আল কুরআন


সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 54)

সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 54)



হরকত ছাড়া:

وإذ قال موسى لقومه يا قوم إنكم ظلمتم أنفسكم باتخاذكم العجل فتوبوا إلى بارئكم فاقتلوا أنفسكم ذلكم خير لكم عند بارئكم فتاب عليكم إنه هو التواب الرحيم ﴿٥٤﴾




হরকত সহ:

وَ اِذْ قَالَ مُوْسٰی لِقَوْمِهٖ یٰقَوْمِ اِنَّکُمْ ظَلَمْتُمْ اَنْفُسَکُمْ بِاتِّخَاذِکُمُ الْعِجْلَ فَتُوْبُوْۤا اِلٰی بَارِئِکُمْ فَاقْتُلُوْۤا اَنْفُسَکُمْ ؕ ذٰلِکُمْ خَیْرٌ لَّکُمْ عِنْدَ بَارِئِکُمْ ؕ فَتَابَ عَلَیْکُمْ ؕ اِنَّهٗ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِیْمُ ﴿۵۴﴾




উচ্চারণ: ওয়া ইযকা-লা মূছা- লিকাওমিহী ইয়া-কাওমি ইন্নাকুম জালামতুম আনফুছাকুম বিত্তিখা-যিকুমুল ‘ইজলা ফাতূবূ ইলা-বা-রিইকুম ফাকতুলূআনফুছাকুম যা-লিকুম খাইরুল্লাকুম ‘ইনদা বা-রিইকুম ফাতা-বা ‘আলাইকুম ইন্নাহূ হুওয়াত্তাওওয়া-বুররাহীম।




আল বায়ান: আর যখন মূসা তার কওমকে বলেছিল, ‘হে আমার কওম, নিশ্চয় তোমরা বাছুরকে (উপাস্যরূপে) গ্রহণ করে নিজদের উপর যুলম করেছ। সুতরাং তোমরা তোমাদের সৃষ্টিকর্তার কাছে তাওবা কর। অতঃপর তোমরা নিজদেরকে হত্যা কর। এটি তোমাদের জন্য তোমাদের সৃষ্টিকর্তার নিকট উত্তম। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের তাওবা কবূল করলেন। নিশ্চয় তিনি তাওবা কবূলকারী, পরম দয়ালু।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫৪. আর ম্মরণ কর,যখন মূসা আপন জাতির লোকদের বললেন, ‘হে আমার জাতি! গো-বৎসকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে তোমরা নিজেদের প্রতি যুলুম করেছ, কাজেই তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করে তোমাদের স্রষ্টার কাছে তাওবা কর। তোমাদের সৃষ্টিকর্তার নিকট এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তারপর তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করেছিলেন। অবশ্যই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।




তাইসীরুল ক্বুরআন: স্মরণ কর, মূসা যখন আপন কওমের লোককে বলল, ‘হে আমার কওম! বাছুরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ ক’রে তোমরা নিজেদের প্রতি কঠিন অত্যাচার করেছ, কাজেই তোমরা তোমাদের সৃষ্টিকর্তার নিকট তাওবাহ কর এবং তোমরা নিজেদেরকে (নিরপরাধীরা অপরাধীদেরকে) হত্যা কর, তোমাদের স্রষ্টার নিকট এটাই শ্রেয়, অতঃপর তিনি তোমাদের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করলেন, তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’




আহসানুল বায়ান: ৫৪। আর মূসা যখন আপন সম্প্রদায়ের লোককে বললেন, হে আমার সম্প্রদায়! গো-বৎসকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে তোমরা নিজেদের প্রতি ঘোর অনাচার করেছ। সুতরাং তোমরা তোমাদের স্রষ্টার দিকে ফিরে যাও (তওবা কর) এবং তোমরা নিজেদেরকে হত্যা কর। তোমাদের স্রষ্টার নিকট এটাই শ্রেয়। তিনি তোমাদের প্রতি ক্ষমাপরায়ণ হবেন। নিশ্চয় তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (1)



