সূরা আন-নিসা (আয়াত: 2)
হরকত ছাড়া:
وآتوا اليتامى أموالهم ولا تتبدلوا الخبيث بالطيب ولا تأكلوا أموالهم إلى أموالكم إنه كان حوبا كبيرا ﴿٢﴾
হরকত সহ:
وَ اٰتُوا الْیَتٰمٰۤی اَمْوَالَهُمْ وَ لَا تَتَبَدَّلُوا الْخَبِیْثَ بِالطَّیِّبِ ۪ وَ لَا تَاْکُلُوْۤا اَمْوَالَهُمْ اِلٰۤی اَمْوَالِکُمْ ؕ اِنَّهٗ کَانَ حُوْبًا کَبِیْرًا ﴿۲﴾
উচ্চারণ: ওয়া আ-তুল ইয়াতা-মাআমওয়া-লাহুম ওয়ালা-তাতাবাদ্দালুল খাবীছা বিত্তাইয়িবি ওয়ালা-তা’কুলূআমওয়া-লাহুম ইলাআমওয়া-লিকুম ইন্নাহূকা-না হুবান কাবীরা-।
আল বায়ান: আর তোমরা ইয়াতীমদেরকে তাদের ধন-সম্পদ দিয়ে দাও এবং তোমরা অপবিত্র বস্ত্তকে পবিত্র বস্ত্ত দ্বারা পরিবর্তন করো না এবং তাদের ধন-সম্পদকে তোমাদের ধন-সম্পদের সাথে খেয়ো না। নিশ্চয় তা বড় পাপ।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২. আর ইয়াতীমদেরকে তোমরা তাদের ধন-সম্পদ সমর্পণ করো(১) এবং ভালোর সাথে মন্দ বদল করো না(২) আর তোমাদের সম্পদের সাথে তাদের সম্পদ মিশিয়ে গ্রাস করো না; নিশ্চয় এটা মহাপাপ(৩)।
তাইসীরুল ক্বুরআন: এবং ইয়াতীমদেরকে তাদের ধন-সম্পদ প্রদান কর এবং ভালোর সাথে মন্দের বদল করো না এবং তাদের মাল নিজেদের মালের সঙ্গে মিশিয়ে গ্রাস করো না, নিশ্চয় এটা মহাপাপ।
আহসানুল বায়ান: (২) আর পিতৃহীনদেরকে তাদের ধন-সম্পদ সমর্পণ কর এবং উৎকৃষ্টের সাথে নিকৃষ্ট বদল করো না, এবং তোমাদের সম্পদের সাথে তাদের সম্পদকে মিশ্রিত করে গ্রাস করো না; নিশ্চয় তা মহাপাপ।[1]
মুজিবুর রহমান: আর ইয়াতীমদেরকে তাদের ধন সম্পত্তি বুঝিয়ে দাও এবং পবিত্রতার সাথে অপবিত্রতার বিনিময় করনা ও তোমাদের ধন সম্পত্তির সাথে তাদের ধন সম্পত্তি মিশ্রিত করে ভোগ করনা; নিশ্চয়ই এটা গুরুতর অপরাধ।
ফযলুর রহমান: এতিমদেরকে তাদের সম্পদ দিয়ে দাও; (তোমাদের) খারাপ জিনিসকে (তাদের) ভাল জিনিস দ্বারা বদল করো না এবং তোমাদের সম্পদের সাথে মিশিয়ে তাদের সম্পদ ভক্ষণ করো না; এটা অবশ্যই একটা বড় পাপ।
মুহিউদ্দিন খান: এতীমদেরকে তাদের সম্পদ বুঝিয়ে দাও। খারাপ মালামালের সাথে ভালো মালামালের অদল-বদল করো না। আর তাদের ধন-সম্পদ নিজেদের ধন-সম্পদের সাথে সংমিশ্রিত করে তা গ্রাস করো না। নিশ্চয় এটা বড়ই মন্দ কাজ।
জহুরুল হক: আর তাদের ধন-সম্পত্তি এতীমদের দিয়ে দাও, আর উৎকৃষ্ট বস্তুর সঙ্গে নিকৃষ্ট বস্তু বদলে নিও না। আর তাদের সম্পত্তি তোমাদের সম্পত্তির সঙ্গে গ্রাস করো না। নিঃসন্দেহ এটি গুরুতর অপরাধ।
Sahih International: And give to the orphans their properties and do not substitute the defective [of your own] for the good [of theirs]. And do not consume their properties into your own. Indeed, that is ever a great sin.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২. আর ইয়াতীমদেরকে তোমরা তাদের ধন-সম্পদ সমর্পণ করো(১) এবং ভালোর সাথে মন্দ বদল করো না(২) আর তোমাদের সম্পদের সাথে তাদের সম্পদ মিশিয়ে গ্রাস করো না; নিশ্চয় এটা মহাপাপ(৩)।
তাফসীর:
(১) আয়াতে বলা হয়েছে, ইয়াতীমের সম্পদ তাদেরকে যথার্থভাবে বুঝিয়ে দাও। আরবী ‘ইয়াতীম’ শব্দটির অর্থ হচ্ছে- নিঃসঙ্গ। একটি ঝিনুকের মধ্যে যদি একটিমাত্র মুক্তা জন্ম নেয়, তখন একে ‘দুররাতুন-ইয়াতীমাতুন’ বা ‘নিঃসঙ্গ মুক্তা’ বলা হয়ে থাকে। ইসলামী পরিভাষায় যে শিশু-সন্তানের পিতা ইন্তেকাল করে, তাকে ইয়াতীম বলা হয়। ছেলে-মেয়ে বালেগ হয়ে গেলে তাদেরকে ইসলামী পরিভাষায় ইয়াতীম বলা হয় না। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বালেগ হওয়ার পর আর কেউ ইয়াতীম থাকে না। [আবু দাউদঃ ২৮৭৩]
