সূরা আল-মায়েদা (আয়াত: 54)
হরকত ছাড়া:
ياأيها الذين آمنوا من يرتد منكم عن دينه فسوف يأتي الله بقوم يحبهم ويحبونه أذلة على المؤمنين أعزة على الكافرين يجاهدون في سبيل الله ولا يخافون لومة لائم ذلك فضل الله يؤتيه من يشاء والله واسع عليم ﴿٥٤﴾
হরকত সহ:
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا مَنْ یَّرْتَدَّ مِنْکُمْ عَنْ دِیْنِهٖ فَسَوْفَ یَاْتِی اللّٰهُ بِقَوْمٍ یُّحِبُّهُمْ وَ یُحِبُّوْنَهٗۤ ۙ اَذِلَّۃٍ عَلَی الْمُؤْمِنِیْنَ اَعِزَّۃٍ عَلَی الْکٰفِرِیْنَ ۫ یُجَاهِدُوْنَ فِیْ سَبِیْلِ اللّٰهِ وَ لَا یَخَافُوْنَ لَوْمَۃَ لَآئِمٍ ؕ ذٰلِکَ فَضْلُ اللّٰهِ یُؤْتِیْهِ مَنْ یَّشَآءُ ؕ وَ اللّٰهُ وَاسِعٌ عَلِیْمٌ ﴿۵۴﴾
উচ্চারণ: ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূ মাইঁ ইয়ারতাদ্দা মিনকুম ‘আন দীনিহী ফাছাওফা ইয়া‘তিল্লা-হু বিকাওমিইঁ ইউহিব্বুহুম ওয়া ইউহিববূনাহূ আযিল্লাতিন ‘আলাল মু’মিনীনা আ‘ইযযাতিন ‘আলাল কা-ফিরীনা ইউজা-হিদূ না ফী ছাবীলিল্লা-হি ওয়ালা ইয়াখা-ফূনা লাওমাতা লাইমিন যা-লিকা ফাদলুল্লা-হি ইউ’তীহি মাইঁ ইয়াশাউ ওয়াল্লা-হু ওয়া-ছি‘উন ‘আলীম।
আল বায়ান: হে মুমিনগণ, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার দীন থেকে ফিরে যাবে তাহলে অচিরেই আল্লাহ এমন কওমকে আনবেন, যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন এবং তারা তাঁকে ভালবাসবে। তারা মুমিনদের উপর বিনম্র এবং কাফিরদের উপর কঠোর হবে। আল্লাহর রাস্তায় তারা জিহাদ করবে এবং কোন কটাক্ষকারীর কটাক্ষকে ভয় করবে না। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তিনি তাকে তা দান করেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫৪. হে মুমিনগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ দ্বীন থেকে ফিরে গেলে নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায়(১) আনবেন যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন এবং যারা তাকে ভালবাসবে; তারা মুমিনদের প্রতি কোমল ও কাফেরদের প্রতি কঠোর হবে; তারা আল্লাহ্র পথে জিহাদ করবে এবং কোন নিন্দুকের নিন্দার ভয় করবে না(২); এটা আল্লাহ্র অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছে তাকে তিনি তা দান করেন এবং আল্লাহ্ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।(৩)
তাইসীরুল ক্বুরআন: হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মধ্য হতে কেউ তার দ্বীন হতে ফিরে গেলে সত্বর আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায়কে নিয়ে আসবেন যাদেরকে তিনি ভালবাসেন আর তারাও তাঁকে ভালবাসবে, তারা মু’মিনদের প্রতি কোমল আর কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে, তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করবে, কোন নিন্দুকের নিন্দাকে তারা ভয় করবে না, এটা আল্লাহর অনুগ্রহ- যাকে ইচ্ছে তিনি দান করেন এবং আল্লাহ প্রাচুর্যের অধিকারী, সর্বজ্ঞ।
আহসানুল বায়ান: (৫৪) হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ ধর্ম হতে ফিরে গেলে[1] আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায় আনয়ন করবেন যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন ও যারা তাঁকে ভালবাসবে,[2] তারা হবে বিশ্বাসীদের প্রতি কোমল ও অবিশ্বাসীদের প্রতি কঠোর। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কোন নিন্দুকের নিন্দায় ভয় করবে না,[3] এ আল্লাহর অনুগ্রহ যাকে ইচ্ছা তিনি দান করেন। বস্তুতঃ আল্লাহ প্রাচুর্যময়, প্রজ্ঞাময়।
