সূরা আন-নিসা (আয়াত: 115)
হরকত ছাড়া:
ومن يشاقق الرسول من بعد ما تبين له الهدى ويتبع غير سبيل المؤمنين نوله ما تولى ونصله جهنم وساءت مصيرا ﴿١١٥﴾
হরকত সহ:
وَ مَنْ یُّشَاقِقِ الرَّسُوْلَ مِنْۢ بَعْدِ مَا تَبَیَّنَ لَهُ الْهُدٰی وَ یَتَّبِعْ غَیْرَ سَبِیْلِ الْمُؤْمِنِیْنَ نُوَلِّهٖ مَا تَوَلّٰی وَ نُصْلِهٖ جَهَنَّمَ ؕ وَ سَآءَتْ مَصِیْرًا ﴿۱۱۵﴾
উচ্চারণ: ওয়া মাইঁ ইউশাকিকিররাছূলা মিম বা‘দি মা-তাবাইইয়ানা লাহুল হুদা-ওয়া ইয়াত্তাবি‘ গাইরা ছাবীলিল মু’মিনীনা নুওয়ালিল হী মা-তাওয়াল্লা-ওয়ানুসলিহী জাহান্নামা ওয়া ছাআত মাসীরা-।
আল বায়ান: আর যে রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে তার জন্য হিদায়াত প্রকাশ পাওয়ার পর এবং মুমিনদের পথের বিপরীত পথ অনুসরণ করে, আমি তাকে ফেরাব যেদিকে সে ফিরে এবং তাকে প্রবেশ করাব জাহান্নামে। আর আবাস হিসেবে তা খুবই মন্দ।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১১৫. আর কারো নিকট সৎ পথ প্রকাশ হওয়ার পর সে যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ছাড়া অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে যেদিকে সে ফিরে যায় সে দিকেই তাকে আমরা ফিরিয়ে দেব এবং তাকে জাহান্নামে দগ্ধ করাব, আর তা কতই না মন্দ আবাস!(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: যে ব্যক্তি সত্য পথ প্রকাশিত হওয়ার পরও রসূলের বিরোধিতা করে এবং মু’মিনদের পথ বাদ দিয়ে ভিন্ন পথ অনুসরণ করে, আমি তাকে সে পথেই ফিরাব যে পথে সে ফিরে যায়, আর তাকে জাহান্নামে দগ্ধ করব, কত মন্দই না সে আবাস!
আহসানুল বায়ান: (১১৫) আর যে ব্যক্তি তার নিকট সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করবে এবং বিশ্বাসীদের পথ ভিন্ন অন্য পথ অনুসরণ করবে, তাকে আমি সেদিকেই ফিরিয়ে দেব, যেদিকে সে ফিরে যেতে চায় এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। [1] আর তা কত মন্দ আবাস!
মুজিবুর রহমান: আর সুপথ প্রকাশিত হওয়ার পর যে রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং বিশ্বাসীগণের বিপরীত পথের অনুগামী হয়, তাহলে সে যাতে অভিনিবিষ্ট আমি তাকে তাতেই প্রত্যাবর্তিত করাব এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব; এবং ওটা নিকৃষ্টতর প্রত্যাবর্তন স্থল।
ফযলুর রহমান: সঠিক পথ স্পষ্ট হওয়ার পর কেউ যদি রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে আর মুমিনদের পথ ছাড়া অন্য পথ অনুসরণ করে তাহলে আমি তাকে সেদিকেই ফেরাব যেদিকে সে ফিরতে চেয়েছে এবং তাকে জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ করব। সেটা কত খারাপ গন্তব্য!
