আল কুরআন


সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 45)

সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 45)



হরকত ছাড়া:

واستعينوا بالصبر والصلاة وإنها لكبيرة إلا على الخاشعين ﴿٤٥﴾




হরকত সহ:

وَ اسْتَعِیْنُوْا بِالصَّبْرِ وَ الصَّلٰوۃِ ؕ وَ اِنَّهَا لَکَبِیْرَۃٌ اِلَّا عَلَی الْخٰشِعِیْنَ ﴿ۙ۴۵﴾




উচ্চারণ: ওয়াছতা‘ঈনূ বিসসাবরি ওয়াসসালা-তি ওয়া ইন্নাহা-লাকাবীরাতুন ইল্লা-‘আলাল খা-শি‘ঈন।




আল বায়ান: আর তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয় তা বিনয়ী ছাড়া অন্যদের উপর কঠিন।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪৫. আর তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর(১)। আর নিশ্চয় তা বিনয়ীরা ছাড়া(২) অন্যদের উপর কঠিন।




তাইসীরুল ক্বুরআন: তোমরা ধৈর্য্য ও সলাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর, আর তা আল্লাহভীরু ব্যক্তিবর্গ ছাড়া অন্য সকলের কাছে নিশ্চিতভাবে কঠিন।




আহসানুল বায়ান: ৪৫। তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর (1) এবং বিনীতগণ ব্যতীত আর সকলের নিকট নিশ্চিতভাবে এ কঠিন। (2)



মুজিবুর রহমান: এবং তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও; অবশ্যই ওটা কঠিন, কিন্তু বিনীতদের পক্ষে নয়।



ফযলুর রহমান: তোমরা ধৈর্য ও নামাযের সাহায্য নাও। অবশ্য এই নামায একটি কঠিন কাজ; তবে একনিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গের জন্য (তা কঠিন) নয়,



মুহিউদ্দিন খান: ধৈর্য্যর সাথে সাহায্য প্রার্থনা কর নামাযের মাধ্যমে। অবশ্য তা যথেষ্ট কঠিন। কিন্তু সে সমস্ত বিনয়ী লোকদের পক্ষেই তা সম্ভব।



জহুরুল হক: আর তোমরা ধৈর্য ধরে ও নামায পড়ে সাহায্য কামনা করো। আর এটি নিশ্চয়ই বড় কঠিন, শুধু বিনয়ীদের ছাড়া, --



Sahih International: And seek help through patience and prayer, and indeed, it is difficult except for the humbly submissive [to Allah]



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৪৫. আর তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর(১)। আর নিশ্চয় তা বিনয়ীরা ছাড়া(২) অন্যদের উপর কঠিন।


তাফসীর:

১. মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ ‘সবর’ এর তাফসীর করেছেন “সাওম”। [আত-তাফসীরুস সহীহ] আল্লামা শানকীতী বলেন, ধৈৰ্য্যের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করা সুস্পষ্ট বিষয়। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করলে এক সময় তার উপর আল্লাহর রহমত নাযিল হবে এবং সে সফলকাম হবে। কিন্তু সালাতের মাধ্যমে কিভাবে সাহায্য প্রার্থনা করবে? এর উত্তর হচ্ছে, সালাতের মাধ্যমে অন্যায় অশ্লিল কাজ থেকে মুক্তি লাভ করা যায়। আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় সালাত অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে দূরে রাখে। [সূরা আল-আনকাবুত: ৪৫] এটা নিশ্চয় এক বিরাট সাহায্য।

তাছাড়া সালাতের মাধ্যমে রিযকের মধ্যে প্রশস্তি আসে। আল্লাহ বলেন, “আর আপনার পরিবারবর্গকে সালাতের আদেশ দিন ও তাতে অবিচল থাকুন, আমরা আপনার কাছে কোন জীবনোপকরণ চাই না; আমরাই আপনাকে জীবনোপকরণ দেই এবং শুভ পরিণাম তো তাকওয়াতেই নিহিত [সূরা ত্বা-হা: ১৩২] আর এ জন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোন বিষয়ে সমস্যায় পড়তেন বা চিন্তাগ্রস্ত হতেন তখনই তিনি সালাতে দাঁড়িয়ে যেতেন”। [মুসনাদে আহমাদ: ৫/৩৮৮]