মুজিবুর রহমান: আর যখন মূসা স্বীয় সম্প্রদায়কে বললঃ হে আমার সম্প্রদায়! নিশ্চয়ই তোমরা গো-বৎসকে উপাস্য রূপে গ্রহণ করে তোমাদের নিজেদের প্রতি অত্যাচার করেছ। অতএব তোমরা তোমাদের রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তোমরা তোমাদের নিজ নিজ প্রাণ বিসর্জন দাও, তোমাদের রবের নিকট এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর; অনন্তর তিনি তোমাদের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করলেন, নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, করুণাময়।



ফযলুর রহমান: (স্মরণ করো) যখন মূসা তার লোকদেরকে বলেছিল, “হে আমার লোকেরা! তোমরা বাছুরকে উপাস্য বানিয়ে নিজেদের প্রতি জুলুম করেছো। অতএব, তোমাদের স্রষ্টার নিকট তওবা করো এবং নিজেদেরকে (নিজেদের মধ্য থেকে অপরাধীদেরকে) হত্যা কর। তোমাদের স্রষ্টার বিচারে সেটাই তোমাদের জন্য মঙ্গল।” এরপর তিনি তোমাদের তওবা কবুল করেছিলেন। বস্তুত তিনিই তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।



মুহিউদ্দিন খান: আর যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বলল, হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা তোমাদেরই ক্ষতিসাধন করেছ এই গোবৎস নির্মাণ করে। কাজেই এখন তওবা কর স্বীয় স্রষ্টার প্রতি এবং নিজ নিজ প্রাণ বিসর্জন দাও। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর তোমাদের স্রষ্টার নিকট। তারপর তোমাদের প্রতি লক্ষ্য করা হল। নিঃসন্দেহে তিনিই ক্ষমাকারী, অত্যন্ত মেহেরবান।



জহুরুল হক: আর স্মরণ করো! মূসা তাঁর লোকদের বলেছিলেন, -- “হে আমার অনুচরবর্গ, তোমরা নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতি অন্যায় করেছ বাছুরকে গ্রহণ ক’রে, অতএব তোমাদের সৃষ্টিকর্তার দিকে ফেরো ও নিজেদের সংহার করো। ইহা তোমাদের সৃষ্টিকর্তার সমীপে তোমাদের জন্য মঙ্গলময়।” তাই তিনি তোমাদের দিকে ফিরলেন। নিঃসন্দেহ তিনি নিজেই সদা ফেরেন, অফুরন্ত ফলদাতা।



Sahih International: And [recall] when Moses said to his people, "O my people, indeed you have wronged yourselves by your taking of the calf [for worship]. So repent to your Creator and kill yourselves. That is best for [all of] you in the sight of your Creator." Then He accepted your repentance; indeed, He is the Accepting of repentance, the Merciful.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৫৪. আর ম্মরণ কর,যখন মূসা আপন জাতির লোকদের বললেন, ‘হে আমার জাতি! গো-বৎসকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে তোমরা নিজেদের প্রতি যুলুম করেছ, কাজেই তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করে তোমাদের স্রষ্টার কাছে তাওবা কর। তোমাদের সৃষ্টিকর্তার নিকট এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তারপর তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করেছিলেন। অবশ্যই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: ৫৪। আর মূসা যখন আপন সম্প্রদায়ের লোককে বললেন, হে আমার সম্প্রদায়! গো-বৎসকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে তোমরা নিজেদের প্রতি ঘোর অনাচার করেছ। সুতরাং তোমরা তোমাদের স্রষ্টার দিকে ফিরে যাও (তওবা কর) এবং তোমরা নিজেদেরকে হত্যা কর। তোমাদের স্রষ্টার নিকট এটাই শ্রেয়। তিনি তোমাদের প্রতি ক্ষমাপরায়ণ হবেন। নিশ্চয় তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (1)


তাফসীর:

(1) যখন মূসা (আঃ) নিজ সম্প্রদায়কে শির্ক থেকে সতর্ক করলেন, তখন তাদের মধ্যে তাওবা করার প্রেরণা সৃষ্টি হল। তাওবার পদ্ধতি (প্রায়শ্চিত্ত) আপোস-হত্যা নির্বাচিত হল। {فَاقْتُلُوْآ أَنْفُسَكُمْ} (তোমরা নিজেদেরকে হত্যা কর) এই আয়াতের দু'টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে, (ক) সকলকে দুই কাতারে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয় এবং তারা একে অপরকে হত্যা করে। (খ) যারা শির্ক করেছিল তাদেরকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয় এবং যারা শির্ক থেকে বেঁচে ছিল, তাদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। ফলে শির্কমুক্তরা মুশরিকদেরকে হত্যা করে। হতদের সংখ্যা ৭০ হাজার বলা হয়েছ (ইবনে কাসীর ও ফাতহুল ক্বাদীর)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৪৯-৫৭ নং আয়াতের তাফসীর:



আল্লাহ তা‘আলার গযবে ধ্বংসপ্রাপ্ত পৃথিবীর আদি ৬টি জাতির মধ্যে কওমে নূহ, ‘আদ, সামূদ, লূত ও কওমে মাদইয়ানের বর্ণনার পর ৬ষ্ঠ গযবপ্রাপ্ত জাতি হিসেবে এখানে ফির‘আউন জাতি সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা আলোচনা করেছেন। এছাড়াও কুরআনের ২৭টি সূরায় ৭৫টি স্থানে বিভিন্ন প্রসঙ্গে এদের আলোচনা রয়েছে। (তারীখুল আম্বিয়া ১/১৩৬)



আল্লাহ তা‘আলা তাদের কাছে প্রসিদ্ধ উলূল আযম নাবী মূসা ও বড় ভাই হারুনকে প্রেরণ করেছিলেন। কুরআনে সর্বাধিক আলোচিত জাতি হল এরা। যেন উম্মতে মুহাম্মাদী ফির‘আউনের জাতির চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য এবং তাদের সীমালঙ্ঘনের মাত্রা ও তাদের পরিণতি দেখে হুশিয়ার হয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ) ও ফির‘আউনের কাহিনীকে এত গুরুত্ব দিয়েছেন যে, অধিকাংশ সূরায় এর কিছু না কিছু আলোচনা করেছেন। কারণ এ নাবীর জীবন চরিত ও দাওয়াতী বিবরণে এবং ফির‘আউনের অবাধ্যতায় অগণিত শিক্ষা, আল্লাহ তা‘আলার অপার শক্তি ও অনুগ্রহের বিস্ময়কর রহস্যসমূহ সন্নিবেশিত হয়েছে। এ আলোচনার মাধ্যমে আসমানী কিতাবধারী ইয়াহূদী-খ্রিস্টানদের পেছনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া এবং শেষ নাবীর ওপর ঈমান আনার পক্ষে যৌক্তিকতা উপস্থাপন করা হয়েছে। নিম্নে এদের বিবরণ তুলে ধরা হলো:



বানী ইসরাঈল, মূসা (আঃ) ও ফির‘আউনের সংক্ষিপ্ত পরিচয়:



ইবরাহীম (আঃ)-এর কনিষ্ঠ পুত্র ইসহাক (আঃ)-এর পুত্র ইয়া‘কূব (আঃ)-এর অপর নাম ‘ইসরাঈল’। হিব্রু ভাষায় ‘ইসরাঈল’অর্থ আল্লাহ তা‘আলা দাস। সে হিসেবে ইয়া‘কূব (আঃ)-এর বংশধরকে ‘বানু ইসরাঈল’বলা হয়।



ইয়া‘কূব (আঃ)-এর আদি বাসস্থান ছিল কেন‘আনে, যা বর্তমান ফিলিস্তিন এলাকায় অবস্থিত। তখনকার সময় ফিলিস্তিন ও সিরিয়া মিলিতভাবে শাম দেশ ছিল। এর গোটা অঞ্চলকে বর্তমানে ‘মধ্যপ্রাচ্য’বলা হয়। ইয়া‘কূব (আঃ)-এর পুত্র ইউসুফ (আঃ) যখন মিসরের মন্ত্রী হন এবং অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় কিন‘আনে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, তখন ইউসুফ (আঃ)-এর আমন্ত্রণে পিতা ইয়া‘কূব (আঃ) সপরিবারে মিসরে চলে আসেন ও বসবাস শুরু করেন। ক্রমে সেখানে তাঁরা আধিপত্য বিস্তার করেন ও সুখ-শান্তিতে দিনাতিপাত করতে থাকেন। পরবর্তীতে পুনরায় মিসর ফির‘আউনের অধিকারে ফিরে আসে। ইউসুফ (আঃ)-এর মৃত্যুর পরে তাঁর ৫ম অধঃস্তন পুরুষ মূসা ও হারুনের সময় নিপীড়ক ফির‘আউন শাসন ক্ষমতায় ছিল, তার নাম রেমেসীস-২।



