সূরা ফাতির (আয়াত: 17)
হরকত ছাড়া:
وما ذلك على الله بعزيز ﴿١٧﴾
হরকত সহ:
وَ مَا ذٰلِکَ عَلَی اللّٰهِ بِعَزِیْزٍ ﴿۱۷﴾
উচ্চারণ: ওয়ামা-যা-লিকা ‘আলাল্লা-হি বি‘আযীয।
আল বায়ান: আর তা আল্লাহর জন্য মোটেই কঠিন নয়।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৭. আর এটা আল্লাহর পক্ষে কঠিন নয়।
তাইসীরুল ক্বুরআন: এটা আল্লাহর পক্ষে কঠিন নয়।
আহসানুল বায়ান: (১৭) আর আল্লাহর পক্ষে তা কঠিন নয়।
মুজিবুর রহমান: এটা আল্লাহর পক্ষে কঠিন নয়।
ফযলুর রহমান: এটা আল্লাহর পক্ষে কঠিন কিছু নয়।
মুহিউদ্দিন খান: এটা আল্লাহর পক্ষে কঠিন নয়।
জহুরুল হক: আর এটি আল্লাহ্র জন্যে মোটেই কঠিন নয়।
Sahih International: And that is for Allah not difficult.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৭. আর এটা আল্লাহর পক্ষে কঠিন নয়।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৭) আর আল্লাহর পক্ষে তা কঠিন নয়।
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৫-১৮ নং আয়াতের তাফসীর:
প্রথমত আল্লাহ তা‘আলা তা’আলা নিজের পরিপূর্ণতার বর্ণনা দিয়ে বলছেন, সকল মানুষ আল্লাহ তা‘আলার মুখাপেক্ষী, কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা কারো মুখাপেক্ষী নন। আল্লাহ তা‘আলার বাণী,
(وَاللّٰهُ الْغَنِيُّ وَأَنْتُمُ الْفُقَرَا۬ءُ ج وَإِنْ تَتَوَلَّوْا يَسْتَبْدِلْ قَوْمًا غَيْرَكُمْ لا ثُمَّ لَا يَكُوْنُوْآ أَمْثَالَكُمْ)
“আল্লাহ অভাবমুক্ত, তোমরাই অভাবগ্রস্ত। যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে রাখ তাহলে আল্লাহ তোমাদের বদলে অন্য কাওমকে নিয়ে আসবেন। আর তারা তোমাদের মত হবে না।” (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:৩৮)
হাদীসে কুদসীতে এসেছে:
আল্লাহ তা‘আলা বলেন: হে আমার বান্দা, তোমাদের পূর্বাপর সকল মানুষ ও জিন জাতি, তোমাদের জীবিত ও মৃত সবাই যদি ভাল হয়ে একজন সৎ লোকের আত্মার মত হয়ে যাও তাহলে আমার রাজত্বের কিছুই বৃদ্ধি পাবে না। আবার তোমাদের পূর্বাপর সকল মানুষ ও জিন জাতি, তোমাদের জীবিত ও মৃত সবাই যদি খারাপ হয়ে একজন খারাপ লোকের আত্মার মত হয়ে যাও তাহলে আমার রাজত্বের কোন কিছুই কমবে না। (সহীহ মুসলিম হা: ২৫৭৭)
(إِنْ يَّشَأْ يُذْهِبْكُمْ وَيَأْتِ بِخَلْقٍ جَدِيْدٍ)
‘যদি তিনি ইচ্ছা করেন তবে তোমাদেরকে ধ্বংস করে দেবেন এবং এক নতুন সৃষ্টি আনবেন।’ এ সম্পর্কে পূর্বে সূরা নিসা’র ১৩৩ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
(وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِّزْرَ أُخْرٰي)
কোন ব্যক্তি অন্যজনের পাপের ভার বহন করবে না। প্রত্যেকে নিজেই তার পাপের ভার বহন করবে। ইকরিমা (عليه السلام) অত্র আয়াতের তাফসীরে বলেন: সে দিন এক পিতা তার পুত্রকে বলবে, তুমি জান যে, আমি তোমার প্রতি কেমন স্নেহশীল ও সদয় পিতা ছিলাম। পুত্র স্বীকার করে বলবে: নিশ্চয়ই আপনার ঋণ অসংখ্য। আমার জন্য পৃথিবীতে অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন। অতঃপর পিতা বলবে: হে বৎস, আজ আমি তোমার মুখাপেক্ষী। তোমার পুণ্যসমূহের মধ্য থেকে আমাকে যৎসামন্য দিয়ে দাও, এতে আমার মুক্তি হয়ে যাবে। পুত্র বলবে: বাবা আপনি সামান্য বস্তুই চেয়েছেন কিন্তু আমি কী করব, যদি আমি তা আপনাকে দিয়ে দেই, তবে আমারও তো সে অবস্থা হবে। অতএব আমি আপনাকে যৎসামান্য পুণ্য দিতে অক্ষম। অতঃপর সে তার সহধর্মিণীকেও এ কথা বলবে যে, দুনিয়াতে আমি তোমার জন্য সবকিছু বিসর্জন দিয়েছি। আজ তোমার কাছে সামান্য পুণ্য চাচ্ছি, তুমি তা দিয়ে দাও। সহধর্মিণীও পুত্রের অনুরূপ জওয়াব দেবে।
