সূরা সাবা (আয়াত: 14)
হরকত ছাড়া:
فلما قضينا عليه الموت ما دلهم على موته إلا دابة الأرض تأكل منسأته فلما خر تبينت الجن أن لو كانوا يعلمون الغيب ما لبثوا في العذاب المهين ﴿١٤﴾
হরকত সহ:
فَلَمَّا قَضَیْنَا عَلَیْهِ الْمَوْتَ مَا دَلَّهُمْ عَلٰی مَوْتِهٖۤ اِلَّا دَآبَّۃُ الْاَرْضِ تَاْکُلُ مِنْسَاَتَهٗ ۚ فَلَمَّا خَرَّ تَبَیَّنَتِ الْجِنُّ اَنْ لَّوْ کَانُوْا یَعْلَمُوْنَ الْغَیْبَ مَا لَبِثُوْا فِی الْعَذَابِ الْمُهِیْنِ ﴿ؕ۱۴﴾
উচ্চারণ: ফালাম্মা-কাদাইনা-‘আলাইহিল মাওতা মা-দাল্লাহুম ‘আলা-মাওতিহী-ইল্লা-দাব্বাতুল আরদিতা’কুলুমিন ছাআতাহু ফালাম্মা-খাররা তাবাইয়ানাতিল জিন্নুআল্লাও কা-নূ ইয়া‘লামূনাল গাইবা মা-লাবিছূফিল ‘আযা-বিল মুহীন।
আল বায়ান: তারপর যখন আমি সুলাইমানের মৃত্যুর ফয়সালা করলাম তখন মাটির পোকা জিনদেরকে তার মৃত্যু সম্পর্কে অবহিত করল, যা তার লাঠি খাচ্ছিল। অতঃপর যখন সে পড়ে গেল তখন জিনরা বুঝতে পারল যে, তারা যদি গায়েব জানত তাহলে তারা লাঞ্ছনাদায়ক আযাবে থাকত না।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৪. অতঃপর যখন আমরা সুলাইমানের মৃত্যু ঘটালাম, তখন জিনদেরকে তার মৃত্যুর খবর জানাল শুধু মাটির পোকা, যা তার লাঠি খাচ্ছিল। অতঃপর যখন তিনি পড়ে গেলেন তখন জিনরা বুঝতে পারল যে, যদি তারা গায়েব জানত, তাহলে তারা লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তিতে আবদ্ধ থাকত না।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: অতঃপর আমি যখন সুলাইমানের মৃত্যু ঘটালাম, তখন ঘুণে পোকাই জ্বিনদেরকে তার মৃত্যু সম্পর্কে অবহিত করল, তারা (ধীরে ধীরে) সুলাইমানের লাঠি খেয়ে যাচ্ছিল। যখন সে পড়ে গেল তখন জ্বিনেরা বুঝতে পারল যে, তারা (নিজেরা) যদি অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে অবগত থাকত তাহলে তাদেরকে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তির মধ্যে পড়ে থাকতে হত না।
আহসানুল বায়ান: (১৪) যখন আমি সুলাইমানের মৃত্যু ঘটালাম, তখন উই পোকাই জ্বিনদেরকে তার মৃত্যু বিষয় জানাল; যা সুলাইমানের লাঠি খাচ্ছিল। যখন সুলাইমান মাটিতে পড়ে গেল, তখন জ্বিনেরা বুঝতে পারল যে, ওরা যদি অদৃশ্য বিষয় অবগত থাকত, তাহলে ওরা এতকাল লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তিতে আবদ্ধ থাকত না। [1]
মুজিবুর রহমান: যখন আমি সুলাইমানের মৃত্যু ঘটালাম তখন জিনদেরকে তার মৃত্যু বিষয় জানালো শুধু মাটির পোকা যা সুলাইমানের লাঠি খাচ্ছিল। যখন সুলাইমান পড়ে গেল তখন জিনেরা বুঝতে পারল যে, তারা যদি অদৃশ্য বিষয় অবগত থাকত তাহলে তারা লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তিতে আবদ্ধ থাকতনা।