সুতরাং যে কোন বিপদাপদে ও সমস্যায় সালাতে দাঁড়িয়ে আল্লাহর সাথে সম্পর্কটা তাজা করে নেয়ার মাধ্যমে সাহায্য লাভ করা যেতে পারে। সালফে সালেহীন তথা সাহাবা, তাবেয়ীন ও সত্যনিষ্ঠ ইমামগণ থেকে এ ব্যাপারে বহু ঘটনা বর্ণিত আছে। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার নিকট তার ভাই ‘কুছাম' এর মৃত্যুর খবর পৌছল, তিনি তখন সফর অবস্থায় ছিলেন। তিনি তার বাহন থেকে নেমে দুরাকাআত সালাত আদায় করেন এবং এ আয়াত তেলাওয়াত করলেন। আবার অনুরূপভাবে আবদুর রহমান ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু অসুস্থ অবস্থায় পড়লে একবার এমনভাবে বেহুশ হয়ে যান যে সবাই ধারণা করে বসেছিল যে, তিনি বুঝি মারাই গেছেন। তখন তার স্ত্রী উম্মে কুলসুম মসজিদে গিয়ে আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে সবর ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করলেন। [মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/২৬৯]


২. কুরআন ও সুন্নায় যেখানে خُشُوْعٌ বা বিনয়ের প্রতি উৎসাহ প্রদানের বর্ণনা রয়েছে, সেখানে এর অর্থ অক্ষমতা ও অপারগতাজনিত সেই মানসিক অবস্থাকেই বুঝানো হয়েছে, যা আল্লাহ্ তা'আলার মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব এবং তার সামনে নিজের ক্ষুদ্রতা ও দীনতার অনুভূতি থেকে সৃষ্টি হয়। এর ফলে ইবাদাত সহজতর হয়ে যায়। কখনো এর লক্ষণাদি দেহেও প্রকাশ পেতে থাকে। তখন সে শিষ্টাচারসম্পন্ন বিনম্র ও কোমলমন বলে পরিদৃষ্ট হয়। যদি হৃদয়ে আল্লাহভীতি ও নম্রতা না থাকে, মানুষ বাহ্যিকভাবে যতই শিষ্টাচারের অধিকারী ও বিনম্র হোক না কেন, প্রকৃত প্রস্তাবে সে বিনয়ের অধিকারী হয় না। বিনয়ের লক্ষণাদি ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশ করাও বাঞ্ছনীয় নয়।

উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু একবার এক যুবককে নতশিরে বসে থাকতে দেখে বললেন, মাথা উঠাও, বিনয় হৃদয়ে অবস্থান করে। ইবরাহীম নখয়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘মোটা কাপড় পরা, মোটা খাওয়া এবং মাথা নত করে থাকাই বিনয় নয় خُشُوْعٌ বা বিনয় অর্থ ‘অধিকারের ক্ষেত্রে ইতর-ভদ্র নির্বিশেষে সবার সংগে একই রকম ব্যবহার করা এবং আল্লাহ্ তাআলা যা ফরয করে দিয়েছেন তা পালন করতে গিয়ে হৃদয়কে শুধু তারই জন্য নির্দিষ্ট ও কেন্দ্রিভূত করে নেয়া। সারকথা, ইচ্ছাকৃতভাবে কৃত্রিম উপায়ে বিনয়ীদের রূপ ধারণ করা শয়তান ও প্রবৃত্তির প্রতারণা মাত্র। আর তা অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ। অবশ্য যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়, তবে তা ক্ষমার্হ।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: ৪৫। তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর (1) এবং বিনীতগণ ব্যতীত আর সকলের নিকট নিশ্চিতভাবে এ কঠিন। (2)


তাফসীর:

(1) ধৈর্য এবং নামায প্রত্যেক আল্লাহভীরু লোকের বড় হাতিয়ার। নামাযের মাধ্যমে একজন মুমিনের সম্পর্ক মহান আল্লাহর সাথে বলিষ্ঠ হয়। এরই দ্বারা সে আল্লাহর নিকট থেকে শক্তি ও সাহায্য লাভ করে। ধৈর্যের মাধ্যমে কার্যে সুদৃঢ় এবং দ্বীনে প্রতিষ্ঠিত থাকার প্রেরণা সৃষ্টি হয়। হাদীসে এসেছে, নবী কারীম (সাঃ)-এর সামনে যখন কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এসে উপস্থিত হত, তখন তিনি সত্বর নামাযের শরণাপন্ন হতেন। (আহমদ, আবূ দাউদ, ফাতহুল ক্বাদীর)

(2) নামাযের যত্ন নেওয়া সাধারণ মানুষের জন্য ভারী কাজ, কিন্তু বিনয়ী-নম্র মানুষের জন্য তা সহজ এবং নামায তাঁদের হূদয়ের প্রশান্তির উপকরণ। এই লোক কারা? এরা সেই লোক যাঁরা কিয়ামতের উপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখে। অর্থাৎ, কিয়ামতের প্রতি বিশ্বাস সৎকর্মসমূহকে সহজতর করে দেয় এবং আখেরাত থেকে উদাসীনতা মানুষকে আমলহীন; বরং বদ আমলের অভ্যাসী বানিয়ে দেয়।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৪৫ হতে ৪৮ নং আয়াতের তাফসীর:



আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতিকে সালাত ও ধৈর্যের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতের সকল কাজে সাহায্য প্রার্থনা করার নির্দেশ দিয়েছেন। সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনার ফলাফল কী সে সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:



(إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهٰي عَنِ الْفَحْشَا۬ءِ وَالْمُنْكَرِ)



“নিশ্চয়ই সালাত অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে।”(সূরা আনকাবুত ২৯:৪৫)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:



(وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا نَحْنُ نَرْزُقُكَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوٰي)



“এবং তোমার পরিবারবর্গকে সালাতের আদেশ দাও ও তাতে অবিচলিত থাকো, আমি তোমার নিকট কোন জীবনোপকরণ চাই না; আমিই তোমাকে জীবনোপকরণ দেই এবং শুভ পরিণাম তো মুত্তাকীদের জন্য।”(সূরা ত্বা-হা- ২০:১৩২)



তাই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোন বিপদের সম্মুখীন হলে দ্রুত সালাতে মগ্ন হতেন।



এ সালাত তাদের জন্য সহজ-সাধ্য কাজ যারা আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে এবং পরকালে আল্লাহ তা‘আলার সাথে সাক্ষাতের প্রত্যাশী। আর যারা আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে না সালাত তাদের জন্য সহজ নয়।



আবার আল্লাহ তা‘আলা বানী ইসরাঈলকে তাঁর প্রদত্ত নেয়ামতরাজির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এমন দিবসের ভয় করার আদেশ দিচ্ছেন যে দিবসে একে অপরের উপকার করতে পারবে না, কারো কোন সুপারিশ চলবে না এবং কোন মুক্তিপণ গ্রহণ করা হবে না।



উক্ত আয়াত দ্বারা বুঝা যায় কিয়ামত দিবসে কোন প্রকার শাফাআত কবূল করা হবে না। আবার অন্য আয়াত থেকে বুঝা যায় শাফাআত থাকবে, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَه۫ إِلَّا بِإِذْنِه۪)



“কে সে যে তাঁর (আল্লাহর) নিকট সুপারিশ করবে তাঁর অনুমতি ছাড়া।”(সূরা বাকারাহ ২:৫৫২)



অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার অনুমতি সাপেক্ষে শাফাআত চালু থাকবে।



সুতরাং শাফাআত দু’প্রকার:



১. বাতিল শাফাআত: الشفاعة المنفية ২. গ্রহণযোগ্য শাফাআত: الفشاعة الثابتة



বাতিল শাফাআত:



যা কাফির মুশরিকদের সাথে সম্পৃক্ত। যে শাফায়াতের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলার কোন অনুমতি নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَیَعْبُدُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللہِ مَا لَا یَضُرُّھُمْ وَلَا یَنْفَعُھُمْ وَیَقُوْلُوْنَ ھٰٓؤُلَا۬ئِ شُفَعَا۬ؤُنَا عِنْدَ اللہِ)



