সূরা আল-মায়েদা (আয়াত: 55)
হরকত ছাড়া:
إنما وليكم الله ورسوله والذين آمنوا الذين يقيمون الصلاة ويؤتون الزكاة وهم راكعون ﴿٥٥﴾
হরকত সহ:
اِنَّمَا وَلِیُّکُمُ اللّٰهُ وَ رَسُوْلُهٗ وَ الَّذِیْنَ اٰمَنُوا الَّذِیْنَ یُقِیْمُوْنَ الصَّلٰوۃَ وَ یُؤْتُوْنَ الزَّکٰوۃَ وَ هُمْ رٰکِعُوْنَ ﴿۵۵﴾
উচ্চারণ: ইন্নামা-ওয়ালিইইয়ুকুমুল্লা-হুওয়ারাছূলুহূওয়াল্লাযীনা আ-মানূল্লাযীনা ইউকীমূনাসসালাতা ওয়া ইউ’তূনাযযাকা-তা ওয়া হুম রা-কি‘ঊন।
আল বায়ান: তোমাদের বন্ধু কেবল আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনগণ, যারা সালাত কায়েম করে এবং যাকাত প্রদান করে বিনীত হয়ে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫৫. তোমাদের বন্ধু(১) তো কেবল আল্লাহ, তার রাসূল(২) ও মুমিনগণ- যারা সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং তারা বিনীত।(৩)
তাইসীরুল ক্বুরআন: তোমাদের বন্ধু কেবল আল্লাহ, তাঁর রসূল ও মু’মিনগণ যারা নামায কায়িম করে, যাকাত আদায় করে এবং আল্লাহর কাছে অবনত হয়।
আহসানুল বায়ান: (৫৫) নিশ্চয় তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ তাঁর রসূল ও বিশ্বাসীগণ;[1] যারা বিনত হয়ে নামায পড়ে ও যাকাত আদায় করে।
মুজিবুর রহমান: তোমাদের বন্ধুতো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং মু’মিনগণ - যারা সালাত সুপ্রতিষ্ঠিত করে, যাকাত প্রদান করে এবং বিনম্র।
ফযলুর রহমান: বস্তুত তোমাদের বন্ধু হল আল্লাহ, তাঁর রসূল আর বিশ্বাসীগণ—যারা বিনয়াবনত হয়ে নামায সুসম্পন্ন করে ও যাকাত দেয়।
মুহিউদ্দিন খান: তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ তাঁর রসূল এবং মুমিনবৃন্দ-যারা নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং বিনম্র।
জহুরুল হক: নিঃসন্দেহ তোমাদের ওলী হচ্ছেন কেবলমাত্র আল্লাহ্ এবং তাঁর রসূল, আর যারা ঈমান এনেছে, আর যারা নামায কায়েম করে, আর যাকাত আদায় করে, আর তারা রুকুকারী।
Sahih International: Your ally is none but Allah and [therefore] His Messenger and those who have believed - those who establish prayer and give zakah, and they bow [in worship].
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৫৫. তোমাদের বন্ধু(১) তো কেবল আল্লাহ, তার রাসূল(২) ও মুমিনগণ- যারা সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং তারা বিনীত।(৩)
তাফসীর:
(১) এ আয়াতে মুসলিমদের গভীর বন্ধুত্ব ও বিশেষ বন্ধুত্ব যাদের সাথে হতে পারে, তাদের গুণাগুণ বর্ণনা করা হচ্ছে। বলা হয়েছে, প্রথমতঃ তারা পূর্ণ আদব ও শর্তাদিসহ নিয়মিত সালাত আদায় করে। দ্বিতীয়তঃ স্বীয় অর্থ-সম্পদ থেকে যাকাত প্রদান করে। তৃতীয়তঃ তারা বিনম্র ও বিনয়ী স্বীয় সৎকর্মের জন্য গর্বিত নয়, তারা মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার করে। [সা'দী]
(২) ফাইরোয আদ-দাইলামী বলেন, তার সম্প্রদায় ইসলাম গ্রহণ করার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তাদের প্রতিনিধি পাঠালেন। তারা এসে বললঃ হে আল্লাহর রাসূল, আমরা তো ঈমান এনেছি, এখন আমার বন্ধু-অভিভাবক কে? তিনি বললেন, আল্লাহ ও তার রাসূল। তারা বললঃ আমাদের জন্য এটাই যথেষ্ট এবং আমরা সন্তুষ্ট। [মুসনাদে আহমাদঃ ৪/২৩২]
(৩) আয়াতে উল্লেখিত (وَهُمْ رَاكِعُونَ) এ ركوع শব্দের কয়েকটি অর্থ হতে পারে। কোন কোন তাফসীরবিদ বলেনঃ এখানে রুকূ’ অর্থ পারিভাষিক রুকূ’, যা সালাতের একটি রুকন। অর্থাৎ আর তারা রুকুকারী। [ফাতহুল কাদীর] এটা যেমন ফরয সালাতের সাধারণ রুকু উদ্দেশ্য হতে পারে, তেমনিভাবে নফল সালাত আদায়কারী অর্থেও হতে পারে। [বাগভী, জালালাইন] পক্ষান্তরে অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এখানে রুকু বলে বিনম্র ও খুশু-খুযু সম্পন্ন হওয়া বোঝানো হয়েছে। [ইবন কাসীর, সা’দী] প্রথম অর্থের ক্ষেত্রে واو টি عطف এর জন্য। আর দ্বিতীয় অর্থের ক্ষেত্রে واو টি حال বা অবস্থা নির্দেশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ইবন কাসীর এ অর্থটি গৌন বিবেচনা করেছেন।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৫৫) নিশ্চয় তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ তাঁর রসূল ও বিশ্বাসীগণ;[1] যারা বিনত হয়ে নামায পড়ে ও যাকাত আদায় করে।
