সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 118)
হরকত ছাড়া:
فكلوا مما ذكر اسم الله عليه إن كنتم بآياته مؤمنين ﴿١١٨﴾
হরকত সহ:
فَکُلُوْا مِمَّا ذُکِرَ اسْمُ اللّٰهِ عَلَیْهِ اِنْ کُنْتُمْ بِاٰیٰتِهٖ مُؤْمِنِیْنَ ﴿۱۱۸﴾
উচ্চারণ: ফাকুলূমিম্মা-যুকিরাছমুল্লা-হি ‘আলাইহি ইন কুনতুম বিআ-য়া-তিহী মু’মিনীন।
আল বায়ান: সুতরাং তোমরা আহার কর তা থেকে, যার উপর আল্লাহর নাম নেয়া হয়েছে, যদি তোমরা তাঁর আয়াতসমূহের ব্যাপারে বিশ্বাসী হও।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১১৮. সুতরাং তোমরা তার আয়াতসমূহে ঈমানদার হলে, যাতে আল্লাহ্র নাম নেয়া হয়েছে তা থেকে খাও;
তাইসীরুল ক্বুরআন: কাজেই যে পশু যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম নেয়া হয়েছে তা তোমরা খাও যদি তাঁর নিদর্শনাবলীতে তোমরা বিশ্বাসী হয়ে থাক।
আহসানুল বায়ান: (১১৮) তোমরা যদি তাঁর আয়াতসমূহে বিশ্বাসী হও, তাহলে যার যবেহকালে আল্লাহর নাম নেওয়া হয়েছে, তা ভক্ষণ কর।[1]
মুজিবুর রহমান: অতএব যে জীবকে আল্লাহর নাম নিয়ে যবাহ করা হয়েছে তা তোমরা আহার কর, যদি তোমরা আল্লাহর বিধানের প্রতি ঈমান রাখ।
ফযলুর রহমান: আল্লাহর নাম নিয়ে জবাই-করা প্রাণীর মাংস খাও, যদি তোমরা তাঁর বিধানসমূহে বিশ্বাসী হও।
মুহিউদ্দিন খান: অতঃপর যে জন্তুর উপর আল্লাহর নাম উচ্চারিত হয়, তা থেকে ভক্ষণ কর যদি তোমরা তাঁর বিধানসমূহে বিশ্বাসী হও।
জহুরুল হক: কাজেই আহার করো যার উপরে আল্লাহ্র নাম উল্লেখ করা হয়েছে, -- যদি তোমরা তাঁর নির্দেশসমূহে বিশ্বাসী হও।
Sahih International: So eat of that [meat] upon which the name of Allah has been mentioned, if you are believers in His verses.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১১৮. সুতরাং তোমরা তার আয়াতসমূহে ঈমানদার হলে, যাতে আল্লাহ্–র নাম নেয়া হয়েছে তা থেকে খাও;
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১১৮) তোমরা যদি তাঁর আয়াতসমূহে বিশ্বাসী হও, তাহলে যার যবেহকালে আল্লাহর নাম নেওয়া হয়েছে, তা ভক্ষণ কর।[1]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, যে পশুকে শিকার অথবা যবেহ বা নহর করার সময় আল্লাহর নাম নেওয়া হয়, তা খাও; যদি তা এমন পশু হয় যা খাওয়া বৈধ। এর অর্থ হল, যে পশুকে শিকার অথবা যবেহ বা নহর করার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর নাম নেওয়া হয় না, তা হালাল ও বৈধ নয়। তবে যবেহ করার সময় যবেহকারী আল্লাহর নাম নিয়েছে, না নেয়নি --এই সন্দেহজনক ব্যাপারটা এ থেকে স্বতন্ত্র। এ ব্যাপারে বিধান হল, আল্লাহর নাম নিয়ে তা খাও। হাদীসে আছে কিছু লোক রসূল (সাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, একদল লোক আমাদের কাছে গোশত নিয়ে আসে (এ থেকে বুঝানো হয়েছে এমন মরুবাসীদেরকে, যারা নতুন নতুন ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং সম্পূর্ণরূপে ইসলামী জ্ঞান লাভ করতে পারে নি।) আমরা জানি না যে, তারা (যবেহকালে) আল্লাহর নাম নিয়েছে, না নেয়নি? তখন তিনি বললেন, سَمُّوْا عَلَيْهِ أَنْتُمْ وَكُلُوْا )) অর্থাৎ, তোমরা আল্লাহর নাম নিয়ে তা খাও। (বুখারী) অর্থাৎ, সন্দেহজনক অবস্থায় এর অনুমতি আছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, সর্বপ্রকার পশুর গোশত ‘বিসমিল্লাহ’ পড়ে নিলেই হালাল হয়ে যাবে। এ থেকে ঊর্ধ্বপক্ষে কেবল এতটাই প্রমাণিত হয় যে, মুসলিমদের বাজার ও দোকানে যে গোশত পাওয়া যায়, তা হালাল। হ্যাঁ, যদি কেউ উক্ত সন্দেহ ও দ্বিধায় পতিত হয়, তবে সে খাওয়ার সময় ‘বিসমিল্লাহ’ পড়ে নেবে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১১৬-১২১ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীবাসী সম্পর্কে বলেন যে, তাদের অধিকাংশই পথভ্রষ্ট। কারণ তারা ধারণার অনুসারী। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلَقَدْ ضَلَّ قَبْلَهُمْ أَكْثَرُ الْأَوَّلِيْنَ)
