সূরা আস-সাজদাহ (আয়াত: 10)
হরকত ছাড়া:
وقالوا أئذا ضللنا في الأرض أئنا لفي خلق جديد بل هم بلقاء ربهم كافرون ﴿١٠﴾
হরকত সহ:
وَ قَالُوْۤا ءَ اِذَا ضَلَلْنَا فِی الْاَرْضِ ءَ اِنَّا لَفِیْ خَلْقٍ جَدِیْدٍ ۬ؕ بَلْ هُمْ بِلِقَآیِٔ رَبِّهِمْ کٰفِرُوْنَ ﴿۱۰﴾
উচ্চারণ: ওয়া কা-লূ ইযা-দালালনা-ফিল আরদিআইন্না-লাফী খালকিন জাদীম বাল হুম বিলিকাই রাব্বিহিম কা-ফিরূন।
আল বায়ান: আর তারা বলে, ‘আমরা যখন মাটিতে মিশে যাব তখন কি আবার নতুন সৃষ্টি হব’? বরং তারাতো তাদের রবের সাক্ষাৎকে অস্বীকারকারী।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১০. আর তারা বলে, আমরা মাটিতে হারিয়ে গেলেও কি আমরা হবো নূতন সৃষ্টি? বরং তারা তাদের রবের সাক্ষাতের সাথে কুফরিকারী।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তারা বলে, কী! আমরা মাটিতে মিশিয়ে গেলেও কি আমাদেরকে আবার নতুন ক’রে সৃষ্টি করা হবে? বরং তারা তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎকে অস্বীকার করে।
আহসানুল বায়ান: (১০) ওরা বলে, ‘আমরা মাটিতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও কি আমাদেরকে আবার নতুন করে সৃষ্টি করা হবে?’ [1] আসলে ওরা ওদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎকে অস্বীকার করে।
মুজিবুর রহমান: তারা বলেঃ আমরা মাটিতে পর্যবসিত হলেও কি আমাদেরকে আবার নতুন করে সৃষ্টি করা হবে? বস্তুতঃ তারা তাদের রবের সাক্ষাৎকার অস্বীকার করে।
ফযলুর রহমান: তারা বলে, “(মৃত্যুর পর) আমরা যখন মাটিতে হারিয়ে যাব তার পরও কি আমাদেরকে নতুন করে সৃষ্টি করা হবে?” আসলে তারা তাদের প্রভুর (সাথে) সাক্ষাতকে অবিশ্বাস করে।
মুহিউদ্দিন খান: তারা বলে, আমরা মৃত্তিকায় মিশ্রিত হয়ে গেলেও পুনরায় নতুন করে সৃজিত হব কি? বরং তারা তাদের পালনকর্তার সাক্ষাতকে অস্বীকার করে।
জহুরুল হক: আর তারা বলে -- "কি, যখন আমরা মাটিতে মিলিয়ে যাই, তখন কি আমরা নতুন সৃষ্টিতে পৌঁছব?" বস্তুত তারা তাদের প্রভুর সাথে মুলাকাত হওয়া সন্বন্ধে অবিশ্বাসী।
Sahih International: And they say, "When we are lost within the earth, will we indeed be [recreated] in a new creation?" Rather, they are, in [the matter of] the meeting with their Lord, disbelievers.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১০. আর তারা বলে, আমরা মাটিতে হারিয়ে গেলেও কি আমরা হবো নূতন সৃষ্টি? বরং তারা তাদের রবের সাক্ষাতের সাথে কুফরিকারী।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১০) ওরা বলে, ‘আমরা মাটিতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও কি আমাদেরকে আবার নতুন করে সৃষ্টি করা হবে?” [1] আসলে ওরা ওদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎকে অস্বীকার করে।
তাফসীর:
[1] যখন এক বস্তুর উপর অন্য এক বস্তু প্রভাবশালী হয় এবং পূর্বের সমস্ত চিহ্নকে মিটিয়ে দেয়, তখন তাকে ضلالة (নিশ্চিহ্ন হওয়া) বলা হয়। এখানে (ضَلَلْنَا فِي الأَرْضِ) এর অর্থ হবে, মাটিতে মিশে আমাদের দেহ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও কি---।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১০-১১ নং আয়াতের তাফসীর:
যখন এক বস্তুর ওপর অন্য বস্তু প্রভাবশালী হয় এবং পূর্বের সমস্ত চিহ্নকে মিটিয়ে দেয়, তখন তাকে ضلالة বলা হয়। এখানে
ضللنا في الأرض
এর অর্থ হবে মাটিতে মিশে আমাদের দেহ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও কি আমাদের পুনরুত্থান করা হবে? অর্থাৎ কাফির-মুশরিকরা এটা বিশ্বাস করত না যে, মৃত্যুর পর তাদেরকে পুনরায় জীবিত করা হবে, এটা সম্ভব হতে পারে না। তাই তারা এরূপ প্রশ্ন করত। তারা বলত:
