সূরা আন-নিসা (আয়াত: 1)
হরকত ছাড়া:
ياأيها الناس اتقوا ربكم الذي خلقكم من نفس واحدة وخلق منها زوجها وبث منهما رجالا كثيرا ونساء واتقوا الله الذي تساءلون به والأرحام إن الله كان عليكم رقيبا ﴿١﴾
হরকত সহ:
یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ اتَّقُوْا رَبَّکُمُ الَّذِیْ خَلَقَکُمْ مِّنْ نَّفْسٍ وَّاحِدَۃٍ وَّ خَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَ بَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا کَثِیْرًا وَّ نِسَآءً ۚ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ الَّذِیْ تَسَآءَلُوْنَ بِهٖ وَ الْاَرْحَامَ ؕ اِنَّ اللّٰهَ کَانَ عَلَیْکُمْ رَقِیْبًا ﴿۱﴾
উচ্চারণ: ইয়াআইয়ুহান্না-ছুত্তাকূরাব্বাকুমুল্লাযীখালাকাকুম মিন নাফছিওঁ ওয়া-হিদাতিওঁ ওয়া খালাকা মিনহা-যাওজাহা-ওয়াবাছছা মিনহুমা-রিজা-লান কাছীরাওঁ ওয়ানিছাআওঁ ওয়াত্তাকুল্লাহাল্লাযী তাছাআলূনা বিহী ওয়াল আরহা-মা ইন্নাল্লা-হা কা-না ‘আলাইকুম রাকীবা।
আল বায়ান: হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক নফ্স থেকে। আর তা থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে এবং তাদের থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু পুরুষ ও নারী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার মাধ্যমে তোমরা একে অপরের কাছে চেয়ে থাক। আর ভয় কর রক্ত-সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষক।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১. হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবের তাকওয়া অবলম্বন কর(১) যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন ও তার থেকে তার স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন(২) এবং তাদের দুজন থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দেন; আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে নিজ নিজ হক দাবী কর(৩) এবং তাকওয়া অবলম্বন কর রক্ত-সম্পর্কিত আতীয়ের ব্যাপারেও(৪)। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষক।(৫)
তাইসীরুল ক্বুরআন: হে মনুষ্য সমাজ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে একটি মাত্র ব্যক্তি হতে পয়দা করেছেন এবং তা হতে তার জোড়া সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর সেই দু’জন হতে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা পরস্পর পরস্পরের নিকট (হাক্ব) চেয়ে থাক এবং সতর্ক থাক জ্ঞাতি-বন্ধন সম্পর্কে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন।
আহসানুল বায়ান: (১) হে মানবসম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে একটি প্রাণ হতে সৃষ্টি করেছেন[1] ও তা হতে তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যিনি তাদের দু’জন থেকে বহু নরনারী (পৃথিবীতে) বিস্তার করেছেন। সেই আল্লাহকে ভয় কর, যার নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচ্ঞা কর এবং জ্ঞাতি-বন্ধন ছিন্ন করাকে ভয় কর।[2] নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখেন।
মুজিবুর রহমান: হে মানবমন্ডলী! তোমরা তোমাদের রাব্বকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে একই ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন এবং তা হতে তদীয় সহধর্মিনী সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের উভয় হতে বহু নর ও নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং সেই আল্লাহকে ভয় কর যাঁর নামের দোহাই দিয়ে তোমরা একে অপরকে যাঞ্চা কর, এবং আত্মীয়-জ্ঞাতিদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর। নিশ্চয়ই আল্লাহই তত্ত্বাবধানকারী।
ফযলুর রহমান: হে মানুষ! তোমাদের প্রভুকে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি (আদম) থেকে সৃষ্টি করেছেন; তার থেকে তার সঙ্গিনীকেও সৃষ্টি করেছেন আর ঐ দুজন থেকেই অনেক নর-নারী (সৃষ্টি করে পৃথিবীতে) ছড়িয়ে দিয়েছেন। আল্লাহকে ভয় করো, যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে (যার যার পাওনা) চেয়ে থাক। রক্ত-সম্পর্কের ব্যাপারেও সাবধান থেকো। অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে পর্যবেক্ষণে রেখেছেন।
