সূরা গাফির (আল মু‘মিন) (আয়াত: 4)
হরকত ছাড়া:
ما يجادل في آيات الله إلا الذين كفروا فلا يغررك تقلبهم في البلاد ﴿٤﴾
হরকত সহ:
مَا یُجَادِلُ فِیْۤ اٰیٰتِ اللّٰهِ اِلَّا الَّذِیْنَ کَفَرُوْا فَلَا یَغْرُرْکَ تَقَلُّبُهُمْ فِی الْبِلَادِ ﴿۴﴾
উচ্চারণ: মা-ইউজা-দিলুফীআ-য়া-তিল্লা-হি ইল্লাল্লাযীনা কাফারূফালা-ইয়াগরুরকা তাকাল্লুবুহুম ফিল বিলা-দ।
আল বায়ান: কাফিররাই কেবল আল্লাহর আয়াতসমূহ নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়। সুতরাং দেশে দেশে তাদের অবাধ বিচরণ যেন তোমাকে ধোঁকায় না ফেলে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪. আল্লাহর আয়াতসমূহে বিতর্ক কেবল তারাই করে যারা কুফরী করেছে; কাজেই দেশে দেশে তাদের অবাধ বিচরণ যেন আপনাকে ধোকায় না ফেলে।
তাইসীরুল ক্বুরআন: কাফিররা ছাড়া অন্য কেউ আল্লাহর আয়াত নিয়ে ঝগড়া করে না। কাজেই দেশে দেশে তাদের অবাধ বিচরণ তোমাকে যেন ধোঁকায় না ফেলে।
আহসানুল বায়ান: (৪) কেবল অবিশ্বাসীরাই আল্লাহর নিদর্শনসমূহ সম্বন্ধে বিতর্ক করে,[1] সুতরাং দেশে-দেশে তাদের অবাধ বিচরণ যেন তোমাকে বিভ্রান্ত না করে।[2]
মুজিবুর রহমান: শুধু কাফিরেরাই আল্লাহর নিদর্শন সম্বন্ধে বিতর্ক করে; সুতরাং দেশে দেশে তাদের অবাধ বিচরণ যেন তোমাদের বিভ্রান্ত না করে।
ফযলুর রহমান: আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে শুধু কাফেররাই বিতর্ক করে। সুতরাং জনপদসমূহে তাদের অবাধ বিচরণ যেন তোমাকে বিভ্রান্ত না করে।
মুহিউদ্দিন খান: কাফেররাই কেবল আল্লাহর আয়াত সম্পর্কে বিতর্ক করে। কাজেই নগরীসমূহে তাদের বিচরণ যেন আপনাকে বিভ্রান্তিতে না ফেলে।
জহুরুল হক: আল্লাহ্র নির্দেশাবলী সন্বন্ধে কেউ বচসা করে না, কেবল তারা ছাড়া যারা অবিশ্বাস করে, সুতরাং শহরে-নগরে তাদের চলাফেরা যেন তোমাকে প্রতারিত না করে।
Sahih International: No one disputes concerning the signs of Allah except those who disbelieve, so be not deceived by their [uninhibited] movement throughout the land.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৪. আল্লাহর আয়াতসমূহে বিতর্ক কেবল তারাই করে যারা কুফরী করেছে; কাজেই দেশে দেশে তাদের অবাধ বিচরণ যেন আপনাকে ধোকায় না ফেলে।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৪) কেবল অবিশ্বাসীরাই আল্লাহর নিদর্শনসমূহ সম্বন্ধে বিতর্ক করে,[1] সুতরাং দেশে-দেশে তাদের অবাধ বিচরণ যেন তোমাকে বিভ্রান্ত না করে।[2]
তাফসীর:
