সূরা আন-নাজম (আয়াত: 26)
হরকত ছাড়া:
وكم من ملك في السماوات لا تغني شفاعتهم شيئا إلا من بعد أن يأذن الله لمن يشاء ويرضى ﴿٢٦﴾
হরকত সহ:
وَ کَمْ مِّنْ مَّلَکٍ فِی السَّمٰوٰتِ لَا تُغْنِیْ شَفَاعَتُهُمْ شَیْئًا اِلَّا مِنْۢ بَعْدِ اَنْ یَّاْذَنَ اللّٰهُ لِمَنْ یَّشَآءُ وَ یَرْضٰی ﴿۲۶﴾
উচ্চারণ: ওয়াকাম মিম মালাকিন ফিছ ছামা-ওয়া-তি লা-তুগনী শাফা-‘আতুহুম শাইআন ইল্লা-মিম বা‘দিআইঁ ইয়া’যানাল্লা-হু লিমাইঁ ইয়াশাউ ওয়া ইয়ারদা-।
আল বায়ান: আর আসমানসমূহে অনেক ফেরেশতা রয়েছে, তাদের সুপারিশ কোনই কাজে আসবে না। তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন এবং যার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট, তার ব্যাপারে অনুমতি দেয়ার পর।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৬. আর আসমানসমূহে বহু ফিরিশতা রয়েছে; তাদের সুপারিশ কিছুমাত্র ফলপ্রসূ হবে না, তবে আল্লাহর অনুমতির পর; যার জন্য তিনি ইচ্ছে করেন ও যার প্রতি তিনি সস্তুষ্ট।
তাইসীরুল ক্বুরআন: আকাশে কতই না ফেরেশতা আছে তাদের সুপারিশ কোনই কাজে আসবে না, তবে (কাজে আসবে) যদি তিনি অনুমতি দেন যার জন্য আল্লাহ ইচ্ছে করবেন এবং যার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট।
আহসানুল বায়ান: (২৬) আকাশমন্ডলীতে কত ফিরিশতা রয়েছে তাদের কোন সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না, যতক্ষণ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা এবং যার প্রতি সন্তুষ্ট তাকে অনুমতি না দেন। [1]
মুজিবুর রহমান: আকাশে কত মালাইকা/ফেরেশতা রয়েছে, তাদের কোন সুপারিশ ফলপ্রসু হবেনা যতক্ষণ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা এবং যার প্রতি সন্তষ্ট তাকে অনুমতি না দেন।
ফযলুর রহমান: আসমানে অনেক ফেরেশতা আছে, যাদের সুপারিশ কোন কাজে আসবে না; তবে আল্লাহ যার জন্য চান এবং যার ওপর তিনি সন্তুষ্ট, তার পক্ষে তিনি সুপারিশ করার অনুমতি দেওয়ার পরই (তা কাজে আসবে)।
মুহিউদ্দিন খান: আকাশে অনেক ফেরেশতা রয়েছে। তাদের কোন সুপারিশ ফলপ্রসূ হয় না যতক্ষণ আল্লাহ যার জন্যে ইচ্ছা ও যাকে পছন্দ করেন, অনুমতি না দেন।
জহুরুল হক: আর মহাকাশমন্ডলে কত যে ফিরিশ্তা রয়েছে যাদের সুপারিশ কোনো কাজে আসবে না যতক্ষণ না আল্লাহ্ অনুমতি দেন তার জন্য যাকে তিনি ইচ্ছা করেন ও তিনি সন্তষ্ট হয়েছেন।
Sahih International: And how many angels there are in the heavens whose intercession will not avail at all except [only] after Allah has permitted [it] to whom He wills and approves.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২৬. আর আসমানসমূহে বহু ফিরিশতা রয়েছে; তাদের সুপারিশ কিছুমাত্র ফলপ্রসূ হবে না, তবে আল্লাহর অনুমতির পর; যার জন্য তিনি ইচ্ছে করেন ও যার প্রতি তিনি সস্তুষ্ট।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২৬) আকাশমন্ডলীতে কত ফিরিশতা রয়েছে তাদের কোন সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না, যতক্ষণ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা এবং যার প্রতি সন্তুষ্ট তাকে অনুমতি না দেন। [1]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, ফিরিশতাগণ যাঁরা আল্লাহর অধিক নৈকট্যপ্রাপ্ত সৃষ্টি, তাঁদেরকেও সুপারিশ করার অধিকার কেবলমাত্র তাদেরই জন্য দেওয়া হবে, যাদের জন্য আল্লাহ পছন্দ করবেন। ব্যাপার যদি এই হয়, তবে পাথরের মূর্তিগুলো কারো জন্য সুপারিশ কিভাবে করবে, যার আশায় তোমরা বসে আছ? অনুরূপ মহান আল্লাহ মুশরিকদের জন্য সুপারিশ করার অধিকার কাকেই বা কখন দেবেন? তাঁর কাছে তো শিরকের পাপ ক্ষমার্হই নয়।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৯-২৬ নম্বর আয়াতের তাফসীর : /b>
নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে যে সঠিক দীন ও তাওহীদ এসেছে তার আলোচনা করার পর মুশরিকদের বাতিল ধর্মের কথা তুলে ধরা হয়েছে। তারা আল্লাহ তা‘আলাকে বাদ দিয়ে যাদের ‘ইবাদত করে তারা তো আয়াতে উল্লিখিত গুণাবলির অধিকারী নয়, তারা কোন প্রকার উপকার ও ক্ষতি করতে পারে না। তারা ‘ইবাদত করে এমন সব মূর্তির যা তারা নিজের হাতে তৈরি করেছে, যার নামকরণ করেছে তাদের বাপ-দাদারা। যারা মূলত ‘ইবাদত পাবার হক্বদার নয়।
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন : اللت (লাত) নামে একজন লোক ছিল, সে ছাতু তৈরি করে হাজীদের খাওয়াতো। (সহীহ বুখারী হা. ৪৮৫৯)
ইবনু জারীর (রহঃ) বলেন : العزى শব্দটি العزيز থেকে এসেছে। মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী “নাখলা” নামক স্থানে একটি বৃক্ষ ছিল। তার ওপর গম্বুজ নির্মিত ছিল। তা চাদরাবৃত করা হত। কুরাইশরা তাকে খুব সম্মান করত। আমাদের দেশে ক্ববর পূজারীরা যেমন করে থাকে।
আবূ সুফিয়ান (রাঃ) উহূদের দিন বলেছিলেন, আমাদের উয্যা আছে, তোমাদের উয্যা নেই। জবাবে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছিলেন : আল্লাহ তা‘আলা আমাদের অভিভাবক, তোমাদের কোন অভিভাবক নেই। (সহীহ বুখারী হা. ৩০৩৯)
আবূ তুফায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন : মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খালেদ ইবনু ওয়ালিদকে “নাখলা” নামক স্থানে প্রেরণ করলেন। সেখানে উয্যা নামক মূর্তি ছিল। খালেদ (রাঃ) সেখানে আসলেন। উয্যা তিনটি বাবলা গাছের ওপর ছিল। গাছগুলো কেটে ফেলা হলো। গম্বুজ ভেঙ্গে ফেলা হলো। অতঃপর খালেদ (রাঃ) ফিরে এসে নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জানালেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন : “ফিরে যাও, তুমি কিছুই করনি। খালেদ (রাঃ) ফিরে আসলেন এবং তখন দেখলেন তার রক্ষক ও খাদেমরা উয্যাকে রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে আর বলছে হে উয্যা! হে উয্যা! খালেদ (রাঃ) আসলেন এবং দেখলেন, একজন উলঙ্গ নারী রয়েছে, যার চুলগুলো এলোমেলো, আর সে তার মাথার ওপর মাটি নিক্ষেপ করছে। খালেদ (রাঃ) তরবারী দ্বারা তাকে হত্যা করলেন। অতঃপর ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এ সংবাদ দিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন : ঐটাই হলো উয্যা। (মু’জামুল বুলদান ৪/১১৭)
(أَلَكُمُ الذَّكَرُ وَلَهُ الْأُنْثٰي)
অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার জন্য তোমরা কন্যা সন্তান নির্ধারণ করো আর তোমাদের নিজেদের জন্য ছেলে সন্তান গ্রহণ করে নিচ্ছ। এরূপ বণ্টন কতইনা নিকৃষ্ট।
(أَمْ لِلْإِنْسَانِ مَا تَمَنّٰي)
অর্থাৎ মানুষ যা কিছু আকাক্সক্ষা করে তার সব পায় না।
আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : যখন তোমাদের কেউ কিছুর আকাক্সক্ষা করে তখন সে কিসের আকাক্সক্ষা করছে তা যেন লক্ষ্য করে। কেননা সে জানেনা তার ঐ আকাক্সক্ষার জন্য কী লেখা হবে। (মুসনাদ আহমাদ ২/৩৫৭, সহীহ)
(لَا تُغْنِيْ شَفَاعَتُهُمْ)
‘তাদের কোন সুপারিশ কাজে আসবে না’ শাফা‘য়াতের আলোচনা সূরা আল বাকারাতে করা হয়েছে।
সুতরাং যদি নৈকট্যশীল ফেরেশতাদের শাফা‘য়াত আল্লাহ তা‘আলার অনুমতি ছাড়া কাজে না আসে তাহলে কোথায় মূর্তি আর কোথায় মাজারে শায়িত ব্যক্তি ও পীর-গাউস-কুতুবদের শাফায়াত!
