আল কুরআন


সূরা আল-মায়েদা (আয়াত: 18)

সূরা আল-মায়েদা (আয়াত: 18)



হরকত ছাড়া:

وقالت اليهود والنصارى نحن أبناء الله وأحباؤه قل فلم يعذبكم بذنوبكم بل أنتم بشر ممن خلق يغفر لمن يشاء ويعذب من يشاء ولله ملك السموات والأرض وما بينهما وإليه المصير ﴿١٨﴾




হরকত সহ:

وَ قَالَتِ الْیَهُوْدُ وَ النَّصٰرٰی نَحْنُ اَبْنٰٓؤُا اللّٰهِ وَ اَحِبَّآؤُهٗ ؕ قُلْ فَلِمَ یُعَذِّبُکُمْ بِذُنُوْبِکُمْ ؕ بَلْ اَنْتُمْ بَشَرٌ مِّمَّنْ خَلَقَ ؕ یَغْفِرُ لِمَنْ یَّشَآءُ وَ یُعَذِّبُ مَنْ یَّشَآءُ ؕ وَ لِلّٰهِ مُلْکُ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ وَ مَا بَیْنَهُمَا ۫ وَ اِلَیْهِ الْمَصِیْرُ ﴿۱۸﴾




উচ্চারণ: ওয়াকা-লাতিল ইয়াহুদুওয়ান নাসা-রা-নাহনুআবনাউল্লা-হি ওয়া আহিব্বাউহূ কুল ফালিমা ইউ‘আযযিবুকুম বিযুনূবিকুম বাল আনতুম বাশারূম মিম্মান খালাকা ইয়াগফিরু লিমাইঁ ইয়াশাউ ওয়া ইউ‘আযযিবুমাইঁ ইয়াশূউ ওয়া লিলল্লা-হি মুলকুছছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদিওয়ামা-বাইনাহুমা; ওয়া ইলাইহিল মাসীর।




আল বায়ান: ইয়াহূদী ও নাসারারা বলে, ‘আমরা আল্লাহর পুত্র ও তার প্রিয়জন’। বল, ‘তবে কেন তিনি তোমাদেরকে তোমাদের পাপের কারণে আযাব দেন? বরং তোমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত মানুষ, যাদেরকে তিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছা আযাব দেন। আর আসমানসমূহ ও যমীন এবং তাদের মধ্যবর্তী যা আছে তার সার্বভৌমত্ব আল্লাহর এবং তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তন’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৮. আর ইয়াহুদী ও নাসাররা বলে, আমরা আল্লাহর পুত্র ও তার প্রিয়জন। বলুন, ‘তবে কেন তিনি তোমাদের পাপের জন্য তোমাদেরকে শাস্তি দিবেন?(১) বরং তোমরা তাদেরই অন্তর্গত মানুষ, যাদেরকে তিনি সৃষ্টি করেছেন। যাকে ইচ্ছে তিনি ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছে তিনি শাস্তি দেন(২)। আর আসমানসমূহ ও যমীন এবং এ দুয়ের মধ্যে যা কিছু আছে তার সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই, এবং প্রত্যাবর্তন তারই দিকে।




তাইসীরুল ক্বুরআন: ইয়াহূদী ও নাসারারা বলে, আমরা আল্লাহর পুত্র ও তাঁর প্রিয়পাত্র। বল, তাহলে তোমাদের পাপের জন্য আল্লাহ তোমাদেরকে শাস্তি দেন কেন? বরং তিনি যাদের সৃষ্টি করেছেন তোমরা তাদের অন্তর্গত মানুষ, তিনি যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন, যাকে ইচ্ছে শাস্তি দেন, আকাশসমূহ ও পৃথিবী আর এদের মধ্যে যা আছে সবকিছুর সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই জন্য, আর প্রত্যাবর্তন তাঁরই পানে।