মুহিউদ্দিন খান: যে কেউ রসূলের বিরুদ্ধাচারণ করে, তার কাছে সরল পথ প্রকাশিত হওয়ার পর এবং সব মুসলমানের অনুসৃত পথের বিরুদ্ধে চলে, আমি তাকে ঐ দিকেই ফেরাব যে দিক সে অবলম্বন করেছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা নিকৃষ্টতর গন্তব্যস্থান।
জহুরুল হক: নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ ক্ষমা করেন না তাঁর সঙ্গে শরিক করা হোক, আর তা ছাড়া সব-কিছু তিনি ক্ষমা করেন যার জন্য তিনি ইচ্ছে করেন। আর যে কেউ আল্লাহ্র সঙ্গে অংশীদার করে সে নিশ্চয়ই বিপথগামী হয় সুদূর বিপথে।
Sahih International: And whoever opposes the Messenger after guidance has become clear to him and follows other than the way of the believers - We will give him what he has taken and drive him into Hell, and evil it is as a destination.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১১৫. আর কারো নিকট সৎ পথ প্রকাশ হওয়ার পর সে যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ছাড়া অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে যেদিকে সে ফিরে যায় সে দিকেই তাকে আমরা ফিরিয়ে দেব এবং তাকে জাহান্নামে দগ্ধ করাব, আর তা কতই না মন্দ আবাস!(১)
তাফসীর:
(১) এ আয়াত থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা বের হয়। এক. আল্লাহর রাসূলের বিরোধিতাকারী জাহান্নামী। দুই. কোন ব্যাপারে হক তথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত প্রকাশিত হওয়ার পর সেটার বিরোধিতা করাও জাহান্নামীদের কাজ। তিন. এ উম্মতের ইজমা বা কোন বিষয়ে ঐক্যমতে পৌছার পর সেটার বিরোধিতা করা অবৈধ। কারণ, তারা পথভ্রষ্টতায় একমত হবে না। মুমিনদের মত ও পথের বিপরীতে চলার কোন সুযোগ নেই।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১১৫) আর যে ব্যক্তি তার নিকট সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করবে এবং বিশ্বাসীদের পথ ভিন্ন অন্য পথ অনুসরণ করবে, তাকে আমি সেদিকেই ফিরিয়ে দেব, যেদিকে সে ফিরে যেতে চায় এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। [1] আর তা কত মন্দ আবাস!
তাফসীর:
[1] হিদায়াতের পথ পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার পর রসূল (সাঃ)-এর বিরোধিতা এবং মু’মিনদের পথ ত্যাগ করে অন্য পথের অনুসরণ করা ইসলাম থেকে খারিজ গণ্য হয় এবং এ ব্যাপারেই জাহান্নামের শাস্তির কথা বলা হয়েছে। মু’মিনীন বলতে সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-দের বুঝানো হয়েছে। যাঁরা হলেন সর্বপ্রথম ইসলামের অনুসারী এবং ইসলামী শিক্ষার পরিপূর্ণ নমুনা। এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার সময় তাঁরা ব্যতীত অন্য কোন মু’মিনীন বিদ্যমানও ছিলেন না যে তাঁরা লক্ষ্য হতে পারেন। কাজেই রসূল (সাঃ)-এর বিরোধিতা এবং সাহাবা (রাঃ)-দের পথ ত্যাগ করে অন্য পথের অনুসরণ করা দুটোই প্রকৃতপক্ষে একই জিনিসের নাম। এই জন্য সাহাবায়ে কেরামদের পথ থেকে বিচ্যুতিও কুফরী ও ভ্রষ্টতা। কোন কোন উলামা মু’মিনীনদের পথ বলতে উম্মতের ঐক্য (ইজমা বা সর্ববাদিসম্মতি)-কে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ, উম্মতের কোন বিষয়ে ঐকমত্য প্রত্যাখ্যান করাও কুফরী। আর উম্মতের ঐকমত্যের অর্থ হল, কোন মসলায় উম্মতের সমস্ত আলেম ও ফিক্বাহবিদের ঐকমত্য প্রকাশ করা। অথবা কোন বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের ঐক্য