সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 282)
হরকত ছাড়া:
يا أيها الذين آمنوا إذا تداينتم بدين إلى أجل مسمى فاكتبوه وليكتب بينكم كاتب بالعدل ولا يأب كاتب أن يكتب كما علمه الله فليكتب وليملل الذي عليه الحق وليتق الله ربه ولا يبخس منه شيئا فإن كان الذي عليه الحق سفيها أو ضعيفا أو لا يستطيع أن يمل هو فليملل وليه بالعدل واستشهدوا شهيدين من رجالكم فإن لم يكونا رجلين فرجل وامرأتان ممن ترضون من الشهداء أن تضل إحداهما فتذكر إحداهما الأخرى ولا يأب الشهداء إذا ما دعوا ولا تسأموا أن تكتبوه صغيرا أو كبيرا إلى أجله ذلكم أقسط عند الله وأقوم للشهادة وأدنى ألا ترتابوا إلا أن تكون تجارة حاضرة تديرونها بينكم فليس عليكم جناح ألا تكتبوها وأشهدوا إذا تبايعتم ولا يضار كاتب ولا شهيد وإن تفعلوا فإنه فسوق بكم واتقوا الله ويعلمكم الله والله بكل شيء عليم ﴿٢٨٢﴾
হরকত সহ:
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا تَدَایَنْتُمْ بِدَیْنٍ اِلٰۤی اَجَلٍ مُّسَمًّی فَاکْتُبُوْهُ ؕ وَ لْیَکْتُبْ بَّیْنَکُمْ کَاتِبٌۢ بِالْعَدْلِ ۪ وَ لَا یَاْبَ کَاتِبٌ اَنْ یَّکْتُبَ کَمَا عَلَّمَهُ اللّٰهُ فَلْیَکْتُبْ ۚ وَ لْیُمْلِلِ الَّذِیْ عَلَیْهِ الْحَقُّ وَ لْیَتَّقِ اللّٰهَ رَبَّهٗ وَ لَا یَبْخَسْ مِنْهُ شَیْئًا ؕ فَاِنْ کَانَ الَّذِیْ عَلَیْهِ الْحَقُّ سَفِیْهًا اَوْ ضَعِیْفًا اَوْ لَا یَسْتَطِیْعُ اَنْ یُّمِلَّ هُوَ فَلْیُمْلِلْ وَلِیُّهٗ بِالْعَدْلِ ؕ وَ اسْتَشْهِدُوْا شَهِیْدَیْنِ مِنْ رِّجَالِکُمْ ۚ فَاِنْ لَّمْ یَکُوْنَا رَجُلَیْنِ فَرَجُلٌ وَّ امْرَاَتٰنِ مِمَّنْ تَرْضَوْنَ مِنَ الشُّهَدَآءِ اَنْ تَضِلَّ اِحْدٰىهُمَا فَتُذَکِّرَ اِحْدٰىهُمَا الْاُخْرٰی ؕ وَ لَا یَاْبَ الشُّهَدَآءُ اِذَا مَا دُعُوْا ؕ وَ لَا تَسْـَٔمُوْۤا اَنْ تَکْتُبُوْهُ صَغِیْرًا اَوْ کَبِیْرًا اِلٰۤی اَجَلِهٖ ؕ ذٰلِکُمْ اَقْسَطُ عِنْدَ اللّٰهِ وَ اَقْوَمُ لِلشَّهَادَۃِ وَ اَدْنٰۤی اَلَّا تَرْتَابُوْۤا اِلَّاۤ اَنْ تَکُوْنَ تِجَارَۃً حَاضِرَۃً تُدِیْرُوْنَهَا بَیْنَکُمْ فَلَیْسَ عَلَیْکُمْ جُنَاحٌ اَلَّا تَکْتُبُوْهَا ؕ وَ اَشْهِدُوْۤا اِذَا تَبَایَعْتُمْ ۪ وَ لَا یُضَآرَّ کَاتِبٌ وَّ لَا شَهِیْدٌ ۬ؕ وَ اِنْ تَفْعَلُوْا فَاِنَّهٗ فُسُوْقٌۢ بِکُمْ ؕ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَ یُعَلِّمُکُمُ اللّٰهُ ؕ وَ اللّٰهُ بِکُلِّ شَیْءٍ عَلِیْمٌ ﴿۲۸۲﴾
উচ্চারণ: ইয়া আইয়ূহাল্লাযীনা আ-মানূইযা-তাদা-ইয়ানতুম বিদাইনিন ইলা-আজালিম মুছাম্মান ফাকতুবূহু ওয়ালইয়াকতুব বাইনাকুম কা-তিবুম বিল‘আদলি ওয়ালা-ইয়া’বা কাতিবুন আইঁ ইয়াকতুবা কামা-‘আল্লামাহুল্লা-হু ফালইয়াকতুব ওয়াল ইউমলিলিল্লাযী ‘আলাইহিল হাক্কুওয়াল ইয়াত্তাকিল্লা-হা রাব্বাহূওয়ালা-ইয়াবখাছ মিনহু শাইআন ফাইন কা-নাল্লাযী আলাইহিল হাক্কুছাফীহান আও দা‘ঈফান আও লা-ইয়াছতাতী‘উ আই ইউমিল্লা হুওয়া ফাল ইউমলিল ওয়ালিইইয়ুহু বিল‘আদলি ওয়াছতাশহিদূ শাহীদাইনি মিররিজা-লিকুম ফাইল্লাম ইয়াকূনা রাজুলাইনি ফারাজুলুওঁ ওয়ামরাআতা-নি মিম্মান তারদাওনা মিনাশ শুহাদাই আন তাদিল্লা ইহদা -হুমা ফাতুযাককিরা ইহদা-হুমাল উখরা ওয়ালা-ইয়া’বাশশুহাদাউ ইযা-মা দু‘ঊ ওয়ালা-তাছআমূ আন তাকতুবূহু ছাগীরান আও কাবীরান ইলা আজালিহী যা-লিকুম আকছাতু‘ইনদাল্লা-হি ওয়াআকওয়ামুলিশশাহা-দাতি ওয়াআদনা আল্লা-তারতা-বূইল্লা আন তাকূনা তিজারাতান হা-দিরাতান তুদীরূনাহা-বাইনাকুম ফালাইছা ‘আলাইকুম জুনা-হুন আল্লাতাকতুবূহা-ওয়াআশহিদূ ইযা-তাবা-ইয়া‘তুম ওয়ালা-ইউদাররা কা-তিবুওঁ ওয়ালা-শাহীদুওঁ ওয়া ইন তাফ‘আলূফাইষর নযধু -হরহ ওঅষ'সকুম ওয়াত্তাকুল্লা-হা ওয়া ইউ‘আলিলমুকুমুল্লা-হু ওয়াল্লা-হু বিকুল্লি শাইইন ‘আলীম।
আল বায়ান: হে মুমিনগণ, যখন তোমরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পরস্পর ঋণের লেন-দেন করবে, তখন তা লিখে রাখবে। আর তোমাদের মধ্যে একজন লেখক যেন ইনসাফের সাথে লিখে রাখে এবং কোন লেখক আললাহ তাকে যেরূপ শিক্ষা দিয়েছেন, তা লিখতে অস্বীকার করবে না। সুতরাং সে যেন লিখে রাখে এবং যার উপর পাওনা সে (ঋণ গ্রহীতা) যেন তা লিখিয়ে রাখে। আর সে যেন তার রব আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে এবং পাওনা থেকে যেন সামান্যও কম না দেয়। অতঃপর যার উপর পাওনা রয়েছে সে (ঋণ গ্রহীতা) যদি নির্বোধ বা দুর্বল হয়, অথবা সে লেখার বিষয়বস্ত্ত বলতে না পারে, তাহলে যেন তার অভিভাবক ন্যায়ের সাথে লেখার বিষয়বস্ত্ত বলে দেয়। আর তোমরা তোমাদের পুরুষদের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী রাখ। অতঃপর যদি তারা উভয়ে পুরুষ না হয়, তাহলে একজন পুরুষ ও দু’জন নারী- যাদেরকে তোমরা সাক্ষী হিসেবে পছন্দ কর। যাতে তাদের (নারীদের) একজন ভুল করলে অপরজন স্মরণ করিয়ে দেয়। সাক্ষীরা যেন অস্বীকার না করে, যখন তাদেরকে ডাকা হয়। আর তা ছোট হোক কিংবা বড় তা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত লিপিবদ্ধ করতে তোমরা বিরক্ত হয়ো না। এটি আল্লাহর নিকট অধিক ইনসাফপূর্ণ এবং সাক্ষ্য দানের জন্য যথাযথ। আর তোমরা সন্দিহান না হওয়ার অধিক নিকটবর্তী। তবে যদি নগদ ব্যবসা হয় যা তোমরা হাতে হাতে লেনদেন কর, তাহলে তা না লিখলে তোমাদের কোন দোষ নেই। আর তোমরা সাক্ষী রাখ, যখন তোমরা বেচা-কেনা করবে এবং কোন লেখক ও সাক্ষীকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে না। আর যদি তোমরা কর, তাহলে নিশ্চয় তা হবে তোমাদের সাথে অনাচার। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং আল্লাহ তোমাদেরকে শিক্ষা দেবেন। আর আল্লাহ সব বিষয়ে সম্যক জ্ঞানী।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৮২. হে মুমিনগণ! তোমরা যখন একে অন্যের সাথে নির্ধারিত সময়ের জন্য ঋণের আদান-প্রদান কর তখন তা লিখে রেখো(১); তোমাদের মধ্যে কোন লেখক যেন ন্যায়ভাবে তা লিখে দেয়; কোন লেখক লিখতে অস্বীকার করবে না, যেমন আল্লাহ্ তাকে শিক্ষা দিয়েছেন। সুতরাং সে যেন লিখে(২); এবং যে ব্যক্তির উপর হক্ক রয়েছে (ঋণগ্রহীতা) সে যেন লেখার বিষয়বস্তু বলে দেয়(৩) এবং সে যেন তার রব আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে। আর তা থেকে কিছু যেন না কমায় (ব্যতিক্রম না করে)। অতঃপর যার উপর হক্ক রয়েছে (ঋণগ্রহীতা) যদি নির্বোধ অথবা দুর্বল হয় অথবা লেখার বিষয়বস্তু সে বলে দিতে না পারে। তবে যেন তার অভিভাবক ন্যায্যভাবে লেখার বিষয়বস্তু সে বলে দিতে না পারে তবে যেন তার অভিভাবক নায্যভাবে লেখার বিষয়বস্তু বলে দেয়।(৪) আর তোমরা তোমাদের পুরুষদের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী রাখ, অতঃপর যদি দু’জন পুরুষ না হয় তবে একজন পুরুষ ও দু’জন স্ত্রীলোক যাদেরকে তোমরা সাক্ষী হিসেবে পছন্দ কর, যাতে স্ত্রীলোকদের মধ্যে একজন ভুলে গেলে তাদের একজন অপরজনকে স্মরণ করিয়ে দেয়(৫)। আর সাক্ষীগণকে যখন ডাকা হবে তখন তারা যেন অস্বীকার না করে(৬)। আর তা (লেনদেন) ছোট-বড় যাই হোক, মেয়াদসহ লিখতে তোমরা কোনরূপ বিরক্ত হয়ো না। এটাই আল্লাহর নিকট ন্যায্যতর ও সাক্ষ্যদানের জন্য দৃঢ়তর এবং তোমাদের মধ্যে সন্দেহের উদ্রেক না হওয়ার জন্য অধিকতর উপযুক্ত। তবে তোমরা পরস্পর যে নগদ ব্যবসা পরিচালনা কর তা তোমরা না লিখলে কোন দোষ নেই। আর তোমরা যখন পরস্পর বেচাকেনা কর তখন সাক্ষী রেখো। আর কোন লেখক ও সাক্ষীকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে না। আর যদি তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত কর, তবে তা হবে তোমাদের সাথে অনাচার(৭)। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং আল্লাহ তোমাদেরকে শিক্ষা দিবেন। আর আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে সবিশেষ জ্ঞানী।