ইকরিমা বলেন:
(وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِّزْرَ أُخْرٰي)
বাক্যের অর্থও তাই। এ সম্পর্কে আলোচনা সূরা বানী ইসরাঈল-এর ১৫ নং আয়াতেও করা হয়েছে।
مُثْقَلَةٌ বলা হয় সে ব্যক্তিকে যে পাপের বোঝা বহন করবে, সে তার পাপের বোঝা বহন করার জন্য নিজের আত্মীয়দেরকে ডাকবে, কিন্তু কেউ তার আহ্বানে সাড়া দিবে না।
( إِنَّمَا تُنْذِرُ الَّذِيْنَ..... الصَّلٰوةَ)
‘তুমি কেবল তাদেরকে সতর্ক করতে পারো, যারা তাদের প্রতিপালককে না দেখে ভয় করে’ এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সতর্ক করাটা সীমাবদ্ধ করেছেন ঐ সকল লোকদের জন্য যারা আল্লাহ তা‘আলাকে না দেখেও ভয় করে এবং সালাত প্রতিষ্ঠা করে। এখানে মু’মিনদের সাথে নির্দিষ্ট করার কারণ এই যে, যেহেতু তারাই এ সতর্কবাণী দ্বারা উপকৃত হয় তাই বস্তুত সকলকেই সতর্ক করা হয় কিন্তু যারা কাফির-মুশরিক তারা এর দ্বারা উপকৃত হয় না।
আল্লাহর বাণী,
(وَسَوَا۬ءٌ عَلَيْهِمْ أَأَنْذَرْتَهُمْ أَمْ لَمْ تُنْذِرْهُمْ لَا يُؤْمِنُوْنَ إِنَّمَا تُنْذِرُ مَنِ اتَّبَعَ الذِّكْرَ وَخَشِيَ الرَّحْمٰنَ بِالْغَيْبِ ج فَبَشِّرْهُ بِمَغْفِرَةٍ وَّأَجْرٍ كَرِيْمٍ)
“তুমি তাদেরকে সতর্ক কর কিংবা না কর, তাদের পক্ষে উভয়ই সমান, তারা ঈমান আনবে না। তুমি কেবল তাকেই সতর্ক কর, যে উপদেশ মেনে চলে এবং না দেখে দয়াময় আল্লাহকে ভয় করে। অতএব তুমি তাকে সুসংবাদ শুনিয়ে দাও ক্ষমা ও উত্তম পুরস্কারের।” (সূরা ইয়াসীন ৩৬:১০-১১) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
(إِنَّمَآ أَنْتَ مُنْذِرُ مَنْ يَّخْشَاهَا)
“যে তার ভয় করে তুমি কেবল তারই সতর্ককারী।” (সূরা নাযিআত ৭৯:৪৫)
মূলত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সকলের জন্যই সতর্ককারী। আর বিশ্বাসীগণই যেহেতু এ সতর্কবাণী দ্বারা সতর্ক হয় তাই বিশেষ করে তাদের কথাই বলা হয়েছে।
অবশেষে আল্লাহ তা‘আলা বলেন যে, কেউ নিজেকে সংশোধন করে নিলে সে তা নিজের কল্যাণার্থেই করল। এর দ্বারা অন্য কারো কল্যাণ হবে না, বরং তারই উপকার হবে। আর যদি সংশোধন না করে নেয় তাহলে তার নিজেরই ক্ষতি হবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. আল্লাহ তা‘আলা বান্দার কোন কিছুর মুখাপেক্ষী নন বরং বান্দা প্রতিটি কাজে আল্লাহ তা‘আলার মুখাপেক্ষী।
২. প্রত্যেককে তার নিজের পাপভার নিজেকেই বহন করতে হবে, কেউ কারো পাপভার বহন করবে না। যদিও নিকটাত্মীয় হয়।
৩. মানুষ যা কিছু করে তা মূলত তারই কল্যাণ বা অকল্যাণে আসবে, অন্য কারো নয়।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৫-১৮ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন যে, তিনি মাখলুক হতে অভাবশূন্য, আর সমস্ত যাক তাঁর মুখাপেক্ষী। তিনি অভাবমুক্ত এবং সবাই অভাবী। তিনি বেপরোয়া এবং সমস্ত সৃষ্টজীবই তাঁর মুখাপেক্ষী। সবাই তার সামনে হেয় ও তুচ্ছ এবং তিনি মহা প্রতাপশালী ও বিজয়ী। তাঁর ইচ্ছা ছাড়া কারো নড়াচড়ার বা থেমে থাকারও ক্ষমতা নেই। এমনকি তার বিনা হুকুমে শ্বাস-প্রশ্বাসেরও কারো অধিকার নেই। সৃষ্টি জগতের সবাই অসহায় ও নিরুপায়। বেপরোয়া, অমুখাপেক্ষী ও অভাবমুক্ত একমাত্র আল্লাহ। তিনি যা চান তাই করতে পারেন। তিনি যা করেন সবকিছুতেই তিনি প্রশংসনীয়। তাঁর কোন কাজই হিকমত ও প্রশংসাশূন্য নয়। নিজ কথা ও কাজে, নিজ বিধানে, তাকদীর নির্ধারণে, মোটকথা তার সব কাজই প্রশংসার যোগ্য।