“আর তাদের পূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছিল পূর্ববর্তীদের অধিকাংশই।”(সূরা সাফফাত ৩৭:৭১)
অন্যত্র তিনি বলেন:
(وَمَآ أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِيْنَ)
“তুমি যতই আকাক্সক্ষা কর না কেন, অধিকাংশ লোকই বিশ্বাসী নয়।”(সূরা ইউসুফ ১২:১০৩)
তাই আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলছেন, তুমি যদি অধিকাংশ মানুষের অনুসরণ কর তাহলে তারা তোমাকে তাদের মত পথভ্রষ্ট করে ফেলবে।
অতএব সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্যের মাপকাঠি হতে পারে না। সত্যের পক্ষে একজন থাকলেও সত্যের পথই অবলম্বন করা উচিত। সুতরাং সত্যের মাপকাঠি হল কুরআন ও সহীহ হাদীস।
১১৮-১২১ নং আয়াতের শানে নুযূল:
ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, কিছু মানুষ নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আগমন করল। অতঃপর বলল: হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমরা যা হত্যা করি তা খাব আর আল্লাহ তা‘আলা যা হত্যা করেন তা খাব না? তখন
(فكلوا مما ذكر.......لمشركون)
নাযিল হয়। (তিরমিযী, হা: ৩০৬৯, সহীহ।)
ইবনু আব্বাস থেকে অন্য বর্ণনায় রয়েছে: (শয়তানরা) বলে: আল্লাহ তা‘আলা যা জবাই করে দেন তা খাও না আর নিজেরা যা জবাই কর কেবল তা খাও? তখন
(وَإِنَّ الشَّيٰطِيْنَ لَيُوْحُوْنَ إِلٰٓي أَوْلِيَآئِهِمْ)
নাযিল হয়। (নাসাঈ হা: ৪৪৩৭, সনদ সহীহ)
(فَكُلُوْا مِمَّا ذُكِرَ اسْمُ اللّٰهِ عَلَيْهِ)
‘তোমরা তাঁর নিদর্শনে বিশ্বাসী হলে যা আল্লাহর নাম নিয়ে (জবেহ করা) হয়েছে তা হতে খাও।’যেসব জন্তু আল্লাহ তা‘আলার নাম নিয়ে জবেহ করা হয় তা খাওয়া মুসলিমদের জন্য তিনি বৈধ করে দিয়েছেন। আর যা জবেহ করার সময় তাঁর নাম নেয়া হয়নি তা হারাম করেছেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(لَا تَأْكُلُوْا مِمَّا لَمْ يَذْكُرِ اسْمُ اللّٰهِ عَلَيْهِ)
‘যাতে আল্লাহর নাম নিয়ে (জবেহ করা) হয়নি তার কিছুই তোমরা খেও না।’
তাই কোন শিকার ধরে নিয়ে আসার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রাণী প্রেরণ করলে অবশ্যই ‘বিসমিল্লাহ’ বলে পাঠাতে হবে। আর যদি এমন এলাকা থেকে কোন জবেহকৃত প্রাণী বা গোশত আসে যে, তারা আল্লাহ তা‘আলার নাম নিয়েছে কি না তা জানা যায়নি, তা হলে ‘বিসমিল্লাহ’বলে খাওয়া বৈধ হবে। (সহীহ বুখারী হা: ৫৫০৭)
যা হারাম তা আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করে দিয়েছেন। তবে কেউ নিরুপায় হয়ে হারাম খেতে বাধ্য হলে তাও তার জন্য জায়েয রয়েছে। এ সম্পর্কে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।
তারপর আল্লাহ তা‘আলা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল পাপের কাজ ত্যাগ করার নির্দেশ দিচ্ছেন।
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّـيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ)