তাইসীরুল ক্বুরআন: হে বিশ্বাসীগণ! যখন তোমরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ধারে কারবার করবে, তখন তা লিখে রাখবে, তোমাদের মধ্যে যেন কোন একজন লেখক ন্যায্যভাবে লিখে দেয়, লেখক যেন লিখতে অস্বীকার না করে, যেরূপ আল্লাহ তাকে শিক্ষা দিয়েছেন, কাজেই সে যেন লিখে এবং কর্জ-গ্রহীতা যেন লেখার বিষয়বস্তু বলে দেয় এবং তার প্রতিপালক আল্লাহর ভয় রাখে এবং প্রাপ্য হতে যেন কোনও প্রকারের কাটছাঁট না করে। যদি কর্জ-গ্রহীতা স্বল্প-বুদ্ধি অথবা দুর্বল কিংবা লেখার বিষয়বস্তু বলতে অক্ষম হয়, তবে তার অভিভাবক যেন লেখার বিষয়বস্তু ন্যায্যভাবে বলে দেয় এবং তোমাদের আপন পুরুষ লোকের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী রাখ, যদি দু’জন পুরুষ না পাওয়া যায়, তাহলে একজন পুরুষ ও দু’জন স্ত্রী লোক, যাদের সাক্ষ্য সম্পর্কে তোমরা রাজী আছ, এটা এজন্য যে, যদি একজন ভুলে যায় তবে অন্যজন স্মরণ করিয়ে দেবে এবং যখন সাক্ষীগণকে ডাকা হবে, তখন যেন (সাক্ষ্য দিতে) অস্বীকার না করে। ছোট হোক বা বড় হোক তোমরা নির্দিষ্ট মেয়াদসহ লিখে রাখাকে তাচ্ছিল্যভরে উপেক্ষা করো না, এ লিখে রাখা আল্লাহর নিকট ইনসাফ বজায় রাখার জন্য দৃঢ়তর, সঠিক প্রমাণের জন্য সহজতর এবং তোমরা যাতে কোনও সন্দেহে পতিত না হও এর নিকটবর্তী। কিন্তু যদি কোন সওদা তোমরা পরস্পর নগদ নগদ সম্পাদন কর, তবে না লিখলেও তোমাদের কোন দোষ নেই। আর তোমরা যখন পরস্পর কেনাবেচা কর তখন সাক্ষী রেখ। কোনও লেখক ও সাক্ষীকে যেন কষ্ট দেয়া না হয় এবং যদি এরূপ কর, তাহলে তোমাদের গুনাহ হবে। কাজেই আল্লাহকে ভয় কর এবং আল্লাহ তোমাদেরকে শিক্ষা দিচ্ছেন এবং আল্লাহ সর্ববিষয়ে সুপরিজ্ঞাত।
আহসানুল বায়ান: (২৮২) হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পরস্পর ঋণ দেওয়া-নেওয়া কর, তখন তা লিখে নাও।[1] আর তোমাদের মধ্যে কোন লেখক যেন ন্যায়ভাবে তা লিখে দেয় এবং আল্লাহ যেরূপ শিক্ষা দিয়েছেন --সেইরূপ লিখতে কোন লেখক যেন অস্বীকার না করে। অতএব তার লিখে দেওয়াই উচিত। আর ঋণগ্রহীতা যেন লেখার বিষয় বলে দিয়ে লিখিয়ে নেয়[2] এবং সে যেন স্বীয় প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করে এবং লেখার মধ্যে বিন্দুমাত্র কম-বেশী না করে। অনন্তর ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ হয় কিংবা দুর্বল হয় অথবা নিজে লেখার বিষয়বস্তু বলে দিতে অক্ষম হয়, তাহলে তার অভিভাবক যেন ন্যায়সঙ্গতভাবে তা লেখায়। আর তোমাদের মধ্যে দু’জন পুরুষকে (এই আদান-প্রদানের) সাক্ষী কর। যদি দু’জন পুরুষ না পাও, তাহলে সাক্ষীদের মধ্যে যাদেরকে তোমরা পছন্দ কর তাদের মধ্য হতে একজন পুরুষ ও দু’জন মহিলাকে সাক্ষী কর; [3] যাতে মহিলাদ্বয়ের একজন ভুলে গেলে যেন অন্য জন তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।[4] আর যখন (সাক্ষ্য দিতে) ডাকা হয়, তখন যেন সাক্ষীরা অস্বীকার না করে। (ঋণ) ছোট হোক, বড় হোক, তোমরা মেয়াদসহ লিখতে কোনরূপ অলসতা করো না। এ লেখা আল্লাহর নিকট ন্যায্যতর ও সাক্ষ্য (প্রমাণের) জন্য দৃঢ়তর এবং তোমাদের মধ্যে সন্দেহ উদ্রেক না হওয়ার অধিক নিকটতর।[5] কিন্তু তোমরা পরস্পরে ব্যবসায় যে নগদ আদান-প্রদান কর, তা না লিখলে কোন দোষ নেই। তোমরা যখন পরস্পর বেচা-কেনা কর, তখন সাক্ষী রাখ।[6] আর কোন লেখক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং না কোন সাক্ষী।[7] যদি তোমরা তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত কর, তাহলে তা হবে তোমাদের পক্ষে পাপের বিষয়। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর।[8] আল্লাহ তোমাদেরকে শিক্ষা দেন। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে মহাজ্ঞান
মুজিবুর রহমান: হে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ! যখন তোমরা কোন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঋণের আদান প্রদান করবে তখন তা লিখে নিবে; আর কোন একজন লেখক যেন ন্যায্যভাবে তোমাদের মধ্যে (ঐ আদান প্রদানের দলীল) লিখে দেয়, আর কোন লেখক যেন (দলীল) লিখে দিতে অস্বীকার না করে, আল্লাহ তাকে যেরূপ শিক্ষা দিয়েছেন, তার উচিত তা লিখে দেয়া, এবং ঋণ গ্রহিতা যেন লেখার বিষয় বলে দেয় এবং তার উচিত স্বীয় রাব্ব আল্লাহকে ভয় করা এবং ওর মধ্যে কিছুমাত্র ব্যতিক্রম না করা; অতঃপর ঋণ গ্রহীতা যদি নির্বোধ বা অযোগ্য অথবা লিখিয়ে নিতে অসমর্থ হয় তাহলে তার অভিভাবকরা ন্যায় সঙ্গতভাবে লিখিয়ে নিবে এবং তোমাদের মধ্যে দু’জন পুরুষ সাক্ষীকে সাক্ষী করবে; কিন্তু যদি দু’জন পুরুষ না পাওয়া যায় তাহলে সাক্ষীগণের মধ্যে তোমরা একজন পুরুষ ও দু’জন নারী মনোনীত করবে, যদি নারীদ্বয়ের একজন ভুলে যায় তাহলে একজন অপর জনকে স্মরণ করিয়ে দিবে; এবং যখন আহবান করা হয় তখন সাক্ষীগণের অস্বীকার না করা উচিত, এবং ক্ষুদ্র অথবা বৃহৎ বিষয়ের নির্দিষ্ট সময় লিখে দিতে তোমরা অবহেলা করনা, এটা আল্লাহর নিকট অতি সঙ্গত এবং সাক্ষ্যের জন্য এটাই দৃঢ়তর ও সন্দেহে পতিত না হওয়ার নিকটতর; কিন্তু যদি তোমরা কারবারে পরস্পর হাতে হাতে আদান প্রদান কর তাহলে তা লিপিবদ্ধ না করলে তোমাদের পক্ষে দোষ নেই; কিন্তু বাণিজ্যিক লেনদেনের জন্য সাক্ষী রেখ, যেন লেখক কিংবা সাক্ষী ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। যদি এরূপ কর (ক্ষতিগ্রস্ত) তাহলে তা তোমাদের পক্ষে পাপের বিষয়। আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহই তোমাদেরকে শিক্ষা প্রদান করেন এবং আল্লাহ সর্ব বিষয়ে মহাজ্ঞানী।
ফযলুর রহমান: হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন কোন নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত পরস্পর ঋণের লেনদেন করো তখন তা লিখে রাখবে। একজন লেখক যেন ন্যায়সঙ্গতভাবে তোমাদের জন্য (বিষয়টি) লিখে দেয়। কোন লেখক যেন লিখে দিতে অস্বীকার না করে; ঠিক যেভাবে আল্লাহ তাকে শিখিয়েছেন; অতএব, সে যেন লিখে দেয়। ঋণগ্রহীতা যেন লিখিয়ে রাখে আর স্বীয় প্রভু আল্লাহকে ভয় করে এবং তা থেকে (অর্থাৎ ঋণের সঠিক পরিমাণ থেকে) এতটুকু কম না লেখায়। তবে ঋণগ্রহিতা যদি বোকা কিংবা দুর্বল হয় অথবা নিজে লেখাতে না পারে তাহলে তার অভিভাবক যেন ন্যায়সঙ্গতভাবে লিখিয়ে দেয়। তোমাদের পুরুষদের মধ্য থেকে দুজনকে সাক্ষী রেখো; যদি দুজন পুরুষ না থাকে তাহলে সাক্ষী হিসেবে তোমরা পছন্দ করো এমন একজন পুরুষ ও দুজন মহিলা (রেখো), যাতে দুজনের মধ্যে একজন ভুল করলে অন্যজন তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে পারে। সাক্ষীদেরকে ডাকা হলে তারা যেন (সাক্ষ্য দিতে) অস্বীকার না করে। ছোট হোক কিংবা বড় হোক, ঋণ লেনদেনের বিষয়টি মেয়াদ উল্লেখসহ লিখে রাখতে তোমরা বিরক্ত হবে না। এটাই আল্লাহর কাছে ন্যায্যতর, সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসেবে দৃঢ়তর ও তোমাদের সন্দেহে পতিত না হওয়ার নিকটতর সহায়ক। অবশ্য যদি তোমরা নিজেদের মধ্যে কোন নগদ ব্যবসায়িক লেনদেন সম্পন্ন করো তাহলে ভিন্ন কথা; সেটা না লিখলে তোমাদের কোন পাপ হবে না। তবে তোমরা যখন পরস্পর কেনাবেচা করো তখন সাক্ষী রেখো। লেখক কিংবা সাক্ষী কারো যেন ক্ষতি না করা হয়। যদি তোমরা তা করো তাহলে সেটা তোমাদের অন্যায় হবে। আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহ তোমাদেরকে (সবকিছু) শিখিয়ে দেন। তিনি সবকিছুই ভালভাবে জানেন।