মুহিউদ্দিন খান: হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গীনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দু’জন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচঞ্ঝা করে থাক এবং আত্নীয় জ্ঞাতিদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন।
জহুরুল হক: ওহে মানবগোষ্ঠি! তোমাদের প্রভুকে ভয়ভক্তি করো যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন একই নফস থেকে, আর তার জোড়াও সৃষ্টি করেছেন তার থেকে, আর এই উভয় থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু নর ও নারী। অতএব ভয়শ্রদ্ধা করো আল্লাহ্কে যাঁর দ্বারা তোমরা পরস্পরের ও মাতৃজঠরের সওয়াল-জবাব করো। নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ তোমাদের উপরে সদা প্রহরী।
Sahih International: O mankind, fear your Lord, who created you from one soul and created from it its mate and dispersed from both of them many men and women. And fear Allah, through whom you ask one another, and the wombs. Indeed Allah is ever, over you, an Observer.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১. হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবের তাকওয়া অবলম্বন কর(১) যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন ও তার থেকে তার স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন(২) এবং তাদের দুজন থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দেন; আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে নিজ নিজ হক দাবী কর(৩) এবং তাকওয়া অবলম্বন কর রক্ত-সম্পর্কিত আতীয়ের ব্যাপারেও(৪)। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষক।(৫)
তাফসীর:
(১) সূরার শুরুতে পারস্পরিক সম্পর্ক এবং অন্যের অধিকার সংক্রান্ত বিধান জারি করা হয়েছে। যেমন- অনাথ ইয়াতীমের অধিকার, আত্মীয়-স্বজনের অধিকার ও স্ত্রীদের অধিকার প্রভৃতির কথা বলা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, হক্কুল-ইবাদ বা অন্যের অধিকারের সাথে সংশ্লিষ্ট এমন কতকগুলো অধিকার রয়েছে, যেগুলো সাধারণতঃ দেশের প্রচলিত আইনের আওতায় পড়ে এবং আইন প্রয়োগের মাধ্যমে তা কার্যকর করা যেতে পারে। সাধারণ ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্রয়-বিক্রয়, ভাড়া ও শ্রমের মজুরী প্রভৃতি এ জাতীয় অধিকার যা মূলতঃ দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে কার্যকর হয়ে থাকে। এসব অধিকার যদি কোন এক পক্ষ আদায় করতে ব্যর্থ হয় অথবা সেক্ষেত্রে কোন প্রকার ক্রটি-বিচ্যুতি হয়, তাহলে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে তার সুরাহা করা যেতে পারে। কিন্তু সন্তান-সন্ততি, পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, কারো নিজ বংশের ইয়াতীম ছেলে-মেয়ে এবং আত্মীয়-স্বজনের পারস্পরিক অধিকার আদায় হওয়া নির্ভর করে সহানুভূতি, সহমর্মিতা ও আন্তরিকতার উপর। এসব অধিকার তুলাদণ্ডে পরিমাপ করা যায় না। কোন চুক্তির মাধ্যমেও তা নির্ধারণ করা দুষ্কর। সুতরাং এসব অধিকার আদায়ের জন্য আল্লাহ-ভীতি এবং আখেরাতের ভয় ছাড়া দ্বিতীয় আর কোন উত্তম উপায় নেই। আর একেই বলা হয়েছে তাকওয়া।
বস্তুতঃ এই তাকওয়া দেশের প্রচলিত আইন ও প্রশাসনিক শক্তির চেয়ে অনেক বড়। তাই আলোচ্য সূরাটিও তাকওয়ার বিধান দিয়ে শুরু হয়েছে। সম্ভবতঃ এ কারণেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিয়ের খোতবায় এ আয়াতটি পাঠ করতেন। বিয়ের খোতবায় এ আয়াতটি পাঠ করা সুন্নাত। তাকওয়ার হুকুমের সাথে সাথে আল্লাহর অসংখ্য নামের মধ্যে এখানে ‘রব’ শব্দটি ব্যবহার করার মধ্যেও একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। অর্থাৎ এমন এক সত্তার বিরুদ্ধাচারণ করা কি করে সম্ভব হতে পারে, যিনি সমগ্র সৃষ্টিলোকের লালন-পালনের যিম্মাদার এবং যার রুবুবিয়্যাত বা পালন-নীতির দৃষ্টান্ত সৃষ্টির প্রতিটি স্তরে স্তরে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত।