হওয়া। উভয় অবস্থায়ই উম্মতের ঐক্য বলে গণ্য এবং এই উভয় ঐক্যের অথবা তার কোন একটির অস্বীকার করা হবে কুফরী। তবে সাহাবায়ে কেরামদের ঐকমত্য তো অনেক মসলায় পাওয়া যায়। অর্থাৎ, এই প্রকারের ঐক্য তো লক্ষ্য করা যায়, কিন্তু সাহাবায়ে কেরামদের ঐক্যের পর সমস্ত উম্মতের বহু বিষয়ে ঐকমত্যের দাবী করা হলেও বাস্তবে এ রকম মাসলা-মাসায়েলের সংখ্যা অনেক কম, যে ব্যাপারে উম্মতের সমস্ত উলামা ও ফুক্বাহা (ফিক্বাহ শাস্ত্রের পন্ডিতগণ) ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন। স্বল্প সংখ্যায় হলেও যে ব্যাপারে উম্মতের ঐক্য হয়েছে তার অস্বীকৃতিও সাহাবায়ে কেরামদের ঐক্যের অস্বীকৃতির মতই কুফরী। কারণ, সহীহ হাদীসে এসেছে যে, ‘‘মহান আল্লাহ আমার উম্মতকে ভ্রষ্টতার উপর ঐক্যবদ্ধ করবেন না এবং জামাআতের উপর থাকে আল্লাহর হাত।’’ (সহীহ তিরমিযী, আলবানী ১৭৫৯নং)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১১৪-১১৫ নং আয়াতের তাফসীর:
نجوي শব্দের অর্থ গোপনে কথা বলা। এখানে গুপ্ত পরামর্শকে পাপ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যত্র একে সরাসরি নিষেধ করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(يیٰٓاَیُّھَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْٓا اِذَا تَنَاجَیْتُمْ فَلَا تَتَنَاجَوْا بِالْاِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَمَعْصِیَتِ الرَّسُوْلِ وَتَنَاجَوْا بِالْبِرِّ وَالتَّقْوٰیﺚ وَاتَّقُوا اللہَ الَّذِیْٓ اِلَیْھِ تُحْشَرُوْنَﭘ اِنَّمَا النَّجْوٰی مِنَ الشَّیْطٰنِ لِیَحْزُنَ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَلَیْسَ بِضَا۬رِّھِمْ شَیْئًا اِلَّا بِاِذْنِ اللہِﺚ وعَلَی اللہِ فَلْیَتَوَکَّلِ الْمُؤْمِنُوْنَﭙ)
“ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা যখন কানে কানে কথা বল তখন পাপকার্য, সীমালঙ্ঘন ও রাসূলের অবাধ্যাচরণের বিষয়ে কানাকানি করনা। বরং সৎ কাজ ও তাক্বওয়াহ সম্পর্কে পরামর্শ কর। আর তোমরা ভয় কর আল্লাহকে যার কাছে তোমাদের একত্রিত করা হবে। এ কানাঘুষা তো কেবল শয়তানের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে মু’মিনদেরকে দুঃখ দেয়ার জন্য। তবে শয়তান আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতিরেকে তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আর একমাত্র আল্লাহর ওপরই যেন মু’মিনরা ভরসা করে।”(সূরা মুজাদালাহ ৫৮:৯-১০)
(গুপ্ত পরামর্শ) বলতে মুনাফিকদের সেই কথাবার্তাকে বুঝানো হয়েছে যা তারা আপোষে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বা একে অপরের বিরুদ্ধে করত।
(إِلَّا مَنْ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ)
‘তবে কল্যাণ আছে যে নির্দেশ দেয় দান-খয়রাত’তবে গোপন পরামর্শ পাপ হবে না যখন তা কোন সদাক্বাহ বা ভাল কাজে হয়। এখানে সকল প্রকার জ্ঞানগত ও মালগত সদাক্বাহ শামিল।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, প্রত্যেক তাসবীহ সদাক্বাহ, প্রত্যেক তাকবীর সদাক্বাহ, প্রত্যেক তাহলীল বলা সদাক্বাহ, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজের বাধা সদাক্বাহ, এমনকি স্ত্রীর সাথে সহবাস করা সদাক্বাহ। (সহীহ বুখারী হা: ২৭০৭, সহীহ মুসলিম হা: ২৫৩)
(إِصْلَاحٍۭ بَيْنَ النَّاسِ)