মুহিউদ্দিন খান: হে মুমিনগণ! যখন তোমরা কোন নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে ঋনের আদান-প্রদান কর, তখন তা লিপিবদ্ধ করে নাও এবং তোমাদের মধ্যে কোন লেখক ন্যায়সঙ্গতভাবে তা লিখে দেবে; লেখক লিখতে অস্বীকার করবে না। আল্লাহ তাকে যেমন শিক্ষা দিয়েছেন, তার উচিত তা লিখে দেয়া। এবং ঋন গ্রহীতা যেন লেখার বিষয় বলে দেয় এবং সে যেন স্বীয় পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করে এবং লেখার মধ্যে বিন্দুমাত্রও বেশ কম না করে। অতঃপর ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ হয় কিংবা দূর্বল হয় অথবা নিজে লেখার বিষয়বস্তু বলে দিতে অক্ষম হয়, তবে তার অভিভাবক ন্যায়সঙ্গতভাবে লিখাবে। দুজন সাক্ষী কর, তোমাদের পুরুষদের মধ্যে থেকে। যদি দুজন পুরুষ না হয়, তবে একজন পুরুষ ও দুজন মহিলা। ঐ সাক্ষীদের মধ্য থেকে যাদেরকে তোমরা পছন্দ কর যাতে একজন যদি ভুলে যায়, তবে একজন অন্যজনকে স্মরণ করিয়ে দেয়। যখন ডাকা হয়, তখন সাক্ষীদের অস্বীকার করা উচিত নয়। তোমরা এটা লিখতে অলসতা করোনা, তা ছোট হোক কিংবা বড়, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। এ লিপিবদ্ধ করণ আল্লাহর কাছে সুবিচারকে অধিক কায়েম রাখে, সাক্ষ্যকে অধিক সুসংহত রাখে এবং তোমাদের সন্দেহে পতিত না হওয়ার পক্ষে অধিক উপযুক্ত। কিন্তু যদি কারবার নগদ হয়, পরস্পর হাতে হাতে আদান-প্রদান কর, তবে তা না লিখলে তোমাদের প্রতি কোন অভিযোগ নেই। তোমরা ক্রয়-বিক্রয়ের সময় সাক্ষী রাখ। কোন লেখক ও সাক্ষীকে ক্ষতিগ্রস্ত করো না। যদি তোমরা এরূপ কর, তবে তা তোমাদের পক্ষে পাপের বিষয়। আল্লাহকে ভয় কর তিনি তোমাদেরকে শিক্ষা দেন। আল্লাহ সব কিছু জানেন।
জহুরুল হক: ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা যখন কোনো লেনদেন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পরস্পরের মধ্যে সম্পাদিত কর তখন তা লিখে রাখো, এবং লেখকজন যেন তোমাদের মধ্যে লিখে রাখুক ন্যাসঙ্গতভাবে, আর লেখক যেন লিখতে অস্বীকার না করে, কেননা আল্লাহ্ তাকে শিখিয়েছেন, কাজেই সে লিখুক। আর যার উপরে দেনার দায় সে বলে যাবে, আর সে তার প্রভু আল্লাহ্কে যেন ভয়-ভক্তি করে, এবং তা’ থেকে কোনো কিছু যেন কম না করে। কিন্তু যার উপরে দেনার দায় সে যদি অল্পবুদ্ধি বা জরাগ্রস্ত হয়, অথবা তা বলে যেতে অপারগ হয় তবে তার অভিভাবক বলে যাক ন্যায়সঙ্গতভাবে। আর তোমাদের পুরুষদের মধ্যে থেকে দুইজন সাক্ষীকে সাক্ষী মনোনীত করো। কিন্তু যদি দুইজন পুরুষকে পাওয়া না যায় তবে একজন পুরুষ ও দু’জন মহিলাকে -- তাদের মধ্যে থেকে যাদের তোমরা সাক্ষী মনোনীত কর, যাতে তাদের দুজনের একজন যদি ভুল করে তবে তাদের অন্য একজন মনে করিয়ে দেবে। আর সাক্ষীরা যেন অস্বীকার না করে যখন তাদের ডাকা হয়। আর এটা লিখে নিতে অমনোযোগী হয়ো না -- ছোট হোক বা বড় হোক -- তার মেয়াদ সমেত। এ আল্লাহ্র কাছে বেশী ন্যায়সঙ্গত ও সাক্ষ্যের জন্য বেশী নির্ভরযোগ্য, এবং তোমরা যাতে সন্দেহ না করো সেজন্যেও এ সব চাইতে ভালো, তবে হাতের কাছের পণ্যসামগ্রী হলে তোমাদের মধ্যে তার বিনিময়ের ক্ষেত্র ব্যতীত, তখন তোমাদের অপরাধ হবে না যদি তোমরা তা লেখাপড়া না করো। আর সাক্ষী রাখো যখন তোমরা একে অন্যের কাছে বিক্রি করো। আর লেখকজন যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, আর সাক্ষীও যেন না হয়। কিন্তু যদি তোমরা কর তবে তা নিশ্চয়ই তোমাদের পক্ষে দুস্কার্য হবে। আর আল্লাহ্কে ভয়-ভক্তি করো, কারণ আল্লাহ্ তোমাদের শিখিয়েছেন। আর আল্লাহ্ সব-কিছু সন্বন্দে সর্বজ্ঞাতা।
Sahih International: O you who have believed, when you contract a debt for a specified term, write it down. And let a scribe write [it] between you in justice. Let no scribe refuse to write as Allah has taught him. So let him write and let the one who has the obligation dictate. And let him fear Allah, his Lord, and not leave anything out of it. But if the one who has the obligation is of limited understanding or weak or unable to dictate himself, then let his guardian dictate in justice. And bring to witness two witnesses from among your men. And if there are not two men [available], then a man and two women from those whom you accept as witnesses - so that if one of the women errs, then the other can remind her. And let not the witnesses refuse when they are called upon. And do not be [too] weary to write it, whether it is small or large, for its [specified] term. That is more just in the sight of Allah and stronger as evidence and more likely to prevent doubt between you, except when it is an immediate transaction which you conduct among yourselves. For [then] there is no blame upon you if you do not write it. And take witnesses when you conclude a contract. Let no scribe be harmed or any witness. For if you do so, indeed, it is [grave] disobedience in you. And fear Allah. And Allah teaches you. And Allah is Knowing of all things.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২৮২. হে মুমিনগণ! তোমরা যখন একে অন্যের সাথে নির্ধারিত সময়ের জন্য ঋণের আদান-প্রদান কর তখন তা লিখে রেখো(১); তোমাদের মধ্যে কোন লেখক যেন ন্যায়ভাবে তা লিখে দেয়; কোন লেখক লিখতে অস্বীকার করবে না, যেমন আল্লাহ্– তাকে শিক্ষা দিয়েছেন। সুতরাং সে যেন লিখে(২); এবং যে ব্যক্তির উপর হক্ক রয়েছে (ঋণগ্রহীতা) সে যেন লেখার বিষয়বস্তু বলে দেয়(৩) এবং সে যেন তার রব আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে। আর তা থেকে কিছু যেন না কমায় (ব্যতিক্রম না করে)। অতঃপর যার উপর হক্ক রয়েছে (ঋণগ্রহীতা) যদি নির্বোধ অথবা দুর্বল হয় অথবা লেখার বিষয়বস্তু সে বলে দিতে না পারে। তবে যেন তার অভিভাবক ন্যায্যভাবে লেখার বিষয়বস্তু সে বলে দিতে না পারে তবে যেন তার অভিভাবক নায্যভাবে লেখার বিষয়বস্তু বলে দেয়।(৪) আর তোমরা তোমাদের পুরুষদের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী রাখ, অতঃপর যদি দু’জন পুরুষ না হয় তবে একজন পুরুষ ও দু’জন স্ত্রীলোক যাদেরকে তোমরা সাক্ষী হিসেবে পছন্দ কর, যাতে স্ত্রীলোকদের মধ্যে একজন ভুলে গেলে তাদের একজন অপরজনকে স্মরণ করিয়ে দেয়(৫)। আর সাক্ষীগণকে যখন ডাকা হবে তখন তারা যেন অস্বীকার না করে(৬)। আর তা (লেনদেন) ছোট-বড় যাই হোক, মেয়াদসহ লিখতে তোমরা কোনরূপ বিরক্ত হয়ো না। এটাই আল্লাহর নিকট ন্যায্যতর ও সাক্ষ্যদানের জন্য দৃঢ়তর এবং তোমাদের মধ্যে সন্দেহের উদ্রেক না হওয়ার জন্য অধিকতর উপযুক্ত। তবে তোমরা পরস্পর যে নগদ ব্যবসা পরিচালনা কর তা তোমরা না লিখলে কোন দোষ নেই। আর তোমরা যখন পরস্পর বেচাকেনা কর তখন সাক্ষী রেখো। আর কোন লেখক ও সাক্ষীকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে না। আর যদি তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত কর, তবে তা হবে তোমাদের সাথে অনাচার(৭)। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং আল্লাহ তোমাদেরকে শিক্ষা দিবেন। আর আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে সবিশেষ জ্ঞানী।
তাফসীর:
(১) আলোচ্য আয়াতসমূহে লেন-দেন সম্পর্কিত আইনের জরুরী মূলনীতি ব্যক্ত হয়েছে। যাকে চুক্তিনামাও বলা যেতে পারে। এরপর সাক্ষ্য-বিধির বিশেষ ধারা উল্লেখিত হয়েছে। আজকাল লেখালেখির যুগ। লেখাই মুখের কথার স্থলাভিষিক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু আপনি চৌদ্দ শ’ বছর পূর্বের দিকে তাকিয়ে দেখুন। তখন দুনিয়ার সব কাজকারবার ও ব্যবসা-বাণিজ্য মুখে মুখেই চলত। লেখালেখি এবং দলীল-দস্তাবেজের প্রথা প্রচলন ছিল না। সর্বপ্রথম কুরআনুল কারীম এদিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বলা হয়েছে “তোমরা যখন পরস্পর নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ধার-কর্জের কারবার কর, তখন তা লিখে নাও”। এতে প্রথম নীতি এই যে, ধার-কর্জের লেনদেনে দলীল-দস্তাবেজ লিপিবদ্ধ করা উচিত - যাতে ভুল-ভ্রান্তি অথবা কোন পক্ষ থেকে অস্বীকৃতির কোন পরিস্থিতির উদ্ভব হলে তখন কাজে লাগে।
দ্বিতীয়তঃ ধার-কর্জের ব্যাপারে মেয়াদ অবশ্যই নির্দিষ্ট করতে হবে। অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ধার-কর্জের লেন-দেন জায়েয নয়। এতে কলহ-বিবাদের দ্বার উন্মুক্ত হয়। এ কারণেই ফেকাহবিদগণ বলেছেনঃ মেয়াদও এমন নির্দিষ্ট করতে হবে, যাতে কোনরূপ অস্পষ্টতা না থাকে। মাস এবং দিন তারিখসহ নির্দিষ্ট করতে হবে। কোনরূপ অস্পষ্ট মেয়াদ, যেমন “ধান কাটার সময়”- এরূপ নির্ধাতির করা যাবে না। কেননা, আবহাওয়ার পরিবর্তনে ধান কাটার সময় আগে-পিছে হয়ে যেতে পারে। [মাআরিফুল কুরআন]
