আল কুরআন


সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 249)

সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 249)



হরকত ছাড়া:

فلما فصل طالوت بالجنود قال إن الله مبتليكم بنهر فمن شرب منه فليس مني ومن لم يطعمه فإنه مني إلا من اغترف غرفة بيده فشربوا منه إلا قليلا منهم فلما جاوزه هو والذين آمنوا معه قالوا لا طاقة لنا اليوم بجالوت وجنوده قال الذين يظنون أنهم ملاقو الله كم من فئة قليلة غلبت فئة كثيرة بإذن الله والله مع الصابرين ﴿٢٤٩﴾




হরকত সহ:

فَلَمَّا فَصَلَ طَالُوْتُ بِالْجُنُوْدِ ۙ قَالَ اِنَّ اللّٰهَ مُبْتَلِیْکُمْ بِنَهَرٍ ۚ فَمَنْ شَرِبَ مِنْهُ فَلَیْسَ مِنِّیْ ۚ وَ مَنْ لَّمْ یَطْعَمْهُ فَاِنَّهٗ مِنِّیْۤ اِلَّا مَنِ اغْتَرَفَ غُرْفَۃًۢ بِیَدِهٖ ۚ فَشَرِبُوْا مِنْهُ اِلَّا قَلِیْلًا مِّنْهُمْ ؕ فَلَمَّا جَاوَزَهٗ هُوَ وَ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا مَعَهٗ ۙ قَالُوْا لَا طَاقَۃَ لَنَا الْیَوْمَ بِجَالُوْتَ وَ جُنُوْدِهٖ ؕ قَالَ الَّذِیْنَ یَظُنُّوْنَ اَنَّهُمْ مُّلٰقُوا اللّٰهِ ۙ کَمْ مِّنْ فِئَۃٍ قَلِیْلَۃٍ غَلَبَتْ فِئَۃً کَثِیْرَۃًۢ بِاِذْنِ اللّٰهِ ؕ وَ اللّٰهُ مَعَ الصّٰبِرِیْنَ ﴿۲۴۹﴾




উচ্চারণ: ফালাম্মা-ফাসালা তা-লূতু বিলজুনূদি কা-লা ইন্নাল্লা-হা মুবতালীকুম বিনাহারিন ফামান শারিবা মিনহু ফালাইছা মিন্নী ওয়া মাল্লাম ইয়াত‘আমহু ফাইন্নাহু মিন্নী-ইল্লা-মানিগতারাফা গুরফাতাম বিয়াদিহী ফাশারিবূ মিনহু ইল্লা-কালীলাম মিনহুম ফালাম্মা-জা-ওয়াযাহু হুওয়া ওয়াল্লাযীনা আ-মানূ মা‘আহু কা-লূ লা-তা-কাতালানাল ইয়াওমা বিজা-লূতা ওয়া জুনূদিহী কালাল্লাযীনা ইয়াজুন্নূনা আন্নাহুম মুলা-কুল্লা-হি কাম মিন ফিআতিন কালীলাতিন, গালাবাত ফিআতান কাছীরাতাম বিইযনিল্লা-হি ওয়াল্লা-হু মা‘আসসা-বিরীন।