ইয়াতীম যদি পারিতোষিক অথবা উপঢৌকন হিসেবে কিছু সম্পদপ্রাপ্ত হয়, তাহলে ইয়াতীমের অভিভাবকের দায়িত্ব হচ্ছে সেসব মালেরও হেফাজত করা। ইয়াতীমের মৃত পিতা অথবা দেশের সরকার যে-ই উক্ত অভিভাবককে মনোনীত করুক না কেন; তার উপরই ইয়াতীমের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বর্তায়। উক্ত অভিভাবকের উচিত, ইয়াতীমের যাবতীয় প্রয়োজন তার গচ্ছিত ধন-সম্পদ থেকে নির্বাহ করা। এ আয়াতে ইয়াতিমের সম্পদ তার হাতে বুঝিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কোন শর্তারোপ করা হয়নি। পক্ষান্তরে পরবর্তী ৬ নং আয়াতে এ সম্পদ তাদের কাছে প্রত্যার্পণ করার জন্য দুটি শর্ত দিয়েছে। এক, ইয়াতীম বালেগ হতে হবে, দুই ভাল-মন্দ বিবেচনা করার ক্ষমতা থাকতে হবে। কারণ, বালেগ হওয়ার পূর্বে তার জ্ঞান ও বুদ্ধি-বিবেচনা সম্পত্তি সংরক্ষণের মত না হওয়াই স্বাভাবিক। দুটো বিষয় তাদের মধ্যে পাওয়া গেলে তাদের সম্পদ তাদের কাছে ফেরৎ দেয়া উচিত। [আদওয়াউল বায়ান]
(২) মুজাহিদ বলেন, এর অর্থ তোমরা হালালকে হারামের সাথে মিশিয়ে ফেলো না। [তাবারী]
(৩) এ আয়াতে ইয়াতিমের সম্পদ গ্রাস করাকে বড় গুনাহ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু গোনাহের পরিণাম সম্পর্কে এখানে কিছু বলা হয়নি। এ সূরারই ১০ নং আয়াতে আল্লাহ তা'আলা সেটা ঘোষণা করে বলেছেন, “যারা ইয়াতীমদের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে তারা তো তাদের পেটে আগুনই খাচ্ছে, তারা অচিরেই জ্বলন্ত আগুনে জ্বলবে।” [আদওয়াউল বায়ান]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২) আর পিতৃহীনদেরকে তাদের ধন-সম্পদ সমর্পণ কর এবং উৎকৃষ্টের সাথে নিকৃষ্ট বদল করো না, এবং তোমাদের সম্পদের সাথে তাদের সম্পদকে মিশ্রিত করে গ্রাস করো না; নিশ্চয় তা মহাপাপ।[1]
তাফসীর:
[1] পিতৃহীন, অনাথ বা ইয়াতীম যখন সাবালক হয়ে যাবে এবং ভাল-মন্দ বুঝতে শিখবে, তখন তাকে তার ধন-সম্পদ বুঝিয়ে (ফিরিয়ে) দাও। ‘খাবীস’ বলতে নিকৃষ্ট জিনিস এবং ‘ত্বাইয়্যিব’ বলতে উৎকৃষ্ট জিনিসকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, এমন করো না যে, তাদের মাল থেকে উৎকৃষ্ট জিনিসগুলো নিয়ে তার পরিবর্তে নিকৃষ্ট জিনিস দিয়ে গুনতি পূরণ করে দেবে। এই নিকৃষ্ট জিনিসগুলোকে খাবীস (নাপাক) এবং উৎকৃষ্ট জিনিসগুলোকে ত্বাইয়্যিব (পবিত্র) আখ্যা দিয়ে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, এইভাবে পরিবর্তন করা মাল যদিও প্রকৃতপক্ষে ত্বাইয়্যিব (পবিত্র ও হালাল), তবুও তোমাদের বিশ্বাসঘাতকতা তাকে অপবিত্র করে দিয়েছে। কাজেই এখন তা আর পবিত্র নেই, বরং তোমাদের জন্য তা অপবিত্র ও হারাম হয়ে গেছে। অনুরূপ বেঈমানী করে তাদের মালকে নিজের মালের সাথে মিশ্রিত করে খাওয়াও নিষেধ। তবে যদি তাদের কল্যাণ উদ্দেশ্য হয়, তাহলে তাদের মালকে নিজের মালের সাথে মিশ্রিত করা জায়েয।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২ হতে ৪ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা‘আলা ইয়াতীমদের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, যখন পিতৃহীন ইয়াতীম সাবালক হয়ে যাবে এবং তারা ভাল-মন্দ বুঝতে শিখবে তখন তাদের সম্পদ তাদেরকে বুঝিয়ে দাও। যেমন অত্র সূরার ৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে।
الخبيث বা খারাপ বলতে অন্যায়ভাবে ইয়াতীমদের সম্পদ খাওয়া বুঝানো হয়েছে।
الطيب বা ভাল বলতে- নিজেদের হালাল সম্পদকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ ইয়াতীমদের সম্পদ অন্যায়ভাবে এনে তোমাদের হালাল সম্পদের সাথে মিশ্রণ করে সব সম্পদ হারাম বানিয়ে খেও না। এরূপ করা মহাপাপ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(اِنَّ الَّذِیْنَ یَاْکُلُوْنَ اَمْوَالَ الْیَتٰمٰی ظُلْمًا اِنَّمَا یَاْکُلُوْنَ فِیْ بُطُوْنِھِمْ نَارًاﺚ وَسَیَصْلَوْنَ سَعِیْرًا)
“নিশ্চয়ই যারা অন্যায়ভাবে ইয়াতীমদের সম্পদ খায়, তারা তাদের পেটে কেবল আগুনই ভক্ষণ করে। আর অচিরেই তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে।”(সূরা নিসা ৪:১০)
