আল কুরআন


সূরা মুহাম্মাদ (আয়াত: 37)

সূরা মুহাম্মাদ (আয়াত: 37)



হরকত ছাড়া:

إن يسألكموها فيحفكم تبخلوا ويخرج أضغانكم ﴿٣٧﴾




হরকত সহ:

اِنْ یَّسْـَٔلْکُمُوْهَا فَیُحْفِکُمْ تَبْخَلُوْا وَ یُخْرِجْ اَضْغَانَکُمْ ﴿۳۷﴾




উচ্চারণ: ইয়ঁইয়াছআলকুমূহা-ফাইউহফিকুম তাবখালূওয়া ইউখরিজ আদগা-নাকুম।




আল বায়ান: যদি তিনি তোমাদের নিকট তা চান, অতঃপর তিনি তোমাদের ওপর প্রবল চাপ দেন, তাহলে তো তোমরা কার্পণ্য করবে। আর তিনি তোমাদের গোপন বিদ্বেষসমূহ বের করে দেবেন।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৭. তোমাদের কাছ থেকে তিনি তা চাইলে ও তার জন্য তোমাদের উপর চাপ দিলে তোমরা তো কার্পণ্য করবে এবং তখন তিনি তোমাদের বিদ্বেষভাব প্ৰকাশ করে দেবেন।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: তিনি যদি তোমাদের কাছে তা চাইতেন আর সেজন্য চাপ দিতেন তাহলে তোমরা কৃপণতা করতে আর তাতে তিনি তোমাদের বিদ্বেষভাব প্রকাশ করে দিতেন।




আহসানুল বায়ান: (৩৭) তোমাদের নিকট হতে তিনি তা চাইলে ও তার জন্যে তোমাদের উপর চাপ দিলে তোমরা তো কার্পণ্য করবে এবং তিনি তোমাদের বিদ্বেষভাব প্রকাশ করে দেবেন। [1]



মুজিবুর রহমান: তোমাদের নিকট হতে তিনি তা চাইলে এবং তজ্জন্য তোমাদের উপর চাপ দিলে তোমরাতো কার্পন্য করবে, এবং তিনি তোমাদের মনের সংকীর্ণতা প্রকাশ করে দিবেন।



ফযলুর রহমান: তিনি যদি তোমাদের কাছে তা চান এবং তোমাদেরকে (সেজন্য) চাপ দেন তাহলে তোমরা কার্পণ্য করবে এবং তিনি (তখন) তোমাদের মনের বক্রতা প্রকাশ করে দেবেন।



মুহিউদ্দিন খান: তিনি তোমাদের কাছে ধন-সম্পদ চাইলে অতঃপর তোমাদেরকে অতিষ্ঠ করলে তোমরা কার্পণ্য করবে এবং তিনি তোমাদের মনের সংকীর্ণতা প্রকাশ করে দেবেন।



জহুরুল হক: যদি তিনি তোমাদের কাছ থেকে তা চাইতেন এবং তোমাদের চাপ দিতেন, তাহলে তোমরা কার্পণ্য করবে, আর তিনি প্রকাশ করে দিচ্ছেন তোমাদের বিদ্বেষ।



Sahih International: If He should ask you for them and press you, you would withhold, and He would expose your unwillingness.



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৩৭. তোমাদের কাছ থেকে তিনি তা চাইলে ও তার জন্য তোমাদের উপর চাপ দিলে তোমরা তো কার্পণ্য করবে এবং তখন তিনি তোমাদের বিদ্বেষভাব প্ৰকাশ করে দেবেন।(১)


তাফসীর:

(১) আয়াতের সারমর্ম এই যে, যদি আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের কাছে সমস্ত ধন-সম্পদ চাইতেন, তবে তোমরা কার্পণ্য করতে। কৃপণতার কারণে যে অপ্রিয়ভাব তোমাদের অন্তরে থাকত, তা অবশ্যই প্রকাশ হয়ে পড়ত। তাই তিনি তোমাদের ধন-সম্পদের মধ্য থেকে সামান্য একটি অংশ তোমাদের উপর ফরয করেছেন। কিন্তু তোমরা তাতেও কৃপণতা শুরু করেছ। [ফাতহুল কাদীর, মুয়াস্‌সার]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৩৭) তোমাদের নিকট হতে তিনি তা চাইলে ও তার জন্যে তোমাদের উপর চাপ দিলে তোমরা তো কার্পণ্য করবে এবং তিনি তোমাদের বিদ্বেষভাব প্রকাশ করে দেবেন। [1]


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, যদি তোমাদের প্রয়োজনের অধিক অবশিষ্ট সমস্ত ধন-সম্পদ চাইতেন, তাও আবার বারবার তাকীদের সাথে ও জোর দিয়ে, তাহলে এটাই মানুষের স্বভাব যে, তোমরা কার্পণ্য করবে এবং ইসলামের বিরুদ্ধে নিজেদের বিদ্বেষ ও শত্রুতা প্রকাশ করবে। অর্থাৎ, এই পরিস্থিতিতে স্বয়ং ইসলামের বিরুদ্ধে তোমাদের মনে এই শত্রুতার জন্ম নিত যে, এমন ধর্ম কোন ভাল ধর্ম নয়, যে আমাদের পরিশ্রমের সমস্ত উপার্জন নিজের মধ্যেই গুটিয়ে নেয়।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৩৬-৩৮ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



মহান স্রষ্টা আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা করে মানুষকে তার প্রতি নিরুৎসাহিত করে বলেন : দুনিয়ার জীবন তো একটি ধোঁকা ও প্রতারণা মাত্র। এ জীবনের কোন ভিত্তি নেই। মানুষ সম্পদ, সন্তান, দুনিয়ার চাকচিক্য, নারী, ভোজন বিলাসিতা, চোখ জোড়ানো অট্টালিকা ইত্যাদি নিয়ে মত্ত ও তার ভালবাসায় নিমগ্ন। আর এমন কাজ-কর্মে লিপ্ত হওয়া কোন উপকারে আসে না বরং আল্লাহ তা‘আলা থেকে গাফেল করে রাখে। এমনিভাবে তার জীবনের আয়ূ শেষ হয়ে যায়, মৃত্যু চলে আসে কিন্তু তাকে দুনিয়াতে প্রেরণ করার লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের কিছুই করেনি। ফলে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে শামিল। যেমন আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন : ‏ “তোমরা জেনে রেখ, দুনিয়ার জীবন তো খেল-তামাশা, জাঁকজমক, পারস্পরিক অহঙ্কার প্রকাশ, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ব্যতীত আর কিছুই নয়; এর উপমা বৃষ্টি, যার দ্বারা উৎপন্ন শস্য-সম্ভার কৃষকদেরকে চমৎকৃত করে, অতঃপর ওটা শুকিয়ে যায়, ফলে তুমি ওটা হলুদ বর্ণ দেখতে পাও, অবশেষে তা খড় কুটোয় পরিণত হয়। আখিরাতে রয়েছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। দুনিয়ার জীবন ছলনাময় ধোঁকা ব্যতীত কিছুই নয়।” (সূরা হাদীদ ৫৭ : ২০)



(وَإِنْ تُؤْمِنُوا وَتَتَّقُوا)



‘যদি তোমরা ঈমান আন এবং তাকওয়ার জীবন যাপন কর’ তাহলে আল্লাহ তা‘আলা আমলের প্রতিদান দেবেন।



ঈমান ও তাকওয়ার ফযীলত সম্পর্কে অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(یٰٓاَیُّھَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللہَ وَاٰمِنُوْا بِرَسُوْلِھ۪ یُؤْتِکُمْ کِفْلَیْنِ مِنْ رَّحْمَتِھ۪ وَیَجْعَلْ لَّکُمْ نُوْرًا تَمْشُوْنَ بِھ۪ وَیَغْفِرْ لَکُمْﺚ وَاللہُ غَفُوْرٌ رَّحِیْمٌ)‏



“হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন, তিনি তাঁর অনুগ্রহে তোমাদেরকে দ্বিগুণ পুরস্কার দেবেন এবং তিনি তোমাদেরকে দেবেন আলো, যার সাহায্যে তোমরা চলবে এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা হাদীদ ৫৭ : ২৮)



(وَلَا يَسْأَلْكُمْ أَمْوَالَكُمْ)



‘আর তিনি তোমাদের কাছ থেকে তোমাদের ধন-সম্পদ চাইবেন না’ অর্থাৎ তিনি তোমাদের ধন-সম্পদের মুখাপেক্ষী নন। আর এ জন্যই তিনি তোমাদের নিকট সমস্ত সম্পদ চাননি। বরং তা থেকে অতি সামান্যতম অংশ চান। আবার তাও এক বছর পূর্ণ হবার পর প্রয়োজনের অতিরিক্ত হলে। তার প্রতিদানও তোমাদেরকে দেবেন। যদি তোমাদের প্রয়োজনের অধিক অবশিষ্ট সমস্ত সম্পদ চাইতেন তাহলে তোমরা কার্পণ্য করতে এবং ইসলামের বিরুদ্ধে নিজেদের বিদ্বেষ ও শত্র“তা প্রকাশ করতে।



(تُدْعَوْنَ لِتُنْفِقُوْا فِيْ سَبِيْلِ اللّٰهِ)



‘তোমাদেরকে বলা হচ্ছে যে, আল্লাহর পথে মাল খরচ কর’ অর্থাৎ যখন যাকাত হিসেবে আল্লাহ তা‘আলার পথে ব্যয় করতে বলা হয় তখন একশ্রেণির লোকেরা কার্পণ্য করে। যারা কার্পণ্য করে তারা মূলত নিজেদেরকে পূণ্য থেকে বঞ্চিত করল। আল্লাহ তা‘আলা ব্যয়ের প্রতি উৎসাহ প্রদান করার অর্থ এই নয় যে, তিনি তোমাদের সম্পদের মুখাপেক্ষী। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন কারণ-



১. তোমাদের আত্মা ও সম্পদকে পবিত্র করার জন্য।

২. অভাবীদের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য।

৩. তোমরা যাতে শত্র“দের ওপর বিজয়ী ও উন্নত থাক।



(وَإِنْ تَتَوَلَّوْا يَسْتَبْدِلْ قَوْمًا)



‘যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে রাখ তাহলে আল্লাহ তোমাদের বদলে অন্য কাওমকে নিয়ে আসবেন’ আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : একদা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন। সাহাবীরা বলল : হে আল্লাহ তা‘আলার রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমরা ঈমান থেকে বিমুখ হলে যে অন্য জাতিকে নিয়ে আসা হবে তারা কারা যারা আমাদের মত হবে না? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সালমান ফারসীর কাঁধে হাত মেরে বললেন : তারা হল এ (সালমান) ও তাঁর সম্প্রদায় যদি দীন সুরাইয়া নামক তারকাতেও থাকে তাহলে ফারসীর ঐসব লোকেরা তা নিয়ে আসবে। অন্য বর্ণনাতে রয়েছে ঐ সকল লোকেরা নিয়ে আসবে। (তিরমিযী হা. ৩২৬১, সহীহ)



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. দুনিয়ার জীবন হল অস্থায়ী, তাই তার পিছনে মত্ত হয়ে আখিরাতকে ভুলে যাওয়া যাবে না।

২. সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কার্পণ্য করা হারাম।

৩. যাকাত না দেয়ার পরিণাম নিজের ওপরেই বর্তাবে।

৪. সালমান ফারসী (রাঃ)-এর ফযীলত জানতে পারলাম।

৫. আল্লাহর প্রতি ঈমান ও তাকওয়া অবলম্বন করলে আল্লাহ উপযুক্ত প্রতিদান দেবেন।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৩৬-৩৮ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ার তুচ্ছতা, হীনতা ও স্বল্পতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন যে, পার্থিব জীবন ক্রীড়া-কৌতুক ও খেল-তামাশা ছাড়া কিছুই নয়, তবে যে কাজ আল্লাহর জন্যে করা হয় তা-ই শুধু বাকী থাকে।

আল্লাহ তা'আলা যে বান্দার মোটেই মুখাপেক্ষী নন তার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেনঃ তোমাদের ভাল কর্মের সুফল তোমরাই লাভ করবে, তিনি তোমাদের ধন-মালের প্রত্যাশী নন। তিনি তোমাদের উপর যাকাত ফরয করেছেন এই কারণে যে, যাতে ওর মাধ্যমে গরীব-দুঃখীরা লালিত-পালিত হতে পারে। আর এর মাধ্যমে তোমরাও যাতে পরকালের পুণ্য সঞ্চয় করতে পার।

এরপর মহান আল্লাহ মানুষের কার্পণ্য এবং কার্পণ্যের পর অন্তরের হিংসা প্রকাশিত হওয়ার অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ ধন-সম্পদ বের করার ব্যাপারে এটা তো হয়েই থাকে যে, ওটা মানুষের নিকট খুবই প্রিয় হয় এবং তা বের করতে তার কাছে খুবই কঠিন ঠেকে।

অতঃপর কৃপণদের কার্পণ্যের কুফল বর্ণনা করা হচ্ছে যে, আল্লাহর পথে ধন-সম্পদ খরচ করা হতে বিরত থাকলে প্রকৃতপক্ষে নিজেরই ক্ষতি সাধন করা হয়। কেননা, যারা আল্লাহর পথে ব্যয় করতে কার্পণ্য করে, এই কৃপণতার শাস্তি তাদেরকেই ভোগ করতে হবে। আর দান-খয়রাতের ফযীলত এবং ওর পুরস্কার হতেও তারা বঞ্চিত থাকবে। আল্লাহ তা'আলা সম্পূর্ণরূপে অভাবমুক্ত এবং মানুষ অভাবগ্রস্ত আর তারা তাঁর চরম মুখাপেক্ষী। অভাবমুক্ত ও অমুখাপেক্ষী হওয়া আল্লাহ তা'আলার অপরিহার্য গুণ এবং অভাবগ্রস্ত ও মুখাপেক্ষী হওয়া মাখলুক বা সৃষ্টজীবের অপরিহার্য গুণ। ঐ গুণ আল্লাহ তা'আলা হতে কখনো পৃথক হবে না এবং এই গুণ মাখলূক হতে কখনো পৃথক হবে না।

মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ তোমরা যদি শরীয়ত মেনে চলতে অস্বীকার কর তবে আল্লাহ তা'আলা তোমাদের স্থলে অন্য জাতিকে আনয়ন করবেন, যারা তোমাদের মত (অবাধ্য) হবে না। তারা শরীয়তকে পূর্ণভাবে মেনে চলবে।

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা (আরবী) -এই আয়াতটি পাঠ করেন, তখন সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যাদেরকে আমাদের স্থলবর্তী করা হতো তারা কোন জাতি হতো?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সালমান ফারেসীর (রাঃ) স্কন্ধে হস্ত রেখে বলেনঃ “এ ব্যক্তি এবং এর কওম। দ্বীন যদি সুরাইয়ার (সপ্তর্ষিমণ্ডলস্থ নক্ষত্রের) নিকটেও থাকতো তবুও পারস্যের লোকেরা ওটা নিয়ে আসতো।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) ও ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন খালিদ যনজী নামক এর একজন বর্ণনাকারীর ব্যাপারে কোন কোন ইমাম কিছু সমালোচনা করেছেন)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।