আল কুরআন


সূরা আল-মায়েদা (আয়াত: 17)

সূরা আল-মায়েদা (আয়াত: 17)



হরকত ছাড়া:

لقد كفر الذين قالوا إن الله هو المسيح ابن مريم قل فمن يملك من الله شيئا إن أراد أن يهلك المسيح ابن مريم وأمه ومن في الأرض جميعا ولله ملك السموات والأرض وما بينهما يخلق ما يشاء والله على كل شيء قدير ﴿١٧﴾




হরকত সহ:

لَقَدْ کَفَرَ الَّذِیْنَ قَالُوْۤا اِنَّ اللّٰهَ هُوَ الْمَسِیْحُ ابْنُ مَرْیَمَ ؕ قُلْ فَمَنْ یَّمْلِکُ مِنَ اللّٰهِ شَیْئًا اِنْ اَرَادَ اَنْ یُّهْلِکَ الْمَسِیْحَ ابْنَ مَرْیَمَ وَ اُمَّهٗ وَ مَنْ فِی الْاَرْضِ جَمِیْعًا ؕ وَ لِلّٰهِ مُلْکُ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ وَ مَا بَیْنَهُمَا ؕ یَخْلُقُ مَا یَشَآءُ ؕ وَ اللّٰهُ عَلٰی کُلِّ شَیْءٍ قَدِیْرٌ ﴿۱۷﴾




উচ্চারণ: লাকাদ কাফারাল্লাযীনা কা-লূ ইন্নাল্লা-হা হুওয়াল মাছীহুবনুমারইয়ামা কুল ফামাইঁ ইয়ামলিকুমিনাল্লা-হিশাইআন ইন আরা-দা আইঁ ইউহলিকাল মাছীহাবনা মারইয়ামা ওয়া উম্মাহূওয়া মান ফিল আরদিজামী‘আওঁ ওয়ালিলল্লা-হি মুলকুছছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদিওয়ামা-বাইনাহুমা ইয়াখলুকুমা-ইয়াশাউ ওয়াল্লা-হু ‘আলা-কুল্লি শাইয়িন কাদীর।




আল বায়ান: অবশ্যই তারা কুফরী করেছে যারা বলে ‘নিশ্চয় মারইয়াম পুত্র মাসীহই আল্লাহ’। বল, যদি আল্লাহ ধ্বংস করতে চান মারইয়াম পুত্র মাসীহকে ও তার মাকে এবং যমীনে যারা আছে তাদের সকলকে ‘তাহলে কে আল্লাহর বিপক্ষে কোন কিছুর ক্ষমতা রাখে? আর আসমানসমূহ, যমীন ও তাদের মধ্যবর্তী যা রয়েছে, তার রাজত্ব আল্লাহর জন্যই। তিনি যা ইচ্ছা তা সৃষ্টি করেন এবং আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৭. যারা বলে, নিশ্চয় মারইয়াম-তনয় মসীহই আল্লাহ্‌, তারা অবশ্যই কুফরী করেছে।(১) বলুন, আল্লাহ যদি মারইয়াম-তনয় মসীহ, তার মাতা এবং দুনিয়ার সকলকে ধ্বংস করতে ইচ্ছে করেন তবে তাঁকে বাধা দেবার শক্তি কার আছে? আর আসমানসমূহ ও যমীনে এবং এ দুয়ের মধ্যে যা কিছু আছে তার সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছে সৃষ্টি করেন(২) এবং আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।




তাইসীরুল ক্বুরআন: তারা কুফরী করেছে যারা বলে মাসীহ্ ইবনে মারইয়ামই আল্লাহ। বল, মাসীহ ইবনে মারইয়াম, আর তার মা এবং পৃথিবীতে যারা আছে সকলকে ধ্বংস করতে চাইলে আল্লাহর বিরুদ্ধে কারো এতটুকু ক্ষমতা আছে কি? আসমানসমূহে আর পৃথিবীতে ও এদের মধ্যে যা কিছু আছে সব আল্লাহরই মালিকানাধীন। তিনি যা ইচ্ছে সৃষ্টি করেন। আল্লাহ্ সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান।