আল বায়ান: অতঃপর যখন তালূত সৈন্যবাহিনী নিয়ে বের হল, তখন সে বলল, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে একটি নদী দ্বারা পরীক্ষা করবেন। অতএব, যে তা হতে পান করবে, সে আমার দলভুক্ত নয়। আর যে তা খাবে না, তাহলে নিশ্চয় সে আমার দলভুক্ত। তবে যে তার হাত দিয়ে এক আজলা পরিমাণ খাবে, সে ছাড়া; কিন্তু তাদের মধ্য থেকে স্বল্পসংখ্যক ছাড়া তা থেকে তারা পান করল। অতঃপর যখন সে ও তার সাথি মুমিনগণ তা অতিক্রম করল, তারা বলল, ‘আজ আমাদের জালূত ও তার সৈন্যবাহিনীর সাথে লড়াই করার ক্ষমতা নেই’। যারা দৃঢ় ধারণা রাখত যে, তারা আল্লাহর সাথে মিলিত হবে, তারা বলল, ‘কত ছোট দল আল্লাহর হুকুমে বড় দলকে পরাজিত করেছে’! আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৪৯ তারপর তালুত যখন সেনাবাহিনীসহ বের হলো তখন সে বলল, আল্লাহ এক নদী দ্বারা তোমাদের পরীক্ষা করবেন। যে তা থেকে পানি পান করবে সে আমাদের দলভুক্ত নয়; আর যে তার স্বাদ গ্রহণ করবে না সে আমার দলভুক্ত; এছাড়া যে তার হাতে এক কোষ পানি গ্রহণ করবে সেও’। অতঃপর অল্প সংখ্যক ছাড়া তারা তা থেকে পানি পান করল(১)। সে এবং তার সংগী ঈমানদারগণ যখন তা অতিক্রম করল তখন তারা বলল, জালূত ও তার সেবাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মত শক্তি আজ আমাদের নেই। কিন্তু যাদের প্রত্যয় ছিল আল্লাহ্‌র সাথে তাদের সাক্ষাৎ হবে তারা বলল, আল্লাহ্‌র হুকুমে কত ক্ষুদ্র দল কত বৃহৎ দলকে পরাভূত করেছে! আর আল্লাহ্‌ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন।




তাইসীরুল ক্বুরআন: অতঃপর যখন তালুত সৈন্যসহ রওয়ানা হল, বলল, ‘আল্লাহ একটা নদী দ্বারা তোমাদের পরীক্ষা করবেন, মূলতঃ যে কেউ ওটার পানি পান করবে সে ব্যক্তি আমার দলভুক্ত নয় আর যে তা খাবে না, সে নিশ্চয়ই আমার দলভুক্ত হবে, কিন্তু যে এক অঞ্জলি পানি নিবে সেও (আমার দলভুক্ত)’। অতঃপর অতি অল্প সংখ্যক ছাড়া তারা সকলেই তাত্থেকে পান করল। এরপর তালুত এবং তার সাথী মু’মিনগণ নদী পার হয়ে বলল, ‘আজ জ্বালুত ও তার সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ করার শক্তি আমাদের নেই। কিন্তু যাদের এ ধারণা ছিল যে, তাদেরকে আল্লাহর সামনে হাজির হতে হবে তারা বলল, ‘আল্লাহর হুকুমে বহু ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র দল বৃহৎ দলের উপর জয়যুক্ত হয়েছে’। আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।




আহসানুল বায়ান: (২৪৯) অতঃপর তালূত যখন সৈন্যদলসহ বের হল, তখন সে বলল, ‘আল্লাহ একটি নদী দ্বারা তোমাদেরকে পরীক্ষা করবেন।[1] অতএব যে কেউ উক্ত নদী থেকে পানি পান করবে, সে আমার দলভুক্ত নয় এবং যে ঐ পানি পান করবে না, সে আমার দলভুক্ত। অবশ্য যে কেউ তার হাত দিয়ে এক আঁজলা পানি পান করবে সে-ও (আমার দলভুক্ত)।’ কিন্তু (যখন তারা নদীর কাছে হাজির হল, তখন) তাদের অল্প সংখ্যক ব্যতীত অধিকাংশ লোকই তা থেকে পানি পান করল।[2] অতঃপর যখন সে (ত্বালূত) ও তার প্রতি বিশ্বাসস্থাপনকারিগণ তা (নদী) অতিক্রম করল, তখন তারা বলল, ‘আমাদের শক্তি ও সাধ্য নেই যে, আজ জালূত ও তার সৈন্য-সামন্তের সাথে যুদ্ধ করি।’[3] কিন্তু যাদের প্রত্যয় ছিল যে, আল্লাহর সাথে তাদের সাক্ষাৎ ঘটবে, তারা বলল, ‘আল্লাহর ইচ্ছায় কত ক্ষুদ্র দল কত বৃহৎ দলকে পরাজিত করেছে! আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে রয়েছেন।’