মুজিবুর রহমান: হে মু’মিনগণ! তোমাদের মধ্য হতে যে ব্যক্তি স্বীয় ধর্ম হতে বিচ্যুত হবে, (এতে ইসলামের কোন ক্ষতি নেই, কেননা) আল্লাহ সত্ত্বরই (তাদের স্থলে) এমন এক সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন যাদেরকে আল্লাহ ভালবাসবেন এবং তারাও আল্লাহকে ভালবাসবে, তারা মুসলিমদের প্রতি মেহেরবান থাকবে, কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে, তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে আর তারা কোন নিন্দুকের নিন্দার পরওয়া করবেনা; এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, তা তিনি যাকে ইচ্ছা প্রদান করেন; বস্তুতঃ আল্লাহ প্রাচুর্য দানকারী, মহাজ্ঞানী।
ফযলুর রহমান: হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মধ্যে যারা স্বীয় ধর্ম ত্যাগ করবে তাদের স্থলে আল্লাহ এমন একদল লোক নিয়ে আসবেন যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন এবং তারাও তাঁকে ভালবাসবে; তারা মুমিনদের প্রতি নরম আর কাফেরদের প্রতি কঠোর হবে এবং তারা আল্লাহর পথে জেহাদ করবে ও কোন নিন্দুকের নিন্দায় ভীত হবে না। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করেন। আল্লাহ বড় দানশীল, মহাজ্ঞানী।
মুহিউদ্দিন খান: হে মুমিনগণ, তোমাদের মধ্যে যে স্বীয় ধর্ম থেকে ফিরে যাবে, অচিরে আল্লাহ এমন সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন, যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন এবং তারা তাঁকে ভালবাসবে। তারা মুসলমানদের প্রতি বিনয়-নম্র হবে এবং কাফেরদের প্রতি কঠোর হবে। তারা আল্লাহর পথে জেহাদ করবে এবং কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারে ভীত হবে না। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ-তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্য দানকারী, মহাজ্ঞানী।
জহুরুল হক: ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের মধ্যে থেকে যে কেউ তার ধর্ম থেকে ফিরে যায়, আল্লাহ্ তবে শীঘ্রই নিয়ে আসবেন একটি সম্প্রদায় -- তাদের তিনি ভালোবাসবেন ও তারা তাঁকে ভালোবাসবে, মুমিনদের প্রতি বিনীত, অবিশ্বাসীদের প্রতি কঠোর, তারা আল্লাহ্র পথে জিহাদ করবে, আর ভয় করবে না কোনো নিন্দুকের নিন্দা। এই হচ্ছে আল্লাহ্র এক আশিস -- তিনি তা প্রদান করেন যাকে তিনি ইচ্ছে করেন। আর আল্লাহ্ পরম বদান্য, সর্বজ্ঞাতা।
Sahih International: O you who have believed, whoever of you should revert from his religion - Allah will bring forth [in place of them] a people He will love and who will love Him [who are] humble toward the believers, powerful against the disbelievers; they strive in the cause of Allah and do not fear the blame of a critic. That is the favor of Allah; He bestows it upon whom He wills. And Allah is all-Encompassing and Knowing.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৫৪. হে মুমিনগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ দ্বীন থেকে ফিরে গেলে নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায়(১) আনবেন যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন এবং যারা তাকে ভালবাসবে; তারা মুমিনদের প্রতি কোমল ও কাফেরদের প্রতি কঠোর হবে; তারা আল্লাহ্–র পথে জিহাদ করবে এবং কোন নিন্দুকের নিন্দার ভয় করবে না(২); এটা আল্লাহ্–র অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছে তাকে তিনি তা দান করেন এবং আল্লাহ্– প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।(৩)
তাফসীর:
