সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 283)
হরকত ছাড়া:
وإن كنتم على سفر ولم تجدوا كاتبا فرهان مقبوضة فإن أمن بعضكم بعضا فليؤد الذي اؤتمن أمانته وليتق الله ربه ولا تكتموا الشهادة ومن يكتمها فإنه آثم قلبه والله بما تعملون عليم ﴿٢٨٣﴾
হরকত সহ:
وَ اِنْ کُنْتُمْ عَلٰی سَفَرٍ وَّ لَمْ تَجِدُوْا کَاتِبًا فَرِهٰنٌ مَّقْبُوْضَۃٌ ؕ فَاِنْ اَمِنَ بَعْضُکُمْ بَعْضًا فَلْیُؤَدِّ الَّذِی اؤْتُمِنَ اَمَانَتَهٗ وَ لْیَتَّقِ اللّٰهَ رَبَّهٗ ؕ وَ لَا تَکْتُمُوا الشَّهَادَۃَ ؕ وَ مَنْ یَّکْتُمْهَا فَاِنَّهٗۤ اٰثِمٌ قَلْبُهٗ ؕ وَ اللّٰهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ عَلِیْمٌ ﴿۲۸۳﴾
উচ্চারণ: ওয়া ইন কুনতুম ‘আলা-ছাফারিওঁ ওয়ালাম তাজিদূকা-তিবান ফারিহা-নুম মাকবূদাতুন ফাইন আমিনা বা‘দুকুম বা‘দান ফালইউআদ্দিল্লাযী’তুমিনা আমা-নাতাহু ওয়াল ইয়াত্তাকিল্লাহা রাব্বাহূ ওয়ালা-তাকতুমুশশাহা-দাতা ওয়া মাইঁ ইয়াকতুমহা-ফাইন্নাহুআছিমুন কালবুহু ওয়াল্লা-হু বিমা-তা‘মালূন ‘আলীম।
আল বায়ান: আর যদি তোমরা সফরে থাক এবং কোন লেখক না পাও, তাহলে হস্তান্তরিত বন্ধক রাখবে। আর যদি তোমরা একে অপরকে বিশ্বস্ত মনে কর, তবে যাকে বিশ্বস্ত মনে করা হয়, সে যেন স্বীয় আমানত আদায় করে এবং নিজ রব আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে। আর তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না এবং যে কেউ তা গোপন করে, অবশ্যই তার অন্তর পাপী। আর তোমরা যা আমল কর, আল্লাহ সে ব্যাপারে সবিশেষ অবহিত।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৮৩. আর যদি তোমরা সফরে থাক এবং কোন লেখক না পাও তবে হস্তান্তরকৃত বন্ধক রাখবে(১)। অতঃপর তোমাদের একে অপরকে বিশ্বস্ত মনে করলে, যার কাছে আমানত রাখা হয়েছে সে যেন আমানত প্রত্যার্পণ করে এবং তার রব আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে। আর তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না(২)। আর যে কেউ তা গোপন করে অবশ্যই তার অন্তর পাপী(৩)। আর তোমরা যা কর আল্লাহ তা সবিশেষ অবগত।
তাইসীরুল ক্বুরআন: যদি তোমরা সফরে থাক এবং কোন লেখক না পাও, তাহলে বন্ধক রাখার জিনিসগুলো অন্যের দখলে রাখতে হবে, যদি তোমরা পরস্পর পরস্পরকে বিশ্বাস কর তাহলে যাকে বিশ্বাস করা হয়েছে সে যেন আমানত ফিরিয়ে দেয় এবং তার প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করে। তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না, যে ব্যক্তি তা গোপন করে, তার অন্তর পাপী। তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে বিশেষভাবে অবহিত।