আহসানুল বায়ান: (১৮) ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা বলে, ‘আমরা আল্লাহর পুত্র ও তাঁর প্রিয়।’[1] বল, ‘তবে কেন তিনি তোমাদের পাপের জন্য তোমাদেরকে শাস্তি দেবেন?[2] বরং তোমরা অন্যান্য সৃষ্টির ন্যায় তাঁরই সৃষ্ট মানুষ। যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করবেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেবেন।[3] আর আকাশ-পৃথিবী এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে, তার সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই। আর তাঁরই নিকট ফিরে যেতে হবে।’



মুজিবুর রহমান: ইয়াহুদী ও নাসারাহ্ বলেঃ আমরা আল্লাহর পুত্র ও তাঁর প্রিয়পাত্র। তুমি তাদের বলে দাও, আচ্ছা তাহলে তিনি তোমাদেরকে তোমাদের পাপের দরুণ কেন শাস্তি প্রদান করবেন? বরং তোমরাও অন্যান্য সৃষ্টির ন্যায় সাধারণ মানুষ মাত্র, তিনি যাকে ইচ্ছা মার্জনা করবেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি দিবেন, আর আল্লাহর কর্তৃত্ব রয়েছে আকাশসমূহে ও যমীনে এবং এতদুভয়ের মধ্যস্থিত সবকিছুতেও; আর সবাইকে আল্লাহর দিকেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে।



ফযলুর রহমান: ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা বলে, “আমরা আল্লাহর সন্তান ও তাঁর প্রিয়জন।” বল, “তাহলে তোমাদের পাপের কারণে তিনি তোমাদের শাস্তি দেন কেন? তোমরা বরং তাঁর সৃষ্ট অন্যদের মতই মানুষ।” তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন। আসমান-জমিন ও তার মধ্যবর্তী সবকিছুর কর্তৃত্ব আল্লাহরই। তাঁর কাছেই (সবকিছুর) প্রত্যাবর্তন।



মুহিউদ্দিন খান: ইহুদী ও খ্রীষ্টানরা বলে, আমরা আল্লাহর সন্তান ও তাঁর প্রিয়জন। আপনি বলুন, তবে তিনি তোমাদেরকে পাপের বিনিময়ে কেন শাস্তি দান করবেন? বরং তোমারও অন্যান্য সৃষ্ট মানবের অন্তর্ভুক্ত সাধারণ মানুষ। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি প্রদান করেন। নভোমন্ডল, ভুমন্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যে যা কিছু আছে, তাতে আল্লাহরই আধিপত্য রয়েছে এবং তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে।



জহুরুল হক: আর ইহুদী ও খ্রীষ্টানরা বলে -- "আমরা আল্লাহ্‌র সন্তান ও তাঁর প্রিয়পাত্র।" তুমি বলো -- "তবে কেন তোমাদের অপরাধের জন্য তিনি তোমাদের শাস্তি দেন? না, যাদের তিনি সৃষ্টি করেছেন তোমরা তাদের মধ্যেকার মানুষ। তিনি যাকে ইচ্ছে করেন পরিত্রাণ করেন এবং যাকে ইচ্ছে করেন শাস্তি দেন।" আর আল্লাহ্‌রই মহাকাশমন্ডল ও পৃথিবীর সাম্রাজ্য এবং এই দুইয়ের মধ্যে যা আছে, আর তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন।



Sahih International: But the Jews and the Christians say, "We are the children of Allah and His beloved." Say, "Then why does He punish you for your sins?" Rather, you are human beings from among those He has created. He forgives whom He wills, and He punishes whom He wills. And to Allah belongs the dominion of the heavens and the earth and whatever is between them, and to Him is the [final] destination.



