আল কুরআন


সূরা আন-নিসা (আয়াত: 114)

সূরা আন-নিসা (আয়াত: 114)



হরকত ছাড়া:

لا خير في كثير من نجواهم إلا من أمر بصدقة أو معروف أو إصلاح بين الناس ومن يفعل ذلك ابتغاء مرضاة الله فسوف نؤتيه أجرا عظيما ﴿١١٤﴾




হরকত সহ:

لَا خَیْرَ فِیْ کَثِیْرٍ مِّنْ نَّجْوٰىهُمْ اِلَّا مَنْ اَمَرَ بِصَدَقَۃٍ اَوْ مَعْرُوْفٍ اَوْ اِصْلَاحٍۭ بَیْنَ النَّاسِ ؕ وَ مَنْ یَّفْعَلْ ذٰلِکَ ابْتِغَآءَ مَرْضَاتِ اللّٰهِ فَسَوْفَ نُؤْتِیْـهِ اَجْرًا عَظِیْمًا ﴿۱۱۴﴾




উচ্চারণ: লা-খাইরা ফী কাছীরিম মিন নাজওয়া-হুম ইল্লা-মান আমারা বিসাদাকাতিন আও মা‘রূফিন আও ইসলা-হিম বাইনান্না-ছি ওয়া মাইঁ ইয়াফ‘আল যা-লিকাব তিগাআ মারদাতিল্লা-হি ফাছাওফা নু’তীহি আজরান ‘আজীমা-।




আল বায়ান: তাদের গোপন পরামর্শের অধিকাংশে কোন কল্যাণ নেই। তবে (কল্যাণ আছে) যে নির্দেশ দেয় সদাকা কিংবা ভালো কাজ অথবা মানুষের মধ্যে মীমাংসার। আর যে তা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে করবে তবে অচিরেই আমি তাকে মহাপুরস্কার দান করব।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১১৪. তাদের অধিকাংশ গোপন পরামর্শে কোন কল্যাণ নেই, তবে কল্যাণ আছে যে নির্দেশ দেয় সাদকাহ, সৎকাজ ও মানুষের মধ্যে শান্তি স্থাপনের(১); আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি লাভের আশায় কেউ তা করলে তাকে অবশ্যই আমরা মহা পুরস্কার দেব।




তাইসীরুল ক্বুরআন: তাদের অধিকাংশ গোপন পরামর্শের মধ্যে কোন কল্যাণ নেই, কিন্তু কল্যাণ আছে যে ব্যক্তি দান-খয়রাত অথবা কোন সৎকাজের কিংবা লোকেদের মধ্যে মিলমিশের নির্দেশ দেয়। যে কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি সাধন উদ্দেশে এমন কাজ করবে, আমি তাকে মহা পুরস্কার দান করব।




আহসানুল বায়ান: (১১৪) তাদের অধিকাংশ গুপ্ত পরামর্শে কোন কল্যাণ নেই,[1] তবে যে (তার পরামর্শে) দান খয়রাত, সৎকাজ ও মানুষের মধ্যে শান্তি স্থাপনের নির্দেশ দেয় (তাতে কল্যাণ আছে)।[2] আর আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আকাঙ্ক্ষায় যে ঐরূপ করবে[3] তাকে আমি মহা পুরস্কার দান করব। [4]



মুজিবুর রহমান: সাধারণ লোকের অধিকাংশ গুপ্ত পরামর্শে কোন মঙ্গল নিহিত থাকেনা, তবে হ্যাঁ যে ব্যক্তি দান খয়রাত করে অথবা কোন সৎ কাজ করে কিংবা লোকের মধ্যে পরস্পর সন্ধি স্থাপন করে দেয়ার উদ্দেশে তা করে তাহলে তা স্বতন্ত্র এবং যে আল্লাহর প্রসন্নতা সন্ধানের জন্য ঐরূপ করে, আমি তাকে মহান বিনিময় প্রদান করব।



ফযলুর রহমান: তাদের গোপন পরামর্শের অনেকগুলোতে ভাল কিছু নেই। তবে যে দান-ছদকা, ভাল কাজ কিংবা মানুষের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার আদেশ দেয় তার কথা আলাদা। আর যে এসব কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য করে, আমি তাকে বড় পুরস্কার দেব।



