সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 160)
হরকত ছাড়া:
من جاء بالحسنة فله عشر أمثالها ومن جاء بالسيئة فلا يجزى إلا مثلها وهم لا يظلمون ﴿١٦٠﴾
হরকত সহ:
مَنْ جَآءَ بِالْحَسَنَۃِ فَلَهٗ عَشْرُ اَمْثَالِهَا ۚ وَ مَنْ جَآءَ بِالسَّیِّئَۃِ فَلَا یُجْزٰۤی اِلَّا مِثْلَهَا وَ هُمْ لَا یُظْلَمُوْنَ ﴿۱۶۰﴾
উচ্চারণ: মান জাআ বিল হাছানাতি ফালাহূ‘আশরু আমছা-লিহা- ওয়ামান জাআ বিছছাইয়িআতি ফালা-ইউজযা ইল্লা-মিছলাহা-ওয়া হুম লা-ইউজলামূন।
আল বায়ান: যে সৎকাজ নিয়ে এসেছে, তার জন্য হবে তার দশ গুণ। আর যে অসৎকাজ নিয়ে এসেছে, তাকে অনুরূপই প্রতিদান দেয়া হবে এবং তাদেরকে যুলম করা হবে না।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৬০. কেউ কোন সৎকাজ করলে সে তার দশ গুণ পাবে। আর কেউ কোন অসৎ কাজ করলে তাকে শুধু তার অনুরূপ প্রতিফলই দেয়া হবে এবং তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: যে ব্যক্তি সৎকর্ম করবে তার জন্য আছে দশ গুণ পুরস্কার, আর যে ব্যক্তি অসৎকাজ করবে তাকে শুধু কৃতকর্মের তুল্য প্রতিফল দেয়া হবে, তাদের উপর অত্যাচার করা হবে না।
আহসানুল বায়ান: (১৬০) কেউ সৎকাজ করলে, সে তার দশগুণ (প্রতিদান) পাবে[1] এবং কেউ অসৎকাজ করলে, তাকে শুধু তার সমপরিমাণ প্রতিফলই দেওয়া হবে।[2] আর তারা অত্যাচারিত হবে না।
মুজিবুর রহমান: কেহ কোন ভাল কাজ করলে সে তার দশ গুণ প্রতিদান পাবে, আর কেহ পাপ ও অসৎ কাজ করলে তাকে শুধু ততটুকুই প্রতিফল দেয়া হবে যতটুকু সে করেছে, আর তারা অত্যাচারিত হবেনা।
ফযলুর রহমান: যে ব্যক্তি একটি ভাল কাজ করবে সে তার মত দশটির ফল পাবে; আবার যে একটি খারাপ কাজ করবে তাকে শুধু সেটিরই প্রতিফল দেওয়া হবে। তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না।
মুহিউদ্দিন খান: যে একটি সৎকর্ম করবে, সে তার দশগুণ পাবে এবং যে, একটি মন্দ কাজ করবে, সে তার সমান শাস্তিই পাবে। বস্তুতঃ তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না।
জহুরুল হক: যে কেউ একটি ভালো কাজ নিয়ে আসে, তার জন্য তবে রয়েছে দশটি তার অনুরূপ, আর যে কেউ একটি মন্দ কাজ নিয়ে আসে, তাকে তবে প্রতিদান দেয়া হয় না তার অনুরূপ ব্যতীত, আর তাদের প্রতি অন্যায় করা হবে না।
Sahih International: Whoever comes [on the Day of Judgement] with a good deed will have ten times the like thereof [to his credit], and whoever comes with an evil deed will not be recompensed except the like thereof; and they will not be wronged.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৬০. কেউ কোন সৎকাজ করলে সে তার দশ গুণ পাবে। আর কেউ কোন অসৎ কাজ করলে তাকে শুধু তার অনুরূপ প্রতিফলই দেয়া হবে এবং তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না।(১)
তাফসীর:
(১) এ আয়াতে আখেরাতের প্রতিদান ও শাস্তির একটি সহৃদয় বিধি বর্ণিত হয়েছে যে, যে ব্যক্তি একটি সৎকাজ করবে, তাকে দশগুণ প্রতিদান দেয়া হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি একটি গোনাহ করবে, তাকে শুধু একটি গোনাহর সমান বদলা দেয়া হবে। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমাদের প্রতিপালক অত্যন্ত দয়ালু। যে ব্যক্তি কোন সৎকাজের শুধু ইচ্ছা করে, তার জন্য একটি নেকী লেখা হয়- ইচ্ছাকে কার্যে পরিণত করুক বা না করুক। অতঃপর যখন সে সৎকাজটি সম্পাদন করে, তখন তার আমলনামায় দশটি নেকী লেখা হয়। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কোন পাপ কাজের ইচ্ছা করে, অতঃপর তা কার্যে পরিণত না করে, তার আমলনামায়ও একটি নেকী লেখা হয়। অতঃপর যদি সে ইচ্ছাকে কার্যে পরিণত করে, তবে একটি গোনাহ লেখা হয়। কিংবা একেও মিটিয়ে দেয়া হয়। এহেন দয়া ও অনুকম্পা সত্বেও আল্লাহর দরবারে ঐ ব্যক্তিই ধ্বংস হতে পারে, যে ধ্বংস হতেই দৃঢসংকল্প। [বুখারী: ৬৪৯১; মুসলিম: ১৩১]
অপর হাদীসে এসেছে, যে ব্যক্তি একটি সৎকাজ করে, সে দশটি সৎকাজের সওয়াব পায় বরং আরো বেশী পায়। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি একটি গোনাহ করে সে তার শাস্তি এক গোনাহর সমপরিমাণ পায় কিংবা তাও আমি মাফ করে দেব। যে ব্যক্তি পৃথিবী ভর্তি গোনাহ করার পর আমার কাছে এসে ক্ষমা প্রার্থনা করে, আমি তার সাথে ততটুকুই ক্ষমার ব্যবহার করব। যে ব্যক্তি আমার দিকে অর্ধহাত অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হই এবং যে ব্যক্তি আমার দিকে একহাত অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে বা (অর্থাৎ দুই বাহু প্রসারিত) পরিমাণ অগ্রসর হই। যে ব্যক্তি আমার দিকে লাফিয়ে আসে, আমি তার দিকে দৌড়ে যাই। [মুসনাদে আহমাদ: ৫/১৫৩] এসব হাদীস থেকে জানা যায়, আয়াতে যে সৎকাজের প্রতিদান দশগুণ দেয়ার কথা বলা হয়েছে, তা সর্বনিম পরিমাণ। আল্লাহ্ তাআলা স্বীয় কৃপায় তা আরো বেশী দিতে পারেন এবং দিবেন। অন্যান্য হাদীস দ্বারা সত্তর গুণ বা সাতশ গুণ পর্যন্ত প্রমাণিত রয়েছে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৬০) কেউ সৎকাজ করলে, সে তার দশগুণ (প্রতিদান) পাবে[1] এবং কেউ অসৎকাজ করলে, তাকে শুধু তার সমপরিমাণ প্রতিফলই দেওয়া হবে।[2] আর তারা অত্যাচারিত হবে না।
তাফসীর:
[1] এটা হল আল্লাহ তাআলার সেই দয়া ও অনুগ্রহের বর্ণনা, যা ঈমানদারদের উপর তিনি করবেন। আর তা হল, একটি নেকীর বিনিময় তিনি দশটি নেকী দ্বারা দেবেন। আর এটা হল কমসে কম প্রতিদান। তাছাড়া কুরআন ও হাদীস থেকে প্রমাণিত যে, কোন কোন নেকীর প্রতিদান কয়েক শ’ এমন কি কয়েক হাজার গুণ পর্যন্ত দেওয়া হবে।
[2] অর্থাৎ, যে পাপমূহের শাস্তি নির্ধারিত নয় এবং যেগুলো করার পর পাপী তা থেকে তওবাও করেনি অথবা তার পুণ্যের হার পাপের তুলনায় কম হবে কিংবা আল্লাহ তাঁর বিশেষ অনুগ্রহে তা ক্ষমা করবেন না, (কেননা, এই সমস্ত অবস্থায় প্রতিদানের নীতি প্রয়োগ করা হবে না) তখন আল্লাহ এই পাপের দরুন শাস্তি দেবেন এবং তা পাপের সমপরিমাণই দেবেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৫৯-১৬০ নং আয়াতের তাফসীর:
যারা তাদের দীনকে বিভিন্ন দলে উপদলে বিভক্ত করতঃ বিভিন্ন নাম ধারণ করেছে তাদেরকে ধমক দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: হে নাবী, তাদের দায়িত্ব তোমার নয়। তাদের দায়িত্ব আল্লাহ তা‘আলার, আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে অবহিত করবেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:
(إِنَّ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَالَّذِيْنَ هَادُوْا وَالصّٰبِئِيْنَ وَالنَّصٰرٰي وَالْمَجُوْسَ وَالَّذِيْنَ أَشْرَكُوْآ إِنَّ اللّٰهَ يَفْصِلُ بَيْنَهُمْ يَوْمَ الْقِيٰمَةِ ط إِنَّ اللّٰهَ عَلٰي كُلِّ شَيْءٍ شَهِيْدٌ)
“যারা ঈমান এনেছে এবং যারা ইয়াহূদী হয়েছে, যারা সাবিয়ী, খ্রিস্টান ও অগ্নিপূজক এবং যারা মুশরিক হয়েছে কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেবেন। আল্লাহ সমস্ত কিছুর সম্যক প্রত্যক্ষকারী।”(সূরা হাজ্জ ২২:২৭)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(وَلَا تَکُوْنُوْا کَالَّذِیْنَ تَفَرَّقُوْا وَاخْتَلَفُوْا مِنْۭ بَعْدِ مَا جَا۬ءَھُمُ الْبَیِّنٰتُﺚ وَاُولٰ۬ئِکَ لَھُمْ عَذَابٌ عَظِیْمٌ)
“তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং তাদের কাছে প্রমাণ আসার পর মতভেদে লিপ্ত হয়েছে। তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি।”(সূরা আলি-ইমরান ৩:১০৫)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(مُنِیْبِیْنَ اِلَیْھِ وَاتَّقُوْھُ وَاَقِیْمُوا الصَّلٰوةَ وَلَا تَکُوْنُوْا مِنَ الْمُشْرِکِیْنَﭮﺫ مِنَ الَّذِیْنَ فَرَّقُوْا دِیْنَھُمْ وَکَانُوْا شِیَعًاﺚ کُلُّ حِزْبٍۭ بِمَا لَدَیْھِمْ فَرِحُوْنَ)
“(নিজেকে দীনে প্রতিষ্ঠিত রাখো) বিশুদ্ধচিত্তে আল্লাহ অভিমুখী হয়ে এবং তাকে ভয় কর, সালাত কয়েম কর এবং মুশরিকদের মধ্যে শামিল হয়ো না, যারা তাদের দীনকে খণ্ড-বিখণ্ড করে নিয়েছে এবং ভিন্ন ভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। প্রত্যেক দলই নিজ নিজ অনুসৃত নিয়ম নিয়ে উল্লসিত।”(সূরা রূম ৩০:৩১-৩২)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের তিনটি বিষয়ে সন্তুষ্ট হন আর তিনটি বিষয়ে অসন্তুষ্ট বা অপছন্দ করেন। তিনি তোমাদের জন্য সন্তুষ্ট যে, তোমরা তাঁরই ইবাদত করবে, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না। আর তোমরা আল্লাহ তা‘আলার রজ্জুকে সুদৃঢ় ও সম্মিলিতভাবে আঁকড়ে ধরবে, দলে দলে বিচ্ছিন্ন হবে না। আর তিনি অপছন্দ করেন অনর্থক কথা বলাবলি করা, অনর্থক প্রশ্ন করা এবং সম্পদ নষ্ট করা। (সহীহ মুসলিম হা: ৪৫৭৮)
অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: জামা‘আতের ওপর আল্লাহ তা‘আলার হাত রয়েছে। (তিরমিযী হা: ২১৬৬, সহীহ)
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: আয়াতে বিভক্ত জাতি দ্বারা উদ্দেশ্য ইয়াহুদ ও খ্রিস্টানরা। কারণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নবুওয়াতের পর তারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। (ইবনু কাসীর ৩/৪১৯)। কেউ কেউ বলেছেন: কিছু মুশরিক ফেরেশতাদের, কিছু তারকারাজির এবং কিছু বিভিন্ন মূর্তির পূজা করত। তবে এ আয়াত ব্যাপক।