তাফসীর:
[1] যখন ইয়াহুদ ও নাসারদের সাথে বন্ধুত্ব নিষেধ করা হয়েছে, তখন কাদের সাথে বন্ধুত্ব করা যাবে? এই প্রশ্নের উত্তরে বলা হচ্ছে, ঈমানদারগণের বন্ধু সর্বপ্রথম আল্লাহ ও তাঁর রসূল, অতঃপর যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের একান্ত অনুগত। পরবর্তীতে তাদের আরো গুণাবলী উল্লেখ করা হচ্ছে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৫৪-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদেরকে সতর্ক ও সাবধান করে বলেন, তোমাদের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণ করার পর তা ত্যাগ করবে জেনে রেখ, আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের পরিবর্তে এমন এক সম্প্রদায় নিয়ে আসবেন যাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা ভালবাসবেন এবং তারাও আল্লাহ তা‘আলাকে ভালবাসবে। তারা মু’মিনদের প্রতি দয়ালু ও কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে। এটা মু’মিনদের পরিপূর্ণতার গুণ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِلْمُؤْمِنِيْنَ)
“তুমি মু’মিনদের জন্য তোমার দয়ার ডানা অবনমিত কর”(সূরা হিজর ১৫:৮৮) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللّٰهِ ط وَالَّذِيْنَ مَعَه۫ٓ أَشِدَّا۬ءُ عَلَي الْكُفَّارِ رُحَمَا۬ءُ بَيْنَهُمْ)
“মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। যারা তাঁর সাথে আছে তারা কাফিরদের ওপর কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে সহানুভূতিশীল ও কোমল।”(সূরা ফাতহ ৪৮:২৯)
তাদের অন্যতম আরেকটি গুণ হল, তারা আল্লাহ তা‘আলার পথে জিহাদ করবে, কোন ভর্ৎসনাকারীর ভর্ৎসনাকে ভয় করবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(يَآ أَيُّهَا النَّبِيُّ جَاهِدِ الْكُفَّارَ وَالْمُنٰفِقِيْنَ وَاغْلُظْ عَلَيْهِمْ)
“হে নাবী! কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর এবং তাদের প্রতি কঠোর হও।”(সূরা তাওবাহ ৯:৭৩)
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তা‘আলা বলেন: মু’মিনদের বন্ধু কেবল আল্লাহ তা‘আলা, রাসূলুল্লাহ ও মু’মিনগণ যারা সালাত কায়িম করে ও যাকাত দেয়। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(اَللّٰهُ وَلِيُّ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا يُخْرِجُهُمْ مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَي النُّوْرِ)
“মু’মিনদের অভিভাবক হচ্ছেন আল্লাহ। তিনি তাদেরকে অন্ধকারসমূহ হতে আলোর দিকে নিয়ে আসেন।” (সূরা বাক্বারাহ ২:২৫৭)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(وَالْمُؤْمِنُوْنَ وَالْمُؤْمِنٰتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَا۬ءُ بَعْضٍ)
“মু’মিন নর ও মু’মিন নারী একে অপরের বন্ধু।”(সূরা তাওবাহ ৯:৭১) অতএব কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব রাখার কোন সুযোগ নেই।
(فَإِنَّ حِزْبَ اللّٰهِ هُمُ الْغٰلِبُوْنَ)