আহসানুল বায়ান: (১৭) নিশ্চয় তারা অবিশ্বাসী (কাফের), যারা বলে, ‘মারয়্যাম-তনয় মসীহই আল্লাহ।’ বল, ‘মারয়্যাম-তনয় মসীহ, তার মাতা এবং পৃথিবীর সকলকে যদি আল্লাহ ধ্বংস করতে ইচ্ছা করেন, তবে তাঁকে বাধা দেবার শক্তি কার আছে?’ আকাশ ও ভূ-মন্ডলে এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে, তার সার্বভৌমতব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। আর আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান। [1]



মুজিবুর রহমান: নিশ্চয়ই তারা কাফির যারা বলেঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ স্বয়ং হচ্ছেন মসীহ্ (ঈসা) ইবনে মারইয়াম! তুমি বলঃ যদি আল্লাহ মসীহ্ (ঈসা) ইবনু মারইয়ামকে ও তার মাতাকে এবং ভূ-পৃষ্ঠে যারা আছে তাদের সবাইকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করেন তাহলে এরূপ কে আছে যে তাদেরকে আল্লাহ হতে এতটুকু রক্ষা করতে পারে? আল্লাহরই কর্তৃত্ব নির্দিষ্ট রয়েছে আকাশসমূহে ও যমীনে এবং এতদুভয়ের মধ্যস্থিত যাবতীয় কিছুর উপর; তিনি যা ইচ্ছা করেন তাই সৃষ্টি করেন, আর আল্লাহ সকল বস্তুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান।



ফযলুর রহমান: যারা বলে, “আল্লাহ তো মরিয়মের পুত্র মসীহ” তারা অবশ্যই কুফরির মধ্যে রয়েছে। বল, “তাহলে আল্লাহ যদি মরিয়মের পুত্র মসীহ ও তার মাকে এবং পৃথিবীতে যারা আছে তাদের সকলকে ধ্বংস করতে চান তাহলে কে আছে যে আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করার ক্ষমতা রাখে?” আসমান-জমিন ও তার মধ্যবর্তী সবকিছুর কর্তৃত্ব আল্লাহরই। তিনি যা চান সৃষ্টি করেন। আল্লাহ সবকিছু করতে সক্ষম।



মুহিউদ্দিন খান: নিশ্চয় তারা কাফের, যারা বলে, মসীহ ইবনে মরিয়মই আল্লাহ। আপনি জিজ্ঞেস করুন, যদি তাই হয়, তবে বল যদি আল্লাহ মসীহ ইবনে মরিয়ম, তাঁর জননী এবং ভূমন্ডলে যারা আছে, তাদের সবাইকে ধ্বংস করতে চান, তবে এমন কারও সাধ্য আছে কি যে আল্লাহর কাছ থেকে তাদেরকে বিন্দুমাত্রও বাঁচাতে পারে? নভোমন্ডল, ভুমন্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যে যা আছে, সবকিছুর উপর আল্লাহ তা’আলার আধিপত্য। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। আল্লাহ সবকিছুর উপর শক্তিমান।



জহুরুল হক: তারা নিশ্চয়ই অবিশ্বাস পোষণ করে যারা বলে -- "নিঃসন্দেহ আল্লাহ্‌, তিনিই মসীহ্‌, মরিয়মের পুত্র।" তুমি বলো -- "কার তাহলে বিন্দুমাত্র ক্ষমতা আছে আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধে যখন তিনি চেয়েছিলেন মরিয়ম-পুত্র মসীহ্‌কে বিনাশ করতে, আর তাঁব মাতাকে, আর পৃথিবীতে যারা ছিল তাদের সবাইকে?" বস্তুতঃ আল্লাহ্‌রই মহাকাশমন্ডল ও পৃথিবীর রাজত্ব আর এই দুইয়ের মধ্যে যা আছে। তিনি সৃষ্টি করেন যা তিনি ইচ্ছে করেন। আর আল্লাহ্ সব-কিছুর উপরে সর্বশক্তিমান।



