সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 55)
হরকত ছাড়া:
وإذ قلتم يا موسى لن نؤمن لك حتى نرى الله جهرة فأخذتكم الصاعقة وأنتم تنظرون ﴿٥٥﴾
হরকত সহ:
وَ اِذْ قُلْتُمْ یٰمُوْسٰی لَنْ نُّؤْمِنَ لَکَ حَتّٰی نَرَی اللّٰهَ جَهْرَۃً فَاَخَذَتْکُمُ الصّٰعِقَۃُ وَ اَنْتُمْ تَنْظُرُوْنَ ﴿۵۵﴾
উচ্চারণ: ওয়া ইয কুলতুমইয়া-মূছা- লান নু’মিনা লাকা হাত্তা- নারাল্লা-হা জাহরাতান ফা-আখাযাতকুমুসসা-‘ইকাতুওয়া আনতুম তানজুরূন।
আল বায়ান: আর যখন তোমরা বললে, ‘হে মূসা, আমরা তোমার প্রতি ঈমান আনব না, যতক্ষণ না আমরা প্রকাশ্যে আল্লাহকে দেখি’। ফলে বজ্র তোমাদেরকে পাকড়াও করল আর তোমরা তা দেখছিলে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫৫. আর স্মরণ কর, যখন তোমরা বলেছিলে, “হে মূসা আমরা আল্লাহকে প্রকাশ্যভাবে না দেখা পর্যন্ত তোমাকে কখনও বিশ্বাস করব না, ফলে তোমাদেরকে বজ্ৰ পাকড়াও করলো, যা তোমরা নিজেরাই দেখছিলে।
তাইসীরুল ক্বুরআন: স্মরণ কর, যখন তোমরা বলেছিলে, ‘হে মূসা! আমরা আল্লাহকে সরাসরি না দেখা পর্যন্ত তোমাকে কক্ষনো বিশ্বাস করব না’। তখন বজ্র তোমাদেরকে পাকড়াও করেছিল আর তোমরা নিজেরাই তা প্রত্যক্ষ করছিলে।
আহসানুল বায়ান: ৫৫। আর যখন তোমরা বলেছিলে, ‘হে মূসা! আমরা আল্লাহকে প্রত্যক্ষভাবে না দেখা পর্যন্ত তোমাকে কখনো বিশ্বাস করব না।’ তখন তোমরা বজ্রাহত হয়েছিলে এবং নিজেরা তা প্রত্যক্ষ করেছিলে। (1)
মুজিবুর রহমান: এবং যখন তোমরা বলেছিলেঃ হে মূসা! আমরা আল্লাহকে প্রকাশ্যভাবে দর্শন না করা পর্যন্ত তোমাকে বিশ্বাস করবনা - তখন বজ্রপাত তোমাদেরকে আক্রমণ করেছিল এবং তোমরা তা প্রত্যক্ষ করেছিলে।
ফযলুর রহমান: (স্মরণ করো) যখন তোমরা বলেছিলে, “হে মূসা! আমরা আল্লাহকে প্রকাশ্যে না দেখা পর্যন্ত তোমার কথায় বিশ্বাস করব না।” তখনি তোমাদের ওপর বজ্রপাত হল আর তোমরা তা দেখছিলে।
মুহিউদ্দিন খান: আর যখন তোমরা বললে, হে মূসা, কস্মিনকালেও আমরা তোমাকে বিশ্বাস করব না, যতক্ষণ না আমরা আল্লাহকে (প্রকাশ্যে) দেখতে পাব। বস্তুতঃ তোমাদিগকে পাকড়াও করল বিদ্যুৎ। অথচ তোমরা তা প্রত্যক্ষ করছিলে।
জহুরুল হক: আর স্মরণ করো! তোমরা বললে -- “হে মূসা, আমরা তোমার প্রতি কখনো ঈমান আনব না যে পর্যন্ত না আমরা প্রকাশ্যভাবে আল্লাহ্কে দেখতে পাই।” তাই বজ্রাঘাত তোমাদের পাকড়ালো, আর তোমরা তাকিয়ে থাকলে।
Sahih International: And [recall] when you said, "O Moses, we will never believe you until we see Allah outright"; so the thunderbolt took you while you were looking on.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৫৫. আর স্মরণ কর, যখন তোমরা বলেছিলে, “হে মূসা আমরা আল্লাহকে প্রকাশ্যভাবে না দেখা পর্যন্ত তোমাকে কখনও বিশ্বাস করব না, ফলে তোমাদেরকে বজ্ৰ পাকড়াও করলো, যা তোমরা নিজেরাই দেখছিলে।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: ৫৫। আর যখন তোমরা বলেছিলে, ‘হে মূসা! আমরা আল্লাহকে প্রত্যক্ষভাবে না দেখা পর্যন্ত তোমাকে কখনো বিশ্বাস করব না।’ তখন তোমরা বজ্রাহত হয়েছিলে এবং নিজেরা তা প্রত্যক্ষ করেছিলে। (1)