‘মানুষের মধ্যে শান্তি স্থাপনের’মানুষের মাঝে সুষ্ঠু ফায়সালা করে শান্তি স্থাপন করা ভাল কাজ। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوْا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ ج وَاتَّقُوا اللّٰهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُوْنَ)
“মু’মিনরা পরস্পর ভাই। তাই তোমাদের ভাইদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। আল্লাহকে ভয় কর যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও।”(সূরা হুজুরাত ৪৯:১০)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(وَاِنْ طَا۬ئِفَتٰنِ مِنَ الْمُؤْمِنِیْنَ اقْتَتَلُوْا فَاَصْلِحُوْا بَیْنَھُمَاﺆ فَاِنْۭ بَغَتْ اِحْدٰٿھُمَا عَلَی الْاُخْرٰی فَقَاتِلُوا الَّتِیْ تَبْغِیْ حَتّٰی تَفِیْ۬ ئَ اِلٰٓی اَمْرِ اللہِﺆ فَاِنْ فَا۬ءَتْ فَاَصْلِحُوْا بَیْنَھُمَا بِالْعَدْلِ وَاَقْسِطُوْاﺚ اِنَّ اللہَ یُحِبُّ الْمُقْسِطِیْنَ)
“যদি ঈমানদারদের দু’দল একে অপরের সাথে লড়াই করে তাহলে তাদের মধ্যে আপোষ করে দাও। এরপর যদি একদল অপর দলের সাথে বাড়াবাড়ি করে তবে তাদের বিরুদ্ধে তোমরা লড়াই কর; যতক্ষণ না সে দলটি আল্লাহর হুকুমের দিকে ফিরে আসে। অতঃপর যদি (সে দলটি) ফিরে আসে তাহলে উভয় দলের মধ্যে ইনসাফের সাথে ফায়সালা করে দাও। আর সুবিচার কর; নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায় বিচারকারীদেরকে ভালোবাসেন।”(সূরা হুজুরাত ৪৯:৯)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
لَيْسَ الْكَذَّابُ الَّذِيْ يُصْلِحُ بَيْنَ النَّاسِ فَيَنْمِيْ خَيْرًا أَوْ يَقُوْلُ خَيْرًا
যে ব্যক্তি কল্যাণের নিয়তে মানুষের মাঝে সংশোধন করে, সে ব্যক্তি মিথ্যুক নয়। (সহীহ বুখারী হা: ২৬৯২)
এছাড়াও উল্লিখিত আমলগুলোর অনেক ফযীলত সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
হালাল উপার্জন করে আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় একটি খেজুর পরিমাণ সদাক্বার নেকীও উহুদ পাহাড়ের সমান। (সহীহ মুসলিম হা: সদাক্বাহ অধ্যায়)
অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: আমি কি তোমাদেরকে সিয়াম, সালাত, সদাক্বাহ, সাহায্য অপেক্ষা অধিক মর্যাদার কথা বলে দেব না? সকলে বলল: অবশ্যই হে আল্লাহর রাসূল! রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আপোষে সদ্ভাব স্থাপন করা। (আবূ দাঊদ হা: ৪৯১৯, তিরমিযী হা: ১৯৩৮, সহীহ)
(وَمَنْ يُّشَاقِقِ الرَّسُوْلَ)
‘যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে’ অর্থাৎ হিদায়াতের পথ পরিস্কার হয়ে যাবার পরও যে গোঁড়ামী ও বাতিল তরীকা বহাল রাখতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিরোধিতা করে এবং মু’মিনদের পথ ত্যাগ করে অন্য পথের অনুসরণ করে সে ইসলাম থেকে খারিজ বলে গণ্য হবে। সে জন্যই তার জন্য জাহান্নামের এ শাস্তির কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَّلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَي اللّٰهُ وَرَسُوْلُه۫ٓ أَمْرًا أَنْ يَّكُوْنَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ ط وَمَنْ يَّعْصِ اللّٰهَ وَرَسُوْلَه۫ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِيْنًا)
“কোন মু’মিন পুরুষ কিংবা মু’মিন নারীর জন্য এ অবকাশ নেই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন কোন কাজের নির্দেশ দেন, তখন সে কাজে তাদের কোন নিজস্ব সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে। কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করলে সে তো প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় নিপতিত হয়।” (সূরা আহযাব ৩৩:৩৬)