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. মক্কার মূর্তিগুলোর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস জানলাম।
২. আল্লাহ তা‘আলা এক, অদ্বিতীয় তার কোন স্ত্রী ও সন্তানাদি নেই।
৩. যাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা শাফা‘য়াত করার অনুমতি দেবেন এবং যাদের প্রতি তিনি খুশি কেবলমাত্র তারাই কারো জন্য শাফা‘য়াত করতে পারবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৯-২৬ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তাআলা এই আয়াতগুলোতে মুশরিকদের ধমকের সুরে বলছেন যে, তারা প্রতিমাগুলোকে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরকে মা’বূদ বানিয়ে নিয়েছে এবং যেমনভাবে আল্লাহর বন্ধু হযরত ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহর নির্দেশক্রমে তার ঘর নির্মাণ করেছেন তেমনিভাবে তারা নিজেদের বাতিল মাবুদগুলোর জন্যে ইবাদতখানা বানিয়েছে।
লাত ছিল একটি সাদা পাথর যা অংকিত ও নক্সকৃত ছিল। ওর উপর গম্বুজ নির্মাণ করা হয়েছিল। ওর উপর তারা গেলাফ উঠিয়েছিল। ওর জন্যে তারা খাদেম, রক্ষক ও ঝাড়দার নিযুক্ত করেছিল। ওর আশে পাশের জায়গাগুলোকে তারা হারাম শরীফের মত মর্যাদা সম্পন্ন মনে করতো। এটা ছিল তায়েফবাসীদের মূর্তির ঘর বা মন্দির। সাকীফ গোত্র এর উপাসক ছিল। তারাই ছিল এর মুতাওয়াল্লী। কুরায়েশ ছাড়া অন্যান্য সমস্ত আরব গোত্রের উপর তারা নিজেদের গৌরব প্রকাশ করতো।
ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, ঐ লোকগুলো আল্লাহ শব্দ হতে লাত শব্দটি বানিয়ে নিয়েছে। তারা যেন একে স্ত্রী লিঙ্গ রূপে ব্যবহার করেছিল। আল্লাহ তাআলার সত্তা সমস্ত শরীক হতে পবিত্র।
একটি কিরআতে, (আরবী) শব্দটির (আরবী) অক্ষরটি তাশদীদের সাথে রয়েছে। অর্থাৎ পানি দ্বারা মিশ্রিতকারী। ওকে (আরবী) এই অর্থে বলার কারণ এই যে, সে একটি সৎলোক ছিল। হজ্বের মৌসুমে সে হাজীদেরকে পানির সাথে ছাতু মিশিয়ে পান করাতো। তার মৃত্যুর পর জনগণ তার কবরের খিদমত করতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে তার ইবাদতের প্রচলন শুরু হয়। অনুরূপভাবে (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দ হতে নেয়া হয়েছে। মক্কা ও মদীনার মধ্যস্থলে অবস্থিত নাখলা' নামক স্থানে একটি বৃক্ষ ছিল। ওর উপরও গম্বুজ নির্মিত ছিল। ওটাকেও চাদর দ্বারা আবৃত করা হতো। কুরায়েশরা ওর খুবই সম্মান করতো। আবু সুফিয়ানও (রাঃ) উহুদের যুদ্ধের দিন বলেছিলেনঃ “আমাদের উযযা আছে এবং তোমাদের (মুসলমানদের) উয নেই।” এর জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে (রাঃ) বলেছিলেন ? “আল্লাহ আমাদের মাওলা এবং তোমাদের কোন মাওলা নেই।”
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি (ভুলক্রমে) লাত ও উযার কসম খেয়ে ফেলবে সে যেন তৎক্ষণাৎ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে নেয়। আর যে ব্যক্তি তার সঙ্গীকে বলবেঃ ‘এসো, আমরা জুয়া খেলি। সে যেন সাদকা করে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) ভাবার্থ এই যে, অজ্ঞতার যুগে যেহেতু এ ধরনের কসম খাওয়া হতো, সেই হেতু ইসলাম গ্রহণের পরেও যদি কারো মুখ দিয়ে পূর্বের অভ্যাস হিসেবে এ শব্দগুলো বেরিয়ে পড়ে তবে তার কালেমা পড়ে নেয়া উচিত।