মহান আল্লাহ বলেনঃ হে লোক সকল! আল্লাহ ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে ধ্বংস করে দিয়ে তোমাদের স্থলে অন্য সৃষ্টি আনয়ন করতে পারেন। এটা তার কাছে খুবই সহজ।
কিয়ামতের দিন কেউ তার বোঝা অন্যের উপর চাপাতে চাইলে তা পূর্ণ হবে না। এমন কেউ সেখানে থাকবে না যে তার বোঝা বহন করবে। বন্ধু-বান্ধব ও নিকটতম আত্মীয়রা সবাই সেদিন মুখ ফিরিয়ে নিবে। হে লোকেরা! জেনে রেখো যে, পিতা-মাতা ও সন্তান-সন্ততি প্রত্যেকেই নিজ নিজ চিন্তায় ব্যস্ত থাকবে। সেদিন সবারই উপর একই রকম বিপদ আসবে।
হযরত ইকরামা (রঃ) বলেছেন যে, প্রতিবেশী প্রতিবেশীর পিছনে লেগে যাবে। সে আল্লাহ তা'আলার কাছে আরয করবেঃ “হে আল্লাহ! আপনি তাকে জিজ্ঞেস করুন, কেন সে আমা হতে তার দরযা বন্ধ করে দিয়েছিল?` কাফির মুমিনের পিছনে লেগে যাবে এবং যে ইহসান সে দুনিয়ায় তার উপর করেছিল তা সে তাকে স্মরণ করিয়ে দিবে এবং বলবেঃ “আজ আমি তোমার মুখাপেক্ষী।” মুমিনও তার জন্যে সুপারিশ করবে এবং হতে পারে যে তার শাস্তিও কিছু কম হবে, যদিও জাহান্নাম হতে মুক্তি লাভ অসম্ভব। পিতা পুত্রকে তার প্রতি তার অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলবেঃ “হে আমার প্রিয় বৎস! সরিষা পরিমাণ পুণ্য আজ তুমি আমাকে দাও।` পুত্র বলবেঃ “আব্বা! আপনি জিনিস তো অল্পই চাচ্ছেন। কিন্তু যে ভয়ে আপনি ভীত রয়েছেন সেই ভয়ে আমিও ভীত রয়েছি। সুতরাং আজ তো আমি আপনাকে কিছুই দিতে পারছি না।” তখন সে তার স্ত্রীর কাছে যাবে এবং বলবেঃ “দুনিয়ায় আমি তোমার প্রতি যে সদ্ব্যবহার করেছিলাম তা তো অজানা নেই?” উত্তরে স্ত্রী বলবেঃ “আপনি ঠিক কথাই বলেছেন। কিন্তু এখন আপনার কথা কি?” সে বলবেঃ “আজ আমি তোমার মুখাপেক্ষী। আমাকে একটি নেকী দিয়ে দাও যাতে আমি আজ এই কঠিন আযাব হতে মুক্তি পেতে পারি।” স্ত্রী জবাবে বলবেঃ “আপনার আবেদন ও চাহিদা তো খুবই হালকা বটে, কিন্তু যে ভয়ে আপনি রয়েছেন সে ভয় আমারও কোন অংশে কম নয়। সুতরাং আজ তো আমি আপনার কোন উপকার করতে পারবো না।” কুরআন কারীমের অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “না পিতা পুত্রের কোন উপকারে আসবে এবং না পুত্র পিতার কোন উপকারে লাগবে।” (৩১:৩৩) মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভ্রাতা হতে, তার মাতা, তার পিতা, তার পত্নী ও তার সন্তান হতে। সেই দিন তাদের প্রত্যেকের হবে এমন গুরুতর অবস্থা যা তাকে সম্পূর্ণরূপে ব্যস্ত রাখবে।”(৮০:৩৪-৩৭)
মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি শুধু তাদেরকেই সতর্ক করতে পার যারা তাদের প্রতিপালককে না দেখে ভয় করে এবং নামায কায়েম করে।
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যে কেউ নিজেকে পরিশোধন করে সে তো পরিশোধন করে নিজেরই কল্যাণের জন্যে। ফিরে তো আল্লাহর কাছেই যেতে হবে। তার কাছে হাযির হয়ে হিসাব দিতে হবে। তিনি স্বয়ং আমলের বিনিময় প্রদান করবেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।