আল কুরআন


সূরা ফাতির (আয়াত: 18)

সূরা ফাতির (আয়াত: 18)



হরকত ছাড়া:

ولا تزر وازرة وزر أخرى وإن تدع مثقلة إلى حملها لا يحمل منه شيء ولو كان ذا قربى إنما تنذر الذين يخشون ربهم بالغيب وأقاموا الصلاة ومن تزكى فإنما يتزكى لنفسه وإلى الله المصير ﴿١٨﴾




হরকত সহ:

وَ لَا تَزِرُ وَازِرَۃٌ وِّزْرَ اُخْرٰی ؕ وَ اِنْ تَدْعُ مُثْقَلَۃٌ اِلٰی حِمْلِهَا لَا یُحْمَلْ مِنْهُ شَیْءٌ وَّ لَوْ کَانَ ذَا قُرْبٰی ؕ اِنَّمَا تُنْذِرُ الَّذِیْنَ یَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَیْبِ وَ اَقَامُوا الصَّلٰوۃَ ؕ وَ مَنْ تَزَکّٰی فَاِنَّمَا یَتَزَکّٰی لِنَفْسِهٖ ؕ وَ اِلَی اللّٰهِ الْمَصِیْرُ ﴿۱۸﴾




উচ্চারণ: ওয়ালা-তাযিরু ওয়া-যিরাতুওঁবিযরা উখরা- ওয়া ইন তাদ‘উ মুছকালাতুন ইলাহিম লিহা-লা-ইউহমাল মিনহু শাইয়ুওঁ ওয়ালাও কা-না যা-কুরবা- ইন্নামাতুনযিরুল্লাযীনা ইয়াখশাওনা রাব্বাহুম বিলগাইবি ওয়া আকামুসসালা-তা ওয়া মান তাযাক্কা-ফাইন্নামা-ইয়াতাযাক্কা-লিনাফছিহী ওয়া ইলাল্লা-হিল মাসীর।




আল বায়ান: আর কোন বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না এবং কোন ভারাক্রান্ত ব্যক্তি যদি তার বোঝা বহনের জন্য কাউকে ডাকে তবে তার বোঝার কোন অংশই বহন করা হবে না যদিও সে আত্মীয় হয়; তুমি কেবল তাদেরকেই সতর্ক করবে যারা তাদের রবকে না দেখেও ভয় করে এবং সালাত কায়েম করে; আর যে ব্যক্তি পরিশুদ্ধি অর্জন করে সে নিজের জন্যই পরিশুদ্ধি অর্জন করে। আর আল্লাহর কাছেই প্রত্যাবর্তন।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৮. আর কোন বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না(১); এবং কোন ভারাক্রান্ত ব্যক্তি যদি কাউকেও তা বহন করতে ডাকে তবে তার থেকে কিছুই বহন করা হবে না—এমনকি নিকট আত্মীয় হলেও।(২) আপনি শুধু তাদেরকেই সতর্ক করতে পারেন যারা তাদের রবকে না দেখে ভয় করে এবং সালাত কায়েম করে। আর যে কেউ নিজেকে পরিশোধন করে, সে তো পরিশোধন করে নিজেরই কল্যাণের জন্য। আর আল্লাহরই দিকে প্রত্যাবর্তন।




তাইসীরুল ক্বুরআন: কোন বহনকারী অন্যের (পাপের) বোঝা বইবে না। কেউ যদি তার গুরুভার বয়ে দেয়ার জন্য অন্যকে ডাকে তবে তার কিছুই বয়ে দেয়া হবে না- নিকটাত্মীয় হলেও। তুমি কেবল তাদেরকেই সতর্ক করতে পার, যারা না দেখেই তাদের প্রতিপালককে ভয় করে আর নামায প্রতিষ্ঠা করে। যে কেউ নিজেকে পরিশুদ্ধ করে সে তো পরিশুদ্ধ করে নিজের কল্যাণেই। আল্লাহর দিকেই (সকলের) প্রত্যাবর্তন।