Sahih International: They have certainly disbelieved who say that Allah is Christ, the son of Mary. Say, "Then who could prevent Allah at all if He had intended to destroy Christ, the son of Mary, or his mother or everyone on the earth?" And to Allah belongs the dominion of the heavens and the earth and whatever is between them. He creates what He wills, and Allah is over all things competent.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৭. যারা বলে, নিশ্চয় মারইয়াম-তনয় মসীহই আল্লাহ্–, তারা অবশ্যই কুফরী করেছে।(১) বলুন, আল্লাহ যদি মারইয়াম-তনয় মসীহ, তার মাতা এবং দুনিয়ার সকলকে ধ্বংস করতে ইচ্ছে করেন তবে তাঁকে বাধা দেবার শক্তি কার আছে? আর আসমানসমূহ ও যমীনে এবং এ দুয়ের মধ্যে যা কিছু আছে তার সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছে সৃষ্টি করেন(২) এবং আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।


তাফসীর:

(১) আলোচ্য আয়াতে নাসারাদের একটি উক্তির খণ্ডন করা হয়েছে- যা তাদের একদলের বিশ্বাসও ছিল। অর্থাৎ তাদের একদলের বিশ্বাস ছিল যে, ঈসা মসীহ হুবহু আল্লাহ। কিন্তু আয়াতে যে যুক্তি দ্বারা বিষয়টির খণ্ডন করা হয়েছে, তাতে নাসারাদের সব দলের একত্ববাদ বিরোধী ভ্রান্ত বিশ্বাসেরই খণ্ডন হয়ে যায়, তা মসীহ আলাইহিস সালামের আল্লাহর সন্তান হওয়া সংক্রান্ত বিশ্বাসই হোক অথবা তিন ইলাহর অন্যতম ইলাহ হওয়ার বিশ্বাসই হোক। আল্লাহ তা’আলা বলছেন যে, যদি তিনি ঈসা ও তার মা মারইয়ামকে মারতে ইচ্ছা করেন, তবে কি এমন কেউ আছে যে তাদেরকে মৃত্যু থেকে বাঁচাতে পারে?

তারা নিজেরাও সেটা করতে সক্ষম নয়। সুতরাং তারা কিভাবে ইলাহ হতে পারে? আল্লাহ তা'আলার সামনে মসীহ 'আলাইহিস সালাম এতই অক্ষম যে, তিনি নিজেকে রক্ষা করতে পারেন না এবং যে জননীর খেদমত ও হেফাযত তার কাছে প্রাণের চেয়েও প্রিয়, সে জননীকেও রক্ষা করতে পারেন না। সুতরাং তিনিই কিভাবে ইলাহ হতে পারেন। আর তার মা যেহেতু মারা গেছেন সেহেতু কিভাবেই বা তিনি তিন ইলাহর অন্যতম ইলাহ বলে বিবেচিত হবেন? [তাফসীর মুয়াসসার ও সা’দী]


(২) ‘তিনি যা ইচ্ছে সৃষ্টি করেন’ এ বাক্যে নাসারাদের পূর্বোক্ত ভ্রান্ত বিশ্বাসের কারণকে খণ্ডন করা হয়েছে। কেননা, মসীহকে আল্লাহ মনে করার আসল কারণ তাদের মতে এই ছিল যে, তিনি জগতের সাধারণ নিয়মের বিপরীতে পিতা ছাড়া শুধুমাত্র মায়ের গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণ করেছেন। তিনি মানুষ হলে নিয়মানুযায়ী পিতা-মাতা উভয়ের মাধ্যমে জন্মগ্রহণ করতেন। আলোচ্য বাক্যে এর উত্তর দেয়া হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা যাকে ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা সৃষ্টি করার পূর্ণ ক্ষমতা রাখেন। যেমন অন্যত্র বলেছেন যে, “ঈসার উদাহরণ তো আদমের মত” [সূরা আলে-ইমরানঃ ৫৯]