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৮. আর ইয়াহুদী ও নাসাররা বলে, আমরা আল্লাহর পুত্র ও তার প্রিয়জন। বলুন, ‘তবে কেন তিনি তোমাদের পাপের জন্য তোমাদেরকে শাস্তি দিবেন?(১) বরং তোমরা তাদেরই অন্তর্গত মানুষ, যাদেরকে তিনি সৃষ্টি করেছেন। যাকে ইচ্ছে তিনি ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছে তিনি শাস্তি দেন(২)। আর আসমানসমূহ ও যমীন এবং এ দুয়ের মধ্যে যা কিছু আছে তার সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই, এবং প্রত্যাবর্তন তারই দিকে।


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ যদি সত্যি-সত্যিই তোমারা আল্লাহর প্রিয়বান্দা হতে তবে তিনি তোমাদেরকে শাস্তি দিতেন না। অথচ তিনি তোমাদেরকে শাস্তি দিবেন। এতে বোঝা যাচ্ছে যে, তোমরা আল্লাহর প্রিয় বান্দা নও। আল্লাহ যে তোমাদেরকে শাস্তি দিবেন এটা তোমরাও স্বীকার কর। তোমরা বলে থাক যে, আমাদেরকে সামান্য কিছু দিনই কেবল অগ্নি স্পর্শ করবে’ [সূরা আল-বাকারাহ: ৮০; সূরা আলে ইমরান: ২৪] আর যদি সত্যি সত্যিই তোমাদের কোন শাস্তি হবে না তবে তোমরা মৃত্যু কামনা কর না কেন? দুনিয়ার কষ্ট থেকে বেঁচে গিয়ে আখেরাতের স্থায়ী শান্তি যদি তোমাদের জন্যই নির্ধারিত থাকে, তবে তোমাদের উচিত মৃত্যু কামনা করা। অথচ তোমরা হাজার বছর বাঁচতে আগ্রহী।

অন্য আয়াতে আল্লাহ্‌ বলেন, বলুন ‘যদি আল্লাহ্‌র কাছে আখেরাতের বাসস্থান অন্য লোক ছাড়া বিশেষভাবে শুধু তোমাদের জন্যই হয়, তবে তোমরা মৃত্যু কামনা কর---যদি সত্যবাদী হয়ে থাক। কিন্তু তাদের কৃতকর্মের কারণে তারা কখনো তা কামনা করবে না। [সূরা আল-বাকারাহ: ৯৪-৯৫] আরও বলেন, বলুন, হে ইয়াহুদী হয়ে যাওয়া লোকরা! যদি তোমরা মনে কর যে, তোমরাই আল্লাহ্‌র বন্ধু, অন্য কোন মানবগোষ্ঠী নয়; তবে তোমরা মৃত্যু কামনা কর, যদি তোমরা সত্যবাদী হও। কিন্তু তারা তাদের হাত যা আগে পাঠিয়েছে (তাদের কৃতকর্ম) এর কারণে কখনো মৃত্যু কামনা করবে না। [সূরা আল-জুম'আ: ৬-৭]

হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁর বন্ধুকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হতে দেন না। [মুসনাদে আহমাদ ৩/১০৪] এক বর্ণনায় এসেছে, ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট নোমান ইবন আদ্বা, বাহরী ইবন আমর এবং শাস ইবন আদী এসে কথা বলল এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে আল্লাহর দিকে আহবান জানালেন, তার শাস্তির ভয় দেখালেন। তখন তারা বলল, হে মুহাম্মাদ! আপনি আমাদেরকে কিসের ভয় দেখান? আমরা তো কেবল আল্লাহর সন্তান-সন্তুতি ও তার প্রিয়জন! নাসারাদের মতই তারা বলল। তখন আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করলেন। [তাবারী]


