আল কুরআন


সূরা হা-মীম আস-সাজদা (ফুসসিলাত) (আয়াত: 49)

সূরা হা-মীম আস-সাজদা (ফুসসিলাত) (আয়াত: 49)



হরকত ছাড়া:

لا يسأم الإنسان من دعاء الخير وإن مسه الشر فيئوس قنوط ﴿٤٩﴾




হরকত সহ:

لَا یَسْـَٔمُ الْاِنْسَانُ مِنْ دُعَآءِ الْخَیْرِ ۫ وَ اِنْ مَّسَّهُ الشَّرُّ فَیَـُٔوْسٌ قَنُوْطٌ ﴿۴۹﴾




উচ্চারণ: লা-ইয়াছআমুল ইনছা-নুমিন দু‘আইল খাইরি ওয়াইম মাছছাহুশ শাররু ফাইয়াঊছুন কানূত।




আল বায়ান: কল্যাণ প্রার্থনায় মানুষ বিরক্ত হয় না; আর যদি অকল্যাণ তাকে স্পর্শ করে তাহলে সে নিরাশ ও হতাশ হয়ে পড়ে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪৯. মানুষ কল্যাণ প্রার্থনায় কোন ক্লান্তি বোধ করে না, কিন্তু যখন তাকে অকল্যাণ স্পর্শ করে তখন সে প্রচণ্ডভাবে হতাশ ও নিরাশ হয়ে পড়ে;




তাইসীরুল ক্বুরআন: মানুষ নিজের কল্যাণ কামনায় দু‘আ প্রার্থনা করতে ক্লান্ত হয় না, আর মন্দ যখন তাকে স্পর্শ করে, তখন সে নৈরাশ্যে ডুবে যায়।




আহসানুল বায়ান: (৪৯) মানুষ কল্যাণ প্রার্থনায় কোন ক্লান্তি বোধ করে না।[1] কিন্তু যখন তাকে দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করে, তখন সে সম্পূর্ণরূপে নিরাশ হয়ে পড়ে। [2]



মুজিবুর রহমান: মানুষ ধন-সম্পদ প্রার্থনায় কোন ক্লান্তি বোধ করেনা, কিন্তু যখন তাকে দুঃখ দৈন্য স্পর্শ করে তখন সে অত্যন্ত নিরাশ ও হতাশ হয়ে পড়ে।



ফযলুর রহমান: মঙ্গল (সুখ-শান্তি) চাওয়ায় মানুষ ক্লান্ত হয় না; কিন্ত যদি তাকে অমঙ্গল (দুঃখ-কষ্ট) স্পর্শ করে তাহলেই সে একেবারে নিরাশ হয়ে পড়ে।



মুহিউদ্দিন খান: মানুষ উন্নতি কামনায় ক্লান্ত হয় না; যদি তাকে অমঙ্গল স্পর্শ করে, তবে সে সম্পূর্ণ রূপে নিরাশ হয়ে পড়ে।



জহুরুল হক: মানুষ ভালর জন্যে প্রার্থনায় ক্লান্তি বোধ করে না, কিন্ত যদি দুঃখকষ্ট তাকে স্পর্শ করে সে তখন ধৈর্যহারা হয়ে যায়।



Sahih International: Man is not weary of supplication for good [things], but if evil touches him, he is hopeless and despairing.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৪৯. মানুষ কল্যাণ প্রার্থনায় কোন ক্লান্তি বোধ করে না, কিন্তু যখন তাকে অকল্যাণ স্পর্শ করে তখন সে প্রচণ্ডভাবে হতাশ ও নিরাশ হয়ে পড়ে;


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৪৯) মানুষ কল্যাণ প্রার্থনায় কোন ক্লান্তি বোধ করে না।[1] কিন্তু যখন তাকে দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করে, তখন সে সম্পূর্ণরূপে নিরাশ হয়ে পড়ে। [2]


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, দুনিয়ার ধন-সম্পদ ও আসবাব-পত্র, সুস্থতা ও শক্তি, সম্মান ও মর্যাদা এবং অন্যান্য পার্থিব নিয়ামত চাইতে মানুষ ক্লান্ত ও বিরক্ত হয় না; বরং অবিরাম চাইতেই থাকে। এখানে ‘মানুষ’ বলতে অধিকাংশ মানুষ উদ্দেশ্য।