“তারা আল্লাহ ব্যতীত যার ‘ইবাদত করে তা তাদের ক্ষতিও করতে পারে না, উপকারও করতে পারে না। তারা বলে, ‘এগুলো আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী।”(সূরা ইউসুফ ১০:১৮)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:



(مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَي اللّٰهِ زُلْفٰي)



“আমরা তো এদের উপাসনা এজন্য করি, যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছিয়ে দেয়।”(সূরা যুমার ৩৯:৩)



এ সকল শাফাআত বাতিল, তাই আল্লাহ তা‘আলা কবূল করবেন না। তিনি বলেন:



فَمَا تَنْفَعُهُمْ شَفَاعَةُ الشَّافِعِيْنَ



“ফলে (সে সময়) শাফাআতকারীদের শাফাআত তাদের (অমুসলিমদের) কোন কাজে আসবে না।”(সূরা মুদ্দাসসির ৭৪:৪৮)



গ্রহণযোগ্য শাফাআত: এর জন্য তিনটি শর্ত। যথা:



১. শাফাআতকারীর ওপর আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(یَوْمَئِذٍ لَّا تَنْفَعُ الشَّفَاعَةُ اِلَّا مَنْ اَذِنَ لَھُ الرَّحْمٰنُ وَرَضِیَ لَھ۫ قَوْلًا)



“দয়াময় যাকে অনুমতি দেবেন ও যার কথা তিনি পছন্দ করবেন সে ব্যতীত কারও সুপারিশ সেদিন কোন কাজে আসবে না।”(সূরা ত্বা-হা- ২০:১০৯)



২. যার জন্য শাফাআত করা হবে তার ওপর আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



وَکَمْ مِّنْ مَّلَکٍ فِی السَّمٰوٰتِ لَا تُغْنِیْ شَفَاعَتُھُمْ شَیْئًا اِلَّا مِنْۭ بَعْدِ اَنْ یَّاْذَنَ اللہُ لِمَنْ یَّشَا۬ئُ وَیَرْضٰی



“আকাশসমূহে কত ফেরেশতা রয়েছে! তাদের কোন সুপারিশ কাজে আসবে না যতক্ষণ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা এবং যার প্রতি সন্তুষ্ট তাকে অনুমতি না দেন।”(সূরা নাজম ৫৩:২৬)



৩. শাফাআত করার অনুমতি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَه۫ إِلَّا بِإِذْنِه۪



“কে সে যে তাঁর (আল্লাহর) নিকট সুপারিশ করবে তাঁর অনুমতি ছাড়া।”(সূরা বাকারাহ ২:২৫৫)



এসব শর্তসাপেক্ষে শাফাআত করা যাবে এবং পাওয়া যাবে। সুতরাং যে সব নামধারী মুসলিম শাফাআত করার ও পাওয়ার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়, সেটা তাদের বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘন ছাড়া কিছুই নয়।



আলোচ্য আয়াতে যে শাফাআত নিষিদ্ধের কথা বলা হয়েছে তা বাতিল শাফাআত যা কাফির-মুশরিকদের জন্য প্রযোজ্য।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. বিপদাপদে ও কঠিন মুহূর্তে সালাত ও ধৈর্যের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করা উচিত।

২. ঈমান ও সৎ আমলের মাধ্যমে জাহান্নামের শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা ওয়াজিব।

৩. কাফির-মুশরিকদের জন্য কিয়ামতের দিন কোন সুপারিশকারী থাকবে না এবং সেদিন কোন বিনিময় চলবে না। অপরপক্ষে ঈমানদারদের জন্য সুপারিশের ব্যবস্থা থাকবে, তবে আল্লাহ তা‘আলার অনুমতি ও সন্তুষ্টি সাপেক্ষে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৪৫-৪৬ নং আয়াতের তাফসীর

এ আয়াতে মানুষকে দুনিয়া ও আখেরাতের কাজে ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করতে বলা হয়েছে।