দলে দলে বিভক্ত হওয়া হকপন্থীদের বৈশিষ্ট্য নয়, বরং তা মুশরিক, বিদ‘আতী ও প্রবৃত্তির অনুসারীদের কাজ। বিদআতীরা তাদের প্রবৃত্তি যা ভাল মনে করে সে ধারণানুযায়ী বিভিন্ন তরীকা, ওযীফা ও সবক তৈরি করে মানুষকে নিজেদের দল ও মতের দিকে আহ্বান করে জান্নাতের যিম্মাদারী নিচ্ছে। জেনে রাখুন, এসব শয়তানের তরীকা, মুসলিমদের তরীকা হল একটি। তা হল কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ। বিভিন্ন পথ, মত ও তরীকা তৈরি করে মুসলিমদেরকে দলে দলে বিভক্ত করা গোমরাহী ছাড়া কিছুই নয়।
(مَنْ جَا۬ءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَه۫ عَشْرُ اَمْثَالِھَا)
‘কেউ কোন সৎ কাজ করলে সে তার দশ গুণ পাবে’এ আয়াতে সৎ আমলকারীদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার দয়া ও অনুগ্রহের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যে ব্যক্তি একটি ভাল আমল করবে তার বিনিময়ে আল্লাহ তা‘আলা দশ গুণ প্রতিদান দেবেন। আবার যে খারাপ আমল করবে তার বিনিময়ে আল্লাহ তা‘আলা দশ গুণ গুনাহ দেবেন না। বরং ঐ একটি খারাপ আমলের যে গুনাহ হয় তাই দেবেন। আল্লাহ তা‘আলা পারতেন ভাল কাজের বিনিময়ে একটি মাত্র নেকী দিতে কিন্তু এটাই হল আল্লাহ তা‘আলার দয়া যা ছাড়া কোন মানুষ জান্নাতে যেতে পারবে না।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আল্লাহ তা‘আলা বলেন, নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক দয়ালু। যে ব্যক্তি একটি সৎ কাজের মনস্থ করেছে, কিন্তু আমল করেনি তার জন্য একটি নেকী লিখা হয়। আর যদি কমিটি করে তাহলে দশ থেকে সাতশত পর্যন্ত নেকী লেখা হয়। এমনকি এর চেয়েও বেশি। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কোন খারাপ কাজের মনস্থ করে, কিন্তু বাস্তবে তা করল না তার জন্য একটি নেকী লেখা হয়। আর যদি করেই ফেলে তাহলে একটি গুনাহ লেখা হয়। অথবা তা মিটিয়ে দেন। আল্লাহ তা‘আলা তাকেই ধ্বংস করেন যে নিজেকে ধ্বংস করে। (সহীহ বুখারী হা: ৬৪৯১)
এরূপ অসংখ্য সহীহ হাদীস রয়েছে যেখানে বলা হয়েছে সৎ কাজের বেশি প্রতিদান দেয়ার কথা আর খারাপ কাজের অনুরূপ প্রতিদান দেয়ার কথা। ( ইবনে কাসীর, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ৪২১-৪২৩)
তাই দীনের ভিতর দলাদলি সৃষ্টি করা যা মুসলিম ঐক্যের প্রতিবন্ধক এমন কাজ অবশ্যই বর্জনীয়। আমাদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। আসুন, আমরা সকল মুসলিম! সকল তরীকা, মাযহাব ও মতাদর্শ বর্জন করে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর দিকে ফিরে আসি। তবেই আমরা আবার ইসলামের স্বর্ণ যুগ ফিরে পারবো ইনশা-আল্লাহ। আর যদি আপন আপন মত ও তরীকার দিকে আহ্বান জানাই, শুধু মুখে ঐক্যের বুলি আওড়াই তাহলে কখনও ঐক্য সম্ভব নয়। সুতরাং আকীদাহ-আমল সকল ক্ষেত্রে ঐক্যের মানদন্ড হবে কুরআন ও সহীহ হাদীস, তাহলেই ঐক্য সম্ভব। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সেই তাওফীক দান করুন, আমীন।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. দীনের মধ্যে দল উপদল সৃষ্টি করা হারাম।