তাফসীর:
(1) তূর পাহাড়ে তাওরাত আনতে যাওয়ার সময় মূসা (আঃ) ৭০ জন লোককে সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন। প্রত্যাবর্তনকালে তারা মূসা (আঃ)-কে বলল, মহান আল্লাহকে প্রকাশ্যে না দেখা পর্যন্ত আমরা তোমার কথা বিশ্বাস করার জন্য প্রস্তুত নই। তাই শাস্তি স্বরূপ তাদের উপর বজ্রপাত হয় এবং তারা মারা যায়। আর তাদের প্রত্যক্ষ করার অর্থ হল, প্রথমে যাদের উপর বজ্রপাত হয়েছিল শেষের লোকেরা তা প্রত্যক্ষ করছিল এবং দেখতে দেখতে সকলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৪৯-৫৭ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা‘আলার গযবে ধ্বংসপ্রাপ্ত পৃথিবীর আদি ৬টি জাতির মধ্যে কওমে নূহ, ‘আদ, সামূদ, লূত ও কওমে মাদইয়ানের বর্ণনার পর ৬ষ্ঠ গযবপ্রাপ্ত জাতি হিসেবে এখানে ফির‘আউন জাতি সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা আলোচনা করেছেন। এছাড়াও কুরআনের ২৭টি সূরায় ৭৫টি স্থানে বিভিন্ন প্রসঙ্গে এদের আলোচনা রয়েছে। (তারীখুল আম্বিয়া ১/১৩৬)
আল্লাহ তা‘আলা তাদের কাছে প্রসিদ্ধ উলূল আযম নাবী মূসা ও বড় ভাই হারুনকে প্রেরণ করেছিলেন। কুরআনে সর্বাধিক আলোচিত জাতি হল এরা। যেন উম্মতে মুহাম্মাদী ফির‘আউনের জাতির চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য এবং তাদের সীমালঙ্ঘনের মাত্রা ও তাদের পরিণতি দেখে হুশিয়ার হয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ) ও ফির‘আউনের কাহিনীকে এত গুরুত্ব দিয়েছেন যে, অধিকাংশ সূরায় এর কিছু না কিছু আলোচনা করেছেন। কারণ এ নাবীর জীবন চরিত ও দাওয়াতী বিবরণে এবং ফির‘আউনের অবাধ্যতায় অগণিত শিক্ষা, আল্লাহ তা‘আলার অপার শক্তি ও অনুগ্রহের বিস্ময়কর রহস্যসমূহ সন্নিবেশিত হয়েছে। এ আলোচনার মাধ্যমে আসমানী কিতাবধারী ইয়াহূদী-খ্রিস্টানদের পেছনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া এবং শেষ নাবীর ওপর ঈমান আনার পক্ষে যৌক্তিকতা উপস্থাপন করা হয়েছে। নিম্নে এদের বিবরণ তুলে ধরা হলো:
বানী ইসরাঈল, মূসা (আঃ) ও ফির‘আউনের সংক্ষিপ্ত পরিচয়:
ইবরাহীম (আঃ)-এর কনিষ্ঠ পুত্র ইসহাক (আঃ)-এর পুত্র ইয়া‘কূব (আঃ)-এর অপর নাম ‘ইসরাঈল’। হিব্রু ভাষায় ‘ইসরাঈল’অর্থ আল্লাহ তা‘আলা দাস। সে হিসেবে ইয়া‘কূব (আঃ)-এর বংশধরকে ‘বানু ইসরাঈল’বলা হয়।