[2] অর্থাৎ, কষ্ট পৌঁছলেই, নিরাশ হয়ে পড়ে। অথচ, আল্লাহর খাঁটি বান্দার অবস্থা এর বিপরীত হয়। এরা প্রথমতঃ পার্থিব জীবনের সুখ-সামগ্রী চায় না; বরং সর্বদা তারা আখেরাতের চিন্তা-ভাবনাই করে থাকে। দ্বিতীয়তঃ কষ্ট পৌঁছবার পরও তারা আল্লাহর রহমত এবং তাঁর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়ে পড়ে না। বরং পরীক্ষাকেও গোনাহর প্রায়শ্চিত্ত এবং মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ মনে করে থাকে। এই জন্য, নৈরাশ্য তাদের নিকটেও পৌঁছতে পারে না।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৪৯-৫১ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



এখানে আল্লাহ তা‘আলা মানুষের একটি মন্দ অভ্যাসের কথা আলোচনা করেছেন। মানুষ প্রাচুর্যের লালসায় মোহিত। তার যত সম্পদ, সন্তান, ক্ষমতা ও সম্মান থাকে সে আরো বেশি কামনা করে। একটি বাড়ি থাকলে চায় আরেকটি বাড়ি যদি থাকত! এরূপ কামনা করতেই থাকে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : আদম সন্তানের একটি স্বর্ণের পাহাড় থাকলে সে পছন্দ করে তার যদি দু’টি স্বর্ণের পাহাড় থাকত। (সহীহ বুখারী হা. ৬৪৩৯) সে কথাই আল্লাহ তা‘আলা এখানে বলছেন- মানুষ তার জন্য সম্পদ, ক্ষমতা, রাজত্ব ও সম্মান চাইতে বিরক্ত বোধ করে না। কিন্তু যখন কোন আপদ-বিপদ যেমন অসুস্থতা, দরিদ্রতা ইত্যাদি দ্বারা আক্রান্ত হয় তখন আল্লাহ তা‘আলার রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যায়, মনে করে এ বিপদে সে ধ্বংস হয়ে যাবে। তবে যারা মু’মিন তারা নয়, কারণ তাদেরকে কোন বিপদ আক্রান্ত করলে ধৈর্য ধারণ করে এটা তাদের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য।



তারপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(وَلَئِنْ أَذَقْنٰهُ رَحْمَةً)



অর্থাৎ যে ব্যক্তি ধন-সম্পদ চাইতে বিরক্ত হয় না তাকে যদি বিপদাপদ আক্রান্ত করে, আর আল্লাহ তা‘আলা সে বিপদ থেকে মুক্তি দান করেন তাহলে সে শুকরিয়া আদায় করে না, বরং সে বাড়াবাড়ি করে ও বড়ত্ব্ প্রকাশ করে বলে- আমি এটার হকদার বলেই আমাকে তা দেয়া হয়েছে।



মুজাহিদ বলেন :



(لَيَقُوْلَنَّ هٰذَا لِيْ)