(২) সুদ্দী বলেন, এর অর্থ, যাকে ইচ্ছা তাকে আল্লাহ দুনিয়াতে হেদায়াত দেন, ফলে তাকে তিনি ক্ষমা করেন। আর যাকে ইচ্ছা কুফরীর উপর মৃত্যু দেন, ফলে তাকে তিনি শাস্তি দেন। [তাবারী]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৮) ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা বলে, ‘আমরা আল্লাহর পুত্র ও তাঁর প্রিয়।’[1] বল, ‘তবে কেন তিনি তোমাদের পাপের জন্য তোমাদেরকে শাস্তি দেবেন?[2] বরং তোমরা অন্যান্য সৃষ্টির ন্যায় তাঁরই সৃষ্ট মানুষ। যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করবেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেবেন।[3] আর আকাশ-পৃথিবী এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে, তার সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই। আর তাঁরই নিকট ফিরে যেতে হবে।’


তাফসীর:

[1] ইয়াহুদীরা উযায়ের (আঃ)-কে এবং খ্রিষ্টানরা ঈসা (আঃ)-কে ‘আল্লাহর পুত্র বলে’ এবং তারা নিজেদেরকেও ‘আল্লাহর পুত্র ও তাঁর প্রিয়পাত্র’ বলে দাবী করে। অনেকে বলেন, এখানে একটি শব্দ ঊহ্য আছে, আর তা হচ্ছে أتباع أبناء الله অর্থাৎ, আমরা আল্লাহর পুত্রদ্বয় (উযায়ের ও ঈসা)এর অনুসারী। উল্লিখিত দুই অর্থের মধ্যে যে অর্থই নেওয়া হোক না কেন, তাতে তাদের গর্ব ও আস্ফালন এবং আল্লাহর উপর অনর্থক ভরসা প্রকাশ পায়; যা আল্লাহর নিকটে মূল্যহীন।

[2] এই অংশে তাদের উল্লিখিত আস্ফালন ও গর্বকে ভিত্তিহীন বলে বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, বস্তুতঃপক্ষে তোমরা যদি সত্যিই আল্লাহর প্রিয়পাত্র ও অভীষ্ট হও, তাহলে তোমরা যা ইচ্ছা তাই কর। আল্লাহ তো সে ব্যাপারে তোমাদেরকে কোন জিজ্ঞাসাবাদই করবেন না। আর যদি তাই হয়, তাহলে তোমাদের কৃতপাপের কারণে কেন তিনি তোমাদেরকে শাস্তি দিয়ে আসছেন ও দিবেন? এর দ্বারা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহর দরবারে বিচার কেবল দাবীর ভিত্তিতে হয় না; আর তা কিয়ামতের দিনেও হবে না। বরং আল্লাহ ঈমান, পরহেযগারী ও সৎকর্ম দেখেন এবং দুনিয়াতেও তারই ভিত্তিতেই ফায়সালা করেন। আর কিয়ামতের দিনেও এই ভিত্তির উপরেই বিচার ফায়সালা করবেন।

[3] তথাপি এই শাস্তি অথবা ক্ষমার ফায়সালা আল্লাহর সেই নিয়ম মোতাবেকই হবে; যা পরিষ্কারভাবে তিনি বর্ণনা করে দিয়েছেন যে, মুমিনগণের জন্য ক্ষমা এবং কাফের ও ফাসেকদের জন্য শাস্তি। সমস্ত মানুষের বিচার এই সাধারণ নীতি অনুসারেই হবে। হে আহলে কিতাবগণ! তোমরাও তাঁরই সৃষ্ট মানুষ। তোমাদের ব্যাপারে বিচার-ফায়সালা অন্য মানুষ থেকে ভিন্নতর কেন হবে?


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৭-১৯ নং আয়াতের তাফসীর:



এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা নিজের অসীম ক্ষমতা ও পূর্ণ সার্বভৌমত্বের মালিকানার কথা বর্ণনা করেছেন। উদ্দেশ্য হল: খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদ আকীদাহ ও বিশ্বাসকে খণ্ডন করা। ঈসা (আঃ)-কে যারা আল্লাহ বলে বিশ্বাস করে তারা কাফির। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:



(لَقَدْ كَفَرَ الَّذِيْنَ قَالُوْآ إِنَّ اللّٰهَ ثَالِثُ ثَلٰثَةٍ)