ইয়া‘কূব (আঃ)-এর আদি বাসস্থান ছিল কেন‘আনে, যা বর্তমান ফিলিস্তিন এলাকায় অবস্থিত। তখনকার সময় ফিলিস্তিন ও সিরিয়া মিলিতভাবে শাম দেশ ছিল। এর গোটা অঞ্চলকে বর্তমানে ‘মধ্যপ্রাচ্য’বলা হয়। ইয়া‘কূব (আঃ)-এর পুত্র ইউসুফ (আঃ) যখন মিসরের মন্ত্রী হন এবং অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় কিন‘আনে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, তখন ইউসুফ (আঃ)-এর আমন্ত্রণে পিতা ইয়া‘কূব (আঃ) সপরিবারে মিসরে চলে আসেন ও বসবাস শুরু করেন। ক্রমে সেখানে তাঁরা আধিপত্য বিস্তার করেন ও সুখ-শান্তিতে দিনাতিপাত করতে থাকেন। পরবর্তীতে পুনরায় মিসর ফির‘আউনের অধিকারে ফিরে আসে। ইউসুফ (আঃ)-এর মৃত্যুর পরে তাঁর ৫ম অধঃস্তন পুরুষ মূসা ও হারুনের সময় নিপীড়ক ফির‘আউন শাসন ক্ষমতায় ছিল, তার নাম রেমেসীস-২।
মূসা (আঃ) হলেন ইবরাহীম (আঃ)-এর ৮ম অধঃস্তন পুরুষ। তাঁর পিতার নাম ‘ইমরান’। তাঁর জন্ম হয় মিসরে আর লালিত-পালিত হন ফির‘আউনের ঘরে। তাঁর জন্ম ও লালন পালন সম্পর্কে কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আলোচিত হয়েছে। তাঁর সহোদর ভাই হারুন ছিলেন তাঁর চেয়ে তিন বছরের বড়। উভয়ের মৃত্যু হয় মিসর ও শামের মধ্যবর্তী তীহ প্রান্তরে বানী ইসরাঈলের ৪০ বছর আটক থাকাকালীন সময়ে। মূসা (আঃ)-এর কবর হয় বায়তুল মুক্বাদ্দাসের উপকণ্ঠে। নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেখানে একটি লাল টিবির দিকে ইশারা করে সে স্থানেই মূসা (আঃ)-এর কবর রয়েছে বলে জানিয়েছেন। (মুত্তাফাক আলাইহি, মিশকাত হা: ৫৭১৩)
ফির‘আউন কোন ব্যক্তির নাম নয়। বরং এটি হল তৎকালীন মিসরের সম্রাটদের উপাধি। কিবতী বংশীয় এ সম্রাটগণ কয়েক শতাব্দীব্যাপী মিসর শাসন করে। এ সময় মিসর সভ্যতা ও সমৃদ্ধির শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিল। লাশ মমিকরণ, পিরামিড, স্ফিংক্র প্রভৃতি তাদের সময়কার বৈজ্ঞানিক উন্নতির প্রমাণ বহন করে।। মূসা (আঃ)-এর সময়কার পরপর দুজন ফির‘আউন ছিল। সর্বসম্মত ইসরাঈলী বর্ণনাও হল এটাই এবং মূসা (আঃ) দু’জনেরই যুগ পান। উৎপীড়ক ফির‘আনের নাম ছিল রেমেসিস-২ এবং ডুবে মরা ফির‘আউন ছিল তার পুত্র মানেপতাহ। লোহিত সাগর সংলগ্ন তিক্ত হ্রদে তিনি সসৈন্য ডুবে মরেন। যার মমি ১৯০৭ সালে আবিষ্কৃত হয় এবং আজও তার লাশ মিসরের পিরামিডে রক্ষিত আছে।
আল্লাহ তা‘আলা বানী ইসরাঈলের প্রতি প্রদত্ত নেয়ামতগুলো ধারাবাহিকভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছেন: স্মরণ কর, তোমাদের পুত্র সন্তানদের হত্যা করে ফির‘আউন জঘন্যতম শাস্তি দিত। আমি তোমাদেরকে মূসা (আঃ)-এর মাধ্যমে মুক্তি দিয়েছি। ঘটনাটির সারসংক্ষেপ হলো- একদা ফির‘আন স্বপ্নে দেখে যে, বায়তুল মুক্বাদ্দিসের দিক হতে এক আগুন এসে মিসরের প্রত্যেক কিবতীর ঘরে প্রবেশ করছে, কিন্তু তা বানী ইসরাঈলের ঘরে যায়নি। এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা ছিল এই যে, বানী ইসরাঈলের মধ্যে এমন একটি ছেলে জন্ম গ্রহণ করবে যার হাতে তার অহঙ্কার চূর্ণ হয়ে যাবে। তাই সে চারদিকে নির্দেশ জারি করে দিল যে, বানী ইসরাঈলের ঘরে যে সন্তান জন্মগ্রহণ করবে সরকারি লোক দ্বারা যাচাই করে দেখবে। যদি পুত্র সন্তান হয় তৎক্ষণাৎ তাকে মেরে ফেলবে। আর যদি কন্যা সন্তান হয় তবে তাকে ছেড়ে দিবে। এ নীতি চালু অবস্থায় আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-কে ঐ ফেরআউনের ঘরেই লালিত-পালিত করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, পরিণত বয়সে নবুয়তী পেয়ে ফির‘আউনের এ নির্যাতন থেকে মুক্তি লাভ করার পর মূসা (আঃ)-এর সাথে স্বদেশ ত্যাগকালে যখন ফির‘আউন দলবল নিয়ে তোমাদেরকে পাকড়াও করতে এসেছিল আর তোমরা এমতাবস্থায় সমুদ্রের উপকূলে ছিলে যখন তোমাদের নাজাতের কোন উপায় ছিল না, এমতাবস্থায় আমি তোমাদের জন্য সমুদ্রের মধ্য দিয়ে রাস্তা তৈরি করে দিলাম আর তোমরা মুক্তি পেলে। সুতরাং এসব নেয়ামত পেয়ে আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় করা উচিত এবং তাঁর বিধান মেনে চলা উচিত।
(وَإِذْ وَاعَدْنَا)
‘আর যখন আমি মূসার সঙ্গে চল্লিশ রাত্রির অঙ্গীকার করেছিলাম’এখানে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-কে তাওরাত দেয়ার জন্য যে ৪০ দিনের ওয়াদা দিয়েছিলেন সে নেয়ামতের কথা আলোচনা করেছেন। প্রথমে ত্রিশ দিনের ওয়াদা দিয়েছিলেন পরে দশ দিন বাড়িয়ে দিয়ে চল্লিশ দিন পূর্ণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَوٰعَدْنَا مُوْسٰی ثَلٰثِیْنَ لَیْلَةً وَّاَتْمَمْنٰھَا بِعَشْرٍ فَتَمَّ مِیْقَاتُ رَبِّھ۪ٓ اَرْبَعِیْنَ لَیْلَةً)
“স্মরণ কর, মূসার জন্য আমি ত্রিশ রাত্রি নির্ধারণ করি এবং আরও দশ দ্বারা সেটা পূর্ণ করি। এভাবে তার প্রতিপালকের নির্ধারিত সময় চল্লিশ রাত্রিতে পূর্ণ হয়।”(সূরা আ‘রাফ ৭:১৪২)
কিন্তু তারা সময় হওয়ার পূর্বেই ধৈর্যহারা হয়ে গেল। এমনকি মূসা (আঃ) চলে যাবার পর তারা গো-বৎসের পূজা/উপাসনা করতে শুরু করে দিল, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের ওপর জুলুম করল। তারপরও আল্লাহ তা‘আলা একজন আরেকজনকে হত্যা করার মাধ্যমে তাওবাহ করার নির্দেশ দিলেন এবং এর মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন যাতে তারা শুকরিয়া আদায় করে।