মুজিবুর রহমান: অনন্তর যখন তালূত সৈন্যদলসহ বহির্গত হয়েছিল তখন সে বলেছিল, নিশ্চয়ই আল্লাহ একটি নদী দ্বারা তোমাদেরকে পরীক্ষা করবেন, ওটা হতে যে পান করবে সে আমার দলভুক্ত নয় এবং যে স্বীয় হস্ত দ্বারা অঞ্জলি পূর্ণ করে নিবে এবং তদ্ব্যতীত সে আর আস্বাদন করবেনা সে নিশ্চয়ই আমার লোক; কিন্তু তাদের মধ্যে অল্প সংখ্যক ব্যতীত অন্য সবাই সেই নদীর পানি পান করল, অতঃপর যখন সে ও তার সঙ্গী বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ নদী অতিক্রম করে গেল তখন তারা বললঃ জালুত ও তার সেনাবাহিনীর মুকাবিলা করার শক্তি আজ আমাদের নেই; পক্ষান্তরে যারা বিশ্বাস করত যে, তাদেরকে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে তারা বললঃ আল্লাহর হুকুমে কত ক্ষুদ্র দল কত বৃহৎ দলকে পরাজিত করেছে; বস্তুতঃ ধৈর্যশীলদের সঙ্গী হচ্ছেন আল্লাহ!



ফযলুর রহমান: পরে তালূত যখন সৈন্য নিয়ে বের হয়েছিল তখন সে (সৈন্যদেরকে) বলেছিল, “আল্লাহ তোমাদেরকে একটি নদী দ্বারা পরীক্ষা করবেন। যে ঐ নদীর পানি পান করবে সে আমার দলভুক্ত থাকতে পারবে না, আর যে তার স্বাদ গ্রহণ করবে না সে আমার দলভুক্ত থাকবে। অবশ্য যে নিজের হাতে মাত্র এক কোষ পরিমাণ (পানি) নেবে তার কথা আলাদা (অর্থাৎ সে সাধারণ পানকারীদের পর্যায়ে পড়বে না, তাই সেও আমার দলভুক্ত থাকতে পারবে)।” কিন্তু অল্প লোক ছাড়া সবাই নদীর পানি পান করেছিল। তারপর তালূত ও তার সাথের বিশ্বাসীরা যখন নদীটি পার হয়ে গেল তখন তারা বলল, “আজ জালূত ও তার সৈন্যদের মোকাবেলা করার ক্ষমতা আমাদের নেই।” তবে যারা নিশ্চিত জানত যে, আল্লার সাথে তাদের সাক্ষাৎ হবে তারা বলল, “আল্লাহর হুকুমে কত ছোট দল কত বড় দলকে পরাজিত করেছে!” আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।



মুহিউদ্দিন খান: অতঃপর তালূত যখন সৈন্য-সামন্ত নিয়ে বেরুল, তখন বলল, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদিগকে পরীক্ষা করবেন একটি নদীর মাধ্যমে। সুতরাং যে লোক সেই নদীর পানি পান করবে সে আমার নয়। আর যে, লোক তার স্বাদ গ্রহণ করলো না, নিশ্চয়ই সে আমার লোক। কিন্তু যে লোক হাতের আঁজলা ভরে সামান্য খেয়ে নেবে তার দোষঅবশ্য তেমন গুরুতর হবে না। অতঃপর সবাই পান করল সে পানি, সামান্য কয়েকজন ছাড়া। পরে তালূত যখন তা পার হলো এবং তার সাথে ছিল মাত্র কয়েকজন ঈমানদার, তখন তারা বলতে লাগল, আজকের দিনে জালূত এবং তার সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করার শক্তি আমাদের নেই, যাদের ধারণা ছিল যে, আল্লাহর সামনে তাদের একদিন উপস্থিত হতে হবে, তারা বার বার বলতে লাগল, সামান্য দলই বিরাট দলের মোকাবেলায় জয়ী হয়েছে আল্লাহর হুকুমে। আর যারা ধৈর্য্যশীল আল্লাহ তাদের সাথে রয়েছেন।