এমনিভাবে একদা হযরত সা'দ ইবনে আবি অক্কাস (রাঃ) লাত ও উয্যার কসম খেয়ে বসেন। জনগণ তাঁকে সতর্ক করলে তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গমন করেন এবং তাঁর কাছে ঘটনাটি উল্লেখ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বলেন, তুমি নিম্নের কালেমাটি পাঠ করঃ (আরবী)
অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন মা’বূদ নেই, তিনি এক, তার কোন অংশীদার নেই, রাজ্য তাঁরই এবং প্রশংসাও তারই, আর তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। তারপর তিনবার পাঠ করঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘আমি আল্লাহর নিকট বিতাড়িত শয়তান হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। এরপর বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলো এবং ভবিষ্যতে আর এরূপ করো না। (এ হাদীসটি ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
মক্কা ও মদীনার মধ্যস্থলে কাদীদের পার্শ্বে মুসাল্লাল নামক স্থানে মানাত ছিল। অজ্ঞতার যুগে খুযাআহ, আউস ও খাযরাজ গোত্র ওর খুব সম্মান করতে। এখান হতে ইহরাম বেঁধে তারা কা'বার হজ্বের জন্যে যেতো। অনুরূপভাবে এই তিনটি মূর্তি ছাড়া আরো বহু মূর্তি ও থান ছিল আরবের লোকেরা যেগুলোর পূজা করতো। কিন্তু এই তিনটির খুব খ্যাতি ছিল বলে এখানে শুধু এই তিনটিরই বর্ণনা দেয়া হয়েছে। ঐ লোকগুলো এই জায়গাগুলোর তাওয়াফও করতো। তারা তথায় কুরবানীর জন্তুগুলো নিয়ে যেতো এবং তাদের নামে ওগুলোকে কুরবানী করতো। এতদসত্ত্বেও কিন্তু তারা কা'বা শরীফের মর্যাদার কথা স্বীকার করতো। ওটাকে তারা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মসজিদ বলে বিশ্বাস করতো এবং ওর খুবই সম্মান করতো।
সীরাতে ইবনে ইসহাকে রয়েছে যে, কুরায়েশ ও বানু কিনানাহ গোত্র উযযার পূজারী ছিল যা ছিল নাখলায়। ওর রক্ষক ও মুতাওয়াল্লী ছিল বানু শায়বান গোত্র। ওটা ছিল সালীম গোত্রের শাখা। বানু হাশিমের সাথে তাদের ভ্রাতৃত্ব ভাব ছিল। মক্কা বিজয়ের পর এই মূর্তিটি ভেঙ্গে ফেলার জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ)-কে প্রেরণ করেন। হযরত খালিদ (রাঃ) ঐ মূর্তিটিকে ভেঙ্গে ফেলছিলেন এবং মুখে উচ্চারণ করছিলেনঃ (আরবী)
অর্থাৎ “হে উযযা! আমি তোমাকে অস্বীকার করছি, তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি না। আমি দেখছি যে, আল্লাহ তোমাকে লাঞ্ছিত করেছেন।” এটা বাবলার তিনটি গাছের উপর ছিল। গাছগুলোকে কেটে ফেলা হয়। গম্বুজকেও ভেঙ্গে ফেলা হয়। অতঃপর হযরত খালিদ (রাঃ) ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ সংবাদ দেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “তুমি কিছুই করনি। আবার যাও।” তখন হযরত খালিদ (রাঃ) পুনরায় গেলেন। তথাকার রক্ষক ও খাদিমরা বড় বড় কৌশল অবলম্বন করলো। তারা খুব চীৎকার করে ‘হে উয! হে উম্!' বলে ডাক দিলো। হযরত খালিদ (রাঃ) দেখলেন যে, একটি উলঙ্গ নারী রয়েছে, যার চুলগুলো এলোমেলো, আর সে তার মাথার উপর মাটি নিক্ষেপ করছে। হযরত খালিদ (রাঃ) তরবারী দ্বারা তাকে শেষ করে ফেলেন। তারপর ফিরে গিয়ে তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ খবর দেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, ওটাই ছিল উযযা। (এ হাদীসটি ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
