সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 159)
হরকত ছাড়া:
إن الذين فرقوا دينهم وكانوا شيعا لست منهم في شيء إنما أمرهم إلى الله ثم ينبئهم بما كانوا يفعلون ﴿١٥٩﴾
হরকত সহ:
اِنَّ الَّذِیْنَ فَرَّقُوْا دِیْنَهُمْ وَ کَانُوْا شِیَعًا لَّسْتَ مِنْهُمْ فِیْ شَیْءٍ ؕ اِنَّمَاۤ اَمْرُهُمْ اِلَی اللّٰهِ ثُمَّ یُنَبِّئُهُمْ بِمَا کَانُوْا یَفْعَلُوْنَ ﴿۱۵۹﴾
উচ্চারণ: ইন্নালাযীনা ফাররাকূদীনাহুম ওয়া কা-নূশিয়া‘আল্লাছতা মিনহুম ফী শাইয়িন ইন্নামাআমরুহুম ইলাল্লা-হি ছুম্মা ইউনাব্বিউহুম বিমা-কা-নূইয়াফ‘আলূন।
আল বায়ান: নিশ্চয় যারা তাদের দীনকে বিচ্ছিন্ন করেছে এবং দল-উপদলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের কোন ব্যাপারে তোমার দায়িত্ব নেই। তাদের বিষয়টি তো আল্লাহর নিকট। অতঃপর তারা যা করত, তিনি তাদেরকে সে বিষয়ে অবগত করবেন।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৫৯. নিশ্চয় যারা তাদের দ্বীনকে বিচ্ছিন্ন করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের কোন দায়িত্ব আপনার নয়; তাদের বিষয় তো আল্লাহ্র নিকট তারপর তিনি তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জানাবেন।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: যারা নিজেদের (পূর্ণ পরিণত) দ্বীনকে খন্ডে খন্ডে বিভক্ত করে নিয়েছে আর (আপন আপন অংশ নিয়ে) দলে দলে ভাগ হয়ে গেছে তাদের কোন কাজের সাথে তোমার কোন সম্পর্ক নেই। তাদের ব্যাপারটি পুরোপুরি আল্লাহর ইখতিয়ারভুক্ত। (সময় হলেই) তিনি তাদেরকে জানিয়ে দেবেন তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে।
আহসানুল বায়ান: (১৫৯) অবশ্যই যারা ধর্ম সম্বন্ধে নানা মতের সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে[1] তাদের কোন কাজের দায়িত্ব তোমার নেই, তাদের বিষয় আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত। তিনিই তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে তাদেরকে অবহিত করবেন।
মুজিবুর রহমান: নিশ্চয়ই যারা নিজেদের দীনের মধ্যে নানা মতবাদ সৃষ্টি করে ওকে খন্ড বিখন্ড করেছে এবং বিভিন্ন দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, তাদের সাথে কোন ব্যাপারে তোমার কোন দায়িত্ব নেই, তাদের বিষয়টি নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট সমর্পিত, পরিশেষে তিনিই তাদেরকে তাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবহিত করবেন।
ফযলুর রহমান: যারা নিজেদের ধর্মকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে তুমি তাদের সাথে কোন কিছুতেই নও। তাদের বিষয়টি আল্লাহর কাছে ন্যস্ত রয়েছে। তিনি তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে অবহিত করবেন।
মুহিউদ্দিন খান: নিশ্চয় যারা স্বীয় ধর্মকে খন্ড-বিখন্ড করেছে এবং অনেক দল হয়ে গেছে, তাদের সাথে আপনার কোন সম্পর্ক নেই। তাদের ব্যাপার আল্লাহ তা'আয়ালার নিকট সমর্পিত। অতঃপর তিনি বলে দেবেন যা কিছু তারা করে থাকে।
জহুরুল হক: নিঃসন্দেহ যারা তাদের ধর্মকে বিভক্ত করেছে এবং বিভিন্ন দল হয়ে গেছে, তাদের জন্য তোমার কোনো দায়দায়িত্ব নেই। নিঃসন্দেহ তাদের ব্যাপার আল্লাহ্র কাছে, তিনিই এরপরে তাদের জানাবেন যা তারা করে চলতো।
Sahih International: Indeed, those who have divided their religion and become sects - you, [O Muhammad], are not [associated] with them in anything. Their affair is only [left] to Allah; then He will inform them about what they used to do.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৫৯. নিশ্চয় যারা তাদের দ্বীনকে বিচ্ছিন্ন করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের কোন দায়িত্ব আপনার নয়; তাদের বিষয় তো আল্লাহ্–র নিকট তারপর তিনি তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জানাবেন।(১)