(২) এখানে দুটি মত রয়েছে, (এক) তার থেকে অর্থাৎ তারই সমপর্যায়ের করে তার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন। (দুই) তার শরীর থেকেই তার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন। এ মতের সপক্ষে হাদীসের কিছু উক্তি পাওয়া যায়, যাতে বুঝা যায় যে, মহিলাদেরকে বাকা হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। [দেখুন- বুখারীঃ ৩৩৩১, মুসলিমঃ ১৪৬৮]
(৩) বলা হয়েছে যে, যার নাম উচ্চারণ করে তোমরা অন্যের থেকে অধিকার দাবী কর এবং যার নামে শপথ করে অন্যের কাছ থেকে নিজের উদ্দেশ্য হাসিল করে থাক সে মহান সত্ত্বার তাকওয়া অবলম্বন কর। আরও বলা হয়েছে যে, আত্মীয়তার সম্পর্কে - তা পিতার দিক থেকেই হোক, অথবা মায়ের দিক থেকেই হোক - তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাক এবং তা আদায়ের যথাযথ ব্যবস্থা অবলম্বন কর।
(৪) আলোচ্য আয়াতের দুটি অর্থ হতে পারে। একটি যা ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে, অর্থাৎ তোমরা আত্মীয়তার সম্পর্কের ব্যাপারে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর। সুতরাং তোমরা আতীয়তার সম্পর্ক ঠিক রাখ। এ অর্থটি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে। [তাবারী] আয়াতের দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে, তোমরা যে আল্লাহ ও আত্মীয়তার সম্পর্কের খাতিরে পরস্পর কোন কিছু চেয়ে থাক। অর্থাৎ তোমরা সাধারণত বলে থাক যে, আমি আল্লাহর ওয়াস্তে এবং আত্মীয়তার সম্পর্কের খাতিরে কোন কিছু তোমার কাছে চাই। সুতরাং দু কারণেই তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর। এ অর্থটি মুজাহিদ থেকে বর্ণিত হয়েছে। [আত-তাফসীরুস সহীহ] পবিত্র কুরআনের আত্মীয়তার সম্পর্ক বুঝানোর জন্য ‘আরহাম’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা মূলতঃ একটি বহুবচনবোধক শব্দ। এর একবচন হচ্ছে রাহেম। যার অর্থ জরায়ু বা গর্ভাশয়। অর্থাৎ জন্মের প্রাক্কালে মায়ের উদরে যে স্থানে সন্তান অবস্থান করে। জন্মসূত্রেই মূলতঃ মানুষ পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের বুনিয়াদকে ইসলামী পরিভাষায় ‘সেলায়ে-রাহমী’ বলা হয়। আর এতে কোন রকম বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হলে তাকে বলা হয় ‘কেত্বয়ে-রাহমী’। হাদীসে আত্মীয়তার সম্পর্কের উপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি তার রিযিকের প্রাচুর্য এবং দীর্ঘ জীবনের প্রত্যাশা করে, তার উচিত আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। [বুখারীঃ ২০৬৭; মুসলিমঃ ২৫৫৭]
অন্য হাদীসে আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের প্রায় সাথে সাথেই আমিও তার দরবারে গিয়ে হাজির হলাম। সর্বপ্রথম আমার কানে তার যে কথাটি প্রবেশ করল, তা হল এইঃ হে লোক সকল! তোমরা পরস্পর পরস্পরকে বেশী বেশী সালাম দাও। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য মানুষকে খাদ্য দান কর। আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোল এবং রাতের বেলায় সালাতে মনোনিবেশ কর, যখন সাধারণ লোকেরা নিদ্রামগ্ন থাকে। স্মরণ রেখো, এ কথাগুলো পালন করলে তোমরা পরম সুখ ও শান্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। [মুসনাদে আহমাদ: ৫৪৫১ ইবন মাজাহ ৩২৫১] অন্য হাদীসে এসেছে, উম্মুল-মুমিনীন মায়মুনা রাদিয়াল্লাহু আনহা তার এক বাদিকে মুক্ত করে দিলেন। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট যখন এ খবর পৌছালেন, তখন তিনি বললেন, তুমি যদি বাদিটি তোমার মামাকে দিয়ে দিতে, তাহলে অধিক পূণ্য লাভ করতে পারতে। [বুখারীঃ ২৫৯৪] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেনঃ কোন অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিকে সাহায্য করলে সদকার সওয়াব পাওয়া যায়। কিন্তু কোন নিকট আত্মীয়কে সাহায্য করলে একই সঙ্গে সদকা এবং আত্মীয়তার হক আদায়ের দ্বৈত পূণ্য লাভ করা যায় ৷ [বুখারীঃ ১৪৬৬, মুসলিমঃ ১০০০]