মুহিউদ্দিন খান: তাদের অধিকাংশ সলা-পরামর্শ ভাল নয়; কিন্তু যে সলা-পরামর্শ দান খয়রাত করতে কিংবা সৎকাজ করতে কিংবা মানুষের মধ্যে সন্ধিস্থাপন কল্পে করতো তা স্বতন্ত্র। যে একাজ করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে আমি তাকে বিরাট ছওয়াব দান করব।



জহুরুল হক: আর যে কেউ রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে পথনির্দেশ তার কাছে সুস্পষ্ট হবার পরে, আর অনুসরণ করে মূমিনদের পথ থেকে ভিন্ন, আমরা তাকে ফেরাবো সেই দিকে যে দিকে সে ফিরেছে, আর তাকে প্রবেশ করাবো জাহান্নামে, আর মন্দ সেই গন্তব্যস্থান!



Sahih International: No good is there in much of their private conversation, except for those who enjoin charity or that which is right or conciliation between people. And whoever does that seeking means to the approval of Allah - then We are going to give him a great reward.



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১১৪. তাদের অধিকাংশ গোপন পরামর্শে কোন কল্যাণ নেই, তবে কল্যাণ আছে যে নির্দেশ দেয় সাদকাহ, সৎকাজ ও মানুষের মধ্যে শান্তি স্থাপনের(১); আল্লাহ্–র সন্তুষ্টি লাভের আশায় কেউ তা করলে তাকে অবশ্যই আমরা মহা পুরস্কার দেব।


তাফসীর:

(১) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ঐ ব্যক্তি মিথ্যাবাদী নয় যে মানুষের মধ্যে ভাল কিছু ইশারা করে বা বলে শান্তি স্থাপন করে দেয়। [বুখারীঃ ২৬৯২, মুসলিমঃ ২৬০৫] অন্য হাদীসে এসেছে, আবুদ্দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি কি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব না এমন কাজ যা সিয়াম, সালাত ও সদকা থেকেও উত্তম? তারা বললঃ অবশ্যই। রাসূল বললেনঃ মানুষের মধ্যে মীমাংসা করে দেয়া। কেননা, মানুষের মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট হওয়া গর্দান কাটার সমান। [তিরমিযীঃ ২৫০৯]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১১৪) তাদের অধিকাংশ গুপ্ত পরামর্শে কোন কল্যাণ নেই,[1] তবে যে (তার পরামর্শে) দান খয়রাত, সৎকাজ ও মানুষের মধ্যে শান্তি স্থাপনের নির্দেশ দেয় (তাতে কল্যাণ আছে)।[2] আর আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আকাঙ্ক্ষায় যে ঐরূপ করবে[3] তাকে আমি মহা পুরস্কার দান করব। [4]


তাফসীর:

[1] نَجْوَى (গুপ্ত পরামর্শ) বলতে মুনাফিকদের সেই কথা-বার্তাকে বুঝানো হয়েছে, যা তারা আপোসে মুসলিমদের বিরুদ্ধে অথবা একে অপরের বিরুদ্ধে বলাবলি করত।

[2] অর্থাৎ, সাদাকা-খয়রাত, সর্বপ্রকার ভাল কাজ এবং মানুষের মাঝে মীমাংসার জন্য গুপ্ত-পরামর্শ করা কল্যাণকর। বহু হাদীসেও এই কাজগুলোর ফযীলত ও গুরুত্বের কথা বর্ণিত হয়েছে।

[3] কারণ, ইখলাস (আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের খাঁটি উদ্দেশ্য) না থাকলে বড় বড় আমলও কেবল নষ্টই হবে না, বরং আমলকারীর জন্য বিপদের কারণও হবে। نعوذ بالله من الرياء والنفاق