(২) অর্থাৎ এটা জরুরী যে, তোমাদের মধ্যে কোন লেখক ন্যায়সঙ্গতভাবে লিখবে। এতে একদিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, লেখক কোন এক পক্ষের লোক হতে পারবে না; বরং নিরপেক্ষ হতে হবে - যাতে কারো মনে সন্দেহ-সংশয় না থাকে। অপরদিকে লেখককে ন্যায়সঙ্গতভাবে লিখতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অন্যের ক্ষণস্থায়ী উপকার করে নিজের চিরস্থায়ী ক্ষতি করা তার পক্ষে উচিত হবে না। এরপর লেখককে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা তাকে এ লেখার বিদ্যা দান করেছেন। এর কৃতজ্ঞতা এই যে, সে লিখতে অস্বীকার করবে না। [মা'আরিফুল কুরআন]
(৩) এরপর দলীল কোন পক্ষ থেকে লিখতে হবে সে সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ যার দায়িত্বে দেনা, সে লেখাবে। উদাহরণতঃ এক ব্যক্তি সওদা কিনে মূল্য বাকী রাখল। এখানে যার দায়িত্বে দেনা হচ্ছে, সে দলীলের বিষয়বস্তু লেখাবে। কেননা, এটা হবে তার পক্ষ থেকে স্বীকৃতি বা অঙ্গীকারপত্র।
(৪) লেন-দেনের ব্যাপারে দেনাদার ব্যক্তি কখনো নির্বোধ বা অক্ষম, বৃদ্ধ, অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক, মুক অথবা অন্য ভাষাভাষী হতে পারে। এ কারণে দলীলের বিষয়বস্তু বলে দেয়া তার পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে। তাই এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হলে তার পক্ষ থেকে তার কোন অভিভাবক লেখাবে। পাগল ও নাবালেগের তো অভিভাবক থাকেই। তাদের সব কাজ-কারবার অভিভাবক দ্বারাই সম্পন্ন হয়। মুক ও অন্য ভাষাভাষীর অভিভাবকও এ কাজ সম্পন্ন করতে পারে। যদি তারা কাউকে উকিল নিযুক্ত করে, তাতেও চলবে। এখানে কুরআনুল কারীমের ‘ওলী’ শব্দটি উভয় অর্থই বোঝায়।
(৫) এখানে বলা হয়েছে যে, দলীলের লেখাকেই যথেষ্ট মনে করবে না; বরং এতে সাক্ষ্যও রাখবে -যাতে কোন সময় পারস্পরিক কলহ দেখা দিলে আদালতে সাক্ষীদের সাক্ষ্য দ্বারা ফয়সালা হতে পারে। এ কারণেই ফেকাহবিদগণ বলেছেন যে, লেখা শরীআতসম্মত প্রমাণ নয়, তাই লেখার সমর্থনে শরীআতসম্মত সাক্ষ্য বিদ্যমান না থাকলে শুধু লেখার উপর ভিত্তি করে ফয়সালা করা যায় না। আজকালকার সাধারণ আদালতসমূহেও এ রীতিই প্রচলিত রয়েছে। লেখার মৌখিক সত্যায়ন ও তৎসমর্থনে সাক্ষ্য ব্যতীত কোন ফয়সালা করা হয় না। আয়াতে এরপর সাক্ষ্য-বিধির কতিপয় জরুরী নীতি বর্ণনা করা হয়েছে। উদাহরণতঃ (১) সাক্ষী দু’জন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দু’জন মহিলা হওয়া জরুরী। একা একজন পুরুষ অথবা শুধু দু’জন মহিলা সাধারণ লেন-দেনের সাক্ষ্যের জন্য যথেষ্ট নয়। অনুরূপভাবে (২) সাক্ষী মুসলিম হতে হবে। (مِنْ رِجَالِكُمْ) শব্দে এদিকেই নির্দেশ করা হয়েছে। (৩) সাক্ষী নির্ভরযোগ্য আদিল’ (বিশ্বস্ত) হতে হবে, যার কথার উপর আস্থা রাখা যায়। ফাসেক ও ফাজের (অর্থাৎ পাপাচারী) হলে চলবে না। (مِمَّنْ تَرْضَوْنَ مِنَ الشُّهَدَاءِ) বাক্যে এ নির্দেশ রয়েছে।
(৬) আয়াতের উদ্দেশ্য এই যে, যখন কোন ব্যাপারে কাউকে সাক্ষী করার জন্য ডাকা হয়, তখন সে যেন আসতে অস্বীকার না করে। কেননা, সাক্ষ্যই হচ্ছে সত্য প্রতিষ্ঠিত করার এবং বিবাদ মেটানোর উপায় ও পন্থা। কাজেই একে জরুরী জাতীয় কাজ মনে করে কষ্ট স্বীকার করবে। এরপর আবার লেন-দেনের দলীল লিপিবদ্ধ করার উপর জোর দিয়ে বলা হয়েছেঃ লেন-দেন ছোট কিংবা বড় হোক - সবই লিপিবদ্ধ করা দরকার। এ ব্যাপার বিরক্তিবোধ করা উচিত নয়। কেননা, লেন-দেন লিপিবদ্ধ করা সত্য প্রতিষ্ঠিত রাখতে, নির্ভুল সাক্ষ্য দিতে এবং সন্দেহ থেকে বেঁচে থাকতে চমৎকাররূপে সহযোগীতা করে। যদি নগদ লেন-দেন হয় - বাকী না হয়, তবে তা লিপিবদ্ধ না করলেও ক্ষতি নেই। তবে এ ব্যাপারেও কমপক্ষে সাক্ষী রাখা বাঞ্ছনীয়। কেননা, উভয় পক্ষের মধ্যে কোন সময় মতবিরোধ দেখা দিতে পারে। উদাহরণতঃ বিক্রেতা মূল্যপ্রাপ্তি অস্বীকার করতে পারে কিংবা ক্রেতা বলতে পারে যে, সে ক্রীতবস্তু বুঝে পায়নি। এ মতবিরোধ মীমাংসার ক্ষেত্রে সাক্ষ্য কাজে লাগবে। [মা'আরিফুল কুরআন]
(৭) আয়াতের শুরুতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, তারা যেন লিখতে ও সাক্ষী দিতে অস্বীকার না করে। এমতাবস্থায় তাদেরকে হয়ত মানুষ বিরক্ত করে তুলতে পারত। তাই আয়াতের শেষ ভাগে বলা হয়েছে, (وَلَا يُضَارَّ كَاتِبٌ وَلَا شَهِيدٌ) অর্থাৎ কোন লেখক বা সাক্ষীকে যেন ক্ষতিগ্রস্ত করা না হয়। নিজের উপকারের জন্য যেন তাদের বিব্রত না করা হয়। এরপর বলা হয়েছে, (وَإِنْ تَفْعَلُوا فَإِنَّهُ فُسُوقٌ بِكُمْ) অর্থাৎ তোমরা যদি লেখক বা সাক্ষীকে বিব্রত কর, তবে এতে তোমাদের গোনাহ হবে। এতে বোঝা গেল যে, লেখক কিংবা সাক্ষীকে বিব্রত বা ক্ষতিগ্রস্ত করা হারাম। এ কারণেই ফকীহগণ বলেনঃ যদি লেখক লেখার পারিশ্রমিক দাবী করে কিংবা সাক্ষী যাতায়াত খরচ চায়, তবে এটা তাদের নায্য অধিকার। তা না দেয়াও তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিব্রত করার শামিল এবং অবৈধ। ইসলাম বিচার ব্যবস্থায় যেমন সাক্ষীকে সাক্ষ্যদানে বাধ্য করেছে এবং সাক্ষ্য গোপন করাকে কঠোর অপরাধ সাব্যস্ত করেছে, তেমনি এ ব্যবস্থাও করেছে, যাতে কেউ সাক্ষ্য দেয়া থেকে গা বাঁচাতে বাধ্য না হয়।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২৮২) হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পরস্পর ঋণ দেওয়া-নেওয়া কর, তখন তা লিখে নাও।[1] আর তোমাদের মধ্যে কোন লেখক যেন ন্যায়ভাবে তা লিখে দেয় এবং আল্লাহ যেরূপ শিক্ষা দিয়েছেন --সেইরূপ লিখতে কোন লেখক যেন অস্বীকার না করে। অতএব তার লিখে দেওয়াই উচিত। আর ঋণগ্রহীতা যেন লেখার বিষয় বলে দিয়ে লিখিয়ে নেয়[2] এবং সে যেন স্বীয় প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করে এবং লেখার মধ্যে বিন্দুমাত্র কম-বেশী না করে। অনন্তর ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ হয় কিংবা দুর্বল হয় অথবা নিজে লেখার বিষয়বস্তু বলে দিতে অক্ষম হয়, তাহলে তার অভিভাবক যেন ন্যায়সঙ্গতভাবে তা লেখায়। আর তোমাদের মধ্যে দু’জন পুরুষকে (এই আদান-প্রদানের) সাক্ষী কর। যদি দু’জন পুরুষ না পাও, তাহলে সাক্ষীদের মধ্যে যাদেরকে তোমরা পছন্দ কর তাদের মধ্য হতে একজন পুরুষ ও দু’জন মহিলাকে সাক্ষী কর; [3] যাতে মহিলাদ্বয়ের একজন ভুলে গেলে যেন অন্য জন তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।[4] আর যখন (সাক্ষ্য দিতে) ডাকা হয়, তখন যেন সাক্ষীরা অস্বীকার না করে। (ঋণ) ছোট হোক, বড় হোক, তোমরা মেয়াদসহ লিখতে কোনরূপ অলসতা করো না। এ লেখা আল্লাহর নিকট ন্যায্যতর ও সাক্ষ্য (প্রমাণের) জন্য দৃঢ়তর এবং তোমাদের মধ্যে সন্দেহ উদ্রেক না হওয়ার অধিক নিকটতর।[5] কিন্তু তোমরা পরস্পরে ব্যবসায় যে নগদ আদান-প্রদান কর, তা না লিখলে কোন দোষ নেই। তোমরা যখন পরস্পর বেচা-কেনা কর, তখন সাক্ষী রাখ।[6] আর কোন লেখক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং না কোন সাক্ষী।[7] যদি তোমরা তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত কর, তাহলে তা হবে তোমাদের পক্ষে পাপের বিষয়। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর।[8] আল্লাহ তোমাদেরকে শিক্ষা দেন। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে মহাজ্ঞান
তাফসীর:
[1] যে সমাজে সূদী কার্যকলাপকে কঠোরভাবে নিষেধ করে সাদাকা-খয়রাত করার প্রতি তাকীদ করা হয়েছে, সেই সমাজে ঋণ করার প্রয়োজন পড়ে বেশী। কারণ সূদ তো হারাম এবং সব মানুষ সাদাকা-খয়রাত করার সামর্থ্য রাখে না। তাছাড়া সব লোক সাদাকা নিতে পছন্দও করে না। সুতরাং স্বীয় প্রয়োজন পূরণ করার জন্য উপায় এখন ঋণ আদান-প্রদান করা। আর এই কারণেই ঋণ দেওয়া যে বড় ফযীলতের কাজ, সে কথা বহু হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। তবে ঋণ যেহেতু অতীব প্রয়োজনীয় জিনিস, তাই এর প্রতি গুরুত্ব না দিলে অথবা এ ব্যাপারে অলসতা করলে, তা কলহ-বিবাদের কারণও হতে পারে। তাই এই আয়াতে --যাকে ‘আয়াতুদ দাইন’ বলা হয় এবং যেটা কুরআনের মধ্যে সব থেকে লম্বা আয়াত -তাতে মহান আল্লাহ ঋণের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দান করেছেন। যাতে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনটি কলহ-বিবাদের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। কাজেই এ ব্যাপারে একটি নির্দেশ হল, মেয়াদ নির্দিষ্ট করে নাও। দ্বিতীয় নির্দেশ, এটা লিখে নাও এবং তৃতীয় নির্দেশ হল, এর উপর দু’জন মুসলিম পুরুষকে অথবা একজন পুরুষ ও দু’জন মহিলাকে সাক্ষী বানিয়ে নাও।
[2] এ থেকে ঋণগ্রহীতাকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, সে যেন আল্লাহকে ভয় করে এবং টাকার যেন সঠিক পরিমাণ লিখায়, কম করে যেন না লিখায়। এর পর বলা হচ্ছে, ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ অথবা দুর্বল শিশু কিংবা পাগল হয়, তাহলে তার অভিভাবকের উচিত ইনসাফের সাথে লিখিয়ে নেওয়া, যাতে ঋণদাতার কোন ক্ষতি না হয়।
[3] অর্থাৎ, যাদের দ্বীনদারী ও ন্যায়-নিষ্ঠার ব্যাপারে তোমরা পূর্ণ আস্থাবান। কুরআনের এই আয়াত দ্বারা এ কথাও জানা গেল যে, দু’জন মহিলার সাক্ষী একজন পুরুষের সমান। অনুরূপ পুরুষ ছাড়াই কেবল একজন মহিলার সাক্ষী জায়েয নয়; কেবল সেই ব্যাপারগুলো ছাড়া যে ব্যাপার মহিলা ব্যতীত অন্য কারো জানা সম্ভব নয়। তবে বাদীর (অভিযোক্তার) একটি কসমের সাথে দু’জন মহিলার সাক্ষীর ভিত্তিতে ফয়সালা করা জায়েয না নাজায়েয, এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। যেমন, একজন পুরুষ সাক্ষী দিলে এবং দ্বিতীয় সাক্ষীর পরিবর্তে বাদী কসম খেলে ফায়সালা করা জায়েয। হানাফী ফক্বীহদের নিকট এ রকম করা জায়েয নয়। তবে মুহাদ্দিসীনগণ জায়েয হওয়ার কথাই ব্যক্ত করেছেন। কারণ, হাদীসে একজন সাক্ষী এবং কসমের সাথে ফায়সালা করা প্রমাণিত। আর দু’জন মহিলা যখন একজন পুরুষ সাক্ষীর সমান, তখন দু’জন মহিলা এবং কসমের সাথে ফায়সালা করা অবশ্যই জায়েয হবে। (ফাতহুল ক্বাদীর)
[4] এখানে একজন পুরুষের মোকাবেলায় দু’জন মহিলার সমান হওয়ার কারণ ও যুক্তি আছে। অর্থাৎ, মহিলা জ্ঞান ও স্মরণশক্তিতে পুরুষের থেকে দুর্বল। (যেমন মুসলিম শরীফের হাদীসে মহিলাকে কম জ্ঞানের অধিকারিণী বলা হয়েছে।) এখানে মহিলাকে ছোট ও তুচ্ছ সাব্যস্ত করা উদ্দেশ্য নয়। (যেমন, অনেকে বুঝাতে চেষ্টা করে।) বরং উদ্দেশ্য হল, একটি প্রাকৃতিক দুর্বলতার কথা বর্ণনা করা; যা মহান আল্লাহর ইচ্ছা এবং তাঁর কৌশলগত ব্যাপারের অন্তর্ভুক্ত। অহংকারবশতঃ কেউ যদি তা স্বীকার না করে, তাহলে তার ব্যাপার ভিন্ন। তবে প্রকৃতার্থে এবং বাস্তবতার দিক দিয়ে এটা অস্বীকারযোগ্য নয়।
[5] এটা ঋণ আদান-প্রদানের কথা লিখে রাখার উপকারিতা। এ থেকে সুবিচারের দাবীসমূহ পূরণ হবে, সাক্ষীও ঠিক থাকবে (সাক্ষীর মৃত্যুর পর এবং তার অনুপস্থিত থাকাকালীন এই লেখা কাজে আসবে।) এবং সন্দেহ-সংশয় থেকে উভয় পক্ষ হিফাযতে থাকবে। কারণ, সন্দেহের সৃষ্টি হলে লেখা দেখে তা দূর করে নেওয়া যেতে পারে।
[6] এটা এমন বেচা-কেনা যা ধারে হয় অথবা দাম-দর হয়ে যাওয়ার পরও যাতে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। নচেৎ ইতিপূর্বে নগদ বেচা-কেনার কথা লিখে নেওয়ার নির্দেশ থেকে পৃথক করা হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, এই বেচা-কেনা থেকে উদ্দেশ্য হল, জমি-জায়গা, বাড়ি-দোকান, বাগান ও পশু বেচা-কেনা। (আয়সারুত তাফাসীর)
[7] তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হল, কোন দূর-দূরান্ত অঞ্চলে তাদেরকে ডেকে আনা; যার কারণে তাদের নিজেদের কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটে অথবা ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। (তাদেরকে রাহাখরচ না দেওয়া) কিংবা তাদেরকে মিথ্যা কথা লিখতে এবং মিথ্যা সাক্ষী দিতে বাধ্য করা ইত্যাদি।
[8] অর্থাৎ, যে বিষয়গুলোর প্রতি তাকীদ করা হয়েছে, সেগুলোর উপর আমল কর এবং যে সব জিনিস থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে, তা থেকে বিরত থাকো।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২৮২-২৮৩ নং আয়াতের তাফসীর:
আয়াতের বাহ্যিক ভাব প্রমাণ করছে ঋণ লিখে রাখা অপরিহার্য। কিন্তু পরের আয়াত প্রমাণ করছে তা লিখে রাখা অপরিহার্য নয়। বরং লিখে রাখা উত্তম।
অত্র আয়াতকে “আয়াতুদ দাইন”বা ঋণের আয়াত বলা হয়। কুরআনুল কারীমের এটা সবচেয়ে বড় আয়াত। যেহেতু পূর্বের আয়াতে সুদকে কঠোরভাবে হারাম করে দান-সদাকাহ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে সেহেতু সমাজে বসবাসকারীদের মাঝে ঋণ গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিবেই। কারণ সুদ হারাম, সব মানুষ দান-সদাকাহ করার ক্ষমতা রাখে না। তাছাড়া সবাই দান-সদাকাহ নিতে পছন্দও করে না। সুতরাং প্রয়োজন সাড়ার অন্যতম উপায় ঋণ আদান-প্রাদান করা। ঋণ দেয়াও বড় ফযীলতের কাজ বলে হাদীসে উল্লেখ রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: কিয়ামতের দিন একজন লোককে আল্লাহ তা‘আলার সামনে আনা হবে। তাকে আল্লাহ তা‘আলা জিজ্ঞাসা করবেন: বল, তুমি আমার জন্য কী পুণ্য করেছ? সে বলবে: হে আল্লাহ! আমি এমন একটি অণু পরিমাণও পুণ্যের কাজ করতে পারিনি যার প্রতিদান আমি আপনার নিকট চাইতে পারি। আল্লাহ তা‘আলা তাকে পুনরায় এটাই জিজ্ঞাসা করবেন এবং সে একই উত্তর দেবে। আল্লাহ তা‘আলা আবার জিজ্ঞাসা করবেন তখন সে বলবে: হে আল্লাহ! একটি সামান্য কথা মনে পড়েছে। আপনি দয়া করে আমাকে কিছু সম্পদ দান করেছিলেন। আমি ব্যবসায়ী ছিলাম। লোক আমার নিকট হতে কর্জ নিয়ে যেতো। আমি যখন দেখতাম যে, এ লোকটি দরিদ্র এবং পরিশোধ করতে পারছে না তখন তাকে কিছু সময় অবকাশ দিতাম। ধনীদের ওপরও পীড়াপীড়ি করতাম না। অত্যন্ত দরিদ্র ব্যক্তিদের ক্ষমা করে দিতাম। তখন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তাহলে আমি তোমার পথ সহজ করবো না কেন? আমি তো সর্বাপেক্ষা বেশি সহজকারী। যাও আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। তুমি জান্নাতে চলে যাও। (সহীহ বুখারী হা: ২০৭৭)
ঋণ বা যে কোন লেন-দেন আদান-প্রদানের কয়েকটি নিয়ম-কানুন আল্লাহ তা‘আলা অত্র আয়াতে উল্লেখ করেছেন। কারণ সাধারণত টাকা-পয়সা ও মূল্যবান দ্রব্য লেন-দেনে কলহ-বিবাদ ও ভুল বুঝাবুঝি হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে মানুষের গভীর সম্পর্কও নষ্ট হয়ে যায়। তাই এমন নাজুক পরিস্থিতি হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহ তা‘আলা বিধান দিলেন- (১) মেয়াদ নির্দিষ্ট করে নেয়া। (২) লিখে রাখা। (৩) দু’জন মুসলিম পুরুষকে বা একজন পুরুষ ও দু’জন মহিলাকে সাক্ষী রাখা।
(وَلْيُمْلِلِ الَّذِي عَلَيْهِ)
“আর ঋণগ্রহীতা লেখার বিষয় বলে দেবে” এখানে বলা হচ্ছে ঋণ গ্রহীতা যদি নির্বোধ অথবা দুর্বল শিশু কিংবা পাগল হয় তাহলে তার অভিভাবকদের উচিত ইনসাফের সাথে লিখে নেয়া যাতে ঋণদাতার কোন ক্ষতি না হয়।
وَّامْرَاَتٰنِ “দু’জন মহিলা” এখানে একজন পুরুষের মোকাবেলায় দু’জন নারীকে সমান করা হয়েছে। কারণ মহিলারা দীনে ও স্মরণশক্তিতে পুরুষের চেয়ে দুর্বল। এখানে মহিলাদেরকে তুচ্ছ করে দেখা হয়নি। বরং সৃষ্টিগত দুর্বলতার কথা বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
مَا رَأَيْتُ مِنْ نَاقِصَاتِ عَقْلٍ وَدِينٍ أَغْلَبَ لِذِي لُبٍّ مِنْكُنَّ
“জ্ঞান ও দীনদারীত্ব কম হওয়া সত্ত্বেও জ্ঞানীদেরকে এত দ্রুত পরাস্ত করতে পারে, এমনটি তোমাদের (মহিলাদের) ছাড়া অন্য কাউকে দেখিনি। জিজ্ঞাসা করা হল- দীন ও জ্ঞান কম কোন্ দিক দিয়ে? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: কিছু দিন তোমরা সালাত আদায় কর না এবং সিয়াম পালন কর না এটা দীনের দিক দিয়ে কম। আর তোমাদের দু’জনের সাক্ষ্য একজন পুরুষের সমান। এটা জ্ঞানের দিক দিয়ে কম।”(সহীহ বুখারী হা: ৩০৪, ১৪৬২)