ফযলুর রহমান: তারপর যখন আমি সোলায়মানের মৃত্যু ঘটালাম তখন জ্বিনদেরকে কেউ তার মৃত্যুর কথা জানাতে পারেনি, একমাত্র মাটির পোকা র্(ঘুণ) ছাড়া, যা তার লাঠিটি খেয়ে ফেলছিল। অতঃপর সে যখন পড়ে গেল তখন জ্বিনেরা বুঝতে পারল যে, তারা যদি গায়েব জানত (আগেই সোলায়মানের মৃত্যুর কথা জানতে পারত) তাহলে তারা (এতদিন) লাঞ্ছনাকর শাস্তির মধ্যে অবস্থান করত না (ইচ্ছার বিরুদ্ধে নির্মাণকাজে নিয়োজিত থাকত না)।
মুহিউদ্দিন খান: যখন আমি সোলায়মানের মৃত্যু ঘটালাম, তখন ঘুণ পোকাই জিনদেরকে তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে অবহিত করল। সোলায়মানের লাঠি খেয়ে যাচ্ছিল। যখন তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন, তখন জিনেরা বুঝতে পারল যে, অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান থাকলে তারা এই লাঞ্ছনাপূর্ণ শাস্তিতে আবদ্ধ থাকতো না।
জহুরুল হক: তারপর যখন আমরা তাঁর প্রতি মৃত্যুবিধান করেছিলাম তখন কিছুই তাদের কাছে তাঁর মৃত্যু সন্বন্ধে জানতে দেয় নি শুধু এক মাটির কীট ব্যতীত, সে খেয়ে ফেলেছিল তাঁর শাঁস। তারপর যখন তার পতন ঘটল তখন জিনেরা পরিস্কারভাবে বুঝলো যে যদি তারা অদৃশ্যটা জানতো তাহলে তারা লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তিতে অবস্থান করত না।
Sahih International: And when We decreed for Solomon death, nothing indicated to the jinn his death except a creature of the earth eating his staff. But when he fell, it became clear to the jinn that if they had known the unseen, they would not have remained in humiliating punishment.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৪. অতঃপর যখন আমরা সুলাইমানের মৃত্যু ঘটালাম, তখন জিনদেরকে তার মৃত্যুর খবর জানাল শুধু মাটির পোকা, যা তার লাঠি খাচ্ছিল। অতঃপর যখন তিনি পড়ে গেলেন তখন জিনরা বুঝতে পারল যে, যদি তারা গায়েব জানত, তাহলে তারা লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তিতে আবদ্ধ থাকত না।(১)
তাফসীর:
(১) কারণ, সুলাইমান আলাইহিস সালাম তার ঘরে ইবাদাতে মশগুল ছিলেন। তারপর জিনরা তার জন্য বিল্ডিং বানাচ্ছিল। এমতাবস্থায় আল্লাহ সুলাইমান আলাইহিস সালামের মৃত্যু দিলেন। কিন্তু জিনরা তা জানতেই পারল না। শেষ পর্যন্ত তার লাঠিতে যমীনের পোকা লেগে সেটা নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর তিনি পড়ে গেলেন। কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায় সেটা ছিল পূর্ণ এক বছর পর। তখন জিনরা তাদের ভুল বুঝতে পারল যে, যদি তারা গায়েবের কিছু জানত তবে এতদিন কষ্ট করত না। [সা’দী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৪) যখন আমি সুলাইমানের মৃত্যু ঘটালাম, তখন উই পোকাই জ্বিনদেরকে তার মৃত্যু বিষয় জানাল; যা সুলাইমানের লাঠি খাচ্ছিল। যখন সুলাইমান মাটিতে পড়ে গেল, তখন জ্বিনেরা বুঝতে পারল যে, ওরা যদি অদৃশ্য বিষয় অবগত থাকত, তাহলে ওরা এতকাল লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তিতে আবদ্ধ থাকত না। [1]