(وَاِنْ خِفْتُمْ اَلَّا تُقْسِطُوْا فِی الْیَتٰمٰی)
‘আর যদি তোমরা ভয় কর যে ইয়াতীমদের (মেয়েদের) প্রতি সুবিচার করতে পারবে না’ এর শানে নুযূল: আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, এক ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে একজন ইয়াতীম মেয়ে ছিল। সে মেয়েটির একটি বাগান ছিল। ঐ ব্যক্তি সে মেয়েকে বিবাহ করে কিন্তু কোন মাহর নির্ধারণ করেনি, কারণ মেয়ের প্রতি তার কোন আগ্রহ ছিল না। (শুধু সম্পদের লোভে বিবাহ করেছে) তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (সহীহ বুখারী হা: ৪৫৭৩)
উরওয়াহ ইবনু যুবাইর (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি আয়িশাহ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, মহান আল্লাহর বাণী-
(وَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تُقْسِطُوْا فِي الْيَتٰمٰي.... )
সম্পর্কে। তিনি উত্তরে বললেন, হে ভাগ্নে! সে হচ্ছে পিতৃহীনা বালিকা, অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে থাকে, তার সম্পত্তিতে অংশীদার হয় এবং তার রূপ ও সম্পদ তাকে (অভিভাবককে) আকৃষ্ট করে। এরপর সেই অভিভাবক উপযুক্ত মাহর না দিয়ে তাকে বিবাহ করতে চায়। তদুপরি অন্য ব্যক্তি যে পরিমাণ মাহর দেয়, তা না দিয়ে এবং তার প্রতি ন্যায়বিচার না করে তাকে বিয়ে করতে চায়। এরপর তাদের পারিবারিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ মাহর এবং ন্যায় ও সমুচিত মাহর প্রদান ব্যতীত তাদের বিয়ে করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং তদ্ব্যতীত যে সকল মহিলা পছন্দ হয় তাদেরকে বিয়ে করতে অনুমতি দেয়া হয়েছে। উরওয়াহ বলেন যে, আয়িশাহ (রাঃ)- বলেছেন, এ আয়াত নাযিল হবার পর লোকেরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে মহিলাদের ব্যাপারে জানতে চাইলে আল্লাহ তা‘আলা নাযিল করেন:
(وَيَسْتَفْتُوْنَكَ فِي النِّسَا۬ءِ.... )-
“এবং লোকেরা আপনাকে নাবীদের বিষয়ে জিজ্ঞেস করে...”। আল্লাহ তা‘আলার বাণী- ‘তোমরা তাদেরকে বিয়ে করতে আগ্রহ প্রকাশ কর। অথচ ইয়াতীম বালিকার ধন-সম্পদ কম হলে এবং সুন্দরী না হলে তাকে বিবাহ করতে আগ্রহ প্রকাশ কর না।’ আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, তাই ইয়াতীম বালিকার মাল ও সৌন্দর্যের আকর্ষণে বিবাহ করতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে ন্যায়বিচার করলে ভিন্ন কথা। কেননা তারা সম্পদের অধিকারী না হলে এবং সুন্দরী না হলে তাদের কেউ বিবাহ করতে আগ্রহ প্রকাশ করে না। (সহীহ বুখারী হা: ৪৫৭৪, সহীহ মুসলিম হা: ৩০১৮)
তাই ইয়াতীম মেয়েদের প্রতি কেউ সুবিচার করতে সক্ষম না হলে অন্যত্র পছন্দমত একত্রে সর্বোচ্চ চার নারী বিবাহ করতে পারবে।
সালেম (রহঃ) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, গায়লান বিন সালামাহ নামে এক ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে। তার দশজন স্ত্রী ছিল। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বলেন, তুমি এদের থেকে চারজন চয়ন করে নাও”। (অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে, বলা হয়েছে অন্যদের পৃথক করে দাও) তিনি উমার (রাঃ)-এর যুগে বাকি ছয়জনকে তালাক দিয়ে দেন। (মুসনাদ আহমাদ: ২/১৪, সনদ সহীহ)
একাধিক বিবাহের শর্ত হল সুবিচার করতে হবে আর যদি সুবিচার করতে সক্ষম না হয় তাহলে একজনকে বিবাহ করবে অথবা কোন ক্রীতদাস বিবাহ করবে। তবে সুবিচার করা খুবই কষ্টকর। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلَنْ تَسْتَطِيْعُوْآ أَنْ تَعْدِلُوْا بَيْنَ النِّسَا۬ءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ فَلَا تَمِيْلُوْا كُلَّ الْمَيْلِ فَتَذَرُوْهَا كَالْمُعَلَّقَةِ)