[1] এই বিতর্ক থেকে অবৈধ ও বাতিল বিতর্ক বুঝানো হয়েছে। যে বিতর্কের উদ্দেশ্য হয় সত্যকে মিথ্যায় পরিণত করা এবং তা খন্ডন ও ভুল প্রমাণিত করতে চেষ্টা করা। নচেৎ, যে তর্ক-বিতর্কের উদ্দেশ্য হয় সত্য স্পষ্ট করা, বাতিল খন্ডন করা এবং অস্বীকারকারী ও অভিযোগ উপস্থাপনকারীদের সংশয়-সন্দেহ নিরসন করা, সে বিতর্ক নিন্দিত নয়, বরং তা প্রশংসনীয় ও বাঞ্ছনীয় কর্ম। এমন কি উলামাগণকে এর প্রতি তাকীদ করা হয়েছে। ﴿لَتُبَيِّنُنَّهُ لِلنَّاسِ وَلا تَكْتُمُونَهُ﴾ ‘‘তোমরা তা মানুষের নিকট অবশ্যই বর্ণনা করবে এবং তা গোপন করবে না।’’ (সূরা আলে ইমরান ১৮৭ আয়াত) আল্লাহর নাযিল করা কিতাবের দলীলসমূহ ও প্রমাণাদিকে গোপন করা এত বড় অপরাধ যে, তার উপর বিশ্বজাহানের প্রতিটি জিনিস অভিসম্পাত করে। (সূরা বাক্বারাহ ১৫৯ আয়াত) তাদের সাথে সদ্ভাবে বিতর্ক কর। (সূরা নাহল ১২৫ আয়াত)
[2] অর্থাৎ, এই কাফের ও মুশরিকরা যে ব্যবসা-বাণিজ্য করে, তার জন্য যে তারা বিভিন্ন শহরে যাতায়াত করে প্রচুর লাভ অর্জন করে, কিন্তু এরা নিজেদের কুফরীর কারণে অতি সত্বর আল্লাহর কাছে ধরা খাবে। এদেরকে অবকাশ অবশ্য দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু এইভাবে বৃথা ছেড়ে দেওয়া হবে না।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৪-৬ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
আলোচ্য আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা কাফিরদের একটি মন্দ অভ্যাসের বর্ণনা দিয়ে মুসলিমদেরকে সতর্ক করে বলছেন : আল্লাহ তা‘আলার নিদর্শনাবলী প্রতিহত ও বাতিল করার জন্য একমাত্র কাফিররাই বিতর্ক করে থাকে। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(وَيُجَادِلُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا بِالْبَاطِلِ لِيُدْحِضُوْا بِهِ الْحَقَّ وَاتَّخَذُوْآ اٰيٰتِيْ وَمَآ أُنْذِرُوْا هُزُوًا)
কিন্তু কাফিররা মিথ্যা অবলম্বণে বিতণ্ডা করে সেটা দ্বারা সত্যকে ব্যর্থ করে দেবার জন্য আর তারা আমার নিদর্শনাবলী ও যার দ্বারা তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে সে সমস্তকে তারা বিদ্রূপের বিষয়রূপে গ্রহণ করে থাকে। (সূরা কাহফ ১৮ : ৫৬)।
এসব অসৎ কাজ করার উদ্দেশ্য হল তারা শয়তানের অনুসারী এবং তারা এ ব্যাপারে সঠিক জ্ঞান রাখে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يُّجَادِلُ فِي اللّٰهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَّيَتَّبِعُ كُلَّ شَيْطَانٍ مَّرِيْدٍ لا- كُتِبَ عَلَيْهِ أَنَّه۫ مَنْ تَوَلَّاهُ فَأَنَّه۫ يُضِلُّه۫ وَيَهْدِيْهِ إِلٰي عَذَابِ السَّعِيْرِ)
“মানুষের মধ্যে কতক অজ্ঞতাবশত আল্লাহ সম্বন্ধে বিতণ্ডা করে এবং অনুসরণ করে প্রত্যেক বিদ্রোহী শয়তানের, তার সম্বন্ধে এ নিয়ম করে দেয়া হয়েছে যে, যে কেউ তার সাথে বন্ধুত্ব করবে সে তাকে পথভ্রষ্ট করবে এবং তাকে পরিচালিত করবে প্রজ্জ্বলিত অগ্নির শাস্তির দিকে।” (সূরা আল হাজ্জ ২২ : ৩-৪)
(فَلَا يَغْرُرْكَ تَقَلُّبُهُمْ فِي الْبِلَادِ)