তাফসীর:
[1] সুলাইমান (আঃ)-এর সময়ে জ্বিনদের বিষয়ে এই খবর প্রসিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল যে, জ্বিনরা গায়বের খবর জানে, আল্লাহ তাআলা সুলাইমান (আঃ)-এর মৃত্যু দ্বারা সেই আকীদার ভ্রষ্টতা পরিষ্কার করে দিলেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১২-১৪ নং আয়াতের তাফসীর:
পূর্বে দাঊদ (عليه السلام)-কে যে সকল নেয়ামত দেয়া হয়েছিল তার বর্ণনা দেয়ার পর পুত্র সুলাইমান (عليه السلام)-কে যে সকল নেয়ামত বা মু‘জিযাহ দান করা হয়েছিল তার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে।
আল্লাহ তা‘আলা সুলাইমান (عليه السلام)-কে অনেক বৈশিষ্ট্য দান করেছিলেন, তন্মধ্যে সূরা নামলের ১৫-৪৪ নং আয়াতের তাফসীরে দুটি উল্লেখ করা হয়েছে। বাকীগুলো সূরা সোয়াদে উল্লেখ করা হয়েছে, এখানে অত্র আয়াতগুলোর সাথে সম্পৃক্তগুলো উল্লেখ করা হল।
(১) আল্লাহ তা‘আলা বায়ু প্রবাহকে সুলাইমান (عليه السلام)-এর অনুগত করে দিয়েছিলেন। তাঁর হুকুম মত বায়ু তাঁকে তাঁর ইচ্ছামত স্থানে বহন করে নিয়ে যেত। তিনি সদলবলে বায়ুর মাধ্যমে নিজ সিংহাসনে সওয়ার হয়ে দু‘মাসের পথ একদিনে পৌঁছে যেতেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلِسُلَیْمٰنَ الرِّیْحَ عَاصِفَةً تَجْرِیْ بِاَمْرِھ۪ٓ اِلَی الْاَرْضِ الَّتِیْ بٰرَکْنَا فِیْھَاﺚ وَکُنَّا بِکُلِّ شَیْءٍ عٰلِمِیْنَ)
“এবং সুলাইমানের বশীভূত করে দিয়েছিলাম প্রচণ্ড বায়ুকে; সে বায়ু তার আদেশক্রমে প্রবাহিত হত সে দেশের দিকে যেখানে আমি কল্যাণ রেখেছি; প্রত্যেক বিষয় সম্পর্কে আমি সম্যক অবগত।” (সূরা আম্বিয়া ২১:৮১)
(২) তামার ন্যায় শক্ত পদার্থকে আল্লাহ তা‘আলা সুলাইমান (عليه السلام)-এর জন্য তরল ধাতুতে পরিণত করেছিলেন। যেমন
(وَاَسَلْنَا لَھ۫ عَیْنَ الْقِطْرِ)
‘আমি তার জন্য গলিত তামার এক প্রস্রবন প্রবাহিত করে দিলাম।’ এর দ্বারা বুঝা যায় যে, ঐ গলিত ধাতু উত্তপ্ত ছিল না। বরং তা দিয়ে অতি সহজে পাত্রাদি তৈরি করা যেত। সুলাইমান (عليه السلام)-এর পর থেকেই তামা গলিয়ে পাত্রাদি তৈরি করা শুরু হয় বলে ইমাম কুরতুবী বর্ণনা করেছেন। পিতা দাঊদের জন্য ছিল লোহা গলানোর মু‘জিযাহ আর পুত্র সুলাইমানের জন্য তামা গলানোর মু‘জিযাহ। এজন্যই আয়াতের শেষে বলা হয়েছে; ‘হে দাঊদের ক্বাওম! কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে কাজ করে যাও। আমার বান্দাদের মধ্যে খুব অল্পই কৃতজ্ঞ।’