(وَإِن كُنتُمْ عَلَي سَفَرٍ)
“আর যদি তোমরা সফরে থাক” যদি কারো সফরে লেনদেনের প্রয়োজন হয় আর লেখক না পায় তাহলে ঋণদাতা ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে কোন জিনিস বন্ধক রাখবে। বন্ধক রাখা শরীয়তসম্মত নিয়ম। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর বর্ম এক ইয়াহূদীর কাছে বন্ধক রেখেছিলেন। (সহীহ বুখারী হা: ২২০০)। বন্ধক রাখা জিনিস যদি এমন হয় যার দ্বারা উপকৃত হওয়া যায়, তাহলে তার উপকারিতার অধিকারী হবে মালিক; ঋণদাতা নয়। অবশ্য বন্ধক রাখা জিনিসে যদি ঋণদাতার কোন কিছু ব্যয় হয়, তবে সে তার খরচ নিতে পারবে। খরচ নিয়ে নেয়ার পর অবশিষ্ট লাভ মালিককে দেয়া জরুরী।
(وَلَا تَكْتُمُواْ الشَّهَادَةَ)
‘আর তোমরা সাক্ষী গোপন কর না’সাক্ষ্য গোপন করা হারাম ও কবীরা গুনাহ। যে ব্যক্তি সাক্ষ্য গোপন করবে তার জন্য সহীহ হাদীসেও অনেক কঠিন শাস্তির কথা বলা হয়েছে। (সহীহ মুসলিম হা: ২৫৩৫, ১৭১৯)
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. ঋণ লেনদেন শরীয়তসম্মত, তবে অন্যায় ও পাপ কাজের জন্য ঋণ দেয়া যাবে না।
২. সকল লেনদেনে সময় উল্লেখ থাকা জরুরী।
৩. লেখককে অবশ্যই ন্যায় ও নিষ্ঠার সাথে লেখতে হবে, কোনরূপ কারচুপি করা যাবে না।
৪. ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রেও সাক্ষীর প্রয়োজন হলে রাখা উচিত।
৫. দুজন সাক্ষীর হিকমত হল একজন ভুলে গেলে অন্যজন স্মরণ করে দেবে।
৬. জেনে শুনে ও সত্যতার সাথে সাক্ষ্য দিতে হবে।
৭. কাউকে সাক্ষী হিসেবে থাকতে বললে বাধা দেয়া যাবে না।
৯. লেখা ও সাক্ষ্য দেয়ার ফলে প্রতিদান নেয়া যাবে না।
৮. সাক্ষ্য গোপন করা হারাম, তা দুনিয়ার কোন বিষয় হোক বা দীনের কোন বিষয় হোক।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: কুরআন কারীমের মধ্যে এই আয়াতটি সবচেয়ে বড় আয়াত। হযরত সাইদ বিন মুসাইয়্যাব (রঃ) বলেনঃ “আমার নিকট এই সংবাদ পৌছেছে যে, কুরআন মাজীদের মধ্যে আরশের সঙ্গে সর্বাপেক্ষা নতুন আয়াত ঋণের এই আয়াতটিই। আয়াতটি অবতীর্ণ হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হযরত আদমই (আঃ) অস্বীকারকারী। আল্লাহ তাআলা হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করার পর তাঁর পৃষ্ঠদেশে হাত বুলিয়ে দেন। ফলে কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর যতগুলো সন্তান জন্মগ্রহণ করবে সবাই বেরিয়ে আসে। হযরত আদম (আঃ) তাঁর সন্তানদেরকে স্বচক্ষে দেখতে পান। একজনকে অত্যন্ত হৃষ্ট পুষ্ট ও ঔজ্জ্বল্যময় দেখে জিজ্ঞেস করেন“হে আল্লাহ! এর নাম কি: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এটা তোমার সন্তান দাউদ (আঃ)। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ 'তার বয়স কত: আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ষাট বছর।' তিনি বলেনঃ তার বয়স তার কিছুদিন বাড়িয়ে দিন! আল্লাহ, তাআলা বলেন-না, তা হবে না। তবে তুমি যদি তোমার বয়সের মধ্য হতে তাকে কিছু দিতে চাও তবে দিতে পার। তিনি বলেনঃ হে আল্লাহ! আমার বয়সের মধ্য হতে চল্লিশ বছর তাকে দেয়া হোক। সুতরাং তা দেয়া হয়। হযরত আদম (আঃ) এর প্রকৃত বয়স ছিল এক হাজার বছর। বয়সের এই আদান -প্রদান লিখে নেয়া হয় এবং ফেরেশতাদেরকে ওর উপর সাক্ষী রাখা হয়। হযরত আদমের (আঃ)-মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে তিনি বলেনঃ হে আল্লাহ! আমার বয়সের এখনও তো চল্লিশ বছর অবশিষ্ট রয়েছে। আল্লাহ তাআলা তখন বলেনঃ “তুমি তোমার সন্তান দাউদ (আঃ)-কে চল্লিশ বছর দান করেছে। হযরত আদম (আঃ) তা অস্বীকার করেন। তখন তাঁকে ঐ লিখা দেখানো হয় এবং ফেরেশতাগণ সাক্ষ্য প্রদান করেন। দ্বিতীয় বর্ণনায় রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-এর বয়স এক হাজার বছর পূর্ণ করেছিলেন। এবং হযরত দাউদ (আঃ) এর বয়স করেছিলেন একশো বছর। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) কিন্তু এই হাদীসটি অত্যন্ত গারীব। এর একজন বর্ণনাকারী আলী বিন যায়েদ বিন জাদআন হতে বর্ণিত হাদীসগুলো অগ্রাহ্য হয়ে থাকে। মুসতাদরাক-ই-হাকিমের মধ্যেও এই বর্ণনাটি রয়েছে।
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর ঈমানদার বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন-আদান-প্রদান লিখে রাখে, তা হলে ঋণের পরিমাণ ও নির্ধারিত সময়ের ব্যাপারে কোন গণ্ডগোল সৃষ্টি হবে না। এতে সাক্ষীরাও ভুল করবে না। এর দ্বারা ঋণের জন্যে একটি সময় নির্ধারিত করার বৈধতাও সাব্যস্ত হচ্ছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলতেনঃ ‘সময় নির্ধারণ করে ঋণ আদান-প্রদানের অনুমতি এই আয়াত দ্বারা সুন্দরভাবে সাব্যস্ত হচ্ছে। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে। যে, “মদীনাবাসীদের ঋণ অদান-প্রদান দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেন,-“তোমরা মাপ বা ওজন নির্ধারণ করবে, দর চুকিয়ে নেবে এবং সময়েরও ফায়সালা করে নেবে”। কুরআন কারীমে নির্দেশ হচ্ছে-‘তোমরা লিখে রাখ। আর হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা নিরক্ষর উম্মত, না আমরা লিখতে জানি, না হিসাব জানি।” এই দুয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য এইভাবে যে, ধর্মীয় জিজ্ঞাস্য বিষয়াবলী এবং শরীয়তের বিধানসমূহ লিখার মমাটেই প্রয়োজন নেই। স্বয়ং মহান আল্লাহর পক্ষ হতে এগুলো অত্যন্ত সহজ করে দেয়া হয়েছে। কুরআন মাজীদ ও হাদীস শরীফে মুখস্থ রাখা মানুষের জন্যে প্রকৃতিগতভাবেই সহজ। কিন্তু ইহলৌকিক ছোট খাট আদান-প্রদান ও ধার-কর্জের বিষয়গুলো অবশ্যই লিখে রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া এটাও স্মরণ রাখবার বিষয় যে, এই নির্দেশ ফরযের জন্যে নয়। সুতরাং না লিখা ধর্মীয় কার্যে এবং লিখে রাখা সাংসারিক কার্যে প্রযোজ্য। কেউ কেউ এই লিখে রাখাকে ফরযও বলেছেন। ইবনে জুরাইজ (রঃ) বলেছেন, যে ধার দেবে সে লিখে রাখবে এবং যে বিক্রি করবে সে সাক্ষী রাখবে। হযরত আবূ সুলাইমান মিরআশী (রঃ) বহুদিন হযরত কা'বের সংস্পর্শে এসেছিলেন। তিনি একদা তাঁর পার্শ্ববর্তী লোকদের বলেন-ঐ অত্যাচারিত ব্যক্তি, যে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করে অথচ তার প্রার্থনা গ্রহণীয় হয় না, তোমরা তার পরিচয় জান কি: তারা বলে-এটা কিরূপে: তিনি বলেন, এটা ঐ ব্যক্তি যে ব্যক্তি একটা নির্ধারিত সময়ের জন্যে ধার দেয় কিন্তু সাক্ষীও রাখে না বা লিখেও রাখে না। অতঃপর নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হওয়ার পর সে তাগাদা শুরু করে এবং ঋণী ব্যক্তি তা অস্বীকার করে। তখন এই লোকটি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে কিন্তু তার; প্রার্থনা গৃহীত হয় না। কেননা,সে মহান আল্লাহর নির্দেশের বিপরীত করেছে। সুতরাং সে তাঁর অবাধ্য হয়েছে। হযরত আবু সাঈদ (রঃ), শাবী (রঃ), রাবী বিন আনাস (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), ইবনে জুরাইজ (রঃ), ইবনে যায়েদ (রঃ) প্রমূখের উক্তি এই যে, এইভাবে লিখে পড়ে রাখার কাজটি প্রথমে অবশ্যকরণীয় কাজ ছিল। কিন্তু পরে তা রহিত হয়ে যায়। পরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ(আরবি)
