সূরা আলে-ইমরান (আয়াত: 139)
হরকত ছাড়া:
ولا تهنوا ولا تحزنوا وأنتم الأعلون إن كنتم مؤمنين ﴿١٣٩﴾
হরকত সহ:
وَ لَا تَهِنُوْا وَ لَا تَحْزَنُوْا وَ اَنْتُمُ الْاَعْلَوْنَ اِنْ کُنْتُمْ مُّؤْمِنِیْنَ ﴿۱۳۹﴾
উচ্চারণ: ওয়ালা-তাহিনূওয়ালা-তাহযানূওয়া আনতুমুল আ‘লাওনা ইন কুনতুম মু’মিনীন।
আল বায়ান: আর তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না, আর তোমরাই বিজয়ী যদি মুমিন হয়ে থাক।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৩৯. তোমরা হীনবল হয়ো না এবং চিন্তিতও হয়ো না; তোমরাই বিজয়ী যদি তোমরা মুমিন হও।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: তোমরা হীনবল ও দুঃখিত হয়ো না, বস্তুতঃ তোমরাই জয়ী থাকবে যদি তোমরা মু’মিন হও।
আহসানুল বায়ান: (১৩৯) আর তোমরা হীনবল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না, তোমরাই হবে সর্বোপরি (বিজয়ী); যদি তোমরা বিশ্বাসী হও। [1]
মুজিবুর রহমান: আর তোমরা নিরাশ হয়োনা ও বিষন্ন হয়োনা এবং যদি তোমরা বিশ্বাসী হও তাহলে তোমরাই বিজয়ী হবে।
ফযলুর রহমান: (শত্রুর সামনে) তোমরা দুর্বল কিংবা বিষণ্ন হয়ো না। (প্রকৃত) ঈমানদার হলে তোমরাই বিজয়ী হবে।
মুহিউদ্দিন খান: আর তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না। যদি তোমরা মুমিন হও তবে, তোমরাই জয়ী হবে।
জহুরুল হক: অতএব দুর্বলচিত্ত হয়ো না ও অনুশোচনা করো না, কারণ তোমরাই হবে উচ্চপদস্থ যদি তোমরা বিশ্বাসী হও।
Sahih International: So do not weaken and do not grieve, and you will be superior if you are [true] believers.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৩৯. তোমরা হীনবল হয়ো না এবং চিন্তিতও হয়ো না; তোমরাই বিজয়ী যদি তোমরা মুমিন হও।(১)
তাফসীর:
(১) আলোচ্য আয়াতে মুসলিমদের হতাশ না হতে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। কতিপয় ক্রটি-বিচ্যুতির কারণে ওহুদের যুদ্ধে প্রথম পর্যায়ে জয়লাভ করার পর কিছুক্ষণের জন্য মুসলিমরা পরাজয় বরণ করে সত্তরজন সাহাবী শহীদ হন। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আহত হন। কিন্তু এ সবের পর আল্লাহ তা'আলা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেন এবং শত্রুরা পিছু হটে যায়। এ সাময়িক বিপর্যয়ের কারণ ছিল তিনটি। (এক) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তীরন্দাজ বাহিনীর প্রতি যে নির্দেশ জারি করেছিলেন, পারস্পরিক মতভেদের কারণে তা শেষ পর্যন্ত পালিত হয়নি।
(দুই) খোদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিহত হওয়ার সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে মুসলিমদের মনে নৈরাশ্যের সৃষ্টি হয়। ফলে সবাই ভীত ও হতোদ্যম হয়ে পড়ে। (তিন) মদীনা শহরে অবস্থান গ্রহণ করে শক্ৰদের মোকাবেলা করার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদেশ পালনে যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল, সেটাই ছিল সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মুসলিমদের এ তিনটি বিচ্যুতির কারণেই তারা সাময়িক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিলেন।
এ সাময়িক পরাজয় অবশেষে বিজয়ের রূপ ধারণ করেছিল সত্য; কিন্তু মুসলিম যোদ্ধারা আঘাতে জর্জরিত ছিলেন। মুসলিম বীরদের মৃতদেহছিল চোখের সামনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও হতভাগারা আহত করে দিয়েছিলো। সর্বত্র ঘোর বিপদ ও নৈরাশ্য ছায়া বিস্তার করেছিল। মুসলিম মুজাহিদগণ স্বীয় ক্রটি-বিচ্যুতির জন্যেও বেদনায় মুষড়ে পড়েছিলেন। সার্বিক পরিস্থিতিতে দুটি বিষয় প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছিল। (এক) অতীত ঘটনার জন্য দুঃখ ও বিষাদ। (দুই) আশঙ্কা যে, ভবিষ্যতের জন্য মুসলিমগণ যেন দুর্বল ও হতোদ্যম না হয়ে পড়ে এবং বিশ্ব-নেতৃত্বের দায়িত্বপ্রাপ্ত এ জাতি অঙ্কুরেই মনোবল হারিয়ে না ফেলে।