অতঃপর মূসা (আঃ) তাঁর সম্প্রদায়কে বললেন: তোমরা গো-বৎসকে তোমাদের মা‘বূদরূপে গ্রহণ করে নিজেদের ওপর জুলুম করেছ। অতএব একজন আরেকজনকে হত্যা করার মাধ্যমে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট তাওবাহ কর। জাহান্নামে চিরস্থায়ী থাকার চেয়ে এটা তোমাদের জন্য উত্তম। তারপর আল্লাহ তা‘আলা তাদের অবাধ্যতার সীমালঙ্ঘনের কথা তুলে ধরেছেন, যখন তারা আল্লাহ তা‘আলার কথা শুনল তখন মূসাকে বলল: এগুলো যে আল্লাহ তা‘আলার কথা তা আমরা কখনো বিশ্বাস করব না যতক্ষণ না আমরা আল্লাহ তা‘আলাকে দেখতে পাব। তাদের দাবি অনুযায়ী আল্লাহ তা‘আলাকে দেখতে গেলে বজ্রধ্বনি তাদেরকে পাকড়াও করল। যার ফলে তারা সবাই মৃত্যু বরণ করল। অতঃপর মূসা (আঃ)-এর দু‘আয় তাদেরকে পুনরায় জীবন ফিরিয়ে দেয়া হলো। এভাবে তাদের প্রয়োজনীয় মুহূর্তে আল্লাহ তা‘আলা করুণা করে তাদের এ ইহকালীন ও পরকালীন মুক্তির পথ সুগম করেছেন কিন্তু তারা ছিল বড়ই অবাধ্য ও অকৃতজ্ঞ জাতি। নিম্নে তাদের প্রতি প্রদত্ত নিয়ামতকে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো।
আল্লাহ তা‘আলা বানী ইসরাঈলকে যে সকল নেয়ামত প্রদান করেছিলেন তা হল:
১. বানী ইসরাঈলের হিদায়াতস্বরূপ মূসা (আঃ)-কে আসমানী কিতাব তাওরাত প্রদান। (সূরা বাকারাহ ২:৫৩)
২. বিভিন্ন জঘন্য অপরাধ করার পরও আল্লাহর পক্ষ হতে ক্ষমা প্রদান। (সূরা বাকারাহ ২:৫২)
৩. ফির‘আউনের শাস্তি থেকে মুক্তি প্রদান। (সূরা বাকারাহ ২:৪৯)
৪. সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়া থেকে মুক্তি প্রদান। (সূরা বাকারাহ ২:৫০)
৫. বারটি গোত্রের জন্য বারটি ঝর্ণা প্রবাহিত করা। (সূরা বাকারাহ ২:৬০)
৬. আসমানী খাদ্য মান্না ও সালওয়া প্রদান। (সূরা বাকারাহ ২:৫৭)
মান্না ও সালওয়া এক প্রকার আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত খাদ্য যা একমাত্র বানী ইসরাঈলের জন্যই নির্দিষ্ট ছিল। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: সালওয়া হল এক প্রকার ছোট পাখি। ইকরামা বলেন: সালওয়া হল এক প্রকার পাখি যা চড়ুই পাখির ন্যায়। বারী বিন আনাস বলেন: মান্না মধু জাতীয় জিনিস যা তারা পানি দিয়ে মিশিয়ে পান করত।
হাদীসে এসেছে, ব্যাঙ-এর ছাতা মান্নার অর্ন্তভুক্ত, তার পানি চক্ষু রোগের প্রতিষেধক। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৩৯) সঠিক কথা হচ্ছে মান্না হল মিষ্টি জাতীয় আর সালওয়া হল পাখির গোশত।
৭. সকল খাদ্য বানী ইসরাঈল এর জন্য হালাল করা। (সূরা আলি-ইমরান ৩:৯৩)
৮. তাদের মাঝে ধারাবাহিকভাবে নাবী-রাসূলগণের আগমন। যেমন হাদীসে এসেছে:
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ صلي اللّٰه عليه وسلم إِنَّ بَنِي إِسْرَائِيلَ كَانَتْ تَسُوسُهُمْ الْأَنْبِيَاءُ إِذَا مَاتَ نَبِيٌّ قَامَ نَبِيٌّ وَإِنَّهُ لَا نَبِيَّ بَعْدِي
আবূ হুরাইরাই (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, নিশ্চয়ই বানী ইসরাঈদের মধ্যে নাবীগণ ধারাবাহিকভাবে এসেছে। যখন কোন নাবী মারা গেছেন তখনই তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছে অন্য নাবী। আর আমার পরে কোন নাবী নেই। (মুসনাদ আবূ আওয়ানা: ৭১২৮)