জহুরুল হক: তারপর তালুত যখন সৈন্যদল নিয়ে অভিযান করলেন তখন বললেন -- "নিশ্চয় আল্লাহ্ তোমাদের পরীক্ষা করবেন একটি নদী দিয়ে; তাই যে কেউ তার থেকে পান করবে সে আমার নয়, আর যে এর স্বাদ গ্রহণ করবে না সে নিঃসন্দেহ আমার, শুধু সে ছাড়া যে তার হাতে কোষ-পরিমাণ পান করে।" কিন্তু তাদের অল্প কয়েকজন ছাড়া তারা তা থেকে পান করেছিল। তারপর তিনি যখন উহা পার হয়ে গেলেন, তিনি ও যারা তাঁর সাথে ঈমান এনেছে, তারা বললে -- "আজ আমাদের শক্তি নেই জালুত এবং তার সৈন্যদলের বিরুদ্ধে।" যারা নিশ্চিত ছিল যে তারা অবশ্যই আল্লাহ্‌র সাথে মুলাকাত করতে যাচ্ছে, তারা বললে -- "কতবার ছোট দল আল্লাহ্‌র হুকুমে বড় দলকে পরাজিত করেছে, আর আল্লাহ্ অধ্যবসায়ীদের সাথে আছেন"।



Sahih International: And when Saul went forth with the soldiers, he said, "Indeed, Allah will be testing you with a river. So whoever drinks from it is not of me, and whoever does not taste it is indeed of me, excepting one who takes [from it] in the hollow of his hand." But they drank from it, except a [very] few of them. Then when he had crossed it along with those who believed with him, they said, "There is no power for us today against Goliath and his soldiers." But those who were certain that they would meet Allah said, "How many a small company has overcome a large company by permission of Allah. And Allah is with the patient."



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২৪৯ তারপর তালুত যখন সেনাবাহিনীসহ বের হলো তখন সে বলল, আল্লাহ এক নদী দ্বারা তোমাদের পরীক্ষা করবেন। যে তা থেকে পানি পান করবে সে আমাদের দলভুক্ত নয়; আর যে তার স্বাদ গ্রহণ করবে না সে আমার দলভুক্ত; এছাড়া যে তার হাতে এক কোষ পানি গ্রহণ করবে সেও’। অতঃপর অল্প সংখ্যক ছাড়া তারা তা থেকে পানি পান করল(১)। সে এবং তার সংগী ঈমানদারগণ যখন তা অতিক্রম করল তখন তারা বলল, জালূত ও তার সেবাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মত শক্তি আজ আমাদের নেই। কিন্তু যাদের প্রত্যয় ছিল আল্লাহ্–র সাথে তাদের সাক্ষাৎ হবে তারা বলল, আল্লাহ্–র হুকুমে কত ক্ষুদ্র দল কত বৃহৎ দলকে পরাভূত করেছে! আর আল্লাহ্– ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন।


তাফসীর:

(১) কোন কোন তাফসীরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এতে তিন ধরণের লোক ছিল। একদল অসম্পূর্ণ ঈমানদার, যারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। দ্বিতীয় দল পূর্ণ ঈমানদার, যারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু নিজেদের সংখ্যা কম বলে চিন্তা করেছে এবং তৃতীয় দল ছিল পরিপূর্ণ ঈমানদার, যারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন এবং নিজেদের সংখ্যালঘিষ্টতার কথাও চিন্তা করেননি। [মা'আরিফুল কুরআন]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২৪৯) অতঃপর তালূত যখন সৈন্যদলসহ বের হল, তখন সে বলল, ‘আল্লাহ একটি নদী দ্বারা তোমাদেরকে পরীক্ষা করবেন।[1] অতএব যে কেউ উক্ত নদী থেকে পানি পান করবে, সে আমার দলভুক্ত নয় এবং যে ঐ পানি পান করবে না, সে আমার দলভুক্ত। অবশ্য যে কেউ তার হাত দিয়ে এক আঁজলা পানি পান করবে সে-ও (আমার দলভুক্ত)।’ কিন্তু (যখন তারা নদীর কাছে হাজির হল, তখন) তাদের অল্প সংখ্যক ব্যতীত অধিকাংশ লোকই তা থেকে পানি পান করল।[2] অতঃপর যখন সে (ত্বালূত) ও তার প্রতি বিশ্বাসস্থাপনকারিগণ তা (নদী) অতিক্রম করল, তখন তারা বলল, ‘আমাদের শক্তি ও সাধ্য নেই যে, আজ জালূত ও তার সৈন্য-সামন্তের সাথে যুদ্ধ করি।’[3] কিন্তু যাদের প্রত্যয় ছিল যে, আল্লাহর সাথে তাদের সাক্ষাৎ ঘটবে, তারা বলল, ‘আল্লাহর ইচ্ছায় কত ক্ষুদ্র দল কত বৃহৎ দলকে পরাজিত করেছে! আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে রয়েছেন।’


তাফসীর:

[1] এই নদীটি জর্ডান ও প্যালেষ্টাইনের মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত।

[2] আমীরের আনুগত্য করা সর্বাবস্থায় জরুরী। আর শত্রুর সাথে যুদ্ধ করার সময় তো তার (আমীরের আনুগত্য করার) গুরুত্ব দ্বিগুণ নয়, বরং শতগুণ হয়ে যায়। দ্বিতীয়তঃ যুদ্ধে সফলতা অর্জনের জন্য জরুরী হল, সৈন্যের যুদ্ধকালীন সময়ের ক্ষুৎপিপাসা এবং অন্যান্য কষ্ট অতীব ধৈর্যের সাথে সহ্য করা। তাই এই দু’টি বিষয়ে তরবিয়াত এবং পরীক্ষার জন্য ত্বালুত বললেন, নদীতে তোমাদের প্রথম পরীক্ষা হবে। যে এই নদীর পানি পান করবে, তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক থাকবে না। কিন্তু এই সতর্কতা সত্ত্বেও অধিকাংশ লোকেরাই পানি পান করে নেয়। তাদের সংখ্যার ব্যাপারে মুফাসসিরগণের বিভিন্ন উক্তি বর্ণিত হয়েছে। অনুরূপ যারা পান করেনি, তাদের সংখ্যা ৩১৩ বলা হয়েছে, যা ছিল বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারীদের সংখ্যা। আর আল্লাহই অধিক জানেন।

[3] এই ঈমানদাররাও যখন শুরুতে দেখল শত্রুর সংখ্যা অনেক, তখন তাদের সংখ্যা (শত্রুর তুলনায়) কম থাকায় তারা এই মত প্রকাশ করল। তখন তাদের আলেমগণ এবং যারা আল্লাহর সাহায্যে পূর্ণ বিশ্বাসী ছিলেন তাঁরা বললেন, সফলতা সংখ্যার আধিক্যের এবং অস্ত্র-শস্ত্রের প্রাচুর্যের উপর নির্ভরশীল নয়, বরং তা আল্লাহর ইচ্ছা এবং তাঁর নির্দেশের উপর নির্ভর করে। আর আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার জন্য জরুরী হল ধৈর্যের প্রতি যত্ন নেওয়া।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ২৪৬-২৫২ নং আয়াতের তাফসীর:



এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-এর পরবর্তী যুগের একটি জাতির ঘটনা উল্লেখ করেছেন। সাগরডুবি থেকে নাজাত পেয়ে মূসা ও হারূন (আঃ) বানী ইসরাঈলের নিয়ে শামে এসে শান্তিতে বসবাস করতে থাকলেন। এমতাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে পিতৃভূমি ফিলিস্তীন ফিরে গিয়ে আমালেকা জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তা পুনরুদ্ধারের নির্দেশ দেয়া হল, সাথে এ ওয়াদাও দেয়া হল- যুদ্ধ করলেই বিজয় দান করা হবে (সূরা মায়িদাহ ৫:২৩)। কিন্তু তারা মূসা (আঃ)-কে পরিস্কার জানিয়ে দিল- ‘তুমি ও তোমার রব গিয়ে যুদ্ধ কর, আমরা এখানে বসে রইলাম’(সূরা মায়িদাহ ৫:২৪)। ফলে শাস্তিস্বরূপ তারা তীহ ময়দানে ৪০ বছর উ™£ান্ত অবস্থায় ঘুরতে থাকল। পরে ইউশা বিন নূনের নেতৃত্বে ফিলিস্তীন দখল করা হলেও বানী ইসরাঈল পুনরায় বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দেয় এবং নানাবিধ অনাচারে লিপ্ত হয়। তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদের ওপর পুনরায় আমালেকা জাতি চাপিয়ে দেন। বানী ইসরাঈলরা আবার নিগৃহীত হতে থাকে। এভাবে বহু দিন কেটে যায়। এক সময় শামাবীল (شمويل) নাবীর যুগ আসে। তারা এ নাবীর কাছে একজন বাদশা নির্ধারণের দাবি জানাল যাতে তার নেতৃত্বে পূর্বের ঐতিহ্য ফিরে পেতে পারে এবং বর্তমান দুর্দশা থেকে মুক্তি পেতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা তাদের দাবি মতে নেতা হিসেবে তালূতকে প্রেরণ করেন। কিন্তু তারা তালূতকে মেনে নেয়নি। কারণ তালূত ঐ বংশের ছিল না যে বংশ থেকে ধারাবাহিকভাবে বানী ইসরাঈলের নেতৃত্বের আগমন ঘটেছে। তিনি একজন দরিদ্র ও সাধারণ সৈনিক ছিলেন। তাই তারা আয়াতে বর্ণিত অভিযোগ আনল।



বিষয়টি হল- বানী ইসরাঈলের নিকট একটি সিন্দুক ছিল। যার মধ্যে তাদের নাবী মূসা ও হারূন (আঃ) এবং তাদের পরিবারের ব্যবহৃত কিছু পরিত্যক্ত সামগ্রী ছিল। তারা এটাকে খুবই বরকতময় মনে করত এবং যুদ্ধকালে একে সম্মুকে রাখত। একবার আমালেকাদের সাথে যুদ্ধের সময় বানী ইসরাঈল পরাজিত হলে আমালেকাদের বাদশা জালূত উক্ত সিন্দুকটি নিয়ে যায়। এক্ষণে যখন বানী ইসরাঈলগণ পুনরায় জিহাদের সংকল্প করল, তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে উক্ত সিন্দুক ফিরিয়ে দিতে মনস্থ করলেন। অতঃপর এ সিন্দুকটির মাধ্যমে তাদের মধ্যকার নেতৃত্ব নিয়ে ঝগড়ার নিসরন করেন। সিন্দুকটি তালূতের বাড়িতে আগমনের ঘটনা এই যে, জালূতের নির্দেশে কাফিররা যেখানেই সিন্দুকটি রাখে, সেখানেই দেখা দেয় মহামারী ও অন্যান্য বিপদাপদ শুরু হয়ে যায়। এমনিভাবে তাদের পাঁচটি শহর ধ্বংস হয়ে যায়। অবশেষে অতিষ্ট হয়ে তারা একে তার প্রকৃত মালিকের কাছে পাঠিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিল এবং গরুর গাড়িতে উঠিয়ে হাঁকিয়ে দিল। তখন ফেরেশতাগণ আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশক্রমে গরুর গাড়িটি তাড়িয়ে এনে তালূতের ঘরের সম্মুখে রেখে দিল। বানী ইসরাঈল এ দৃশ্য দেখে সবাই একবাক্যে তালূতের নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করল। অতঃপর তালূত আমালেকাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার প্রস্তুতি নেন। সকল প্রস্তুতি শেষ হলে কথিত মতে ৮০,০০০ হাজার সেনা নিয়ে রওনা হন। অল্প বয়স্ক তরুণ দাউদ (আঃ) ছিলেন উক্ত সেনা দলের সদস্য। পথিমধ্যে সেনাপতি তালূত তাদের পরীক্ষা করতে চাইলেন। সম্মুখেই ছিল এক নদী। মৌসুম ছিল প্রচণ্ড গরমের। পিপাসায় ছিল সবাই কাতর। তাই তিনি বললেন,