(৫) এখানে মানুষের অন্তরকে আত্মীয়-স্বজনের অধিকার আদায়ের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে আল্লাহ বলেন, আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে খুবই সচেতন ও পর্যবেক্ষণকারী। আল্লাহ তোমাদের অন্তরের ইচ্ছার কথাও ভালভাবে অবগত রয়েছেন। কিন্তু যদি লোক লজ্জার ভয়ে অথবা সমাজ ও পরিবেশের চাপে পড়ে আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সুব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহর কাছে এর কোন মূল্য নেই।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১) হে মানবসম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে একটি প্রাণ হতে সৃষ্টি করেছেন[1] ও তা হতে তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যিনি তাদের দু’জন থেকে বহু নরনারী (পৃথিবীতে) বিস্তার করেছেন। সেই আল্লাহকে ভয় কর, যার নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচ্ঞা কর এবং জ্ঞাতি-বন্ধন ছিন্ন করাকে ভয় কর।[2] নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখেন।
তাফসীর:
[1] ‘একটি প্রাণ’ বলতে মানবকুলের পিতা আদম (আঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। আর خَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا এতে مِنْهَا থেকে উক্ত প্রাণ অর্থাৎ, আদম (আঃ)-কেই বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, আদম (আঃ) থেকেই তাঁর স্ত্রী হাওয়াকে সৃষ্টি করেন। আদম (আঃ) থেকে হাওয়াকে কিভাবে সৃষ্টি করা হয়, এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, হাওয়া পুরুষ অর্থাৎ, আদম (আঃ) থেকে সৃষ্টি হয়েছেন। অর্থাৎ, তাঁর পাঁজরের হাড় থেকে। অপর একটি হাদীসে বলা হয়েছে যে, ‘‘নারীদেরকে পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পাঁজরের হাড়ের মধ্যে উপরের হাড়টি অধিক বাঁকা। যদি তা সোজা করতে যাও, তাহলে ভেঙ্গে ফেলবে। আর যদি তুমি তার দ্বারা উপকৃত হতে চাও, তবে তার মধ্যে বক্রতা অবশিষ্ট থাকা অবস্থাতেই উপকৃত হতে পারবে।’’ (বুখারী ৩৩৩১, মুসলিম ১৪৬৮নং) উলামাদের কেউ কেউ এই হাদীসের ভিত্তিতে ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত উক্তিকেই সমর্থন করেছেন। কুরআনের শব্দ خَلَقَ مِنْهَا থেকেও এই মতের সমর্থন হয়। অর্থাৎ, মা হাওয়ার সৃষ্টি সেই একটি প্রাণ থেকেই হয়েছে, যাকে ‘আদম’ বলা হয়।
[2] وَالأَرْحَامَ এর সংযোগ اللَّهَ এর সাথে। অর্থাৎ, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করাকেও ভয় কর। أَرْحَامٌ হলো, رِحِمٌ এর বহুবচন। যার অর্থ হল গর্ভাশয়, যেহেতু আত্মীয়তার সম্পর্ক মাতৃগর্ভের ভিত্তিতেই কায়েম হয়। এতে মাহরাম (যার সাথে চিরতরের জন্য বিবাহ হারাম, অগম্য বা এগানা) এবং গায়র মাহরাম (গম্য বা বেগানা) সকল আত্মীয়ই শামিল। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা অতি বড় গোনাহ। হাদীসসমূহে সর্বাবস্থায় আত্মীয়তার সম্পর্ক কায়েম রাখার এবং তাদের অধিকার আদায় করার প্রতি বড়ই তাকীদ করা হয়েছে এবং এ কাজের অনেক ফযীলতের কথাও বর্ণিত হয়েছে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: নামকরণ ও অবতীর্ণের সময়কাল:
(النِّسَاءُ) নিসা শব্দের অর্থ নারীগণ, মহিলাগণ। এ সূরায় মহিলাদের সাথে বিবাহ বন্ধন, ওয়ারিশসহ তাদের সার্বিক অধিকার ও ইসলাম ধর্মে তাদের মর্যাদার কথা আলোচনা করা হয়েছে বিধায় অত্র সূরার নাম সূরা আন্ নিসা (বা নারীগণ) করা হয়েছে। এ সূরা সম্পূর্ণই মদীনায় অবতীর্ণ হয়।
ইমাম কুরতুবী (রহঃ) বলেন: একটি আয়াত মক্কা বিজয়ের দিন মক্কাতে অবতীর্ণ হয়েছে তা হল:
(إِنَّ اللّٰهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمٰنٰتِ إِلٰٓي أَهْلِهَا)