“মু’মিনদের পথ” বলতে সাহাবায়ে কিরামগণের আমল ও আকীদাকে বুঝানো হয়েছে। কেউ কেউ উম্মাতের ইজমার কথাও বলেছেন। তবে প্রথমটিই সঠিক। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَإِنَّكَ لَعَلٰي خُلُقٍ عَظِيْمٍ)
“নিশ্চয়ই তুমি মহান চরিত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছ।”(সূরা কালাম ৬৮:৪)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: আমার প্রত্যেক উম্মাত জান্নাতে যাবে, তবে যারা ‘আবা’ তারা জান্নাতে যাবে না। বলা হল ‘আবা’ কারা হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: যারা আমার আনুগত্য করবে তারা জান্নাতে যা-এর সহীহ সুন্নাহকে বর্জন করে কোন ব্যক্তির মতাদর্শ, চিন্তাধারা ও তরিকা গ্রহণ করা কুফরী কাজ।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. অসৎ কাজে গুপ্ত পরামর্শ করা হারাম।
২. মানুষের সাঝে সংশোধন করে দেয়া ঈমানের বৈশিষ্ট্য ও নেকীর কাজ।
৩. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সহীহ হাদীস বর্জন করে অন্যের মতামত ও তরিকা গ্রহণ করা প্রকাশ্য বে-ঈমানী।
৩. সকল সাহাবাই অনুসণীয়। নির্দিষ্টভাবে কোন সাহাবী নন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১১৪-১১৫ নং আয়াতের তাফসীর:
জনগণের অধিকাংশ কথাই অমঙ্গলজনক হয়। তবে কতক লোক এমনও আছে যে, তারা মানুষকে দান খয়রাত করার, সকার্য সাধনের এবং পরস্পর মিলেমিশে থাকার উৎসাহ দিয়ে থাকে। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এ রয়েছে, হযরত যায়েদ ইবনে হুনায়েশ (রঃ) বলেন, হযরত সুফইয়ান সাওয়ারী (রঃ) রোগ শয্যায় শায়িত হলে আমরা তাকে দেখতে যাই। আমাদের সঙ্গে হযরত সাঈদ ইবনে হাস্সানও (রঃ) ছিলেন। হযরত সুফইয়ান সাওরী (রঃ) হযরত সাঈদ (রঃ)-কে বলেন, “হে সাঈদ (রাঃ)! আপনি উম্মে সালেহ হতে যে হাদীসটি বর্ণনা করেছিলেন তা আজকে আবার বর্ণনা করুন। হযরত সাঈদ ইবনে হাস্সান (রঃ) বর্ণনা করতঃ বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মানুষের সমস্ত কথাই তার জন্যে অমঙ্গল আনয়ন করে, তবে যদি সে আল্লাহর, যিকির, মানুষকে ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করে (তবে সেটা মঙ্গলজনক)'। তখন হযরত সুফইয়ান সাওরী (রঃ) বলেন, এ বিষয়টিই (আরবী) -এ আয়াতে রয়েছে। (আরবী) -( ৭৮:৩৮) -এ আয়াতেও রয়েছে এবং (আরবী) (১০৩:১-২) -এ আয়াতেও রয়েছে।
মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ ‘জনগণের মধ্যে মিলজুল এবং সন্ধি স্থাপনের উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি ভাল কথা বলে বা এদিক হতে ওদিকে এ প্রকারের আলাপ আলোচনা করে সে মিথ্যাবাদী নয়।' হযরত উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা (রাঃ) বলেন, তিন জায়গায় আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এরূপ কথা বলার অনুমতি দিতে শুনেছি। (১) যুদ্ধে, (২) জনগণের মধ্যে সন্ধি স্থাপনের উদ্দেশ্যে এবং (৩) স্বামীর এরূপ কথা বলা স্ত্রীকে এবং স্ত্রীর এরূপ কথা বলা স্বামীকে। উম্মে কুলসুমের (রাঃ) রিওয়ায়েতে রাসূল (সঃ) হিজরাতকারীগণ এবং বাইআত গ্রহণকারীগণকে বলেন :আমি কি তোমাদেরকে এমন এক কাজের কথা বলে দেবনা যা নামায এবং রোযা অপেক্ষাও উত্তম? সাহাবীগণ বলেন, হ্যা, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি বলুন। তখন তিনি বলেন :‘জনগণের মধ্যে সন্ধি স্থাপন করা এবং তাদের পরস্পরের বিবাদ মিটিয়ে দেয়া।' (সুনান-ই-আবি দাউদ ইত্যাদি)।