(৩) জিন জাতিকে তাঁর অনুগত করে দিয়েছিলেন। ফলে তিনি যখন কোন কাজের ইচ্ছা করতেন তখন সে কাজ তাঁর সামনে তাদের দ্বারা করিয়ে নিতেন। তারা সুলাইমান (عليه السلام)-এর ইচ্ছানুযায়ী প্রাসাদ, মূর্তি অর্থাৎ কাঁচের, তামার ইত্যাদির প্রতিচ্ছবি, বড় বড় পাত্র, ডেগ ইত্যাদি নির্মাণ করত এবং সাগরে ডুব দিয়ে তলদেশ থেকে মূল্যবান মণি-মুক্তা, হীরা তুলে আনত।
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمِنَ الشَّیٰطِیْنِ مَنْ یَّغُوْصُوْنَ لَھ۫ وَیَعْمَلُوْنَ عَمَلًا دُوْنَ ذٰلِکَﺆ وَکُنَّا لَھُمْ حٰفِظِیْنَ)
“এবং শয়তানদের মধ্যে কতক সুলাইমানের জন্য ডুবুরীর কাজ করত, তা ব্যতীত অন্য কাজও করত; আমি তাদের রক্ষাকারী ছিলাম।” (সূরা আম্বিয়া ২১:৮২)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(وَالشَّیٰطِیْنَ کُلَّ بَنَّا۬ئٍ وَّغَوَّاصٍ ﭴﺫوَّاٰخَرِیْنَ مُقَرَّنِیْنَ فِی الْاَصْفَادِﭵ)
“এবং অধীন করেছিলাম শয়তানদেরকেও, যারা ছিল ইমারত নির্মাণকারী ও ডুবুরী। এবং আরও অনেককে, যারা শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকত।” (সূরা সোয়াদ ৩৮:৩৭-৩৮)
مَّحَارِيْب শব্দটি محراب -এর বহুবচন। অর্থ হলো, উঁচু জায়গা অথবা সুন্দর অট্টালিকা।
تَمَاثِيْل শব্দটি تماثيل-এর বহুবচন। অর্থ হলোন প্রতিমা, মূর্তি। তবে ইসলামে মূর্তি তৈরি করা নিষেধ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: যে ব্যক্তি কোন ছবি অংকন করবে (প্রাণী জাতীয়) আল্লাহ তা‘আলা তাকে শাস্তি দেবেন যতক্ষণ না সে তাতে রূহ দিতে পারবে। কিন্তু সে কোন দিন তাতে রূহ দিতে পারবে না। (সহীহ বুখারী হা: ২২২৫) جِفَان শব্দটি جفنة-এর বহুবচন। অর্থ হলো, বিরাট পাত্র।
الْجَوَاب শব্দটি جابية-এর বহুবচন। ঐ হাউজকে বলা হয় যাতে পানি আসতে থাকে।
قُدُوْرٍ অর্থ ডেগ আর راسيات অর্থ স্বস্থানে স্থাপিত। এ সকল ডেগ পাথর খোদাই করে নির্মাণ করা হত, যা স্থানান্তর করার যোগ্য ছিল না।
এ সকল নেয়ামতরাজির বিনিময়ে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে এ নির্দেশ প্রদান করেছেন যে, তারা যেন মহান আল্লাহ তা‘আলার শুকুরগুজারী হয়।
আবূ আব্দুর রহমান আল হুখুলী বলেন: সালাত আদায় করা একটি শুকরিয়া, সিয়াম পালন করা একটি শুকরিয়া, অনুরূপভাবে প্রত্যেক ভাল কাজ একটি শুকরিয়া। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আল্লাহ তা‘আলার কাছে সর্বোত্তম সালাত হলো দাঊদ (عليه السلام)-এর সালাত, তিনি প্রথম অর্ধরাত ঘুমাতেন, এক তৃতীয়াংশ নফল সালাত পড়তেন, আর এক ষষ্ঠাংশ ঘুমাতেন। (সহীহ বুখারী হা: ৩৪১৯)