এ আয়াতেও উক্ত সন্দেহের নিরসন করা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর সাধারণ নিয়মের বাইরে মসীহ আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করা তার ইলাহ হওয়ার প্রমাণ হতে পারে না। লক্ষণীয় যে, আদমকে আল্লাহ তা'আলা পিতা ও মাতা উভয়ের মাধ্যম ছাড়াই সৃষ্টি করেছিলেন। সুতরাং আল্লাহ সবকিছুই করতে পারেন। তিনিই স্রষ্টা, রব ও উপাসনার যোগ্য। অন্য কেউ তার অংশীদার নয়। [সা’দী; মুয়াসসার; ইবন কাসীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৭) নিশ্চয় তারা অবিশ্বাসী (কাফের), যারা বলে, ‘মারয়্যাম-তনয় মসীহই আল্লাহ।’ বল, ‘মারয়্যাম-তনয় মসীহ, তার মাতা এবং পৃথিবীর সকলকে যদি আল্লাহ ধ্বংস করতে ইচ্ছা করেন, তবে তাঁকে বাধা দেবার শক্তি কার আছে?’ আকাশ ও ভূ-মন্ডলে এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে, তার সার্বভৌমতব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। আর আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান। [1]


তাফসীর:

[1] এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা নিজ অসীম ক্ষমতা ও পূর্ণ সার্বভৌমত্বের কথা বর্ণনা করেছেন। উদ্দেশ্য খ্রিষ্টানদের সেই আকীদা ও বিশ্বাসকে খন্ডন করা, যাতে তারা মনে করে যে, মসীহ (আঃ) স্বয়ং আল্লাহ। ‘মসীহ (আঃ) স্বয়ং আল্লাহ’ (যীশুই ঈশ্বর) এই আকীদায় বিশ্বাসী প্রথমে অল্প সংখ্যক লোক ছিল অর্থাৎ, খ্রিষ্টানদের একটি ফির্কাই ছিল, যারা ‘ইয়াকূবিয়াহ’ নামে পরিচিত। কিন্তু বর্তমানে তাদের প্রায় সকল ফির্কাই কোন না কোন দিক দিয়ে ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ মনে করে থাকে। এই জন্য খ্রিষ্টধর্মে ত্রিত্ববাদ অথবা ট্রিনিটির বিশ্বাস মূল ভিত্তি হিসাবে গুরুত্ব লাভ করেছে। অথচ কুরআনে কারীমের এই আয়াতে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, কোন নবী বা রসূলকে আল্লাহর গুণে গুণান্বিত করা প্রকাশ্য কুফরী। খ্রিষ্টানরা মসীহ (আঃ)-কে আল্লাহ বানিয়ে এই কুফরী করেছে। যদি অন্য কোন ফির্কা বা দল অন্য কোন নবী বা রসূলকে মানুষ ও রসূল হওয়ার আসন থেকে উঠিয়ে আল্লাহর আসনে আসীন করে, তাহলে তারাও কুফরী করবে। (আমরা এই ভ্রান্ত আকীদা থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৭-১৯ নং আয়াতের তাফসীর:



এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা নিজের অসীম ক্ষমতা ও পূর্ণ সার্বভৌমত্বের মালিকানার কথা বর্ণনা করেছেন। উদ্দেশ্য হল: খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদ আকীদাহ ও বিশ্বাসকে খণ্ডন করা। ঈসা (আঃ)-কে যারা আল্লাহ বলে বিশ্বাস করে তারা কাফির। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:



(لَقَدْ كَفَرَ الَّذِيْنَ قَالُوْآ إِنَّ اللّٰهَ ثَالِثُ ثَلٰثَةٍ)