‘আল্লাহর দলই বিজয়ী হবে।’এখানে আল্লাহ তা‘আলার দলের বিজয়ী হবার কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলার দলের বৈশিষ্ট্য এবং বিজয়ী হবার কারণ কী তা সূরা মুযাদালার ২১ ও ২২ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “আল্লাহ লিখে রেখেছেন যে, আমি এবং আমার রাসূলগণ নিশ্চয়ই জয় লাভ করব। নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিশালী, মহাপ্রতাপশালী। যারা আল্লাহর প্রতি ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, তাদেরকে তুমি এমন লোকেদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবে না যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করে, যদিও তারা তাদের পিতা অথবা তাদের পুত্র অথবা তাদের ভাই, অথবা তাদের জাতি-গোষ্ঠী হোক না কেন। আল্লাহ তাদের অন্তরে ঈমান সুদৃঢ় করে দিয়েছেন এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর পক্ষ থেকে (অদৃশ্য) রূহ দিয়ে। তিনি তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার তলদেশে ঝর্ণাসমূহ প্রবাহিত হয়, সেথায় তারা চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল। জেনে রেখ, আল্লাহর দলই সফলতা লাভ করবে।” (সূরা মুজাদালাহ ৫৮:২১-২২)
সুতরাং দীন বর্জন করে কাফির মুশরিকদেরকে মুসিলমদের সহযোগিতা করাতে আল্লাহ তা‘আলার কিছু আসে যায় না; বরং আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ধ্বংস করে তদস্থলে এমন জাতি নিয়ে আসবেন যারা উক্ত গুণে গুণান্বিত হবে।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. মু’মিনরা নিজের প্রতি কোমল আর কাফিরদের প্রতি কঠোর।
২. মু’মিনদের প্রকৃত বন্ধু আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল।
৩. মু’মিনগণ আল্লাহ তা‘আলা, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও মু’মিনদের সাথে বন্ধুত্ব রাখলে ফলাফল কী হবে তাও জানতে পারলাম।
৪. মু’মিনরা আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় জিহাদ করে, কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারকে পরওয়া করে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৫৪-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর:
মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ সংবাদ দিচ্ছেন যে, যদি কেউ এ পবিত্র দ্বীন ত্যাগ করে, তবে সে ইসলামের একটুও ক্ষতি করতে পারবে না। কেননা, আল্লাহ তাদের পরিবর্তে এমন লোকদেরকে এ সত্য ধর্মের খিদমতে লাগিয়ে দেবেন যারা সবদিক দিয়েই এদের চেয়ে উত্তম হবে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে- (আরবী) (৪:১৩৩) অন্য এক জায়গায় রয়েছে- (আরবী) (১৪:১৯) এসব আয়াতের ভাবার্থ ওটাই যা বর্ণনা করা হলো। হককে ছেড়ে দিয়ে বাতিলের দিকে ফিরে যাওয়াকে (আরবী) বলা হয়। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি কুরাইশ নেতৃবর্গের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর খিলাফতকালে যেসব লোক ইসলাম থেকে ফিরে গিয়েছিল তাদের হুকুম এ আয়াতে রয়েছে। তাদের পরিবর্তে যে কওমকে আনয়নের ওয়াদা করা হচ্ছে, তার হচ্ছে আহলে কাদেসিয়া বা কওমে সাবা অথবা আহলে ইয়ামান, যারা কিনদাহ ও সুকূ গোত্রের লোক। একটি খুবই গরীব মারফু হাদীসেও শেষোক্ত কথাটি বর্ণিত আছে। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেনঃ “তারা এ লোকটির কওমের লোক।”
ঐ পূর্ণ ঈমানদারদের গুণাবলী বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা তাদের বন্ধুদের প্রতি (অর্থাৎ মুসলমানদের প্রতি খুবই কোমল ও নম্র হবে, কিন্তু কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর। যেমন অন্য আয়াতে বলা হয়েছে।' (আরবী) অর্থাৎ “তারা কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর আর পরস্পরের প্রতি অত্যন্ত কোমল ও দয়ালু।” (৪৯:২৯) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি
(আরবী) ছিলেন। অর্থাৎ তিনি বন্ধুদের সামনে ছিলেন।
হাসিমুখ ও প্রফুল্ল চেহারা বিশিষ্ট, আর শত্রুদের সামনে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও সংগ্রামী বীর পুরুষ। মুসলমানরা জিহাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় না, পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে না, ক্লান্ত হয়ে পড়ে না, ভীরুতা প্রকাশ করে না এবং বিলাসপ্রিয় হয় না। তারা আল্লাহর ওয়াস্তে কাজ করতে গিয়ে কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারকে ভয় করে না। আল্লাহর আনুগত্য করা, তার শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা, ভাল কাজের হুকুম করা এবং মন্দ কাজ হতে বিরত রাখা ইত্যাদি কাজে তারা সদা নিমগ্ন থাকে।
ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সামিত (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আবু যার (রাঃ) বলেনঃ “আমার বন্ধু (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) আমাকে সাতটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন। (১) মিসকীনদের ভালবাসা এবং তাদের সাথে উঠাবসা করা। (২) (পার্থিব বিষয়ে) নিজের চেয়ে নিম্নস্তরের লোকের প্রতি দৃষ্টিপাত করা এবং উচ্চ পর্যায়ের লোকের দিকে নযর না দেয়া। (৩) আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখা যদিও ঐ আত্মীয় তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। (৪) কারও কাছে কিছু না চাওয়া। (৫) তিক্ত হলেও সত্য কথা বলা। (৬) আল্লাহর ব্যাপার (ধর্মীয় কাজে) কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারকে ভয় না করা। (৭) অধিকাংশ সময় (আরবী)- এ কালেমাটি পাঠ করা, কেননা এটা আরশের কোষাগার।” অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আবু যার (রাঃ) বলেনঃ “আমি পাঁচবার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে দীক্ষা গ্রহণ করেছি এবং তিনি আমাকে সাতটি কাজ পরিপূর্ণভাবে আদায় করতে বলেছেন। আর আমি সাতবার নিজের উপর আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলেছি যে, আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে কোন ভৎসনাকারীর ভৎসনাকে মোটেই গ্রাহ্য করবো না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একবার আমাকে ডেকে বলেনঃ “জান্নাতের বিনিময়ে তুমি আমার হাতে দীক্ষা গ্রহণ করবে কি?` আমি তা স্বীকার করে আমার হাতখানা বাড়িয়ে দিলাম। তখন তিনি শর্ত দিলেনঃ “তুমি কারও কাছে কিছুই চাইবে না।` আমি বললামঃ বেশ, ঠিক আছে। তিনি বললেনঃ “যদি চাবুকও হয়, অর্থাৎ ওটাও যদি পড়ে যায় তবে স্বয়ং সওয়ারী থেকে নেমে তা উঠিয়ে নেবে।”
মুসনাদে আহমাদে রয়েছে, হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “লোকের ভয়ে তোমাদের কেউ যেন সত্য ও ন্যায্য কথা বলা থেকে বিরত না থাকে। জেনে রেখো যে, না কেউ মৃত্যুকে এগিয়ে আনতে পারে, না কেউ রিককে দূর করতে পারে।” ইমাম আহমাদ (রঃ) আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে আরও বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ শরীয়ত বিরোধী কোন কাজ দেখার পর নিজেকে দুর্বল মনে করে নীরব থেকো না, নতুবা কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে এর জন্যে জবাবদিহি করতে হবে। সেই সময় মানুষ উত্তর দিতে গিয়ে বলবেঃ আমি মানুষের ভয়ে নীরব ছিলাম। তখন মহান আল্লাহ বলবেনঃ “আমি এরই বেশী হকদার ছিলাম যে, তুমি আমাকেই ভয় করতে।” এটাও বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাকে এ প্রশ্নও করবেন :“তুমি শরীয়ত বিরোধী কাজ দেখে বাধা দাওনি কেন? অতঃপর আল্লাহ পাক নিজেই এর উত্তর চাইবেন। তখন সে বলবেঃ “হে আমার প্রভু! আমি আপনার উপর ভরসা করেছিলাম এবং মানুষকে ভয় করেছিলাম।` (সুনানে ইবনে মাজাহ) অন্য একটি বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে-“মুমিনের জন্যে এটা উচিত নয় যে, সে নিজেকে লাঞ্ছিত করবে।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিভাবে সে নিজেকে লাঞ্ছিত করতে পারে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “ঐ বিপদ সে নিজের উপর উঠিয়ে নেবে যা বহন করার শক্তি তার নেই।”
ইরশাদ হচ্ছে-এটা হচ্ছে আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা তা দিয়ে থাকেন। অর্থাৎ পূর্ণ ঈমানের এ গুণাবলী আল্লাহ পাকের বিশেষ দান। এর তাওফীক তাঁরই পক্ষ থেকে এসে থাকে। তাঁর অনুগ্রহ খুবই প্রশস্ত এবং তিনি মহাজ্ঞানী। এ বড় নিয়ামতের হকদার কে তা তিনিই খুব ভাল জানেন।