অর্থাৎ যদি তোমাদের একের অপরের প্রতি আস্থা থাকে তবে যার নিকট তার আমানত রাখা হবে তা যেন সে আদায় করে দেয় (২:২৮৩)। ওর দলীল হচ্ছে নিম্নের হাদীসটি। এই ঘটনাটি পূর্ব যুগীয় উম্মতের হলেও তাদের শরীয়তই আমাদের শরীয়ত, যদি আমাদের শরীয়ত তা অস্বীকার না করে। যে ঘটনা আমরা এখন বর্ণনা করতে যাচ্ছি তাতে লিখা পড়া না হওয়া এবং সাক্ষী ঠিক না রাখাকে আইন রচয়িতা (সঃ) অস্বীকার করেননি। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, বানী ইসরাঈলের একটি লোক অন্য একটি লোকের নিকট এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা ধার চায়। সে বলেঃ ‘সাক্ষী আন। সে বলেঃ ‘আল্লাহ তাআলার সাক্ষ্যই যথেষ্ট।' সে বলেঃ জামানত আন।' সে বলে “আল্লাহ পাকের জামানতই যথেষ্ট। তথন ঋণ দাতা লোকটিকে বলেঃ তুমি সত্যই বলছো।' অতঃপর ঋণ আদায়ের সময় নির্ধারিত হয় এবং সে তাকে এক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা গুনে দেয়। এরপর ঋণ গ্রহীতা লোকটি সামুদ্রিক ভ্রমণে বের হয় এবং নিজের কাজ হতে অবকাশ লাভ করে। ঋণ পরিশোধের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার সময় নিকটবর্তী হয়ে গেলে সে সমুদ্রের তীরে আগমন করে। তার ইচ্ছে এই যে, কোন জাহাজ আসলে তাতে উঠে বাড়ী চলে আসবে এবং ঐ লোকটির ঋণ পরিশোধ করে দেবে। কিন্তু কোন জাহাজ পেলো না। এখন সে দেখলো যে, সে সময় মত পৌছতে পারবে না। তখন সে একখানা কাঠ নিয়ে খোদিত করলো এবং তাতে এক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা রেখে দিলো ও এক টুকরো কাগজও রাখলো। অতঃপর ওর মুখ বন্ধ করে দিলো এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করলো, | হে প্রভু! আপনি খুব ভাল জানেন যে, আমি অমুক ব্যক্তির নিকট এক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা ধার করেছি। সে আমার নিকট জামানত চাইলে আমি আপনাকেই জামিন দেই এবং তাতে সে সন্তুষ্ট হয়ে যায়। সে সাক্ষী উপস্থিত করতে বললে আমি আপনাকেই সাক্ষী রাখি। সে তাতেও সন্তুষ্ট হয়ে যায়। এখন যখন সময় শেষ হতে চলেছে তখন আমি সদা নৌকা অনুসন্ধান করতে থাকি যে, নৌকা যোগে বাড়ী গিয়ে কর্জ পরিশোধ করবো। কিন্তু কোন নৌকা পাওয়া যায়নি। এখন আমি সেই অংক আপনাকেই সমর্পণ করছি এবং সমুদ্রে নিক্ষেপ করছি ও প্রার্থনা করছি যে,আপনি এই মুদ্রা তার নিকট পৌছিয়ে দিন। অতঃপর সে ঐ কাঠটি সমুদ্রে নিক্ষেপ করে এবং নিজে চলে আসে। কিন্তু তবুও সে নৌকার খোজেই থাকে যে, নৌকা পেলে চলে যাবে। এখানে তো এই হলো। আর ওখানে যে ব্যক্তি তাকে ঋণ দিয়েছিলো সে যখন দেখলো যে, সময় হয়ে গেছে এবং আজ তার যাওয়া উচিত। কাজেই সেও সমুদ্রের ধারে আসে যে ঐ ঋণ গ্রহীতা আসবে এবং তাকে তার ঋণ পরিশোধ করবে কিংবা কারও হাতে পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু যখন সন্ধ্যা হয়ে গেল কোন নৌকা এলো না তখন সে ফিরে আসার মনস্থ করলো। সমুদ্রের ধারে একটি কাঠ দেখে মনে করলো, বাড়ী তো খালি হাতেই যাচ্ছি কাঠটি নিয়ে যাই। একে ফেড়ে শুকিয়ে জ্বালানি কাঠ রূপে ব্যবহার করা যাবে। বাড়ী পৌছে কাঠটিকে কাড়া মাত্রই ঝন ঝন করে বেজে উঠে স্বর্ণমুদ্রা বেরিয়ে আসে। গণনা করে দেখে যে, পুরো এক হাজারই রয়েছে। তথায় কাগজ খণ্ডের উপর দৃষ্টি পড়ে। ওটা উঠিয়ে পড়ে নেয়। অতঃপর একদিন ঐ লোকটিই এসে এক হাজার দীনার পেশ করতঃ বলে-“আপনার প্রাপ্য মুদ্রা গ্রহণ করুন এবং আমাকে ক্ষমা করুন। আমি সদা অঙ্গীকার ভঙ্গ না করার চেষ্টা করেছি। নৌকা না পাওয়ার কারণে বিলম্ব করতে বাধ্য হয়েছি। আজ নৌকা পাওয়ায় মুদ্রা নিয়ে আপনার নিকট উপস্থিত হয়েছি।' তখন ঐ ঋণ দাতা লোকটি বলে আপনি আমার প্রাপ্য পাঠিয়েও দিয়েছিলেন কি: সে বলে, “আমি তো বলেই দিয়েছি যে, আমি নৌকা পাইনি।' সে বলে, “আপনি আপনার অর্থ নিয়ে সন্তুষ্ট চিত্তে ফিরে যান। আপনি মহান আল্লাহর উপর নির্ভর করতঃ কাঠের মধ্যে ভরে যে মুদ্রা নদীতে ফেলে দিয়েছিলেন তা আল্লাহ আমার নিকট পৌছিয়ে দিয়েছেন এবং আমি আমার পূর্ণ প্রাপ্য পেয়েছি। এই হাদীসের সনদ সম্পূর্ণ সঠিক। সহীহ বুখারীর মধ্যে সাত জায়গায় এই হাদীসটি এসেছে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, লেখক যেন ন্যায় ও সত্যের সঙ্গে লিখে। লিখার ব্যাপারে যেন কোন দলের উপর অত্যাচার না করে, এদিকে ওদিকে কিছু কম বেশী না করে। বরং আদান-প্রদানকারী একমত হয়ে যা তাকে লিখতে বলবে ঠিক তাই যেন সে লিখে দেয়। যেমন তার প্রতি আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ রয়েছে যে, তিনি তাকে লিখা-পড়া শিখিয়েছেন, তেমনই যারা লিখা-পড়া জানে না সেও যেন তাদের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করতঃ তাদের আদান প্রদান ঠিকভাবে লিখে দেয়। হাদীস শরীফে এসেছেঃ কোন কার্যরত ব্যক্তিকে সাহায্য করা এবং কোন পতিত ব্যক্তির কাজ করে দেয়াও সাদকা। অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে বিদ্যা জেনে তা গোপন করে, কিয়ামতের দিন তাকে আগুনের লাগাম পরানো হবে।'
হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত আতা (রঃ) বলেনঃ “এই আয়াতের ধারা অনুসারে লিখে দেয়া লেখকের উপর ওয়াজিব।” লিখিয়ে নেয়ার দায়িত্ব যার উপর রয়েছে সে যেন হক ও সত্যের সঙ্গে লিখিয়ে নেয় এবং আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করতঃ যেন বেশী-কম না করেও বিশ্বাসঘাতকতা না করে। যদি এই লোকটি অবুঝ হয়, দুর্বল হয়, নাবালক হয়, জ্ঞান ঠিক না থাকে কিংবা নির্বুদ্ধিতার কারণে লিখিয়ে নিতে অসমর্থ হয়, তবে তার অভিভাবক ও বড় মানুষ লিখিয়ে নেবে।
অতঃপর বলা হচ্ছে যে, লিখার সাথে সাথে সাক্ষ্যও হতে হবে, যেন এই আদান-প্রদানের ব্যাপারটি খুবই শক্ত ও পরিষ্কার হয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা দু’জন পুরুষ লোককে সাক্ষী করবে। যদি দু’জন পুরুষ পাওয়া যায় তবে একজন পুরুষ ও দুজন স্ত্রী হলেও চলবে। এই নির্দেশ ধন-সম্পদের ব্যাপারে এবং সম্পদের উদ্দেশ্যের ব্যাপারে রয়েছে। স্ত্রী লোকের জ্ঞানের স্বল্পতার কারণেই দু'জন স্ত্রী লোককে একজন পুরুষের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে। যেমন সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘হে স্ত্রী লোকেরা! তোমরা দান-খয়রাত কর এবং খুব বেশী আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। আমি জাহান্নামে তোমাদেরই সংখ্যা বেশী দেখেছি। একজন স্ত্রী লোক বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এর কারণ কি:' তিনি বলেন, ‘তোমরা খুব বেশী অভিশাপ দিয়ে থাক এবং তোমাদের স্বামীদের অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাক। তোমাদের জ্ঞান ও দ্বীনের স্বল্পতা সত্ত্বেও পুরুষদের জ্ঞান হরণকারিণী তোমাদের অপেক্ষা বেশী আর কেউ নেই।' সে পুনরায় জিজ্ঞেস করে, “দ্বীন ও জ্ঞানের স্বল্পতা কিরূপে: তিনি উত্তরে বলেন, জ্ঞানের স্বল্পতা তো এর দ্বারাই প্রকাশিত হয়েছে যে, দু’জন স্ত্রী লোকের সাক্ষ্য একজন পুরুষ লোকের সাক্ষ্যের সমান আর দ্বীনের স্বল্পতা এই যে, তোমাদের ঋতুর অবস্থায় তোমরা নামায পড় না ও রোযা কাযা করে থাকি।
সাক্ষীদের সম্বন্ধে বলা হয়েছে যে, তাদের ন্যায়পরায়ণ হওয়া শর্ত। ইমাম শাফিঈর (রঃ) মাযহাব এই যে, কুরআন মাজীদের মধ্যে যেখানেই সাক্ষীদের বর্ণনা রয়েছে, সেখানে শব্দে না থাকলেও ভাবার্থে ন্যায়পরায়ণতার শর্ত অবশ্যই রয়েছে। যারা ন্যায়পরায়ণ নয় তাদের সাক্ষ্য যারা প্রত্যাখ্যান করেছেন, এই আয়াতটিই তাদের দলীল। তারা বলেন যে, সাক্ষীগণকে অবশ্যই ন্যায়পরায়ণ। হতে হবে। দু’জন স্ত্রী লোক নির্ধারণ করারও দূরদর্শিতা বর্ণনা করা হয়েছে যে, যদি একজন ভুলে যায় তবে অপরজন তাকে স্মরণ করিয়ে দেবে। ফাতুজাক্কিরা শব্দটি অন্য পঠনে ফাতুজাকিরুও রয়েছে। যারা বলেন যে, একজন স্ত্রীর সাক্ষ্য অন্য স্ত্রীর সাক্ষ্যের সাথে মিলে যায় তখন তা পুরুষ লোকের সাক্ষ্যের মতই হয়ে যায়, এটা তাঁদের মন গড়া কথা। প্রথম উক্তিটিই সঠিক। বলা হচ্ছে, সাক্ষীদেরকে ডাকা হলে তারা যেন অস্বীকার না করে অর্থাৎ যখন তাদেরকে বলা হবে তোমরা এসো ও সাক্ষ্য প্রদান কর, তখন তারা যেন অস্বীকৃতি জ্ঞাপন না করে। যেমন লেখকদের ব্যাপারেও এটাই বলা হয়েছে। এখান থেকে এই উপকারও লাভ করা যাচ্ছে যে, সাক্ষী থাকা ফরযে কেফায়া। ‘জমহূরের মাযহাব এটাই' এ কথাও বলা হয়েছে। এই অর্থও বর্ণনা করা হয়েছে যে, যখন। সাক্ষীদেরকে সাক্ষ্য প্রদানের জন্যে ডাক দেয়া হবে অর্থাৎ যখন তাদেরকে ঘটনা জিজ্ঞেস করা হবে তখন যেন তারা সাক্ষ্য দেয়ার কাজ হতে বিরত