লাত ছিল সাকীফ গোত্রের মূর্তি। তারা ছিল তায়েফের অধিবাসী। ওর মুতাওয়াল্লী ও খাদেম ছিল বানু মু'তাব। ওটাকে ভেঙ্গে ফেলার জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সেখানে হযরত মুগীরা ইবনে শুবা (রাঃ) ও হযরত আবু সুফিয়ান সাখর ইবনে হারব (রাঃ)-কে প্রেরণ করেন। তাঁরা ওটাকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে ওর স্থলে মসজিদ নির্মাণ করেন।
মানাত ছিল আউস, খাযরাজ এবং তাদের ন্যায় মত পোষণকারী ইয়াসরিববাসী অন্যান্য লোকদের মূর্তি। ওটা মুসাল্লালের দিকে সমুদ্র তীরবর্তী কাদীদ নামক স্থানে অবস্থিত ছিল। সেখানেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু সুফিয়ান (রাঃ)-কে প্রেরণ করেন। তিনি সেখানে গিয়ে ওকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেলেন। কারো কারো মতে ঐ কুফরিস্তান ধ্বংস হয় হযরত আলী (রাঃ)-এর হাতে।
যুলখালসা ছিল দাউস, খাশআম, বাজীলাহ এবং তাদেরই দেশস্থ আরবীয় অন্যান্য লোকদের বুতখানা। ওটা ছিল তাবালায় অবস্থিত এবং ঐ লোকগুলো ওটাকে কাবায়ে ইয়ামানিয়্যাহ বলতো। আর মক্কার কাবাকে তারা বলতো কা’বায়ে শামিয়্যাহ। ওটা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে হযরত জারীর ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ)-এর হাতে ধ্বংস হয়।
কাস ছিল তাই গোত্র এবং তাদের আশেপাশে বসবাসকারী অন্যান্য আরবীয়দের বুতখানা। ওটা সালমা ও আজ্জার মধ্যস্থিত তাই পাহাড়ে অবস্থিত ছিল। ওটাকে ভেঙ্গে ফেলার কাজে হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) আদিষ্ট হয়েছিলেন। তিনি ওটাকে ভেঙ্গে ফেলেন এবং সেখান হতে দু’টি তরবারী নিয়ে যান। একটির নাম রাসূব এবং অপরটির নাম মুখযিম ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তরবারী দু’টি তাঁকেই দিয়ে দেন।
হুমায়ের গোত্র এবং ইয়ামনবাসী সানআ নামক স্থানে তাদের বুতখানা নির্মাণ করেছিল। ওটাকে রাইয়াম বলা হতো। কথিত আছে যে, ওর মধ্যে একটি কালো কুকুর ছিল। দুই জন হুমাইরী, যারা তুব্বর সঙ্গে বের হয়েছিল, তারা ঐ কুকুরটিকে বের করে হত্যা করে দেয় এবং ঐ বুতখানাকে ধ্বংস করে ফেলে।
বানু রাবীআহ ইবনে সা'দের বুতখানাটির নাম ছিল রিযা। ওটাকে মুসতাওগার ইবনে রাবীআহ ইবনে কা'ব ইবনে সা’দ ইসলামে ভেঙ্গে ফেলেন। ইবনে হিশাম (রাঃ) বলেন যে, তার বয়স ৩৩০ (তিনশ ত্রিশ) বছর হয়েছিল, যার বর্ণনা তিনি স্বয়ং তার কবিতার মধ্যে বর্ণনা করেছেন।
সানদাদ নামক স্থানে বকর, তাগলিব এবং আয়াদ গোত্রের একটি দেবমন্দির ছিল যাকে যুলকা’বাত বলা হতো।
এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ তবে কি পুত্র সন্তান তোমাদের জন্যে এবং কন্যা সন্তান আল্লাহর জন্যে?' কেননা এই মুশরিকরা নিজেদের বাজে ধারণার বশবর্তী হয়ে ফেরেশতাদেরকে আল্লাহর কন্যা বলতো। (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক)। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা যদি তোমাদের পরস্পরের মধ্যে বন্টন করতে বস তখন যদি কাউকেও শুধু কন্যা দাও এবং কাউকেও শুধু পুত্র দাও তবে যাকে শুধু কন্যা দেয়া হবে সে কখনো এতে সম্মত হবে না এবং এই প্রকার বন্টনকে অসঙ্গত বন্টন মনে করা হবে। অথচ তোমরা আল্লাহর জন্যে সাব্যস্ত করছো কন্যা সন্তান আর নিজেদের জন্যে সাব্যস্ত করছো পুত্র সন্তান! এই প্রকার বন্টন তো খুবই বে-ঢংগা ও অসঙ্গত!