আহসানুল বায়ান: (২৮৩) আর যদি তোমরা সফরে থাক এবং কোন লেখক না পাও, তাহলে বন্ধকী হাতে রাখা বিধেয়।[1] আর যদি তোমরা পরস্পর পরস্পরকে বিশ্বাস কর, তাহলে যাকে বিশ্বাস করা হয়, সে যেন (বিশ্বাস বজায় রেখে) আমানত প্রত্যর্পণ করে এবং তার প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করে। [2] আর তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না, বস্তুতঃ যে তা গোপন করে, নিশ্চয় তার অন্তর পাপময়। [3] তোমরা যা কর, আল্লাহ তা সবিশেষ অবহিত।
মুজিবুর রহমান: এবং যদি তোমরা প্রবাসে থাক ও লেখক না পাও তাহলে বন্ধকী বস্ত্ত নিজের দখলে রাখ। অতঃপর কেহ যদি কেহকে বিশ্বাস করে তাহলে যাকে বিশ্বাস করা হয়েছে তার পক্ষে গচ্ছিত দ্রব্য প্রত্যর্পণ করা উচিত এবং স্বীয় রাব্ব আল্লাহকে ভয় করা উচিৎ। সাক্ষ্য গোপন করনা; এবং যে কেহ তা গোপন করবে, নিশ্চয়ই তার মন পাপাচারী; বস্তুতঃ আল্লাহ তোমাদের কার্যকলাপ সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞাত।
ফযলুর রহমান: আর তোমরা যদি সফরে থাক এবং কোন লেখক না পাও তাহলে হস্তান্তরকৃত বন্ধক (রেখো)। যদি তোমাদের একজন আরেকজনকে বিশ্বাস করে (তার কাছে কিছু আমানত রাখে) তাহলে যাকে বিশ্বাস করা হয়েছে সে যেন তার (কাছে রাখা) আমানত ফেরত দেয় এবং স্বীয় প্রভু আল্লাহকে ভয় করে। তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না। যে তা গোপন করে সে নিশ্চয়ই অন্তরপাপী। তোমরা যা করো আল্লাহ তা ভালভাবে অবগত আছেন।
মুহিউদ্দিন খান: আর তোমরা যদি প্রবাসে থাক এবং কোন লেখক না পাও তবে বন্ধকী বন্তু হস্তগত রাখা উচিত। যদি একে অন্যকে বিশ্বাস করে, তবে যাকে বিশ্বাস করা হয়, তার উচিত অন্যের প্রাপ্য পরিশোধ করা এবং স্বীয় পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় কর! তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না। যে কেউ তা গোপন করবে, তার অন্তর পাপপূর্ণ হবে। তোমরা যা করা, আল্লাহ সে সম্পর্কে খুব জ্ঞাত।
জহুরুল হক: আর যদি তোমরা সফরে থাক এবং লেখক না পাও তবে বন্ধক নিতে পার। কিন্তু তোমাদের কেউ যদি অন্যের কাছে বিশ্বাসস্থাপন করে তবে যাকে বিশ্বাস করা হল সে তার আমানত ফেরত দিক, আর তার প্রভু আল্লাহ্কে ভয়-ভক্তি করুক। আর সাক্ষ্য গোপন করবে না, কারণ যে তা গোপন করে তার হৃদয় নিঃসন্দেহ পাপপূর্ণ। আর তোমরা যা করো আল্লাহ্ সে-সন্বন্ধে স র্বজ্ঞাতা।
Sahih International: And if you are on a journey and cannot find a scribe, then a security deposit [should be] taken. And if one of you entrusts another, then let him who is entrusted discharge his trust [faithfully] and let him fear Allah, his Lord. And do not conceal testimony, for whoever conceals it - his heart is indeed sinful, and Allah is Knowing of what you do.