(১) আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, এ আয়াতে আল্লাহর পক্ষ থেকে কঠোর হুশিয়ারী দেয়া হচ্ছে যে, যারাই আল্লাহর পথ ও তাঁর দ্বীন থেকে পিছু ফিরে যাবে, তারা আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহ্ তাআলা তার দ্বীনের জন্য নতুন কোন জাতিকে এগিয়ে আনবেন। [তাবারী] আইয়াদ আল আশ'আরী বলেন, যখন এ আয়াত নাযিল হলো, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘হে আবু মূসা, এরা হল তোমার সম্প্রদায়। আর রাসূল হাত দিয়ে ইশারা করছিলেন আবু মূসা আল-আশ'আরীর দিকে। [মুস্তাদরাকে হাকেমঃ ২/৩১৩]
(২) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে ভাষণ দিতে দাঁড়িয়ে বললেনঃ “তোমাদের মধ্যে কারো হক জানা থাকলে সে যেন তা বলতে কাউকে ভয় না করে। বর্ণনাকারী আবু সাঈদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এ হাদীস বর্ণনা করে কেঁদে ফেললেন। তারপর বললেন, আল্লাহর শপথ আমরা অনেক বিষয় দেখেছি, কিন্তু ভয় করেছি। [ইবন মাজাহঃ ৪০০৭; তিরমিযী: ২১৯১]
(৩) এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, মুসলিমদের স্বার্থেই তাদেরকে অমুসলিমদের সাথে গভীর বন্ধুত্ব ও মেলামেশা করতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ, সত্যদ্বীন ইসলামের হেফাযতের দায়িত্ব আল্লাহ নিজেই গ্রহণ করেছেন। কোন ব্যক্তি কিংবা দলের বক্রতা ও অবাধ্যতা দূরের কথা, স্বয়ং মুসলিমদের কোন ব্যক্তি কিংবা দল যদি সত্যি সত্যিই ইসলাম ত্যাগ করে বসে এবং সম্পূর্ণ দ্বীনত্যাগী হয়ে অমুসলিমদের সাথে হাত মিলায়, তবে এতেও ইসলামের কোন ক্ষতি হবে না- হতে পারে না। মুসলিমরাও যদি দ্বীনত্যাগী হয়ে যায়, আল্লাহ তা'আলা তাদের জায়গায় অন্য কোন জাতির অভ্যুত্থান ঘটাবেন। সে জাতির মধ্যে বেশ কিছু গুণ থাকবে। তাদের প্রথম গুণ হচ্ছে যে, আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে ভালবাসবেন এবং তারা নিজেরাও আল্লাহ তা'আলাকে ভালবাসবে।
এ গুণটি দুটি অংশে বিভক্ত- এক. আল্লাহর সাথে তাদের ভালবাসা। একে কোন না কোন স্তরে মানুষের ইচ্ছাধীন মনে করা যায়। দুই. আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদেরকে ভালবাসা। এতে বাহ্যতঃ মানুষের ইচ্ছা ও কর্মের কোন ভূমিকা নেই। যে বিষয়টি মানুষের ইচ্ছা ও সামর্থ্যের বাইরে, তা মানুষকে শুনানোরও কোন বাহ্যিক সার্থকতা নেই। কিন্তু কুরআনুল কারীমের অন্যান্য আয়াতের পর্যালোচনা করলে বুঝা যায় যে, এ ভালবাসার উপায়-উপকরণগুলোও মানুষের ইচ্ছাধীন। মানুষ যদি এসব উপায়কে কাজে লাগায়, তবে তাদের সাথে আল্লাহ তা'আলার ভালবাসা অবশ্যম্ভাবী।
আল্লাহ্ তাআলা বলেন, “হে রাসূল, আপনি বলে দিন, যদি তোমরা আল্লাহ্কে ভালবাস, তবে আমার অনুসরন কর। এর ফলশ্রুতিতে আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদেরকে ভালবাসতে থাকবেন, আর আল্লাহ তোমাদের অপরাধসমূহ মার্জনা করে দিবেন; এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়ালু।” [সূরা আলে-ইমরানঃ ৩১] এ আয়াত থেকে জানা যাচ্ছে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা’আলার ভালবাসা লাভ করতে চায়, তার উচিত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং প্রতিটি পদক্ষেপে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত অনুসরণে অবিচল থাকা। এমনটা করলে আল্লাহ তা'আলা তাকে ভালবাসবেন বলে ওয়াদা দিয়েছেন। তাদের দ্বিতীয় গুণ হচ্ছে যে, তারা মুসলিমদের সামনে নম্র হবে এবং কোন ব্যাপারে মতবিরোধ হলে সত্যপন্থী হওয়া সত্বেও সহজে বশ হয়ে তারা ঝগড়া ত্যাগ করবে। এ অর্থেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ‘আমি ঐ ব্যক্তিকে জান্নাতের মধ্যস্থলে বাসস্থান দেয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করছি, যে সত্যপন্থী হওয়া সত্বেও ঝগড়া ত্যাগ করে’। [আবু দাউদঃ ৪৮০০]