৯. স্বাছন্দময় জীবন যাপনের ব্যাবস্থাকরণ।
এ ছাড়াও বানী ইসরাঈলকে আরো অনেক নেয়ামত দান করা হয়েছিল। কিন্তু তারা এত নেয়ামত পাওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তা‘আলার সাথে কুফরী করেছে, মূসা (আঃ)-এর প্রতি ঈমান আনার পরিবর্তে তাঁর বিরোধিতা করেছে। সুতরাং আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত, রাত-দিন আমরা আল্লাহ তা‘আলার কত নেয়ামত ভোগ করছি, তিনি আমাদের ওপর কত অনুগ্রহ করছেন! কখনো যেন আমরা তাঁর সাথে কুফরী না করি, তাঁর নেয়ামত অস্বীকার না করি। বরং সর্বদা তাঁর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করব এবং তাঁর আদেশ নিষেধ মেনে চলব। আল্লাহ তা‘আল্ াআমাদের তাওফীক দিন। (আমীন)!
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. নেয়ামতের কথা স্মরণ করে আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় করা কর্তব্য।
২. আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদেরকে বিভিন্ন বিপদাপদ দ্বারা পরীক্ষা করেন এটা জানার জন্য যে, কারা তাঁর দীনের ওপর অটল থাকে।
৩. বানী ইসরাঈলের প্রতি আল্লাহ তা‘আলার বিভিন্ন নেয়ামতের কথা জানতে পারলাম।
৪. যারা আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলের বিরোধিতা করে তথা ইসলাম বিদ্রোহী হয় তাদের পরিণতি খুব খারাপ, যেমন মূসা (আঃ)-এর বিরোধী বানী ইসরাঈল জাতির হয়েছিল।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৫৫-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর
হযরত মূসা (আঃ) যখন বানী ইসরাঈলের সত্তরজন লোককে সঙ্গে নিয়ে আল্লাহর ওয়াদা অনুযায়ী তূর পাহাড়ে যান এবং ঐ লোকগুলি আল্লাহর কথা শুনতে পায়, তখন তারা মূসা (আঃ) কে বলে যে, তারা আল্লাহকে সামনে না দেখা পর্যন্ত ঈমান আনবে না। এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ প্রশ্নের ফলে দেখতে দেখতেই তাদের উপর আকাশ হতে বিদ্যুৎ পড়ে যায় এবং এক ভয়াবহ উচ্চ শব্দ হয়, তার ফলে তারা সবাই মরে যায়। এদিকে হযরত মূসা (আঃ) বিলাপ করতে থাকেন এবং কেঁদে কেঁদে মহান আল্লাহর নিকট আরজ করেনঃ “হে আল্লাহ্! আমি বানী ইসরাঈলকে কি উত্তর দেবো! এরা তো তাদের মধ্যে উত্তম ও নেতৃস্থানীয় লোক ছিল। হে প্রভু! আপনার এরূপ করার ইচ্ছে থাকলে ইতিপূর্বেই তাদেরকে ও আমাকে মেরে ফেলতেন। হে আল্লাহ! অজ্ঞ লোকেদের অজ্ঞতার কারণে আমাকে ধরবেন না।