২. যারা ব্যক্তি ও গোষ্ঠির স্বার্থে দলে দলে বিভক্ত হয়ে যায় তাদের সাথে মু’মিনদের কোন সম্পর্ক নেই।
৩. মু’মিনদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার কিরূপ দয়া ও অনুগ্রহ তা জানতে পারলাম।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: এ আয়াতে কারীমায় বিস্তারিতভাবে আলোকপাত করা হয়েছে এবং এর পরবর্তী আয়াত সংক্ষিপ্ত। এ আয়াতের সাথে সাদৃশ্যযুক্ত বহু হাদীস রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মহাকল্যাণময় আল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেনঃ “তোমাদের মহামহিমান্বিত আল্লাহ বড় করুণাময়। কেউ যদি কোন ভাল কাজের ইচ্ছা করে, কিন্তু ঐ কাজ সাধন করতে না পারে তবুও তার জন্যে একটা পুণ্য লিখে নেয়া হয়। আর যদি সে ঐ কাজটি সাধন করে তবে তার জন্যে দশটা পুণ্য লিখা হয় এবং তার ভাল নিয়তের কারণে এটা বৃদ্ধি হতে হতে সাতশ’ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পক্ষান্তরে কেউ যদি কোন খারাপ কাজের ইচ্ছা করে, কিন্তু তা করে না বসে তবে ওর জন্যেও একটা পুণ্য লিখা হয়। আর যদি তা করে ফেলে তবে একটা মাত্র পাপ লিখা হয় এবং সেটাও ইচ্ছা করলে মহামহিমান্বিত আল্লাহ ক্ষমা করে দেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, “মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেন-যে ব্যক্তি একটি ভাল কাজ করবে তার জন্যে অনুরূপ দশটি পুণ্য রয়েছে এবং আমি তার চেয়েও বেশী প্রদান করবো। আর যে ব্যক্তি একটি খারাপ কাজ করবে, তার অনুরূপ একটি মাত্র পাপ তার জন্যে লিখা হবে অথবা আমি ওটাও ক্ষমা করে দেবো। যে ব্যক্তি ভূ-পৃষ্ঠ বরাবর পাপ করে আমার সাথে সাক্ষাৎ করবে, কিন্তু আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না, আমি সেই পরিমাণই ক্ষমা তার উপর নাযিল করবো। যে ব্যক্তি আমার দিকে অর্ধহাত অগ্রসর হবে, আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হবো। যে ব্যক্তি আমার দিকে একহাত অগ্রসর হবে, আমি তার দিকে দু'হাত অগ্রসর হবো। যে ব্যক্তি আমার দিকে হেঁটে আসবে, আমি তার দিকে দৌড়িয়ে যাবো।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন ভাল কাজের ইচ্ছা করলো কিন্তু কাজটা করলো না তবে তার জন্যে একটা পুণ্য লিখা হবে। আর যদি কাজটি করে নেয় তবে তার জন্যে দশটি পুণ্য লিপিবদ্ধ করা হবে। পক্ষান্তরে কেউ যদি কোন খারাপ কাজের ইচ্ছা করে, কিন্তু করে না বসে তবে তার জন্যে কিছুই লিখা হবে না। আর যদি কাজটি করে ফেলে তবে তার জন্যে একটা পাপ লিখা হবে।” (হাদীসটি হাফিয আবু ইয়ালা আল মুসিলী বর্ণনা করেছেন)