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন আমানত তার হকদারকে ফিরিয়ে দিতে।” এছাড়াও নাযিলের সময়কালের ব্যাপারে কয়েকটি বর্ণনা পাওয়া যায়। ইমাম কুরতুবী (রহঃ) বলেন: সঠিক কথা হল সূরাটি মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে। (তাফসীর কুরতুবী ৫/৩)
আয়িশাহ (রাঃ) বলেন: সূরা নিসা অবতীর্ণকালীন সময়ে আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে ছিলাম। অর্থাৎ তিনি আমাকে বিবাহ করে তাঁর ঘরে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। (সহীহ বুখারী হা: ৪৯৯৩) আর এ বিষয়ে সকলে একমত যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আয়িশার (রাঃ) সাথে মদীনায় বাসর করেছেন। (ফাতহুল কাদীর, অত্র সূরার তাফসীর)
সূরা নিসার ফযীলত:
এটি বিধি-বিধান সম্বলিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সূরা। এ সূরাতে ইয়াতীমের অধিকার, বিবাহের সর্বোচ্চ সংখ্যা, উত্তরাধিকার, যে সকল নারীদের বিবাহ করা হারাম তাদের বর্ণনা, পুরুষদের দায়িত্ব ও ক্ষমতা, শির্ক বর্জিত এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত ও তার নিয়ম-পদ্ধতি, মুশরিকদের ইহলৌকিক ও পরলৌকিক বিধান, শরীয়তে সুন্নাতে রাসূলের গুরুত্বসহ বিভিন্ন বিষয় আলোচনা করা হয়েছে।
আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: সূরা নিসায় পাঁচটি আয়াত রয়েছে, যদি আমি সারা দুনিয়া পেতাম তাহলে তত খুশি হতাম না যত খুশি হয়েছি এ আয়াতগুলো পেয়ে।
আয়াত পাঁচটি হল:
১. (إِنَّ اللّٰهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ)
“আল্লাহ অণু পরিমাণও জুলুম করেন না।”(সূরা নিসা ৪:৪০)
২. (إِنْ تَجْتَنِبُوْا كَبَا۬ئِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ.. )
“তোমাদেরকে যে সকল কবীরা গুনাহ থেকে নিষেধ করা হয়েছে তা হতে বিরত থাকলে ...” (সূরা নিসা ৪:৩১)
৩. (إِنَّ اللّٰهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُّشْرَكَ بِه۪ وَيَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذٰلِكَ لِمَنْ يَّشَا۬ءُ)
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরীক করা ক্ষমা করেন না। এটা ব্যতীত অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।” (সূরা নিসা ৪:৪৮)
৪. (وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَّلَمُوْآ أَنْفُسَهُمْ جَا۬ءُوْكَ)
“যখন তারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছিল তখন যদি তারা তোমার নিকট আসত।” (সূরা নিসা ৪:৬৪)
৫. (وَمَنْ يَّعْمَلْ سُوْ۬ءًا أَوْ يَظْلِمْ نَفْسَه۫ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ)
“যে ব্যক্তি কোন মন্দ কাজ করে অথবা নিজের প্রতি জুলুম পরে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে।” (সূরা নিসা ৪:১১০)। (হাকিম ২/৩০৫, মুরসাল সহীহ)
১ নং আয়াতের তাফসীর:
সূরার শুরুতেই আল্লাহ তা‘আলা সারা জাহানের মানুষকে তাক্বওয়া তথা তাঁকে ভয় করে চলার নির্দেশ দিচ্ছেন। তাক্বওয়া হল, আল্লাহ তা‘আলার আদেশসমূহ মেনে চলা, নিষেধসমূহ বর্জন করা, একমাত্র তাঁর ইবাদত করা এবং তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরীক না করা। যে জাতি তাক্বওয়া অবলম্বন করে চলবে সে জাতি দুনিয়াতে সফলতা ও পরকালে মুক্তি লাভ করবে। তাক্বওয়ার ফলাফল সূরা বাকারাতে আলোচনা করা হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর মহান কুদরতের ব্যাপারে অবগত করে বলছেন, তিনি সমস্ত মানুষকে একজন মাত্র ব্যক্তি আদম (আঃ) থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর স্ত্রী হাওয়াকেও তাঁর থেকে সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ এ একজন মানুষ থেকে সৃষ্টি করে পরস্পরের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও আত্মীয়তার সুদৃঢ় সম্পর্ক তৈরি করে দিয়েছেন। পারস্পরিক এ সহানুভূতি ও সহমর্মিতায় উদ্বুদ্ধ হয়েই একে অন্যের অধিকারের প্রতি সজাগ থাকে এবং উঁচু-নীচু, ধনী-গরীব, ইতর-ভদ্রের ব্যবধান ভুলে গিয়ে একই মানদণ্ডে সম্পর্ক তৈরি করে।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: মহিলাদেরকে পাঁজর হতে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং সবচেয়ে উঁচু পাঁজর হচ্ছে বেশি বক্র। সুতরাং তুমি যদি তাকে সম্পূর্ণ সোজা করতে চাও তবে তাকে ভেঙ্গে ফেলবে। আর যদি তার মধ্যে কিছু বক্রতা রেখে দিয়ে উপকার লাভ করতে চাও তাহলে উপকার নিতে পারবে। (সহীহ বুখারী হা: ৩৩৩১)