তার এ প্রার্থনা কবূল হয় এবং তাকে বলা হয় যে, এরাও বাছুর পূজকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাদের শাস্তি হয়ে গেল। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে জীবিত করেন। মুহাম্মদ বিন ইসহাক বলেন যে, যখন হযরত মূসা (আঃ) তাঁর গোত্রের নিকট আসেন এবং তাদেরকে বাছুর পূজতে দেখেন, তিনি তার ভাই হারূনকে (আঃ) ও সামেরীকে তিরস্কার করেন। অতঃপর বাছুরকে পুড়িয়ে ফেলেন এবং ওর ছাই নদীতে ভাসিয়ে দেন। তারপর তাদের মধ্যে হতে উত্তম লোকদেরকে বেছে নেন। তাদের সংখ্যা ছিল সত্তর। তাওবা করাবার জন্যে তিনি তাদেরকে নিয়ে তূর পাহাড়ে চলে যান। তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তাওবা কর, রোযা রাখ, পবিত্র হয়ে যাও এবং কাপড় পাক কর। যখন হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে নিয়ে ভূরে সীনায় পৌছেন , তখন ঐলোকগুলো বলেঃ “হে নবী (আঃ)! আপনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করুন যেন তিনি তাঁর কথা আমাদেরকেও শুনিয়ে দেন।
হযরত মূসা (আঃ) পাহাড়ের কাছে পৌছলে এক খণ্ড মেঘ এসে সারা পাহাড় ঢেকে নেয় এবং তিনি ওরই ভিতর ভিতর আল্লাহ তা'আলার নিকটবর্তী হয়ে যান। আল্লাহ পাকের কথা আরম্ভ হলে হযরত মূসার (আঃ) কপাল আলোকোজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সেই সময় কেউ তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করার ক্ষমতা রাখতো না। লোকেরা এগিয়ে গেলে তারা মেঘের মধ্যে প্রবেশ করে এবং সবাই সিজদায় পড়ে যায়। হযরত মূসার (আঃ) প্রার্থনার ফলে তাঁর সঙ্গীয় বানী ইসরাঈলও আল্লাহ তা'আলার কথা শুনতে থাকে। তার কথা শেষ হলে মেঘ সরে যায় এবং হযরত মূসা (আঃ) তাদের নিকট চলে আসেন। তখন তারা তাকে বলেঃ “হে মূসা (আঃ)! আমরা কখনও ঈমান আনবো না যে পর্যন্ত আমরা আমাদের প্রভুকে আমাদের সামনে দেখতে পাই। এ ঔদ্ধত্যের ফলে। এক ভূমিকম্প আসে এবং তারা সবাই ধ্বংস হয়ে যায়। এখন হযরত মূসা (আঃ) খাটি অন্তরে প্রার্থনা করতে আরম্ভ করেন এবং বলেন যে, এর চেয়ে তো বরং এর পূর্বেই মরে যাওয়া ভাল ছিল। নির্বোধদের কার্যের জন্যে আল্লাহ পাক যেন তাকে ধ্বংস না করেন। ওরা তো বানী ইসরাঈলের মধ্যে উত্তম লোক ছিল। এখন তিনি একাই ফিরে গেলে তাদেরকে কি উত্তর দেবেন? কেই বা তাঁর কথা বিশ্বাস করবে এবং কেই বা আর তাঁর উপর ঈমান আনবে? সুতরাং আল্লাহ তা'আলা যেন তার তাওবা কবূল করেন ও তার প্রতি দয়া করেন।
হযরত মূসা (আঃ) এভাবে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে প্রার্থনা করতে থাকেন। অবশেষে তার প্রার্থনা মঞ্জুর হয় এবং আল্লাহ ঐ মৃতদেরকে পুনর্জীবিত করেন। এখন সবাই সম্মিলিতভাবে বানী ইসরাঈলের পক্ষ হতে তাওবা করতে আরম্ভ করে। তাদেরকে বলা হয় যে, যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের জীবনকে ধ্বংস করবে এবং একে অপরকে হত্যা করবে, সেই পর্যন্ত তাদের তাওবা ককূল করা হবে না। সুদ্দী কাবীর (রঃ) বলেন যে, এটা বানী ইসরাঈলের পরস্পর রক্তারক্তির পরের ঘটনা। এর দ্বারা এটাও জানা যাচ্ছে যে, এ সম্বোধন সাধারণ হলেও প্রকৃতপক্ষে এটা দ্বারা উদ্দেশ্য এই সত্তর ব্যক্তিই বটে।