কর্তব্য পালন করতে এবং নামায পড়তে বলা হয়েছে। রোযা রাখাও হচ্ছে ধৈর্য ধারণ করা। এ জন্যেই রমযান মাসকে ধৈর্যের মাস বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “রোযা অর্ধেক ধৈর্য। ধৈর্যের ভাবার্থ পাপের কাজ হতে বিরত থাকাও বটে। এ আয়াতে যদি ধৈর্যের ভাবার্থ এটাই হয়ে থাকে তবে মন্দ কাজ হতে বিরত থাকাও পুণ্যের কাজ করা এ দুটোরই বর্ণনা হয়ে গেছে। পুণ্যের কার্যসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে নামায। হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ ধৈর্য দু'প্রকার। (১) বিপদের সময় ধৈর্য, (২) পাপের কাজ হতে বিরত থাকার ব্যাপারে ধৈর্য। দ্বিতীয় ধৈর্য প্রথম ধৈর্য হতে উত্তম।' হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ) বলেনঃ প্রত্যেক জিনিস আল্লাহর পক্ষ হতে হয়ে থাকে মানুষের এটা স্বীকার করা, পুণ্য প্রার্থনা করা এবং বিপদের প্রতিদানের ভাণ্ডার আল্লাহর নিকটে আছে এ মনে করার নাম ধৈর্য।' আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে ধৈর্যধারণ করলেও আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করা হয়। পুণ্যের কাজে নামায দ্বারা বিশেষ সাহায্য পাওয়া যায়।

স্বয়ং কুরআন মাজীদে ঘোষিত হয়েছেঃ “তোমরা নামায প্রতিষ্ঠিত কর, নিশ্চয় এ নামায সমুদয় নির্লজ্জ ও অশোভনীয় কাজ হতে বিরত রাখে, আর আল্লাহর স্মরণই হচ্ছে শ্রেষ্ঠতম বস্তু।' হযরত হুযাইফা (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখনই কোন কঠিন ও চিন্তাযুক্ত কাজের সম্মুখীন হতেন তখনই তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন।

খন্দকের যুদ্ধে রাতের বেলায় হযরত হুযাইফা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খেদমতে হাজির হলে তাকে নামাযে দেখতে পান। হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ বদর যুদ্ধের রাত্রে আমরা সবাই শুয়ে গেছি, আর দেখি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সারা রাত নামাযে রয়েছেন। সকাল পর্যন্ত তিনি নামায ও প্রার্থনায় লেগে রয়েছেন। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে আছে যে, নবী করীম (সঃ) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-কে দেখতে পান যে, তিনি ক্ষুধার জ্বালায় পেটের ব্যাথায় ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন। তিনি ফারসী ভাষায় তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘তোমার পেটে কি ব্যথা আছে?' তিনি বলেনঃ হাঁ।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘উঠো, নামায আরম্ভ কর, এতে রোগমুক্তি রয়েছে।

হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) সফরে তার ভাই কাসামের (রাঃ) মৃত্যু সংবাদ পেয়ে (আরবি) (২:১৫৬) পাঠ করতঃ পথের এক ধারে সরে গিয়ে উটকে বসিয়ে দেন এবং নামায শুরু করেন। দীর্ঘক্ষণ নামায পড়ার পর সাওয়ারীর নিকট আসেন এবং এই আয়াত দু’টি পড়তে থাকেন। মোটকথা ধৈর্য ও নামায এ দু'টো দ্বারা আল্লাহর করুণা লাভ করা যায়।