‘সে বলেই থাকে : এটা আমার প্রাপ্য’ মানুষ বিপদাপদে আক্রান্ত হওয়ার পর আল্লাহ তা‘আলা তা থেকে মুক্তি দিলে সে বলে এটা আমার কর্মের ফল ও আমি এর হকদার। মূলত এটা আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামতকে অস্বীকার করা। ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) বলেন : শুকরিয়ার মূল হল- নেয়ামত দানকারীকে বিনয়-নম্রতা ও মহব্বতের সাথে স্মরণ করা ও নেয়ামতকে স্বীকার করা। যে ব্যক্তি নেয়ামতকে চিনতে পারল না সে শুকরিয়া আদায় করতে পারবে না। আর যে নেয়ামতকে চিনল কিন্তু যিনি নেয়ামত দান করেছেন তাঁকে চিনল না সে ব্যক্তিও নেয়ামতের যথার্থ শুকরিয়া আদায় করতে সক্ষম হয় না। নেয়ামত ও নেয়ামত দানকারীকে চেনার পর অস্বীকার করলে নেয়ামতের সাথে কুফরী করা হয়। যে ব্যক্তি নেয়ামতকে চিনল এবং যিনি নেয়ামত দান করেছেন তাকেও চিনল অস্বীকারও করল না কিন্তু তার প্রতি বিনয়ী ও সন্তুষ্টি প্রকাশ করল না এবং তা ভালবাসল না সেও নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করল না। সুতরাং যে ব্যক্তি নেয়ামত চিনল, নেয়ামত দানকারীকে চিনল এবং তা স্বীকার করল এবং তার প্রতি বিনয়ী হল সে ব্যক্তিই নেয়ামতের যথার্থ শুকরিয়া আদায় করতে পারবে। (মাদারিজুস সালিকীন ২ : ১৩৫-১৪৪) যেমন বানী ইসরাঈলের তিন ব্যক্তি, একজনের কুষ্ট রোগ ছিল, আরেকজনের মাথায় টাক ছিল, অন্য জন অন্ধ ছিল।



আল্লাহ তা‘আলার রহমতে তিনজন আরোগ্য লাভ করে। প্রথম দুজন নেয়ামত অস্বীকার করে, ফলে তাদের নেয়ামত ছিনিয়ে নেয়া হয়, তৃতীয়জন স্বীকার করে ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাকে প্রদত্ত নেয়ামত বহাল রাখেন। (সহীহ বুখারী হা. ৩৪৬৪)



(وَمَآ أَظُنُّ السَّاعَةَ قَا۬ئِمَةً)



‘আমি মনে করি না যে, কিয়ামত সংঘটিত হবে’ অর্থাৎ সে পুনরুত্থানকে অস্বীকার করে।



(وَّلَئِنْ رُّجِعْتُ إِلٰي رَبِّيْٓ...)



অর্থাৎ ‘যদি কিয়ামত হয়ই তাহলে আমি আল্লাহ তা‘আলার কাছে ফিরে যাব এমন অবস্থায় যে, তার কাছে আমার উত্তম প্রতিদান রয়েছে।’ যেমন আমার দুনিয়াতে অনেক সম্পদ ছিল, আখিরাতেও আমার জন্য এরূপ থাকবে। এটা আল্লাহ তা‘আলার প্রতি বানিয়ে কথা বলা এবং তাঁর সাথে স্পর্ধা দেখানো। আল্লাহ তা‘আলা তাকে ধমক দিয়ে পরের কথাগুলো বলেছেন।



(فَذُوْ دُعَا۬ءٍ عَرِيْضٍ)



‘দীর্ঘ প্রার্থনায় রত হয়ে যায়’ অর্থাৎ বেশি বেশি দু’আ করতে থাকে। কারণ সে বিপদে ধৈর্য ধারণ করতে পারে না এবং সাচ্ছন্দ্যের সময় শুকরিয়া আদায় করতে পারে না। তবে আল্লাহ তা‘আলা যাকে রহমত ও অনুগ্রহ করেছেন সে ব্যতীত। এ সম্পর্কে পূর্বে সূরা ইউনুস-এর ১২ নম্বর আয়াত, সূরা আল কাহ্ফ-এর ৩৬ নম্বর আয়াতসহ অন্যান্য স্থানেও আলোচনা করা হয়েছে।



সুতরাং আল্লাহ তা‘আলার প্রত্যেক নেয়ামতের যথাযথ শুকরিয়া আদায় করা প্রতিটি মু’মিন-মুসলিমের একান্ত কর্তব্য। আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামত পাওয়ার শুকরিয়া আদায় না করা নেয়ামতকে অস্বীকার করার শামিল। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে তাঁর নেয়ামত চিনে যথাযথ শুকরিয়া আদায় করার তাওফীক দান করুন। (আমীন)



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. বিপদে-আপদে, সুখে-দুঃখে সর্বদা আল্লাহ তা‘আলাকে ডাকতে হবে এবং তাঁরই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে। বিপদে পড়ে আল্লাহ তা‘আলাকে ডাকব আর সুখের সময় তাঁর সাথে কুফরী করব এমনটি করা যাবে না।