(وَلَئِنْ قُلْتَ إِنَّكُمْ مَّبْعُوْثُوْنَ مِنْۭ بَعْدِ الْمَوْتِ لَيَقُوْلَنَّ الَّذِيْنَ كَفَرُوْآ إِنْ هٰذَآ إِلَّا سِحْرٌ مُّبِيْنٌ)
“তুমি যদি বল: ‘মৃত্যুর পর তোমরা অবশ্যই উত্থিত হবে’, কাফিররা নিশ্চয়ই বলবে, ‘এটা তো সুস্পষ্ট জাদু।’ (সূরা হূদ ১১:৭) মূলত তারা পুনরুত্থানকে অসম্ভব মনে করে অস্বীকার করত।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তোমাদের জন্য নিযুক্ত ফেরেশতা তোমাদের প্রাণ হরণ করবে। অর্থাৎ যখন নির্ধারিত সময় উপস্থিত হবে তখন “মালাকূল মাউত ও তার সাথে অন্যান্য ফেরেশতারা প্রাণ হরণ করে নিবে। সেই সুনির্দিষ্ট সময় থেকে ক্ষণকালের জন্যও অবকাশ দেয়া হবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلَنْ يُّؤَخِّرَ اللّٰهُ نَفْسًا إِذَا جَا۬ءَ أَجَلُهَا ط وَاللّٰهُ خَبِيْرٌۭبِمَا تَعْمَلُوْنَ)
“নির্ধারিত কাল যখন উপস্থিত হবে, তখন আল্লাহ কাউকেও অবকাশ দেবেন না। তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত।” (সূরা মুনাফিক ৬৩:১১)
প্রকৃতপক্ষে মৃত্যুর মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা “মালাকুল মাউত” ফেরেশতাকে তিনি এ কাজে নিযুক্ত রেখেছেন আর অন্যান্য যারা আছে তারা হল মালাকুল মাউতের সাহায্যকারী। আল্লাহ তা‘আলার অনুমতি ব্যতীত মৃত্যুদান করার ক্ষমতা কারো নেই। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(وَمَا كَانَ لِنَفْسٍ أَنْ تَمُوْتَ إِلَّا بِإِذْنِ اللّٰهِ كِتٰبًا مُّؤَجَّلًا)
“আর আল্লাহর আদেশ ব্যতীত ধার্যকৃত লিপিবদ্ধ নির্দিষ্ট সময়ে কেউই মৃত্যু বরণ করে না।” (সূরা আলি ইমরান ৩:১৪৫) যেহেতু মালাকুল মাউত মানুষের আত্মা কবয করার দায়িত্বে নিযুক্ত তাই তার দিকে সম্পৃক্ত করে বলা হয়েছে, মালাকুল মাউত তোমাদের মৃত্যু দেয়।
মালাকুল মাউত সম্পর্কে প্রখ্যাত মুফাসসির মুজাহিদ বলেন: মালাকুল মাউতের সামনে গোটা বিশ্ব কোন ব্যক্তির সামনে রক্ষিত বিভিন্ন খাবার সামগ্রীপূর্ণ একটি থালার মত, তিনি যা ইচ্ছা থালা থেকে তুলে নেন। মালাকুল মাউত মানুষের মত অন্যান্য জীবজন্তুর প্রাণ কবয করেন কিনা তা নিয়ে একাধিক মত পাওয়া যায়। ইমাম মালেক (رحمه الله) বলেন: তিনি অন্যান্য কীট-পতঙ্গেরও প্রাণ কবয করে থাকে। কিন্তু কতিপয় বর্ণনা দ্বারা জানা যায়নফেরেশতাগণের দ্বারা আত্মার বিয়োগ ঘটানো কেবল মানুষের জন্য নির্দিষ্ট তাদের মর্যাদার দিকে লক্ষ্য রেখে। অন্যান্য জীব-জন্তু আল্লাহ তা‘আলার অনুমতিতে মারা যায়। (কুরতুবীর বরাত দিয়ে ইবনু আতিয়্যাত বর্ণনা করেছেন)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. মানুষকে মৃত্যুর পর আল্লাহ তা‘আলার নিকটেই ফিরে যেতে হবে।
২. আল্লাহ তা‘আলার অনুমতি ছাড়া কেউ মৃত্যু দান করতে পারে না। তবে মালাকূল মাউত ফেরেশতাকে শুধু একাজে নিযুক্ত করে রাখা হয়েছে।
৩. মানুষকে মৃত্যুর পর হিসাব-নিকাশের জন্য পুনরায় জীবিত করা হবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১০-১১ নং আয়াতের তাফসীর
কাফিরদের আকীদা বা বিশ্বাস সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে। মৃত্যুর পর পুনর্জীবনে তারা বিশ্বাসী নয়। ওটা তারা অসম্ভব বলে মনে করে। তারা বলে থাকেঃ যখন আমরা মরে সড়ে পচে যাবো এবং আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছিন্ন ভিন্ন হয়ে মাটির সাথে মিশে যাবে, তারপর আবার কি আমাদেরকে নতুনভাবে সৃষ্টি করা হবে? দুঃখের কথা এই যে, আল্লাহকে তারা নিজেদের সাথে তুলনা করে থাকে। তারা তাদের সীমাবদ্ধ শক্তিকে আল্লাহর অসীম শক্তির সাথে তুলনা করে। তারা জানে ও স্বীকার করে যে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে প্রথমে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু বড়ই আশ্চর্যজনক কথা এই যে, দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করারও শক্তি যে তার আছে এটা তারা স্বীকার করে না। অথচ তারা তো তাঁরই শক্তিতে চালিত হচ্ছে। তার তো শুধু হুকুম মাত্র। যখনই তিনি কোন কিছুকে বলেনঃ হও, আর তেমনি তা হয়ে যায়। এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা বলেন যে, তারা তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎকার অস্বীকার করে।
এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমাদের জন্যে নিযুক্ত ফেরেশতা তোমাদের প্রাণ হরণ করবে। এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, মালাকুল মাউত’ একজন ফেরেশতার উপাধী। হযরত বারা (রাঃ)-এর ঐ হাদীসটি যার বর্ণনা সূরায়ে ইবরাহীমে গত হয়েছে, ওর দ্বারাও প্রথম কথাটি এটাই বোধগম্য হয়ে থাকে। আর কোন কোন আসারে তার নাম আযরাঈলও (আঃ) রয়েছে এবং এটাই প্রসিদ্ধও বটে। হ্যাঁ, তবে তাঁর সঙ্গী-সাথী ও তার সাথে কাজকারী আরো ফেরেশতা রয়েছেন, যারা দেহ হতে রূহ বের করে থাকেন এবং হুলকুম পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার পর মালাকুল মাউত ওটা নিয়ে নেন। তাদের জন্যে দুনিয়াকে। ছোট করে দেয়া হয়। যেমন আমাদের সামনে খাবারের খাঞ্চা থাকে। মন চায় যে, সেটা এমন স্থানে রাখা হালে যাতে সেটা থেকে খাবার উঠিয়ে নেয়ার সুবিধা হয়। ফেরেশতাদের কাছে দুনিয়াও ঠিক তদ্রুপ।
এই বিষয়ের উপর একটি মুরসাল হাদীসও রয়েছে। আর ওটা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তিও বটে।
জাফর ইবনে মুহাম্মাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি তাঁর পিতাকে বলতে শুনেছেনঃ একজন আনসারীর শিয়রে মালাকুল মাউতকে দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “হে মালাকুল মাউত! আমার সাহাবীর রূহ সহজভাবে কব করুন।” মালাকুল মাউত উত্তরে বললেনঃ “হে আল্লাহর নবী (সঃ)! আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন ও চিত্তকে আনন্দিত রাখুন। কেননা, আমি প্রত্যেক মুমিনের ব্যাপারে কোমলতা অবলম্বন করে থাকি। শুনুন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর শপথ! সারা দুনিয়ার প্রত্যেক কাঁচাপাকা ঘরে, স্থলে হালে বা জলে হালে, প্রত্যেক দিন আমি পাঁচবার চক্কর লাগিয়ে থাকি। তাদের ছোট ও বড় নিজেদেরকে যতটা চিনে তার চেয়ে বেশী আমি তাদেরকে চিনি। হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আল্লাহর শপথ! আল্লাহর আদেশ না হওয়া পর্যন্ত আমি একটি মশারও জান কবয করতে পারি না।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত জাফর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, মালাকুল মাউতের দিনের মধ্যে পাঁচবার একটি মানুষের খোঁজ-খবর নেয়ার অর্থ হচ্ছে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের সময় তাকে দেখে নেয়া। যদি সে নামাযের হিফাযতকারী হয় তবে ফেরেশতা তার নিকটে অবস্থান করেন এবং শয়তান তার থেকে দূরে থাকে। শেষ সময়ে ফেরেশতা তাকে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’-এর তালকীন দিয়ে থাকেন।
মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, মালাকুল মাউত প্রত্যেকদিন প্রতিটি বাড়ীতে দু’বার করে এসে থাকেন। কা’ব আহবার (রঃ) তো এর সাথে সাথে একথাও বলেন যে, মালাকুল মাউত দরজার উপর অবস্থান করেন এবং সারা দিনের মধ্যে সাতবার দৃষ্টিপাত করেন যে, ঐ বাড়ীর লোকদের মধ্যে কারো জান কবয করার নির্দেশ হয়েছে কি-না।
মহান আল্লাহ বলেনঃ অবশেষে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট প্রত্যানীত হবে। কবর থেকে বের হয়ে হাশরের মাঠে আল্লাহর সামনে তোমাদেরকে হাযির হতে হবে এবং সেখানে তোমরা তোমাদের কৃতকর্মের ফল ভোগ করবে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।