“যারা বলে, ‘আল্লাহ তো তিনের মধ্যে একজন, তারা কুফরী করেছে।”(সূরা মায়িদাহ ৫:৭৩)



আল্লাহ তা‘আলা যদি ঈসা ও তার মাতাকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করেন তাহলে কেউ কি বাঁচাতে পারবে? না পারবে না। তাহলে কিভাবে তারা আল্লাহ হতে পারে! এ জন্যই তিনি অত্র আয়াতের সাথেই সংযুক্ত করে বলেছেন: ‘আসমান ও জমিনের এবং এদের মধ্যে যা কিছু আছে তার সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।’ অর্থাৎ আকাশ-জমিনের রাজত্ব তাঁর, তিনি যা ইচ্ছা যেভাবে ইচ্ছা সৃষ্টি করতে পারেন। তিনি ইচ্ছা করলে কাউকে পিতা-মাতা ছাড়া সৃষ্টি করতে পারেন যেমন আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করেছেন, আবার পিতা ছাড়াও সৃষ্টি করতে পারেন। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। তাই বলে তিনি আল্লাহ বা আল্লাহর অংশ হয়ে যাবেন এমনটা নয়।



যুগে যুগে মানুষ কুফর, শির্ক ও গুমরাহীতে নিপতিত হবার বড় কারণ ছিল নাবী-রাসূল ও অলী-আওলিয়াদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা। তাদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে খ্রিস্টানরা ঈসা (আঃ) কে আল্লাহ বানিয়ে ছিল, আর ইয়াহূদীরা উযাইর (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র বানিয়ে ছিল। উম্মতে মুহাম্মাদীর এক শ্রেণির মানুষ অলী-আওলিয়াদের নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে তাদেরকে আল্লাহর মর্যাদায় তুলে দিচ্ছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: তোমরা বাড়াবাড়ি করা থেকে বিরত থাক, কারণ তোমাদের পূর্ববর্তীরা বাড়াবাড়ি করার কারণে ধ্বংস হয়েছে। (ইবনু মাযাহ হা: ৩০২৯, সহীহ)



ইয়াহূদীরা উযায়েরকে আল্লাহ তা‘আলার পুত্র ও খ্রিস্টানরা ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ বলে থাকে। মূলত এ দু’জনই আল্লাহ তা‘আলার প্রিয়পাত্র ও বান্দা এবং তাঁরা বান্দা পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করেননি। যেমন সূরা নিসার ১৭২ নং আয়াতে উল্লেখ হয়েছে। এমনকি তাঁরা কেউ নিজেদেরকে মা‘বূদ দাবী করেননি এবং নিজেদের ইবাদতের দিকে আহ্বান করেননি। এ সম্পর্কে অত্র সূরার ১১৬ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে।



(وَقَالَتِ الْيَهُوْدُ وَالنَّصٰرٰي نَحْنُ أَبْنٰ۬ؤُا اللّٰهِ وَأَحِبَّا۬ٓؤُه)



‘ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানগণ বলে, ‘আমরা আল্লাহর পুত্র ও তার প্রিয়পাত্র।’আল্লাহ তা‘আলা স্বয়ং তার উত্তর দিচ্ছেন: তাহলে কেন তিনি তোমাদেরকে তোমাদের পাপের কারণে শাস্তি দেন। যদি প্রিয়পাত্রই হতে তাহলে তো শাস্তি দেয়ার প্রশ্নই আসে না।



সুতরাং বুঝা যাচ্ছে এটা তাদের মিথ্যা দাবী। আল্লাহ তা‘আলা কাউকে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেননি এবং স্ত্রী হিসেবেও কাউকে গ্রহণ করেননি।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(یٰٓاَھْلَ الْکِتٰبِ لَا تَغْلُوْا فِیْ دِیْنِکُمْ وَلَا تَقُوْلُوْا عَلَی اللہِ اِلَّا الْحَقّ َ ﺚ اِنَّمَا الْمَسِیْحُ عِیْسَی ابْنُ مَرْیَمَ رَسُوْلُ اللہِ وَکَلِمَتُھ۫ ﺆ اَلْقٰٿھَآ اِلٰی مَرْیَمَ وَرُوْحٌ مِّنْھُﺑ فَاٰمِنُوْا بِاللہِ وَرُسُلِھ۪)