মূসা (আঃ) হলেন ইবরাহীম (আঃ)-এর ৮ম অধঃস্তন পুরুষ। তাঁর পিতার নাম ‘ইমরান’। তাঁর জন্ম হয় মিসরে আর লালিত-পালিত হন ফির‘আউনের ঘরে। তাঁর জন্ম ও লালন পালন সম্পর্কে কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আলোচিত হয়েছে। তাঁর সহোদর ভাই হারুন ছিলেন তাঁর চেয়ে তিন বছরের বড়। উভয়ের মৃত্যু হয় মিসর ও শামের মধ্যবর্তী তীহ প্রান্তরে বানী ইসরাঈলের ৪০ বছর আটক থাকাকালীন সময়ে। মূসা (আঃ)-এর কবর হয় বায়তুল মুক্বাদ্দাসের উপকণ্ঠে। নাবী মু‏হাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেখানে একটি লাল টিবির দিকে ইশারা করে সে স্থানেই মূসা (আঃ)-এর কবর রয়েছে বলে জানিয়েছেন। (মুত্তাফাক আলাইহি, মিশকাত হা: ৫৭১৩)



ফির‘আউন কোন ব্যক্তির নাম নয়। বরং এটি হল তৎকালীন মিসরের সম্রাটদের উপাধি। কিবতী বংশীয় এ সম্রাটগণ কয়েক শতাব্দীব্যাপী মিসর শাসন করে। এ সময় মিসর সভ্যতা ও সমৃদ্ধির শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিল। লাশ মমিকরণ, পিরামিড, স্ফিংক্র প্রভৃতি তাদের সময়কার বৈজ্ঞানিক উন্নতির প্রমাণ বহন করে।। মূসা (আঃ)-এর সময়কার পরপর দুজন ফির‘আউন ছিল। সর্বসম্মত ইসরাঈলী বর্ণনাও হল এটাই এবং মূসা (আঃ) দু’জনেরই যুগ পান। উৎপীড়ক ফির‘আনের নাম ছিল রেমেসিস-২ এবং ডুবে মরা ফির‘আউন ছিল তার পুত্র মানেপতাহ। লোহিত সাগর সংলগ্ন তিক্ত হ্রদে তিনি সসৈন্য ডুবে মরেন। যার মমি ১৯০৭ সালে আবিষ্কৃত হয় এবং আজও তার লাশ মিসরের পিরামিডে রক্ষিত আছে।



আল্লাহ তা‘আলা বানী ইসরাঈলের প্রতি প্রদত্ত নেয়ামতগুলো ধারাবাহিকভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছেন: স্মরণ কর, তোমাদের পুত্র সন্তানদের হত্যা করে ফির‘আউন জঘন্যতম শাস্তি দিত। আমি তোমাদেরকে মূসা (আঃ)-এর মাধ্যমে মুক্তি দিয়েছি। ঘটনাটির সারসংক্ষেপ হলো- একদা ফির‘আন স্বপ্নে দেখে যে, বায়তুল মুক্বাদ্দিসের দিক হতে এক আগুন এসে মিসরের প্রত্যেক কিবতীর ঘরে প্রবেশ করছে, কিন্তু তা বানী ইসরাঈলের ঘরে যায়নি। এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা ছিল এই যে, বানী ইসরাঈলের মধ্যে এমন একটি ছেলে জন্ম গ্রহণ করবে যার হাতে তার অহঙ্কার চূর্ণ হয়ে যাবে। তাই সে চারদিকে নির্দেশ জারি করে দিল যে, বানী ইসরাঈলের ঘরে যে সন্তান জন্মগ্রহণ করবে সরকারি লোক দ্বারা যাচাই করে দেখবে। যদি পুত্র সন্তান হয় তৎক্ষণাৎ তাকে মেরে ফেলবে। আর যদি কন্যা সন্তান হয় তবে তাকে ছেড়ে দিবে। এ নীতি চালু অবস্থায় আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-কে ঐ ফেরআউনের ঘরেই লালিত-পালিত করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, পরিণত বয়সে নবুয়তী পেয়ে ফির‘আউনের এ নির্যাতন থেকে মুক্তি লাভ করার পর মূসা (আঃ)-এর সাথে স্বদেশ ত্যাগকালে যখন ফির‘আউন দলবল নিয়ে তোমাদেরকে পাকড়াও করতে এসেছিল আর তোমরা এমতাবস্থায় সমুদ্রের উপকূলে ছিলে যখন তোমাদের নাজাতের কোন উপায় ছিল না, এমতাবস্থায় আমি তোমাদের জন্য সমুদ্রের মধ্য দিয়ে রাস্তা তৈরি করে দিলাম আর তোমরা মুক্তি পেলে। সুতরাং এসব নেয়ামত পেয়ে আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় করা উচিত এবং তাঁর বিধান মেনে চলা উচিত।