না, থাকে। হযরত আবু মুজাল্লা (রঃ), মুজাহিদ (রঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ বলেন যে, যখন সাক্ষী হওয়ার জন্য কাউকে ডাকা হবে তখন তার সাক্ষী হওয়ার বা না হওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সাক্ষী হয়ে যাওয়ার পর সাক্ষ্য প্রদানের জন্যে আহবান করা হলে অবশ্যই যেতে হবে। সহীহ মুসলিম ও সুনানের হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, 'উত্তম সাক্ষী তারাই যারা সাক্ষ্য না চাইতেই সাক্ষ্য দিয়ে থাকে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে হাদীস রয়েছে যে, ‘জঘন্যতম সাক্ষী তারাই যাদের নিকট সাক্ষ্য না চাইতেই সাক্ষ্য দিয়ে থাকে এবং সেই হাদীসটি-র মধ্যে রয়েছে যে, এমন লোক আসবে যাদের শপথ সাক্ষ্যের উপর ও সাক্ষ্য শপথের উপর অগ্রে অগ্র থাকবে তাতে জানা যাচ্ছে যে, এইসব নিন্দে সূচক কথা মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদানকারী সম্বন্ধেই বলা হয়েছে এবং উপরের ঐ প্রশংসামূলক কথা সত্য সাক্ষ্য প্রদানকারী সম্বন্ধে বলা হয়েছে। এইভাবেই এই পরস্পর বিরোধী হাদীসগুলোর মধ্যে অনুরূপতা দান করা হবে। এই হাদীসসমূহের পরিপ্রেক্ষিতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রভৃতি মনীষী বলেন, ‘সাক্ষ্য দিতে ও সাক্ষী হতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করা উচিত নয়। এই দু'টোই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।'
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, বিষয় বড়ই হোক আর ছোটই হোক, সময়ের মেয়াদ ইত্যাদি লিখে নাও। আমার এই নির্দেশ ন্যায় প্রতিষ্ঠাকারী এবং সাক্ষ্যের সঠিকতা সাব্যস্তকারী।' কেননা,নিজের লিখা দেখে বিস্মৃত কথাও স্মরণ হয়ে যায়। পক্ষান্তরে লিখা না থাকলে ভুল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা হয়ে থাকে। লিখা থাকলে সন্দেহের কোন অবকাশ থাকে কেননা, মতানৈক্যের সময় লিখা দেখে নিঃসন্দেহে মীমাংসা করা যেতে পারে।
এরপর বলা হচ্ছে যে, যদি নগদ ক্রয়-বিক্রয় হয় তবে বিবাদের কোন সম্ভাবনা নেই বলে না লিখলেও কোন দোষ নেই। এখন রইলো সাক্ষ্য। এই ব্যাপারে হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়্যাব (রঃ) বলেন যে, ধার হোক আর নগদই হোক সর্বাবস্থাতেই সাক্ষী রাখতে হবে। অন্যান্য মনীষী হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) এই কথা বলে আল্লাহ তা'আলা সাক্ষ্য প্রদানের নির্দেশও উঠিয়ে নিয়েছেন। এটাও মনে রাখার বিষয় যে, জমহরের মতে এই নির্দেশ ওয়াজিবের জন্যে নয়, বরং এর মধ্যে মঙ্গল নিহিত আছে বলে মুস্তাহাব হিসেবে এই নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর দলীল হচ্ছে নিম্নের হাদীসটি যার মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ক্রয়-বিক্রয় করেছেন কিন্তু সাক্ষী রাখেননি। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একজন বেদুঈনের নিকট হতে একটি ঘোড়া ক্রয় করেন। বেদুঈন মূল্য। নেয়ার উদ্দেশ্যে তার পিছনে পিছনে তার বাড়ীর দিকে আসে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুব দ্রুত চলছিলেন এবং বেদুঈনটি ধীরে ধীরে চলছিল। ঘোড়াটি যে বিক্রি হয়ে গেছে এ সংবাদ জনগণ জানতো না বলে তারা ঐ ঘোড়ার দাম করতে থাকে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট ঘোড়াটি যে দামে বিক্রি করেছিল তার চেয়ে বেশী দাম লেগে যায়। বেদুঈন নিয়্যত পরিবর্তন করতঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ডাক দিয়ে বলে- জনাব, আপনি হয় ঘোড়াটি ক্রয় করুন, না হয় আমি অন্যের হাতে বিক্রি করে দেই।' একথা শুনে নবী (সঃ) থেমে যান এবং বলেন-“তুমি তো ঘোড়াটি আমার হাতে বিক্রি করেই ফেলেছো; সুতরাং এখন আবার কি বলছো:’ বেদুঈনটি তখন বলে, “আল্লাহর শপথ! আমি বিক্রি করিনি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, তোমার ও আমার মধ্যে ক্রয়-বিক্রয় হয়ে গেছে। এখন এদিক ওদিক থেকে তোক একথা ওকথা বলতে থাকে। ঐ নির্বোধ তখন বলে, আমি আপনার নিকট বিক্রি করেছি তার সাক্ষী আনয়ন করুন। মুসলমানগণ তাকে বারবার বলে, ওরে হতভাগা! তিনি তো আল্লাহর রাসূল, তার মুখ দিয়ে ততা সত্য কথাই বের হয়। কিন্তু তার এই একই কথা-সাক্ষ্য আনয়ন করুন। এমন সময় হযরত খুযাইমা (রাঃ) এসে পড়েন এবং বেদুঈনের কথা শুনে বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে ঘোড়াটি বিক্রি করেছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেন, তুমি কি করে সাক্ষ্য দিচ্ছ: তিনি বলেন, আপনার সত্যবাদিতার উপর ভিত্তি করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, আজ খুযাইমার (রাঃ) সাক্ষ্য দু'জন সাক্ষীর সাক্ষ্যের সমান। সুতরাং এই হাদীস দ্বারা ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদানের বাধ্যবাধকতা প্রমাণিত হয় না। কিন্তু মঙ্গল ওর মধ্যেই রয়েছে যে, ব্যবসা বাণিজ্যেরও সাক্ষী রাখতে হবে। কেননা, তাফসীরে ইবনে মিরদুওয়াই ও মুসতাদরাক-ই-হাকিমের মধ্যে রয়েছে, তিন ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করে; কিন্তু তাদের প্রার্থনা কবুল হয়। প্রথম ঐ ব্যক্তি যার ঘরে দুশ্চরিত্রা স্ত্রী রয়েছে অথচ সে তাকে পরিত্যাগ করে না। দ্বিতীয় ঐ ব্যক্তি যে পিতৃহীনকে তার মাল তার প্রাপ্ত বয়সের পূর্বেই সমর্পণ করে। তৃতীয় ঐ ব্যক্তি যে কাউকে মাল ধার দেয় কিন্তু সাক্ষী রাখে না। ইমাম হাকিম (রঃ) হাদীসটিকে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের শর্তের উপর সহীহ বলেছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) হাদীসটিকে তাঁদের কিতাবে আনেননি। তার কারণ এই যে, হযরত শু'বার (রঃ) শিষ্য এই বর্ণনাটিকে হযরত আবু মূসা আশআরীর (রাঃ) উপর মাওকুফ বলে থাকেন। অর্থাৎ সনদ নবী (সঃ) পর্যন্ত পৌছেনি।
এর পর বলা হচ্ছে যে, যা লিখিয়ে নিচ্ছে লেখক যেন তার বিপরীত কথা না লিখে। অনুরূপভাবে সাক্ষীরও উচিত যে, সে যেন মূল ঘটনার উল্টো সাক্ষ্য না দেয় বা যেন সাক্ষ্য প্রদানে কার্পণ্য না করে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) এবং কাতাদাহ (রঃ) প্রমুখ মনীষীর এটাই উক্তি। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই দু’জনকে কষ্ট দেয়া হবে না’ এর ভাবার্থ এই বর্ণনা করেছেন যে, যেমন কেউ তাদেরকে ডাকতে গেল। সেই সময় তারা তাদের কাজকর্মে লিপ্ত রয়েছে। এই লোকটি তাদেরকে বলে ঐ কাজ দু’টো সম্পাদন করা তোমাদের উপর ফরয। সুতরাং নিজেদের ক্ষতি করে তথায় তোমাদেরকে অবশ্যই যেতে হবে।' এ কথা তাদেরকে বলার অধিকার তার নেই। অন্যান্য বহু মনীষী হতেও এটাই বর্ণিত আছে।
অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-‘আমি যা করতে নিষেধ করি তা করা এবং যা করতে বলি তা হতে বিরত থাকা চরম অন্যায়। এর শাস্তি তোমাদেরকে অবশ্যই ভোগ করতে হবে।' এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তোমরা প্রতিটি কাজে আল্লাহ তাআলার কথা স্মরণ করতঃ তাঁকে ভয় করে চল, তাঁর আদেশ পালন কর এবং তাঁর নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থাকে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “হে ইমানদারগণ! যদি তোমরা আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করে চল তবে তিনি তোমাদেরকে দলীল প্রদান করবেন। (৮:২৯) অন্য স্থানে রয়েছে, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাস রেখো, তিনি তোমাদেরকে দ্বিগুণ করুণা দান করবেন এবং তোমাদেরকে এমন নূর দান করবেন যার ঔজ্জ্বল্যে তোমরা চলতে থাকবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন ‘কার্যসমূহের পরিণাম এবং গূঢ় রহস্য সম্পর্কে, ঐগুলোর মঙ্গল ও দূরদর্শিতা সম্পর্কে আল্লাহ সম্পূর্ণ সজাগ রয়েছেন। কোন কিছুই তার দৃষ্টির অন্তরালে নেই; তার জ্ঞান সারা জগৎকে ঘিরে রয়েছে এবং প্রত্যেক জিনিসেরই প্রকৃত জ্ঞান তার রয়েছে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।