মোটকথা, তারা মুসলিমদের সাথে স্বীয় অধিকার কাজ-কারবারের ব্যাপারে কোনরূপ ঝগড়াবিবাদ রাখবে না। তাদের তৃতীয় গুণ হচ্ছে যে, তারা কাফেরদের উপর প্রবল, শক্তিশালী ও কঠোর। উদ্দেশ্য এই যে, তারা আল্লাহ ও তার দ্বীনের শক্রদের মোকাবেলায় কঠোর ও পরাক্রান্ত। শক্ররা তাদেরকে সহজে কাবু করতে পারে না। উভয় বাক্য একত্রিত করলে সারমর্ম দাঁড়ায় এই যে, তারা হবে এমন এক জাতি, যাদের ভালবাসা ও শক্রতা নিজ সত্ত্বা ও সত্ত্বাগত অধিকারের পরিবর্তে শুধু আল্লাহ, তার রাসূল ও তার দ্বীনের খাতিরে নিবেদিত হবে।
এ একই বিষয়বস্তু সম্বলিত অন্য এক আয়াতে আল্লাহ বলেন, (أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ) -অর্থাৎ “কাফেরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল।” [সূরা আল-ফাতহঃ ২৯) তাদের চতুর্থ গুণ হচ্ছে, “তারা সত্য দ্বীনের প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে জিহাদে প্রবৃত্ত হবে।” এর সারমর্ম এই যে, কুফর ও দ্বীনত্যাগের মোকাবেলা করার জন্য শুধু কতিপয় প্রচলিত ইবাদাত এবং নম্র ও কঠোর হওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দীপনাও থাকতে হবে। এই উদ্দীপনাকে পূর্ণতা দানের জন্য পঞ্চম গুণ বলা হয়েছে, “দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত ও সমুন্নত করার চেষ্টায় তারা কোন ভৎসনাকারীর ভৎসনারই পরোয়া করবে না।” [ইবন কাসীর থেকে সংক্ষেপিত]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৫৪) হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ ধর্ম হতে ফিরে গেলে[1] আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায় আনয়ন করবেন যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন ও যারা তাঁকে ভালবাসবে,[2] তারা হবে বিশ্বাসীদের প্রতি কোমল ও অবিশ্বাসীদের প্রতি কঠোর। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কোন নিন্দুকের নিন্দায় ভয় করবে না,[3] এ আল্লাহর অনুগ্রহ যাকে ইচ্ছা তিনি দান করেন। বস্তুতঃ আল্লাহ প্রাচুর্যময়, প্রজ্ঞাময়।
তাফসীর:
[1] আল্লাহ তাআলা নিজের ইলম মোতাবেক বলেছেন; যা নবী করীম (সাঃ)-এর মৃত্যুর পরপরই প্রকাশ পেয়েছিল। তা হচ্ছে, ইসলাম-ত্যাগের ফিতনা; আবু বাকর সিদ্দীক (রাঃ) ও তাঁর সঙ্গীদের নিরলস প্রচেষ্টায় যার সমাপ্তি ঘটেছিল।
[2] ধর্ম-ত্যাগীদের পরিবর্তে আল্লাহ এমন এক কওমকে নির্বাচিত করবেন, যাদের চারটি স্পষ্ট গুণ বর্ণনা করা হয়েছে; (ক) আল্লাহর প্রতি ভালবাসা রাখা ও তাঁর ভালবাসার পাত্রতে পরিণত হওয়া। (খ) ঈমানদারদের প্রতি কোমল ও বিনম্র এবং কাফেরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর হওয়া। (গ) আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা। এবং (ঘ) আল্লাহর ব্যাপারে কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারকে পরোয়া না করা। সাহাবায়ে কেরামগণ (রাঃ) এই সমস্ত গুণের অধিকারী ছিলেন। যার কারণে আল্লাহ তাঁদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে মহা সৌভাগ্যবান বলে আখ্যায়িত করেছেন। আর দুনিয়াতেই তিনি তাঁদের প্রতি সন্তুষ্টির সার্টিফিকেট প্রদান করেছেন।
[3] এটা ঐ ঈমানদারগণের ৪র্থ নম্বর গুণ। অর্থাৎ, মহান আল্লাহর আনুগত্য ও হুকুম পালনের ব্যাপারে কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারকে ভয় ও পরোয়া করবে না। এ গুণটিও বড় গুরুত্বপূর্ণ গুণ। সমাজে যখন কোন পাপের প্রচলন ব্যাপক হয়ে যায়, তখন তার বিরুদ্ধে এই গুণ ছাড়া নেকীর উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা এবং আল্লাহর বিধানের আনুগত্য করা সম্ভব নয়। সমাজে কত শত এমন মানুষ আছে যাঁরা পাপাচরণ, আল্লাহ-দ্রোহিতা এবং সামাজিক অশ্লীলতা থেকে বাঁচতে চেষ্টা করে, কিন্তু এই নিন্দুকের নিন্দা ও তিরস্কারের মোকাবেলা করার মত ক্ষমতা তাদের নেই। ফলে পাপের ঐ দলদল হতে বের হতে পারে না এবং হক ও বাতিলের মাঝে পার্থক্য করার মত তওফীকও লাভ করে