আহসানুল বায়ান: (১৮) কোন বহনকারী অপরের বোঝা বহন করবে না; [1] কারও পাপের বোঝা গুরুভার হলে সে যদি অন্যকে তা বহন করতে আহবান করে, তবুও কেউ তা বহন করবে না; যদিও সে নিকট আত্মীয় হয়।[2] তুমি কেবল তাদেরকেই সতর্ক করতে পার, যারা তাদের প্রতিপালককে না দেখে ভয় করে এবং যথাযথভাবে নামায পড়ে।[3] যে কেউ পরিশুদ্ধ হয়, সে তো পরিশুদ্ধ হয় নিজেরই কল্যাণের জন্য। [4] আর প্রত্যাবর্তন আল্লাহরই নিকট।



মুজিবুর রহমান: কোন বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবেনা, কোন ভারাক্রান্ত ব্যক্তি যদি কেহকেও এটা বহন করতে আহবান করে তাহলে তার কিছুই বহন করা হবেনা, নিকট আত্মীয় হলেও। তুমি শুধু সতর্ক করতে পার তাদেরকে যারা তাদের রাববকে না দেখে ভয় করে এবং সালাত কায়েম করে। যে কেহ নিজেকে পরিশোধন করে সেতো পরিশোধন করে নিজেরই কল্যাণের জন্য। প্রত্যাবর্তনতো আল্লাহরই নিকট।



ফযলুর রহমান: কোন বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না। আর গুরুতর ভারগ্রস্ত কেউ তার ভার বহনের জন্য অন্যকে ডাকলে তার কিছুই বহন করা হবে না, যদি সে নিকটাত্মীয়ও হয়। তুমি তো কেবল তাদেরকেই সতর্ক করতে পার যারা তাদের প্রভুকে না দেখেও ভয় করে এবং নামায কায়েম করে। যে নিজেকে পরিশোধন করে সে তো নিজের (কল্যাণের) জন্যই তা করে। আর আল্লাহর কাছেই (সকলের) প্রত্যাবর্তন।



মুহিউদ্দিন খান: কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না। কেউ যদি তার গুরুতর ভার বহন করতে অন্যকে আহবান করে কেউ তা বহন করবে না-যদি সে নিকটবর্তী আত্নীয়ও হয়। আপনি কেবল তাদেরকে সতর্ক করেন, যারা তাদের পালনকর্তাকে না দেখেও ভয় করে এবং নামায কায়েম করে। যে কেউ নিজের সংশোধন করে, সে সংশোধন করে, স্বীয় কল্যাণের জন্যেই আল্লাহর নিকটই সকলের প্রত্যাবর্তন।



জহুরুল হক: আর কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বইবে না। আর গুরুভারে পীড়িত কেউ যদি তার বোঝার জন্যে ডাকে, তা থেকে কিছুই বয়ে নেওয়া হবে না, যদিও সে নিকটা‌ত্মীয় হয়। তুমি তো সাবধান করতে পার কেবলমাত্র তাদের যারা তাদের প্রভুকে ভয় করে আড়ালে, আর নামায কায়েম করে। আর যে কেউ নিজেকে পবিত্র করে, সে তো তবে পবিত্র করে তার নিজেরই জন্যে। আর আল্লাহ্‌র কাছেই প্রত্যাবর্তন।



Sahih International: And no bearer of burdens will bear the burden of another. And if a heavily laden soul calls [another] to [carry some of] its load, nothing of it will be carried, even if he should be a close relative. You can only warn those who fear their Lord unseen and have established prayer. And whoever purifies himself only purifies himself for [the benefit of] his soul. And to Allah is the [final] destination.



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৮. আর কোন বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না(১); এবং কোন ভারাক্রান্ত ব্যক্তি যদি কাউকেও তা বহন করতে ডাকে তবে তার থেকে কিছুই বহন করা হবে না—এমনকি নিকট আত্মীয় হলেও।(২) আপনি শুধু তাদেরকেই সতর্ক করতে পারেন যারা তাদের রবকে না দেখে ভয় করে এবং সালাত কায়েম করে। আর যে কেউ নিজেকে পরিশোধন করে, সে তো পরিশোধন করে নিজেরই কল্যাণের জন্য। আর আল্লাহরই দিকে প্রত্যাবর্তন।