এখানে এটা জেনে নেয়া জরুরী যে, যে ব্যক্তি কোন পাপকার্যের ইচ্ছা করে তা করে বসলো না ওটা তিন প্রকার। (১) কখনও এরূপ হয় যে, সে আল্লাহর ভয়ে পাপের ইচ্ছা পরিত্যাগ করলো। এ প্রকারের লোককেও পাপকার্য থেকে বিরত থাকার কারণে একটি পুণ্য দেয়া হবে এবং এটা আমল ও নিয়তের উপর নির্ভরশীল। একারণেই তার জন্যে একটা পুণ্য লিখা হয়। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে, সে আমারই কারণে পাপকার্য পরিত্যাগ করেছে। (২) কখনও এমন হয়। যে, ঐ ব্যক্তি পাপকার্যের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ভুলে গিয়ে তা ছেড়ে দেয়। এ অবস্থায় তার জন্যে শাস্তিও নেই, প্রতিদানও নেই। কেননা, সে ভাল কাজেরও নিয়ত করেনি এবং খারাপ কাজও করে বসেনি। (৩) আবার কখনও এমনও হয় যে, কোন ব্যক্তি পাপকার্য করে ফেলার চেষ্টা করে থাকে, ওর উপকরণ সংগ্রহ করে, কিন্তু ওকে কার্যে পরিণত করতে সে অপারগ হয়ে যায় এবং বাধ্য হয়ে তাকে ওটা ছেড়ে দিতে হয়। এরূপ ব্যক্তি যদিও পাপকার্য করে বসলো না তবুও তাকে কার্যে পরিণত কারীরূপেই গণ্য করা হবে এবং শাস্তি দেয়া হবে। যেমন সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যখন দু’জন মুসলমান তরবারী নিয়ে যুদ্ধ করতে শুরু করে তখন হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়ই জাহান্নামী।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা হত্যাকারীর ব্যাপারে প্রযোজ্য, কিন্তু নিহত ব্যক্তি জাহান্নামী হবে কেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ “নিশ্চয়ই সে তার সাথীকে হত্যা করতে উদ্যত ছিল (কিন্তু পারেনি)।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন সকার্যের ইচ্ছা করে, সেই কাজ সাধনের পূর্বেই তার জন্যে একটি পুণ্য লিখে নেয়া হয়। আর যদি সেই কার্য সাধন করে ফেলে তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে তার আমলনামায় দশটি পুণ্য লিপিবদ্ধ করা হয়। কিন্তু কেউ যদি কোন খারাপ কাজের ইচ্ছা করে তবে শুধু তার ইচ্ছার উপর ভিত্তি করে তার নামে কোন পাপ লিখা হয় না যে পর্যন্ত না। সে তা কার্যে পরিণত করে। আর যদি সে ঐ কাজটি করে বসে তবে দশটি পাপের পরিবর্তে একটি মাত্র পাপ লিখা হয়। যদি সে ইচ্ছা সত্ত্বেও সেই পাপ কার্য থেকে বিরত থাকে তবে কোন আমল ছাড়াই তার জন্যে একটা পুণ্য লিখা হয়। কেননা, আল্লাহ পাক বলেনঃ “আমাকে ভয় করার করণেই সে পাপকার্য থেকে বিরত রয়েছে।”
খুরায়েম ইবনে ফাতিক আসাদী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “মানুষ চার প্রকার এবং আমল ছয় প্রকার। (চার প্রকার মানুষ হচ্ছে) (১) কোন কোন লোক দুনিয়া ও আখিরাত উভয় স্থলেই সৌভাগ্যবান হয়ে থাকে। (২) কেউ কেউ দুনিয়ায় ভাগ্যবান কিন্তু পরকালে হতভাগ্য হয়। (৩) কোন ব্যক্তি দুনিয়ায় হতভাগ্য কিন্তু পরকালে ভাগ্যবান হয়। (৪) আবার কেউ কেউ দুনিয়া ও আখিরাত উভয় স্থলেই হতভাগ্য হয়ে থাকে। (ছয় প্রকারের। আমল হচ্ছে) দু’প্রকারের আমল ওয়াজিবকারী অর্থাৎ আমলের সমান পুণ্য দান। করা হবে বা দশগুণ বেশী অথবা সাতশ’গুণ বেশী পুণ্য দেয়া হবে। যে দু'টি কাজ ওয়াজিবকারী তা হচ্ছে এই যে, যদি কোন মুমিন লোক মারা