না। এই জন্যেই পরবর্তীতে আল্লাহ বলেছেন, যাদের মধ্যে এই চারটি গুণ বিদ্যমান আছে তাদের উপর আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৫৪-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদেরকে সতর্ক ও সাবধান করে বলেন, তোমাদের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণ করার পর তা ত্যাগ করবে জেনে রেখ, আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের পরিবর্তে এমন এক সম্প্রদায় নিয়ে আসবেন যাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা ভালবাসবেন এবং তারাও আল্লাহ তা‘আলাকে ভালবাসবে। তারা মু’মিনদের প্রতি দয়ালু ও কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে। এটা মু’মিনদের পরিপূর্ণতার গুণ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِلْمُؤْمِنِيْنَ)
“তুমি মু’মিনদের জন্য তোমার দয়ার ডানা অবনমিত কর”(সূরা হিজর ১৫:৮৮) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللّٰهِ ط وَالَّذِيْنَ مَعَه۫ٓ أَشِدَّا۬ءُ عَلَي الْكُفَّارِ رُحَمَا۬ءُ بَيْنَهُمْ)
“মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। যারা তাঁর সাথে আছে তারা কাফিরদের ওপর কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে সহানুভূতিশীল ও কোমল।”(সূরা ফাতহ ৪৮:২৯)
তাদের অন্যতম আরেকটি গুণ হল, তারা আল্লাহ তা‘আলার পথে জিহাদ করবে, কোন ভর্ৎসনাকারীর ভর্ৎসনাকে ভয় করবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(يَآ أَيُّهَا النَّبِيُّ جَاهِدِ الْكُفَّارَ وَالْمُنٰفِقِيْنَ وَاغْلُظْ عَلَيْهِمْ)
“হে নাবী! কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর এবং তাদের প্রতি কঠোর হও।”(সূরা তাওবাহ ৯:৭৩)
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তা‘আলা বলেন: মু’মিনদের বন্ধু কেবল আল্লাহ তা‘আলা, রাসূলুল্লাহ ও মু’মিনগণ যারা সালাত কায়িম করে ও যাকাত দেয়। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(اَللّٰهُ وَلِيُّ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا يُخْرِجُهُمْ مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَي النُّوْرِ)
“মু’মিনদের অভিভাবক হচ্ছেন আল্লাহ। তিনি তাদেরকে অন্ধকারসমূহ হতে আলোর দিকে নিয়ে আসেন।” (সূরা বাক্বারাহ ২:২৫৭)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(وَالْمُؤْمِنُوْنَ وَالْمُؤْمِنٰتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَا۬ءُ بَعْضٍ)
“মু’মিন নর ও মু’মিন নারী একে অপরের বন্ধু।”(সূরা তাওবাহ ৯:৭১) অতএব কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব রাখার কোন সুযোগ নেই।
(فَإِنَّ حِزْبَ اللّٰهِ هُمُ الْغٰلِبُوْنَ)
‘আল্লাহর দলই বিজয়ী হবে।’এখানে আল্লাহ তা‘আলার দলের বিজয়ী হবার কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলার দলের বৈশিষ্ট্য এবং বিজয়ী হবার কারণ কী তা সূরা মুযাদালার ২১ ও ২২ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “আল্লাহ লিখে রেখেছেন যে, আমি এবং আমার রাসূলগণ নিশ্চয়ই জয় লাভ করব। নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিশালী, মহাপ্রতাপশালী। যারা আল্লাহর প্রতি ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, তাদেরকে তুমি এমন লোকেদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবে না যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করে, যদিও তারা তাদের পিতা অথবা তাদের পুত্র অথবা তাদের ভাই, অথবা তাদের জাতি-গোষ্ঠী হোক না কেন। আল্লাহ তাদের অন্তরে ঈমান সুদৃঢ় করে দিয়েছেন এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর পক্ষ থেকে (অদৃশ্য) রূহ দিয়ে। তিনি তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার তলদেশে ঝর্ণাসমূহ প্রবাহিত হয়, সেথায় তারা চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল। জেনে রেখ, আল্লাহর দলই সফলতা লাভ করবে।” (সূরা মুজাদালাহ ৫৮:২১-২২)