“যারা বলে, ‘আল্লাহ তো তিনের মধ্যে একজন, তারা কুফরী করেছে।”(সূরা মায়িদাহ ৫:৭৩)



আল্লাহ তা‘আলা যদি ঈসা ও তার মাতাকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করেন তাহলে কেউ কি বাঁচাতে পারবে? না পারবে না। তাহলে কিভাবে তারা আল্লাহ হতে পারে! এ জন্যই তিনি অত্র আয়াতের সাথেই সংযুক্ত করে বলেছেন: ‘আসমান ও জমিনের এবং এদের মধ্যে যা কিছু আছে তার সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।’ অর্থাৎ আকাশ-জমিনের রাজত্ব তাঁর, তিনি যা ইচ্ছা যেভাবে ইচ্ছা সৃষ্টি করতে পারেন। তিনি ইচ্ছা করলে কাউকে পিতা-মাতা ছাড়া সৃষ্টি করতে পারেন যেমন আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করেছেন, আবার পিতা ছাড়াও সৃষ্টি করতে পারেন। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। তাই বলে তিনি আল্লাহ বা আল্লাহর অংশ হয়ে যাবেন এমনটা নয়।



যুগে যুগে মানুষ কুফর, শির্ক ও গুমরাহীতে নিপতিত হবার বড় কারণ ছিল নাবী-রাসূল ও অলী-আওলিয়াদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা। তাদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে খ্রিস্টানরা ঈসা (আঃ) কে আল্লাহ বানিয়ে ছিল, আর ইয়াহূদীরা উযাইর (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র বানিয়ে ছিল। উম্মতে মুহাম্মাদীর এক শ্রেণির মানুষ অলী-আওলিয়াদের নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে তাদেরকে আল্লাহর মর্যাদায় তুলে দিচ্ছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: তোমরা বাড়াবাড়ি করা থেকে বিরত থাক, কারণ তোমাদের পূর্ববর্তীরা বাড়াবাড়ি করার কারণে ধ্বংস হয়েছে। (ইবনু মাযাহ হা: ৩০২৯, সহীহ)



ইয়াহূদীরা উযায়েরকে আল্লাহ তা‘আলার পুত্র ও খ্রিস্টানরা ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ বলে থাকে। মূলত এ দু’জনই আল্লাহ তা‘আলার প্রিয়পাত্র ও বান্দা এবং তাঁরা বান্দা পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করেননি। যেমন সূরা নিসার ১৭২ নং আয়াতে উল্লেখ হয়েছে। এমনকি তাঁরা কেউ নিজেদেরকে মা‘বূদ দাবী করেননি এবং নিজেদের ইবাদতের দিকে আহ্বান করেননি। এ সম্পর্কে অত্র সূরার ১১৬ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে।



(وَقَالَتِ الْيَهُوْدُ وَالنَّصٰرٰي نَحْنُ أَبْنٰ۬ؤُا اللّٰهِ وَأَحِبَّا۬ٓؤُه)



‘ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানগণ বলে, ‘আমরা আল্লাহর পুত্র ও তার প্রিয়পাত্র।’আল্লাহ তা‘আলা স্বয়ং তার উত্তর দিচ্ছেন: তাহলে কেন তিনি তোমাদেরকে তোমাদের পাপের কারণে শাস্তি দেন। যদি প্রিয়পাত্রই হতে তাহলে তো শাস্তি দেয়ার প্রশ্নই আসে না।



সুতরাং বুঝা যাচ্ছে এটা তাদের মিথ্যা দাবী। আল্লাহ তা‘আলা কাউকে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেননি এবং স্ত্রী হিসেবেও কাউকে গ্রহণ করেননি।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(یٰٓاَھْلَ الْکِتٰبِ لَا تَغْلُوْا فِیْ دِیْنِکُمْ وَلَا تَقُوْلُوْا عَلَی اللہِ اِلَّا الْحَقّ َ ﺚ اِنَّمَا الْمَسِیْحُ عِیْسَی ابْنُ مَرْیَمَ رَسُوْلُ اللہِ وَکَلِمَتُھ۫ ﺆ اَلْقٰٿھَآ اِلٰی مَرْیَمَ وَرُوْحٌ مِّنْھُﺑ فَاٰمِنُوْا بِاللہِ وَرُسُلِھ۪)