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা এ দু’জন (আদম ও হাওয়া ‘আলাইহিমাস সালাম) ব্যক্তি থেকে সারা পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন রং ও ভাষা-ভাষী করে নারী-পুরুষে ছড়িয়ে দিয়েছেন। সে দুজন ব্যক্তি থেকে মানুষ দিনান্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বিভিন্ন জায়াগায় ছড়িয়ে বসবাস করছে যেখানে পূর্বে কখনো বসবাস ছিল না।
تَسَا۬ءَلُوْنَ ‘তোমরা একে অপরের কাছে আবেদন কর’ অর্থাৎ সেই আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় কর, যে আল্লাহ তা‘আলার নামে একে অপরের কাছে চেয়ে থাক, যেমন বলা হয়: আল্লাহর ওয়াস্তে তোমার কাছে চাচ্ছি।
وَالْأَرْحَامَ ‘আত্মীয়তাকে (সম্পর্ক ছিন্ন করাকে) ভয় কর’ অর্থাৎ আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকে বিরত থাক। বরং আত্মীয়তা সম্পর্ক বহাল রাখ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আল্লাহ যাবতীয় সৃষ্টিকে সৃষ্টি করলেন। এমনকি যখন তাঁর সৃষ্টি কাজ শেষ করলেন, তখন আত্মীয়তা সম্পর্ক বলে উঠলো: সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকে আপনার আশ্রয় লাভকারীদের এটাই যথাযোগ্য স্থান। তিনি (আল্লাহ) বললেন: হ্যাঁ, তুমি কি এতে খুশি নও যে, তোমার সাথে যে ব্যক্তি সুসম্পর্ক রাখবে আমিও তার সাথে সুসম্পর্ক রাখব। আর যে তোমার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করবে, আমিও তার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করব? সে (রক্ত সম্পর্ক) বলল: হ্যাঁ, সন্তুষ্ট হে আমার রব। আল্লাহ বললেন: তাহলে এ মর্যাদা তোমাকে দেয়া হল। (সহীহ বুখারী হা: ৫৯৮৭) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
لَيْسَ الوَاصِلُ بِالْمُكَافِئِ، وَلَكِنِ الوَاصِلُ الَّذِي إِذَا قُطِعَتْ رَحِمُهُ وَصَلَهَا
কেউ কিছু প্রদান করে, ফলে আমিও প্রদান করি এটা আত্মীয়তায় সম্পর্ক বহাল রাখা নয়। বরং আত্মীয়তার সম্পর্ক বহাল রাখা হল, কেউ যদি সম্পর্ক ছিন্ন করে তার সাথে বহাল রাখা। (সহীহ বুখারী হা: ৫৯৯১)
যারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে তাদের ব্যাপারে কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ করে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে যাবে না। (সহীহ বুখারী হা: ৫৯৮৪)
সুতরাং আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করা এবং তাঁর নির্দেশাবলী পালন করা ও নিষেধাজ্ঞা বর্জন করে চলা প্রত্যেক মু’মিনের দায়িত্ব। আর আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ঈমানী দায়িত্ব।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. পৃথিবীর সকল মানুষ একজন নর ও নারী থেকে সৃষ্ট।
২. তাক্বওয়ার গুরুত্ব জানতে পারলাম।
৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক বহাল রাখা ওয়াজিব।
৪. আল্লাহ তা‘আলা সবকিছুর সম্পর্কে অবগত রয়েছেন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ সূরাটি মদীনা শরীফে অবতীর্ণ হয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ) হযরত যায়েদ ইবনে সাবিতও (রাঃ) এটাই বলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, যখন এ সূরাটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ বলেনঃ “এখন আর রুদ্ধরাখা নয়।” মুসতাদরিক-ই-হাকিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “সূরা-ই-নিসার মধ্যে পাঁচটি এমন আয়াত আছে যে, যদি আমি সারা দুনিয়া পেয়ে যেতাম তথাপি আমি তত খুশী হতাম না যত খুশী এ আয়াতগুলোতে হয়েছি। একটি