‘‘হে আহলে কিতাবগণ! তোমাদের দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি কর না ও আল্লাহ সম্পর্কে সত্য ছাড়া অন্য কিছু বল না। মারইয়ামের ছেলে ‘ঈসা মসীহ তো আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর বাণী, যা তিনি মারইয়ামের নিকট প্রেরণ করেছিলেন ও তাঁর আদেশ। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান আন।” (সূরা নিসা ৪:১৭১)



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা আহলে কিতাদেরকে নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি ঈমান আনার আহ্বান করেছেন। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এমন সময় প্রেরণ করেছেন যখন নাবী-রাসূলের আগমনে দীর্ঘ বিরতি ছিল।



(فَتْرَةٍ مِّنَ الرُّسُلِ)



‘রাসূল আগমনে বিরতির সময়’এ বিরতি সময়ের ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও ঈসা (আঃ)-এরমাঝে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান ছিল, ইমাম বুখারী সালমান ফারেসী (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন: সে সময় ছিল ছয়শত বছর। (সহীহ বুখারী হা: ৩৯৪৮) এছাড়া বিভিন্ন বর্ণনাতে বলা হয়েছে: ৫৬০, ৫৪০ বছর ইত্যাদি।



নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে প্রেরণ করার অন্যতম আরেকটি উদ্দেশ্য হল, যাতে এ অভিযোগ না করতে পারে যে, কোন সুসংবাদদাতা বা ভীতি প্রদর্শনকারী আমাদের নিকট আসেনি। সেজন্য আল্লাহ তা‘আলা বলে দিলেন:



(فَقَدْ جَا۬ءَكُمْ بَشِيْرٌ وَّنَذِيْرٌ)



“এখন অবশ্যই তোমাদের নিকট একজন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী এসেছে।”



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. যারা বলে আল্লাহ তা‘আলা হলেন ঈসা বা আল্লাহ তা‘আলা তিনজনের একজন বা আল্লাহ তা‘আলার সমতুল্য কোন গাউস, কুতুব, পীর-ফকির বা বাবা রয়েছে তারা কাফির।

২. ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানদের কর্তৃক তাদের আল্লাহ তা‘আলার পুত্র হবার দাবী মিথ্যা।

৩. সকল সার্বভৌমত্বের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা।

৪. নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সারা পৃথিবীবাসীর জন্য প্রেরণ করেছেন যাতে কেউ তাওহীদ না জানার অভিযোগ করতে না পারে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৭-১৮ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তা'আলা খ্রীষ্টানদের কুফরের কথা বর্ণনা করছেন যে, তারা আল্লাহরই সৃষ্টকে তাঁরই মর্যাদা প্রদান করছে। অথচ আল্লাহ শিরক থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। সমস্ত বস্তুই তার অনুগত এবং প্রত্যেক বস্তুর উপর তিনি পূর্ণ ক্ষমতাবান। সবকিছুরই উপরই তার আধিপত্য রয়েছে। এমন কেউ নেই যে তাঁকে তাঁর ইচ্ছে থেকে বিরত রাখতে পারে। যদি তিনি মাসীহ (আঃ)-কে, তার মাকে এবং ভূ-পৃষ্ঠের সমস্ত সৃষ্টজীবকে ধ্বংস করে দেয়ার ইচ্ছা করেন। তবুও কারও শক্তি নেই যে, তার সামনে এগিয়ে আসে এবং তাকে বাধা প্রদান করে। সমস্ত প্রাণী ও সৃষ্ট বস্তুর উদ্ভাবক ও সৃষ্টিকর্তা তিনিই। সকলের মালিক ও অধিকর্তা তিনিই। তিনি যা চান তা-ই করেন। কোন জিনিসই তার ক্ষমতার বাইরে নেই। কেউই তার কাজের কোন হিসাব নিতে পারে না। তাঁর রাজত্ব ও সাম্রাজ্য খুবই প্রশস্ত। তাঁর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব খুবই উচ্চ। তিনি প্রবল পরাক্রান্ত, তিনি মহাকারিগর। তিনি যেভাবে চান সেভাবেই ভাঙ্গেন ও গড়েন। তার শক্তির কোন সীমা নেই।