[4] উল্লিখিত আমলগুলোর অনেক ফযীলতের কথা হাদীসসমূহে বর্ণিত হয়েছে। হালাল উপার্জন থেকে আল্লাহর রাস্তায় একটি খেজুর পরিমাণ সাদাকার নেকীও উহুদ পাহাড়ের সমান। (সহীহ মুসলিম, যাকাত অধ্যায়ঃ) ভাল কথার প্রচারের নেকীও অনেক। অনুরূপ আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব এবং আপস-দ্বনেদ্ব লিপ্ত এমন মানুষদের মাঝে সদ্ভাব ও সন্ধি স্থাপন করে দেওয়ার ফযীলতও অনেক। একটি হাদীসে তো এ কাজকে নফল নামায, নফল রোযা এবং নফল সাদাকা-খয়রাত থেকেও উত্তম বলা হয়েছে। মহানবী (সাঃ) বলেন, (أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَفْضَلَ مِنْ دَرَجَةِ الصِّيَامِ وَالصَّلَاةِ وَالصَّدَقَةِ؟ قَالُوا بَلَى يَا رَسُولَ اللهِ، قَالَ: إِصْلَاحُ ذَاتِ الْبَيْنِ، وَفَسَادُ ذَاتِ الْبَيْنِ الحَالِقَةُ ) "আমি কি তোমাদেরকে রোযা, নামায ও সদকার মাহাত্ম্য অপেক্ষা অধিক মাহাত্ম্যের কথা বলে দিব না?" সকলে বলল, ‘অবশ্যই হে আল্লাহর রসূল!’ তিনি বললেন, "আপোসে সদ্ভাব স্থাপন করা। আর আপোসের সদ্ভাব নষ্ট হওয়াই হল সর্বনাশী।" (আহমাদ, আবূ দাঊদ, তিরমিযী) এমন কি সন্ধিস্থাপনকারীদেরকে (প্রয়োজনবোধে) মিথ্যা বলার অনুমতিও দেওয়া হয়েছে। যাতে একজনকে অপরজনের নিকট করার জন্য উদ্দেশ্যমূলক মিথ্যা বলার প্রয়োজন হলে সে ব্যাপারে যেন কোন দ্বিধা না করে। (لَيْسَ الْكَذَّابُ الَّذِي يُصْلِحُ بَيْنَ النَّاسِ فَيَنْمِي خَيْرًا أَوْ يَقُولُ خَيْرًا ) "সে ব্যক্তি মিথ্যুক নয়, যে মানুষের মাঝে মীমাংসা করার জন্য ভাল কথার প্রচার করে অথবা ভাল কথা বলে বেড়ায়।" (বুখারী ২৬৯২-মুসলিম ২৬০৫)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১১৪-১১৫ নং আয়াতের তাফসীর:



نجوي শব্দের অর্থ গোপনে কথা বলা। এখানে গুপ্ত পরামর্শকে পাপ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যত্র একে সরাসরি নিষেধ করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(يیٰٓاَیُّھَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْٓا اِذَا تَنَاجَیْتُمْ فَلَا تَتَنَاجَوْا بِالْاِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَمَعْصِیَتِ الرَّسُوْلِ وَتَنَاجَوْا بِالْبِرِّ وَالتَّقْوٰیﺚ وَاتَّقُوا اللہَ الَّذِیْٓ اِلَیْھِ تُحْشَرُوْنَﭘ اِنَّمَا النَّجْوٰی مِنَ الشَّیْطٰنِ لِیَحْزُنَ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَلَیْسَ بِضَا۬رِّھِمْ شَیْئًا اِلَّا بِاِذْنِ اللہِﺚ وعَلَی اللہِ فَلْیَتَوَکَّلِ الْمُؤْمِنُوْنَﭙ)



“ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা যখন কানে কানে কথা বল তখন পাপকার্য, সীমালঙ্ঘন ও রাসূলের অবাধ্যাচরণের বিষয়ে কানাকানি কর‎না। বরং সৎ কাজ ও তাক্বওয়াহ সম্পর্কে পরামর্শ কর‎। আর তোমরা ভয় কর আল্লাহকে যার কাছে তোমাদের একত্রিত করা হবে। এ কানাঘুষা তো কেবল শয়তানের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে মু’মিনদেরকে দুঃখ দেয়ার জন্য। তবে শয়তান আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতিরেকে তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আর একমাত্র আল্লাহর ওপরই যেন মু’মিনরা ভরসা করে।”(সূরা মুজাদালাহ ৫৮:৯-১০)



(গুপ্ত পরামর্শ) বলতে মুনাফিকদের সেই কথাবার্তাকে বুঝানো হয়েছে যা তারা আপোষে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বা একে অপরের বিরুদ্ধে করত।



(إِلَّا مَنْ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ)



‘তবে কল্যাণ আছে যে নির্দেশ দেয় দান-খয়রাত’তবে গোপন পরামর্শ পাপ হবে না যখন তা কোন সদাক্বাহ বা ভাল কাজে হয়। এখানে সকল প্রকার জ্ঞানগত ও মালগত সদাক্বাহ শামিল।