ঘোষিত হচ্ছে- তোমাদের বন্ধু কাফেররা নয়, বরং প্রকৃতপক্ষে তোমাদের বন্ধুত্ব স্থাপন করা উচিত আল্লাহর সাথে, তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সাথে এবং মুমিনদের সাথে। মুমিন তো তারাই যাদের মধ্যে এ গুণাবলী রয়েছে যে, তারা নিয়মিতভাবে নামায আদায় করে যা ইসলামের একটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ রুকন এবং যাকাত প্রদান করে যা আল্লাহর দুর্বল ও মিসকীন বান্দাদের হক। শেষ বাক্যটি সম্পর্কে কতক লোকের মনে সন্দেহ জেগেছে যে, ওটা (আরবী) (২:৩) থেকে (আরবী) হয়েছে। অর্থাৎ তারা রুকুর অবস্থায় যাকাত প্রদান করে। এটা সম্পূর্ণরূপে ভুল ধারণা। কেননা, যদি এটা মেনে নেয়া হয় তবে এটা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়ে যাবে যে, রুকুর অবস্থায় যাকাত দেয়া উত্তম। অথচ কোন আলেমই একথা বলেন না। সন্দেহ পোষণকারীরা এখানে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, একদা হযরত আলী (রাঃ) নামাযে রুকুর অবস্থায় ছিলেন, এমন সময় এক ভিক্ষুক এসে যায়। তখন তিনি ঐ অবস্থাতেই তাঁর আংটিটি খুলে তাকে দিয়ে দেন। হযরত সুদ্দী (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি সমস্ত মুসলমানের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। হযরত উত্বার উক্তি অনুযায়ী। (আরবী) দ্বারা সমস্ত মুসলমান ও হযরত আলী (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। একটি মার’ হাদীসেও আংটির ঘটনাটি রয়েছে এবং কোন কোন তাফসীরকারকও এ তাফসীর করেছেন। সনদ কিন্তু একটিরও সঠিক নয়। একটিরও বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য নয়। সুতরাং বুঝা গেল যে, ঘটনাটি মোটেই সঠিক নয়। সঠিক ওটাই যা আমরা ইতিপূর্বে বর্ণনা করেছি যে, এ আয়াতগুলো হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যখন তিনি পরিষ্কার ভাষায় ইয়াহুদীদের বন্ধুত্বকে ভেঙ্গে দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং মুমিনদের বন্ধুত্বে সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। এ কারণেই আয়াতগুলোর শেষে ঘোষণা করা হয়েছে-যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং মুমিনদের সাথে বন্ধুত্ব রাখে সে আল্লাহর সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত এবং আল্লাহর সেনাবাহিনীই জয়যুক্ত হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ এটা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন- আমি ও আমার রাসূলগণই জয়যুক্ত থাকবো, নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিশালী ও প্রবল পরাক্রান্ত। যারা আল্লাহর উপর ও পরকালের উপর বিশ্বাস রাখে তাদেরকে তুমি এরূপ পাবে না যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর শত্রুদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করবে, যদিও তারা তাদের পিতা, ভাই এবং আত্মীয়-স্বজন হয়, এরা তো ওরাই যাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিপিবদ্ধ করেছেন এবং স্বীয় রূহ জিবরাঈল (আঃ) দ্বারা তাদেরকে সাহায্য করেছেন, তাদেরকে আল্লাহ এমন জান্নাতসমূহে প্রবিষ্ট করবেন। যেগুলোর নিম্নদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিত হচ্ছে, তথায় তারা চিরকাল অবস্থান করবে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট, তারাই আল্লাহর সেনাবাহিনী, আল্লাহর সেনাবাহিনীই সফলকাম হবে।” (৫৮:২১-২২) অতএব, যে কেউ আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং মুমিনদের বন্ধুত্বে সন্তুষ্ট হয়ে যাবে, তাকে দুনিয়াতেও সাহায্য করা হবে এবং পরকালেও সে সফলকাম হবে। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতকে এ বাক্য দ্বারাই শেষ করেছেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।