‘‘হে আহলে কিতাবগণ! তোমাদের দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি কর না ও আল্লাহ সম্পর্কে সত্য ছাড়া অন্য কিছু বল না। মারইয়ামের ছেলে ‘ঈসা মসীহ তো আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর বাণী, যা তিনি মারইয়ামের নিকট প্রেরণ করেছিলেন ও তাঁর আদেশ। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান আন।” (সূরা নিসা ৪:১৭১)



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা আহলে কিতাদেরকে নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি ঈমান আনার আহ্বান করেছেন। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এমন সময় প্রেরণ করেছেন যখন নাবী-রাসূলের আগমনে দীর্ঘ বিরতি ছিল।



(فَتْرَةٍ مِّنَ الرُّسُلِ)



‘রাসূল আগমনে বিরতির সময়’এ বিরতি সময়ের ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও ঈসা (আঃ)-এরমাঝে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান ছিল, ইমাম বুখারী সালমান ফারেসী (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন: সে সময় ছিল ছয়শত বছর। (সহীহ বুখারী হা: ৩৯৪৮) এছাড়া বিভিন্ন বর্ণনাতে বলা হয়েছে: ৫৬০, ৫৪০ বছর ইত্যাদি।



নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে প্রেরণ করার অন্যতম আরেকটি উদ্দেশ্য হল, যাতে এ অভিযোগ না করতে পারে যে, কোন সুসংবাদদাতা বা ভীতি প্রদর্শনকারী আমাদের নিকট আসেনি। সেজন্য আল্লাহ তা‘আলা বলে দিলেন:



(فَقَدْ جَا۬ءَكُمْ بَشِيْرٌ وَّنَذِيْرٌ)



“এখন অবশ্যই তোমাদের নিকট একজন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী এসেছে।”



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. যারা বলে আল্লাহ তা‘আলা হলেন ঈসা বা আল্লাহ তা‘আলা তিনজনের একজন বা আল্লাহ তা‘আলার সমতুল্য কোন গাউস, কুতুব, পীর-ফকির বা বাবা রয়েছে তারা কাফির।

২. ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানদের কর্তৃক তাদের আল্লাহ তা‘আলার পুত্র হবার দাবী মিথ্যা।

৩. সকল সার্বভৌমত্বের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা।

৪. নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সারা পৃথিবীবাসীর জন্য প্রেরণ করেছেন যাতে কেউ তাওহীদ না জানার অভিযোগ করতে না পারে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৭-১৮ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তা'আলা খ্রীষ্টানদের কুফরের কথা বর্ণনা করছেন যে, তারা আল্লাহরই সৃষ্টকে তাঁরই মর্যাদা প্রদান করছে। অথচ আল্লাহ শিরক থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। সমস্ত বস্তুই তার অনুগত এবং প্রত্যেক বস্তুর উপর তিনি পূর্ণ ক্ষমতাবান। সবকিছুরই উপরই তার আধিপত্য রয়েছে। এমন কেউ নেই যে তাঁকে তাঁর ইচ্ছে থেকে বিরত রাখতে পারে। যদি তিনি মাসীহ (আঃ)-কে, তার মাকে এবং ভূ-পৃষ্ঠের সমস্ত সৃষ্টজীবকে ধ্বংস করে দেয়ার ইচ্ছা করেন। তবুও কারও শক্তি নেই যে, তার সামনে এগিয়ে আসে এবং তাকে বাধা প্রদান করে। সমস্ত প্রাণী ও সৃষ্ট বস্তুর উদ্ভাবক ও সৃষ্টিকর্তা তিনিই। সকলের মালিক ও অধিকর্তা তিনিই। তিনি যা চান তা-ই করেন। কোন জিনিসই তার ক্ষমতার বাইরে নেই। কেউই তার কাজের কোন হিসাব নিতে পারে না। তাঁর রাজত্ব ও সাম্রাজ্য খুবই প্রশস্ত। তাঁর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব খুবই উচ্চ। তিনি প্রবল পরাক্রান্ত, তিনি মহাকারিগর। তিনি যেভাবে চান সেভাবেই ভাঙ্গেন ও গড়েন। তার শক্তির কোন সীমা নেই।