“আর তোমরা যতই ইচ্ছা কর না কেন তোমাদের স্ত্রীদের মাঝে সুবিচার করতে পারবে না; যদিও তোমরা প্রবল ইচ্ছা কর; অতএব তোমরা কোন একজনের দিকে সম্পূর্ণভাবে ঝুঁকে পড় না ও অপরকে ঝুলানো অবস্থায় রেখ না।”(সূরা নিসা ৪:১২৯)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, যে ব্যক্তির দু’জন স্ত্রী আছে, কিন্তু সে তন্মধ্যে একজনের দিকে ঝুঁকে যায়, এরূপ ব্যক্তি কিয়ামাতের দিন তার অর্ধদেহ ধসাবস্থায় উপস্থিত হবে। (আহমাদ: ২/৩৪৭, হাকিম: ২/১৮৬)
ইসলাম শর্তসাপেক্ষে একজন পুরুষকে সর্বোচ্চ চারজন নারীকে বিবাহ করার সুযোগ দেয়ায় নারীদের প্রতি অসম্মান করেনি, বরং তাদের যথাযথ ব্যবস্থা ও সম্মান অক্ষুন্ন রাখতেই এমন ব্যবস্থাপনা। কারণ এমনও সময় আসতে পারে যখন পুরুষের চেয়ে নারীদের সংখ্যার অনুপাত অনেক বেশি হবে। যা ইতোমধ্যে বর্তমান পৃথিবীতে অনুপাতের তারতম্য লক্ষ করা যাচ্ছে। সে সময় একজন নারী স্বামীর পরিচয় দিতে পেয়ে নিজেকে সৌভাগ্যশীল মনে করবে, এটা লক্ষ করবে না তার স্বামীর কতজন স্ত্রী আছে।
সুতরাং বহু বিবাহ ইসলামী শরীয়তের অন্যতম একটি বিধান। এ সকল শরয়ী বিধান যা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিয়ে এসেছেন তা কেউ ঘৃণা করলে সে কাফির হয়ে যাবে। এ জন্য মহিলাদের উচিত, একজন স্বামীর একাধিক স্ত্রী থাকাটা যেন তারা অপছন্দ না করে। কারণ এটা আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলের বিধান। তবে স্বভাবগতভাবে এ বিষয়টাকে অপছন্দ করা, ভাল না বাসার অর্থ শরয়ী বিধানকে অপছন্দ করা নয়। এরূপ অপছন্দের কারণে ঈমানের কোন ক্ষতি হবে না। অথবা কতক পুরুষ যারা স্ত্রীদের মাঝে সমতা বজায় রাখতে পারে না এজন্য একাধিক বিবাহকে অপছন্দ করা দোষণীয় নয়। কিন্তু একাধিক বিবাহ করার শরয়ী বিধানকে অপছন্দ করলে মুরতাদ হয়ে যাবে। কারণ সে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কর্তৃক আনীত বিধানকে অপছন্দ করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(ذٰلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوْا مَآ أَنْزَلَ اللّٰهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ)
“কারণ, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা তারা অপছন্দ করছে; তাই আল্লাহ তাদের আমল বরবাদ করে দিয়েছেন।”(সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:৯)
তারপর আল্লাহ তা‘আলা স্ত্রীদের মাহর সন্তুষ্ট মনে আদায় করে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। স্ত্রী যদি খুশি হয়ে কিছু ছেড়ে দেয় তাহলে কোন সমস্যা নেই। এ আয়াত প্রমাণ করছে স্ত্রীকে মাহর প্রদান করা ওয়াজিব। এ বিষয়ে সকল আলেম একমত। (আল ইসতিযকার, ইবনু আব্দুল বার ১৬/৬৮)
মাহরের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন কোন পরিমাণ নেই (সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ ৩/১৬২)। যার যেমন সামর্থ্য সে সেই পরিমাণ দেবে, এতে কোন বাধ্যবাধকতা নেই। তবে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি তা আদায় করে দেয়া উত্তম। মৃত্যুর সময় ক্ষমা চেয়ে নেয়া উচিত নয়।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. প্রত্যেক হারাম সম্পদ ও বস্তু অপবিত্র। আর প্রত্যেক হালাল সম্পদ ও বস্তু পবিত্র।
২. ইয়াতীমদের সম্পদ অন্যায়ভাবে খাওয়া হারাম।
৩. একত্রে একজন পুরুষ চারজন মহিলাকে বিবাহ করতে পারে তবে শর্ত হলো সকলের মাঝে সমতা বহাল রাখার যোগ্য হতে হবে।
৪. মাহর স্ত্রীর হক, তাই তাকে প্রদান করা আবশ্যক।
৫. ইসলামের কোন বিধানকে অপছন্দ করা কুফরী কাজ, বরং আনুগত্যের সাথে সকল বিধানকে মেনে নিতে হবে।