(وَإِذْ وَاعَدْنَا)



‘আর যখন আমি মূসার সঙ্গে চল্লিশ রাত্রির অঙ্গীকার করেছিলাম’এখানে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-কে তাওরাত দেয়ার জন্য যে ৪০ দিনের ওয়াদা দিয়েছিলেন সে নেয়ামতের কথা আলোচনা করেছেন। প্রথমে ত্রিশ দিনের ওয়াদা দিয়েছিলেন পরে দশ দিন বাড়িয়ে দিয়ে চল্লিশ দিন পূর্ণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَوٰعَدْنَا مُوْسٰی ثَلٰثِیْنَ لَیْلَةً وَّاَتْمَمْنٰھَا بِعَشْرٍ فَتَمَّ مِیْقَاتُ رَبِّھ۪ٓ اَرْبَعِیْنَ لَیْلَةً)



“স্মরণ কর, মূসার জন্য আমি ত্রিশ রাত্রি নির্ধারণ করি এবং আরও দশ দ্বারা সেটা পূর্ণ করি। এভাবে তার প্রতিপালকের নির্ধারিত সময় চল্লিশ রাত্রিতে পূর্ণ হয়।”(সূরা আ‘রাফ ৭:১৪২)



কিন্তু তারা সময় হওয়ার পূর্বেই ধৈর্যহারা হয়ে গেল। এমনকি মূসা (আঃ) চলে যাবার পর তারা গো-বৎসের পূজা/উপাসনা করতে শুরু করে দিল, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের ওপর জুলুম করল। তারপরও আল্লাহ তা‘আলা একজন আরেকজনকে হত্যা করার মাধ্যমে তাওবাহ করার নির্দেশ দিলেন এবং এর মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন যাতে তারা শুকরিয়া আদায় করে।



অতঃপর মূসা (আঃ) তাঁর সম্প্রদায়কে বললেন: তোমরা গো-বৎসকে তোমাদের মা‘বূদরূপে গ্রহণ করে নিজেদের ওপর জুলুম করেছ। অতএব একজন আরেকজনকে হত্যা করার মাধ্যমে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট তাওবাহ কর। জাহান্নামে চিরস্থায়ী থাকার চেয়ে এটা তোমাদের জন্য উত্তম। তারপর আল্লাহ তা‘আলা তাদের অবাধ্যতার সীমালঙ্ঘনের কথা তুলে ধরেছেন, যখন তারা আল্লাহ তা‘আলার কথা শুনল তখন মূসাকে বলল: এগুলো যে আল্লাহ তা‘আলার কথা তা আমরা কখনো বিশ্বাস করব না যতক্ষণ না আমরা আল্লাহ তা‘আলাকে দেখতে পাব। তাদের দাবি অনুযায়ী আল্লাহ তা‘আলাকে দেখতে গেলে বজ্রধ্বনি তাদেরকে পাকড়াও করল। যার ফলে তারা সবাই মৃত্যু বরণ করল। অতঃপর মূসা (আঃ)-এর দু‘আয় তাদেরকে পুনরায় জীবন ফিরিয়ে দেয়া হলো। এভাবে তাদের প্রয়োজনীয় মুহূর্তে আল্লাহ তা‘আলা করুণা করে তাদের এ ইহকালীন ও পরকালীন মুক্তির পথ সুগম করেছেন কিন্তু তারা ছিল বড়ই অবাধ্য ও অকৃতজ্ঞ জাতি। নিম্নে তাদের প্রতি প্রদত্ত নিয়ামতকে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো।