“বল: নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক হারাম করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা।”(সূরা আ‘রাফ ৭:৩৩)
নাউয়াস বিন সামআন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে গুনাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উত্তরে বলেন: গুনাহ হল তা-ই যা করলে তোমার মনে খটকা লাগে এবং তুমি এটা অপছন্দ কর যে, মানুষ তা জেনে ফেলবে। (সহীহ মুসলিম হা: ৬৬৮০, তিরমিযী হা: ২৩৮৯)
(وَإِنَّه۫ لَفِسْقٌ)
‘তা অবশ্যই পাপ’ অর্থাৎ ইচ্ছাকৃতভাবে যে পশুকে আল্লাহ তা‘আলার নাম ছাড়া বা কোন দেব দেবীর নামে জবেহ করা হয়েছে তা খাওয়া ফাসেকী বা হারাম কাজ।
ইবনু আব্বাস (রাঃ) এই অর্থই করেছেন। তিনি বলেন: যে ভুলে যায় তাকে ফাসিক বলা হয় না।
ইমাম বুখারী (রহঃ)-ও এ মত পোষণ করেছেন। ইমাম শাফিঈ (রহঃ) বলেন: মুসলিমদের জবেহ করা পশু উভয় অবস্থাতেই হালাল, আল্লাহ তা‘আলার নাম নিয়ে যবাই করুক আর ভুলবশতঃ নাম ছাড়াই জবাই করুক।
(وَإِنَّه۫ لَفِسْقٌ)
বলতে তিনি আল্লাহ তা‘আলাকে বাদ দিয়ে অন্যের নামে জবেহ করাকে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ অন্যের নামে জবেহ করলে খাওয়া হারাম হয়ে যাবে।
(وَإِنْ أَطَعْتُمُوْهُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُوْنَ)
“যদি তোমরা তাদের কথামত চল তবে তোমরা অবশ্যই মুশরিক হবে” অর্থাৎ তাদের কথা শুনে মৃত জন্তু খাওয়া হালাল করে নাও, তাহলে তোমরাও মুশরিক হয়ে যাবে। সুতরাং আয়াত প্রমাণ করে- আল্লাহ তা‘আলা যা হারাম করেছেন তা হালাল করে নিলে মুশকিরক হয়ে যাবে।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্যের মাপকাঠি নয় বরং সত্যের মাপকাঠি হচ্ছে কুরআন ও সহীহ হাদীস।
২. আল্লাহ তা‘আলার ভাষায় অধিকাংশ মানুষ পথভ্রষ্ট।
৩. যা আল্লাহ তা‘আলার নাম নিয়ে জবেহ করা হবে কেবল তা-ই খাওয়া মুসলিমদের জন্য বৈধ।
৪. প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল প্রকার পাপ মুসলিমদেরক পক্ষে বর্জন করা আবশ্যক।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১১৮-১১৯ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দারদেরকে অনুমতি দিচ্ছেন যে, কোন জীবকে যবাই করার সময় বিসমিল্লাহ বলা হলে তারা সেই জীবের গোশত খেতে পারে। অর্থাৎ যে জন্তুকে আল্লাহর নাম না নিয়ে যবাই করা হয় তা হারাম। যেমন কাফির কুরায়শরা মৃত জন্তুকে ভক্ষণ করতো এবং যে জন্তুগুলোকে মূর্তি ইত্যাদির নামে যবাই করা হতো সেগুলোকেও খেতো। মহান আল্লাহ বলেন, যে জন্তুর উপর আল্লাহর নাম নেয়া হয়েছে তা তোমরা খাবে না কেন? তিনি তো হারাম জিনিসগুলো তোমাদের জন্যে বর্ণনা করে দিয়েছেন এবং স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ ফাস্সালা অর্থাৎ তাশদীদসহ পড়েছেন এবং কেউ কেউ ফাসালা অর্থাৎ তাখফীফসহ পড়েছেন। দু'টোরই অর্থ হচ্ছে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা। আল্লাহ পাক বলেনঃ তবে হ্যা, অত্যন্ত নিরুপায় অবস্থায় পতিত হলে সবকিছুই তোমাদের জন্যে হালাল।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা মুশরিকদের মিথ্যা ও ভিত্তিহীন মতবাদের উল্লেখ করে বলেনঃ তারা কিভাবে নিজেদের জন্যে এবং গায়রুল্লাহর নামে যবাইকৃত জন্তুকে হালাল করে নিয়েছে! তাদের অধিকাংশই অজ্ঞতার কারণে স্বীয় কুপ্রবৃত্তির পিছনে পড়ে পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে। আল্লাহ ঐ সব সীমা অতিক্রমকারীকে ভালরূপেই অবগত আছেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।