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ কেয়ামতের দিন কোন মানুষ অন্য মানুষের পাপভার বহন করতে পারবে না। প্রত্যেককে নিজের বোঝা নিজেই বহন করতে হবে। “বোঝা” মানে কৃতকর্মের দায়দায়িত্বের বোঝা। এর অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর কাছে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজেই তার কাজের জন্য দায়ী এবং প্রত্যেকের ওপর কেবলমাত্র তার নিজের কাজের দায়-দায়িত্ব আরোপিত হয়। এক ব্যক্তির কাজের দায়-দায়িত্বের বোঝা আল্লাহর পক্ষ থেকে অন্য ব্যক্তির ঘাড়ে চাপিয়ে দেবার কোন সম্ভাবনা নেই। কোন ব্যক্তি অন্যের দায়-দায়িত্বের বোঝা নিজের ওপর চাপিয়ে নেবে এবং তাকে বাঁচাবার জন্য তার অপরাধে নিজেকে পাকড়াও করাবে  এরও কোন সম্ভাবনা নেই।

সূরা আল-আনকাবুতে বলা হয়েছে: “যারা পথভ্রষ্ট করে, তারা নিজেদের পথভ্রষ্টতার বোঝাও বহন করবে এবং তৎসহ তাদের বোঝাও বহন করবে, যাদেরকে পথভ্ৰষ্ট করেছিল।” [সূরা আল-আনকাবুত: ১৩] এর অর্থ এমন নয় যে, যাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল, তাদের বোঝা তারা কিছুটা হালকা করে দেবে। বরং তাদের বোঝা তাদের উপর পুরোপুরিই থাকবে, কিন্তু পথ-ভ্ৰষ্টকারীদের অপরাধ দ্বিগুণ হয়ে যাবে- একটি পথ ভ্ৰষ্ট হওয়ার ও অপরটি পথভ্রষ্ট করার। অতএব উভয় আয়াতে কোন বৈপরিত্য নেই।


(২) এ বাক্যে বলা হয়েছে, আজ যারা বলছে, তোমরা আমাদের দায়িত্বের কুফরী ও গোনাহের কাজ করে যাও কিয়ামতের দিন তোমাদের গোনাহর বোঝা আমরা নিজেদের ঘাড়ে নিয়ে নেবো তারা আসলে নিছক একটি মিথ্যা ভরসা দিচ্ছে। যখন কিয়ামত আসবে এবং লোকেরা দেখে নেবে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য তারা কোন ধরনের পরিণামের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে তখন প্রত্যেকে নিজেকে বাঁচাবার ফিকিরে লেগে যাবে। ভাই ভাইয়ের থেকে এবং পিতা পুত্রের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। কেউ কারো সামান্যতম বোঝা নিজের ওপর চাপিয়ে নিতে প্ৰস্তুত হবে না। ইকরিমা উল্লেখিত আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন, সেদিন এক পিতা তার পুত্ৰকে বলবে, তুমি জান যে, আমি তোমার প্রতি কেমন স্নেহশীল ও সদয় পিতা ছিলাম।

পুত্ৰ স্বীকার করে বলবে, নিশ্চয় আপনার ঋণ অসংখ্য। আমার জন্যে পৃথিবীতে অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন। অত:পর পিতা বলবে, বৎস, আজ আমি তোমার মুখাপেক্ষী। তোমার পূণ্যসমূহের মধ্য থেকে আমাকে যৎসামান্য দিয়ে দাও এতে আমার মুক্তি হয়ে যাবে। পুত্র বলবে, পিতা আপনি সামান্য বস্তুই চেয়েছেন- কিন্তু আমি কি করব, যদি আমি তা আপনাকে দিয়ে দেই, তবে আমারও যে, সে অবস্থা হবে। অতএব আমি অক্ষম। অতঃপর সে তার স্ত্রীকেও এই কথা বলবে যে, দুনিয়াতে আমি তোমার জন্যে সবকিছু বিসর্জন দিয়েছি। আজ তোমার সামান্য পূণ্য আমি চাই। তা দিয়ে দাও। স্ত্রীও পুত্রের অনুরূপ জওয়াব দেবে। [ইবন কাসীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৮) কোন বহনকারী অপরের বোঝা বহন করবে না; [1] কারও পাপের বোঝা গুরুভার হলে সে যদি অন্যকে তা বহন করতে আহবান করে, তবুও কেউ তা বহন করবে না; যদিও সে নিকট আত্মীয় হয়।[2] তুমি কেবল তাদেরকেই সতর্ক করতে পার, যারা তাদের প্রতিপালককে না দেখে ভয় করে এবং যথাযথভাবে নামায পড়ে।[3] যে কেউ পরিশুদ্ধ হয়, সে তো পরিশুদ্ধ হয় নিজেরই কল্যাণের জন্য। [4] আর প্রত্যাবর্তন আল্লাহরই নিকট।