আয়াত হচ্ছেঃ “আল্লাহ তা'আলা কারও উপর অণুপরিমাণও অত্যাচার করেন না, যার যে পুণ্য থাকে তার প্রতিদান তিনি তাকে বেশী বেশী করে দেন এবং নিজের পক্ষ হতে পুরস্কার হিসেবে যে বড় প্রতিদান তা তো পৃথক।” দ্বিতীয় আয়াত হচ্ছেঃ “তোমরা যদি বড় বড় পাপসমূহ হতে বেঁচে থাক তবে ছোট ছোট পাপগুলো তিনি নিজেই ক্ষমা করে দেবেন এবং তোমাদেরকে সম্মানজনক জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন।” তৃতীয় আয়াত হচ্ছেঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সাথে অংশী স্থাপনকারীকে ক্ষমা করেন না এবং অবশিষ্ট পাপীদের যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করে থাকেন। চতুর্থ আয়াত হচ্ছেঃ “ঐ লোকগুলো যদি নিজেদের জীবনের উপর অত্যাচার করার পর তোমার নিকট এসে যেতো এবং নিজেও স্বীয় পাপের জন্যে আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতো ও রাসূল (সঃ) তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন তবে অবশ্যই তারা আল্লাহকে ক্ষমাশীল ও দয়ালু পেতো।” ইমাম হাকিম (রঃ) বলেনঃ এর ইসনাদ সহীহ বটে, কিন্তু এর আবদুর রহমান নামক একজন বর্ণনাকারীর তার পিতার নিকট হতে শুনার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। আবদুর রায্যাকের বর্ণনায় এই আয়াতটির পরিবর্তে নিম্নের আয়াতটি রয়েছেঃ “যে ব্যক্তির দ্বারা কোন পাপকার্য সংঘটিত হয় কিংবা সে নিজের জীবনের উপর অত্যাচার করে, অতঃপর সে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, তবে সে নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলাকে ক্ষমাশীল, দয়ালু পাবে।” হাদীসদ্বয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য এই ভাবে হবে যে, প্রথম হাদীসে একটি আয়াতের বর্ণনা বাকী রয়ে গেছে এবং এর বর্ণনা দ্বিতীয় হাদীসে হয়েছে। তাহলে পূর্ববর্তী হাদীসের চার আয়াত এবং পরবর্তী হাদীসের, এক আয়াত মিলে মোট পাঁচ আয়াত হয়ে গেল। কিংবা (আরবী) (৪:৪০) হতেই একটি আয়াত পূর্ণ হয়ে গেছে এবং (আরবী)-কে পৃথক আয়াত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, তবে দু’টি হাদীসেই পাঁচটি পাঁচটি করে আয়াত হয়ে গেল। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এ সূরায় এমন ৮টা আয়াত রয়েছে যেগুলো এ উম্মতের জন্যে প্রত্যেক ঐ জিনিস হতে উত্তম যার মধ্যে সূর্য উদিত ও অস্তমিত হয়। প্রথমটি হচ্ছেঃ “আল্লাহ স্বীয় আহকাম তোমাদের উপর পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করতে চান এবং তোমাদেরকে ঐ সৎ লোকদের পথ-প্রদর্শন করতে চান যারা তোমাদের পূর্বে অতীত হয়েছে ও তোমাদের তাওবা কবুল করতে চান, আল্লাহ মহাজ্ঞাতা, বিজ্ঞানময়। দ্বিতীয় আয়াত হচ্ছেঃ “আল্লাহ তোমাদের প্রতি করুণা বর্ষণ করতে এবং তোমাদের তাওবা কবুল করতে চান, আর স্বীয় প্রবৃত্তির অনুসারীরা চায় যে, তোমরা সত্য পথ হতে বহু দূরে সরে পড়।” তৃতীয় আয়াতটি হচ্ছেঃ “মানুষকে যেহেতু দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে, তাই আল্লাহ তোমাদের উপর হালকা করতে চান।” বাকী আয়াত হচ্ছে ঐগুলো যেগুলো পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। ইবনে আবি মালকিয়্যাহ (রঃ) বলেনঃ ‘আমি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে সূরা-ই-নিসা সম্পর্কে শুনেছি। কুরআন কারীম পড়েছি, অথচ আমি ছোট শিশু ছিলাম।' (মুসতাদরিক-ই-হাকিম)
আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে মুত্তাকী হওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন একমাত্র তাঁরই ইবাদত করে এবং অন্তরে যেন তাঁরই ভয় রাখে। অতঃপর তিনি স্বীয় ব্যাপক ক্ষমতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলছেন-আল্লাহ তোমাদের সকলকে একই ব্যক্তি হতে অর্থাৎ হযরত আদম (আঃ) হতে সৃষ্টি করেছেন। এবং ঐ ব্যক্তি হতেই তিনি হযরত হাওয়া (আঃ)-কেও সৃষ্টি করেছেন। হযরত আদম (আঃ) ঘুমিয়ে ছিলেন, এমতাবস্থায় আল্লাহ তা'আলা তার বাম পাজরের পিছন দিক হতে হযরত হাওয়া (আঃ)-কে সৃষ্টি করেন। তিনি জাগ্রত হয়ে তাঁকে দেখতে পান এবং তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন। তাঁর প্রতিও হযরত হাওয়া (আঃ)-এর ভালবাসার সৃষ্টি হয়।