৬. ইসলাম নারীর অর্থনৈতিক অধিকার দিয়েছে, তাদের অর্থে স্বামীরও হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২-৪ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা'আলা পিতৃহীনদের অভিভাবকগণকে নির্দেশ দিচ্ছেন-পিতৃহীনেরা যখন প্রাপ্ত বয়সে পৌছে ও বিবেকসম্পন্ন হয় তখন তাদেরকে তাদের মাল পুরোপুরি প্রদান করবে। কিছুমাত্র কম করবে না বা আত্মসাৎও করবে না। তাদের মালকে তোমাদের মালের সঙ্গে মিশ্রিত করে ভক্ষণ করার বাসনা অন্তরে পোষণ করো না। হালাল মাল যখন আল্লাহ পাক তোমাদেরকে প্রদান করেছেন-তখন হারামের দিকে যাবে কেন? তোমাদের ভাগ্যে যে অংশ লিপিবদ্ধ তা তোমরা অবশ্যই প্রাপ্ত হবে। তোমাদের হালাল মাল ছেড়ে দিয়ে অপরের মাল যা তোমাদের জন্যে হারাম তা কখনও গ্রহণ করো না। নিজেদের দুর্বল ও পাতলা পশুগুলো দিয়ে অপরের মোটাতাজাগুলো হস্তগত করো না। মন্দ দিয়ে ভাল নেয়ার চেষ্টা করো না। পূর্বে লোকেরা এরূপ করতো যে, তারা পিতৃহীনদের ছাগলের পাল হতে বেছে বেছে ভালগুলো নিয়ে নিজেদের দুর্বল ছাগলগুলো দিতো এবং এভাবে গণনা ঠিক রাখতো। মন্দ দিরহামগুলো তাদের মালে রেখে দিয়ে তাদের ভালগুলো নিয়ে নিতো। অতঃপর মনে করতো যে তারা ঠিকই করেছে। কেননা, ছাগলের পরিবর্তে ছাগল দিয়েছে এবং দিরহামের পরিবর্তে দিরহাম দিয়েছে। তারা পিতৃহীনদের সম্পদকে নিজেদের সম্পদের মধ্যে মিশ্রিত করে দিয়ে এ কৌশল করতো যে, এখন আর স্বাতন্ত্র কি আছে? তাই আল্লাহ পাক বলেন-“তাদের সম্পদ নষ্ট করো না, কেননা, এটা বড় পাপ। একটি দুর্বল হাদীসেও আয়াতটির শেষ বাক্যের এ অর্থই বর্ণিত আছে।
সুনান-ই-আবু দাউদের একটি দু'আতেও (আরবী) শব্দটি পাপের অর্থে এসেছে। হযরত আবু আইয়ুব (রাঃ) স্বীয় পত্মীকে তালাক দেয়ার ইচ্ছে করলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ ‘এক তালাক প্রদানে পাপ হবে। সুতরাং তিনি স্বীয় সংকল্প হতে বিরত থাকেন। অন্য বর্ণনায় এ ঘটনাটি হযরত আবূ তালহা (রাঃ) এবং হযরত উম্মে সুলায়েম (রাঃ)-এর ঘটনা বলে বর্ণিত আছে।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-‘কোন পিতৃহীনা বালিকার লালন পালনের দায়িত্ব যদি তোমাদের উপর ন্যস্ত থাকে এবং তোমরা তাকে বিয়ে করার ইচ্ছে কর, কিন্তু যেহেতু তার অন্য কেউ নেই, কাজেই তোমরা এরূপ করো না যে, তাকে মোহর কম দিয়ে স্ত্রীরূপে ব্যবহার করবে, বরং আরও বহু স্ত্রীলোক রয়েছে তাদের মধ্যে তোমাদের পছন্দমত দুটি, তিনটি এবং চারটিকে বিয়ে কর।
হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ ‘একটি পিতৃহীনা বালিকা ছিল। তার মাল-ধনও ছিল এবং বাগানও ছিল। যে লোকটি তাকে লালন পালন করছিল সে। শুধুমাত্র তার মাল-ধনের লালসায় পূর্ণ মোহর ইত্যাদি নির্ধারণ না করেই তাকে বিয়ে করে নেয়। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। আমার ধারণা এই যে, ঐ বাগানে ও মালে এ বালিকাটির অংশ ছিল।'
সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, হযরত ইবনে শিহাব (রঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে এ আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “হে ভাগ্নে! এটা পিতৃহীনা বালিকার বর্ণনা, যে তার অভিভাবকের অধিকারে রয়েছে এবং তার মালে তার অংশ রয়েছে। আর সে বালিকার মাল ও সৌন্দর্য তার চোখে লেগেছে। সুতরাং সে তাকে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু অন্য জায়গায় বালিকাটি যতটা মোহর ইত্যাদি পেতো ততটা সে দেয় না। সুতরাং সে অভিভাবককে নিষেধ করা হয়েছে যে, সে যেন সে বাসনা পরিত্যাগ করে এবং অন্যান্য স্ত্রীলোকদেরকে পছন্দমত বিয়ে করে নেয়।
অতঃপর জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ঐ ব্যাপারেই প্রশ্ন করে এবং (আরবী) (৪:১৬৭) আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তথায় বলা হয়-যখন পৃতিহীনা মেয়ের মাল ও সৌন্দর্য কম থাকে তখন তো অভিভাবক তার প্রতি কোন আগ্রহ প্রকাশ করে না, সুতরাং এর কোন কারণ নেই যে, তার মাল ও সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তার পূর্ণ হক আদায় না করেই তাকে বিয়ে করে নেবে। হ্যাঁ, তবে ন্যায়ের সাথে যদি পূর্ণ মোহর ইত্যাদি নির্ধারণ করতঃ বিয়ে করে তবে কোন দোষ নেই। নচেৎ স্ত্রীলোকের কোন অভাব নেই। তাদের মধ্যে হতে যেন পছন্দ মত সে বিয়ে করে। ইচ্ছে করলে দু’টি, তিনটি এবং চারটি পর্যন্ত করতে পারে। অন্য জায়গাতেও এ শব্দগুলো এ অর্থেই এসেছে। ইরশাদ হচ্ছে-(আরবী) অর্থাৎ যে ফেরেশতাদেরকে আল্লাহ তা'আলা দূতরূপে প্রেরণ করে থাকেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ রয়েছেন দুটি ডানা বিশিষ্ট, কেউ রয়েছেন তিনটি ডানা বিশিষ্ট এবং কেউ রয়েছেন চারটি ডানা বিশিষ্ট।'