খ্রীষ্টানদের দাবী খণ্ডনের পর এখন ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান উভয়েরই দাবীকে খণ্ডন করছেন। তারা আল্লাহর উপর একটা মিথ্যা আরোপ এভাবে করেছে যে, তারা আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিকা) ও প্রিয় পাত্র। তারা নবীদের পুত্র এবং আল্লাহর আদরের সন্তান। তারা নিজেদের কিতাব থেকে নকল করে বলে যে, আল্লাহ তাআলা ইসরাঈল (আঃ)-কে বলেছিলেনঃ অতঃপর তারা এর ভুল ব্যাখ্যা করে ভাবার্থ বদলিয়ে দিয়ে বলে তিনি যখন আল্লাহর পুত্র হলেন তখন আমরাও তাঁর পুত্র ও প্রিয়পাত্র হলাম। অথচ তাদেরই মধ্যে যারা ছিল জ্ঞানী ও বিবেচক তারাও তাদেরকে বুঝিয়ে বলেছিল যে, এ শব্দগুলো দ্বারা হযরত ইসরাঈল (আঃ)-এর শুধু মর্যাদা ও সম্মানই প্রমাণিত হচ্ছে মাত্র। এর দ্বারা তাঁর আল্লাহর সাথে আত্মীয়তার বা রক্তের সম্পর্ক কোনক্রমেই প্রতিষ্ঠিত হয় না। এ অর্থেরই আয়াত খ্রীষ্টানেরা নিজেদের কিতাব থেকে নকল করেছিল যে, হযরত ঈসা (আঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী) -এর দ্বারাও প্রকৃত পিতাকে বুঝায় না, বরং তাদের পরিভাষায় আল্লাহর জন্যেও এরূপ শব্দ ব্যবহৃত হতো। অতএব, এর ভাবার্থ হবে-আমি আমার ও তোমাদের প্রভুর নিকট যাচ্ছি। আর এর দ্বারা এটাও স্পষ্টভাবে প্রকাশ পাচ্ছে যে, এখানে এ আয়াতে যে সম্পর্ক হযরত ঈসা (আঃ)-এর রয়েছে ঐ সম্পর্কই তাঁর সমস্ত উম্মতের দিকেও রয়েছে। কিন্তু এ লোকগুলো নিজেদের ভুল আকীদায় আল্লাহর সাথে হযরত ঈসা (আঃ)-এর যে সম্পর্ক স্থাপন করতে, নিজেদের ব্যাপারে তা মনে করতো না। সুতরাং এ শব্দ শুধুমাত্র সম্মান ও মর্যাদার জন্যেই ছিল, অন্য কিছুর জন্যে ছিল না।