তাফসীর:
(১) এ আয়াতে মুশরিক, ইয়াহুদী, নাসারা ও মুসলিম সবাইকে ব্যাপকভাবে সম্বোধন করা হয়েছে এবং তাদেরকে আল্লাহর সরল পথ পরিহার করার অশুভ পরিণতি সম্পর্কে হুশিয়ার করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলা হয়েছে যে, এসব ভ্রান্ত পথের মধ্যে কিছু পথ সরল পথের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখীও রয়েছে; যেমন, মুশরিক ও আহলে-কিতাবদের অনুসৃত পথ এবং কিছু পথ রয়েছে যা বিপরীতমুখী নয়, কিন্তু সরল পথ থেকে বিচ্যুত করে ডানে-বামে নিয়ে যায়। এগুলো হচ্ছে সন্দেহযুক্ত ও বিদাআতের পথ। এগুলোও মানুষকে পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত করে দেয়। “যারা দ্বীনের মধ্যে বিভিন্ন পথ আবিস্কার করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, তাদের সাথে আপনার কোন সম্পর্ক নেই। তাদের কাজ আল্লাহ্ তা'আলার নিকট সম্পর্কিত। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা তাদের কাছে তাদের কৃতকর্মসমূহ বিবৃত করবেন।”
আয়াতে উল্লেখিত দ্বীনে বিভেদ সৃষ্টি করা এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হওয়ার অর্থ দ্বীনের মূলনীতিসমূহের অনুসরণ ছেড়ে স্বীয় ধ্যান-ধারণা ও প্রবৃত্তি অনুযায়ী কিংবা শয়তানের ধোঁকা ও সন্দেহে লিপ্ত হয়ে দ্বীনে কিছু নতুন বিষয় ঢুকিয়ে দেয়া অথবা কিছু বিষয় তা থেকে বাদ দেয়া। কিছু লোক দ্বীনের মূলনীতি বর্জন করে সে জায়গায় নিজের পক্ষ থেকে কিছু বিষয় ঢুকিয়ে দিয়েছিল। এ উম্মতের বিদ'আতীরাও নতুন ও ভিত্তিহীন বিষয়কে দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত করে থাকে। তারা সবাই আলোচ্য আয়াতের অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বিষয়টি বর্ণনা করে বলেন, বনী-ইসরাঈলরা যেসব অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিল, আমার উম্মতও সেগুলোর সম্মুখীন হবে। তারা যেমন কর্মে লিপ্ত হয়েছিল, আমার উম্মতও তেমনি হবে।
বনী-ইসরাঈলরা ৭২ টি দলে বিভক্ত হয়েছিল, আমার উম্মতে ৭৩ টি দল সৃষ্টি হবে। তন্মধ্যে একদল ছাড়া সবাই জাহান্নামে যাবে। সাহাবায়ে কেরাম আর্য করলেনঃ মুক্তিপ্রাপ্ত দল কোনটি? উত্তর হল, যে দল আমার ও আমার সাহাবীদের পথ অনুসরণ করবে, তারাই মুক্তি পাবে। [তিরমিযীঃ ২৬৪০, ২৬৪১] অনুরূপভাবে ইরবায ইবন সারিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে যারা আমার পর জীবিত থাকবে, তারা বিস্তর মতানৈক্য দেখতে পাবে। তাই (আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছি যে,) তোমরা আমার ও খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে শক্তভাবে আঁকড়ে থেকে নতুন নতুন পথ থেকে সযত্নে গা বাঁচিয়ে চলো। কেননা, দ্বীনে নতুন সৃষ্ট প্রত্যেক বিষয়ই বিদ’আত এবং প্রত্যেক বিদ'আতই পথভ্রষ্টতা। [আবূ দাউদ: ৪৬০৭; তিরমিযী: ২৬৭৬; ইবন মাজাহঃ ৪৩; মুসনাদে আহমাদ: ৪/১২৬]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৫৯) অবশ্যই যারা ধর্ম সম্বন্ধে নানা মতের সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে[1] তাদের কোন কাজের দায়িত্ব তোমার নেই, তাদের বিষয় আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত। তিনিই তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে তাদেরকে অবহিত করবেন।
তাফসীর:
[1] এ থেকে কেউ কেউ ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের বুঝিয়েছেন। তারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত ছিল। কেউ কেউ এ থেকে মুশরিকদের বুঝিয়েছেন। কিছু মুশরিক ফিরিশতাদের, কিছু তারকারাজির এবং কিছু বিভিন্ন মূর্তির পূজা করত। তবে এ আয়াত ব্যাপক। কাফের ও মুশরিকরা সহ সেই সমস্ত লোকই এর আওতাভুক্ত, যারা আল্লাহর দ্বীন এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর তরীকা ত্যাগ করে অন্য দ্বীন বা তরীকা গ্রহণ করে বিচ্ছিন্নতা ও দলাদলির পথ অবলম্বন করে। شِيَعًا এর অর্থ, বিভিন্ন দল। আর এ কথা এমন সকল সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যারা দ্বীনের ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ ছিল পরে তাদের বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ নিজেদের বুযুর্গদের মতকেই নির্ভরযোগ্য এবং সেটাকেই শেষ সিদ্ধান্ত গণ্য করে নিজেদের পথ পৃথক করে নিয়েছে, যদিও সে মত সত্য ও সঠিকতার বিপরীত। (ফাতহুল ক্বাদীর)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৫৯-১৬০ নং আয়াতের তাফসীর:
যারা তাদের দীনকে বিভিন্ন দলে উপদলে বিভক্ত করতঃ বিভিন্ন নাম ধারণ করেছে তাদেরকে ধমক দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: হে নাবী, তাদের দায়িত্ব তোমার নয়। তাদের দায়িত্ব আল্লাহ তা‘আলার, আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে অবহিত করবেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:
(إِنَّ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَالَّذِيْنَ هَادُوْا وَالصّٰبِئِيْنَ وَالنَّصٰرٰي وَالْمَجُوْسَ وَالَّذِيْنَ أَشْرَكُوْآ إِنَّ اللّٰهَ يَفْصِلُ بَيْنَهُمْ يَوْمَ الْقِيٰمَةِ ط إِنَّ اللّٰهَ عَلٰي كُلِّ شَيْءٍ شَهِيْدٌ)
“যারা ঈমান এনেছে এবং যারা ইয়াহূদী হয়েছে, যারা সাবিয়ী, খ্রিস্টান ও অগ্নিপূজক এবং যারা মুশরিক হয়েছে কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেবেন। আল্লাহ সমস্ত কিছুর সম্যক প্রত্যক্ষকারী।”(সূরা হাজ্জ ২২:২৭)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(وَلَا تَکُوْنُوْا کَالَّذِیْنَ تَفَرَّقُوْا وَاخْتَلَفُوْا مِنْۭ بَعْدِ مَا جَا۬ءَھُمُ الْبَیِّنٰتُﺚ وَاُولٰ۬ئِکَ لَھُمْ عَذَابٌ عَظِیْمٌ)
“তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং তাদের কাছে প্রমাণ আসার পর মতভেদে লিপ্ত হয়েছে। তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি।”(সূরা আলি-ইমরান ৩:১০৫)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(مُنِیْبِیْنَ اِلَیْھِ وَاتَّقُوْھُ وَاَقِیْمُوا الصَّلٰوةَ وَلَا تَکُوْنُوْا مِنَ الْمُشْرِکِیْنَﭮﺫ مِنَ الَّذِیْنَ فَرَّقُوْا دِیْنَھُمْ وَکَانُوْا شِیَعًاﺚ کُلُّ حِزْبٍۭ بِمَا لَدَیْھِمْ فَرِحُوْنَ)
“(নিজেকে দীনে প্রতিষ্ঠিত রাখো) বিশুদ্ধচিত্তে আল্লাহ অভিমুখী হয়ে এবং তাকে ভয় কর, সালাত কয়েম কর এবং মুশরিকদের মধ্যে শামিল হয়ো না, যারা তাদের দীনকে খণ্ড-বিখণ্ড করে নিয়েছে এবং ভিন্ন ভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। প্রত্যেক দলই নিজ নিজ অনুসৃত নিয়ম নিয়ে উল্লসিত।”(সূরা রূম ৩০:৩১-৩২)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের তিনটি বিষয়ে সন্তুষ্ট হন আর তিনটি বিষয়ে অসন্তুষ্ট বা অপছন্দ করেন। তিনি তোমাদের জন্য সন্তুষ্ট যে, তোমরা তাঁরই ইবাদত করবে, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না। আর তোমরা আল্লাহ তা‘আলার রজ্জুকে সুদৃঢ় ও সম্মিলিতভাবে আঁকড়ে ধরবে, দলে দলে বিচ্ছিন্ন হবে না। আর তিনি অপছন্দ করেন অনর্থক কথা বলাবলি করা, অনর্থক প্রশ্ন করা এবং সম্পদ নষ্ট করা। (সহীহ মুসলিম হা: ৪৫৭৮)
অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: জামা‘আতের ওপর আল্লাহ তা‘আলার হাত রয়েছে। (তিরমিযী হা: ২১৬৬, সহীহ)