তাফসীর:

[1] অবশ্য যে ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিদেরকে ভ্রষ্ট করবে, সে তার নিজের পাপের বোঝার সাথে তাদের পাপের বোঝাও বহন করবে। মহান আল্লাহ বলেন, (وَلَيَحْمِلُنَّ أَثْقَالَهُمْ وَأَثْقَالًا مَعَ أَثْقَالِهِمْ) (সূরা আনকাবূত ১৩নং) আয়াত এবং ‘‘যে ব্যক্তি ইসলামে কোন মন্দ রীতি (বা কর্মের) সূচনা করে তার জন্য রয়েছে তার পাপ এবং তাদের সমপরিমাণ পাপও যারা ঐ রীতির অনুকরণে আমল (বা কর্ম) করে। এতে তাদের কারো পাপ এতটুকু পরিমাণ হ্রাস করা হয় না।’’ (মুসলিম১০১৭নং, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, তিরমিযী) এই হাদীস দ্বারা স্পষ্ট। কিন্তু আসলে অন্য লোকের এই শ্রেণীর বোঝা তার নিজেরই বোঝা। কারণ সেই তো তাদেরকে ভ্রষ্ট করেছিল।

[2] مُثْقَلَةٌ অর্থাৎ نَفْسٌ مُثْقَلَةٌ এমন ব্যক্তি যে পাপের বোঝা বহন করবে, সে তার বোঝা বহন করার জন্য নিজের আত্মীয়দেরকে ডাকবে। কিন্তু তারা কেউ তা বহন করতে সম্মত হবে না।

[3] অর্থাৎ, তোমার সতর্কীকরণ ও তবলীগ কেবল তাদেরকেই উপকৃত করবে। যেন তুমি কেবল তাদেরকেই ভীতি প্রদর্শন করছ; তাদেরকে নয়, যাদেরকে ভীতি প্রদর্শনে কোন লাভ নেই। যেমন অন্য স্থানে বলেছেন, (إِنَّمَا أَنْتَ مُنْذِرُ مَنْ يَخْشَاهَا) অর্থাৎ, যে ওর ভয় রাখে তুমি কেবল তারই সতর্ককারী। (সূরা নাযিআত ৪৫ আয়াত) এবং (إِنَّمَا تُنْذِرُ مَنِ اتَّبَعَ الذِّكْرَ وَخَشِيَ الرَّحْمَنَ بِالْغَيْبِ) অর্থাৎ, তুমি কেবল তাদেরকে সতর্ক করতে পার, যারা উপদেশ মেনে চলে এবং না দেখে পরম দয়াময়কে ভয় করে। (সূরা ইয়াসীন ১১ আয়াত)

[4] تطَهُّر এবং تَزَكِّيْ এর অর্থ হল শিরক ও অশ্লীলতা থেকে পবিত্র হওয়া।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৫-১৮ নং আয়াতের তাফসীর:



প্রথমত আল্লাহ তা‘আলা তা’আলা নিজের পরিপূর্ণতার বর্ণনা দিয়ে বলছেন, সকল মানুষ আল্লাহ তা‘আলার মুখাপেক্ষী, কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা কারো মুখাপেক্ষী নন। আল্লাহ তা‘আলার বাণী,



(وَاللّٰهُ الْغَنِيُّ وَأَنْتُمُ الْفُقَرَا۬ءُ ج وَإِنْ تَتَوَلَّوْا يَسْتَبْدِلْ قَوْمًا غَيْرَكُمْ لا ثُمَّ لَا يَكُوْنُوْآ أَمْثَالَكُمْ)‏



“আল্লাহ অভাবমুক্ত, তোমরাই অভাবগ্রস্ত। যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে রাখ তাহলে আল্লাহ তোমাদের বদলে অন্য কাওমকে নিয়ে আসবেন। আর তারা তোমাদের মত হবে না।” (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:৩৮)