সুতরাং দীন বর্জন করে কাফির মুশরিকদেরকে মুসিলমদের সহযোগিতা করাতে আল্লাহ তা‘আলার কিছু আসে যায় না; বরং আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ধ্বংস করে তদস্থলে এমন জাতি নিয়ে আসবেন যারা উক্ত গুণে গুণান্বিত হবে।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. মু’মিনরা নিজের প্রতি কোমল আর কাফিরদের প্রতি কঠোর।
২. মু’মিনদের প্রকৃত বন্ধু আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল।
৩. মু’মিনগণ আল্লাহ তা‘আলা, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও মু’মিনদের সাথে বন্ধুত্ব রাখলে ফলাফল কী হবে তাও জানতে পারলাম।
৪. মু’মিনরা আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় জিহাদ করে, কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারকে পরওয়া করে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৫৪-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর:
মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ সংবাদ দিচ্ছেন যে, যদি কেউ এ পবিত্র দ্বীন ত্যাগ করে, তবে সে ইসলামের একটুও ক্ষতি করতে পারবে না। কেননা, আল্লাহ তাদের পরিবর্তে এমন লোকদেরকে এ সত্য ধর্মের খিদমতে লাগিয়ে দেবেন যারা সবদিক দিয়েই এদের চেয়ে উত্তম হবে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে- (আরবী) (৪:১৩৩) অন্য এক জায়গায় রয়েছে- (আরবী) (১৪:১৯) এসব আয়াতের ভাবার্থ ওটাই যা বর্ণনা করা হলো। হককে ছেড়ে দিয়ে বাতিলের দিকে ফিরে যাওয়াকে (আরবী) বলা হয়। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি কুরাইশ নেতৃবর্গের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর খিলাফতকালে যেসব লোক ইসলাম থেকে ফিরে গিয়েছিল তাদের হুকুম এ আয়াতে রয়েছে। তাদের পরিবর্তে যে কওমকে আনয়নের ওয়াদা করা হচ্ছে, তার হচ্ছে আহলে কাদেসিয়া বা কওমে সাবা অথবা আহলে ইয়ামান, যারা কিনদাহ ও সুকূ গোত্রের লোক। একটি খুবই গরীব মারফু হাদীসেও শেষোক্ত কথাটি বর্ণিত আছে। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেনঃ “তারা এ লোকটির কওমের লোক।”
ঐ পূর্ণ ঈমানদারদের গুণাবলী বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা তাদের বন্ধুদের প্রতি (অর্থাৎ মুসলমানদের প্রতি খুবই কোমল ও নম্র হবে, কিন্তু কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর। যেমন অন্য আয়াতে বলা হয়েছে।' (আরবী) অর্থাৎ “তারা কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর আর পরস্পরের প্রতি অত্যন্ত কোমল ও দয়ালু।” (৪৯:২৯) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি
(আরবী) ছিলেন। অর্থাৎ তিনি বন্ধুদের সামনে ছিলেন।
হাসিমুখ ও প্রফুল্ল চেহারা বিশিষ্ট, আর শত্রুদের সামনে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও সংগ্রামী বীর পুরুষ। মুসলমানরা জিহাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় না, পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে না, ক্লান্ত হয়ে পড়ে না, ভীরুতা প্রকাশ করে না এবং বিলাসপ্রিয় হয় না। তারা আল্লাহর ওয়াস্তে কাজ করতে গিয়ে কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারকে ভয় করে না। আল্লাহর আনুগত্য করা, তার শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা, ভাল কাজের হুকুম করা এবং মন্দ কাজ হতে বিরত রাখা ইত্যাদি কাজে তারা সদা নিমগ্ন থাকে।
ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সামিত (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আবু যার (রাঃ) বলেনঃ “আমার বন্ধু (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) আমাকে সাতটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন। (১) মিসকীনদের ভালবাসা এবং তাদের সাথে উঠাবসা করা। (২) (পার্থিব বিষয়ে) নিজের চেয়ে নিম্নস্তরের লোকের প্রতি দৃষ্টিপাত করা এবং উচ্চ পর্যায়ের লোকের দিকে নযর না দেয়া। (৩) আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখা যদিও ঐ আত্মীয় তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। (৪) কারও কাছে কিছু না চাওয়া। (৫) তিক্ত হলেও সত্য কথা বলা। (৬) আল্লাহর ব্যাপার (ধর্মীয় কাজে) কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারকে ভয় না করা। (৭) অধিকাংশ সময় (আরবী)- এ কালেমাটি পাঠ করা, কেননা এটা আরশের কোষাগার।” অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আবু যার (রাঃ) বলেনঃ “আমি পাঁচবার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে দীক্ষা গ্রহণ করেছি এবং তিনি আমাকে সাতটি কাজ পরিপূর্ণভাবে আদায় করতে বলেছেন। আর আমি সাতবার নিজের উপর আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলেছি যে, আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে কোন ভৎসনাকারীর ভৎসনাকে মোটেই গ্রাহ্য করবো না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একবার আমাকে ডেকে বলেনঃ “জান্নাতের বিনিময়ে তুমি আমার হাতে দীক্ষা গ্রহণ করবে কি?` আমি তা স্বীকার করে আমার হাতখানা বাড়িয়ে দিলাম। তখন তিনি শর্ত দিলেনঃ “তুমি কারও কাছে কিছুই চাইবে না।` আমি বললামঃ বেশ, ঠিক আছে। তিনি বললেনঃ “যদি চাবুকও হয়, অর্থাৎ ওটাও যদি পড়ে যায় তবে স্বয়ং সওয়ারী থেকে নেমে তা উঠিয়ে নেবে।”
মুসনাদে আহমাদে রয়েছে, হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “লোকের ভয়ে তোমাদের কেউ যেন সত্য ও ন্যায্য কথা বলা থেকে বিরত না থাকে। জেনে রেখো যে, না কেউ মৃত্যুকে এগিয়ে আনতে পারে, না কেউ রিককে দূর করতে পারে।” ইমাম আহমাদ (রঃ) আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে আরও বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ শরীয়ত বিরোধী কোন কাজ দেখার পর নিজেকে দুর্বল মনে করে নীরব থেকো না, নতুবা কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে এর জন্যে জবাবদিহি করতে হবে। সেই সময় মানুষ উত্তর দিতে গিয়ে বলবেঃ আমি মানুষের ভয়ে নীরব ছিলাম। তখন মহান আল্লাহ বলবেনঃ “আমি এরই বেশী হকদার ছিলাম যে, তুমি আমাকেই ভয় করতে।” এটাও বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাকে এ প্রশ্নও করবেন :“তুমি শরীয়ত বিরোধী কাজ দেখে বাধা দাওনি কেন? অতঃপর আল্লাহ পাক নিজেই এর উত্তর চাইবেন। তখন সে বলবেঃ “হে আমার প্রভু! আমি আপনার উপর ভরসা করেছিলাম এবং মানুষকে ভয় করেছিলাম।` (সুনানে ইবনে মাজাহ) অন্য একটি বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে-“মুমিনের জন্যে এটা উচিত নয় যে, সে নিজেকে লাঞ্ছিত করবে।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিভাবে সে নিজেকে লাঞ্ছিত করতে পারে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “ঐ বিপদ সে নিজের উপর উঠিয়ে নেবে যা বহন করার শক্তি তার নেই।”
ইরশাদ হচ্ছে-এটা হচ্ছে আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা তা দিয়ে থাকেন। অর্থাৎ পূর্ণ ঈমানের এ গুণাবলী আল্লাহ পাকের বিশেষ দান। এর তাওফীক তাঁরই পক্ষ থেকে এসে থাকে। তাঁর অনুগ্রহ খুবই প্রশস্ত এবং তিনি মহাজ্ঞানী। এ বড় নিয়ামতের হকদার কে তা তিনিই খুব ভাল জানেন।