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২৮৩. আর যদি তোমরা সফরে থাক এবং কোন লেখক না পাও তবে হস্তান্তরকৃত বন্ধক রাখবে(১)। অতঃপর তোমাদের একে অপরকে বিশ্বস্ত মনে করলে, যার কাছে আমানত রাখা হয়েছে সে যেন আমানত প্রত্যার্পণ করে এবং তার রব আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে। আর তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না(২)। আর যে কেউ তা গোপন করে অবশ্যই তার অন্তর পাপী(৩)। আর তোমরা যা কর আল্লাহ তা সবিশেষ অবগত।
তাফসীর:
(১) এ আয়াত দ্বারা সফর অবস্থায় বন্ধক রাখা জায়েয প্রমাণিত হয়। অনুরূপভাবে মুকীম বা অবস্থানকালেও বন্ধক দিয়ে ঋণ গ্রহণ করা জায়েয। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও মুকীম অবস্থায় বন্ধক দিয়ে ঋণ গ্রহণ করেছেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ইয়াহুদীর নিকট থেকে নির্দিষ্ট মেয়াদে (বাকী) কিছু খাদ্য সামগ্রী খরিদ করেন এবং ঐ সময়ের জন্য তিনি ইয়াহুদীর নিকট তার বর্ম বন্ধক রাখেন। [বুখারীঃ ২৫০৯]
(২) সাক্ষ্য দিতে না চাওয়া এবং সাক্ষ্যে সত্য ঘটনা প্রকাশে বিরত থাকা উভয়টিই সত্য গোপন করার আওতায় পড়ে।
(৩) এ আয়াতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বর্ণিত হয়েছে। প্রথমতঃ বাকীর ব্যাপারে কেউ যদি বিশ্বস্ততার জন্য কোন বস্তু বন্ধক নিতে চায়, তাও করতে পারে। কিন্তু এতে مَقْبُوضَةٌ শব্দ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, বন্ধকী বস্তু দ্বারা উপকৃত হওয়া তার জন্য জায়েয নয়। সে শুধু ঋণ পরিশোধ হওয়া পর্যন্ত একে নিজের অধিকারে রাখবে। এর যাবতীয় মুনাফা আসল মালিকের প্রাপ্য। দ্বিতীয়তঃ যে ব্যক্তি কোন বিরোধ সম্পর্কে বিশুদ্ধ জ্ঞান রাখে, সে সাক্ষ্য গোপন করতে পারবে না। যদি সে গোপন করে, তবে তার অন্তর গোনাহগার হবে। ‘অন্তর গোনাহগার’ বলার কারণ এই যে, কেউ যেন একে শুধু মুখের গোনাহ মনে না করে। কেননা, অন্তর থেকেই প্রথমে ইচ্ছার সৃষ্টি হয়। তাই অন্তরের গোনাহ প্রথম। [মাআরিফুল কুরআন]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২৮৩) আর যদি তোমরা সফরে থাক এবং কোন লেখক না পাও, তাহলে বন্ধকী হাতে রাখা বিধেয়।[1] আর যদি তোমরা পরস্পর পরস্পরকে বিশ্বাস কর, তাহলে যাকে বিশ্বাস করা হয়, সে যেন (বিশ্বাস বজায় রেখে) আমানত প্রত্যর্পণ করে এবং তার প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করে। [2] আর তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না, বস্তুতঃ যে তা গোপন করে, নিশ্চয় তার অন্তর পাপময়। [3] তোমরা যা কর, আল্লাহ তা সবিশেষ অবহিত।
তাফসীর:
