
এখানে মহান আল্লাহ তাঁর পবিত্র সত্তার প্রশংসা করছেন যে, তিনিই আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। যেন তিনি স্বীয় বান্দাদেরকে প্রশংসা করার কথা শিক্ষা দিচ্ছেন। তিনি দিনে আলোককে এবং রাত্রে অন্ধকারকে তাঁর বান্দাদের জন্যে একটা উপকারী বস্তু বলে ঘোষণা দিচ্ছেন। এখানে (আরবী) শব্দটিকে একবচন এবং (আরবী) শব্দটিকে বহুবচনরূপে ব্যবহার করা হয়েছে। কেননা, উৎকৃষ্ট জিনিসকে একবচন রূপেই ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলার উক্তি রয়েছেঃ (আরবী) এবং (আরবী) এখানে (আরবী) শব্দকে একবচন এবং (আরবী) শব্দকে বহুবচন আনা হয়েছে। আর নিজের রাস্তাকে (আরবী) বলে একবচন এনেছেন এবং ভুল রাস্তাগুলোকে (আরবী) বলে বহুবচন এনেছেন। মোটকথা, যদিও আল্লাহর কতকগুলো বান্দা কুফরীতে লিপ্ত হয়ে তার শরীক স্থাপন করেছে এবং তাঁর স্ত্রী ও সন্তান সাব্যস্ত করেছে (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক),তথাপি তিনি এ সবকিছু হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র।
(আরবী) -তিনি সেই প্রভু যিনি তোমাদেরকে মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন অর্থাৎ তোমাদের পিতা হযরত আদম (আঃ)-কে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং মাটিই তার গোশত ও চামড়ার আকার ধারণ করেছিল। অতঃপর তাঁরই মাধ্যমে মানবকে সৃষ্টি করে পূর্ব ও পশ্চিমে ছড়িয়ে দেয়া হয়। তারপর হযরত আদম (আঃ) পূর্ণ শক্তি প্রাপ্ত হন এবং তাঁর মৃত্যুর নির্ধারিত সময়ে পৌছে যান। হযরত হাসান (রঃ)-এর মতে প্রথম (আরবী)। শব্দ দ্বারা মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের সময় বুঝানো হয়েছে। আর দ্বিতীয় (আরবী) শব্দ দ্বারা মৃত্যুর পরে পুনর্জীবন পর্যন্ত সময়কে বুঝানো হয়েছে। (আরবী) হচ্ছে মানুষের চলন্ত বয়স এবং (আরবী) হচ্ছে সারা দুনিয়ার বয়স অর্থাৎ দুনিয়া লয়প্রাপ্ত হওয়া থেকে নিয়ে দারে আখিরাতের সময় আসা পর্যন্ত।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, প্রথম (আরবী) দ্বারা দুনিয়ার সময়কাল এবং (আরবী) দ্বারা মানুষের জীবন হতে মৃত্যু পর্যন্ত সময়কে বুঝানো হয়েছে। এটা যেন আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তি হতেই গ্রহণ করা হয়েছেঃ
(আরবী) অর্থাৎ “তিনি রাত্রিকালে তোমাদেরকে মেরে ফেলেন। এবং দিবা ভাগে তোমরা যা কিছু কর তা তিনি সম্যক অবগত। আর রাত্রিকালে তো তোমরা কিছুই করতে পার না।” (৬:৬০) অর্থাৎ তোমরা সে সময় নিদ্রিত অবস্থায় থাক এবং সেটা হচ্ছে আত্মা বেরিয়ে যাওয়ার রূপ। তারপরে তোমরা জেগে ওঠ, তখন যেন তোমরা তোমাদের সঙ্গী সাথীদের কাছে ফিরে আস। আর তাঁর (আরবী) -এই উক্তির অর্থ এই যে, ঐ সময়টা একমাত্র তিনি ছাড়া আর কেউ জানে না। যেমন তিনি অন্য এক