খ্রীষ্টানদের দাবী খণ্ডনের পর এখন ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান উভয়েরই দাবীকে খণ্ডন করছেন। তারা আল্লাহর উপর একটা মিথ্যা আরোপ এভাবে করেছে যে, তারা আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিকা) ও প্রিয় পাত্র। তারা নবীদের পুত্র এবং আল্লাহর আদরের সন্তান। তারা নিজেদের কিতাব থেকে নকল করে বলে যে, আল্লাহ তাআলা ইসরাঈল (আঃ)-কে বলেছিলেনঃ অতঃপর তারা এর ভুল ব্যাখ্যা করে ভাবার্থ বদলিয়ে দিয়ে বলে তিনি যখন আল্লাহর পুত্র হলেন তখন আমরাও তাঁর পুত্র ও প্রিয়পাত্র হলাম। অথচ তাদেরই মধ্যে যারা ছিল জ্ঞানী ও বিবেচক তারাও তাদেরকে বুঝিয়ে বলেছিল যে, এ শব্দগুলো দ্বারা হযরত ইসরাঈল (আঃ)-এর শুধু মর্যাদা ও সম্মানই প্রমাণিত হচ্ছে মাত্র। এর দ্বারা তাঁর আল্লাহর সাথে আত্মীয়তার বা রক্তের সম্পর্ক কোনক্রমেই প্রতিষ্ঠিত হয় না। এ অর্থেরই আয়াত খ্রীষ্টানেরা নিজেদের কিতাব থেকে নকল করেছিল যে, হযরত ঈসা (আঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী) -এর দ্বারাও প্রকৃত পিতাকে বুঝায় না, বরং তাদের পরিভাষায় আল্লাহর জন্যেও এরূপ শব্দ ব্যবহৃত হতো। অতএব, এর ভাবার্থ হবে-আমি আমার ও তোমাদের প্রভুর নিকট যাচ্ছি। আর এর দ্বারা এটাও স্পষ্টভাবে প্রকাশ পাচ্ছে যে, এখানে এ আয়াতে যে সম্পর্ক হযরত ঈসা (আঃ)-এর রয়েছে ঐ সম্পর্কই তাঁর সমস্ত উম্মতের দিকেও রয়েছে। কিন্তু এ লোকগুলো নিজেদের ভুল আকীদায় আল্লাহর সাথে হযরত ঈসা (আঃ)-এর যে সম্পর্ক স্থাপন করতে, নিজেদের ব্যাপারে তা মনে করতো না। সুতরাং এ শব্দ শুধুমাত্র সম্মান ও মর্যাদার জন্যেই ছিল, অন্য কিছুর জন্যে ছিল না।