ইমাম রাযী (রঃ) স্বীয় তাফসীরে এই সত্তর ব্যক্তির ঘটনায় লিখেন যে, তারা জীবিত হওয়ার পর বলেছিলঃ “হে নবী (আঃ)! আপনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করুন যে, তিনি যেন আমাদেরকে নবী করেন। তিনি প্রার্থনা করেন এবং তা ককূল হয়। কিন্তু এ কথাটি গরীব। হযরত মূসা (আঃ)-এর যুগে হযরত হারূন (আঃ) ছাড়া এবং তার পরে হযরত ইউশা (আঃ) ছাড়া আর কোন নবী থাকার প্রমাণ নেই। আহলে কিতাব এটাও দাবী করে যে, ঐসব লোক তাদের প্রার্থনা অনুযায়ী ঐ স্থানেই আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখেছিল। এটাও ভুল কথা। কেননা, হযরত মূসা (আঃ) স্বয়ং যখন আল্লাহকে দর্শনের প্রার্থনা করেন তখন তাঁকে নিষেধ করা হয়। তাহলে এই সত্তরজন লোক দীদার-ই-ইলাহীর ঔজ্জ্বল্য কিরূপে সহ্য করতো?
এ আয়াতের তাফসীরে আর একটি মত এও আছে যে, তারা বলেঃ হযরত! আমার কি জানি? আল্লাহ স্বয়ং প্রকাশিত হয়ে আমাদেরকে বলেন না কেন? তিনি আপনার সাথে কথা বলবেন আর আমাদের সাথে বলবেন না এর কারণ কি হতে পারে? যে পর্যন্ত না আমরা তাকে স্বচক্ষে দেখতে পাই, কখনও ঈমান আনবো না।' এ কথার কারণে তাদের উপর আল্লাহর ক্রোধ ও অভিশাপ বর্ষিত হয় এবং তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়। পুনরায় জীবিত করা হয়। অতঃপর মূসা (আঃ) তাদেরকে বলেনঃ “এখন তোমরা তাওরাতকে ধরে রাখো।' তারা আবার অস্বীকার করে। এবার ফেরেশতাগণ পাহাড় উঠিয়ে এনে তাদের মাথার উপর লটকিয়ে রেখে বলেন যে, এবার না মানলে তাদের উপর পাহাড় নিক্ষেপ করা হবে। এর দ্বারা এও জানা গেল যে, মৃত্যুর পরে জীবিত হয়ে পুনরায় তারা ‘মুকাল্লাফ’ হয়েছিল অর্থাৎ তাদের প্রতি আল্লাহর আহকাম জারী হয়েছিল। মাঅরদী বলেছেন যে, কেউ কেউ বলেছেনঃ “যখন তারা আল্লাহর এই বড় নিদর্শন দেখলো, মৃত্যুর পরে জীবিত হলো তখন শরীয়তের নির্দেশাবলী তাদের উপর হতে সরে গেল। কেননা, তখন তো তারা সব কিছু মানতে বাধ্য ছিল।
দ্বিতীয় দল বলেন যে, এটা নয়, বরং এটা সত্ত্বেও তাদের উপর শরীয়তের আহকাম জারী থাকবে। কুরতুবী (রঃ) বলেন যে, সঠিক কথা এটাই। এসব ঘটনা তাদের উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘটেছিল। এটা তাদেরকে শরীয়ত পালন হতে আযাদ করতে পারে না। স্বয়ং বানী ইসরাঈলও বড় বড় অলৌকিক ঘটনা দেখেছিল। স্বয়ং তাদের উপরেই এমন এমন ঘটনা ঘটেছিল যা ছিল সম্পূর্ণরূপে অসাধারণ ও স্বভাব বিরুদ্ধ। তা সত্ত্বেও তো তাদের উপর শরীয়তের নির্দেশাবলী চালু ছিল। এ রকমই এটাও। এটাই সঠিক ও স্পষ্ট কথা। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।