‘সুতরাং শহরগুলিতে তাদের অবাধ বিচরণ যেন তোমাকে ধোঁকায় না ফেলে’ কুরাইশরা শীতকালে ইয়ামান এবং গ্রীষ্মকালে সিরিয়ায় বাণিজ্যিক সফরে যেত। বায়তুল্লাহর সেবক হওয়ার সুবাদে সমগ্র আরবে তাদের সম্মান ও সুখ্যাতি ছিল। ফলে তারা নিরাপদে তাদের ঐশ্বর্য ও রাজনৈতিক প্রতিপত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। ইসলাম ও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিরোধিতা সত্ত্বেও তাদের এ সুখ্যাতি ও প্রভাব কায়েম থাকা তাদের জন্য গর্ব ও অহংকারের বিষয় ছিল। তারা বলত আমরা আল্লাহ তা‘আলার কাছে অপরাধী হলে এসব নেয়ামত ও ধনৈশ্বর্য ছিনিয়ে নেয়া হত। এ পরিস্থিতির কারণে কিছু সংখ্যক মুসলিমদের মাঝেও সন্দেহ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, তাই আলোচ্য আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহ তা‘আলা বিশেষ উদ্দেশ্যে তাদেরকে সাময়িক অবকাশ দিয়ে রেখেছেন। এতে ধোঁকায় পড়া যাবে না। বস্তুত তাদের সকল প্রভাব ও রাজনৈতিক কাঠামো বদর যুদ্ধের সূচনা থেকে মক্কা বিজয় পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে যায়। এ সম্পর্কে আল্লাহ অন্যত্র বলেন :
(لَا یَغُرَّنَّکَ تَقَلُّبُ الَّذِیْنَ کَفَرُوْا فِی الْبِلَادِﰓمَتَاعٌ قَلِیْلٌﺤ ثُمَّ مَاْوٰٿھُمْ جَھَنَّمُﺚ وَبِئْسَ الْمِھَادُ)
“শহরসমূহে কাফিরদের স্বাচ্ছন্দ্য চাল-চলন যেন তোমাকে প্রতারিত না করে। এসব মাত্র কয়েকদিনের সম্ভোগ; অতঃপর তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম এবং তা কতইনা নিকৃষ্ট স্থান!” (সূরা আ-লি ‘ইমরান ৩ : ১৯৬-১৯৭)
এরপর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নাবীকে সান্ত্বনা প্রদান করছেন যে, হে নাবী! লোকেরা যে তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে এ কারণে তুমি দুঃখিত ও চিন্তিত হয়ো না। এদের কাজই হলো সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা। এরা শুধু তোমাকে নয়, বরং তোমার পূর্ববর্তী সকল নাবী-রাসূলকেই মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল। ফলে তারা ধ্বংস হয়ে গেছে। অনুরূপ এরাও ধ্বংস হবে এবং এরাই হলো জাহান্নামের অধিবাসী। এদের বিরুদ্ধে তোমার রবের বিধান এমনই যে, এদের ওপর জাহান্নামের শাস্তি অবধারিত হয়ে গেছে। সুতরাং আমাদের এমন আচরণ বর্জন করা উচিত যা ঈমানের সাথে সাংঘর্ষিক।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. অমুসলিম ব্যতীত কেউই আল্লাহ তা‘আলার নিদর্শন নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করে না।
২. শয়তানের ধোঁকায় পড়ে আখিরাত হারানো থেকে সাবধান থাকতে হবে।