(আরবি)-এর (আরবি) সর্বনামটি কেউ কেউ (আরবি)-এর দিকে ফিরিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বলেন যে, এর (আরবি) হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ (আরবি) শব্দটি। যেমন কারূণের ঘটনায় (আরবি)-এর (আরবি) সর্বনামটি এবং মন্দের বিনিময়ে ভাল করার হুকুমে (আরবি) এর (আরবি) সর্বনামটি। ভাবার্থ এই যে, ধৈর্য ও নামায এ দু'টি প্রত্যেকের সাধ্যের মধ্যে নয়। এ অংশ হচ্ছে ঐ দলের জন্যে যারা আল্লাহকে ভয় করে থাকে। অর্থাৎ কুরআনকে মান্যকারী সত্য মুমিন, বিনয়ী, আনুগত্য স্বীকারকারী এবং জান্নাতের অঙ্গীকার ও জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শনের উপর বিশ্বাস স্থাপনকারীরগণই এ বিশেষণে বিশেষিত হবে। যেমন হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক প্রশ্নকারীর প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেনঃ ‘এটা খুব কঠিন কাজ। কিন্তু যার উপরে আল্লাহর অনুগ্রহ হয় তার জন্যে সহজ। ইবনে জারীর (রঃ) আয়াতটির অর্থ করতে গিয়ে বলেন যে, এটাও ইয়াহুদীদেরকে লক্ষ্য করেই বলা হয়েছে। কিন্তু স্পষ্ট কথা এই যে, বর্ণনাটি তাদের জন্যে হলেও। আদেশ হিসেবে সাধারণ। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন।

বিনয়ীগণ

সামনে এগিয়ে (আরবি)-এর বিশেষণ বর্ণনা করা হয়েছে, এখানে ধারণা অর্থ বিশ্বাস, যদিও এটা সন্দেহের অর্থেও এসে থাকে। যেমন (আরবি) শব্দটি অন্ধকারের অর্থেও আসে এবং আলোর অর্থেও আসে। অনুরূপভাবে (আরবি) শব্দটি অভিযোগকারী ও অভিযোগের প্রতিকারকারী উভয়ের জন্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এরকম আরও বহু শব্দ আছে যেগুলো দু'টি বিভিন্ন জিনিসের উপর ব্যবহৃত হয়ে থাকে (আরবি) শব্দটি (আরবি) এ অর্থে ব্যবহার আরব কবিদের কবিতায়ও দেখা যায়। স্বয়ং কুরআন মাজীদেরই অন্য স্থানে আছেঃ (আরবি)

অর্থাৎ ‘পাপীরা জাহান্নাম দেখে বিশ্বাস করে নেবে যে, নিশ্চয় তারা তার মধ্যে পতিত হয়ে যাবে।' (১৮:৫৩) এখানেও (আরবি) শব্দটি (আরবি) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এমন কি হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, কুরআন মাজীদের মধ্যে এরকম প্রত্যেক জায়গাতে শব্দটি (আরবি)-এর (আরবি) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

আবুল আলিয়াও (রঃ) এখানে (আরবি)-এর অর্থ (আরবি) করে থাকেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ), সুদ্দী (রঃ), রাবী' বিন আনাস (রঃ) এবং কাতাদারও (রঃ) মত এটাই। ইবনে জুরাইযও (রঃ) এ কথাই বলেন। কুরআন মাজীদের অন্য জায়গায় আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ আমার বিশ্বাস ছিল যে, আমাকে হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে (৬৯:২০)।

একটি সহীহ হাদীসে আছে যে, কিয়ামতের দিন এক পাপীকে আল্লাহ তা'আলা বলবেন-“আমি কি তোমাকে স্ত্রী ও সন্তানাদি দেইনি? তোমার প্রতি কি নানা প্রকারের অনুগ্রহ করিনি, ঘোড়া ও উটকে কি তোমার অধীনস্থ করিনি? তোমাকে কি শান্তি, আরাম, আহার্য ও পানীয় দেইনি? সে বলবে-হা', হে প্রভু! এ সব কিছুই ছিল, তখন আল্লাহ বলবেন-“তবে তোমার কি এই জ্ঞান ও বিশ্বাস ছিল না যে, তোমাকে আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে? সে বলবে-হাঁ, হে প্রভু! এর প্রতি আমার বিশ্বাস ছিল। আল্লাহ বলবেন-“তুমি যেমন আমাকে ভুলে গিয়েছিলে তেমনই আমিও তোমাকে ভুলে গেলাম। এ হাদীসেও (আরবি) এ শব্দটি এসেছে এবং (আরবি)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এর আরও বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা ইনশাআল্লাহ (আরবি) (৫৯:১৯)-এর তাফসীরে আসবে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।