ঘোষিত হচ্ছে- তোমাদের বন্ধু কাফেররা নয়, বরং প্রকৃতপক্ষে তোমাদের বন্ধুত্ব স্থাপন করা উচিত আল্লাহর সাথে, তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সাথে এবং মুমিনদের সাথে। মুমিন তো তারাই যাদের মধ্যে এ গুণাবলী রয়েছে যে, তারা নিয়মিতভাবে নামায আদায় করে যা ইসলামের একটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ রুকন এবং যাকাত প্রদান করে যা আল্লাহর দুর্বল ও মিসকীন বান্দাদের হক। শেষ বাক্যটি সম্পর্কে কতক লোকের মনে সন্দেহ জেগেছে যে, ওটা (আরবী) (২:৩) থেকে (আরবী) হয়েছে। অর্থাৎ তারা রুকুর অবস্থায় যাকাত প্রদান করে। এটা সম্পূর্ণরূপে ভুল ধারণা। কেননা, যদি এটা মেনে নেয়া হয় তবে এটা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়ে যাবে যে, রুকুর অবস্থায় যাকাত দেয়া উত্তম। অথচ কোন আলেমই একথা বলেন না। সন্দেহ পোষণকারীরা এখানে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, একদা হযরত আলী (রাঃ) নামাযে রুকুর অবস্থায় ছিলেন, এমন সময় এক ভিক্ষুক এসে যায়। তখন তিনি ঐ অবস্থাতেই তাঁর আংটিটি খুলে তাকে দিয়ে দেন। হযরত সুদ্দী (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি সমস্ত মুসলমানের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। হযরত উত্বার উক্তি অনুযায়ী। (আরবী) দ্বারা সমস্ত মুসলমান ও হযরত আলী (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। একটি মার’ হাদীসেও আংটির ঘটনাটি রয়েছে এবং কোন কোন তাফসীরকারকও এ তাফসীর করেছেন। সনদ কিন্তু একটিরও সঠিক নয়। একটিরও বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য নয়। সুতরাং বুঝা গেল যে, ঘটনাটি মোটেই সঠিক নয়। সঠিক ওটাই যা আমরা ইতিপূর্বে বর্ণনা করেছি যে, এ আয়াতগুলো হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যখন তিনি পরিষ্কার ভাষায় ইয়াহুদীদের বন্ধুত্বকে ভেঙ্গে দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং মুমিনদের বন্ধুত্বে সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। এ কারণেই আয়াতগুলোর শেষে ঘোষণা করা হয়েছে-যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং মুমিনদের সাথে বন্ধুত্ব রাখে সে আল্লাহর সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত এবং আল্লাহর সেনাবাহিনীই জয়যুক্ত হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ এটা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন- আমি ও আমার রাসূলগণই জয়যুক্ত থাকবো, নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিশালী ও প্রবল পরাক্রান্ত। যারা আল্লাহর উপর ও পরকালের উপর বিশ্বাস রাখে তাদেরকে তুমি এরূপ পাবে না যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর শত্রুদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করবে, যদিও তারা তাদের পিতা, ভাই এবং আত্মীয়-স্বজন হয়, এরা তো ওরাই যাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিপিবদ্ধ করেছেন এবং স্বীয় রূহ জিবরাঈল (আঃ) দ্বারা তাদেরকে সাহায্য করেছেন, তাদেরকে আল্লাহ এমন জান্নাতসমূহে প্রবিষ্ট করবেন। যেগুলোর নিম্নদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিত হচ্ছে, তথায় তারা চিরকাল অবস্থান করবে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট, তারাই আল্লাহর সেনাবাহিনী, আল্লাহর সেনাবাহিনীই সফলকাম হবে।” (৫৮:২১-২২) অতএব, যে কেউ আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং মুমিনদের বন্ধুত্বে সন্তুষ্ট হয়ে যাবে, তাকে দুনিয়াতেও সাহায্য করা হবে এবং পরকালেও সে সফলকাম হবে। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতকে এ বাক্য দ্বারাই শেষ করেছেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।