৩. যারা সত্যকে অস্বীকার করবে তাদের জন্যই জাহান্নাম।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৪-৬ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ সত্য প্রকাশিত হয়ে যাবার পর ওকে না মানা এবং তাতে ক্ষতি সৃষ্টি করা কাফিরদেরই কাজ। হে নবী (সঃ)! এ লোকগুলো যদি ধন-মাল ও মান-মর্যাদার অধিকারী হয়ে যায় তবে তুমি যেন প্রতারিত না হও যে, এরা যদি আল্লাহর নিকট ভাল না হতো তবে তিনি তাদেরকে এই নিয়ামতগুলো কেন দিয়ে রেখেছেন? যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা কুফরী করেছে, দেশে দেশে তাদের অবাধ বিচরণ যেন কিছুতেই তোমাকে বিভ্রান্ত না করে। এটা সামান্য ভোগ মাত্র; অতঃপর জাহান্নাম তাদের আবাস, আর ওটা কত নিকৃষ্ট বিশ্রামস্থল!” (৩:১৯৬-১৯৭) অন্য এক আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সামান্য দিন তাদেরকে আমি সুখ ভোগ করতে দিবো, অতঃপর তাদেরকে কঠিন শাস্তির দিকে আসতে বাধ্য করবো।”(৩১-২৪)
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সান্ত্বনা দিচ্ছেনঃ হে নবী (সঃ)! লোকেরা যে তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে এ কারণে তুমি দুঃখিত ও চিন্তিত হয়ো না। তোমার পূর্ববর্তী নবীদের (আঃ) অবস্থার প্রতি লক্ষ্য কর যে, তাদেরকেও তাদের কওম অবিশ্বাস করেছিল এবং তাদের প্রতি ঈমান আনয়নকারীদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। হযরত নূহ, যিনি বানী আদমের মধ্যে সর্বপ্রথম রাসল হয়ে এসেছিলেন, জনগণের মধ্যে যখন প্রথম প্রথম প্রতিমা-পূজা শুরু হয় তখন ঐ লোকগুলো তাঁকেও অবিশ্বাস করে এবং তার পরেও যতজন নবী এসেছিলেন তাদেরকেও তাদের উম্মতরা অবিশ্বাস করতে থাকে। এমনকি সবাই নিজ নিজ যামানার নবীকে বন্দী করা ও হত্যা করার ইচ্ছা করে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ তাতে সফলকামও হয় এবং নিজেদের সন্দেহ ও মিথ্যা দ্বারা সত্যকে তুচ্ছ জ্ঞান করতে চায় এবং সত্যকে ব্যর্থ করে দেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সত্যকে দুর্বল করে দেয়ার উদ্দেশ্যে বাতিলের সাহায্য করে তার উপর হতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) দায়িত্বমুক্ত হয়ে যান।” (এ হাদীসটি আবুল কাসেম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ আমি ঐ বাতিলপন্থীদেরকে পাকড়াও করলাম এবং তাদেরকে তাদের বড় পাপ ও ঘৃণ্য হঠকারিতার কারণে ধ্বংস করে দিলাম। এখন তোমরা চিন্তা করে দেখো যে, তাদের উপর আমার শাস্তি কতই না কঠোর ছিল! অর্থাৎ তাদের উপর আমার শাস্তি ছিল অত্যন্ত কঠোর ও যন্ত্রণাদায়ক।
এরপর প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ যেমনভাবে তাদের উপর তাদের জঘন্য আমলের কারণে আমার শাস্তি আপতিত হয়েছিল, তেমনিভাবে এই উম্মতের মধ্যে যারা এই শেষ নবী (সঃ)-কে অবিশ্বাস করছে, তাদের উপরও এরূপই শাস্তি আপতিত হবে। যদিও তারা পূর্ববর্তী নবীদেরকে (আঃ) সত্য বলে স্বীকার করে নেয়, কিন্তু যে পর্যন্ত তারা শেষ নবী (সঃ)-এর নবুওয়াতকে স্বীকার না করবে, পূর্ববর্তী নবীদের উপর তাদের বিশ্বাস প্রত্যাখ্যাত হবে। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ্।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।