(৩৫:১) ফেরেশতাদের মধ্যে এর চেয়ে বেশী ডানা বিশিষ্ট ফেরেশতাও রয়েছেন। কেননা এটা দলীল দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু পুরুষের জন্যে এক সাথে চারটের বেশী স্ত্রী রাখা নিষিদ্ধ, যেমন এ আয়াতেই বিদ্যমান রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং জমহুরের এটাই উক্তি। এখানে আল্লাহ পাক স্বীয় অনুগ্রহ ও দানের বর্ণনা দিচ্ছেন। সুতরাং চারটের বেশীর উপর সমর্থন থাকলেও অবশ্যই তা বলতেন।
ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেনঃ কুরআন কারীমের ব্যাখ্যাকারী হাদীস শরীফ স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ছাড়া আর কারও জন্যে একই সাথে চারটের বেশী স্ত্রী একত্রিত করা বৈধ নয়।' এর উপরই উলামা-ই-কিরামের ইজমা হয়েছে। তবে কোন কোন শিআ’র মতে তা নয়টি পর্যন্ত একত্রিত করা বৈধ। বরং কোন কোন শিআ’র মতে তা নয়টির বেশী একত্রিত করলেও কোন দোষ নেই। তাদের মতে কোন সংখ্যাই নির্ধারিত নেই। তাদের দলীল হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাজ। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে, তার নয়জন পত্নী ছিলেন। সহীহ বুখারী শরীফের মুআল্লাক হাদীসের কোন কোন বর্ণনাকারী এগার জন বলেছেন।
হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) পনেরজন স্ত্রীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তেরজনের সাথে তাঁর সহবাস হয়েছিল। একই সময়ে এগারজন পত্নী তার নিকট বিদ্যমান ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) নয়জন পত্নী রেখে ইন্তেকাল করেন। আমাদের পক্ষ হতে এর উত্তর এই যে, এটা একমাত্র রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যেই বৈধ ছিল। তাঁর উম্মতের জন্যে একই সাথে চারটের বেশী স্ত্রী রাখার অনুমতি নেই।
এর প্রমাণ রূপে নিম্নের হাদীসগুলো পেশ করা যেতে পারেঃ (১) হযরত গায়লান ইবনে সালমা সাকাফী (রাঃ) যখন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন তখন তার দশজন স্ত্রী বিদ্যমান ছিল। রাসূলুল্লাহ(সঃ) তাঁকে বলেনঃ “তোমার ইচ্ছেমত চারটি স্ত্রী রেখে বাকীগুলো পরিত্যাগ কর। তিনি তাই করেন। অতঃপর হযরত উমার (রাঃ)-এর খিলাফতের যুগে তিনি তাঁর ঐ স্ত্রীগুলোকেও তালাক দিয়ে দেন এবং স্বীয় ধন-সম্পদ স্বীয় ছেলেদের মধ্যে বন্টন করে দেন। হযরত উমার (রাঃ) এ সংবাদ পেয়ে তাকে বলেনঃ ‘সম্ভবতঃ তোমার শয়তান কথা চুরি করেছে এবং তোমার মনে এ ধারণা জন্মিয়ে দিয়েছে যে, তুমি সত্বরই মৃত্যুমুখে পতিত হবে। এজন্যেই তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়েছো যেন তারা তোমার সম্পত্তির অংশ না পায়। আর এ কারণেই তুমি তোমার সম্পদ তোমার ছেলেদের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছ। আমি তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি যে, তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে রাজমাত কর (ফিরিয়ে নাও) এবং তোমার ছেলেদের নিকট হতে মাল ফিরিয়ে নাও। যদি তুমি এ কাজ না কর তবে তোমার মৃত্যুর পর আমি তোমার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীদেরকেও তোমার উত্তরাধিকারিণী বানিয়ে দেবো। কেননা, তুমি তাদেরকে এ ভয়েই তালাক দিয়েছে। আর মনে হচ্ছে যে, তোমার মৃত্যুর সময় নিকটবর্তী হয়েছে। যদি তুমি আমার কথা অমান্য কর তবে জেনে রেখো যে, আমি তোমার কবরে প্রস্তর নিক্ষেপ করার জন্যে জনগণকে নির্দেশ প্রদান করবো, যেমন আবু রাগালের কবরে প্রস্তর নিক্ষেপ করা হয়।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ, শাফিঈ, জামেউত তিরিমিযী, সুনান-ই-ইবনে মাজা, দারেকুতনী ইত্যাদি) মারফু হাদীস পর্যন্ত তো এসব কিতাবেই রয়েছে।