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এগুলো কতক নাম মাত্র যা তোমাদের পূর্বপুরুষরা ও তোমরা রেখেছো, যার সমর্থনে আল্লাহ কোন দলীল প্রেরণ করেননি। তারা প্রকৃতপক্ষে মা’বৃদও নয় এবং তারা কোন পবিত্র নামের হকদারও নয়। এ লোকগুলো নিজেরাও ঐ দেবতাদের উপাসনা করার উপর কোন দলীল পেশ করতে সক্ষম হবে না। তারা তাদের পূর্বপুরুষদের উপর ভাল ধারণা পোষণ করে তারা যা করতো তাই করছে মাত্র। তারা মাছির উপর মাছি মেরে চলছে। অথচ তাদের নিকট তাদের প্রতিপালকের পথ-নির্দেশ এসে গেছে। এতদসত্ত্বেও তারা তাদের পূর্বপুরুষদের ভ্রান্ত পথ পরিত্যাগ করছে না। এটা চরম পরিতাপের বিষয়ই বটে।
মহিমান্বিত আল্লাহ এরপর বলেনঃ মানুষ যা চায় তাই কি সে পায়? সে যে বলে যে, সে সত্যের উপর রয়েছে, তবে সে কি বাস্তবিকই সত্যের উপর রয়েছে। বলে প্রমাণিত হবে? তারা যতই লম্বা চওড়া দাবী করুক না কেন, তাদের দাবী দ্বারাই তাদের উদ্দেশ্য সফল হয়ে যায় না।
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমাদের কেউ কোন কিছুর আকাঙ্ক্ষা করে তখন সে কিসের আকাঙ্ক্ষা করছে তা যেন চিন্তা করে। কারণ সে জানে না যে, তার ঐ আকাক্ষার জন্যে তার জন্যে কি লিখা হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
মহান আল্লাহ বলেনঃ বস্তুতঃ ইহকাল ও পরকাল আল্লাহরই।' দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত ব্যবস্থাপনা তিনিই করে থাকেন। তিনি যা চান তা হয় এবং যা চান না তা হয় না।
এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আকাশে কত ফেরেশতা রয়েছে। তাদের কোন সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না যতক্ষণ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা এবং যার প্রতি সন্তুষ্ট তাকে অনুমতি না দেন। অর্থাৎ আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোন বড় ও মর্যাদা সম্পন্ন ফেরেশতাও কারো জন্যে সুপারিশের কোন শব্দও উচ্চারণ করতে পারেন। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী)
অর্থাৎ “কে সে, যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর নিকট সুপারিশ করবে?” (২:২৫৫) আর এক জায়গায় বলেনঃ অর্থাৎ “তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে কারো জন্যে কারো সুপারিশ উপকারী হবে না।” (৩৪:২৩) সুতরাং বড় বড় নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতাদের যখন এই অবস্থা, তখন হে নির্বোধের দল! তোমাদের পূজনীয় এই মূর্তি ও থানগুলো তোমাদে কি উপকার করতে পারে? তাদের উপাসনা করতে আল্লাহ্ তা'আলা নিষেধ করেছেন। এটা করেছেন তিনি তাঁর সমস্ত রাসূলের ভাষায় এবং তাঁর সমুদয় সমানী কিতাব অবতীর্ণ করার মাধ্যমে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।