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, প্রত্যেক তাসবীহ সদাক্বাহ, প্রত্যেক তাকবীর সদাক্বাহ, প্রত্যেক তাহলীল বলা সদাক্বাহ, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজের বাধা সদাক্বাহ, এমনকি স্ত্রীর সাথে সহবাস করা সদাক্বাহ। (সহীহ বুখারী হা: ২৭০৭, সহীহ মুসলিম হা: ২৫৩)



(إِصْلَاحٍۭ بَيْنَ النَّاسِ)



‘মানুষের মধ্যে শান্তি স্থাপনের’মানুষের মাঝে সুষ্ঠু ফায়সালা করে শান্তি স্থাপন করা ভাল কাজ। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(إِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوْا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ ج وَاتَّقُوا اللّٰهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُوْنَ)



“মু’মিনরা পরস্পর ভাই। তাই তোমাদের ভাইদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। আল্লাহকে ভয় কর‎ যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও।”(সূরা হুজুরাত ৪৯:১০)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:



(وَاِنْ طَا۬ئِفَتٰنِ مِنَ الْمُؤْمِنِیْنَ اقْتَتَلُوْا فَاَصْلِحُوْا بَیْنَھُمَاﺆ فَاِنْۭ بَغَتْ اِحْدٰٿھُمَا عَلَی الْاُخْرٰی فَقَاتِلُوا الَّتِیْ تَبْغِیْ حَتّٰی تَفِیْ۬ ئَ اِلٰٓی اَمْرِ اللہِﺆ فَاِنْ فَا۬ءَتْ فَاَصْلِحُوْا بَیْنَھُمَا بِالْعَدْلِ وَاَقْسِطُوْاﺚ اِنَّ اللہَ یُحِبُّ الْمُقْسِطِیْنَ)



“যদি ঈমানদারদের দু’দল একে অপরের সাথে লড়াই করে তাহলে তাদের মধ্যে আপোষ করে দাও। এরপর যদি একদল অপর দলের সাথে বাড়াবাড়ি করে তবে তাদের বিরুদ্ধে তোমরা লড়াই কর; যতক্ষণ না সে দলটি আল্লাহর হুকুমের দিকে ফিরে আসে। অতঃপর যদি (সে দলটি) ফিরে আসে তাহলে উভয় দলের মধ্যে ইনসাফের সাথে ফায়সালা করে দাও। আর সুবিচার কর‎; নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায় বিচারকারীদেরকে ভালোবাসেন।”(সূরা হুজুরাত ৪৯:৯)



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:



لَيْسَ الْكَذَّابُ الَّذِيْ يُصْلِحُ بَيْنَ النَّاسِ فَيَنْمِيْ خَيْرًا أَوْ يَقُوْلُ خَيْرًا



যে ব্যক্তি কল্যাণের নিয়তে মানুষের মাঝে সংশোধন করে, সে ব্যক্তি মিথ্যুক নয়। (সহীহ বুখারী হা: ২৬৯২)



এছাড়াও উল্লিখিত আমলগুলোর অনেক ফযীলত সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।



হালাল উপার্জন করে আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় একটি খেজুর পরিমাণ সদাক্বার নেকীও উহুদ পাহাড়ের সমান। (সহীহ মুসলিম হা: সদাক্বাহ অধ্যায়)



অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: আমি কি তোমাদেরকে সিয়াম, সালাত, সদাক্বাহ, সাহায্য অপেক্ষা অধিক মর্যাদার কথা বলে দেব না? সকলে বলল: অবশ্যই হে আল্লাহর রাসূল! রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আপোষে সদ্ভাব স্থাপন করা। (আবূ দাঊদ হা: ৪৯১৯, তিরমিযী হা: ১৯৩৮, সহীহ)



(وَمَنْ يُّشَاقِقِ الرَّسُوْلَ)



‘যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে’ অর্থাৎ হিদায়াতের পথ পরিস্কার হয়ে যাবার পরও যে গোঁড়ামী ও বাতিল তরীকা বহাল রাখতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিরোধিতা করে এবং মু’মিনদের পথ ত্যাগ করে অন্য পথের অনুসরণ করে সে ইসলাম থেকে খারিজ বলে গণ্য হবে। সে জন্যই তার জন্য জাহান্নামের এ শাস্তির কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَّلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَي اللّٰهُ وَرَسُوْلُه۫ٓ أَمْرًا أَنْ يَّكُوْنَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ ط وَمَنْ يَّعْصِ اللّٰهَ وَرَسُوْلَه۫ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِيْنًا)‏