হাদীসে কুদসীতে এসেছে:



আল্লাহ তা‘আলা বলেন: হে আমার বান্দা, তোমাদের পূর্বাপর সকল মানুষ ও জিন জাতি, তোমাদের জীবিত ও মৃত সবাই যদি ভাল হয়ে একজন সৎ লোকের আত্মার মত হয়ে যাও তাহলে আমার রাজত্বের কিছুই বৃদ্ধি পাবে না। আবার তোমাদের পূর্বাপর সকল মানুষ ও জিন জাতি, তোমাদের জীবিত ও মৃত সবাই যদি খারাপ হয়ে একজন খারাপ লোকের আত্মার মত হয়ে যাও তাহলে আমার রাজত্বের কোন কিছুই কমবে না। (সহীহ মুসলিম হা: ২৫৭৭)



(إِنْ يَّشَأْ يُذْهِبْكُمْ وَيَأْتِ بِخَلْقٍ جَدِيْدٍ)



‘যদি তিনি ইচ্ছা করেন তবে তোমাদেরকে ধ্বংস করে দেবেন এবং এক নতুন সৃষ্টি আনবেন।’ এ সম্পর্কে পূর্বে সূরা নিসা’র ১৩৩ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।



(وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِّزْرَ أُخْرٰي)



কোন ব্যক্তি অন্যজনের পাপের ভার বহন করবে না। প্রত্যেকে নিজেই তার পাপের ভার বহন করবে। ইকরিমা (عليه السلام) অত্র আয়াতের তাফসীরে বলেন: সে দিন এক পিতা তার পুত্রকে বলবে, তুমি জান যে, আমি তোমার প্রতি কেমন স্নেহশীল ও সদয় পিতা ছিলাম। পুত্র স্বীকার করে বলবে: নিশ্চয়ই আপনার ঋণ অসংখ্য। আমার জন্য পৃথিবীতে অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন। অতঃপর পিতা বলবে: হে বৎস, আজ আমি তোমার মুখাপেক্ষী। তোমার পুণ্যসমূহের মধ্য থেকে আমাকে যৎসামন্য দিয়ে দাও, এতে আমার মুক্তি হয়ে যাবে। পুত্র বলবে: বাবা আপনি সামান্য বস্তুই চেয়েছেন কিন্তু আমি কী করব, যদি আমি তা আপনাকে দিয়ে দেই, তবে আমারও তো সে অবস্থা হবে। অতএব আমি আপনাকে যৎসামান্য পুণ্য দিতে অক্ষম। অতঃপর সে তার সহধর্মিণীকেও এ কথা বলবে যে, দুনিয়াতে আমি তোমার জন্য সবকিছু বিসর্জন দিয়েছি। আজ তোমার কাছে সামান্য পুণ্য চাচ্ছি, তুমি তা দিয়ে দাও। সহধর্মিণীও পুত্রের অনুরূপ জওয়াব দেবে।

ইকরিমা বলেন:



(وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِّزْرَ أُخْرٰي)



বাক্যের অর্থও তাই। এ সম্পর্কে আলোচনা সূরা বানী ইসরাঈল-এর ১৫ নং আয়াতেও করা হয়েছে।



مُثْقَلَةٌ বলা হয় সে ব্যক্তিকে যে পাপের বোঝা বহন করবে, সে তার পাপের বোঝা বহন করার জন্য নিজের আত্মীয়দেরকে ডাকবে, কিন্তু কেউ তার আহ্বানে সাড়া দিবে না।



( إِنَّمَا تُنْذِرُ الَّذِيْنَ..... الصَّلٰوةَ)



‘তুমি কেবল তাদেরকে সতর্ক করতে পারো, যারা তাদের প্রতিপালককে না দেখে ভয় করে’ এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সতর্ক করাটা সীমাবদ্ধ করেছেন ঐ সকল লোকদের জন্য যারা আল্লাহ তা‘আলাকে না দেখেও ভয় করে এবং সালাত প্রতিষ্ঠা করে। এখানে মু’মিনদের সাথে নির্দিষ্ট করার কারণ এই যে, যেহেতু তারাই এ সতর্কবাণী দ্বারা উপকৃত হয় তাই বস্তুত সকলকেই সতর্ক করা হয় কিন্তু যারা কাফির-মুশরিক তারা এর দ্বারা উপকৃত হয় না।