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, স্ত্রীকে পুরুষ হতে সৃষ্টি করা হয়েছে, এ জন্যে তার প্রয়োজন ও কামভাব পুরুষের মধ্যেই রাখা হয়েছে। আর পুরুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি দ্বারা এ জন্যেই তার প্রয়োজন মাটিতেইঙ্খা হয়েছে। সুতরাং তোমরা স্বীয় স্ত্রীদেরকে রুদ্ধ রাখ। বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছেঃ “স্ত্রীলোককে পাঁজর হতে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং সবচেয়ে উঁচু পাঁজর হচ্ছে সবচেয়ে বেশী বক্র। সুতরাং তুমি যদি তাকে সম্পূর্ণ সোজা করার ইচ্ছে কর তবে তাকে ভেঙ্গে দেবে। আর যদি তার মধ্যে কিছু বক্রতা রেখে দিয়ে উপকার লাভ করতে চাও তবে অবশ্যই উপকার লাভ করতে পারবে।'
অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘দু’জন হতে অর্থাৎ হযরত আদম (আঃ) ও হযরত হাওয়া (আঃ) হতে বহু নর ও নারী সৃষ্টি করতঃ দুনিয়ার চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিয়েছেন, যাদের প্রকারে, বিশেষণে, রঙ্গে, আকারে এবং কথাবার্তায় বিভিন্নতা রয়েছে। এ সমস্ত যেমন পূর্বে আল্লাহ তাআলারই অধিকারে ছিল, তিনি তাদেরকে এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে দিয়েছেন ঠিক তেমনই এক সময়ে তিনি সকলকে একত্রিত করে পুনরায় নিজের দখলে নিয়ে নেবেন এবং একটি মাঠে জমা করবেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করতে থাক, তার আনুগত্য ও ইবাদত করতে থাক। তোমরা সেই আল্লাহরই মাধ্যম দিয়ে তার নামেরই দোহাই দিয়ে একে অপরের নিকট তাগাদা করে থাক। যেমন কেউ বলে- আমি আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে এবং আত্মীয়তাকে মনে করিয়ে দিয়ে তোমাকে এ কথা বলছি।' মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে তোমরা তারই নামে শপথ করে থাক এবং অঙ্গীকার দৃঢ় করে থাক। তোমরা আল্লাহকে ভয় করতঃ আত্মীয়তার রক্ষণাবেক্ষণ করে, ওর বন্ধন ছিন্ন করো না, বরং যুক্ত রাখ। একে অপরের সাথে সদ্ব্যবহার কর। একটি পঠনে (আরবী) ও রয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর নামে এবং আত্মীয়তার মাধ্যমে। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের সমস্ত অবস্থা ও কার্যাবলীর সংবাদ রাখেন এবং তিনি খুব ভালভাবে তোমাদের তত্ত্বাবধান করতে রয়েছেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসের উপর সাক্ষী রয়েছেন।
বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত কর যে, যেন তুমি তাকে দেখছো, অথবা তুমি তাকে না দেখলেও তিনি তোমাকে দেখছেন।' ভাবার্থ এই যে, তোমরা তাঁর প্রতি মনোযোগ দাও যিনি তোমাদের উঠায়, বসায়, চলায় ও ফেরায় তোমাদের রক্ষক হিসেবে রয়েছেন। এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে মানবমণ্ডলী! একই বাপ-মায়ের মাধ্যমে তো তোমাদের জন্ম হয়েছে। সুতরাং তোমরা পরস্পরে একে অপরের প্রতি প্রেম-প্রীতি বজায় রেখো, দুর্বলদের সহায়তা কর এবং তাদের সাথে সদ্ব্যবহার কর। সহীহ মুসলিমে একটি হাদীসে রয়েছে যে, মুযা’র ঘোত্র যখন নিজেদেরকে চাদরে আবৃত করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে, কেননা, তাদের শরীরে কাপড় পর্যন্ত ছিল না, তখন রাসূলুল্লাহ যোহরের নামাযের পর দাঁড়িয়ে ভাষণ দান করেন, যাতে তিনি উপরোক্ত আয়াতটি পাঠ করতঃ নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং প্রত্যেকেই যেন দেখে যে, সে আগামীকালের জন্যে কি সামনে পাঠিয়েছে?' (৫৯:১৮) অতঃপর তিনি জনগণকে দান-খয়রাতের প্রতি উৎসাহিত করেন। ফলে যে যা পারলেন ঐ লোকগুলোকে দান করলেন। স্বর্ণ মুদ্রা, রৌপ্য মুদ্রা, খেজুর, গম ইত্যাদি সব কিছুই দিলেন। মুসনাদ ও সুনানের মধ্যে অভাবের ভাষণের বর্ণনায় রয়েছে যে, পরে তিনি তিনটি আয়াত পাঠ করেন যার মধ্যে একটি এ আয়াতটিই।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।