“কোন মু’মিন পুরুষ কিংবা মু’মিন নারীর জন্য এ অবকাশ নেই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন কোন কাজের নির্দেশ দেন, তখন সে কাজে তাদের কোন নিজস্ব সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে। কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করলে সে তো প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় নিপতিত হয়।” (সূরা আহযাব ৩৩:৩৬)



“মু’মিনদের পথ” বলতে সাহাবায়ে কিরামগণের আমল ও আকীদাকে বুঝানো হয়েছে। কেউ কেউ উম্মাতের ইজমার কথাও বলেছেন। তবে প্রথমটিই সঠিক। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَإِنَّكَ لَعَلٰي خُلُقٍ عَظِيْمٍ)‏



“নিশ্চয়ই তুমি মহান চরিত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছ।”(সূরা কালাম ৬৮:৪)



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: আমার প্রত্যেক উম্মাত জান্নাতে যাবে, তবে যারা ‘আবা’ তারা জান্নাতে যাবে না। বলা হল ‘আবা’ কারা হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: যারা আমার আনুগত্য করবে তারা জান্নাতে যা-এর সহীহ সুন্নাহকে বর্জন করে কোন ব্যক্তির মতাদর্শ, চিন্তাধারা ও তরিকা গ্রহণ করা কুফরী কাজ।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. অসৎ কাজে গুপ্ত পরামর্শ করা হারাম।

২. মানুষের সাঝে সংশোধন করে দেয়া ঈমানের বৈশিষ্ট্য ও নেকীর কাজ।

৩. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সহীহ হাদীস বর্জন করে অন্যের মতামত ও তরিকা গ্রহণ করা প্রকাশ্য বে-ঈমানী।

৩. সকল সাহাবাই অনুসণীয়। নির্দিষ্টভাবে কোন সাহাবী নন।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১১৪-১১৫ নং আয়াতের তাফসীর:

জনগণের অধিকাংশ কথাই অমঙ্গলজনক হয়। তবে কতক লোক এমনও আছে যে, তারা মানুষকে দান খয়রাত করার, সকার্য সাধনের এবং পরস্পর মিলেমিশে থাকার উৎসাহ দিয়ে থাকে। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এ রয়েছে, হযরত যায়েদ ইবনে হুনায়েশ (রঃ) বলেন, হযরত সুফইয়ান সাওয়ারী (রঃ) রোগ শয্যায় শায়িত হলে আমরা তাকে দেখতে যাই। আমাদের সঙ্গে হযরত সাঈদ ইবনে হাস্সানও (রঃ) ছিলেন। হযরত সুফইয়ান সাওরী (রঃ) হযরত সাঈদ (রঃ)-কে বলেন, “হে সাঈদ (রাঃ)! আপনি উম্মে সালেহ হতে যে হাদীসটি বর্ণনা করেছিলেন তা আজকে আবার বর্ণনা করুন। হযরত সাঈদ ইবনে হাস্সান (রঃ) বর্ণনা করতঃ বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মানুষের সমস্ত কথাই তার জন্যে অমঙ্গল আনয়ন করে, তবে যদি সে আল্লাহর, যিকির, মানুষকে ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করে (তবে সেটা মঙ্গলজনক)'। তখন হযরত সুফইয়ান সাওরী (রঃ) বলেন, এ বিষয়টিই (আরবী) -এ আয়াতে রয়েছে। (আরবী) -( ৭৮:৩৮) -এ আয়াতেও রয়েছে এবং (আরবী) (১০৩:১-২) -এ আয়াতেও রয়েছে।

মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ ‘জনগণের মধ্যে মিলজুল এবং সন্ধি স্থাপনের উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি ভাল কথা বলে বা এদিক হতে ওদিকে এ প্রকারের আলাপ আলোচনা করে সে মিথ্যাবাদী নয়।' হযরত উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা (রাঃ) বলেন, তিন জায়গায় আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এরূপ কথা বলার অনুমতি দিতে শুনেছি। (১) যুদ্ধে, (২) জনগণের মধ্যে সন্ধি স্থাপনের উদ্দেশ্যে এবং (৩) স্বামীর এরূপ কথা বলা স্ত্রীকে এবং স্ত্রীর এরূপ কথা বলা স্বামীকে। উম্মে কুলসুমের (রাঃ) রিওয়ায়েতে রাসূল (সঃ) হিজরাতকারীগণ এবং বাইআত গ্রহণকারীগণকে বলেন :আমি কি তোমাদেরকে এমন এক কাজের কথা বলে দেবনা যা নামায এবং রোযা অপেক্ষাও উত্তম? সাহাবীগণ বলেন, হ্যা, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি বলুন। তখন তিনি বলেন :‘জনগণের মধ্যে সন্ধি স্থাপন করা এবং তাদের পরস্পরের বিবাদ মিটিয়ে দেয়া।' (সুনান-ই-আবি দাউদ ইত্যাদি)।

মুসনাদ-ই-বায়ে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু আইউব (রাঃ)-কে বলেনঃ এসো, আমি তোমাকে একটি ব্যবসায়ের কথা বলে দেই। লোকেরা যখন বিবাদে লিপ্ত হয় তখন তুমি তাদের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দাও, যখন একজন অপরজন হতে সরে থাকে তখন তুমি তাদেরকে একত্রিত করে দাও।'

আল্লাহ তা'আলার বলেন- যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রসন্নতা সন্ধানের জন্যে ঐরূপ করে, আমি তাকে মহান বিনিময় প্রদান করবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি শরীয়তের বিপরীত পথে চলে, শরীয়ত হয় এক দিকে এবং তার পথ হয় অন্যদিকে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক দিকে চলার নির্দেশ দেন এবং সে অন্যদিকে চলে, অথচ সত্য তার নিকট প্রকাশিত হয়ে পড়েছে, সে দলীল প্রমাণাদি দেখেছে। তথাপি সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করতঃ মুসলমানদের সরল ও পরিষ্কার পথ হতে সরে পড়েছে, সুতরাং আমিও তাকে ঐ বক্র ও খারাপ পথেই ফিরিয়ে দেব। ঐ খারাপ পথই তখন তার নিকট ভাল বলে মনে হবে, অতঃপর সে জাহান্নামে গিয়ে পৌছে যাবে।

মুসলমানদের পথ ছেড়ে দিয়ে অন্য পথ অনুসন্ধান করাই হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করা। কিন্তু কখনও হয় তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্পষ্ট কথারই উল্টো হয়, আবার কখনও কখনও ঐ জিনিসের বিপরীত হয় যার উপর মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উম্মত সবাই একমত রয়েছে। তাদের দ্রতা ও নম্রতার কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ভুল হতে রক্ষা করেছেন। এ ব্যাপারে বহু হাদীসও রয়েছে এবং উসূলের হাদীসগুলোতে আমরা ওর বিরাট অংশ বর্ণনাও করেছি।

ইমাম শাফিঈ (রঃ) চিন্তা ও গবেষণার পর এ আয়াত হতেই উম্মতের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দলীল গ্রহণ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এটাই এ ব্যাপারে উত্তম ও দৃঢ়তার জিনিস। তবে অন্য কয়েকজন ইমাম এ যুক্তিকে কঠিন ও আয়াত হতে দূরে বলেছেন। মোটকথা যারা মুমিনদের পথ হতে সরে পড়ে তাদের রজ্জুকে আল্লাহ তা'আলা ঢিল দিয়ে দেন। যেমন আল্লাহ পাক অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তুমি আমাকে ও যে এ কথাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে তাকে ছেড়ে দাও, সত্বরই আমি এমনভাবে ধরবো যে, সে জানতেই পারবে না।' (৬৮:৪৪) অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন তারা বাঁকা হয়ে গেল তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরকে বক্র করে দিলেন। (৬১:৫) আর একটি আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘আমি তাদেরকে তাদের বিরুদ্ধাচরণে ছেড়ে দিচ্ছি, তন্মধ্যে তারা অন্ধভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শেষে তাদের প্রত্যাবর্তনস্থল জাহান্নামই হবে। (৬:১১০) যেমন এক জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “একত্রিত কর গোনাহগারদেরকে এবং তাদের দোসরদেরকে।” (৩৭:২২) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ ‘আগুন দেখে অত্যাচারীরা জেনে নেবে যে, তাদেরকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হতে হবে এবং তারা পলায়নের কোন স্থান পাবে না।' (১৮:৫৩)।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।