বায়তুল মুক্বাদ্দাস নির্মাণ ও সুলাইমান (عليه السلام)-এর মৃত্যুর বিস্ময়কর ঘটনা:
সুলাইমান (عليه السلام)-এর তিন নং মু‘জিযায় উল্লেখ করা হয়েছে, আল্লাহ তা‘আলা জিন জাতিকে তাঁর অনুগত করে দিয়েছিলেন। ফলে তিনি যখন কোন কাজের ইচ্ছা করতেন তখন সে কাজ তাঁর সামনে জিনের দ্বারা করিয়ে নিতেন। এ সুযোগে তিনি তাদের দ্বারা বাইতুল মুক্বাদ্দাস পুনঃনির্মাণের কাজ করিয়ে নিলেন। মূলত বায়তুল মুক্বাদ্দাসের নির্মাণ সর্বপ্রথম ফেরেশতাদের মাধ্যমে অথবা আদম (عليه السلام)-এর কোন সন্তানের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় কা‘বা গৃহের ৪০ বছর পর। অতঃপর স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে ইয়া‘কূব (عليه السلام) তা পুননির্মাণ করেন। প্রায় হাজার বছর পর দাঊদ (عليه السلام) তার পুননির্মাণ শুরু করেন এবং সুলাইমান (عليه السلام)-এর হাতে তা সমাপ্ত হয়। কিন্তু মূল নির্মাণ কাজ শেষ হলেও আনুসঙ্গিক কিছু কাজ তখনও অবশিষ্ট থেকে যায়। এমন সময় সুলাইমান (عليه السلام)-এর মৃত্যুকাল ঘনিয়ে আসে। এ কাজগুলো অবাধ্যপ্রবণ জিনদের ওপর ন্যস্ত ছিল। তারা সুলাইমান (عليه السلام)-এর ভয়ে কাজ করত। তারা তাঁর মৃত্যু সংবাদ জানতে পারলে কাজ ফেলে পালাতো। ফলে নির্মাণ কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যেত। তখন সুলাইমান (عليه السلام) আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে তাঁর কাঁচ নির্মিত মেহরাবে প্রবেশ করলেন। যাতে বাইরে থেকে ভেতরে সবকিছু দেখা যায়। তিনি বিধানানুযায়ী ইবাদতের উদ্দেশ্যে লাঠিতে ভর করে দাঁড়িয়ে গেলেন, যাতে রূহ বেরিয়ে যাবার পরেও লাঠিতে ভর দিয়ে দেহ স্বস্থানে দাঁড়িয়ে থাকে। সেটাই হল। আল্লাহ তা‘আলার হুকুমে তাঁর দেহ উক্ত লাঠিতে ভর করে এক বছর দাঁড়িয়ে থাকল। দেহ পচলো না, খসলো না বা পড়েও গেল না। জিনেরা ভয়ে চলে যায়নি। ফলে তারা হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে কাজ শেষ করে ফেলল। এভাবে কাজ সমাপ্ত হলে আল্লাহ তা‘আলার হুকুমে কিছু উইপোকা লাঠি খেয়ে ফেলার কারণে তা ভেঙ্গে পড়লে তিনি দাঁড়ানো অবস্থা থেকে পড়ে যান। তখন জিনেরা বুঝতে পারল সুলাইমান (عليه السلام) অনেক আগেই মারা গেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: জিনেরা যদি গায়েবের খবর জানত তাহলে তারা এ শাস্তিমূলক নির্মাণ কাজ করত না। অতএব জানা গেল জিনেরাও গায়েবের খবর জানে না। এ বিষয়ে জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই আছে। কোন নাবী-রাসূল, আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্যশীল ফেরেশতাদেরও এ জ্ঞান নেই।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. সুলাইমান (عليه السلام)-এর প্রতি যে সকল নেয়ামত দান করা হয়েছিল সে সম্পর্কে জানা গেল।