আল্লাহ তা‘আলা বানী ইসরাঈলকে যে সকল নেয়ামত প্রদান করেছিলেন তা হল:



১. বানী ইসরাঈলের হিদায়াতস্বরূপ মূসা (আঃ)-কে আসমানী কিতাব তাওরাত প্রদান। (সূরা বাকারাহ ২:৫৩)

২. বিভিন্ন জঘন্য অপরাধ করার পরও আল্লাহর পক্ষ হতে ক্ষমা প্রদান। (সূরা বাকারাহ ২:৫২)

৩. ফির‘আউনের শাস্তি থেকে মুক্তি প্রদান। (সূরা বাকারাহ ২:৪৯)

৪. সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়া থেকে মুক্তি প্রদান। (সূরা বাকারাহ ২:৫০)

৫. বারটি গোত্রের জন্য বারটি ঝর্ণা প্রবাহিত করা। (সূরা বাকারাহ ২:৬০)

৬. আসমানী খাদ্য মান্না ও সালওয়া প্রদান। (সূরা বাকারাহ ২:৫৭)



মান্না ও সালওয়া এক প্রকার আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত খাদ্য যা একমাত্র বানী ইসরাঈলের জন্যই নির্দিষ্ট ছিল। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: সালওয়া হল এক প্রকার ছোট পাখি। ইকরামা বলেন: সালওয়া হল এক প্রকার পাখি যা চড়ুই পাখির ন্যায়। বারী বিন আনাস বলেন: মান্না মধু জাতীয় জিনিস যা তারা পানি দিয়ে মিশিয়ে পান করত।



হাদীসে এসেছে, ব্যাঙ-এর ছাতা মান্নার অর্ন্তভুক্ত, তার পানি চক্ষু রোগের প্রতিষেধক। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৩৯) সঠিক কথা হচ্ছে মান্না হল মিষ্টি জাতীয় আর সালওয়া হল পাখির গোশত।



৭. সকল খাদ্য বানী ইসরাঈল এর জন্য হালাল করা। (সূরা আলি-ইমরান ৩:৯৩)



৮. তাদের মাঝে ধারাবাহিকভাবে নাবী-রাসূলগণের আগমন। যেমন হাদীসে এসেছে:



عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ صلي اللّٰه عليه وسلم إِنَّ بَنِي إِسْرَائِيلَ كَانَتْ تَسُوسُهُمْ الْأَنْبِيَاءُ إِذَا مَاتَ نَبِيٌّ قَامَ نَبِيٌّ وَإِنَّهُ لَا نَبِيَّ بَعْدِي



আবূ হুরাইরাই (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, নিশ্চয়ই বানী ইসরাঈদের মধ্যে নাবীগণ ধারাবাহিকভাবে এসেছে। যখন কোন নাবী মারা গেছেন তখনই তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছে অন্য নাবী। আর আমার পরে কোন নাবী নেই। (মুসনাদ আবূ আওয়ানা: ৭১২৮)



৯. স্বাছন্দময় জীবন যাপনের ব্যাবস্থাকরণ।



এ ছাড়াও বানী ইসরাঈলকে আরো অনেক নেয়ামত দান করা হয়েছিল। কিন্তু তারা এত নেয়ামত পাওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তা‘আলার সাথে কুফরী করেছে, মূসা (আঃ)-এর প্রতি ঈমান আনার পরিবর্তে তাঁর বিরোধিতা করেছে। সুতরাং আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত, রাত-দিন আমরা আল্লাহ তা‘আলার কত নেয়ামত ভোগ করছি, তিনি আমাদের ওপর কত অনুগ্রহ করছেন! কখনো যেন আমরা তাঁর সাথে কুফরী না করি, তাঁর নেয়ামত অস্বীকার না করি। বরং সর্বদা তাঁর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করব এবং তাঁর আদেশ নিষেধ মেনে চলব। আল্লাহ তা‘আল্ াআমাদের তাওফীক দিন। (আমীন)!