মুসনাদ-ই-বায়ে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু আইউব (রাঃ)-কে বলেনঃ এসো, আমি তোমাকে একটি ব্যবসায়ের কথা বলে দেই। লোকেরা যখন বিবাদে লিপ্ত হয় তখন তুমি তাদের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দাও, যখন একজন অপরজন হতে সরে থাকে তখন তুমি তাদেরকে একত্রিত করে দাও।'
আল্লাহ তা'আলার বলেন- যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রসন্নতা সন্ধানের জন্যে ঐরূপ করে, আমি তাকে মহান বিনিময় প্রদান করবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি শরীয়তের বিপরীত পথে চলে, শরীয়ত হয় এক দিকে এবং তার পথ হয় অন্যদিকে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক দিকে চলার নির্দেশ দেন এবং সে অন্যদিকে চলে, অথচ সত্য তার নিকট প্রকাশিত হয়ে পড়েছে, সে দলীল প্রমাণাদি দেখেছে। তথাপি সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করতঃ মুসলমানদের সরল ও পরিষ্কার পথ হতে সরে পড়েছে, সুতরাং আমিও তাকে ঐ বক্র ও খারাপ পথেই ফিরিয়ে দেব। ঐ খারাপ পথই তখন তার নিকট ভাল বলে মনে হবে, অতঃপর সে জাহান্নামে গিয়ে পৌছে যাবে।
মুসলমানদের পথ ছেড়ে দিয়ে অন্য পথ অনুসন্ধান করাই হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করা। কিন্তু কখনও হয় তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্পষ্ট কথারই উল্টো হয়, আবার কখনও কখনও ঐ জিনিসের বিপরীত হয় যার উপর মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উম্মত সবাই একমত রয়েছে। তাদের দ্রতা ও নম্রতার কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ভুল হতে রক্ষা করেছেন। এ ব্যাপারে বহু হাদীসও রয়েছে এবং উসূলের হাদীসগুলোতে আমরা ওর বিরাট অংশ বর্ণনাও করেছি।
ইমাম শাফিঈ (রঃ) চিন্তা ও গবেষণার পর এ আয়াত হতেই উম্মতের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দলীল গ্রহণ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এটাই এ ব্যাপারে উত্তম ও দৃঢ়তার জিনিস। তবে অন্য কয়েকজন ইমাম এ যুক্তিকে কঠিন ও আয়াত হতে দূরে বলেছেন। মোটকথা যারা মুমিনদের পথ হতে সরে পড়ে তাদের রজ্জুকে আল্লাহ তা'আলা ঢিল দিয়ে দেন। যেমন আল্লাহ পাক অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তুমি আমাকে ও যে এ কথাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে তাকে ছেড়ে দাও, সত্বরই আমি এমনভাবে ধরবো যে, সে জানতেই পারবে না।' (৬৮:৪৪) অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন তারা বাঁকা হয়ে গেল তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরকে বক্র করে দিলেন। (৬১:৫) আর একটি আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘আমি তাদেরকে তাদের বিরুদ্ধাচরণে ছেড়ে দিচ্ছি, তন্মধ্যে তারা অন্ধভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শেষে তাদের প্রত্যাবর্তনস্থল জাহান্নামই হবে। (৬:১১০) যেমন এক জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “একত্রিত কর গোনাহগারদেরকে এবং তাদের দোসরদেরকে।” (৩৭:২২) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ ‘আগুন দেখে অত্যাচারীরা জেনে নেবে যে, তাদেরকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হতে হবে এবং তারা পলায়নের কোন স্থান পাবে না।' (১৮:৫৩)।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।