২. কৃতজ্ঞ বান্দাদের সংখ্যা খুবই কম। আর অকৃতজ্ঞ লোকদের সংখ্যাই বেশি। সুতরাং দল বড় হলেই মনে করা যাবে না যে, এরাই সঠিক পথের অনুসারী।
৩. আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত কেউ অদৃশ্যের খবর জানেন না, এমনকি নাবী রাসূলগণও নয় এবং জিনেরাও নয়।
৪. মৃত্যুর নির্ধারিত সময় উপস্থিত হলে নাবী-রাসূল যে-ই হোক না কেন এক মুহূর্তও সুযোগ থাকে না। যদিও নাবীদেরকে স্বাধীনতা দেয়া হয়।
৫. আল্লাহ তা‘আলা কোন কাজ করতে চাইলে তা যে কোন উপায়ে করিয়ে নেন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর মৃত্যুর অবস্থা বর্ণনা। করছেন। হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর মৃত্যুর পরেও তাঁর মৃতদেহটি তাঁর লাঠির উপর ভর করে দাঁড়িয়েই ছিল। তাঁর অধীনস্থ জ্বিনেরা তিনি জীবিতই আছেন ভেবে মাথা নীচু করে বড় বড় কঠিন কাজে লিপ্তই ছিল।
হযরত মুজাহিদ (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এভাবেই প্রায় এক বছর কেটে যায়। যে লাঠিটির সাহায্যে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন তাতে যখন উই ধরে ওটাকে খেয়ে শেষ করে দেয় তখন তাঁর মৃতদেহ পড়ে যায়। ঐ সময় তারা তার মৃত্যুর খবর জানতে পারে। তখন শুধু মানুষই নয়, বরং জ্বিনদেরও এ দৃঢ় বিশ্বাস জনিলো যে, তাদের মধ্যে কেউই গায়েবের খবর রাখে না।
একটি মুনকার ও গারীব মারফু হাদীসে আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, হযরত সুলাইমান (আঃ) যখন নামাযে দাঁড়াতেন তখন সামনে কোন গাছ দেখতে পেলে জিজ্ঞেস করতেনঃ “তোমার নাম কি? তোমার দ্বারা কি কাজ হয়?” গাছটি তখন তার নাম বলতো এবং কি কাজে ব্যবহৃত হয় সেটাও বলতো। তখন হযরত সুলাইমান (আঃ) ওটাকে ঐ কাজেই ব্যবহার করতেন। একবার তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে যান এবং একটি গাছ দেখতে পেয়ে ওকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার নাম কি? উত্তরে গাছটি বলেঃ “আমার নাম খারূব।” আবার তিনি গাছটিকে প্রশ্ন করেনঃ “তুমি কি কাজে লাগবে?” গাছটি জবাব দেয়ঃ “এই ঘরকে উজাড় ও ধ্বংস করার কাজে আমি ব্যবহৃত হবো।” তখন হযরত সুলাইমান (আঃ) প্রার্থনা করলেনঃ “হে আল্লাহ! আমার মৃত্যুর খবর আপনি জ্বিনদেরকে জানতে দিবেন না। যাতে মানুষের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, জ্বিনেরা গায়েব জানে না।”