(مُبْتَلِيْكُمْ بِنَهَرٍ)



‘তোমাদেরকে একটি নদী দ্বারা পরীক্ষা করবেন’এ নদীটি হল জর্ডান ও প্যালেস্টাইনের মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত। বস্তুত নদী পার হওয়া অল্প সংখ্যক ঈমানদার ব্যতীত সকলেই পানি পান করেছিল, যাদের সংখ্যা ছিল ৩১৩ জন, যা বদর যুদ্ধে মুসলিম যুদ্ধাদের সংখ্যা ছিল। যারা পানি পান করেছিল তারা আলস্যে ঘুমিয়ে পড়ে। এ স্বল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে তালূত শৌর্য-বীর্যের প্রতীক আমালেকাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চললেন। বস্তুবাদীদের হিসেবে এটা ছিল নিতান্তই আত্মহননের শামিল, একটি অসম যুদ্ধ।



(وَلَمَّا بَرَزُوْا لِجَالُوْتَ وَجُنُوْدِه)



‘আর যখন তারা জালূত ও তার সৈন্যদের মুখোমুুখি হল’জালূত ছিল শত্র“দলের সেনাপতি। তালূত ও তাঁর সঙ্গীরা জালূতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়েছিল। এরা ছিল আমালিকা জাতি। তৎকালীন সময়ে তারা বড় দুর্ধর্ষ ও যুদ্ধবাজ ছিল। তাই এ যুদ্ধবাজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় তারা আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করে নিল। আল্লাহ তা‘আলার সহযোগিতায় তারা সংখ্যায় অল্প হলেও জয় লাভ করল।



(وَقَتَلَ دَاو۫دُ جَالُوْتَ)



‘দাঊদ (আঃ) জালূতকে হত্যা করল’তখন দাঊদ (আঃ) নাবী ছিলেন না। তালূতের একজন সাধারণ সৈন্য ছিলেন। পরে আল্লাহ তা‘আলা তাকে নবুওয়াত ও রাজত্ব উভয়টি দান করলেন।



এসব ঘটনা বর্ণনা করার দু’টি উদ্দেশ্য:



(১) শিক্ষা গ্রহণ, (২) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নবুওয়াতের সত্যতার প্রমাণ। কেননা; তিনি এ সব ঘটনা কোন কিতাবে পড়েননি এবং কারো কাছে শোনেননি। বরং অতীতের এসব ঘটনা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলকে ওয়াহীর মাধ্যমে অবগত করেছেন। সেজন্য শেষে আল্লাহ তা‘আলা বললেন:



(إِنَّكَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ)



“নিশ্চয়ই তুমি রাসূলগণের অন্যতম একজন।”(সূরা ইয়াসীন ৩৬:২)



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. শরীয়তসম্মত জিহাদের শর্ত হল শরীয়তসম্মত ইমাম থাকতে হবে।

২. রাসূলদের ব্যবহৃত জিনিস দ্বারা বরকত নেয়া জায়েয। তবে কোন পীর-ফকির বাবা ইত্যাদি ব্যক্তির থেকে নয়। এটা শুধু রাসূলদের সাথে সীমাবদ্ধ।