আল্লাহর বাণী,



(وَسَوَا۬ءٌ عَلَيْهِمْ أَأَنْذَرْتَهُمْ أَمْ لَمْ تُنْذِرْهُمْ لَا يُؤْمِنُوْنَ ‏ إِنَّمَا تُنْذِرُ مَنِ اتَّبَعَ الذِّكْرَ وَخَشِيَ الرَّحْمٰنَ بِالْغَيْبِ ج فَبَشِّرْهُ بِمَغْفِرَةٍ وَّأَجْرٍ كَرِيْمٍ)‏



“তুমি তাদেরকে সতর্ক কর কিংবা না কর, তাদের পক্ষে উভয়ই সমান, তারা ঈমান আনবে না। তুমি কেবল তাকেই সতর্ক কর, যে উপদেশ মেনে চলে এবং না দেখে দয়াময় আল্লাহকে ভয় করে। অতএব তুমি তাকে সুসংবাদ শুনিয়ে দাও ক্ষমা ও উত্তম পুরস্কারের।” (সূরা ইয়াসীন ৩৬:১০-১১) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,



(إِنَّمَآ أَنْتَ مُنْذِرُ مَنْ يَّخْشَاهَا)



“যে তার ভয় করে তুমি কেবল তারই সতর্ককারী।” (সূরা নাযিআত ৭৯:৪৫)



মূলত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সকলের জন্যই সতর্ককারী। আর বিশ্বাসীগণই যেহেতু এ সতর্কবাণী দ্বারা সতর্ক হয় তাই বিশেষ করে তাদের কথাই বলা হয়েছে।



অবশেষে আল্লাহ তা‘আলা বলেন যে, কেউ নিজেকে সংশোধন করে নিলে সে তা নিজের কল্যাণার্থেই করল। এর দ্বারা অন্য কারো কল্যাণ হবে না, বরং তারই উপকার হবে। আর যদি সংশোধন না করে নেয় তাহলে তার নিজেরই ক্ষতি হবে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. আল্লাহ তা‘আলা বান্দার কোন কিছুর মুখাপেক্ষী নন বরং বান্দা প্রতিটি কাজে আল্লাহ তা‘আলার মুখাপেক্ষী।

২. প্রত্যেককে তার নিজের পাপভার নিজেকেই বহন করতে হবে, কেউ কারো পাপভার বহন করবে না। যদিও নিকটাত্মীয় হয়।

৩. মানুষ যা কিছু করে তা মূলত তারই কল্যাণ বা অকল্যাণে আসবে, অন্য কারো নয়।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৫-১৮ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন যে, তিনি মাখলুক হতে অভাবশূন্য, আর সমস্ত যাক তাঁর মুখাপেক্ষী। তিনি অভাবমুক্ত এবং সবাই অভাবী। তিনি বেপরোয়া এবং সমস্ত সৃষ্টজীবই তাঁর মুখাপেক্ষী। সবাই তার সামনে হেয় ও তুচ্ছ এবং তিনি মহা প্রতাপশালী ও বিজয়ী। তাঁর ইচ্ছা ছাড়া কারো নড়াচড়ার বা থেমে থাকারও ক্ষমতা নেই। এমনকি তার বিনা হুকুমে শ্বাস-প্রশ্বাসেরও কারো অধিকার নেই। সৃষ্টি জগতের সবাই অসহায় ও নিরুপায়। বেপরোয়া, অমুখাপেক্ষী ও অভাবমুক্ত একমাত্র আল্লাহ। তিনি যা চান তাই করতে পারেন। তিনি যা করেন সবকিছুতেই তিনি প্রশংসনীয়। তাঁর কোন কাজই হিকমত ও প্রশংসাশূন্য নয়। নিজ কথা ও কাজে, নিজ বিধানে, তাকদীর নির্ধারণে, মোটকথা তার সব কাজই প্রশংসার যোগ্য।