অতঃপর তিনি একটি লাঠির উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং জ্বিনদেরকে কঠিন কাজে লাগিয়ে দিলেন। এমতাবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়ে গেল। কিন্তু লাঠির উপর তার মৃতদেহ দাঁড়িয়েই ছিল। জ্বিনেরা তাকে দেখছিল আর ভাবছিল যে, তিনি জীবিতই আছেন। সুতরাং তারা তাদের উপর অর্পিত কাজ করতেই থাকলো। এভাবেই এক বছর কেটে গেল। হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর লাঠিতে উঁই ধরলো এবং লাঠিকে খেতে শুরু করলো। এক বছরে ঐ লাঠিকে খেয়ে শেষ করে দিলো। তখন হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর মৃতদেহ মাটিতে পড়ে গেল। তখন মানুষ জানতে পারলো যে, জ্বিনেরা গায়েবের খবর রাখে না। তা না হলে। দীর্ঘ এক বছর তারা এ কঠিন কাজে লিপ্ত থাকতো না।” (এ হাদীসটি তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে কিন্তু হাদীসটি মার’রূপে বর্ণিত হওয়া সঠিক নয়)
কোন কোন সাহাবী (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে যে, কোন সময় তিন বছর ধরে এবং কোন সময় দু' বছর ধরে মসজিদে কুদসে ইতেকাফে বসে যাওয়া হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর অভ্যাস ছিল। প্রত্যহ সকালে তিনি তাঁর সামনে একটি গাছ দেখতে পেতেন। তিনি গাছটিকে ওর নাম জিজ্ঞেস করতেন এবং ওর। উপকারিতা কি তা জানতে চাইতেন। গাছটি বলতো এবং তিনি ওকে ঐ কাজে ব্যবহার করতেন। অবশেষে একটি গাছ প্রকাশিত হয় এবং ওটা নিজের নাম ‘খারূবাহ' বলে। হযরত সুলাইমান (আঃ) ওকে প্রশ্ন করেনঃ “তোমার উদ্দেশ্য কি?” গাছটি জবাবে বলেঃ “এই মসজিদকে ধ্বংস করার জন্যে আমি প্রকাশিত হয়েছি। হযরত সুলাইমান (আঃ) বুঝতে পারলেন। সুতরাং তিনি গাছটিকে বললেনঃ “আমার জীবিতাবস্থায় তো এই মসজিদ ধ্বংস হবে না। অবশ্যই তুমি আমার মৃত্যু ও ধ্বংসের জন্যেই প্রকাশিত হয়েছে। তিনি গাছটিকে তার বাগানে লাগিয়ে দিলেন। মসজিদের মধ্যে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে তার লাঠির উপর ভর করে তিনি নামায শুরু করে দেন। সেখানেই তার মৃত্যু হয়ে যায়। কেউই তা জানতে পারলো না। শয়তানরা তার আদেশ অনুযায়ী নিজ নিজ দায়িত্ব প্রতিপালনে লেগে থাকলো। তারা চিন্তা করছিল যে, যদি তাদের কাজে কোন শৈথিল্য প্রকাশ পায় এবং আল্লাহর নবী হযরত সুলাইমান (আঃ) তা দেখে নেন তবে তাদেরকে কঠিন শাস্তি দিবেন। তারা মেহরাবের সামনে ও পিছনে এসে গেল। তাদের মধ্যে যে একজন বড় দুষ্ট শয়তান ছিল সে বললোঃ “দেখো, এর আগে ও পিছনে ছিদ্র রয়েছে। যদি আমি এখান হতে গিয়ে সেখান হতে বেরিয়ে আসতে পারি তবে তোমরা আমার শক্তির কথা স্বীকার করবে তো?” অতঃপর সে গেল এবং বেরিয়ে আসলো। কিন্তু সে হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর কোন শব্দ শুনতে পেলো না। কিন্তু সে তো তাঁর দিকে তাকিয়ে তাঁকে দেখতে পারছিল না। কেননা, তাঁর দিকে তাকালেই সে জ্বলে পুড়ে মরে যেতো। কিন্তু তার মনে সন্দেহের উদ্রেক হলো। সুতরাং সে আরো সাহস দেখালো। সে মসজিদের মধ্যে চলে