[1] যদি সফরে ঋণ লেনদেনের প্রয়োজন পড়ে এবং সেখানে লেখার লোক অথবা কাগজ-কলম ইত্যাদি না থাকে, তাহলে তার বিকল্প ব্যবস্থা হল, ঋণগ্রহীতা কোন জিনিস ঋণদাতার কাছে বন্ধক রাখবে। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, বন্ধক রাখা শরীয়ত সম্মত একটি বৈধ জিনিস। নবী করীম (সাঃ)ও তাঁর লোহার বর্মটি একজন ইয়াহুদীর কাছে বন্ধক রেখেছিলেন। (বুখারী ২২০০নং,মুসলিম) এই বন্ধক রাখা জিনিসটি যদি এমন হয় যার দ্বারা উপকৃত হওয়া যায়, তাহলে তার উপকারিতার অধিকারী হবে মালিক; ঋণদাতা নয়। অবশ্য বন্ধকে রাখা জিনিসে যদি ঋণদাতার কোন কিছু ব্যয় হয়, তবে সে তার খরচ নিতে পারবে। খরচ নিয়ে নেওয়ার পর অবশিষ্ট লাভ মালিককে দেওয়া জরুরী হবে।
[2] অর্থাৎ, তোমাদের একে অপরের প্রতি যদি বিশ্বাস থাকে, তাহলে কিছু বন্ধক রাখা ছাড়াই ঋণের আদান-প্রদান করতে পার। (এখানে ‘আমানত’ অর্থ ঋণ।) আল্লাহকে ভয় করে তা (আমানত) সঠিকভাবে আদায় কর।
[3] সাক্ষ্য গোপন করা কাবীরা গুনাহ। এই জন্যই এর কঠোর শাস্তির কথা কুরআনের এই আয়াতে এবং বহু হাদীসেও বর্ণিত হয়েছে। অনুরূপ সত্য সাক্ষ্য দেওয়ার ফযীলতও অনেক। এক হাদীসে নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, ‘‘আমি কি তোমাদেরকে উত্তম সাক্ষীদাতার কথা বলে দিবো না? সে হল এমন লোক, যার কাছে সাক্ষী তলব করার পূর্বেই সে নিজেই সাক্ষী নিয়ে উপস্থিত হয়ে যায়।’’ (মুসলিম ১৭১৯নং) অপর এক বর্ণনায় নিকৃষ্টতম সাক্ষীদাতার কথা বলতে গিয়ে বলেন, ‘‘আমি কি তোমাদেরকে নিকৃষ্টতম সাক্ষীদাতাদের কথা বলে দিবো না? তারা এমন লোক, যাদের নিকট সাক্ষী চাওয়ার পূর্বেই তারা সাক্ষী দেয়।’’ (মুসলিম ২৫৩৫নং) অর্থাৎ, এরা মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে মহাপাপ সম্পাদন করে। আলোচ্য আয়াতে বিশেষ করে অন্তরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, গোপন করা অন্তরের কাজ। তাছাড়া অন্তর হল অন্য সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নেতা। এটা গোশতের এমন এক টুকরা যে, যদি এটা ঠিক থাকে, তাহলে সারা দেহ ঠিক থাকবে। আর যদি এর মধ্যে খারাবী আসে, তাহলে সমস্ত দেহ খারাবীর শিকার হয়ে পড়বে।
(أَلاَ وَإِنَّ فِي الجَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الجَسَدُ كُلُّهُ وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الجَسَدُ كُلُّهُ أَلاَ وَهِيَ الْقَلْبُ ) (অর্থাৎ, শোন! শরীরে এমন একটি গোশতের টুকরা আছে যে, যদি তা ঠিক থাকে, তাহলে সারা দেহ ঠিক থাকবে। আর যদি তা নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে সারা দেহ নষ্ট হয়ে যাবে। শোন! তা হল, অন্তর।’’ (বুখারী ৫২নং)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২৮২-২৮৩ নং আয়াতের তাফসীর:
আয়াতের বাহ্যিক ভাব প্রমাণ করছে ঋণ লিখে রাখা অপরিহার্য। কিন্তু পরের আয়াত প্রমাণ করছে তা লিখে রাখা অপরিহার্য নয়। বরং লিখে রাখা উত্তম।