৩. ঈমানদার যুদ্ধে গেলে পিছপা হয় না।

৪. মুনাফিকরা যুদ্ধের জন্য খুব আগ্রহ দেখাবে কিন্তু ফরয হলে বা সরাসরি মোকাবেলার সময় হলে পালাবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: এখন ঘটনা বর্ণিত হচ্ছে যে, যখন ঐ লোকেরা তালূতকে বাদশাহ বলে মেনে নিলো তখন তিনি তাদেরকে নিয়ে যুদ্ধে বের হলেন। সুদ্দীর (রঃ) উক্তি অনুযায়ী তাদের সংখ্যা ছিল আশি হাজার। পথে তালূত তাদেরকে বললেনঃ “আল্লাহ তোমাদেরকে একটি নদী দ্বারা পরীক্ষা করবেন।' হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) উক্তি অনুসারে এই নদীটি উরদুন’ ও ফিলিস্তিনের মধ্যবর্তী স্থলে অবস্থিত ছিল। ঐ নদীটির নাম ছিল 'নাহরুশ শারীআহ’। তার্ত তাদেরকে সতর্ক করে দেন যে, কেউ যেন ঐ নদীর পানি পান না করে। যারা পান করবে তারা যেন আমার সাথে না যায়। এক আধ চুমুক যদি কেউ পান করে নেয় তবে কোন দোষ নেই। কিন্তু তথায় পৌঁছে গিয়ে তারা অত্যন্ত তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ে। কাজেই তারা পেট পুরে পানি পান করে নেয়। কিন্তু অল্প কয়েকজন অত্যন্ত পাকা ঈমানদার লোক ছিলেন। তাঁরা এক চুমুক ব্যতীত পান করলেন না।

হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) উক্তি অনুযায়ী ঐ এক চুমুকেই তাঁদের পিপাসা মিটে যায় এবং তারা জিহাদেও অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু যারা পূর্ণভাবে পান করেছিল তাদের পিপাসাও নিবৃত্ত হয়নি এবং তারা জিহাদের উপযুক্ত বলেও গণ্য হয়নি। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, আশি হাজারের মধ্যে ছিয়াত্তর হাজারই পানি পান করেছিল এবং মাত্র চার হাজার লোকে প্রকৃত অনুগতরূপে প্রমাণিত হয়েছিলেন। হযরত বারা বিন আযিব (রাঃ) বলেন যে, মুহাম্মদ (সঃ)-এর সাহাবীগণ (রাঃ) প্রায়ই বলতেন : বদরের যুদ্ধে আমাদের সংখ্যা ততজনই ছিল যতজন তালুতের অনুগত সৈন্যদের সংখ্যা ছিল। অর্থাৎ তিন শো তেরো জন।

নদী পার হয়েই অবাধ্য লোকেরা প্রতারণা শুরু করে দিলো এবং অত্যন্ত কাপুরুষতার সাথে যুদ্ধে যেতে অস্বীকার করে বসলো। শত্রু সৈন্যদের সংখ্যা বেশী শুনে তাদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। সুতরাং তারা স্পষ্টভাবে বলে ফেললো : “আজ তো আমরা জাতের সাথে যুদ্ধ করার শক্তি আমাদের মধ্যে অনুভব করতে পারছি না। তাদের মধ্যে যারা আলেম ছিলেন তারা তাদেরকে বহু রকম করে বুঝিয়ে বললেন : ‘বিজয় লাভ সৈন্যদের আধিক্যের উপর নির্ভর করে না। ধৈর্যশীলদের উপর আল্লাহ তা'আলার সাহায্য এসে থাকে। বহুবার এরূপ ঘটেছে যে, মুষ্টিমেয় কয়েকটি লোকে বিরাট দলকে পরাজিত করেছে। সুতরাং তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং আল্লাহ তা'আলার অঙ্গীকারের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ কর। এই ধৈর্যের বিনিময়ে আল্লাহ তোমাদের সহায় হবেন। কিন্তু এতদ্সত্ত্বেও তাদের মৃত অন্তরে উত্তেজনার সৃষ্টি হলো না এবং তাদের ভীরুতা দূর হলো না।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।