আল্লাহ পাক তাদেরকে উত্তর দিচ্ছেন-যদি এটা ঠিকই হয় তবে তোমাদের কুফর ও মিথ্যা আরোপের কারণে আল্লাহ তোমাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন কেন? কোন একজন সুফী একজন ফিকাহশাস্ত্রবিদকে জিজ্ঞেস করেনঃ “কুরআন মাজীদের মধ্যে কোন জায়গায় এটাও কি আছে যে, বন্ধু স্বীয় বন্ধুকে শাস্তি দেন না? তিনি এর কোন উত্তর দিতে সক্ষম হলেন না। সুফী তখন এ আয়াতটিই পাঠ করলেন। এই উক্তিটি খুবই উত্তম। আর এরই দলীল হচ্ছে মুসনাদের এ হাদীসটি যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদের একটি দলকে সাথে নিয়ে পথ চলছিলেন। একটি ছোট ছেলে পথে খেলা করছিল। তার মা যখন দেখলো যে, একটি বিরাট দল ঐ পথ দিয়েই আসছেন তখন সে ভয় পেয়ে গেল যে, না জানি তারা তার ছেলেকে পদতলে পিষ্ট করে ফেলবেন। তাই সে “আমার ছেলে আমার ছেলে” বলতে বলতে দৌড়িয়ে আসলো এবং অতি তাড়াতাড়ি তার ছেলেকে কোলে উঠিয়ে নিলো। এই দেখে সাহাবীগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ মহিলাটি তো তার প্রিয় ছেলেটিকে কখনও আগুনে নিক্ষেপ করতে পারে না!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “ঠিক কথাই বটে। আল্লাহ তা'আলাও কখনও তার প্রিয় বান্দাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে যাবেন না।”

ইয়াহুদীদের কথার উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলছেনঃ অন্যান্য মানুষের মত তোমারও মানুষই বটে। অন্যান্য লোকদের উপর তোমাদের কোনই প্রাধান্য ও শ্রেষ্ঠত্ব নেই। মহান আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের উপর মহা বিচারক এবং তিনিই হচ্ছেন তাদের মধ্যে সঠিক ফায়সালাকারী; তিনি যাকে ইচ্ছা মার্জনা করবেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেবেন। তার কোন হুকুমকেই কেউ প্রতিরোধ করতে পারে না। তিনি সত্বরই বান্দাদের কৃতকর্মের হিসাব গ্রহণকারী। যমীন, আসমান এবং এতদুভয়ের সমুদয় মখলুক তারই অধিকারে রয়েছে। সবকিছুরই প্রভু তিনিই। সমস্তই তার দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। তিনিই বান্দাদের ফায়সালা করবেন। তিনি অত্যাচারী নন, তিনি ন্যায় বিচারক। তিনি পুণ্যবানদেরকে শান্তি এবং অপরাধীদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন। নোমান ইবনে আ’সা, বাহর ইবনে উমার, শাস ইবনে আদী প্রমুখ ইয়াহুদীদের বড় বড় আলেমগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। তিনি তাদেরকে অনেক বুঝালেন। শেষ পর্যন্ত তাদেরকে শাস্তির ভয় দেখালেন। তখন তারা বললো, “জনাব! আপনি আমাদেরকে কিসের ভয় দেখাচ্ছেন? আমরা তো আল্লাহর সন্তান ও তাঁর প্রিয়পাত্র।` খ্রীষ্টানেরাও এ কথা বলতো, তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তারা পরস্পরের মধ্যে বানিয়ে সানিয়ে এ কথাটিও ছড়িয়ে দিয়েছিল যে, আল্লাহ তাআলা হযরত ইসরাঈল (আঃ)-এর নিকট প্রত্যাদেশ করেছিলেন-তোমার প্রথম পুত্রটি আমার সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত। তার সন্তানরা চল্লিশদিন পর্যন্ত জাহান্নামে থাকবে। এ সময়ের মধ্যে আগুন তাদেরকে পবিত্র করে দেবে এবং তাদের গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেবে। তারপর একজন ফেরেশতা ডাক দিয়ে বলবেনঃ “ইসরাঈল (আঃ)-এর সন্তানদের মধ্যে যারই খত্না করা আছে সে যেন বেরিয়ে আসে।” কুরআন কারীমে তাদের যে উক্তিটি বর্ণিত আছে তার অর্থ এটাই যে, তারা বলেঃ “আমাদেরকে গণনাকৃত কয়েকটি দিন মাত্র জাহান্নামে থাকতে হবে।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) ও ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।