অত্র আয়াতকে “আয়াতুদ দাইন”বা ঋণের আয়াত বলা হয়। কুরআনুল কারীমের এটা সবচেয়ে বড় আয়াত। যেহেতু পূর্বের আয়াতে সুদকে কঠোরভাবে হারাম করে দান-সদাকাহ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে সেহেতু সমাজে বসবাসকারীদের মাঝে ঋণ গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিবেই। কারণ সুদ হারাম, সব মানুষ দান-সদাকাহ করার ক্ষমতা রাখে না। তাছাড়া সবাই দান-সদাকাহ নিতে পছন্দও করে না। সুতরাং প্রয়োজন সাড়ার অন্যতম উপায় ঋণ আদান-প্রাদান করা। ঋণ দেয়াও বড় ফযীলতের কাজ বলে হাদীসে উল্লেখ রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: কিয়ামতের দিন একজন লোককে আল্লাহ তা‘আলার সামনে আনা হবে। তাকে আল্লাহ তা‘আলা জিজ্ঞাসা করবেন: বল, তুমি আমার জন্য কী পুণ্য করেছ? সে বলবে: হে আল্লাহ! আমি এমন একটি অণু পরিমাণও পুণ্যের কাজ করতে পারিনি যার প্রতিদান আমি আপনার নিকট চাইতে পারি। আল্লাহ তা‘আলা তাকে পুনরায় এটাই জিজ্ঞাসা করবেন এবং সে একই উত্তর দেবে। আল্লাহ তা‘আলা আবার জিজ্ঞাসা করবেন তখন সে বলবে: হে আল্লাহ! একটি সামান্য কথা মনে পড়েছে। আপনি দয়া করে আমাকে কিছু সম্পদ দান করেছিলেন। আমি ব্যবসায়ী ছিলাম। লোক আমার নিকট হতে কর্জ নিয়ে যেতো। আমি যখন দেখতাম যে, এ লোকটি দরিদ্র এবং পরিশোধ করতে পারছে না তখন তাকে কিছু সময় অবকাশ দিতাম। ধনীদের ওপরও পীড়াপীড়ি করতাম না। অত্যন্ত দরিদ্র ব্যক্তিদের ক্ষমা করে দিতাম। তখন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তাহলে আমি তোমার পথ সহজ করবো না কেন? আমি তো সর্বাপেক্ষা বেশি সহজকারী। যাও আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। তুমি জান্নাতে চলে যাও। (সহীহ বুখারী হা: ২০৭৭)
ঋণ বা যে কোন লেন-দেন আদান-প্রদানের কয়েকটি নিয়ম-কানুন আল্লাহ তা‘আলা অত্র আয়াতে উল্লেখ করেছেন। কারণ সাধারণত টাকা-পয়সা ও মূল্যবান দ্রব্য লেন-দেনে কলহ-বিবাদ ও ভুল বুঝাবুঝি হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে মানুষের গভীর সম্পর্কও নষ্ট হয়ে যায়। তাই এমন নাজুক পরিস্থিতি হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহ তা‘আলা বিধান দিলেন- (১) মেয়াদ নির্দিষ্ট করে নেয়া। (২) লিখে রাখা। (৩) দু’জন মুসলিম পুরুষকে বা একজন পুরুষ ও দু’জন মহিলাকে সাক্ষী রাখা।
(وَلْيُمْلِلِ الَّذِي عَلَيْهِ)
“আর ঋণগ্রহীতা লেখার বিষয় বলে দেবে” এখানে বলা হচ্ছে ঋণ গ্রহীতা যদি নির্বোধ অথবা দুর্বল শিশু কিংবা পাগল হয় তাহলে তার অভিভাবকদের উচিত ইনসাফের সাথে লিখে নেয়া যাতে ঋণদাতার কোন ক্ষতি না হয়।
وَّامْرَاَتٰنِ “দু’জন মহিলা” এখানে একজন পুরুষের মোকাবেলায় দু’জন নারীকে সমান করা হয়েছে। কারণ মহিলারা দীনে ও স্মরণশক্তিতে পুরুষের চেয়ে দুর্বল। এখানে মহিলাদেরকে তুচ্ছ করে দেখা হয়নি। বরং সৃষ্টিগত দুর্বলতার কথা বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