আল্লাহ পাক তাদেরকে উত্তর দিচ্ছেন-যদি এটা ঠিকই হয় তবে তোমাদের কুফর ও মিথ্যা আরোপের কারণে আল্লাহ তোমাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন কেন? কোন একজন সুফী একজন ফিকাহশাস্ত্রবিদকে জিজ্ঞেস করেনঃ “কুরআন মাজীদের মধ্যে কোন জায়গায় এটাও কি আছে যে, বন্ধু স্বীয় বন্ধুকে শাস্তি দেন না? তিনি এর কোন উত্তর দিতে সক্ষম হলেন না। সুফী তখন এ আয়াতটিই পাঠ করলেন। এই উক্তিটি খুবই উত্তম। আর এরই দলীল হচ্ছে মুসনাদের এ হাদীসটি যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদের একটি দলকে সাথে নিয়ে পথ চলছিলেন। একটি ছোট ছেলে পথে খেলা করছিল। তার মা যখন দেখলো যে, একটি বিরাট দল ঐ পথ দিয়েই আসছেন তখন সে ভয় পেয়ে গেল যে, না জানি তারা তার ছেলেকে পদতলে পিষ্ট করে ফেলবেন। তাই সে “আমার ছেলে আমার ছেলে” বলতে বলতে দৌড়িয়ে আসলো এবং অতি তাড়াতাড়ি তার ছেলেকে কোলে উঠিয়ে নিলো। এই দেখে সাহাবীগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ মহিলাটি তো তার প্রিয় ছেলেটিকে কখনও আগুনে নিক্ষেপ করতে পারে না!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “ঠিক কথাই বটে। আল্লাহ তা'আলাও কখনও তার প্রিয় বান্দাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে যাবেন না।”

ইয়াহুদীদের কথার উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলছেনঃ অন্যান্য মানুষের মত তোমারও মানুষই বটে। অন্যান্য লোকদের উপর তোমাদের কোনই প্রাধান্য ও শ্রেষ্ঠত্ব নেই। মহান আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের উপর মহা বিচারক এবং তিনিই হচ্ছেন তাদের মধ্যে সঠিক ফায়সালাকারী; তিনি যাকে ইচ্ছা মার্জনা করবেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেবেন। তার কোন হুকুমকেই কেউ প্রতিরোধ করতে পারে না। তিনি সত্বরই বান্দাদের কৃতকর্মের হিসাব গ্রহণকারী। যমীন, আসমান এবং এতদুভয়ের সমুদয় মখলুক তারই অধিকারে রয়েছে। সবকিছুরই প্রভু তিনিই। সমস্তই তার দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। তিনিই বান্দাদের ফায়সালা করবেন। তিনি অত্যাচারী নন, তিনি ন্যায় বিচারক। তিনি পুণ্যবানদেরকে শান্তি এবং অপরাধীদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন। নোমান ইবনে আ’সা, বাহর ইবনে উমার, শাস ইবনে আদী প্রমুখ ইয়াহুদীদের বড় বড় আলেমগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। তিনি তাদেরকে অনেক বুঝালেন। শেষ পর্যন্ত তাদেরকে শাস্তির ভয় দেখালেন। তখন তারা বললো, “জনাব! আপনি আমাদেরকে কিসের ভয় দেখাচ্ছেন? আমরা তো আল্লাহর সন্তান ও তাঁর প্রিয়পাত্র।` খ্রীষ্টানেরাও এ কথা বলতো, তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তারা পরস্পরের মধ্যে বানিয়ে সানিয়ে এ কথাটিও ছড়িয়ে দিয়েছিল যে, আল্লাহ তাআলা হযরত ইসরাঈল (আঃ)-এর নিকট প্রত্যাদেশ করেছিলেন-তোমার প্রথম পুত্রটি আমার সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত। তার সন্তানরা চল্লিশদিন পর্যন্ত জাহান্নামে থাকবে। এ সময়ের মধ্যে আগুন তাদেরকে পবিত্র করে দেবে এবং তাদের গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেবে। তারপর একজন ফেরেশতা ডাক দিয়ে বলবেনঃ “ইসরাঈল (আঃ)-এর সন্তানদের মধ্যে যারই খত্না করা আছে সে যেন বেরিয়ে আসে।” কুরআন কারীমে তাদের যে উক্তিটি বর্ণিত আছে তার অর্থ এটাই যে, তারা বলেঃ “আমাদেরকে গণনাকৃত কয়েকটি দিন মাত্র জাহান্নামে থাকতে হবে।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) ও ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।