যায় এবং সে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করে থাকে, তবে এর ফলে তার জন্যে জান্নাত রয়েছে। পক্ষান্তরে যদি কোন কাফির মারা যায় তবে এর ফল স্বরূপ তার জন্যে জাহানাম রয়েছে। আর যে ব্যক্তি ভাল কাজের ইচ্ছা করে, কিন্তু কার্য সাধনে সক্ষম না হয় তবে আল্লাহ তো জানেন যে তার অন্তরে এটা ছিল এবং কার্য সাধনে সে উদ্যতও ছিল, তাই তার জন্যে একটি পুণ্য লিখা হয়। আর কেউ যদি কোন খারাপ কাজের ইচ্ছা করে তবে তার জন্যে কোন পাপ লিখা হয় না । কিন্তু সে যদি ওটা করে বসে তবে একটিমাত্র পাপ লিখা হয়, ওটা বৃদ্ধি করা হয় না। কেউ যদি কোন ভাল কাজ করে তবে তাকে দশগুণ পুণ্য দেয়া হয়। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে কিছু খরচ করে তখন কখনও তো তাকে দশগুণ পুণ্য দান করা হয়, আবার কোন কোন সময় তার সৎ নিয়ত অনুসারে তাকে তার পুণ্য বৃদ্ধি করতে করতে সাতশ’গুণ পর্যন্ত প্রদান করা হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), তিরমীযী (রঃ) এবং নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আমর ইবনে শু'আয়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা থেকে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “তিন ব্যক্তি জুমআ'র নামাযে হাযির হয়। একজন তো হাযির হয় প্রথা হিসেবে। তার আগমন বৃথা। সুতরাং তার জন্যে কোন অংশও নেই। দ্বিতীয় এমন ব্যক্তি মসজিদে হাযির হয়, যে হাযির হয়ে দু'আ করে থাকে। সুতরাং আল্লাহ ইচ্ছা করলে তার দু'আ ককূল করে থাকেন এবং ইচ্ছা করলে কবুল করেন না। তৃতীয় এমন ব্যক্তি নামাযে হাযির হয়, যে হাযির হয়ে সম্পূর্ণ নীরব থাকে। সে নামাযীদেরকে ভেদ করে সামনে অগ্রসর হয় না, কাউকেও ধাক্কাও দেয় না এবং কাউকেও কষ্টও দেয় না। তাহলে এখন এই ব্যক্তির নামায আগামী জুমআ পর্যন্ত এবং এর পরে আরও তিন দিন পর্যন্তও পাপের কাফফারা হয়ে থাকে। এর কারণ এই যে, আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “কেউ কোন ভাল কাজ করলে সে ওর দশগুণ প্রতিদান পাবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি প্রতি মাসে তিনদিন রোযা রাখলো সে যেন সারা বছর রোযা রাখলো।” এই প্রতিদানও দেয়া হবে এই মূলনীতির উপর ভিত্তি করেই। কেননা, আল্লাহ তা'আলা এর সত্যতা স্বীয় কিতাবে বলে দিয়েছেন। তাই এক দিনের রোযা হবে দশ দিনের রোযার সমান। তাহলে এক বছরে ছত্রিশ দিনের রোযার প্রতিদান তিনশ ষাট দিনের রোযার প্রতিদানের সমান হয়ে যায়। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে এবং পূর্ববর্তী গুরুজনের একটি দল থেকে নকল করা হয়েছে যে, (আরবী)-এই আয়াতে (আরবী) শব্দ দ্বারা কালেমায়ে তাওহীদ অর্থাৎ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু বুঝানো হয়েছে এবং (আরবী) দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে শিক। এই আয়াতের তাফসীরে আরও বহু হাদীস এসেছে। কিন্তু আমি যে কয়টি বর্ণনা করলাম এটাই যথেষ্ট।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।