জায়গায় বলেছেনঃ “ওর জ্ঞান একমাত্র আল্লাহরই কাছে। ওর সময় আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানতে পারে না।” অনুরূপভাবে আল্লাহ পাকের উক্তি “হে নবী (সঃ)! লোকেরা তোমাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে যে, ওটা কখন সংঘটিত হবে? তাহলে তোমার ঐ সম্পর্কে কি জ্ঞান আছে? এ জ্ঞানতো একমাত্র আল্লাহরই রয়েছে” -এই উক্তির অর্থ এটাই। তারপর ওর নীচের আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে- “আকাশসমূহ ও পৃথিবীর আল্লাহ তিনিই, তিনি তোমাদের প্রকাশ্য কথা সম্পর্কেও জ্ঞান রাখেন এবং গোপন কথা সম্পর্কেও তার পূর্ণ জ্ঞান রয়েছে, আর তোমরা যা কিছু করছো সেটাও তিনি সম্যক অবগত।” এই আয়াতের তাফসীরকারকগণ প্রথমে জাহমিয়া সম্প্রদায়ের উক্তির অস্বীকৃতির উপর একমত হয়েছেন। অতঃপর তাঁদের পরস্পরের মধ্যেও কিছুটা মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। জাহমিয়াদের উক্তি এই যে, এই আয়াত এই অর্থ বহন করছে যে, আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জায়গাতেই স্বয়ং বিদ্যমান রয়েছেন। অর্থাৎ এই আকীদায় এই কথা গ্রহণ করা হচ্ছে যে, আল্লাহ পাক প্রত্যেক জিনেসের মধ্যে স্বয়ং বিদ্যমান রয়েছেন। সঠিক উক্তি এই যে, আসমান ও যমীনে একমাত্র আল্লাহকেই মান্য করা হয় এবং তাঁরই ইবাদত করা হয়। আকাশে যেসব ফেরেশতা রয়েছে ও যমীনে যেসব মানুষ রয়েছে সবাই তাঁকে মা'বুদ বলে স্বীকার করছে। তাঁকে তারা ‘আল্লাহ’ বলে ডাকতে রয়েছে। কিন্তু জ্বিন ও মানুষের মধ্যে যারা কাফির তারা তাঁকে ভয় করে না। আল্লাহ তাআলা অন্য জায়গায় বলেছেনঃ “তিনিই আকাশসমহেরও আল্লাহ এবং যমীনেরও আল্লাহ।' এই উক্তিরও ভাবার্থ এটাই যে, আসমানে যত কিছু রয়েছে এবং যমীনে যত কিছু রয়েছে সবারই তিনি আল্লাহ। অর্থ এটা নয় যে, আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে ওগুলোই আল্লাহ। এর উপর ভিত্তি করেই নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, তিনি তোমাদের গোপন কথাও জানেন এবং প্রকাশ্য কথাও জানেন।
দ্বিতীয় উক্তি এই যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে-আল্লাহ তিনিই যিনি আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত প্রকাশ্য ও গোপনীয় কথা জানেন এবং এটা তার (আরবী) -এই উক্তির সাথে সম্পর্কযুক্ত। এর অন্তর্নিহিত অর্থ এটাই হচ্ছে যে, তিনিই আল্লাহ যিনি আকাশসমূহে. ও পৃথিবীতে তোমাদের সমস্ত কথা জানেন এবং তোমরা যা কিছু কর ওর সংবাদ তিনি রাখেন।
তৃতীয় উক্তি এই যে, (আরবী) -এটা বা (আরবী) পূর্ণ বিরতি। এর পরে পুনরায় (আরবী)-এর সূচনা হচ্ছে। অর্থাৎ (আরবী) হচ্ছে (আরবী) এবং (আরবী) হচ্ছে আর ইবনে জারীর (রঃ)-এর মত এটাই।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।