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: আয়াতে বিভক্ত জাতি দ্বারা উদ্দেশ্য ইয়াহুদ ও খ্রিস্টানরা। কারণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নবুওয়াতের পর তারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। (ইবনু কাসীর ৩/৪১৯)। কেউ কেউ বলেছেন: কিছু মুশরিক ফেরেশতাদের, কিছু তারকারাজির এবং কিছু বিভিন্ন মূর্তির পূজা করত। তবে এ আয়াত ব্যাপক।
দলে দলে বিভক্ত হওয়া হকপন্থীদের বৈশিষ্ট্য নয়, বরং তা মুশরিক, বিদ‘আতী ও প্রবৃত্তির অনুসারীদের কাজ। বিদআতীরা তাদের প্রবৃত্তি যা ভাল মনে করে সে ধারণানুযায়ী বিভিন্ন তরীকা, ওযীফা ও সবক তৈরি করে মানুষকে নিজেদের দল ও মতের দিকে আহ্বান করে জান্নাতের যিম্মাদারী নিচ্ছে। জেনে রাখুন, এসব শয়তানের তরীকা, মুসলিমদের তরীকা হল একটি। তা হল কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ। বিভিন্ন পথ, মত ও তরীকা তৈরি করে মুসলিমদেরকে দলে দলে বিভক্ত করা গোমরাহী ছাড়া কিছুই নয়।
(مَنْ جَا۬ءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَه۫ عَشْرُ اَمْثَالِھَا)
‘কেউ কোন সৎ কাজ করলে সে তার দশ গুণ পাবে’এ আয়াতে সৎ আমলকারীদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার দয়া ও অনুগ্রহের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যে ব্যক্তি একটি ভাল আমল করবে তার বিনিময়ে আল্লাহ তা‘আলা দশ গুণ প্রতিদান দেবেন। আবার যে খারাপ আমল করবে তার বিনিময়ে আল্লাহ তা‘আলা দশ গুণ গুনাহ দেবেন না। বরং ঐ একটি খারাপ আমলের যে গুনাহ হয় তাই দেবেন। আল্লাহ তা‘আলা পারতেন ভাল কাজের বিনিময়ে একটি মাত্র নেকী দিতে কিন্তু এটাই হল আল্লাহ তা‘আলার দয়া যা ছাড়া কোন মানুষ জান্নাতে যেতে পারবে না।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আল্লাহ তা‘আলা বলেন, নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক দয়ালু। যে ব্যক্তি একটি সৎ কাজের মনস্থ করেছে, কিন্তু আমল করেনি তার জন্য একটি নেকী লিখা হয়। আর যদি কমিটি করে তাহলে দশ থেকে সাতশত পর্যন্ত নেকী লেখা হয়। এমনকি এর চেয়েও বেশি। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কোন খারাপ কাজের মনস্থ করে, কিন্তু বাস্তবে তা করল না তার জন্য একটি নেকী লেখা হয়। আর যদি করেই ফেলে তাহলে একটি গুনাহ লেখা হয়। অথবা তা মিটিয়ে দেন। আল্লাহ তা‘আলা তাকেই ধ্বংস করেন যে নিজেকে ধ্বংস করে। (সহীহ বুখারী হা: ৬৪৯১)
এরূপ অসংখ্য সহীহ হাদীস রয়েছে যেখানে বলা হয়েছে সৎ কাজের বেশি প্রতিদান দেয়ার কথা আর খারাপ কাজের অনুরূপ প্রতিদান দেয়ার কথা। ( ইবনে কাসীর, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ৪২১-৪২৩)
তাই দীনের ভিতর দলাদলি সৃষ্টি করা যা মুসলিম ঐক্যের প্রতিবন্ধক এমন কাজ অবশ্যই বর্জনীয়। আমাদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। আসুন, আমরা সকল মুসলিম! সকল তরীকা, মাযহাব ও মতাদর্শ বর্জন করে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর দিকে ফিরে আসি। তবেই আমরা আবার ইসলামের স্বর্ণ যুগ ফিরে পারবো ইনশা-আল্লাহ। আর যদি আপন আপন মত ও তরীকার দিকে আহ্বান জানাই, শুধু মুখে ঐক্যের বুলি আওড়াই তাহলে কখনও ঐক্য সম্ভব নয়। সুতরাং আকীদাহ-আমল সকল ক্ষেত্রে ঐক্যের মানদন্ড হবে কুরআন ও সহীহ হাদীস, তাহলেই ঐক্য সম্ভব। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সেই তাওফীক দান করুন, আমীন।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. দীনের মধ্যে দল উপদল সৃষ্টি করা হারাম।
২. যারা ব্যক্তি ও গোষ্ঠির স্বার্থে দলে দলে বিভক্ত হয়ে যায় তাদের সাথে মু’মিনদের কোন সম্পর্ক নেই।