মহান আল্লাহ বলেনঃ হে লোক সকল! আল্লাহ ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে ধ্বংস করে দিয়ে তোমাদের স্থলে অন্য সৃষ্টি আনয়ন করতে পারেন। এটা তার কাছে খুবই সহজ।

কিয়ামতের দিন কেউ তার বোঝা অন্যের উপর চাপাতে চাইলে তা পূর্ণ হবে না। এমন কেউ সেখানে থাকবে না যে তার বোঝা বহন করবে। বন্ধু-বান্ধব ও নিকটতম আত্মীয়রা সবাই সেদিন মুখ ফিরিয়ে নিবে। হে লোকেরা! জেনে রেখো যে, পিতা-মাতা ও সন্তান-সন্ততি প্রত্যেকেই নিজ নিজ চিন্তায় ব্যস্ত থাকবে। সেদিন সবারই উপর একই রকম বিপদ আসবে।

হযরত ইকরামা (রঃ) বলেছেন যে, প্রতিবেশী প্রতিবেশীর পিছনে লেগে যাবে। সে আল্লাহ তা'আলার কাছে আরয করবেঃ “হে আল্লাহ! আপনি তাকে জিজ্ঞেস করুন, কেন সে আমা হতে তার দরযা বন্ধ করে দিয়েছিল?` কাফির মুমিনের পিছনে লেগে যাবে এবং যে ইহসান সে দুনিয়ায় তার উপর করেছিল তা সে তাকে স্মরণ করিয়ে দিবে এবং বলবেঃ “আজ আমি তোমার মুখাপেক্ষী।” মুমিনও তার জন্যে সুপারিশ করবে এবং হতে পারে যে তার শাস্তিও কিছু কম হবে, যদিও জাহান্নাম হতে মুক্তি লাভ অসম্ভব। পিতা পুত্রকে তার প্রতি তার অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলবেঃ “হে আমার প্রিয় বৎস! সরিষা পরিমাণ পুণ্য আজ তুমি আমাকে দাও।` পুত্র বলবেঃ “আব্বা! আপনি জিনিস তো অল্পই চাচ্ছেন। কিন্তু যে ভয়ে আপনি ভীত রয়েছেন সেই ভয়ে আমিও ভীত রয়েছি। সুতরাং আজ তো আমি আপনাকে কিছুই দিতে পারছি না।” তখন সে তার স্ত্রীর কাছে যাবে এবং বলবেঃ “দুনিয়ায় আমি তোমার প্রতি যে সদ্ব্যবহার করেছিলাম তা তো অজানা নেই?” উত্তরে স্ত্রী বলবেঃ “আপনি ঠিক কথাই বলেছেন। কিন্তু এখন আপনার কথা কি?” সে বলবেঃ “আজ আমি তোমার মুখাপেক্ষী। আমাকে একটি নেকী দিয়ে দাও যাতে আমি আজ এই কঠিন আযাব হতে মুক্তি পেতে পারি।” স্ত্রী জবাবে বলবেঃ “আপনার আবেদন ও চাহিদা তো খুবই হালকা বটে, কিন্তু যে ভয়ে আপনি রয়েছেন সে ভয় আমারও কোন অংশে কম নয়। সুতরাং আজ তো আমি আপনার কোন উপকার করতে পারবো না।” কুরআন কারীমের অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “না পিতা পুত্রের কোন উপকারে আসবে এবং না পুত্র পিতার কোন উপকারে লাগবে।” (৩১:৩৩) মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভ্রাতা হতে, তার মাতা, তার পিতা, তার পত্নী ও তার সন্তান হতে। সেই দিন তাদের প্রত্যেকের হবে এমন গুরুতর অবস্থা যা তাকে সম্পূর্ণরূপে ব্যস্ত রাখবে।”(৮০:৩৪-৩৭)

মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি শুধু তাদেরকেই সতর্ক করতে পার যারা তাদের প্রতিপালককে না দেখে ভয় করে এবং নামায কায়েম করে।

আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যে কেউ নিজেকে পরিশোধন করে সে তো পরিশোধন করে নিজেরই কল্যাণের জন্যে। ফিরে তো আল্লাহর কাছেই যেতে হবে। তার কাছে হাযির হয়ে হিসাব দিতে হবে। তিনি স্বয়ং আমলের বিনিময় প্রদান করবেন।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।