২. বিপদে পড়ে নিরাশ হওয়া যাবে না এবং সুখে অতি আনন্দিতও হওয়া যাবে না।

৩. প্রত্যেক নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা আবশ্যক।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৪৯-৫১ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ্ তা'আলা বলেন যে, মালধন, স্বাস্থ্য ইত্যাদি কল্যাণের প্রার্থনা হতে মানুষ ক্লান্ত হয় না। কিন্তু যদি তার উপর বিপদ-আপদ এসে পড়ে তখন সে এতো বেশী হতাশ ও নিরাশ হয়ে পড়ে যে, যেন আর কখনো সে কোন কল্যাণের মুখ দেখতেই পাবে না। আবার যদি কোন বিপদ ও কাঠিন্যের পর সে কোন কল্যাণ ও সুখ লাভ করে তখন সে বলে বসেঃ “আল্লাহ তা'আলার উপর তো আমার এটা হক বা প্রাপ্যই ছিল। আমি এর যোগ্যই ছিলাম। এখন সে এই নিয়ামত লাভ করে ফুলে উঠে এবং ধরাকে সরা জ্ঞান করে বসে। মহান আল্লাহকে বিস্মরণ হয়ে যায় এবং পরিষ্কারভাবে তাকে অস্বীকার করে ফেলে। কিয়ামতের সংঘটনকে স্পষ্টভাবে অবিশ্বাস করে বসে। ধন-দৌলত এবং আরাম ও আয়েশ তার কুফরীর কারণ হয়ে দাড়ায়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “বস্তুতঃ মানুষ তো সীমালংঘন করেই থাকে, কারণ সে নিজেকে অভাব মুক্ত মনে করে।”(৯৬:৬-৭) তাই সে মস্তক উঁচু করে হঠকারিতা করতে শুরু করে দেয়।

মহান আল্লাহ বলেন যে, শুধু এটুকুই নয়, বরং এই দুষ্কর্যের উপর সে ভাল আশাও রাখে এবং বলেঃ যদি কিয়ামত সংঘটিত হয়েও যায় এবং আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রত্যাবর্তিতও হই, তবে যেমন আমি এখানে সুখ-স্বচ্ছন্দে রয়েছি, অনুরূপভাবে সেখানেও অর্থাৎ পরকালেও সুখেই থাকবো। মোটকথা, সে কিয়ামতকে অস্বীকারও করে, মৃত্যুর পর পুনজীবনকে মানেও না, আবার বড় বড় আশাও পোষণ করে যে, দুনিয়ায় যেমন সুখে রয়েছে, আখিরাতেও তেমনি সুখেই থাকবে।

যাদের আমল ও বিশ্বাস এইরূপ তাদেরকে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ভয় প্রদর্শন করে বলেনঃ “আমি এই কাফিরদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে অবশ্যই অবহিত করবো এবং তাদেরকে আস্বাদন করাবো কঠোর শাস্তি।

মহামহিমান্বিত আল্লাহ মানুষের স্বভাব ও আচরণের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ ‘যখন আমি মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করি তখন (গর্বভরে) মুখ ফিরিয়ে নেয় ও দূরে সরে যায়। আর যখন তাকে অনিষ্ট স্পর্শ করে তখন সে দীর্ঘ প্রার্থনায় রত হয়। (আরবী) ওকেই বলা হয় যার শব্দ বেশী এবং অর্থ কম হয়। আর যে কালাম বা কথা এর বিপরীত হয় অর্থাৎ শব্দ কম ও অর্থ বেশী, ওকে (আরবী) বলা হয়ে থাকে। এই বিষয়টিই অন্য জায়গায় নিম্নরূপে বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “মানুষকে যখন কষ্ট ও বিপদ স্পর্শ করে তখন সে শুয়ে, বসে এবং দাড়িয়ে আমাকে আহ্বান করে থাকে, অতঃপর যখন আমি ঐ কষ্ট ও বিপদ দূরীভূত করি তখন সে এমন বেপরোয়া ভাব দেখিয়ে ফিরে যায় যে, যেন সে বিপদের সময় আমাকে আহ্বান করেইনি।” (১০:১২)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।