৩. মু’মিনদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার কিরূপ দয়া ও অনুগ্রহ তা জানতে পারলাম।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: এ আয়াতটি ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নবুওয়াতের পূর্বে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানেরা পরস্পর মতানৈক্য সৃষ্টি করতে এবং নিজ নিজ ধর্ম পৃথক সাব্যস্ত করতো। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রেরিত হন তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। বলা হয়, হে নবী (সঃ)! যারা নিজেদের ধর্মের মধ্যে নানা মতবাদ সৃষ্টি করতঃ ওকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে এবং বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, তাদের সাথে তোমার কোন সম্পর্ক নেই এবং তোমার সাথে তাদেরও কোন সম্পর্ক নেই। এরা হচ্ছে বিদআতী, সন্দেহ পোষণকারী পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়। কিন্তু এই হাদীসে একটি সনদ ঠিক নয়।
আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, এটা এই উম্মতের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। আর (আরবী) দ্বারা খারেজীদেরকে বুঝানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে বলেছিলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে বিদআতীরা। এ হাদীসটিও গারীব এবং মারফু' রূপেও বিশুদ্ধ নয়। (এটা হচ্ছে মুজাহিদ (রঃ), কাতাদাহ (রঃ), যহহাক (রঃ) এবং সুদ্দী (রঃ)-এর উক্তি) তবে প্রকাশ্য কথা এই যে, এ আয়াতটি সাধারণ । এমন প্রত্যেক ব্যক্তির উপরই এটা প্রযোজ্য হতে পারে যে আল্লাহর দ্বীনে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে এবং দ্বীনের বিরোধী হয়ে যায়। কেননা, আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সত্য ধর্মের হিদায়াতসহ প্রেরণ করেছেন যেন তিনি সমস্ত দ্বীনের উপর দ্বীনে ইসলামকে জয়যুক্ত করেন। ইসলামের পথ একটাই। তাতে কোন মতভেদ ও বিচ্ছিন্নতা নেই। যারা পথক দল অবলম্বন করেছে, যেমন বাহাত্তর দল বিশিষ্ট লোকেরা, আল্লাহর রাসূল (সঃ) তাদের থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। এ আয়াতটি ঐ আয়াতের মতই, যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “হে নবী (সঃ)! তোমাদের জন্যে আমি ঐ দ্বীনকেই পছন্দ করেছি যা নূহ (আঃ) -এর জন্যে ছিল।” হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা নবীরা বৈমাত্রেয় সন্তানদের মত। যেমন বৈমাত্রেয় সন্তানদের পিতা একজনই হয় তেমনই আমাদের সকলেরই দ্বীন বা ধর্ম একটাই। এটাই হচ্ছে সিরাতে মুসতাকীম এবং এটাই হচ্ছে ঐ হিদায়াত যা রাসূলগণ এক আল্লাহর। ইবাদত সম্পর্কে পেশ করেছেন এবং সর্বশেষ রাসূল (সঃ)-এর শরীয়তকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করাকে সিরাতে মুসতাকীম বানিয়েছেন। এটা ছাড়া সমস্ত কিছুই পথভ্রষ্টতা ও মূর্খতা। রাসূলগণ ওগুলো থেকে মুক্ত । যেমন আল্লাহ পাক এখানে বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তাদের সাথে কোন ব্যাপারে তোমার কোন সম্পর্ক নেই। এরপর ইরশাদ হচ্ছে-তাদের বিষয়টি আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে দাও। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদেরকে তাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবহিত করবেন। যেমন তিনি এক জায়গায় বলেনঃ “যারা ঈমান এনেছে, আর যারা ইয়াহূদী রয়েছে বা তারকাপূজক, খ্রীষ্টান, মাজুস কিংবা মুশরিক রয়েছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের মধ্যে ফায়সালা করবেন।” এখন এরপর আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন স্বীয় হুকুম এবং বিচারের মধ্যেও নিজের স্নেহ ও দয়ার বর্ণনা পরবর্তী আয়াতে দিচ্ছেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।