গেল। দেখলো যে, সেখানে যাওয়ার পরেও সে জুলে পুড়ে গেল না। কাজেই তার সাহস আরো বেড়ে গেল। সে চোখ ভরে তাকে দেখলো। তখন দেখলো যে, তিনি পড়ে আছেন এবং তাঁর মৃত্যু হয়ে গেছে। তখন এসে সে সবাইকে খবর দিলো। লোকেরা আসলো এবং মেহরাব খুলে দেখলো যে, সত্যিই আল্লাহর নবী (আঃ) ইন্তেকাল করেছেন। তারা তাঁকে মসজিদ হতে বের করে আনলো। তার ইন্তেকাল কতদিন পূর্বে হয়েছে তা পরীক্ষা করার জন্যে তারা তাঁর লাঠিকে উঁই এর সামনে রেখে দিলো। একদিন ও একরাত ধরে উঁই লাঠিটিকে যে পরিমাণ খেলো তা দেখে তারা অনুমান করলো যে, এক বছর পূর্বে তার মৃত্যু হয়েছে। সমস্ত লোকের তখন দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিলো যে, জ্বিনেরা যে গায়েবের খবর জানে বলে দাবী করে তা সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। তা না হলে দীর্ঘ এক বছর ধরে তারা লাঞ্ছনাজক শাস্তিতে আবদ্ধ থাকতো না। ঐ সময় হতে জ্বিনেরা ঘুণের পোকাকে মাটি ও পানি এনে দেয়। এটা যেন তাদের ঘুণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। তারা পোকাগুলোকে একথাও বলেছিলঃ “তোমরা যদি কিছু খেতে ও পান করতে তবে আমরা ভাল ভাল খাদ্য তোমাদেরকে এনে দিতাম।”
কিন্তু এগুলো সব বানী ইসরাঈলের আলেমদের কথা। তবে তাদের এ কথাগুলোর যেটা হক বা সত্য সেটা আমাদের কাছে গ্রহণীয়। আর যা সত্যের বিপরীত তা বর্জনীয়। এগুলোকে না সত্য বলে মেনে নেয়া যায়, না মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেয়া যায়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের। অধিকারী।
হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত সুলাইমান (আঃ) মালাকুল মাউতকে বলে রেখেছিলেনঃ “আমার মৃত্যুর সময়টা আমাকে কিছুকাল পূর্বে জ্ঞাত করাবেন।” তার এ কথা অনুযায়ী মালাকুল মাউত (মৃত্যুর ফেরেশতা) তাঁকে তাঁর মৃত্যুর সময়টা জানিয়ে দিলেন। তখন তিনি দরবিহীন একটি শীশার ঘর নির্মাণ করার জন্যে জ্বিনদেরকে আদেশ করলেন। তাতে তিনি একটি লাঠির উপর ভর করে নামায শুরু করে দিলেন। এটা তার মৃত্যু-ভয়ের কারণে ছিল না। মালাকুল মাউত সময়মত এসে যান এবং তাঁর রূহ কবয করে নিয়ে চলে যান। অতঃপর তার মৃতদেহ এক বছর ধরে লাঠির উপর দাঁড়িয়েই থাকে। জ্বিনেরা তাঁকে জীবিত মনে করে নিজেদের কাজে লেগেই থাকে। কিন্তু যে পোকা তাঁর লাঠিকে খাচ্ছিল, যখন অর্ধেক খেয়ে ফেলেছে তখন ঐ লাঠি আর তার মৃতদেহ ধরে রাখতে সক্ষম হয়নি। সুতরাং তার মৃতদেহ পড়ে যায়। তখন জ্বিনেরা জানতে পারে যে, তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। অতঃপর তারা সেখান থেকে পলায়ন করে। পূর্বযুগীয় গুরুজন হতে আরো বহু কিছু বর্ণিত আছে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।