مَا رَأَيْتُ مِنْ نَاقِصَاتِ عَقْلٍ وَدِينٍ أَغْلَبَ لِذِي لُبٍّ مِنْكُنَّ
“জ্ঞান ও দীনদারীত্ব কম হওয়া সত্ত্বেও জ্ঞানীদেরকে এত দ্রুত পরাস্ত করতে পারে, এমনটি তোমাদের (মহিলাদের) ছাড়া অন্য কাউকে দেখিনি। জিজ্ঞাসা করা হল- দীন ও জ্ঞান কম কোন্ দিক দিয়ে? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: কিছু দিন তোমরা সালাত আদায় কর না এবং সিয়াম পালন কর না এটা দীনের দিক দিয়ে কম। আর তোমাদের দু’জনের সাক্ষ্য একজন পুরুষের সমান। এটা জ্ঞানের দিক দিয়ে কম।”(সহীহ বুখারী হা: ৩০৪, ১৪৬২)
(وَإِن كُنتُمْ عَلَي سَفَرٍ)
“আর যদি তোমরা সফরে থাক” যদি কারো সফরে লেনদেনের প্রয়োজন হয় আর লেখক না পায় তাহলে ঋণদাতা ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে কোন জিনিস বন্ধক রাখবে। বন্ধক রাখা শরীয়তসম্মত নিয়ম। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর বর্ম এক ইয়াহূদীর কাছে বন্ধক রেখেছিলেন। (সহীহ বুখারী হা: ২২০০)। বন্ধক রাখা জিনিস যদি এমন হয় যার দ্বারা উপকৃত হওয়া যায়, তাহলে তার উপকারিতার অধিকারী হবে মালিক; ঋণদাতা নয়। অবশ্য বন্ধক রাখা জিনিসে যদি ঋণদাতার কোন কিছু ব্যয় হয়, তবে সে তার খরচ নিতে পারবে। খরচ নিয়ে নেয়ার পর অবশিষ্ট লাভ মালিককে দেয়া জরুরী।
(وَلَا تَكْتُمُواْ الشَّهَادَةَ)
‘আর তোমরা সাক্ষী গোপন কর না’সাক্ষ্য গোপন করা হারাম ও কবীরা গুনাহ। যে ব্যক্তি সাক্ষ্য গোপন করবে তার জন্য সহীহ হাদীসেও অনেক কঠিন শাস্তির কথা বলা হয়েছে। (সহীহ মুসলিম হা: ২৫৩৫, ১৭১৯)
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. ঋণ লেনদেন শরীয়তসম্মত, তবে অন্যায় ও পাপ কাজের জন্য ঋণ দেয়া যাবে না।
২. সকল লেনদেনে সময় উল্লেখ থাকা জরুরী।
৩. লেখককে অবশ্যই ন্যায় ও নিষ্ঠার সাথে লেখতে হবে, কোনরূপ কারচুপি করা যাবে না।
৪. ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রেও সাক্ষীর প্রয়োজন হলে রাখা উচিত।
৫. দুজন সাক্ষীর হিকমত হল একজন ভুলে গেলে অন্যজন স্মরণ করে দেবে।
৬. জেনে শুনে ও সত্যতার সাথে সাক্ষ্য দিতে হবে।
৭. কাউকে সাক্ষী হিসেবে থাকতে বললে বাধা দেয়া যাবে না।
৯. লেখা ও সাক্ষ্য দেয়ার ফলে প্রতিদান নেয়া যাবে না।
৮. সাক্ষ্য গোপন করা হারাম, তা দুনিয়ার কোন বিষয় হোক বা দীনের কোন বিষয় হোক।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: অর্থাৎ বিদেশে যদি ধারের আদান-প্রদান হয় এবং কোন লেখক পাওয়া না যায় অথবা কলম, কালি, কাগজ ইত্যাদি না থাকে তবে বন্ধক রাখো এবং যে জিনিস বন্ধক রাখবে তা ঋণ দাতার অধিকারে দিয়ে দাও। (আরবি) শব্দ দ্বারা এই দলীল গ্রহণ করা হয়েছে যে, বন্ধক যে পর্যন্ত অধিকারে না আসবে সেই পর্যন্ত তা অপরিহার্য হবে না। এটাই ইমাম শাফিঈ (রঃ) ও জমহূরের মাযহাব। অন্য দল এই দলীল গ্রহণ করেছেন যে, যে ব্যক্তি ঋণ গ্রহণ করেছে তার হাতেই বন্ধকের জিনিস রাখা জরুরী। ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং অন্য একটি দল হতে এটাই নকল করা হয়েছে। অন্য একটি দলের উক্তি এই যে, শরীয়তে শুধুমাত্র সফরের জন্যেই বন্ধকের বিধান রয়েছে। যেমন হযরত মুজাহিদ (রঃ) প্রভৃতি মনীষীর উক্তি। কিন্তু সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে যে,যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুনিয়া হতে চির বিদায় গ্রহণ করেন তখন তাঁর লৌহ বর্মটি
আবুশ শাহাম নামক একজন ইয়াহূদীর নিকট তিন ‘ওয়াসাক’ যবের বিনিময়ে বন্ধক ছিল, যে যব তিনি স্বীয় পরিবারের খাবারের জন্যে গ্রহণ করেছিলেন। এইসব জিজ্ঞাস্য বিষয় বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করার জায়গা তাফসীর নয়। বরং তার জন্যে বড় বড় আহকামের কিতাব রয়েছে। এর পরবর্তী বাক্য।(আরবি) দ্বারা পূর্বের নির্দেশ রহিত হয়েছে। শাবী। (রঃ) বলেন যে, যখন না দেয়ার ভয় থাকবে না তখন লিখে না রাখলে বা সাক্ষী রাখলে কোন দোষ নেই।
যার নিকট কিছু গচ্ছিত রাখা হবে তার আল্লাহকে ভয় করা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, “হাতের উপরে রয়েছে যা তুমি গ্রহণ করেছো যে পর্যন্ত না তুমি আদায় কর। আল্লাহ তাআলা বলেন, সাক্ষ্য গোপন করো না, বিশ্বাস ভঙ্গ করো না এবং তা প্রকাশ করা হতে বিরত হয়ো না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া এবং সাক্ষ্যকে গোপন করা বড় পাপ (কবিরা গুনাহ)। এখানেও বলা হচ্ছে যে, সাক্ষ্য গোপনকারীর মন পাপাচারী। অন্যস্থানে রয়েছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ আমরা আল্লাহর সাক্ষ্য গোপন করি না, এবং যদি আমরা এরূপ করি তবে নিশ্চয় আমরা পাপীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো। (৫:১০৬) অন্যত্র রয়েছেঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা সত্য ও ন্যায়ের সঙ্গে আল্লাহর উপর সুপ্রতিষ্ঠিত থাক যদিও তা তোমাদের নিজেদের, পিতা-মাতার এবং আত্মীয়-স্বজনের প্রতিকূলে হয়; যদি সে ধনী হয় বা দরিদ্র হয় তবে আল্লাহ তাদের অপেক্ষা উত্তম, অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও বা এড়িয়ে চল তবে জেনে রেখো, আল্লাহ তোমাদের কার্যাবলী সম্যক অবগত রয়েছেন। এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেন, তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না, সাক্ষ্য গোপনকারীর অন্তর পাপাচারী এবং আল্লাহ তোমাদের কার্যাবলী সম্যক জ্ঞাতা।'
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।