তবে হযরত উমার (রাঃ)-এর ঘটনাটি শুধুমাত্র মুসনাদ-ই-আহমাদেই রয়েছে। কিন্তু এ অতিরিক্তটুকু হাসান। তবে ইমাম বুখারী (রঃ) এটাকে দুর্বল বলেছেন এবং এর ইসনাদের দ্বিতীয় ধারা বর্ণনা করার পর ঐ ধারাকে অরক্ষিত বলেছেন। কিন্তু এ ত্রুটি প্রদর্শনের ব্যাপারটাও চিন্তার বিষয়। সম্মানিত হাদীস বিশারদগণও এর উপর সমালোচনা করেছেন। কিন্তু মুসনাদ-ই-আহমাদে বর্ণিত। হাদীসটির সমস্ত বর্ণনাকারীই সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের শর্তে নির্ভরযোগ্য। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, ঐ দশজন স্ত্রীও মুসলমান হয়েছিলেন। (সুনান-ই-নাসাঈ)
এ হাদীস দ্বারা পরিষ্কারভাবে প্রতীয়মান হলো যে, একই সময়ে যদি চারজনের বেশী স্ত্রী রাখা বৈধ হতো তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) গায়লান (রাঃ)-কে। দশজন স্ত্রীর মধ্যে যে কোন চারজনকে রেখে অবশিষ্ট ছয়জনকে তালাক দিতে বলতেন না, কেননা তারা সবাই ঈমান এনেছিলেন। এখানে এটাও স্মরণ রাখার কথা যে, গায়লান (রাঃ)-এর নিকট তো দশজন স্ত্রী বিদ্যমান ছিলেনই, তথাপি তিনি ছয়জনকে পৃথক করিয়ে দিলেন, তাহলে নতুনভাবে চারজনের বেশী স্ত্রী রাখা কিরূপে সম্ভব হতে পারে? (২) সুনান-ই-আবু দাউদ ও ইবনে মাজা ইত্যাদির মধ্যে হাদীস রয়েছে, হযরত উমাইয়া আসাদী (রাঃ) বলেনঃ “আমি যখন ইসলাম গ্রহণ করি তখন আমার আটটি স্ত্রী ছিল। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এটা বর্ণনা করি। তিনি বলেনঃ ‘তোমার ইচ্ছেমত ওদের মধ্যে চারজনকে রাখ।' এর সনদ হাসান এবং এর সাক্ষীও রয়েছে। বর্ণনাকারীদের নামের হেরফের ইত্যাদি এরূপ বর্ণনায় ক্ষতিকর হয় না। (৩) মুসনাদ-ইশাফিঈর মধ্যে রয়েছে, হযরত নাওফিল ইবনে মুআবিয়া (রাঃ) বলেনঃ “আমি যখন ইসলাম গ্রহণ করি তখন আমার ৫টা স্ত্রী ছিল। আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ওদের মধ্যে পছন্দমত চারটিকে রাখ এবং একটিকে পৃথক করে দাও। ওদের মধ্যে যে সবচেয়ে বয়স্কা ছিল এবং নিঃসন্তান ছিল তাকে আমি তালাক দিয়ে দেই। সুতরাং এ হাদীসগুলো হযরত গায়লানযুক্ত হাদীসের সাক্ষী, যেমন ইমাম বায়হাকী (রঃ) বলেছেন।
অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেন-“যদি একাধিক স্ত্রীর মধ্যে সমতা বজায় রাখতে না পারার ভয় থাকে তবে একটিকেই যথেষ্ট মনে কর বা দাসীদেরকে নিয়েই সন্তুষ্ট থাক। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ ‘তোমরা ইচ্ছে করলেও স্ত্রীর মধ্যে ন্যায় ও সমতা প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে না।'(৪:১২৯) এখানে এটাও স্মরণ রাখার বিষয় যে, দাসীদের মধ্যে পালা করা ইত্যাদি ওয়জিব নয়, তবে মুস্তাহাব বটে। যে করে সে ভালই করে এবং যে না করে তারও কোন দোষ নেই। এর পরবর্তী বাক্যের ভাবার্থ কেউ কেউ বলেছেন, এটা তোমাদের দারিদ্র বেশী না হওয়ার অতি নিকটবর্তী। যেমন অন্য স্থানে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যদি তোমরা দারিদ্রের ভয় কর। কোন আরব কবি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘দরিদ্র ব্যক্তি জানে না যে, সে কখন ধনী হবে এবং ধনী ব্যক্তিও জানে যে, সে কখন দরিদ্র হবে। যখন কোন ব্যক্তি দরিদ্র হয়ে পড়ে তখন আরবের লোকেরা বলে থাকে (আরবী) অর্থাৎ লোকটি দরিদ্র হয়ে পড়েছে। মোটকথা এ অর্থে এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এখানে এ তাফসীর খুব ভাল বলে মনে হচ্ছে না। কেননা, যদি আযাদ স্ত্রীলোকদের আধিক্য দারিদ্রের কারণ হতে পারে তবে দাসীদের আধ্যিকও দারিদ্রের কারণ হতে পারবে। সুতরাং জমহুরের উক্তি সত্যিই সঠিক যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “তোমরা অত্যাচার হতে বেঁচে যাও এটা তারই অতি নিকটবর্তী।' আরবে বলা হয়- (আরবী) অর্থাৎ সে হুকুমের ব্যাপারে অত্যাচার করেছে। আবু তালিবের নিম্নের বিখ্যাত কাসিদায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ এমন দাঁড়িপাল্লায় ওজন করছে যা এক যব পরিমাণও কম করে। তার নিকট স্বয়ং তার আত্মাই সাক্ষী রয়েছে যে অত্যাচারী নয়। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, যখনই কুফাবাসী হযরত উসমান (রাঃ)-কে প্রদত্ত এক চিঠিতে তাঁকে কিছু দোষারোপ করে তখন তার উত্তরে তিনি লিখেন, (আরবী) অর্থাৎ আমি অত্যাচারের দাড়ি-পাল্লা নই। সহীহ ইবনে হিব্বান প্রভৃতির মধ্যে একটি মারফু হাদীসে এ বাক্যের তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে-‘তোমরা অত্যাচার করো না।'
হযরত ইবনে আবি হাতিম বলেন যে, এর মারফু হওয়া ভুল কথা, তবে এটা হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর উক্তি বটে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা), হযরত আয়েশা (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা, (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত আবূ মালিক (রঃ), হযরত আবু যারীন (রঃ), হযরত নাখঈ (রঃ), হযরত শাবী (রঃ), যাহ্হাক (রঃ), হযরত আতা খুরাসানী (রঃ), হযরত কাতাদাহ (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ), হযরত মুকাতিল (রঃ) প্রভৃতি হতেও এ অর্থ বর্ণিত আছে। হযরত ইকরামাও (রাঃ) আবু তালিবের উক্ত কাসিদাটি পেশ করেছেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন এবং তিনি নিজেও এটাই পছন্দ করেন।
এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন-‘তোমরা নিজেদের স্ত্রীদেরকে খুশী মনে তাদের নির্ধারিত মোহর দিয়ে দাও যা দিতে তোমরা স্বীকৃত হয়েছে। তবে যদি স্ত্রী ইচ্ছে প্রণোদিত হয়ে তার সমস্ত মোহর বা কিছু অংশ মাফ করে দেয় তবে তা করার তার অধিকার রয়েছে এবং সে অবস্থায় স্বামীর পক্ষে তা ভোগ করা বৈধ। নবী (সঃ)-এর পরে কারও জন্যে মোহর ওয়াজিব করা ছাড়া বিয়ে করা জায়েয নয় এবং ফাকি দিয়ে শুধু নামমাত্র মোহর ধার্য করাও বৈধ নয়।'
মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত আলী (রাঃ)-এর উক্তি বর্ণিত আছে। তিনি বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে যখন কেউ রোগাক্রান্ত হয় তখন তার উচিত যে, সে যেন তার স্ত্রীর মালের তিন দিরহাম বা কিছু কম বেশী গ্রহণ করতঃ তা দিয়ে মধু ক্রয় করে এবং আকাশের বৃষ্টির পানি তার সাথে মিশ্রিত করে, তাহলে তিনটি মঙ্গল সে লাভ করবে। একটি হচ্ছে স্ত্রীর মাল যাকে আল্লাহ পাক তৃপ্তি সহকারে খেতে বলেছেন, দ্বিতীয় হচ্ছে মধুর শিকা এবং তৃতীয় হচ্ছে কল্যাণময় বৃষ্টির পানি। হযরত আবু সালিহ (রঃ) বলেন যে, মানুষ তাদের মেয়েদের মোহর নিজেরা গ্রহণ করতো। ফলে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং এ কাজ হতে বিরত রাখা হয়। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম ও তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) এ নির্দেশ শুনে জনগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাদের পরস্পরের মোহর কি?' তিনি বলেনঃ ‘যে জিনিসের উপরেই তাদের পরিবার সম্মত হয়ে যায়।' (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)
রাসূলুল্লাহ (সঃ)! স্বীয় ভাষণে তিনবার বলেনঃ “তোমরা বিধবাদের বিয়ে দিয়ে দাও।' তখন একটি লোক দাড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাদের পরস্পরের মোহর কি? তিনি বলেনঃ যার উপর তাদের পরিবারের লোক সম্মত হয়ে যাবে।' এ হাদীসের ইবনে সালমানী নামক একজন বর্ণনাকারী দুর্বল, তা ছাড়া এতে ইনকিতাও রয়েছে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।