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. নেয়ামতের কথা স্মরণ করে আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় করা কর্তব্য।

২. আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদেরকে বিভিন্ন বিপদাপদ দ্বারা পরীক্ষা করেন এটা জানার জন্য যে, কারা তাঁর দীনের ওপর অটল থাকে।

৩. বানী ইসরাঈলের প্রতি আল্লাহ তা‘আলার বিভিন্ন নেয়ামতের কথা জানতে পারলাম।

৪. যারা আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলের বিরোধিতা করে তথা ইসলাম বিদ্রোহী হয় তাদের পরিণতি খুব খারাপ, যেমন মূসা (আঃ)-এর বিরোধী বানী ইসরাঈল জাতির হয়েছিল।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: এখানে তাদের তাওবার পন্থা বর্ণনা করা হচ্ছে। তারা বাছুরের পূজা করেছিল এবং তার প্রেম তাদের অন্তরে বদ্ধমূল হয়েছিল। অতঃপর হযরত মূসার (আঃ) বুঝানোর ফলে তাদের সম্বিৎ ফিরে আসে এবং তারা লজ্জিত হয় ও নিজেদের পথভ্রষ্টতার কথা বিশ্বাস করতঃ ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে। তখন তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয় যে, তাদের মধ্যে যারা বাছুর পূজা করেছে তাদেরকে যেন হত্যা করে ঐসব লোকে যারা এতে যোগ দেয়নি। তারা তাই করে। সুতরাং আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করেন এবং হত্যাকারী ও নিহত সবকেই ক্ষমা করে দেন। এর পূর্ণ বর্ণনা ইনশাআল্লাহ সূরা-ই- তা-হা’য় আসবে। হযরত মূসা (আঃ)-এর তাদের সৃষ্টিকর্তার নিকট তাওবা করার নির্দেশ দেয়ার অর্থ এই যে, তাদেরকে যিনি সৃষ্টি করেছেন তাঁকে বাদ দিয়ে অন্যকে পূজা করা-এর চেয়ে বড় জুলুম আর অত্যাচার আর কী হতে পারে? একটি বর্ণনায় আছে যে, হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে মহান আল্লাহর নির্দেশ শুনিয়েদেন এবং যেসব লোক বাছুর পূজা করেছিল তাদেরকে বসিয়ে দেন এবং অন্যান্য লোক দাড়িয়ে গিয়ে তাদেরকে হত্যা করতে শুরু করে। আল্লাহ তাআলার হুকুমে অন্ধকার ছেয়ে যায়। অতঃপর তাদেরকে বিরত রাখা হয়। তখন গণনা করে দেখা যায় যে, সত্তর হাজার লোককে হত্যা করা হয়েছে। এরপর সারা গোত্রের তাওবা কবূল হয়ে যায়। ওটা একটি কঠিন নির্দেশ ছিল যা তারা পালন করেছিল এবং আপন ও পর সকলকেই সমানভাবে হত্যা করেছিল। এরই ফলে পরম করুণাময় আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করেছিলেন। হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে বলেছিলেনঃ যথেষ্ট হয়েছে, মহান আল্লাহ নিহতদেরকে শহীদের পুণ্যদান করেছেন। হত্যাকারী ও অবশিষ্ট লোকদের তাওবা আল্লাহ পাক ককূল করেছেন এবং তাদেকে জিহাদের পূণ্য দান করেছেন।' হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারূন (আঃ) এভাবে তাদের গোত্রের হত্যাকার্য দর্শন করে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহ! এখন তো বনী ইসরাঈল দুনিয়ার বুক হতে মুছে যাবে!' সুতরাং তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হয় এবং বিশ্বপ্রভু বলেনঃ “হে আমার নবীগণ! তোমরা নিহতদের জন্যে দুঃখ করো না, তারা আমার নিকট শহীদদের মর্যাদা পেয়েছে। তারা এখানে জীবিত রয়েছে ও আহার্য পাচ্ছে। তখন তাদের ও গোত্রের লোকদের সান্ত্বনা লাভ হয় এবং স্ত্রীলোকদের ও শিশুদের বিলাপ বন্ধ হয়, তরবারী, বর্শা, ছোরা ইত্যাদি থেমে যায়। পিতা পুত্র ও ভাইয়ে ভাইয়ে রক্তারক্তি বন্ধ হয়ে যায় এবং পরম দয়ালু আল্লাহ তাদের তাওবা কবূল করেন।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।