এ দুইটি ছিদ্রপথ বন্ধ করার জন্যে কুরআনের এ বাণীতে বলা হয় যে, ভবিষ্যতের জন্যে তোমরা দৌর্বল্য ও শৈথিল্যকে কাছে আসতে দিয়ো না এবং অতীতের জন্যেও বিমর্ষ হয়ো না। যদি তোমরা ঈমান ও বিশ্বাসের পথে সোজা হয়ে থাক এবং আল্লাহ্ তা'আলার ওয়াদার উপর ভরসা রেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য ও আল্লাহর পথে জেহাদে অনড় থাক, তবে পরিশেষে তোমরাই জয়ী হবে। উদ্দেশ্য এই যে, অতীতে যে সব ক্রটি-বিচূতি হয়ে গেছে, তার জন্য দুঃখ ও শোক প্রকাশে সময় ও শক্তি নষ্ট না করে ভবিষ্যতে সংশোধনের চিন্তা করা দরকার। ঈমান, বিশ্বাস ও রাসূলের আনুগত্য উজ্জল ভবিষ্যতের দিশারী। এগুলো হাতছাড়া হতে দিয়ো না। পরিশেষে তোমরাই জয়ী হবে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৩৯) আর তোমরা হীনবল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না, তোমরাই হবে সর্বোপরি (বিজয়ী); যদি তোমরা বিশ্বাসী হও। [1]
তাফসীর:
[1] বিগত যুদ্ধে তোমাদের যে ক্ষতি হয়েছে তার জন্য দমে যেও না এবং দুঃখও করো না। কেননা, তোমাদের মধ্যে যদি ঈমানী শক্তি বিদ্যমান থাকে, তাহলে তোমরাই হবে বিজয়ী এবং তোমরাই লাভ করবে সফলতা। এখানে মহান আল্লাহ মুসলিমদের শক্তির প্রকৃত উৎস এবং তাঁদের সফলতার মূল ভিত্তি কোথায়, সে কথা পরিষ্কার করে দিলেন। তাই তো এর পর যত যুদ্ধ হয়েছে, সেই সমূহ যুদ্ধে মুসলিমরা জয়লাভ করেছেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৩৭-১৪৩ নং আয়াতের তাফসীর:
যে সকল মু’মিন উহুদের যুদ্ধে আহত ও শাহাদাত বরণ করেছে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে সম্বোধন করে বলেন, তোমাদের পূর্বে অনেক নাবীর উম্মাত অতীত হয়ে গেছে যারা এমন বিপদাপদের সম্মুখীন হয়েছিল। কিন্তু মু’মিনদের ছিল শুভ পরিণতি আর কাফিরদের ছিল অশুভ পরিণতি। এজন্য আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীতে ভ্রমণ করার নির্দেশ দিয়েছেন যাতে মিথ্যুকদের পরিণতি দেখে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদেরকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, উহুদের দিন যা ঘটে গেছে সে জন্য মনবল হারাইও না। মূলতঃ তোমরাই বিজয়ী, তোমাদের জন্যই উত্তম পরিণতি, যদি তোমরা মু’মিন হও।
(أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا...)
এ সম্পর্কে সূরা বাকারাহর ২১৪ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
تَمَنَّوْنَ الْمَوْتَ
শত্র“দের সাথে মুখোমুখী হবার ও মৃত্যু কামনা করা নিষেধ। তবে যদি শত্র“রা মুখোমুখী হয়েই যায় তা হলে পিছপা হওয়া হারাম।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: তোমরা শত্র“দের সম্মুখীন হবার আকাক্সক্ষা করো না, আল্লাহ তা‘আলার নিকট নিরাপত্তার জন্য প্রার্থনা কর। যখন শত্র“দের সম্মুখীন হয়েই যাবে তখন ধৈর্যধারণ করবে। জেনে রেখ! জান্নাত তরবারীর ছায়াতলে। (সহীহ বুখারী হা: ২৯৬৫, ২৯৬৬)
সুতরাং মু’মিনরা মারবে এবং মরবে, হীনবল হবার কিছু নেই, কারণ তারা (কাফিররা) মারা গেলে জাহান্নামে যাবে আর মু’মিনরা মারা গেলে জান্নাতে যাবে।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. মিথ্যুকদের পরিণতি সর্বদা খারাপ হয়, তারা সফলকাম হতে পারে না।
২. কুরআনের প্রত্যেক আয়াতে হিদায়াত ও উপদেশ রয়েছে।
৩. ঈমানদারগণ দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে সফলকাম।
৪. কোন অবস্থাতেই মৃত্যু কামনা করা যাবে না, তবে এভাবে দু‘আ করা যাবে যে, হে আল্লাহ! আমার বেঁচে থাকা যদি মঙ্গল হয় তা হলে জীবিত রাখ, আর যদি মৃত্যু মঙ্গল হয় তা হলে মৃত্যু দাও।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৩৭-১৪৩ নং আয়াতের তাফসীর:
যেহেতু উহুদের যুদ্ধে সত্তরজন মুসলমান শহীদ হয়েছিলেন, তাই আল্লাহ পাক মুসলমানদেরকে সান্ত্বনা ও উৎসাহ দিয়ে বলছেনঃ “তোমাদের পূর্ববর্তী ধর্মভীরু লোকদেরকেও জান ও মালের ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজয় লাভ তাদেরই হয়েছে। তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী ঘটনাবলীর প্রতি একটু দৃষ্টিপাত করলেই তোমাদের উপর এ রহস্য উৎঘাটিত হয়ে যাবে। এ পবিত্র কুরআনের মধ্যে তোমাদের শিক্ষার জন্যে তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের বর্ণনাও রয়েছে। অর্থাৎ তোমাদের অন্তরের হিদায়াতের জন্যে এবং তোমাদেরকে ভাল-মন্দ সম্বন্ধে সজাগকারী এ কুরআন পাকই বটে। মুসলমানদেরকে ঐ ঘটনাবলী স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাদেরকে আরও বেশী সান্তনা দেয়ার জন্য বলছেন- “তোমরা এ যুদ্ধের ফলাফল দেখে মন খারাপ করো না এবং চিন্তিত হয়ে বসে পড়ো না। এ যুদ্ধে যদি তোমরা আহত হয়ে থাক এবং তোমাদের লোক শহীদ হয়ে থাকে তাতে কি হয়েছে; কেননা, এর পূর্বে তো তোমাদের শত্রুরাও আহত ও নিহত হয়েছিল। এরূপ উত্থান-পতন ততা পৃথিবীতে চলেই আসছে। হ্যা, তবে প্রকৃত কৃতকার্য ওরাই যারা পরিণামে বিজয়ী হয়, আর আমি তো তোমাদের জন্যে এ বিজয় নির্দিষ্ট করেই রেখেছি। তোমাদের কোন কোন বারে পরাজয় এবং বিশেষ করে এ উহুদ যুদ্ধের পরাজয়ের কারণ ছিল তোমাদের মধ্যকার ধৈর্যশীল ও অধৈর্যশীলদেরকে পরীক্ষা করা। আর যারা বহুদিন হতে শাহাদাত লাভের আকাংখী ছিল তাদের আকাংখা পূর্ণ করাও ছিল একটি কারণ। তারা যেন স্বীয় জান ও মাল আমার পথে ব্যয় করার সুযোগ লাভ করতে পারে। আল্লাহ তা'আলা অত্যাচারীদেরকে ভালবাসেন। না। এর আরও কারণ এই যে, ঈমানদারদের পাপ থাকলে তা মোচন হয়ে যাবে, আর পাপ না থাকলে তাদের মর্যাদা বেড়ে যাবে এবং এর দ্বারা কাফিরদেরকে ধ্বংস করারও উদ্দেশ্য রয়েছে। কেননা, তারা বিজয়ী হয়ে গর্বিত হয়ে যাবে এবং তাদের অবাধ্যতা ও অহংকার আরও বৃদ্ধি পাবে। আর এটাই তাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে এবং শেষে তারা সমূলে বিধ্বস্ত হয়ে যাবে। এসব কঠিন বিপদ-আপদ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া কেউ জান্নাত লাভ করতে পারে না। যেমন সূরা-ই-বাকারায় রয়েছে- ‘তোমরা কি এটা জান যে, তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে যেভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল সেভাবে তোমাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না এবং তোমরা জান্নাতে চলে যাবে? এটা হতে পারে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ মানুষ কি মনে করেছে যে, তারা-‘আমরা ঈমান এনেছি’ একথা বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? (২৯:২) এখানেও ঐ কথাই বলা হচ্ছে যে, যে পর্যন্ত ধৈর্যশীলদেরকে জানা না যায়, অর্থাৎ তারা পৃথিবীতে প্রকাশিত না হয় সে পর্যন্ত তারা জান্নাত লাভ করতে পারে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা এর পূর্বে তো এরূপ সুযোগেরই আকাংখা করছিলে যে, নিজেদের ধৈর্য ও দৃঢ়তা মহান আল্লাহকে প্রদর্শন করবে এবং তার পথে শাহাদাত বরণ করবে। কাজেই এস, আমি তোমাদেরকে ঐ সুযোগ প্রদান করলাম, তোমরা এখন তোমাদের দুঃসাহস ও দৃঢ়তা প্রদর্শন কর।' হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমরা শত্রুদের সম্মুখীন হওয়ার আকাঙ্খ করো না, আল্লাহ তাআলার নিকট নিরাপত্তার জন্যে প্রার্থনা কর এবং যখন যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হও তখন লৌহস্তম্ভের মত অটল ও স্থির থাক এবং জেনে রেখো যে, জান্নাত তরবারীর ছায়ার নীচে রয়েছে। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা স্বচক্ষে এ দৃশ্য দেখেছ যে, তরবারী কচ্ শব্দ করছে, বর্শা তীব্র বেগে বের হচ্ছে, তীর বর্ষিত হচ্ছে, ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে এবং এদিকে-ওদিকে মৃতদেহ পড়তে রয়েছে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।